আত্মজীবনী পড়তে আমার খুব একটা ভালো লাগে না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো ’ পড়ে প্রথমবারের মতন বিনোদিনী দাসীর সঙ্গে পরিচয়। তখন থেকেই এই প্রতিভাধর চরিত্রটিকে জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছিলো। বইটি সম্পর্কে জানতে পারলাম অনেক দিন পর।যে মেয়ে একদিন লিখেছিল, ‘‘মনের কথা জানাইবার লোক জগতে নাই,’’ আজ দেখা যাচ্ছে তার কথা শুনে শুনে লোকের আর মন ভরছে না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন এক নারীর এতো সহজ সুন্দর প্রাণবন্ত লেখনী পড়ে সত্যিই অবাক হতে হয়।
এক আশ্চর্য প্রতিভার নাম নটী বিনোদিনী। নিজেকে বলতেন পতিতা, বলতেন পাপীয়সী, বারাঙ্গনা। যে যুগে নারীদের আলাদা কোনো অস্তিত্ব স্বীকার করতনা পরিবার সমাজ এমনকি দেশের শাসককুলও, সে সময়ে দাঁড়িয়ে নিজের অভিনয় প্রতিভার জোরে বিনোদিনী নিজেকে সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন শুধু অভিনয় জগতে নয় সংস্কৃতমনস্ক অভিজাত লোকেদের সভাতেও যেখানে আলোচিত হত বাংলা, ইংরেজী সাহিত্য। সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেসব আলোচনায় যোগ দিতেন এই অসামান্যা প্রতিভাময়ী সুন্দরী নারী, যদিও তাঁর প্রথাগত শিক্ষা ছিল সামান্যই । অতি স্বল্প শিক্ষিতা হয়েও এই অবিসংবাদিত নায়িকা লিখেছেন আত্মজীবনীসহ কবিতার বই।
১৮৭৪-এর ১২ ডিসেম্বর মাত্র এগারো বছর বয়সে ‘শত্রুসংহার’ নাটকে দ্রৌপদীর সখীর ভূমিকায় তার প্রথম অভিনয়। জন্ম হল বাংলা থিয়েটারের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিনোদিনীদাসীর। গিরিশ ঘোষের দলে আসার পর তাঁর অভিনয় প্রতিভা স্বীকৃতি পায় বাংলার সর্বত্র ও নাটক ও সংস্কৃতিবান রুচিশীল মহলে। হয়ে উঠলেন তিনি নাট্যসম্রাজ্ঞী। সীতা প্রমীলা, কৈকেয়ী, কপালকুণ্ডলা, মতিবিবি এবং এরকম আরো অনেক নারীপ্রধান চরিত্রগুলি তাঁর অভিনয় গুণে হয়ে ওঠে বাস্তব। 'মৃণালিনী' নাটকে 'মনোরমা' চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেখে স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, "আমি মনোরমার চিত্র পুস্তকেই লিখিয়াছিলাম, কখনো যে প্রত্যক্ষ দেখিব এমন আশা করি নাই। আজ বিনোদের অভিনয় দেখিয়া সে ভ্রম ঘুচিল ।"এই বক্তব্য প্রমাণ করে লেখকের কল্পনার নারীকে কিভাবে তিনি বাস্তবায়িত করেছেন। অতীব প্রখর মননশক্তি না থাকলে এরকম অভিনয় করা যায়না। মাত্র চোদ্দ বছর! কি অসাধারণ প্রতিভাময়ী ছিলেন এই নারী-- ভাবলেও বিস্মিত হতে হয়। ১৮৮৪-র ২রা আগস্ট প্রথম অভিনীত হয় চৈতন্যলীলা। সর্বাপেক্ষা আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই নাটক। চৈতন্যের ভূমিকায় বিনোদের অভিনয় দেখে ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলেছিলেন "আসল নকল এক দেখলাম "। নিমাই চরিত্রের ভাবতন্ময়তা বিনোদকে আচ্ছন্ন করে রাখত। এর ভিতর দিয়েই পাঁক থেকে পদ্ম হয়ে উঠলেন নটী বারাঙ্গনা বিনোদিনী। শ্রী রামকৃষ্ণের স্পর্শে গ্লানিহীন, কলুষমুক্ত হলেন বারাঙ্গনা, সঙ্গে বাংলার রঙ্গালয়ও অশুচিমুক্ত হল।
বিনোদিনীকে রক্ষিতা হিসেবে পাওয়ার সর্তে পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগালেন গুর্মুখ রায় মুসাদি নামে এক মাড়োয়ারী যুবক। ১৮৮৩ সালে ৬৮ বিডন স্ট্রিটে নির্মিত হল থিয়েটার ভবন।কথা ছিল, বিনোদিনীর নাম অনুসারে তার নাম হবে ‘বি থিয়েটার’। সমস্ত উদ্যোগ স্বয়ং বিনোদের। কিন্তু দৈবের খেলা যাকে বলে তাই হল। থিয়েটারের নাম 'বি-থিয়েটার' হলনা হল 'ষ্টার থিয়েটার'। বারাঙ্গনার দেহ ব্যবহার করা যায় নিজের জৈব চাহিদা মেটাতে কিন্তু তার অধীনে কাজ --নৈব নৈব চ! হোকনা তিনি অসামান্যা-- শুধু রূপে অভিনয়ে নয় , বিচার বুদ্ধিতেও।
বিনোদিনীই ভারতীয় বা দেশজ সাজসজ্জার সঙ্গে ইউরোপীয় সাজ (make up) সজ্জার সংমিশ্রণ করেন, যদিও তাঁর সামনে কোন রোল-মডেল ছিলনা। Moon of The Star, Flower of the Native Stage এইসব বিশেষণে তিনি ভূষিতা হয়েছিলেন। মাত্র চোদ্দ বছর বাংলা রঙ্গালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মাত্র ২৩ বছর বয়সে অভিনয় জীবনের মধ্যগগনে পৌঁছে তাঁকে ছাড়তে হল তাঁর ভালবাসার পেশা ও জীবন। থিয়েটারের রাজনীতি ও দলাদলিতে বিরক্ত হয়ে বিনোদিনী অভিনয়-জীবন শেষ করেন ১৮৮৭-র ১ জানুয়ারি। অসামান্যা প্রতিভাময়ী হয়েও আজন্ম বঞ্চনা আর অবহেলার শিকার হয়ে জীবন কাটান তিনি। শোকের আঘাতে জীবনের সব খেদ, আক্ষেপ যেন দলা পাকিয়ে উঠে এল কলমে – ‘‘ইহা কেবল অভাগিনীর হৃদয়-জ্বালার ছায়া! এ পৃথিবীতে আমার কিছুই নাই, শুধুই অনন্ত নিরাশা, শুধুই দুঃখময় প্রাণের কাতরতা।’’৭৯ বছর বয়সে মৃত্যু তাঁকে শান্তি দিল। ১৯৪১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুর পর এক লাইনও লেখেনি কোনও কাগজ। তাঁর জন্মের দেড়শ বছর বাদে ষ্টার থিয়েটারের নাম হয়েছে, 'বিনোদিনী থিয়েটার' --তবুও ভাল।
কিন্তু যাঁর এটার প্রয়োজন ছিল-- সে তো জীবিত অবস্থায় সে সম্মান পেলনা।