এক সুবিস্তৃত পটভূমিতে রচিত চক্র উপন্যাসের পটভূমিতে আছে বর্ধমান শহরের কাছে অবস্থিত একটি গ্রাম, এবং কলকাতা শহর। ভিন্ন স্থান হওয়া সত্ত্বেও এই দুই জায়গার মধ্যে একটি সংযোগ কোথাও আছে। আর এই সংযোগের মূলে অমল রায়। অমলের ছেলেবেলা কেটেছে এই গ্রামে। পরীক্ষায় ভাল ফল করার পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অমলের বাল্য প্রেমিকা পারুল। সেও এই গ্রামের মেয়ে। তার ব্যক্তিত্ব অন্যদের চর্চার বিষয়। অমলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার পর, শুধুমাত্র প্রেমিকের কামুকতার আঘাতে চিরদিনের মতো এই সম্পর্ক শেষ করে দেয় পারুল। অমল বিদেশে চলে যায়, তার বিয়ে হয় মোনার সঙ্গে। বিয়ে হয় পারুলেরও, স্বামী ব্যবসারী, সাংঘাতিক পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ। পারুল সুখী, স্বামীর ব্যবসায়েরও সঙ্গী। সোহাগ অমলের মেয়ে। বাবা-মায়ের সঙ্গে গ্রামে এসে এক অদ্ভুত পরিবর্তন সূচিত হয় তার জীবনে। পারুল তার কাছে গডেস। এদিকে মোনা ও অমলের সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হয়ে উঠছে। কারণ এত বছর পরেও পারুলকে ভুলতে পারেনি অমল। গ্রামের আর এক আশ্চর্য মানুষ রসিক বাঙাল। তার দুটি বিয়ে; একজন থাকে গ্রামে, অন্যজন শহরে। বাঙালের দু'পক্ষের ছেলেমেয়েদের ভারী মিল। এদের জীবনযাপনের গল্প উপন্যাসে অন্য মাত্রা এনেছে। সহস্র সংকট ও দুঃখ-বেদনার মধ্যেও ভাল হওয়ার জন্য মানুষের কী অনন্ত পিপাসা! সমগ্র কাহিনীতে অনুপস্থিত থেকেও জীবন্ত চরিত্র গৌরহরি চট্টোপাধ্যায়। সোহাগের বন্ধু পান্নাও কাহিনীর অন্যতম প্রন্থি। আর আছে একজন একটা বাস্তুসাপ, যার কোনও ভাষা নেই, ভূমিকা নেই। কিন্তু নিজের গতিপথে কুশীলবদের একই গণ্ডিতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় সে। চক্র'র কাহিনী জুড়ে আছে প্রেম, আত্মানুসন্ধান, পুরনো ধ্যান-ধারণা ছিন্ন করার প্রয়াস। আছে গ্রামীণ স্নিগ্ধ জীবনের অন্তরে নগরসভ্যতার ক্রমানুপ্রবেশের বিশ্বস্ত চিত্র। জীবন কত অমেয়, চক্র সেই কাহিনী বলেছে আশ্চর্য আন্তরিকতায়।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
খুব সাধারণভাবে দৈনন্দিন জীবনের গল্প বলে যেতে পারা এবং সেটা দিয়েই পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারাটা একটা বিশাল ক্ষমতা। আর সেই ক্ষমতার উদ্ভাসিত রূপ আমি সবসময়ই শীর্ষেন্দুবাবুর বইয়ের মধ্যেই বেশি দেখতে পাই।
আজ কোনো কাহিনীসংক্ষেপ এর বালাই না করে সোজাসুজি পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় চলে আসার কারণ হলো "চক্র" বরাবরের মত কোনো অতীব আকর্ষণীয় চমৎকৃত করার প্লটযুক্ত বই নয়৷ এর বিস্তার কয়েক বাক্যে কাহিনীসংক্ষেপ নামে আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। "চক্র" যাপিত জীবনের গল্প, খুব আটপৌরে কিছু সংসারের সাধারণ দোনোমনা, গ্রাম্য ও শহুরে জীবনের চিরকালীন তফাতের কথা। বয়সের ভারে শীর্ণ মানসিকভাবে দুর্বল কোনো বৃদ্ধের কথা। নিজেকে হারিয়ে ফেলা এককালের কোনো শক্তিমাণ তরুণের কাপুরুষত্বের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেবার কথা। বাঁধ-না-মানা কৈশোরের কথা। অতীতের কথা ভুলতে না পেরেও চেপে রাখা এক দুঃখের সাথে মানিয়ে নেবার কথা। নতুন প্রেমে উদ্বেল লজ্জিত তরুণ-তরুণীর কথা৷
"চক্র" যেন জাগতিক সবকিছুর গল্প। এতোটা এলোমেলোভাবে লিখেও যে এতো গুছিয়ে হাজারো জিনিস কেবল একটা বইয়ের মধ্যে তুলে আনা যায়, পড়লেই কেবল বোঝা সম্ভব। পুরো বইটা পড়ার সময়ই আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম আর শেষ করার পরেও ঘোরটা যাচ্ছে না। বার বার ভাবছি উফ কেন আরেকটু বড় হলো না! কেন হুট করে এখানেই শেষ করে দিতে হলো! শীর্ষেন্দুবাবুর যেকোনো বই পড়ার পর তার তৈরি চরিত্রগুলো মাথার মধ্যে অগুণতি সময়ের জন্য আস্তানা গেড়ে বসে থাকে, কোথাও যেতে চায় না। কি বিপদ!
