তিন বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে প্রথম প্রবন্ধ লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। উপন্যাসই ছিলো ঐ প্রবন্ধের প্রধান বিবেচ্য। ঐ প্রবন্ধে, এবং অন্যত্র, অকথিত থাকে এই তথ্য যে, তারাশঙ্কর ও বিভূতিভূষণের ছোটোগল্প মানিকের তুলনায় অকিঞ্চিৎকর। উপন্যাসে যেমন, তেমনি ছোটোগল্পেও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এক অনন্য অধীশ্বর। ১৯৫০ এ মানিকের জীবদ্দশায়, যে-১৮টি গল্প নিয়ে তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ বেরিয়েছিলো, স্বভাবতই তার আহরণক্ষেত্র ছিলো সংকীর্ণ। এখন দূরের পরিপ্রেক্ষিতের সুবিধায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্টিমুখর তিন দশকে রচিত তিন শতাধিক গল্প থেকে নির্বাচন করে সযত্নে সংকলিত ও সম্পাদিত হয়েছে এই ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’। সম্পাদনা করেছেন মানিক-গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ।
Manik Bandopadhyay (Bengali: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) was an Indian Bengali novelist and is considered one of the leading lights of modern Bangla fiction. During a short lifespan of forty-eight years, plagued simultaneously by illness and financial crisis, he produced 36 novels and 177 short-stories. His important works include Padma Nadir Majhi (The Boatman on The River Padma, 1936) and Putul Nacher Itikatha (The Puppet's Tale, 1936), Shahartali (The Suburbia, 1941) and Chatushkone (The Quadrilateral, 1948).
গল্পগুলো অবিশ্বাস জাগায়, ভয় ধরায় এবং শেষে গিয়ে মর্মে জোর আঘাত হানে। ভান-ভণিতা ছাড়া, কোনো প্রকার আড়াল-আবডাল না রেখে মানিক কেবল গল্পই বলতে চেয়েছেন। গল্পের মতো গল্প হলে ঘটনাপ্রধান গল্পেও যে আমার পাঠকসত্তা সন্তুষ্ট হতে পারে তা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। এ বইটি আবার স্মরণ করিয়ে দিল।
অবসর প্রকাশিত সংকলনটির সম্পাদক ও ভূমিকা লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ। ধরেন, কাল একটি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে আপনাকে। বিষয় হচ্ছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প। এদিকে আপনার প্রস্তুতি শূন্যের কোঠায়। কী করবেন? চিন্তা নেই। মানিক-গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দের ৩৮ পৃষ্ঠার ভূমিকাটি পড়ে গেলেই চলবে। এমনই সমৃদ্ধ এই আলোচনা।
মানিকের লেখা সেভাবে পড়া হয়নি কখনো। তাৎকালীন সময়ের অনেককিছু জানিনা বলে ভালোমতো রিলেট করতেও পেরা হচ্ছিলো। কিন্তু বলার ভঙ্গিমা এত বেশি চমৎকার, মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলো শুরু থেকে শেষ। প্রত্যেকটা গল্প প্রত্যেকটা ভিন্ন স্বাদের ভিন্ন আঙ্গিকের! কি সুন্দর!
