যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো ১৯৮২ সালে প্রকাশিত ভারতীয় বাঙালি কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ৩২তম কাব্যগ্রন্থ। এটি ভারতের কলকাতার বেনিয়াটোলায় অবস্থিত আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড কর্তৃক ১৯৮২ সালের মার্চে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। সুনীল শীলের প্রচ্ছদকৃত শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছিল: 'ম্যাডাম আর সুবোধকে' (শিপ্রা ও সুবোধ দাস)। একই শিরোনামে কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতা রয়েছে।
১৯৮৩ সালে, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৪ সালে 'আই ক্যান, বাট হোয়াই শুড আই গো' শিরোনামে জয়ন্ত মহাপাত্র কর্তৃক ইংরেজি ভাষায় এটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ১৯৯৯ সালে 'যা সাকি ছি কিন্তু কিয়ে যাও' শিরোনামে রাম চরণ ঠাকুর কর্তৃক মৈথিলী ভাষায় এটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়-এর জন্ম ২৫ নভেম্বর ১৯৩৩, বহড়ু, চব্বিশ পরগনা। শৈশবে পিতৃহীন। বহড়ুতে মাতামহের কাছে ও বাগবাজারে মাতুলালয়ে বড় হন। পড়াশোনা: বহড়ু হাইস্কুল, মহারাজা কাশিমবাজার স্কুল, প্রেসিডেন্সি কলেজ; যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যে অধ্যয়ন অসমাপ্ত। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় ‘যম’ কবিতা লিখে (১৯৫৬) সাহিত্যজগতে প্রবেশ। যুক্ত ছিলেন কৃত্তিবাস পত্রিকার সঙ্গে। ‘কবিতা সাপ্তাহিকী’ পত্রিকা প্রকাশ করে আলোড়ন তুলেছিলেন কবিতাজগতে৷ প্রণীত, অনূদিত-সম্পাদিত কবিতা ও গদ্যগ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক, তা ছাড়া অজস্র অগ্রন্থিত রচনা ছড়িয়ে আছে পত্রপত্রিকায়। পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, সম্বলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গঙ্গাধর মেহের পুরস্কার, মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার। জীবিকাক্ষেত্রে সাংবাদিক হিসেবে যুক্ত ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে। অতিথি-অধ্যাপক হিসেবে বিশ্বভারতীতে সৃষ্টিশীল সাহিত্যের অধ্যাপনায় রত থাকাকালীন অকস্মাৎ হৃদরোগে শান্তিনিকেতনে মৃত্যু, ২৩ মার্চ ১৯৯৫।
কবিতা আমি পড়িনা, পড়লেও যে কিছু বুঝি তা না। অবশ্য এই বুঝিনা-পড়িনার টানাপোড়েনের মধ্যেও টুকটাক কবিতা যে পড়া হয়নি তা না। আমার দু-একজন প্রিয় কবিও আছেন। কবিতার seasonal পাঠক হিসাবে critical analysis আমার পক্ষে করা তাই সম্ভব না। কবিতা ব্যাপারটাকে আমি শুধু “পড়ে ভালো লেগেছে” বা “ভালো লাগেনি” এইটুকই বলতে পারব। তাই এই বইকে তারা বা Rate করা থেকে দূরে থাকলাম। যদি পরে কোনদিন কবিতার সমঝদার পাঠক হয়ে উঠতে পারি, তবে এই রিভিউটা পড়ে একটুখানি হাসি পাবে, সে ভাবনায় এই সামান্য লিখে রেখে যাওয়া।
“যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো” বইটা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বেশ কিছু কবিতা নিয়ে সংকলন। খুব কম কবিতার বইই বাজারে পাবেন যেগুলার নাম সুন্দর হয়না। এই বইটার নামও খুবই সুন্দর, একেবারে নাম শুনেই পড়তে ইচ্ছা করে এমন একটা বই। আমার কাছে হার্ডকপি তো ছিল না, তবে পিডিএফ সহজলভ্য হওয়ায় টুক করে পড়ে নিতে অসুবিধা হয়নি। প্রথমেই যে কবিতাটা ভালো লাগল তার নাম “বিড়াল”। ছিদ্রান্বেষীরা বলতে পারে এই কবিতাটা ভালো লাগার কারন শুধুই বিড়ালের প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব, হয়ত শক্তির কবিতাটা ততোটা ভালো না। কিন্তু কাছে বসে থাকা হিতব্রতী অসুস্থ বিড়ালটাকে আমার সত্যিই খুব ভালো লেগে গেল।
“সুখের অত্যন্ত কাছে বসে আছে অসুস্থ বিড়াল পশমের অন্তর্গত হয়ে আছে অসুস্থ বিড়াল”
আবার “বলো, ভালোবাসো”তে পেলাম সেই অসুস্থ মানুষটিকে, হাসপাতালে শুয়ে, আশাপাশে তার সব নিরোগ মানুষেরা। মানুষটার শুধু এটুকুই চাওয়া – ভিতরের কন্ঠস্বরটা তাকে বলে উঠুক – সে ভালো আছে, সে ভালোবাসে।
“বলো ভালো আছ আর তোমার অসুখ সেরে গেছে বলো ভালোবাসো, তাই তোমার অসুখ সেরে গেছে।”
কবিতার ব্যাপারটাই কেমন যেন। কবিরা যেন বেশিরভাগ সময় খুবই বিরক্ত, ভীষণ রেগে আছেন। আরেকটা common বৈশিষ্ট্য হল মারাত্বক রকমের Melancholy। কবিতা পড়ে আনন্দে নেচে উঠতে ইচ্ছা করেছে এমন মনে পড়া মতে আমার এমন কখনও হয়নি। এই বইয়ের বেশির ভাগ কবিতাতেও আছে তেমনি একটি বিষণ্ণতা। পেছনের মলাট থেকে যদি ধার করে বলি, বেশির ভাগ কবিতাতে ছেয়ে আছে মৃত্যু-চেতনা। নিজের “এপিটাফ” এ সেরকম বোধ নিয়েই যেন শক্তি লিখলেন,
“অথচ আগুনে পুড়ে গেল লোকটি – কবি ও কাঙাল।”
আরও অনেকগুলো কবিতা বেশ ভালো লেগেছে যেমন – “যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো”, “পুরনো নতুন দুঃখ”, “মন্দিরের থেকে বহু শতাব্দীর অন্ধকার”, “কিছুইতেই মেলেনি” (অতিরিক্ত ভালো), “শুধু দুদিনের জন্য” (যেটা থেকে দু'লাইন উল্লেখ না করে পারছি না –
সানুদেশে, উপত্যকা জুড়ে এক দৃশ্যের সুষমা, দুদিনের জন্য টানে, চিরদিন নয়।” ),
“শাক্য”, “ভালোবাসা পিড়ি পেতে রেখেছিল”, “সবিশেষ ছাড়”, “ভাঙ্গা গড়ার চেয়েও মূল্যবান”, “যাওয়া ভালো” “পাহাড়িয়া কলকাতা” সহ আরও বেশ কয়েকটা।
পরিশেষে বলব, Reading poetry is all about re-reading, সত্যবচন! কবিতা একবার পড়ে রেখে দেওয়ার জিনিস না, কবিতার কাছে আবারও ফিরে আসতে হয়। তবে প্রথম বারের মুগ্ধতাকেও হেলাফেলা করা যায় না। তাই আমিও “যেতে পারি, আর অবশ্যই ফিরে যাবো” এই কবিতা গুলোর কাছে কোন একদিন।
কবিতা পড়ুয়াদের কাছে ভালো ভালো কবিতার বইয়ের suggestion চেয়ে শেষ করছি।
এই তাবৎ জীবনে শৈশবকাল শেষ হবার পরে শুরু হয় জটিলতার অধ্যায়। নানান সব জটিলতা আর কুটিলতার মাঝে পড়ে চ্যাপ্টা হয়ে আমরা জীবনে এমন সব কান্ড করে বসি যে পরে এক একটি নির্জন সময়ে নিজের কাছেই নিজের গল্প পাঠ করতে হয়, কৃতকর্মের ফিরিস্তি খুলে বলতে হয় অনেক কথা, তবুও যেন মনে হয় কোথাও শব্দের ফাঁক-ফোকড় রয়ে গেছে। অথচ শক্তি নির্দ্বিধায় এই গল্প বলে দিলেন দুটি লাইনে-
এতো কালো মেখেছি দু হাতে এতো কাল ধরে!
