কলেজ জীবনে যাদবপুরের ক্যাম্পাসে এক দল বোদ্ধার সাথে বসেছিলাম। তখন আমি ইংরেজি স্নাতকের ছাত্র, বাংলা আধুনিক সাহিত্য সম্পর্কে আমার জ্ঞান নগণ্য বললেও বেশি বলা হবে।
বোদ্ধাদের একজন স্টিম ইঞ্জিনের কসপ্লে করতে করতে "নবারুণ ভটচায"-এর কথা তুলেছিল। মহাশ্বেতা দেবীর পুত্র, সেই ভটচায। অ্যান্টি-এস্টাব্লিশমেন্ট অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান-বিরোধী লেখক, কাউকে নাকি ভয় পান না, সব সরকারের সমালোচনা করেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। বোদ্ধারা সবাই মাথা নাড়িয়ে ওনার লেখা নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করল, ভাবটা এমন যেন পারলে ওখানেই ডিজার্টেশন লিখে ফেলে। আমি চিরকালই মাঝারি ধরণের ছাত্র ছিলাম, এইসব থিওরি কপচানো শুনে ভয়ানক ঘাবড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম, শালা, এই ভটচায লেখেটা কী? আমার মত লোকের জন্যে হয়তো লেখে না।
তারপর প্রায় এক দশক কেটে গেছে। অফিসের কাজ শেষ হওয়ার পর নবারুণ ভট্টাচার্যের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলো ধীরেসুস্থে পড়ে পড়ে শেষ করেছি। এখন আর বোদ্ধাদের ভয় পাই না। এখন মনে হয় নবারুণ ভট্টাচার্য সবার জন্যে গল্প বলতেন, হ্যাঁ সবার জন্যে।
আপনি আর আমি বামপন্থী নাই বা হলাম, কিন্তু নবারুণবাবুর কলমের সম্মোহনী ক্ষমতাকে উপেক্ষা করা আমাদের কারুর সাধ্যি নয়। ইংরেজিতে বলব, এটাই হল "raw and naked power."
একতাল দুঃখ, যন্ত্রণা, আশা-হতাশা, ক্রোধ (উফফ, সেই ক্রোধের সীমাপরিসীমা নেই), জমে রয়েছে এই গল্পগুলোয়। গল্পের কেন্দ্রে প্রায় সময়ই সমাজের উপেক্ষিত লোকজনেরা থাকে। ভিখারি, পাগলী, বেশ্যা, গুণ্ডা, ছিঁচকে চোর, এমনি খুনী, পেশাদার খুনী, হরিজন কৃষক - আমাদের সভ্য সমাজের মিহি বুদবুদের মাঝে এইসমস্ত মানুষজনের কোনও স্থান নেই। কিন্তু তাদেরকে বারবার টেনে এনেছেন নবারুণবাবু, পরাবাস্তবের মাঝে বাস্তবতার কড়া পাচন মিশিয়ে তিনি শুনিয়েছেন অসংখ্য জীবনের আখ্যান।
ওনার দুনিয়াতে ফ্যাতাড়ুরা রাতে উড়ে বেরিয়ে বাঁদরামি করে, মাথাহীন বেশ্যা টেপ রেকর্ডার চালিয়ে মক্কেলদের তোয়াজ করে, রাতের কলকাতায় জমে থাকা জলের উপর রামধনু তেল ভাসে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, পৃথিবীর শেষ কমিউনিস্ট স্মৃতিরোমন্থন করে রাশিয়ার এক হসপিটালে, কাকতাড়ুয়া হিহি করে হাসে (কারণ ওর কোনও ভোট নেই)।
এই সংকলনের সমস্ত গল্পই রাজনৈতিক, কারণ অ্যাপলিটিকাল বলে দুনিয়াতে কিস্যু হয় না। নবারুণবাবুর জীবৎকালে পশ্চিমবঙ্গে, এবং কলকাতায় সামাজিক আর রাজনৈতিক অনেক পরিবর্তন হয়েছে। নকশালের পর এসেছে সিপিএমের চোখ রাঙানি। আর বর্তমান সরকারের কথা তো ছেড়েই দিলাম। কলকাতা বিশ্বায়নের মোড়কে পড়ে পুরো বদলে গেছে। মধ্যবিত্তরা ছেয়ে গেছে চতুর্দিকে। দারুণ সব স্কাইস্ক্রেপার উঠেছে। কলকাতার ছায়া এখন আরও গভীর, আরও অন্ধকার। সেই ছায়ার মধ্যে নবারুণবাবুর চরিত্ররা - কালমন, ফোয়াড়া, মোগলাই, ডি এস, মদন, সবাই একইরকম থেকে গেছে।
সবাই অপেক্ষা করছে।