কয়েকটা প্রিয় অংশ উল্লেখ করে বিদায় নিচ্ছি (যদিও আরো অসংখ্য এবং অসংখ্য প্রিয় অংশ রয়েছে এই বইতে) -
★ ওই যে লোকটা - কি যেন নাম - জিম করবেট, তাকে প্রায় মহাপুরুষ বানানো হয়েছে। লোকটার শিকারকাহিনী এখনো রাশি রাশি বিক্রি হয়। লোকটার মস্ত কৃতিত্ব হলো বন্দুক দিয়ে বাঘ মারা। এটা কোনও বীরত্বের কাজ? আমি সেসময় ক্ষমতায় থাকলে লোকটিকে দেশ থেকে বের করে দিতাম।
- বিজু
★ রামহরি এবং তার স্ত্রীর কথোপকথনঃ
- রান্না-বান্না বুঝেশুনে কোরো বাপু। আবার আমার জন্য আঝালি মশলা ছাড়া রাঁধতে হবে। ডাক্তার পোড়ামুখোরা বলছে আমার রক্তে চকলেট না কী যেন বেড়েছে।
- কী যে ছাই বলো। চকলেট হবে কেন, ও কোলেস্টেরল।
★ লোকে কয় বটে অভাবে স্বভাব নষ্ট। কিন্তু আমি কই নষ্টের বীজ ভিতরে না থাকলে অভাব তারে টলাইতে পারে না।
কিছু কিছু বই শেষ হয়ে যায়। তবু ঘোর কাটে না। চক্র তেমনই একটি বই।
বৃহৎ কলেবরের এই বইয়ের কেন্দ্রস্থল বর্ধমানের কাছেই এক অজানা গ্রামে। উপন্যাসের শুরু হয় গ্রামের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি উকিল গৌরহরি চট্টোপাধ্যায়ের শ্রাদ্ধের দিন থেকে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঘুরেফিরে কয়েক জন। বৃদ্ধ ধীরেন, মহিম রায়ের মেয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যার ভাই গ্রামের সবচেয়ে কৃতি সন্তান অমল রায়, অমলের মেয়ে সোহাগ, গৌরহরির স্ত্রী বলাকা আর ডাকসাইটে সুন্দরী মেয়ে পারুল, গৌরহরির ভাইঝি পান্না আর ভাইপো বিজু, বাঙাল ও তার পরিবার। এই কয়েকজন মানুষের জীবন যাপন, তাদের সম্পর্ক আর মানব জীবনের অদ্ভুত পরিণতি নিয়েই উপন্যাস চক্র।
উপন্যাসটা অসম্ভব ভালো লেগেছে। তবে শেষদিকে কেমন যেন তাড়াহুড়োর ছাপ পেলাম। শেষটা আরো ভালো করা যেতো।
সবমিলিয়ে, বারবার পড়ার মতো চমৎকার একটা বই। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এক অনন্য সৃষ্টি।
একটা সময় আশ্চর্য রকমের এক ঐশ্বর্য ছিল, ঐশ্বর্য বলছি কারন এখন যখন ভাবতে বসি মনে হয় আরেহ্ সেসবও কি বাস্তব ছিল?! ভার্সিটি থেকে বাড়ি ফেরার পথে নীলক্ষেত পড়ত রোজ। সেই সুবাদে আজ এই বই, কাল ঐ বই। কোনোদিন শ পাঁচেক, কোনোদিন পঞ্চাশ আর কোনোদিন "থাক মামা আজ, এই দুটো থাক, কাল পরশু নিয়ে যাব নাহয়😅😅"। বলাই বাহুল্য, বই কখনো রেখে আসতে হয়নি; বইওয়ালা মামা পাঁচ হোক বা পঞ্চাশ, বাকি রেখে, "পরে একদিন দিয়ে যাবেন" বলে ঠিক দিয়ে দিতেন। সেরকমই কোন একদিন তিরিশ টাকায় কেনা এই বই। কেন এই বইটাই? জানিনা। জেনে শুনে বই কিনিনি/পড়িনি আজ বহুদিন। নিজেকে চমক দিতে নাকি নেহায়েত আলসেমিতে? কে জানে ভায়া!
তা সে যেভাবেই হোক, যা মনে করেই কিনলাম, বইখানা পড়বার সাহস হয়ে উঠলোনা যতদিন পর্যন্ত না পড়া বইয়ের সারিতে শুধু এটাই বাকি রইল। কিন্তু শুরু করে কয়েক পাতা এগোতেই দেখলাম এদিকে পারুলের সাথে পান্না গুলিয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে তো ওদিকে বলাকা আর বলাই মিলিয়ে যাচ্ছে। অচেনা নাম নয়, অচেনা সমাজ নয় তাও কেন এমন অচেনা ঠেকছিলো সব বুঝতে বুঝতে কখন যে গল্পের ওরা সব এতো আপনার হয় উঠলো টেরই পেলাম না। কি যে আনন্দ হলো যেদিন অমল মোনার জন্য প্রথম শাড়ি কিনে নিয়ে গেল!! পুরোটা সময় অনুপস্থিত থেকেও প্রকটভাবে বিরাজমান গৌরহরির জন্য বলাকার যে হাহাকার; বুঝতে না পারলেও ঐ শূন্যতা অনুভব না করে পারা যায়নি। সমাজের নিয়ম কি়ংবা নিয়তির দয়া না পাওয়ায় সন্ধ্যার আকুলতা। এত এত জীবন আর তাদের দিন-রাতের এই যাপিত জীবনের যে এত কথা, আমি এখন বলতে গিয়ে কেমন যেন জটলা পাকিয়ে ফেলছি কিন্তু লেখক এসব কখনো সরল কখনো জটিল জীবনকে কত স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে গেলেন পাতার পর পাতা!!
দ্রষ্টব্য: ঐ "বিশেষ" দৃষ্টিকোণটা না দিলেই চলছিল না!!!
I have read the best of Shirshendu in Durbeen, Parthibo and Manabjamin, but missed this one. All of them including Chakra have a very vast milieu as their setting. There are a plethora of characters introduced gradually to the readers, linking them to each other in a complex web of a plot. I’d say Chakra is comparatively less complex in characterization than the other novels but the incidents around each of them are woven very carefully here. The story revolves around two main protagonists, Amal and Parul. The characterization mesmerizes me as usual.The writing is as lucid as it could be, the characters portray emotions beyond ranges, sometimes too subtle for our tastes, deep philosophies discussed in simple words – it is a treat in the form of fiction.