বইটা মাঝারি আকারের। তবুও পড়তে বেশ সময় নিয়েছি। উপন্যাস পড়ার সাথে গল্প বা কবিতার বই পড়ার খানিকটা পার্থক্য আমি অনুভব করি। একটা উপন্যাসে একটাই মূল কাহিনী তার চরিত্রদের নিয়ে এগিয়ে যায়, কিন্তু প্রতিটা গল্প বা কবিতা তার আগেরটার চেয়ে আলাদা। তাই উপন্যাস যেমন একটানে পড়ে ফেলি, গল্প বা কবিতার বই তেমনটা পারি না।
রবীন্দ্রনাথের হিসেবে, ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথার নিতান্ত সহজ সরল সাহিত্যিক প্রকাশই হল ছোটগল্প। আমার কাছেও ব্যাপারটা এমনই। জীবনের খুব ছোট ছোট ঘটনার সৌন্দর্য আর গভীরতর অনুভূতি জানান দেয় ছোট গল্প। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের "শ্রেষ্ঠ গল্প"ও ঠিক এমন। কোনো অস্বাভাবিক বা অতিপ্রাকৃত বিষয় নয়, একদম সহজ সরল মানুষদের দৈনন্দিন জীবন নিয়েই লেখা সবগুলো গল্প।
গল্লগুলোয় মানিকের ব্যক্তিগত জীবন ও তৎকালীন সমাজের প্রভাব বেশ লক্ষনীয়। মানিক নিজে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। বেশ কিছু গল্পে তাই সাম্যবাদী ধ্যান-ধারণা ফুটে উঠেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফুটে উঠেছে বাংলার তৎকালীন দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ রূপ। গল্পগুলো ভাবার আর ভাবাবার মত সন্দেহ নেই, কিন্তু আমার মনে হয় মানবিক সম্পর্ক আর মনোবিশ্লেষণ নিয়ে যেসব গল্প উনি লিখেছেন, সেগুলোই উনার অমূল্য সৃষ্টি।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখনশৈলী নিয়ে নতুন করে বলবার কিছু নেই। সচেতন অথচ সাবলীল লেখনীর কারণে কোনো গল্পকেই বিরক্তিকর বা নাটকীয় বলে মনে হয়নি। অন্য কোনো দুর্বলতাও আমার চোখে পড়েনি। আমার পক্ষ থেকে তাই বইটার জন্য পাঁচ তারাই বরাদ্দ হলো।
মানিকের কিছু উপন্যাস পড়া হলেও গল্প খুব একটা পড়িনি আগে। পাঠ্যবইয়ে এক-দুটি আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আরও এক-আধটি। এবার পড়া হলো এই বইটি। পড়তে পড়তে খেয়াল করলাম ঔপন্যাসিক মানিকের চেয়ে ছোটগল্পকার মানিক বেশি শক্তিশালী লেখক। কী দুর্দান্ত সব গল্প। বিশেষ করে দুর্ভিক্ষ বিষয়ক লেখাগুলো মন ছুয়ে যায়। আলাদাভাবে বলা যায়, হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক মনোভাব বিষয়ের ছেলেমানুষি নামের গল্পটির কথা।
কয়েকটি ছাড়া বাকি সবগুলোই একেবারে ফার্স্টক্লাস। ৫ তাঁরা না দিলে অন্যায় হবে।
বেশ দীর্ঘদিন ধরে একটু একটু করে ওষুধের ডোজ নেবার মতো করে বইটা শেষ করলাম। ছোটগল্পের জগতে হুমায়ূন, রবিঠাকুর,বনফুল, শরৎ, বিভূতি, তারাদাসের সাথে পরিচয় ছিলো। এবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পালা। বলা বাহুল্য, এক্সপেকটেশন ছিলো হাই এবং মানিকবাবুর গল্পগুলো মোটেও হতাশ করেনি। বরঞ্চ কিছু গল্প হৃদয়ে ধাক্কা দিয়েছে, কিছু গল্প মাথা উলট- পালট করে দিয়েছে।
মানিকের লেখায় শুরুর দিকে ফ্রয়েডিয় আর পরবর্তীতে মার্কসীয় প্রভাব বেশি ছিলো। ছোটগল্প গুলোতে তার চিরায়ত নারী-পুরুষের জটিল মনস্তত্ত্ব উঠ এসেছে। কিছু গল্পতে ছিলো তৎকালীন সমাজের অভাবনীয় অভাবের চিত্র। এত করুণ ভাবে তা তুলে ধরেছেন যে রীতিমতো মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো।
