একজন সন্ন্যাসী। অন্যজন গৃহী। এলোকেশী ছিল কুলবধূ। যুবতী। রূপসী। নবীন তার স্বামী। সে বিদেশে। শহরে। গাঁয়ের মেয়ে এলোকেশী গাঁয়েই থাকে মা বাবার কাছে। মাধব গিরি তারকেশ্বরের মোহন্ত মহারাজ। রাজা মহারাজাদের মতোই প্রতাপ তার। এলোকেশী এসেছিল দেব সন্দর্শনে। তখনই দু’জনের প্রথম দেখা। ফলে সন্ন্যাসীর তপোভঙ্গ। এলোকেশীর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল তারকেশ্বরের মোহন্ত। স্বামী সোহাগিনী এলোকেশী অবশেষে ভণ্ড-তপস্বীর অঙ্কশায়িনী। কেননা, পরিবেশ তার প্রতিকূল। এদিকে দোর্দণ্ডপ্রতাপ মোহন্ত, অন্যদিকে লোভী বিমাতা আর কুট্টিনী তেলে-বৌ। স্ত্রীর পতন-সংবাদে আহত, অপমানিত, উন্মত্ত নবীন ঘরে ফিরে প্রতিশোধ নিয়েছিল আপন স্ত্রীকে হত্যা করে। খ্রীস্টাব্দ ১৮৭৩। নবীনের হাতে খুন হল এলোকেশী। খুনের দায়ে দ্বীপান্তরী হল সে। আর ব্যভিচারের দায়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হল তারকেশ্বরের মোহন্ত। এই ঘটনা নিয়ে তোলপাড় উনিশ শতকের বাংলার গ্রাম গঞ্জ নগর। উত্তেজিত, আলোড়িত কলকাতা। নাটক। প্রহসন। ছবি। গান। ক’বছর ধরে সকলের মুখে মুখে শুধু তারকেশ্বর উপাখ্যান। পথে পথে গান—‘মোহন্তের তেল নিবি যদি আয়!’ সেই অভূতপূর্ব উত্তেজনার দিনগুলোকেই ফিরিয়ে এনেছেন শ্রীপান্থ তাঁর এই বইটিতে। অষ্টাদশ-উনিশ শতকের কলকাতার ইতিহাসে তাঁর অধিকারের কথা সকলের জানা। শুধু কলকাতা কেন, শ্রীপান্থের ইতিহাস-চেতনা সবসময়ই তাঁর রচনাকে স্থাপন করে বৃহত্তর পটভূমিতে। ভূগোলের চেয়েও তাঁর কাছে জরুরী যেন কালের সীমানা। হাওয়ার নিশানা। ফলে কখনও যেমন তিনি ‘ঠগী’দের ইতিহাস সন্ধানী, কখনও ‘দেবদাসী’দের, তেমনি ‘জিপসীদের পায়ে পায়ে’ হাঁটতে তাঁর উৎসাহের অভাব ঘটেনি। লিখেছেন— ঔপনিবেশিক যুগের সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে। রাজা-প্রজা সম্পর্কের নানা খুঁটিনাটি দিক। নানা ক্ষেত্রে পুব-পশ্চিমের লেনদেন। শিল্প, সাহিত্য থেকে শুরু করে প্রেম-প্রণয়, পোশাক-আশাক— তাঁর কাছে সবই গভীর মনোযোগ সহকারে আলোচ্য। ‘মোহন্ত এলোকেশী সম্বাদ’-এর পটভূমি অবশ্য কলকাতা। বৃহত্তর কলকাতা। বাংলা। শুধু এলোকেশী আর মোহন্ত সংবাদ নয়, সম্ভাব্য সব সূত্র যাচাই করে, বিপুল তথ্যের সমাবেশ ঘটিয়ে শ্রীপান্থ এখানে উন্মোচন করেছেন সেদিনের বাঙালি সমাজকে। ভণ্ড কি শুধু তারকেশ্বরের মোহন্ত? মূল্যবান পরিশিষ্ট। কালীঘাটের পটুয়াদের আঁকা অমূল্য সব রঙিন ছবি। সম্পূর্ণ অন্য ধরনের সামাজিক ইতিহাস। পড়তে পড়তে মনে হবে এ-বই বুঝিবা সমান প্রাসঙ্গিক এখনও।
শ্রীপান্থের জন্ম ১৯৩২ সালে, ময়মনসিংহের গৌরীপুরে | লেখাপড়া ময়মনসিংহ এবং কলকাতায় | শ্রীপান্থ তরুণ বয়স থেকেই পেশায় সাংবাদিক | আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে যুক্ত | সাংবাদিকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণামূলক রচনাদি লিখে যাচ্ছেন তিনি | তাঁর চর্চার বিষয় সামাজিক ইতিহাস | বিশেষত কলকাতার সমাজ ও সংকৃতি | তিনি সতীদাহ,দেবদাসী,ঠগী,হারেম-ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনিই কলকাতার পটভূমিতে লিখেছেন একাধিক রচনা | তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: আজব নগরী, শ্রীপান্থেরকলকতা, যখন ছাপাখানা এল, এলোকেশী মোহন্ত সম্বাদ, কেয়াবাৎ মেয়ে, মেটিয়াবুরুজের নবাব, দায় ইত্যাদি | বটতলা তাঁর সর্বশেষ বই | কলকাতার শিল্পী সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর বেশি কিছু প্রবন্ধ ইংরেজিতেও প্রকাশিত হয়েছে | বাংলা মুলুকে প্রথম ধাতব হরফে ছাপা বই হালেদের 'আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গোয়েজ'-এর দীর্ঘ ভূমিকা তার মধ্যে অন্যতম | পঞ্চাশের মন্বন্তরের দিনগুলোতে বাংলার শিল্পী সাহিত্যিক কবিদের মধ্যে নব সৃষ্টির যে অভুতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটে তা নিয়ে লেখা তাঁর 'দায়'বইটির ইংরেজিতে অনুবাদ প্রকাশিত হতে চলেছে |