||রাষ্ট্রশক্তি এবং তাকে পালটে দেওয়ার স্বপ্ন-সংঘাত||
[ My Revolution by Hari Kunzru, Hamish Hamilton, 2007]
17th March, 1968 লন্ডনের সকাল। প্রায় দশহাজার প্রতিবাদী মানুষের একটি দল একে একে এসে দাড়াল ট্রাফালগার স্কোয়ারে! বিভিন্ন যুদ্ধবিরোধী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, শান্তিকামী মানুষ, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র, অসংখ্য যুবক ও যুবতী যারা রাষ্ট্রের বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট সামাজিক পরিমন্ডলের গণ্ডির বাইরে গিয়ে অন্যরকম ভাবে সমাজ গড়তে চায়, তারা একত্রিত হয়েছে তাদের সমবেত প্রতিবাদ রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরতে। তারা কেউ গান গাইছেন, কেউ দিচ্ছেন স্লোগান, কেউ মুখে কালো কাপড় বেধে জানাচ্ছেন নীরব প্রতিবাদ, কেউ বয়ে নিয়ে চলেছেন কাধে কালো কফিন, কেউ রাষ্ট্রধ্বজা জ্বালিয়ে তুলে ধরেছেন বিদ্রোহের মশাল। তাদের সকলের উদ্দেশ্য আমেরিকা সরকারকে সচেতন করা, তারা যেন অবিলম্বে ভিয়েতনামে যুদ্ধ বন্ধ করে। তাদের উদ্দেশ্য ব্রিটিশ সরকারকে সচেতন করা, যাতে সরকার যেন আমেরিকা সরকারকে সমর্থন না করে।
বিপুল বিশাল এই জনস্রোতের প্রাথমিক আবহটি ছিল সামান্য লঘু। হাসি ঠাট্টা, গান আর স্লোগানে স্লোগানে আপ্লুত যুবক-যুবতীরা ট্রাফালগার স্কোয়ার থেকে গ্রসভেনর স্কোয়ারের দিকে পা বাড়িয়েই সচকিত হয়ে উঠিল। আমেরিকান এমব্যাসিকে মুড়ে ফেলা হয়েছে পুলিশ দিয়ে! আমেরিকান এমব্যাসি দখল করার প্রাথমিক কোন পরিকল্পনা ছেলেমেয়েদের ছিল না, কিন্তু পুলিশের বাধা পেয়ে অচিরেই আগুয়ান জনতার সাথে তদের তুমুল ঠেলাঠেলি শুরু হল। দু-পক্ষের দ্বন্দ্বযুদ্ধে খুব শ্রীঘই স্মোক বম্ব, ঢিল পাথর ইত্যাদি আদান প্রদান শুরু হল। ধাক্কাধাক্কিতে পুলিশের কর্ডন ভেঙে অনেকেই ঢুকে পড়েছিল এমব্যাসি চত্বরে; অপেক্ষমাণ পুলিশের আরেক সারি তাদের তাড়া করতে ছুটল। অনেককেই পাকড়ে ফেলা গেল, ছুড়ে দেওয়া হল পুলিশ ভ্যানের ধাতব মেঝেতে। ততক্ষণে এদিকে অবশ্য ঘোড়সওয়ার বাহিনী লাঠি উচিয়ে নেমে পড়েছে ময়দানে, পিটিয়ে তারা ছত্রভঙ্গ করতে চাইছে যুবক-যুবতীদের। সদ্য তরুন, ক্রিস ক্রেভার এই আবহেই প্রথমবার দেখেছিল সেই মেয়েটিকে, অ্যানা অ্যাডিসনকে! নীল জিন্স, আর্মি জ্যাকেট আর স্কার্ফে বাধা তার বাদামী চুল, তাকে ক্রিস দেখেছিল প্রতিপক্ষকে অগ্রাহ্য করে সামনে এগিয়ে যেতে, নিখুঁত ভঙ্গিমায় পাথর ছুড়ে মারতে! অ্যানা অ্যাডিসন ছিল একইসাথে ক্রিসের ভালবাসা ও মৃত্যুর পরোয়ানা।