স্পেশাল ভাবে ম্যানশন করবো 'শৈলজ শিলা' গল্পটির কথা। এ গল্পের উপাদান আর প্লট 'চমকে' দেবার মতো।
৩০০+ গল্প লিখেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকে বাছাইকৃত ২২ টি গল্প নিয়েই এই শ্রেষ্ঠ সংকলন।
এখানে বেশির ভাগ গল্পের প্রধান বিষয়বস্তু ছিলো দারিদ্র্যতা। অনেকে বিষয়টি ব্যক্তিজীবনের প্রতিচ্ছবি বলে থাকলে অনেক সমালোচক বলেছেন মানিক বাবু তার লেখায় নিম্নমধ্যবিত্তকে পরোক্ষ কটাক্ষই করেছেন৷
তাছাড়াও সমাজের কুসংস্কার, পরকীয়া, লোভ, ভায়োলেন্স এই বিষয়গুলোও তিনি তার অনেক গল্পে তুলে ধরেছেন।
বিশ্বযুদ্ধের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও তেভাগা আন্দোলনের পটভূমি নিয়েও রচনা করেছেন বেশকিছু গল্প।
এক লেখকের সব কর্ম পড়তে গিয়ে অন্যদের অনেক কাজ পড়া বাকি থেকে যেতে পারে। এই ধারণা থেকেই শ্রেষ্ঠ সংকলন পড়া শুরু করেছি। 😪
বেশকিছু গল্প দূর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা। গল্পের প্লটগুলো এতো মর্মস্পর্শী যে সেটা মানিক বন্দোপাধ্যায়ের গল্প লেখার অনুপম শৈলীকে ভুলিয়ে দেয়। যদিও গল্পগুলোর মর্মার্থ ভালোভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়, কারণ সৌভাগ্যক্রমে আমরা কখনো দুর্ভিক্ষের বিভীষিকা চোখের সামনে দেখিনি।
মানিক লিখেছেন না খেতে পেয়ে মরা মানুষের গল্প। বুকের খাঁচার হাড় গোনা যায় এমন মানুষদের গল্প। ছিনতাই করে চাল জোগাড় করবে এমন মনের জোর পর্যন্ত নিঃশেষ হয়ে গেছে যাদের তাদের কথা গল্পে বলেছেন মানিক। কাপড়��র কারখানায় কাজ করা শ্রমিক হয়েও শরীর আবৃত করার কাপড়ের ব্যবস্হা করতে না পারাদের গল্প আছে। গ্রামের হতদরীদ্র মানুষ একজোট হয়ে অত্যাচারী প্রশাসনকে রুখে দেওয়ার সাহসী গল্পও আছে। আছে ধনী শোষকশ্রেণীর অবিচারকে রসিকতা করার সাহসের কথা।
গল্পগুলো সাম্যবাদে বিশ্বাসীদের অনুপ্রাণিত করে। যদি দুনিয়ার মজদুরগণ বইপড়ুয়া হতো, তাহলে মানিকের গল্প তাদের এক হয়ে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করতো।
এই নিরন্তর জটিল, পঙ্কিল, বীভৎস মানবজীবনের বৃত্তান্ত আমি অন্তত আর পড়তে চাই না। realism বুঝি কিন্ত আমার একটা tolerance limit আছে - প্রতিটা গল্পে এত কুৎসিতের বর্ণনা, মানুষের জঘন্য সব প্রবৃত্তির কথা এবং আশাহীন জীবনের কথা কত পড়া যায়। বিরক্ত ও desensitised হয়ে গেলাম। লেখকের যে তিনটি উপন্যাস পড়েছি সেগুলি এতটা depressing নয়। গল্পগুলো আমার ভাল লাগেনি।
বাংলা সাহিত্যের কী যে এক মহামূল্য রত্নের আকর মানিকের লেখাগুলো, তার আরেকটা প্রমাণ হয়ে রইল বইটা। সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করলো বোধহয় "ছিনিয়ে খায় না কেন" গল্পটা। ঐ আমলে একটা লোক এত তীব্র বোধসম্পন্ন লেখা লিখে গেলেন- আজ অবধি কেউ ছুঁতে পেলো না সেই মাপ!