অনেকটা আটার কাই এর মত। লেখক বেলেই যাচ্ছেন, বেলেই যাচ্ছেন। ফলে সবদিকেই ফুলে ফেঁপে বেশ বড়ধরনের একটা রুটির মত আকার ধারন করেছে উপন্যাসটি। তবে উপন্যাসটির শুরু ও শেষ এর অংশটুকু এবং কয়েকটি চরিত্রের চিত্রায়ন ভাল লেগেছে। ফলশ্রুতিতে বইটি শেষ করতে হবে এই তাগিদ ছাড়া আর কোন আকর্ষণ ছিল না বইটি পড়ে ফেলার ব্যাপারে।
এতো প্রিয় একজন লেখক কিন্তু উনার বই পড়ার পর আমি আর কিছুই লিখতে পারি না। কোথায় যেন হা��িয়ে যাই। শহরের হাঁপ ধরা জীবন ছেড়ে গ্রামের আঁকাবাকা পথে হয়তো! ভালো লাগে অনুভূতিটা।
সাপ এঁকেবেঁকে চলার সাথে সাথে প্রথম পরিচয় ঘটে ভবঘুরে বৃদ্ধ ধীরেনের সাথে ।যার চমকে উঠা চিৎকারে দেখা মেলে টিন এজ পান্নার, যে কি পদ্ধতিতে মরবে তার লটারী করা নিয়ে ব্যস্ত।
সাপটার এগোনোর সাথে সাথে দেখা মেলে বুড্ডা, সোহাগ, তাদের মায়ের। এরা অমলের পরিবার। দেখা মেলে বালক মরনকুমারের।যার বাবা রসিক বাঙ্গাল এবং মা বাসন্তী এই উপন্যাসের বড় একটা অংশ জুড়ে আছে। দেখা মেলে পারুলের।
গ্রামের ডাকসাইটে সুন্দরী পারুল আর অসম্ভব ভালো রেজাল্ট করা অমলের প্রেমের কাহিনী যখন সবার আলোচনার বিষয় এবং দুই পরিবারের ও পুরো সম্মতি তখন বিয়ের আগেই অমলের অসংযত আচরণের কারণে পারুল দৃঢ় ভাবে অমলকে প্রত্যাখ্যান করে। এবং বিচক্ষণ বাবার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করে।এসব অবশ্য বিশ-বাইশ বছর আগের কথা।
ফ্ল্যাশ ব্যাক থেকে বর্তমানে ফিরে দেখা যায় দেশ বিদেশে অত্যন্ত নাম করা অমলের পরিবার গ্রামে।এখান থেকে একে একে ভিতরে প্রবেশ করে দেখা যায় অমলের অসুখী পরিবারের চিত্র। যার কালো মেঘ এসে হানা দিচ্ছে অমলের গ্রামে থাকা স্বামী পরিত্যক্তা কিন্তু নিজ পায়ে দাঁড়ানো বোন সন্ধ্যার জীবনেও।
আচ্ছা পারুল কে হারানো কিংবা সংসারের রাশ আলগা হয়ে যাওয়ার জন্য কি তবে অমলের দুর্বল চিত্তই দায়ি ?ভাবার বিষয় ।
অন্য দিকে পারুল সংসারে স্বামীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের ব্যবসা দেখে এবং সুখি সুন্দর সংসার তার।আর সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় পারুল কে অমলের ব্উ মেয়ে দেবী ভাবে।
এই গ্রামের রসিক বাঙাল,যার বাসন্তী দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। প্রথম পক্ষের জন থাকে শহরে।আর বাসন্তী গ্রামে। অত্যন্ত গৃহী কিন্তু দিলখোলাএই মানুষটি যে নিপুন হাতে দুই সংসার চালিয়ে নিয়ে যায় তা আমাকে খুব বিস্মিত করেছে। অত সুক্ষ্ম চিন্তা ভাবনা সে করতে পারে না কিন্তু যা বিশ্বাস করে তাই করে বলেই তার জীবন অত জটিল হওয়ার সুযোগ পায় না।
বড় কোন একক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ উপন্যাস এগিয়ে যায়নি। মানুষের জীবনের উত্থান-পতনের চক্রের এক সূনিপুন চিত্র হলো উপন্যাস চক্র।
তাই তো এক সময় অমলের সংসারেও সুখের কিরন ছটা চিকচিক করতে দেখা যায়। অগোছালো দিকভ্রান্ত সোহাগ একসময় সুস্থির হয়। আবারও শেষে এসে সাপটার দেখা মেলে ।
এবার আমার উপলব্ধির কথা বলি। আমি অতি সাধারণ মানুষ বলে কিনা জানিনা এই সব সাধারণ মানুষের জীবনের চক্রের কথা আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। এই তো আমাদের জীবন। অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় জীবন টা জটিল নাইবা করলাম।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখার ব্যাপারে আসলে নতুন করে বলার কিছু নেই। উনি সবসময়ই ভালো লেখেন।"চক্র" তার ব্যতিক্রম নয়।
"চক্র" কে রেটিং এ আমি অবশ্যই ৫ এ ৫ দিব। ক্ষমতা থাকলে অবশ্য আমি ৫ এ ৬ দিতাম!!!!!!!!!
