কবি সমর সেন তার দাদু সাহিত্যিক ও গবেষক ড. দীনেশচন্দ্র সেনকে উদ্দেশ করে উক্তিটি করেছিলেন।
সমর সেনের খন্ডিত স্মৃতিকথা 'বাবু বৃত্তান্ত' এবং অন্যান্য প্রবন্ধ নিয়ে এই সুখপাঠ্য গ্রন্থ।
নিজের বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, পরিবারের গন্ডি পেরুবার কাহিনি নয় 'বাবু বৃত্তান্ত'। ত্রিশের দশকের পঞ্চপাণ্ডবের সান্নিধ্যে লাভ, বামপন্থী আন্দোলন, দ্বিতীয় মহাসমর এবং ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সবেরই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিত্র এসেছে সমর সেনের বয়ানে।
অধুনালুপ্ত 'প্রগতি' প্রকাশনায় কাজ করেছেন। সোভিয়েটের পতনের দূরতম পদধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন রুশিদের ডলার লোভ আর ভোগবাদী মানসিকতার উত্তরোত্তর বিকাশ দেখে। নিজের সোভিয়েট স্মৃতিতে সেসব লিখতে কার্পণ্য করেন নি।
বাংলাদেশের জনগণের কাছে ইন্দিরা গান্ধি মানে মহত্তম ব্যক্তিত্বের প্রতিমূর্তি। বিশেষত, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য এখনো সম্মানের চোখে দেখা হয় ইন্দিরা গান্ধিকে। কিন্তু সেই ইন্দিরা গান্ধিরই ভিন্নরূপ তুলে ধরেছেন সমর সেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ জুন থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত জরুরি অবস্থা জারি করে ইন্দিরা গান্ধি কীভাবে ভারতের গণতন্ত্রের ওপর স্টিম রোলার চালিয়েছিলেন তা সম্পর্কে একটা ধারণা সমর সেন দিয়েছেন। বাংলাদেশি পাঠকের জন্য এই বইয়ের ইন্দিরা গান্ধি এবং তার জারি করা জরুরি অবস্থা নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো অবশ্যপাঠ্য। তাতে 'উপকারি' ইন্দিরা গান্ধির আরেকটি ভয়াবহ রূপের কথা পাঠক জানতে পারবেন।
কিছু কিছু বই আছে যেগুলো মোটামুটি একটা নিয়মিত বিরতিতে আমার পুনর্পাঠ করা উচিত - এই বইটা অমন একটা বই। প্রতিবার পুনর্পাঠে আগেরবারের রয়ে যাওয়া মুগ্ধতার রেশটুকুকে কাটিয়ে আরও নির্মোহভাবে বর্ণনা ও বিশ্লেষণগুলোকে দেখা যায়। কয়েকটা কারণে আমি বইটি সবিরতিতে পুনর্পাঠে আগ্রহী। প্রথমত, ব্যক্তিজীবনে সমর সেনের দর্শন ও বিশ্বাস যা-ই থাকুক আলোচনার ক্ষেত্রে তিনি অনেকটাই নিরপেক্ষ। এতে মুদ্রার দুই পিঠকে একইসাথে দেখা যায়, কায়দাটাও লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয়ত, তিনি যেসব আশা ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সেসবের অনেকগুলোই কালে কালে ফলে গেছে। পুনর্পাঠে লক্ষ করা যায় আর কী কী আশা ও আশঙ্কা বাকি আছে। তৃতীয়ত, তাঁর সমসাময়িক অনেকের লেখা বিস্তারিত পাঠ হয়ে ওঠেনি, তাঁদের কোন রচনা পাঠের পর শ্রী সেনের দেয়া অ্যানেকডোটের সাথে মেলানোটা একটা আনন্দের ব্যাপার।
মানুষ চেষ্টা, পরিশ্রম, অধ্যবসায়, মেধা ইত্যাদির ফলে জ্ঞান, অর্থ, প্রতিপত্তি, পদ, ক্ষমতা, পার্থিব বিষয়-আশয় লাভ করতে পারে। কিন্তু সমমনা, সমমেধা, সমরুচি, সমবোধ, সমমত সম্পন্ন বন্ধুমহল লাভ করার জন্য মনে হয় ভাগ্য লাগে। আর ভিন্নমতের অথচ মেধাবী, রুচিবান, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বন্ধুমহল পাবার জন্য পরম সৌভাগ্য লাগে। সমর সেনের বন্ধুমহলের প্রফাইল দেখলে তাঁকে স্রেফ ঈর্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।