বেশ সময় নিয়ে সংকলনটি পড়লাম, এই নিয়ে দ্বিতীয় বার। আগের বারের মতই মানিক আমাকে মুগ্ধ ক'রেছে, সারজীবনই হয়তো ক'রবে। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী মানিক তার জীবদ্দশায় দ্যাখা মানুষ ও তার জীবনকেই তুলে ধরেছেন। দারিদ্র্যের স্বরূপ যেন তাঁর লেখার প্রতি শব্দে, মানুষের কষ্ট, তাদের সংগ্রাম বা সংগ্রামের আকাঙ্খ্যা, শোষকের শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা, দুর্ভিক্ষ, অনাহার, অশিক্ষা, কুসংস্কার, নারীর অবদমিত অবস্থান, পুরুষতান্ত্রিকতা- তিরিশ দশক থেকে পঞ্চাশ। মানুষটা অকালে ম'রে না গেলে তাঁর থেকে হয়তো আমরা ষাটের দশকের বাম-রাজনীতির স্বরূপ পেতাম। অনেক ক'টা গল্পের মাঝে দাগ কেটে গেছে, 'প্রাগৈতিহাসিক', 'আত্মহত্যার অধিকার', 'সরীসৃপ', 'দুঃশাসনীয়', 'হলুদ পোড়া', 'বিবেক', 'নমুনা' ইত্যাদি। অদ্ভুত একটা গল্প, 'হারানের নাতজামাই'। বেশির ভাগ গল্প গ্রাম-নির্ভর হ'লেও শহর বাদ প'ড়েনি। 'ছিনিয়ে খায় নি কেন'-তে তাঁর মাঝে অস্তিত্ববাদ স্পষ্ট। 'কেরানির বউ', 'জুয়াড়ির বউ' ও 'রোমান্স', গল্প তিনটেতে তিনি নারীর চরিত্র ও সমাজে তাঁর করুণ অবস্থানের ঈঙ্গিত দিয়েছেন, নারী-পুরুষের প্রেম উঠে এসেছে। করুণ একটা গল্প 'ফাঁসি', সাম্প্রদায়িকতার ক্ষুদ্রতায় ভরা 'ছেলেমানুষি', দাস মনোবৃত্তির চমৎকার দৃষ্টান্ত 'বাগদি-পাড়া দিয়ে'। প্রতিটা গল্প নিয়েই বিশদ আলোচনা করা যায়। এ পর্যন্তই থাক। একটা তারাও ছিনিয়ে নিতে পারিনি বইটা শেষ করে।
"শ্রেষ্ঠ গল্প" - রচনা (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়) [[{৩০০+ গল্প লিখেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকে বাছাই করা ২২ টি গল্প নিয়ে এই ব্ইটি}]] মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। তার প্রকৃত নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তার রচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল মধ্যবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, নিয়তিবাদ ইত্যাদি জীবনের অতি ক্ষুদ্র পরিসরে তিনি রচনা করেন চল্লিশটি উপন্যাস ও তিনশত ছোটোগল্প। তার রচিত পুতুলনাচের ইতিকথা, দিবারাত্রির কাব্য, পদ্মা নদীর মাঝি ইত্যাদি উপন্যাস ও অতসীমামী, প্রাগৈতিহাসিক, ছোটবকুলপুরের যাত্রী ইত্যাদি গল্পসংকলন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে বিবেচিত হয়। শ্রেষ্ঠ গল্প তার লেখা ছোটো গল্পের মধ্য আমার ভালো লেগেছে এই গল্পগুলো "প্রাগৈতিহাসিক" "আফিম" "একান্নবর্তী" "আত্মহত্যার অধিকার" "ছেলেমানুষী" .... RECOMMEND আপনি যদি সাহিত্যপ্রেমী হয়ে থাকেন তাহলে সময় সুযোগ হলে পড়ে নিতে পারেন । (একরার ব্ইটা পড়তে আরম্ভ করলে ..শেষ না করে ,উঠতে মন মানবে না )
``বাঁচতে হলে তেতলার ছাত থেকে লাফিয়ে পড়ে মরতে হবে,নইলে বাঁচার কোন পথ নেই ''
এমন কথা মানিক বাবু ছাড়া আর কার কলম দিয়ে বের হতে পারে জানা নেই। জানা নেই বলেই বুঝি জীবনের সুক্ষ অলিগলির খোঁজে বারে বারে মানিক বাবু তে ডুবে যেতে হয়।
সরীসৃপ প্রাগৈতিহাসিক আফিম একান্নবর্তী আত্মহত্যার অধিকার ছেলেমানুষী
এর যেকোন একটা গল্প কোন বইয়ে থাকলে সে বই উতরে যাবার কথা। অথচ এই সবগুলো গল্প একটা মাত্র বইয়ে। এই জন্য ঝামেলা হলো এই যে, দ্রুত এই বই শেষ করা যায় না। এক একটা গল্প শেষ করে ঝিম ধরা ঘোর লাগা নিয়ে বসে থাকতে হয়৷ ভাবতে হয়। কখনো কখনো এই ঝিম ধরা অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী ও হয়ে যায়।
হাতের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই বইটি তে একটা চমৎকার ভূমিকা ও রয়েছে। সব মিলিয়ে দারুণ সময় কাটবে এর সাথে।