এক সুবিস্তৃত পটভূমিতে রচিত চক্র উপন্যাসের পটভূমিতে আছে বর্ধমান শহরের কাছে অবস্থিত একটি গ্রাম, এবং কলকাতা শহর। ভিন্ন স্থান হওয়া সত্ত্বেও এই দুই জায়গার মধ্যে একটি সংযোগ কোথাও আছে। আর এই সংযোগের মূলে অমল রায়। গল্পগুলো সব প্রায় অমল রায়কে ঘিরে হলেও আমি বলবো এটা পারুলের গল্প। প্রথম দিকেই অমলের জঘন্য আচরণের জন্য পারুল যে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে এই কারণে আমি এটা পারুলের গল্প ধরে নিবো🖤 আর আমি অমলকে পছন্দ করতে পারিনি প্রথম থেকেই। তাই ওর কথা বলে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়না।
এই উপন্যাসে অনেক চরিত্র, আর নামের সাথে মিল রেখেই বোধহয় সবাইকে এক চক্রে বেঁধে রেখেছিলেন লেখক। এতসব চরিত্রের মধ্যেও বেশি নজর কেড়ে নিয়েছিলো পারুলের মা আর রশিক বাঙাল। কেনো জানিনা এই দুটো চরিত্র আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। পারুলের মাকে এক ভরসার জায়গা বলে মনে হয়েছে। আর হয়তো এই বই পড়লে তুমিও বুঝতে পারবে এই অনুভুতি কেনো আসে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখার একটা দিক হলো ওনি বাস্তব জীবনের সাথে খুব মিল রেখে তার লেখাগুলো লিখে যান। তুমি হয়তো কোনো এক শেষ সমীকরণে পৌঁছাতে একটা বই তুলে নাও। এই বই হাতে নেয়ার আগে জেনে রাখো যে এই বই কিন্তু আলাদা। এটি বাস্তবের মতো-আবহমান। মানুষের পরিবর্তন, সুখ দুখের উপখ্যান, ভালোবাসা, ঘৃণা, সব ঘুরে ফিরে আসবে তোমার সামনে,আর তুমিও জানো যে এটাই জীবন। 'নিজেই মায়া সৃষ্টি করে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছি।'-এই লাইনখানাকে ভীষণ আপন মনে হয়েছে। জীবন কত অমেয়, চক্র সেই কাহিনী বলেছে আশ্চর্য আন্তরিকতায়। তাই পড়ে নিরাশ হওয়ার মতো কোনো কারণ নেই।
শীর্ষেন্দুর সব লেখায়ই আমার মধ্যে একটা ঘোরের সৃষ্টি করে। চক্রও তার ব্যাতিক্রম ছিল না। শহর আর গ্রামের আবরনে কয়েকটি পরিবারের মধ্যকার সম্পর্ক, টানাপোড়েন, আধুনিকতা আর প্রাচীন পন্থীতার মধ্যের একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা নিয়েই উপন্যাস এগোয়। বেশ কিছু স্ট্রং চরিত্র ছিল। ছিল কিছুটা নারীবাদীতার ছায়া। সবকিছু মিলিয়ে বেশ সুখপাঠ্যই বলা যায়।
শুরুতেই খানিক গল্প শুনতে পেলাম এক সরীসৃপের, যে একটু করে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে গল্প বলা শুরু করলো। এরপর -
তার দীর্ঘশ্বাসে বাতাস কেঁপে উঠলো। পিঙ্গল শরীরটাকে বইয়ে দিলো সে। কিন্তু বড়ো কষ্ট। শরীর জুড়ে যেন ব্যাথার মৃদঙ্গ বেজে যাচ্ছে।
এই দীর্ঘশ্বাসমেশা বয়ে চলার সাথে সাথেই পুরো উপন্যাসজুড়ে শুনে গেলাম একটা ছোট্ট গ্রামের আটপৌরে কিছু মানুষ আর মানুষের জীবনের গল্প। সে আমি গল্প শুনতে বরাবরই ভালোবাসি। মানুষ, তাদের জীবনের গল্প যে বেঁধে রাখবে না, তা হবার জো এমনিতেও ছিলো না।
পুরো জার্নিটা বড়ো সুন্দর ছিলো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে প্রথম আদ্ধেকে যতোখানি মুগ্ধতা এসেছে শেষের দিকে কেন যেন ব্যাপারগুলো মিইয়ে গেছে। এর একটা কারণ হতে পারে যে প্রথমদিকে ব্যাপারগুলো প্রেডিক্ট করা সহজ ছিলো না। শেষের দিকটা সব খানিক প্রেডিক্টেবল হয়ে যায়।
শেষ করবার পর সবচেয়ে বেশি মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো সেই সরীসৃপ। আসলে তা কীসের রূপক? লেখক কি নিজেকেই ওর মাঝে তুলে ধরেছেন? কেননা একজন লেখকই তো সব চরিত্র ছুঁয়ে যায়, শুরু থেকে শেষ তার হাতেই হয়। সব চরিত্রের সীমাবদ্ধতা সে-ই ঠিক করে দেয় কলমের আঁচড়ে, যেমনটা পারুল টের পেয়েছিলো ট্র্যাকসুট পড়ে দৌড়াতে গিয়ে সাপের মুখোমুখি হয়ে। সাপের কাছ থেকে ভিক্ষালব্ধ প্রাণ, তুচ্ছ আয়ু যেন কাঙালিনীর মতো কুড়িয়ে নিলো সে। সে বুঝতে পারলে কয়েকটা মুহূর্তের মধ্যেই তাকে দুমড়ে, মুচড়ে, নিংরে নিঃশেষ করে দিয়েছে সাপটা। সে ফিসফিস করে বললো “আই অ্যাম নো গডেস, আই ওয়াজ নেভার এ গডেস, ওঃ গড।"
নাকি এ কোনো বৃহত্তর সত্ত্বার কথা? বা মানুষের কল্পিত স্রষ্টার অনুভব? মানুষের সীমাবদ্ধতার সাথে যা তাকে পরিচয় করিয়ে দেন...