ওয়েস্ট লন্ডনের রুইস্লিপে বড় হয়ে ওঠা, ক্রিস ক্রেভার ছিল লণ্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স এর প্রথম বর্ষের ছাত্র। সেদিন সে এসেছিল ভিয়েতনাম অ্যাকশন গ্রুপের সদস্য হয়ে। সে ছিল দ্বন্দ্বযুদ্ধের প্রথম সারিতে। তার স্থান হল পুলিশের ভ্যানে। লক আপে তার পরিচয় হল আরেক যুবকের সাথে, নাম মাইলস ব্রিজম্যান, ছেলেটি ফটোগ্রাফার। একদিকে অ্যানা, অন্যদিকে মাইলস, ক্রিসের জীবনের দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী চরিত্রের আগমন হল ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে। উন্মাদনাময় এক র্যাডিক্যাল আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক জীবন, যা ক্রিস চিরকাল গোপন রাখতে চেয়েছে তার স্ত্রী মিরান্ডা ও পালিতা কন্যা স্যামের কাছ থেকে, সেই গোপনীয়তা ভেঙে পড়ল ক্রিসের পঞ্চাশ বছরের জন্মদিনে এসে, আবার মাইলসের মুখোমুখি হয়ে! এতদিন পরে ক্রিস জানতে পারল, হ্যাঁ, অ্যানা ও অন্যান্যদের সন্দেহ সঠিক ছিল। আসলে মাইলসকে পাঠানো হয়েছিল চর হিসেবে, ততকালীন আন্ডারগ্রাউন্ড র্যাডিক্যাল গোষ্ঠীর সদস্যদের সম্মন্ধে তথ্য জোগাড় করতে!
কিন্তু এই উপন্যাস শুধু ক্রিস-অ্যানা-মাইলস, বা, সীন, সল, লিও, প্যাট এলিসের কাহিনী নয়! এই গল্প সামগ্রিকভাবে ১৯৬৮-১৯৭৪ এর সময়কালের, যখন দুনিয়াব্যাপী ঠান্ডা যুদ্ধের আবহাওয়ায় একদল যুবক-যুবতী চেয়েছিল বিকল্প কোন সমাজ ব্যবস্থার। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রশক্তি এবং বুর্জোয়া ক্যাপিটালিস্ট শক্তিকে পরাস্ত করে তারা স্বপ্ন দেখছিল এক নতুন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করার। নতুন সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে তাদের কারোরই সুনির্দিষ্ট ধারনা তাদের ছিল না, কিন্তু তাদের ইচ্ছে ছিল আন্তরিক। ক্রিস ছ’মাস জেল খেটে যখন ফিরে এল, তখন কলেজ কর্তৃপক্ষ তার দোর বন্ধ করেছেন ফেরার, শখের বিদ্রোহী সহপাঠীরাও তাকে এড়িয়ে যেতে আগ্রহী। ক্রিস ভিড়ে গেল একদল ছেলেমেয়ের সাথে যারা কমিউন ও কম্যুনিজমে আগ্রহী! অ্যানার সাথে এইখানে তার আলাপ হল।
একদিকে তাদের উদ্দাম বোহেমিয়ান নেশাতুর জীবন, অন্যদিকে বৈকল্পিক এক সমাজ গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা। সকল দিক থেকেই ক্রিস ও অন্যান্যরা সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণা থেকে বিপ্রতীপ এক অবস্থান করছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল ব্যাক্তিগত পরিসর বলে যা কিছু আছে, তা আসলে বুর্জোয়া ধনতান্ত্রিক ধ্যানধারণার চর্চা। সমাজের বদল আনতে গেলে আগে নিজেদের মানসিকতায় ও বদল আনতে হবে। ফ্রী-পিকচার, বা ল্যান্সডাউন রোডে যে সব যুবক-যুবতীরা থাকত, তারা যৌথ ভাবে বাচায় বিশ্বাসী ছিল। প্রত্যেকে পরিশ্রম করবে, এবং তার সুফল