রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্তোরিয়া ওকাম্পো বিষয়ক এই বইটি অভিনব পদ্ধতিতে নির্মিত যেন এক নদী, যার একটি ধারায় রয়েছে একটি উপন্যাস, অপর ধারায় রয়েছে লেখকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। দুটি ধারা মিলিত হয়েছে সৃষ্টির ও অন্বেষণের বিচিত্র কল্লোলে।
প্রচ্ছদে ব্যবহৃত ছবিটি রবীন্দ্রনাথের আঁকা। বইটি ১৯৮৬ সালে আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত।
ভিকতোরিয়া ওকাম্পোকে বাঙালি চেনে রবীন্দ্রনাথের একজন বিদেশিনী অনুরাগিনী হিসেবে। শ্রীমতি ওকাম্পো কিন্তু নিজের গুণেই পরিচিত হবার যথেষ্ট যোগ্যতা রাখেন। আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে (নভেম্বর, ১৯২৪) আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আইরেস শহরে প্রথমবার সাক্ষাৎ হয়েছিল দুজনের। ওকাম্পোর আতিথ্যে মাস-দুয়েক ছিলেন সেখানে। এই সামান্য সময়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাজগতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন এই আর্জেন্টিনীয় বিদুষী। শুধু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিশ্লেষণ নয়, ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর মতো একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বিশদে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা। বাঙালি হিন্দু নারীদের ব্যাপারে লেখকের মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণটিও মৌলিক অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন।
অভিনব বিন্যাসে বইটি লিখেছেন কেতকী কুশারী ডাইসন। একটি কাল্পনিক কাহিনি (প্রথম পুরুষে লেখা) এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ওকাম্পোর সম্পর্ক (উত্তম পুরুষে লেখা)— এই দুটি বিষয়বস্তুকে একসঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন তিনি। ওকাম্পোকে নিয়ে লেখা অংশগুলিকে শুধুমাত্র "প্রবন্ধজাতীয়" বললে কমিয়ে বলা হবে; বিষয়টি নিয়ে রীতিমত তন্নিষ্ঠ গবেষণা করেছেন কেতকী (ইচ্ছে করলেই আলাদা একটি ভারিক্কি বই লিখে ফেলতে পারতেন)। শুধু ওকাম্পো নয়, মেয়েদের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক চিন্তাভাবনার অনেক অচিন্তনীয় (কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো) পরিসরের সঙ্গে পাঠকের মোলাকাত করিয়ে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এরকম নির্মোহ (অথচ অসূয়াহীন) বিশ্লেষণ খুব বেশি চোখে পড়ে না।
বইয়ের শেষদিকে কাদম্বরী দেবীর প্রতি উদ্দিষ্ট অংশটুকু মন ছুঁয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের সারাজীবনের লেখালেখির একটা বড় অংশই তো মূলত কাদম্বরীর স্মৃতিবিলাপ, কাদম্বরীর জন্য এলিজি।
“হে জগতের বিস্মৃত, আমার চিরস্মৃত, আগে তোমাকে যেমন গান শুনাইতাম, এখন তোমাকে তেমন শুনাইতে পারি না কেন? এসব লেখা যে আমি তোমার জন্য লিখিতেছি। পাছে তুমি আমার কন্ঠস্বর ভুলিয়া যাও, অনন্তের পথে চলিতে চলিতে যখন দৈবাৎ তোমাতে আমাতে দেখা হইবে তখন পাছে তুমি আমাকে চিনিতে না পারো, তাই প্রতিদিন স্মরণ করিয়া আমার এই কথাগুলি তোমাকে বলিতেছি, তুমি কি শুনিতেছ না?”
বেশ অন্য ধাঁচের একটা বই। অর্ধেক প্রবন্ধ, অর্ধেক উপন্যাস৷ আলোচিত হয়েছে ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর মনোজগত, তাঁর ফেমিনিজম, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, এলমহার্স্ট আর রবীন্দ্রনাথের সাথে সম্পর্ক৷ সমান্তরালে এসেছে অনামিকা নাম্নী একজন বঙ্গললনার কথা যে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে ভিকতোরিয়াকে। রবীন্দ্রনাথের নারীচিন্তা, তার বিবর্তন এবং কাদম্বরী দেবীর কথাও বিশদে আলোচিত হয়েছে।