ধরুন একটা ছেলের সাথে আপনার কিছুক্ষণের পরিচয়, তাও যদি খুব বেশি সুখকর না সেই পরিচয় পর্ব। আপনি হঠাৎ তাকে একদিন স্বপ্নে দেখলেন। অদ্ভুত একটা স্বপ্ন। আপনি কি এতেই তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবেন? অবশ্যই না। এমন অদ্ভুত কাজ করার মতো মানুষ তো আপনি না।
কিন্তু এই অদ্ভুত কাজটাই করেছিল লিলিয়ান। আমেরিকায় পড়তে আসা নিঃসঙ্গ একটা মেয়ে লিলিয়ান। ঘুরতে গিয়ে অদ্ভুতভাবেই তার সাথে দেখা হয় বাংলাদেশ থেকে ডাক্তারি পড়তে আসা হাসিখুশি তাহেরের। কিন্তু সেই সাক্ষাৎ মোটেই ভালোভাবে হয়নি। বরং শুরুটাই হয়েছিল ঝগড়ার মাধ্যমে। কারণ লিলিয়ানের ক্যামেরার ক্যাপ না খুলেই ছবি তোলা দেখে বিশ্রীভাবে হেসে ফেলে তাহের। এরপর তাহের তার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করলেও লিলিয়ান তাকে পাত্তা দেয় না। কিন্তু কি হলো তার হঠাৎ? সেদিন রাতে ঘুমই হলো না। ভয়ংকর একটা দুঃস্বপ্ন দেখলো। দেখলো যে লিলিয়ান নদীর পাড়ে হাঁটছে। আর মাঝনদী থেকে ভেসে আসছে চিৎকার। কেউ তাকে বলছে, " লি���িয়ান, লিলিয়ান! বাঁচাও আমাকে!!" দূর থেকে হাত নাড়তে নাড়তে চিৎকার করা মানুষটা আর কেউ না। তাহের!
একদিনের পরিচয়েই এই মানুষটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার মানে কী? তাও আবার এমন ভয়ঙ্কর স্বপ্ন!
পরপর তিনদিন লিলিয়ান ঘুমাতে পারলো না। বারবার ঘুরেফিরে স্বপ্নে দেখতে লাগলো তাহেরকেই। সিদ্ধান্ত নিলো সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে যাবে। তাই করলো। কিন্তু ডা. ভারমান কোনো সমাধান দিতে পারলেন না। বরং যুক্তি দিয়ে বোঝালেন যে আসলে তার বাড়ির লোকদের জন্য মন খারাপ হচ্ছে। কিন্তু কি জানি কেনো লিলিয়ান সিদ্ধান্ত নিল তাহেরকে আবার খুঁজে বের করবে। আর পেয়েও গেলো সহজেই। পঁচিশটা গোলাপ হাতে সে তাহেরকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। এমন অদ্ভুত একটা সিদ্ধান্ত সে কেনো নিলো জানে না। মনে হচ্ছে এই কাজগুলো তার নিজের ইচ্ছায় হচ্ছে না। কেউ বুঝি তাকে দিয়ে করাচ্ছে এসব। লিলিয়ান বুঝতে পারে নিয়তি তাকে ঠিকই তাহেরের সাথে বেঁধে দেবে, সারাটাজীবন তার সাথেই কাটাতে হবে!
আর সত্যি সত্যি বিয়েটা হয়েও গেলো। যদিও তার জন্য লিলিয়ানকে হতে হয় বাবা মায়ের ত্যাজ্য কন্যা, কিন্তু তবুও তার কোনো দুঃখ ছিলো না। স্বামী তাকে এতো ভালোবাসে যে তার কখনো মনেই পড়ে না বাড়ির লোকের কথা। আর আশ্চর্যের ব্যাপার বিয়ে হবার পর আর একদিনও তাকে দেখতে হলো না ওই ভয়ানক দুঃস্বপ্ন!
বিয়ের বেশ অনেকবছর পর তাহেরের একবার কাজের তাগিদে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, লিলিয়ানকে থাকতে হয় তাদের ডুপ্লেক্স বাড়িতে একা। ভয়ে ভয়ে ঘুমাতে যায় লিলিয়ান, তাহেরকে ছাড়া এক মুহুর্তও ভালো লাগে না তার। আর আর... সেদিনই সেই ভয়ানক দুঃস্বপ্নটা আবার ফিরে আসে। লিলিয়ান দেখা একটা প্রাচীন বাড়ির প্যাঁচানো সিড়ির রেলিং বেয়ে উঠছে ও। একেবারে উপরে পৌঁছে যাওয়ার পর একইভাবে শুনতে পায় তাহেরের আর্ত চিৎকার, কিন্তু বাঁচানোর জন্য নামতে গিয়ে দেখে সিড়ি আর নেই। ভীষণ অসহায়ত্ব নিয়ে বারান্দায় দাড়িয়ে থাকে লিলিয়ান, কানে আসতে থাকে অসহ্য চিৎকার।।
ঘুম ভেঙে যায় লিলিয়ানের। এইরকম বাড়ি সে কেনো দেখলো? তার বিদেশের মাটিতে তো সে এরকম বাড়ি কখনোই দেখে নি... কেনো জানি মনে হচ্ছে তাহেরের বাংলাদেশের বাড়িটা এরকম। তড়িঘড়ি ফোন করে তাহেরকে কিন্তু জানায় তাহেরদের বাড়িতে কোনো প্যাঁচানো সিড়ি নেই। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে চায় লিলিয়ান কিন্তু পারে না। কারণ তার অবচেতন মন বলছে এই বাড়িতেই তার একদিন যেতে হবে। নিয়তিই তাকে টেনে নিয়ে যাবে!
