বই: আর কোনখানে
লেখক: লীলা মজুমদার
প্রকাশনী: মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ (ভারত)
ধরন: স্মৃতিকথা
পৃষ্ঠা: ১৯৬
মূল্য: ২৫০ রূপী
১.
সংবেদনশীল স্নিগ্ধতায় আটপৌরে যে গল্পগুলো জমে থাকে অতীতে, সেসকল গল্পগুলো আলাদা একটা মায়ার আবরনে আবৃত থাকে। অতীতের সুতোয় টান মেরে জীবন, সংস্কৃতি বা নিতান্তাই প্রকৃতির যে ভুলে যাওয়া রূপ - তা উঠে আসে লেখকদের স্মৃতিকথার পৃষ্ঠা জুড়ে। নানা রকম যতিচিহ্নের প্রয়োগে যেমন একটা লেখা দাঁড়ায়, ঠিক তেমনি ফেলে আসা দিনের নানা স্মৃতিকথার প্রয়োগেই একটা আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা হয়ে ওঠে সার্বজনীন মুগ্ধতার একক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই মুগ্ধতা বয়ে যায় নদীর মতো। লীলা মজুমদারের "আর কোনখানে" তেমনি একটি বই।
২.
লীলা মজুমদার। তিনি তার প্রথম আত্মজীবনী 'আর কোনখানে'-এর জন্য ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্র পুরস্কার পান। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মননের বিকাশের ক্ষেত্রে ঠাকুর পরিবারের মতোই আরও একটি পরিবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। রায়চৌধুরী পরিবার। কে নেই এই পরিবারে - সরদারঞ্জন, প্রমদারঞ্জন, উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, কুলদারঞ্জন, সুখলতা, সত্যজিৎ রায় - স্বমহিমায় উদ্ভাসিত এক একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র। লীলা মজুমদারও এই ঘরেরই একজন উজ্জ্বল তারকা।
"বনের খবর" বইয়ের লেখক প্রমদারঞ্জন রায় লীলা মজুমদারের পিতা। মাতা সুরমা দেবী। বিয়ের আগে লীলা মজুমদার ছিলেন লীলা রায়। বাবার চাকরিসূত্রে লীলা মজুমদারের ছোটবেলা কেটেছে শিলঙে। পড়াশুনাও সেখানে। লীলা মজুমদার যখন লীলা রায়, তখন থেকেই তার লেখালেখির শুরু। ছেলেবেলা শিলঙে, মধ্যবয়স কলকাতায় এবং তার পরে শান্তিনিকেতনে বাড়ি করে সেখানেই বাস করেন। এই মহীয়সী নারী, সৃষ্টিশীল-সরস লেখিকা বেঁচে ছিলেন প্রায় শত-বছর। জন্ম ১৯০৮ সালে। মৃত্য ৫ই এপ্রিল ২০০৭ এ।
"আর কোনখানে" লেখিকার শৈশব, পাহাড়ে বেড়ে ওঠা, তার কর্মজীবনের একাংশ, শান্তিনিকেতনের সময়গুলো এবং পরিশেষে অজস্র রথী-মহারথীদের কথার মেলা।
৩.
"হেথা নয়, হেথা নয়, আর কোন্খানে।"
বলাকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "সন্ধ্যারাগে ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা" এর উক্ত লাইনটি থেকেই যে "আর কোনখানে" নামকরন সেটা সহজেই বোঝা যায়। বইয়ের মাঝেও সেই আভাস রয়েছে। মণীন্দ্র গুপ্তের “অক্ষয় মালবেরি” যদি হয় ক্যালেইডোস্কোপ ঘোর তবে লীলা মজুমদারের "আর কোনখানে" ও সেই ঘোরের মতোই তীব্র। পার্থক্য এই যে "অক্ষয় মালবেরি" মেলানকলি বিউটি। সেখানে "আর কোনখানে" কালারফুল বিউটি। এখানে বিষন্নতা ফুলের সৌরভে ঢাকা পড়া অনেকটা।
লীলা মজুমদারের "আর কোনখানে" সেই রাবিট-হোল সেটা পড়লে পাঠক নিজেকে নির্ণয় করবেন "এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের" এলিস-রূপে। এই রাবিট-হোলে প্রবেশ মাত্রই পাঠক দেখতে পাবেন বেগুনি আকাশ, লতানে গোলাপের ফুলের ছড়ার সঙ্গে মাখামাখি হয়ে আছে মে-ফ্লাওয়ারের ঝোপ, বারান্দার ছাদের কড়ি থেকে ঝুলে থাকা সরলগাছের সুর ডালে অর্কিডের বাহার। ফিকে বেগুনি, হলদে সাদা, খয়েরি ফুটকি, ঘোর বাদমি ডোরা কাটা স্বর্গের সব ফুল। তার নীচে টব জুড়ে নানান জাতের জেরনিয়ম ফুল।
আছে শিলঙের অসাধারন পাহাড়ি লাইফ, প্রকৃতি ও বনের বর্ননা। বই থেকে কিছুটা তুলে দেই-
"যারা গভীর বনে কখনো যায় নি, তারা সেখানকার চেহারা কল্পনা করতে পারবে না। বাইরে তখনো বিকেলের মিষ্টি রোদ; পাকদন্ডী বেয়ে কিছু দূর ওঠা সরলগাছের গোড়ায় থোপা থোপা গোলাপী বনফুল, গাছের গায়ে হানিসাকল্ লতা, গন্ধে চারদিক ভুরভুর করছে। পথের ধারে পাথরের ছায়ায় গোছা গোছা সিলভার ফার্ণ, ওপরটা গাঢ় সবুজ, তলায় সাদা রঙ লাগা, হাতের উপর চেপে ধরলে ফার্ণের সাদা নকশা উঠে আসে।"
৪.