এরপরের লাইন কখনো তোমার ক'রে, তোমাকে ভাবিনি। তোমার জায়গায় নিজেকে বসালেই হয় আসলে, আমরা কি কখনো নিজের ক'রে নিজেকে নিয়ে ভেবেছি? ব্যস এইটুকুই। শক্তি তার ৩২ তম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা "যেতে পারি, কিন্তু কেন যাবো?"তেই যা বলার বলে দিয়েছেন। আমার আর কী বলার থাকতে পারে!
শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ—এই তিন কবির কবিতার মাঝে আমি কিছুটা সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছি৷ উনাদের কবিতা সরল, বিরহ আর মাধুর্যপূর্ণ। আমার নিঃসঙ্গ, নিঃস্ব, আর বিরহে পরিপূর্ণ উত্তপ্ত মনের মধ্যে মধুর সঞ্চার করে কবিতা। তাই আমি কবিতা হয়ে কবিতাকে ভালবাসি; যেমন ভালবাসি পরিবারকে।
.......................
যদি পারো দুঃখ দাও, আমি দুঃখ পেতে ভালবাসি দাও দুঃখ, দুঃখ দাও--আমি দুঃখ পেতে ভালবাসি। ভালবাসি ফুলে কাঁটা, ভালবাসি ভুলে মনস্তাপ-- ভালবাসি শুধু কূলে বসে থাকা পাথরের মতো নদীতে অনেক জল, ভালবাসা, নম্র নীল জল-- ভয় করে।।
কিংবা,
ভাঙারও নিজস্ব এক ছন্দ আছে, রীতি-প্রথা আছে, এবড়োখেবড়োভাবে ভাঙলে, ভাঙার বিজ্ঞান, থুতু দেবে গায়ে আর লোকে বলবে, একেই তছনছ করা বলে। অশিক্ষাও বলে কেউ, বলে, মূর্খ, ভাঙা শিখতে হয়-- অপরূপভাবে ভাঙা, গড়ার চেয়েও মূল্যবান কখনো-সখনো!
কিংবা,
মানুষের মধ্যে নেই মিলেমিশে থাকার সভ্যতা জন্তুদের মধ্যে আছে মিলেমিশে থাকার সভ্যতা।
কিংবা,
বুড়িয়ে পাখির মতো টুকরো টুকরো করে হবে বনভোজন কোনদিন মনে হয়। যা হয় তা হোক কিন্তু, তুমি ভাল থেকো তুমি ভাল থেকো।।
কিংবা,
অনুযোগ অভিযোগ মানুষে মানুষে শুধু করে। দেবতা পাথর, জন্মউদাসীন, নির্বাচনপ্রিয়- সকলের সব কথা শুনতে গেলে মর্যাদা থাকে না। যেমন, কবিকে, মাঝেমধ্যে বড় নিষ্টুরতা টানে?
কিংবা,
অসুখ এক উদাসীনতা, অথচ সামাজিক লোকটা কিছু রহস্যময়, লোকটা কিছু কালো নিজের ভাল করেনি, তাই অন্যে ক'রে ভাল সংসারে সন্ন্যাসী লোকটা কিছুটা নির্ভীকই।
কিংবা,
পেছনের লোকটির চোখে একটা-আধটা উদাহরণ পাততেই হবে সাফল্যের, সংঘর্ষের, জয়ের নাহলে তুমি আর মানুষ কেন? লজ্জাবতী লতা হলেও পারতে।
"যেতে পারি যে-কোনো দিকেই আমি চলে যেতে পারি কিন্তু, কেন যাবো?
যাবো কিন্তু, এখনি যাবো না তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবো একাকী যাব না অসময়ে"
শক্তি আমার কাছে এক বিস্ময়! তার কবিতা পড়লে মনে হয় শব্দগুলো ছোটাছুটি করছে, শব্দরা খেলাধুলা করছে, কিচিরমিচির করছে।। শব্দগুলোকে কেমন জীবন্ত মনে হয় শক্তির কবিতা পড়লে।
"পর্দাগুলো হার মানছে বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিতে। বাহিরে বাতাস বেশি, খর হয়ে উঠছে রোদে-নুনে, চটচটে চামড়ায় টিপ দিতে উঠে আসছে ধুলোবালি�� পরিচ্ছন্ন থাকা বড় কষ্টকর সমুদ্রের পাশে!"