সমর সেন কবি, রুশ অনুবাদক, সম্পাদক, আর কি; আর কি কি ছিলেন সমর সেন তার রূপরেখা রয়েছে বাবু বৃত্তান্তে । বইটাকে প্রবন্ধের বললে ভুল হবে, বলতে হবে একজন দ্রষ্টার মত লোকের সময় অবলোকনের কথন । ইতিহাসের আদল আছে, বিশ্লেষণের ইচ্ছা আছে, সম্পূর্ণতা নেই । ব্যক্তিগত অভিমত কখনো বা যুক্তিকে না মানার তোয়াক্কা প্রবণ । হাস্যরসবোধ কখনো বা পরিপার্শ্বকে হালকা করে । বস্তুত বিভিন্ন সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের নিয়ে সমর সেন তার কবি মনের খেয়ালে লিখে গেছেন বিভিন্ন সময়ের রচনায় । রয়েছে তার সমকালিন রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্হা ও ঘটনার বর্ণনা । আত্মজীবনী নয়, আত্মস্মৃতিতে ধরা পড়া বিবিধ বিষয়ে অনু-পরমানু দর্শন ও মতামত । এসেছে তার বিদেশ ভ্রমন, মস্কো ও দিল্লী যাপনের কিছুটা কথার ছটা । বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের সাথে আলাপ পরিচয় এবং তাদের সম্পর্কে কখনো নিরপেক্ষ আর কখনো বা ব্যক্তির ইগো প্রসূত মতামতও এসেছে কিছু লেখায় । এই ধরণের রচনাকে ক্যাটাগরির জালে জড়ানো যায় না । বরং এই রচনা সংকলনকে সমর সেনীয় কবি মনের এক জাতীয় অসংজ্ঞায়িত বই বলাই শ্রেয় বোধ করি ।
সমর সেনের দুই চারটা কবিতার বাইরে আর কিছু কখনো পড়ছে বলে মনে পড়ে না। বাবু বৃত্তান্ত ছোট্টো, কোলকাতার প্রায় হারায়ে যাওয়া বাবুদের মতো কৃশকায়, গদ্য বেশ সুন্দর, শক্তিশালী নয়, শক্তিমত্তাটুকুর অভাব আছে, কিন্তু সুন্দর। জীবনের একটা দুইটা ঘটনা, মস্কোবাস, স্তালিনপ্রীতি ও আশাভঙ্গ, এর ওর কথা, এইসব উঠে এসছে, উঠে এসছে রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, চল্লিশের দশকের একটা দুইটা করে ঘটনা। ইন্দিরা গান্ধীকে মুখ সংযত রেখে ধুয়ে দেয়ার যে কীর্তি লেখকের, তাও বিস্ময়কর।
সব মিলায়ে, ভালো লাগছে, অস্বীকার করতে পারবো না। যদিও খিলান বা থাম নয়, বড়জোড় সুরকি হয়ে বেঁচে থাকবে এই বই বাংলা সাহিত্যের দেয়ালে। যেটা মোষ্টলি আকারের জন্যই।
এইখানে শুধু 'বাবু বৃত্তান্ত' দেখা যাচ্ছে। আমি যেইটা পড়লাম সেইটা 'বাবুবৃত্তান্ত ও প্রাসঙ্গিক' অর্থাৎ মূল বইয়ের সাথে কিছু প্রবন্ধ যুক্ত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো বেশ চমৎকার। খুব ভালো সমালোচনা করতে পারেতেন সমর সেন। রাজনীতিতে তিনি ঠিক 'সেইভাবে' সক্রিয় হতে পারেননি তবে তাঁর কবিতায়, তাঁর প্রবন্ধে বেশ রকমের সমালোচনা দেখা যায়। শুধু রাজনীতিই নয়, তাঁর শিল্প বোধ ছিল চমৎকার। সিনেমা নিয়ে যে একটি প্রবন্ধ দেয়া হয়েছে আমি শুধু তাই পড়েই চমৎকৃত। সত্যজিতের 'জন অরন্য' কতবার দেখেছি তার কোন হিসেব নেই। মনে আছে সিনেমার শেষে সুকুমারের বোনকে সোমনাথ যখন হোটেল রুমের দিকে নিয়ে যায় তখন সুকুমারের বোন ওরফে কণা ওরফে যূথিকা কি বলেছিলো? বলেছিল, "দাদা ট্যাক্সি চালাচ্ছে" সমর সেন প্রশ্ন করলেন, তবে যূথিকা এই পথে কেন যাচ্ছে? অবশ্য আমার কথা হল, যূথিকা না থাকলে সোমনাথের মতো Middle Man এর কি হতো? আমি একমত, সত্যজিৎ রায় বড্ড 'নির্মম' হয়েছেন এই সিনেমা করতে গিয়ে।
মূল যে গ্রন্থ, সেখানকার রাশিয়া গমনের ব্যাপারটা বেশ ইনটারেসটিং। আমার জানার ইচ্ছে ছিলো কবি সমর সেন কি করে ও কিভাবে অনুবাদক সমর সেন ও পরবর্তীতে সাংবাদিক সমর সেন হয়ে উঠলেন। এগুলো ছাড়াও বইটিতে উঠে এসেছে ত্রিশের দশক থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত লেখকের নানা অভিজ্ঞতা ও ভারতবর্ষের দেখা নানা বিষয়। বইটি সুখপাঠ্য। লেখার ধরনি বেশ ভালো। বইয়ের শেষে লেখকের কবিতাও দেয়া আছে। তিনি চমৎকার কবিতা লিখতেন। দশ বছর লিখেছেন। না ছাড়লেও পারতেন।