বাকি সকলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। সামাজিক এবং রাজনৈতিক, উভয় দিক থেকেই একটা মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলতে চেয়েছিল তারা। প্রায় নেত্রীসুলভ হয়ে অ্যানা নিজেকেই এই বদলের পুরোধা হয়ে উঠেছিল। তাদের খাওয়া শোওয়া আড্ডা আলোচনা নেশা, এমনকি যৌনইচ্ছের ক্ষেত্রেও ব্যাক্তিগত অধিকারবোধের জায়গাটি কে তারা মুছে দিতে চেয়েছিল।
কিন্তু রাষ্ট্রশক্তি চিরকালই সাম্যের বিরোধী এবং বৈষম্য বজায় না রাখলে ধনতন্ত্রের চাকা অচল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র সর্বদাই আপনার ভাবনা, আপনার জীবন, আপনার প্রয়োজনকে নিজের মত করে, নিজের স্বার্থে নিয়ন্ত্রন করতে ইচ্ছুক। তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে যে আপনার ব্যাক্তিগত যা কি���ু আছে, আসলে সেখানেও রাষ্ট্র আপনার অজান্তেই হাত বাড়িয়েছে। ছোটোবেলা থেকে রাষ্ট্র আপনাকে নিয়ম শিখিয়েছে, আপনার ওঠা বসা, আপনার ভাললাগা, খাদ্যরুচি, ব্যাক্তিগত ও পারিবারিক প্রতিটি প্রয়োজন আসলে আসলে রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দেয়। তাই রাষ্ট্রশক্তিকে স্বাভাবিকভাবেই ধনতান্ত্রিক শক্তি কব্জা করে তার নিজেস্ব মুনাফার জন্য। রাষ্ট্রের বেধে দেওয়া ছক থেকে সরে এলে প্রতিক্রিয়াশীল ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রশক্তিও তাই একটি নির্দিষ্ট ছকেই সেই বিক্ষুব্ধ বিরুদ্ধমতাবলম্বীদের মোকাবেলা করে। রাষ্ট্র প্রথমে তাদের উসকে দেয়, তারপর সংগঠিত হতে দেয়, সবশেষে তাদেরকে আইসোলেট করে দিয়ে তাদের উপর রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ তোলে এবং সরাসরি তাদের সাথে এনকাউন্টারে নামে।
রাষ্ট্রের সাথে এই মুখোমুখি বিদ্রোহের পর্যায়গুলি চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে ক্রিসের বয়ানে। বর্তমান থেকে অতীত, অতীত থেকে আবার বর্তমান, ক্রিসকে তার রাজনৈতিক স্বত্বা তাড়া করে ফিরছে। ক্রিসের নিজের কাহিনীর সাথে সাথে উদঘটিত হতে থাকে অ্যানা, মাইলস ও অন্যান্যদের কাহিনী। ভিন্ন স্বাদের এই উপন্যাসটি একটি বিক্ষুব্ধ সময়, কিছু বৈকল্পিক ভাবনা ও ভিন্ন জীবনদর্শনের দলিল, অন্যভাবে উপন্যাসটি আসলে বহন করছে চিরাচরিত দিন-বদলের বৈপ্লবিক স্বপ্নের সাথে শোধনবাদী কায়েমী রাষ্ট্রশক্তির সংঘাতের কাহিনী যার নমুনা ছড়িয়ে আছে প্রতিটি দেশে প্রতিটি শতকের ইতিহাসে। আজও আমাদের চারপাশে এই একই রকম ঘটনা ঘটছে, সচেতন পাঠককে শুধু জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং চোখ মেলে দেখে নিতে হবে রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাষ্ট্রশক্তির কর্মপদ্ধতি।