আর উনি প্রকৃতির গান শুনেন যেন! প্রকৃতির সাথে আলিঙ্গন করেন, কথা বলেন। আর উনার কবিতাতে সেসব অন্যরকম এক প্রাণ পাই
জীবনানন্দ যেমন "নক্ষত্র" শব্দটা বেশি ব্যবহার করেন, তেমনি শক্তির কবিতাতে "পাথর" শব্দটার ব্যবহার বেশি লক্ষ্য করা যায়। যেমনকি উনার ভেতরে অনেক বিরহ, অনেক কষ্ট পাথরের মতো জমে আছে....
"যে-দুঃখ পুরনো, তাকে কাছে এসে বসতে বলি আজ আমি বসে আছি, আছে ছায়া, তার পাশে যদি দুঃখ এসে বসে বেশ লাগে, মনে হয়, নতুন দুঃখকে বলি, যাও কিছুদিন ঘুরে এসো অন্য কোনো সুখের বাগানে নষ্ট করো কিছু ফুল, জ্বালাও সবুজ পাতা, তছনছ করো কিছুদিন ঘুরে দুঃখ ক্লান্ত হও, এসো তারপর পাশে বসো"
শক্তি আমার কাছে অনন্য এক আবিষ্কার। মাঝেমধ্যে উনার কবিতা যেন কানে বাজে। শক্তির আবহে যেন আমি আবিষ্ট, বিমোহিত।। শক্তি আমাকে বারবার মুগ্ধ করেই যাচ্ছেন 🌻
"গাছের ছায়াটি গাছে ডুবে আছে দুপুর রোদ্দুরে বৃষ্টি নেই, পাতাগুলি পুড়ে গিয়ে হয়েছে পাথর গুলমোহর ফুল আর শুকনো পাতা লুটোচ্ছে গাছের গোড়ায়, শিকড় জুড়ে আনন্দ-র পাতা করতল পূর্ণ করে জল চায়, জল দাও, ক্লান্ত, চণ্ডালিকা
জল দাও শিকড়ে আমার জল দাও হৃদয় ভাসায়ে শ্রাবণের বৃষ্টিতে ভাসাও আমার শিকড় দেহখানি"
এরকম হয়েছে দু'দিনই মধ্যরাত, জ্যোৎস্না উঠেছিল, কানাগলি জুড়ে বান ডেকেছিল তাথৈ তাথৈ, বাতাস মরমী ছিল, সড়কের বাতি ছিল কিছু মনমরা, ঔদাসীন্য মাখা ছিল প্রাসাদ-দরজা। কিন্তু বহুভাবে চেনা নিজের বাড়িটি খুঁজে খুঁজে খুঁজে কিছুতে মেলেনি একদিন, পরেও একদা!
অথবা
ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো। এতো কালো মেখেছি দু হাতে এতোকাল ধরে! কখনো তোমার ক’রে, তোমাকে ভাবিনি। এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে চাঁদ ডাকে : আয় আয় আয় এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে চিতাকাঠ ডাকে : আয় আয় যেতে পারি যে-কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি কিন্তু, কেন যাবো?
কে জানে কেমন করে ছন্দের বারান্দা ভাঙা হবে? মিস্তিরি মজুত, কাছে শাবল গাঁইতি সবই আছে। লোকবল আছে, আছে ভাঙনের নিশ্চিত নির্দেশ, ভাঙার ক্ষমতা আছে, প্রয়োজনও আছে।
বারান্দাও জেনে গেছে: সবাই ভাঙনে নয় দড়! ভাঙারও নিজস্ব এক ছন্দ আছে, রীতি-প্রথা আছে, এবড়োখেবড়োভাবে ভাঙলে, ভাঙার বিজ্ঞান থুথু দেবে গায়ে আর লোকে বলবে, একই তছনছ করা বলে। অশিক্ষাও বলে কেউ, বলে, মূর্খ, ভাঙা শিখতে হয়— অপরূপভাবে ভাঙা, গড়ার চেয়েও মূল্যবান কখনো-সখনো!