লীলা মজুমদারের "আর কোনখানে" সাহিত্যের মালঞ্চে অন্যতম সুরভিত ফুল হিসেবেই বিবেচিত হবে। যার সুঘ্রান নেয়া যে কোন পাঠকের জন্যেই নিজেকে দেয়া উপহার হিসেবেই গন্য হবে। মণীন্দ্র গুপ্তের "অক্ষয় মালবেরি" বহুবার পড়ে ভেবেছিলাম যে, এমন বই কি আর পাবো বা অক্ষয় মালবেরির মুখোমুখি দাঁড়াবার বই? "আর কোনখানে" সেই বই হবে নিশ্চিন্তি। যদিও দুটো বইয়ের মধ্যে কিছু মিল এবং তফাৎ দুটোই আছে। অক্ষয় মালবেরি যেমন শেষটায় যেয়ে কিছুটা ধূসর বা শুরুর প্রচন্ড ভালোলাগাটা মিইয়ে গেছে, লীলা মজুমদারের "আর কোনখানে" ও একি রকম হয়েছে। "আর কোনখানে" এর বেলা এই মিইয়ে যাওয়াটা অনেকটা লেখিকার ভাষার সরলতা বা সরস ভাবটা কমে যাওয়া। অনেকটা হয়তো বইয়ের ব্যাপ্তি কিছুটা বাড়াতে টেনে নেয়া। অথবা বয়স বেড়ে যাওয়া সময়ের গল্প সেই ভাষার যাদুতে কিছুটা অন্যরকম টোন দিয়েছে - যেটা বইয়ের অনেকাংশ জুড়ে যে মায়াবী রেশ - তা কিছুটা হালকা করেছে।
"অক্ষয় মালবেরি" আসলে খুব নির্জন। প্রকৃতির নির্জনতায় ভর করে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে এর পাঠককে। সেখানে লীলা মজুমদারের "আর কোনখানে" নির্জন না, বরং প্রকৃতির অকৃত্রিম রূপ এবং বর্ননায় মুখরিত এবং উৎসবময়। "অক্ষয় মালবেরি" যদি পাঠককে "আমন্ত্রন" জানায় তার রূপ-সুধা অনুভব করতে - তাহলে "আর কোনখানে" পাঠককে "নিমন্ত্রন" জানায় পাহাড়ী এক অঞ্চল ও জনপদের নানা সৌন্দর্যকে গিলে খেতে।
তবে শেষটায় যেটা বললাম সাবলীল ভঙ্গিমা এবং ভাষার যাদুতে কিছুটা টান পড়েছে অথবা পাঠকরে মনে হতে পারে কিছুটা ছন্নছাড়া ভাব - এসব কি "আর কোনখানে" বইয়ের সৌন্দর্য বা ভাব কমে কমিয়ে দেবে? পাঠকের চাওয়া আর না-পাওয়ার আখ্যান মিলাতে গেলে কি না-পাওয়ার আখ্যানটুকুই বড় হয়ে দেখা দেবে পাওয়ার তৃপ্তির থেকে? আমার বিশ্বাস না। কবি শেলির প্রসঙ্গে ব্রাউনিং কিছু অবিস্মরনীয় কথা লিখে গেছেন, যার বাংলা অনুবাদ এমন:-
"যাত্রাপথের শত বন্ধ্যা যোজনের মাঝে,
এক বিঘৎ ভূমি যেন তারার মতো জ্বলে।"
আমাদের গুমরোতে থাকা এই জীবন ও যাপনের মাঝে এমন এক বিঘৎ স্মৃতিগুলোই তো তারার মতো জ্বলে। এই জীবনে সেই সব স্মৃতিগুলোই তো ব্রিদিং স্পেসের মতো। প্রেম করতে হবে। জীবনরে আনন্দগুলো পেতে ফেলে আসা সেই সব স্মৃতির সাথে প্রেমই এই জীবন নামক ভূমিতে থিতু হতে সাহায্য করে। "আর কোনখানে" জুড়ে যে সকল মেহানীয় দিনগুলোর বর্ননা রয়েছে, যে মায়া রয়েছে, যে সিল্কের স্কার্ফের মতো আলতো লেপ্ট থেকে অনুভব রয়েছে - তা সেই তারার মতোই। জ্বলজ্বল করে। বইয়ের বাকি আক্ষেপটুকু সেখানে গৌন হয়ে দাঁড়ায়।