প��রশ্নটা রয়ে গিয়েছে। এরপর বলা যায় ধীরেন কাষ্ঠর কথা। ওনার কথা শোনার সময়ে খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই কার কথা মনে আসছিলো জানো? বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়।
খানিকটা পড়লেই বুঝতে পারবে কেন একথা বলছি। এই যে নিতাইয়ের দোকানের নিমকি বিস্কুট – শুনতে সোজা হলে কী হবে, বিস্কুটখানা বিস্তর প্যাঁচালো। সে গুনে দেখেছে বিস্কুটখানায় অন্তত আটখানা থাক। পরতে পরতে জুড়ে কী করে যে বানিয়েছে মাথা খাটিয়ে, কে জানে বাবা! যেমন মুচমুচে তেমনই গালভরা স্বাদ। জিব যেন জুড়িয়ে যায়। মাঝে মাঝে এক আধটা কালোজিরে দাঁতে পড়লে ভারী চমৎকার লাগে। গোটাগুটি কামড়ে খায় না সে। খবরের কাগজের ঠোঙায় বিস্কুটখানা নিয়ে প্রথম কিছুক্ষণ চুপ করে অনুভব করে। ছোঁয়ার মধ্যেও একটা উপভোগ হয় না কি? তার তো হয়। তারপর বিস্কুটখানা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখে। এই দেখাটাও খাওয়ার একটা অঙ্গ। গানের আগে যেমন হারমোনিয়ামের প্যাঁ পোঁ আর তবলা বাঁধার ঠুকঠাক। খুব সাবধানে বিস্কুটের ওপরের পরতটা দু আঙুলে ধরে ছাড়িয়ে নেয় সে। অনেকক্ষণ ধরে চিবোয়। সাথে সুড়ুত করে এক চুমুক চা। কী যে ভালো লাগে তখন। এক পরত শেষ হলে আর একটা খাওয়ার সময় মনটা খারাপ লাগে। শেষ হলেই তো শেষ। আর একখানা যে খাওয়া যায় না, তা নয়। তবে সেটা বড্ডো বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। এক একখানা বিস্কুট এক এক টাকা।
এই দিয়েই হয়তো শুরু হয়েছিলো তার জীবনকে উপভোগ করবার খতিয়ান। কিছু মানুষ সবকিছুতেই যেন সৌন্দর্য খুঁজে নিতে ভালোবাসে, গভীর শিল্পবোধসম্পন্ন হয়। না আজকালকার “পশ অ্যাস্থেটিক” না, শাশ্বত স্নিগ্ধ সৌন্দর্য। ধীরেন খুড়ো তেমনই একজন! আর্থিক সঙ্গতি নেই বিশেষ, বয়সটা ফুরিয়ে এসেছে, তাকে ভালোবাসবার মানুষও নেই পরিবারে অথবা সমাজে – কিন্তু উনি সবকিছুতে সৌন্দর্য খুঁজে যাচ্ছেন অনবরত। সফলও হচ্ছেন বৈকি! মানুষ যখন টের পায় দম ফুরিয়ে আসছে, তখন সবকিছুই ভারী আশ্চর্য সুন্দর ঠেকে। অথবা হয়তো জীবনের সকল ক্ষেত্রে ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়ে সবকিছুতে ইতিবাচকতা খুঁজে ফেরার ব্যাপারটা সারভাইভালের অংশ, নিজের সংকটগুলোর থেকে নজর সরিয়ে রাখার জন্য অবচেতন মনের এক ছেলেভুলানো কৌশল। মানুষটা ভারী শিল্পবোধসম্পন্ন। এই চরিত্রটা বেশ আকর্ষণীয়।
এরপর আসে সন্ধ্যা। কাজপাগল একজন স্বাধীন নারী, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও পরিশ্রমের জোরে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে বেশ অর্থকড়ির মালিক সন্ধ্যা। দীর্ঘশ্বাস দেখা যায় তার মাঝেও। বাবা যখন অসুস্থ হয় তখন কিছু সংলাপে আমরা দেখি তার মাঝে ভয়। শেষ বয়সে নিঃসঙ্গতা বা একাকীত্বের আদিম ভয়। এই চরিত্রটাকেও বেশ আপন লেগেছে। কিন্তু কি জানিস পারুলদি, ওই লোকটার জন্য আমার আজও একটু কেমনধারা মায়া আছে। বাজে লোক, পাজি লোক, তবু কেমন যেন মনে হয়, বিয়ে করলে একটা বুঝি পাপ-টাপ কিছু হবে। পারুল মাথা নেড়ে বললো, কুসংস্কার কেন হবে? লোকটা পাজি হোক, শয়তান হোক, তুই হয়তো তবু ভালোবেসেছিলি। তুই তো বোকা। আর বোকারাই অন্ধের মতো ভালোবাসতে পারে।
এসময় হুট করে মনে হয় আরেক কবিতার কিছু লাইন,
মন নিয়েই যতো ঝামেলা আসলে, মন কোনও একটা জায়গায় পড়ে রইলো তো পড়েই রইলো। মনটাকে নিয়ে অন্য কোথাও বসন্তের রঙের মতো যে ছিটিয়ে দেব, তা হয় না। সবারই হয়ত সবকিছু হয় না, আমার যা হয় না তা হয় না।
আরও আছে বিজু, সোহাগ, পান্না, অমল, পারুল, মোনা, রসিক বাঙাল, বাসন্তী, বলাকা অথবা মহিমরায়। মহিমরায় চরিত্রটা বেশ স্নিগ্ধ। পড়বার সময়ে মমতার স্নিগ্ধতায় ভরপুর একজন দাদুর কথাই মনে হয়েছে, যার কাছে যখন তখন অঢেল মমতার আবদার কখনোই "অন্যায় আবদার" হবে না।
অমলের “খাপছাড়া” লেখাগুলো মাঝেমধ্যে ঠোক্কর দিয়ে গেছে মাথায়। কমলাকান্তের দপ্তরের কথা মনে পড়ে?
অমলের খাতায় হাসপাতালের সেই বুড়ির কথোপকথন শুনে তো বেশ মনে পড়লো আমার।
বুড়িমা! ও বুড়িমা! সাড়া দিচ্ছ না কেন? …এই রে! টেঁসে গেল নাকি? কে বাবা! যমদূত? না বুড়িমা, আমি যমদূত নই। তবে কি তুমি সরকার? না আন্দোলন? অথবা, ওই আর একটা লোক, সবাই আন্দোলনবাবুর কথা খুব বলে। সে নাকি খুব ভালো। সে এলে সব নাকি ফের ঠিকঠাক হয়ে যাবে। তা আন্দোলনবাবু আসে না কেন বলো তো! তাকে বড় দেখতে ইচ্ছে যায়। দেখতে পেলে একটু পায়ের ধুলো নিতাম।
তা বাবা, সেদিন ভয়ে ভয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলুম, হ্যাঁ গো, এই যে শ্বাস নিচ্ছি এর জন্য পয়সা চাইবে না তো?
