সাংবাদিক ও সাহিত্যিক চৌধুরী শামসুর রহমানের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'স্মৃতিকথা'। ১৯৫৮ সালে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে দিব্য প্রকাশ বইটির পুনঃর্মুদ্রণ করে। মূলত, 'মুসাফির' ও 'পঁচিশ বছর' নামে দুইটি বই নিয়ে এই সংকলন।
প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর লেখা একটি ক্ল্যাসিক বই 'মহাস্থবির জাতক'। যাঁরা আতর্থীর ঢাউস বইখানা পড়েছেন, তাঁরা জানেন বইটির আকর্ষণ চুম্বকের মতো। ভবঘুরে জীবন নিয়ে বাংলায় এমন বই দুটো থাকতে পারে তা কল্পনায় ছিল না। চৌধুরী শামসুর রহমানের স্মৃতিকথা'র পহেলা ভাগ 'মুসাফির' পড়তে গিয়ে যেন নির্যাস পেলাম 'মহাস্থবির জাতক' পড়ার।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা হলেও চাঁদপুরের একটি স্কুলে পড়তেন শামসুর রহমান। দশম শ্রেণির পরীক্ষায় গণিতে ভীষণ খারাপ করেন। ভালো ছাত্র হিসেবে সুনাম ছিল। ফেল করলে তো ইজ্জত থাকে না। তাই ইজ্জত বাঁচানোর নিমিত্তেই বাড়ি থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। মাত্র পাঁচ টাকা সম্বল নিয়ে ১৯১৮ সালে পৃথিবীর পথে নামেন শামসুর রহমান। এরপর তিন বছর মুসাফির হয়ে অবিভক্ত ভারতের পথে পথে ঘুরেছেন। সেই মুসাফির জীবনের স্মৃতি পড়তে গিয়ে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। আবার, মানুষের প্রতি মানুষের দরদ দেখে উদ্ভাসিত হচ্ছিলাম। দীর্ঘ তিন বছর একটা কিশোরের পথে-ঘাটে কাটানোর স্মৃতি নিশ্চয়ই সুখকর নয় ; তবে অভিজ্ঞতার বিচারে বৈচিত্র্যমণ্ডিত।
সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে পরিচয় তখন মুখ্য ছিল। তাই যেখানেই গেছেন খুঁজে বের করতে হয়েছে মুসলমান পরিবার। মুসাফির হিসেবে রাতে আশ্রয় নিয়েছেন মসজিদে। অদ্ভুত সব উপায়ে রিজিকের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন স্রষ্টা।
মুসাফির জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে। সেখান থেকে দেশভাগ পর্যন্ত সময়কাল নিয়ে লেখা 'পঁচিশ বছর'। পত্রিকার হকারি থেকে সংবাদকর্মী ও সাহিত্যিক হয়ে ওঠার পর্বের কথা এবার শুনিয়েছেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ বাংলার রাজনীতির অনেক নক্ষত্রের কথা লিখেছেন শামসুর রহমান। দেখেছেন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার ঘৃণ্য চিত্র, সাক্ষী হয়েছেন '৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের।
চৌধুরী শামসুর রহমানের গদ্য প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মতো এত শক্তিশালী নয়। তবে আনন্দ নিয়ে পড়া যায়। বিষয়বস্তু ও বর্ণনার কারণে আড়াই শ পৃষ্ঠার বইটি একবসায় পড়ে ফেলতেও অসুবিধা হয় না ; লাগে না একঘেয়ে।