এদিকে তাহেরের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়, লিলিয়ান হঠাৎ তার বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলো কেনো। মনে হয় যতদিন পর্যন্ত লিলিয়ান তাদের বাড়িটা নিজের চোখে না দেখবে ততদিন তার মাথায় এই দুঃস্বপ্নটা ঘুরতে থাকবে। তাই তাহের সিদ্ধান্ত নেয় ছুটি নিয়ে লিলিয়ানকে সাথে নিয়ে চলে যাবে গ্রামের বাড়িতে। যেই ভাবা সেই কাজ। লিলিয়ান অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে পৌঁছে যায় তাহেরের গ্রামের বাড়ি। কিন্তু সে কি জানতো কি অপেক্ষা করছে তাদের দুজনের জন্য? কারণ তাহেরদের পুরনো বাড়িটা হুবহু লিলিয়ানের স্বপ্নে দেখা বাড়িটার মত! লিলিয়ানের বুক কাঁপতে থাকে। একদিকে যেমন এই বাড়িটাকে মনে হচ্ছে অতিপরিচিত, অপরদিকে ভয় হচ্ছে তার স্বপ্নে দেখা ভয়ংকর ঘটনাগুলো সত্যি হয়ে যাবে না তো? তার স্বামীর কোনো ক্ষতি হবে না তো?
✨পাঠ প্রতিক্রিয়া: হুমায়ূন আহমেদের বই পড়তে তো এমনিতেই ভালো লাগে। এর আবার পাঠ প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করবো কিভাবে ঠিক বুঝতে পারছি না। কারণ সাধারণ একটা বই পড়ে যখন অসাধারণ লাগে তখন সেই বইটাকে ঠিক কি বলে আমার জানা নেই।
"আয়নাঘর" বইটা অতটাও ভয়ের না। তবে খানিকটা শিহরণ তো জাগবেই। একটু হলেও দুশ্চিন্তা হবেই লিলিয়ানের জন্য। জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ খুব সুন্দর করে সাজিয়েছেন গল্পটা। কোথাও বাড়তি কোনো কথা নেই, ঘটনা নেই, শুধু তাহের আর শুধু লিলিয়ান। এদের মিষ্টি প্রেমটা ভালো লেগেছে। লেখক লিলিয়ানের দেখা স্বপ্নগুলোকে দারুণভাবে ফোরশ্যাডো করেছেন। এই ব্যাপারটা সুপার ডুপার লেগেছে। ছোট্টখাটো এই বইটা একবারেই শেষ করে ফেলা যায়। আর অবাক ব্যাপার হলো এই বইটার সুন্দর একটা এন্ডিং ছিলো! হুমায়ূন আহমেদের বইয়ে এন্ডিং থাকা তো একেবারে সপ্তমাশ্চর্যের মত ব্যাপার। পুরো বইটাই দারুন এনজয় করেছি। হ্যাঁ ভয় পাওয়ার মতো তো না একদমই তবে নিঃসন্দেহে অতিপ্রাকৃত জনরার মধ্যে ভীষন ভালো লাগবে পড়তে।
✨ প্রচ্ছদ ও প্রোডাকশন : প্রচ্ছদটা সিম্পলের মধ্যে সুন্দর, শুভ্র। বেশ ভালোই লেগেছে সাদা প্রচ্ছদটা। সময় প্রকাশনীর প্রোডাকশন অনেক হাইফাই না হলেও চলনসই। পড়া গিয়েছে ভালোভাবেই। বহুদিন পর সাদা পেজের বই পড়লাম। ভালোই লাগলো।
✨ রেটিং : ৪.২/৫
পৃথিবীর সব ঘটনারই ব্যাখ্যা থাকবে এমনটা নয়। কিছু ঘটনা থাকবে ব্যাখ্যাহীন, অতিপ্রাকৃত। নিয়তির কারণে সেসব ঘটনার মুখোমুখি হতেই হবে। কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়।