আর সত্য বলতে পুরো গ্রামটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে তুলনামূলক আধুনিকই লাগলো আমার কাছে। অন্তত বাংলাদেশের যেকোনো গ্রামের চেয়ে। মনোরমার কালক্রমে অথবা ঘটনাক্রমে জিজিবুড়িতে রূপান্তরও বেশ ভাবায়। অভাবে স্বভাব নষ্ট? নাকি রসিক বাঙালের কথামতো, নষ্টের বীজ ভেতরে না থাকলে অভাব কাউকে টলাতে পারে না? কার্যকারণ সম্পর্ক দিয়ে কোনো ব্যাপার বিভিন্নভাবে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, এই দ্বন্দ্ব তার বেশ ভালো উদাহরণ।
উপন্যাসটা ঘটনাবহুল। মরণের শৈশব থেকে কৈশোরের পথে এগোনো, সোহাগের শেকড় খুঁজে পাওয়া, অমলের নিজেকে খুঁজে ফেরা, বিজুর ব্রহ্মচর্য, বলাকার সংস্কারাবদ্ধ সনাতন প্রেম, ধীরেনখুড়োর জীবনদর্শন অথবা মাঝেমাঝে খানিক আয়নাকথন।
চক্র! সোজা কথায় সাদামাটা গল্প, খানিক নাটুকেই বলা চলে। তবে শীর্ষেন্দুবাবুর লেখা কি না, পড়তে একঘেয়েমি আসে না।
মাঝেমাঝে মাথায় ঠোক্কর দেয়, মাঝেমাঝে খুব হাসায়ও, আবার মাঝেমধ্যে একটু নীরসও লাগে। হুম, জীবনের চক্রের মতোই!
আমি অতোশতো বুঝি না। পেছনে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছেড়ে পুরোটা পড়বার সময় কেমন একটা কৈশোর কৈশোর অনুভূতি এসেছে।
এটি বাংলা সাহিত্যে আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বই। এতটা ভালো লাগেনি অন্য কোন গল্প। ২০০৮ সালে যখন বইটা পড়ি, নিতান্তই এক কিশোর আমি। কিন্তু বইটির অনেক কিছু আমাকে প্রভাবিত করেছে। আমার লেখক হবার পেছনে এই বইটির ভূমিকা রয়েছে। শীর্ষেন্দুর বর্ণনাভঙ্গী সম্ভবত আমাকে প্রভাবিত করেছে সবচেয়ে বেশি। এই বইটি না পড়লে সম্ভবত লেখক হতে দেরি হতো আমার।
অমল রায় এলাকার একজন তুখোড় ছাত্র। সবাই যাকে সম্মান করে , শ্রদ্ধার চোখে দেখে। সেই অমল রায় একদিন নিজের কামকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ঝাপিয়ে পড়ে তার প্রেমিকা আর এলাকার সবচেয়ে সুন্দর ও বড়লোকের মেয়ে পারুলের উপর। যদিও দুজনার বিয়ে হবে বলে দু পরিবারের মত ছিল। কিন্তু অমলের এমন অদ্ভুৎ আচরণে বেঁকে বসে পারুল। সেও অমলকে ভালবাসলেও সম্পর্ক থেকে সরে এসে অন্যত্র বিয়ে করে নেয়। ঘটনাটা অমল রায়কে প্রচন্ড ধাক্কা দেয়। তার ইগোতে লাগলে সেও বিয়ে করে নেয়। ঘটনা এখানে শেষ নয়। ঘটনা শুরু ঠিক এখান থেকেই।
ঘটনা প্রবাহে দেখা যায় অমল রায় সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলেও পারিবারিক জীবনে একদম অসুখী। তার পরিবারের কারো সঙ্গে কারো মতের মিল নেই। অন্যদিকে পারুল ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে প্রচন্ড সুখী একজন না���ী। সময়ের সাথে সাথে অসংখ্য চরিত্র মিলে বিশাল পরিসরে উপন্যাস এগিয়ে চলে। যার শেষ জানতে হলে হাতে বিশাল সময় নিয়ে বসে পড়তে পারেন।
শীর্ষেন্দুর বিশাল পরিসরে লেখা উপন্যাস গুলোর মধ্যে চক্র আরেকটা ঘটনাবহুল উপন্যাস। প্রচুর চরিত্র এসে জুড়ে গেছে নানা ঘটনার মাধ্যমে। এত এত চরিত্র মনে রাখা বেশ কঠিন একটা ব্যাপার। প্রথম দিকে তালগোল পাকিয়ে গেলেও পরে আর বুঝতে অসুবিধা হয়নি। প্রধান চরিত্র গুলোকে কেন্দ্র করে যে চরিত্র আর ঘটনা গুলো এসেছে কোথাও একটু বিরক্ত হবার সুযোগ নেই আসলে। কারণ এক একটা চরিত্র জীবনের বিচিত্র সব দিকে আলোকপাত করে। জীবন কে নতুন করে ভাববার সুযোগ করে দেয়।
এই যে কালের প্রভাবে ভালবাসার একটা রদবদল হয়ে গেছে বলাকা নামের চরিত্র সেটা আপনাকে বারবার ভাবিয়ে তুলবে। আমি যখনই বলাকা নামের চরিত্রের কোনো অংশ সামনে আসছে তখন খুব মনোযোগ দিয়ে তার চিন্তাচেতনা লক্ষ্য করছিলাম। অদ্ভুত মায়াময় এক চরিত্র এই বলাকা। উপন্যাসে সবচেয়ে বেশি যে চরিত্রের সংলাপ এসেছে সে হচ্ছে অমলের মেয়ে সোহাগ। ছোটো হলেও তার কথা ভাবনা আপনাকে একটু হলেও নাড়া দিবে। উপন্যাস জুড়ে তার অদ্ভুতদর্শন কথা অতি আধুনিকতার পরিচয় দেয়। এছাড়া বাঙ্গাল নামেও একটা চরিত্র আছে যার কথা ও কাজ দিয়ে পুরো উপন্যাসে একটা ম্যাজিকময় ভাব এনে দেয়। যা আপ্পনাকে একটুও বোর করবে না। এছাড়া ধীরেন কাষ্ঠ, পান্না, মহিম, সন্ধ্যা, বিজু নামের চরিত্র গুলো কে নিয়ে আলাদা ভাবে লিখলে গেলে কয়েকপাতা হয়ে যাবে তবুও তাদের কথা বলে শেষ হবেনা।