মানিকের ছোটোগল্পে ক্ষুধার্ত মানুষ, ক্ষুধায় কাতর শিশুর তার মায়ের প্রতি কোনো এক গূঢ়-গোপনস্থলে খাবার লুকিয়ে রাখার অহেতুক অভিযোগ, রোমশ পুরুষের রিরংসা দমনরত ক্ষুধার্ত রূপোপজীবিনী, এগুলোই স্বাভাবিকতা। গল্পে রোমান্স আছে, কিংবা রোমান্সের মোড়কে নিখাদ কামই আছে, কিন্তু সেগুলো টলটলে জলের মতো স্নিগ্ধ নয়। বাস্তববাদ রোমান্টিকতাকে টেনে নামায় রান্নাঘরের ধোঁয়ায়, খোস-পাঁচড়ায়, ক্ষুধায়, অভাবে, বৈধব্যে, চটচটে গরম আর ঘামে। অবশ্য এইসব বাস্তবতাকে অস্বীকার করাও দুরূহ। কোথাও এক গ্রন্থ সমালোচক মানিককে 'অসুন্দরের পূজারি' আখ্যা দিয়েছিলেন, এই আখ্যান যথার্থই, যদিও শুধু উপন্যাস থেকে তাঁর এই বিশেষ পরিচয় পুরোপুরিভাবে পাওয়া সম্ভব নয়, ছোটোগল্পে বরং বিষয়টা ভালোভাবে বোঝা যায়।
বাস্তবতা আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হতাশ মানুষের গল্প মনে হয় না মানিকবাবুর চেয়ে বেশি ভালো করে কেউ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। উল্লেখযোগ্য ভালো লাগার গল্প গুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক,সরীসৃপ, বিবেক, দুঃশাসনীয়, টিচার, জুয়াড়ির বৌ, কুষ্ঠ রোগীর বৌ, স্বামী স্ত্রী, কালোবাজারের প্রেমের দর, একান্নবর্তী, অতসী মামী। সবচেয়ে ব���শি ভালো লেগেছে প্রাগৈতিহাসিক, অতসীমামী এবং সরীসৃপ। বিশেষত প্রাগৈতিহাসিক গল্পের শেষ প্যারাগ্রাফ টা ছিল একটু বেশি রকমেরই দুর্দান্ত। ওরকম একটা প্যারাগ্রাফ লিখতে পারলেই জীবন সার্থক মনে হতো!
গল্পগুলো গতানুগতিক শুধু পড়ে গেলাম এরকম নয়। পড়ার পরে একটা ঝাঁকুনি দেয়। ভাবায়। এখানেই লেখক হিসেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর সার্থকতা। সব মিলিয়ে মনস্তাত্ত্বিক গল্প।
এত দিন পরেও একই রকম প্রাসঙ্গিক।
সব গুলো ভালো লাগে না। তবে প্রাগৈতিহাসিক, হারানের নাতজামাই, হলুদ পোড়া, কুষ্ঠরোগীর বৌ ইত্যাদি কয়েকটা একেবারে গেঁথে যাবার মতো সুন্দর।
একদম রাস্তার মানুষের গল্প। বাবুমশাইদের বিলাসবহুল জীবনকাহিনী না। যারা পেটের ও দেহের ক্ষুধা, শীত, বর্ষা, রোগ সমুহ “বিধাতার অনিবার্য জন্মের বিধান” দারা জীবনে শক্ত হয়ে ওঠে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের কথা বলতেন ভিখারী বসির অথবা বেকার নীলমনির কাহিনী দিয়ে।
ফিকশনও যে কতটা বাস্তবতা ঘেঁষা হতে পারে, তার প্রমান মানিক বন্ধ্যোপাধ্যায়ের এই গল্পগুলো। বইটা পড়ে বুঝলাম যে, বাস্তবতার অন্যরকম এক সত্যতা আছে, ভিন্নধর্মী এক স্বাদ আছে। একজন লেখক যে তাঁর কল্পনাশক্তির বাইরেও কতটা শক্তিশালী, তা টের পাওয়া যায় এই লেখাগুলোতে। কোনো দুর্লভ দর্শন নয়, কোনো অলীক কল্পনা নয়, শুধুমাত্র বাস্তবতার নির্মম সত্য, কুৎসিত রূপ আর রিয়েলিজম নিয়ে তৈরি প্রত্যেকটা গল্প, আর সেগুলো খুব দক্ষভাবে শৈল্পিক রূপ দিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। রিভিউটা শেষ করছি এই বই থেকে আমার খুব প্রিয় একটা লাইন দিয়ে।
*** Following line contains mild spoilers ***
"নীলমণির গায়ে কাঁটা দিতে লাগিল। বাতাস! পৃথিবীতে কত বাতাস! তবুও ফুসফুস ভরাইতে পারে না। অন্নপূর্ণার ভাণ্ডারে সে উপবাসী, পঞ্চাশ মাইল গভীর বায়ুস্তরে, ডুবিয়া থাকিয়া ওর দম আটকাইলো।" ~ (আত্মহত্যার অধিকার), শ্রেষ্ঠগল্প, মানিক বন্ধ্যোপাধ্যায়।