লীলা মজুমদারের "আর কোনখানে" নিঃসন্দেহে খুব গুরুত্বপূর্ন একটি বই। প্রায় এক শতক পিছিয়ে লেখা এই স্মৃতিকথা পাঠকের কাছে বিশুদ্ধ মুগ্ধতা হয়েই ধরা দেবে। শুধূ রায় পরিবারের কথাই না, পাশাপাশি উঠে এসেছে শান্তিনিকেতনের কথা, বইয়ে উপজীব্য হয়েছে বহু বড় বড় সাহিত্যিকদের ছোট ছোট খুনসুটির কথা। লীলা মজুমদারের সবচেয়ে বড় যাদুই তার ভাষা এবং কলমের সরস উপস্থিতি। "আর কোনখানে" এর কোনটা থেকেই বঞ্চিত তো নাই বরং আশীর্বাদপুষ্ট।
৫.
লীলা মজুমদারের "আর কোনখানে" মিত্র ও ঘোষ থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। তবে বই আকারে প্রকাশের আগে মাসিক "কথাসাহিত্য" পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৬৮ সালে প্রকাশের বছরই বইটি রবীন্দ্র-পুরষ্কারে সম্মানিত হয়। লীলা মজুমদারের শিলঙ থেকে কলকাতায় আসা এবং বিয়ের আগ পর্যন্তই সবিস্তারে লেখা আছে এই বইয়ে। "আর কোনখানে" স্মৃতিকথায় সাহিত্যের সাজ বাইরে থেকে পরানো নেই। এই সাজ অন্তরের অনেক গভীরের তলা থেকে উঁকি মারা স্মৃতির সাজ। শেষটায় বই থেকে কিছু অংশ তুলে ধরে শেষ করি:-
"যেই বনের মধ্যে ঢুকলাম অমনি চারদিক ছায়াময় হয়ে উঠল। বাইরের শব্দ সেখানে পৌঁছয় না, শুধু ঝোপের আড়ালে নিরন্তর ঝি ঝি পোকার ডাক, ঝির-ঝির জল পড়ার শব্দ আর পাইন বনের মধ্যে বাতাসের দীর্ঘশ্বাস। পাখিরা বাসায় ফিরছে, তাদের খানিক ডাকাডাকি আর ডানা ঝাপটানি। এখানকার সঙ্গে চেনা পৃথিবীর সাদৃশ্য নেই। এখানে সব রং মিলে গিয়ে অপূর্ব শ্যামল রূপ ধরেছে। কত রকম সবুজ, দিনের আলো যেটুকু পৌঁছাচ্ছে সেও সবুজ; সরলগাছের গায়ে ছাই মেশানো সবুজ পরগাছা ঝুলছে, তাদের ‘লাইকেন’ বলে, কত রকম চেহারা তাদের, হাত দিলে শক্ত কর্কশ। হঠাৎ নাকে আসে অপূর্ব সৌরভ, চারদিক চেয়ে দেখি, উঁচু ডালে অর্কিডের ফুল ফুটেছে। মোটা মোটা রসালো শিকড় বাতাসে মেলে ধরা, কোথাও সোনালী ফুলের ছড়া, তাদের বুকের ভেতরটা গাঢ় লাল, কোথাও যেন মোমের তৈরি সাদা ফুলে বেগনির ছটা। -- আপনা থেকেই আমাদের গলার স্বর নিচু হয়ে আসে, এখানে উঁচু গলায় কথা বলতে ইচ্ছা করে না।"
আপনা থেকেই পাঠকরে মনে তারার মতো জ্বলতে থাকবে একরাশ ভালোলাগা আর মুগ্ধতার রেশ "আর কোনখানে" এর স্পর্শে।