শীর্ষেন্দুর লেখা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। ঘটনা প্রবাহে, সংলাপ নির্মাণে এবং চরিত্র সংযোজনে ভদ্রলোক একজন যাদুকর। যাদুকর বলেই সম্ভবত তার বড় উপন্যাস গুলো পড়তে একটুও আলসেমি ধরে না। অনেকদিন মনে রাখার মত একটা উপন্যাস পড়লাম।
চক্র, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা
দীর্ঘদিন পরে শীর্ষেন্দুর বৃহদায়তন একটি উপন্যাস পড়লাম। এক বইয়ের কাহিনি একজনের গল্প নয়, অনেকের কাহিনির সংমিশ্রণ ঘটেছে এই বইয়ে। অমল রায় এবং তার ডিসফাংশনাল পরিবারের কাহিনি এসেছে। অমল রায়, ছোটবেলা থেকেই তুখোড় ছাত্র। গ্রামে ছোটবেলা থেকেই নামডাক। কিশোর বয়সে প্রেম হয় পারুলের সাথে। পারুলের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনার জন্য ভেস্তে যায় তাদের বিয়ে। সেই ঘটনাই কি এত বছর পরেও অমলের জন্য মনোঃপীড়ার কারণ? সেই পারুল কিনা পরবর্তীতে স্বামী সন্তান নিয়ে ঠিকই সংসার করে যাচ্ছে৷ স্বামীর সাথে সমানতালে তার কাজে হাত লাগিয়ে যাচ্ছে৷ পারুলেরও কি সেই দুপুরবেলার স্মৃতি মনের কোণে উঁকি মারে। অমলের মেয়ে সোহাগ। বিদেশে থাকার সময় যে একবার নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, আবার ফিরেও আসে। এরপর থেকেই সে কেমন যেন হয়ে যায়, প্রকৃতিতে হারিয়ে যেতে চায়। সোহাগের পিসি, অমলের বোন, সন্ধ্যা। প্রথম জীবনে বিয়ে হলেও পরে স্বামী তাকে ত্যাগ করে। অথচ তারই কিনা ইচ্ছা ছিল ঘরকন্যা করার৷ এখন সে আচার বড়ি এসব বানায় এবং বিক্রি করে বেশ স্বাবলম্বী। স্বাবলম্বী বলেই কিনা বাপের সংসারে এসে সম্মানের সাথে থাকতে পারছে। তারপরেও যখন সাবেক স্বামী তার কাছে দরকারে টাকা চায়, সে দেয়। কী এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। পারুলের মা বলাকার কাহিনি বলেছেন লেখক। একেবারে ছোট বয়সে গৌরহরির সাথে বিয়ে হয় বলাকার। এরপরে সেই গৌরহরির সাথে তার বালিকাবধু বলাকা কী যেন এক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেল। গৌরহরি চলে গেল৷ সাথে করে বলাকাকেও যেন নিয়ে গেল। তাদের মধ্যকার অন্যরকম ভালোবাসার, নির্ভরতার গল্প বলেছেন লেখক। রসিক বাঙালের পরিবারের কাহিনি আছে। রসিক বাঙাল বড়বাজারের ব্যবসায়ী। কলকাতাতেও তার দোকান, এই বর্ধমানের এদিকেও তার সম্পত্তি। এই দুইদিক সামলাতে দুইটা বিয়ে করতে হয়েছে তার। একটা শহুরে পরিবার, আরেকটা গ্রামের পরিবার। সে দুইটি পরিবারেই সময় দেয়।শহরে কাজের সূত্র থাকলেও ফি সপ্তাহে গ্রামে আসে বউ বাসন্তীর কাছে। বাসন্তী মাঝে মাঝে ভাবে, মানুষটা কি সত্যিই তাকে ভালোবাসে। অপর পক্ষের বউ তাকে কীভাবে নেবে৷ এসবের জবাবও হয়তো সে পায় রসিকের কাছ থেকে, তার নিজেরই হয়তো উপলব্ধি হয়— নিছক দরকারের সম্পর্ক হলে তো তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিত না। ধীরেন কাষ্ঠর কথা, তার অতীত জীবনে করা পাপের কথা বলেছেন লেখক; যা মাঝে মাঝেই ধীরেনের মনে উঁকি দেয়। জীবন সম্পর্কে ধীরেন কাষ্ঠর মতো লোকের উপলব্ধি তুলে ধরেছেন লেখক। একদম শেষে সাপের উপমার মাধ্যমে এই বিবিধ মানুষের জীবনের বিবিধ মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন লেখক। এই উপন্যাসটিতে উপরে উল্লেখিত চরিত্রদের জীবন সম্পর্কে বোধ, তাদের দর্শন, তাদের মানসিক দ্বন্দ্ব এবং সর্বোপরি লেখকের নিজের দর্শন প্রকাশ পেয়েছে। এতগুলা মানুষের কাহিনি এবং তাদের জীবনযাপন পড়তে মোটের ওপর আপনার খারাপ লাগবে না। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে রসিক বাঙাল ও তার পরিবারের কাহিনি পড়তে।
চক্র দৈনন্দিন জীবনের গল্প, খুব আটপৌরে কিছু সংসারের সাধারণ দোনোমনা, গ্রাম্য ও শহুরে জীবনের চিরকালীন তফাতের গল্প। কিছু কিছু বই শেষ হয়ে যায়। তবু ঘোর কাটে না। চক্র তেমনই একটি বই। উপন্যাসটা অসম্ভব ভালো লেগেছে। বড় কোন একক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ উপন্যাস এগিয়ে যায়নি। মানুষের জীবনের উত্থান-পতনের চক্রের এক সূনিপুন চিত্র হলো উপন্যাস চক্র। এই বইটা প্রচণ্ড আন্ডাররেটেড।
এই উপন্যাসে অনেক চরিত্র, আর নামের সাথে মিল রেখেই বোধহয় সবাইকে এক চক্রে বেঁধে রেখেছিলেন লেখক। এতসব চরিত্রের মধ্যেও বেশি নজর কেড়ে নিয়েছিলো পারুলের মা, বিজু আর রশিক বাঙাল। কেনো জানিনা এই তিনটা চরিত্র আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।
শীর্ষেন্দুর বিশাল পরিসরে লেখা উপন্যাস গুলোর মধ্যে চক্র আরেকটা ঘটনাবহুল উপন্যাস। প্রচুর চরিত্র এসে জুড়ে গেছে নানা ঘটনার মাধ্যমে। এত এত চরিত্র মনে রাখা বেশ কঠিন একটা ব্যাপার। প্রথম দিকে তালগোল পাকিয়ে গেলেও পরে আর বুঝতে অসুবিধা হয়নি। প্রধান চরিত্র গুলোকে কেন্দ্র করে যে চরিত্র আর ঘটনা গুলো এসেছে কোথাও একটু বিরক্ত হবার সুযোগ নেই আসলে। কারণ এক একটা চরিত্র জীবনের বিচিত্র সব দিকে আলোকপাত করে। জীবন কে নতুন করে ভাববার সুযোগ করে দেয়।
একদম শেষে সাপের উপমার মাধ্যমে এই বিবিধ মানুষের জীবনের বিবিধ মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বো���ানোর চেষ্টা করেছেন লেখক।
একাধিক চরিত্র, একটি সাপ আর শহুরে এবং গ্রাম্য জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন। মাঝে মধ্যে চরিত্র গুলোর অতিরিক্ততা, একই পর্যালোচনা বারবার চোখে পড়লেও গল্পের খাতিরে মেনে নেয়া যায়। দুই প্রোটাগোনিস্ট কে ঘিরে বেঁচে ওঠে বাকি চরিত্রগুলো। এই উপন্যাসে কোনো হ্যাপি বা ট্রাজিক এন্ডিং নেই. অনেকটা বাস্তবের মতো যা চিরকাল আবহমান। সুখ বা দুঃখ কোনোটাই চিরস্থায়ী হতে পারে না।
উপন্যাসের শেষে লেখকের সাপের খোলস ছাড়ার সাথে মানুষের নিত্য নতুন পরিবর্তন, সাপের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য গিলে খাবার জ্বালার সাথে মানুষের বেঁচে থাকার কষ্ট এবং তাগিদ, উপমা গুলো তাৎপর্যপূর্ণ।
কোনো লেখকের ই এ লেখা রিভিউ করার মতো জ্ঞান আমার নেই। নিতান্ত গল্পের বিষয়বস্তু তুলে ধরলাম। ৫০০ পৃষ্ঠার উপন্যাস যদিও আমার অন্তত কখনো পড়তে ক্লান্ত বা বোরিং লাগেনি।
বইটির শুরু যেরকম রহস্যময়তায়; বাহবা দিতেই হয়। পুরো বই জুড়েই নানা রকমের মানুষের চিন্তাভাবনা আর জীবনকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার রূপভেদ। কী বলাকা- গৌরহরি, অমল-পারুল, রসিক বাঙ্গাল- বাসন্তী, সোহাগ-বিজু এদের সবার ���ীবনেই ভালোবাসার একটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে গেছে। বিত্তহীন ধীরেন কাষ্ঠের সুগভীর অনুধাবন সত্যিই চারপাশে ঘটে যাওয়া ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় নিয়েও কৌতূহলের যোগান দেবে। ভবে এই আসা আর যাওয়ার মাঝে কত নিগূড় রহস্য, কি অনন্ত মানুষের চিন্তার পরিধি, পার্থিব আর অপার্থিব বাস্তবতাকে বুঝতে চাওয়ার চেষ্টা! লেখকের উপস্থাপনা বিমোহিত করার মত, মনে হচ্ছিল আরো দীর্ঘ কাহিনী হলেও মন্দ হত না! বইখানা দারুণ।
'বিরহের গল্প তার ভীষণ প্রিয়। বিরহের মত জিনিস আছে! পড়লে চোখে জল আসবে, বুক ভার হয়ে উঠবে, মরে যেতে ইচ্ছে করবে-- তবে না গল্প!"
প্রিয় লেখকের এই বইটি অনেক আশা নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম। গল্পটি মূলত অমলকে কেন্দ্র করে, যেখানে পারুল চরিত্রটি অনেকটাই অমল এবং গৌরহরি-বলাকার জন্য উপস্থিত। লেখকের লেখনশৈলী যথারীতি মনোমুগ্ধকর। গৌরহরি-বলাকার নির্মল ও গভীর ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক, সেই সাথে রসিক বাঙ্গাল, বাসন্তী, পান্না এবং মরণের সরলতা হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তবে কিছু অংশে মনে হয়েছে গল্পটি অহেতুক টেনে বড় করা হয়েছে, এবং শেষের দিকে আগ্রহ ধরে রাখা একটু কঠিন হয়ে উঠেছিল। কিছু বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়নি, আবার কিছু জায়গা খানিকটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে। কিন্তু লেখক সমাপ্তিটি সুন্দরভাবে করেছেন, আর তাই বইটি শেষ করার পর একটা ভালো লাগার রেশ থেকে যায়। অনেক শুভকামনা প্রিয় গুণী লেখকের জন্য।