দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'লোকায়ত দর্শন' বইয়ে সুকুমার সেনকে 'ভাষাচার্য' বলে বিশেষায়িত করেছেন। বস্তুত, সুকুমার সেনকে বিশেষায়িত করতে গিয়ে সম্ভবত শব্দটাকেই বিশেষায়িত করা হয়েছে, কেননা সেন মশাই এমন এক পণ্ডিত, যাকে কোন বিশেষণ বা উপাধি দেওয়া বাহুল্য। তিনি নিজ নামে, নিজ গুণেই পরিচিত।
বাংলা ভাষায় সুকুমার সেনের পাণ্ডিত্যের কথা অনেকেই জানেন। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই নানা অর্জন তাঁর ঝুলিতে। সুনাম এবং স্বনামের সঙ্গে কর্মজীবন অতিবাহিত করেছেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের উপর রচনা করেছেন পাঁচ খণ্ডের গ্রন্থ। এর বাইরেও ভাষা এবং সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন, সেসবের মূল্যও অনেক।
সুকুমার সেন কিছু গল্প লিখেছিলেন। মজার ব্যপার হলো গল্পগুলো সবই যাকে বলে 'গোয়েন্দা গল্প'। প্রশ্ন হলো, এ আর এমন কি ব্যপার? যে কেউই লিখতে পারে। হ্যাঁ, যে কেউই লিখতে পারে, অনেকেই লিখেছেন। কিন্তু সুকুমার সেনের গোয়েন্দা চরিত্রটি অতি প্রাচীন, আবার অভিনব। সুকুমার সেনের গোয়েন্দা হলেন কালিদাস।
কোন কালিদাস?
'মেঘদূত' রচয়িতা মহাকবি কালিদাস।
মূলত সুকুমার সেন, কালিদাসকে গোয়েন্দা হিসেবে উপস্থাপন করে গল্প লিখলেও তা আমাদের পরিচিত মূলধারার 'ডিটেকটিভ' গল্প নয়। তিনি বর্তমান অর্থাৎ সুকুমার সেনের সময় থেকে অনেক পেছনে গিয়ে রহস্য কিংবা সমস্যা সমাধানমূলক গল্পের মাধ্যমে সেই সময় এবং সমাজ জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন।
সুকুমার সেনের পাঁচটি গল্পগ্রন্থের সংকলন এই বই। প্রতিটি বইয়ে আছে আবার অনেকগুলো গল্প। হিসেব করিনি, তবে গল্পের সংখ্যা চল্লিশের কাছাকাছি।
উজ্জয়িনিতে কালিদাসের বসবাস। বিক্রমাদিত্যের সভাকবি কালিদাস স্বনামে পরিচিত। কেবল কবি প্রতিভা না, সেই সঙ্গে তিনি প্রখর বুদ্ধির অধিকারী। সে বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি সমাজ ও রাজ্যের অনেক সমস্যার সমাধান করেন। কখনও কখনও রাজ্যের বাইরেও সে কাজে যান কালিদাস।
সেকালের উজ্জয়িনীতে খুন জখম ধর্ষণ হয় না। হলেও কদাচিৎ। কিন্তু কখনও কারও বউ চুরি হয়ে, লাউ চুরি হয়। মন্দিরের সেবায়েতের সামনে মৃত্যু হয় এক মেয়ের। আবার কখনও ছোট রানি, রাজকুমারের মৃত্যুর মতলব আঁটেন। সে সবের সমাধান কে করবেন? আবার কে, কালিদাস। ভূত প্রেতের উপদ্রব থেকে শুরু করে, মেয়েলী হিংসার সমাধান আছে কালিদাসের কাছে।
শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, এ কেমন গোয়েন্দা?
কিন্তু আসল ব্যপার হচ্ছে, আমাদের চিন্তা করতে হবে কালিদাসের সময়ের হিসেবে। সে সময়ে এসব সমস্যাই গুরুতর ছিল। মূলত সুকুমার সেন, কালিদাসের মাধ্যমে আমাদের নিয়ে গেছেন বিক্রমাদিত্যের উজ্জয়িনীতে এবং আমাদের দেখিয়েছেন সে সময়টাকে।
এ গল্পগুলোয় ফুটে উঠেছে সময়ের চিত্র। মানুষের মন। নানা উপকথা, কিছু পুরাণ, মেয়েলী ব্রতকথা ব্যবহারের মাধ্যমে বিচিত্র কিন্তু মনোজ্ঞ সব গল্প লিখেছেন। কালিদাসের সমস্যা সমাধানে যে বুদ্ধির ছাপ দেখা যায় তা মূলত সুকুমার সেনের প্রজ্ঞা।
যেমন কোন কোন গল্পে দেখা যায় কালিদাস রহস্যের সমাধান করেও দোষীকে শাস্তি দিলেন না, কিংবা রাজসভার বাইরে তা প্রকাশ হলো না। কেননা প্রকাশ হলে তা সমাজে বিশৃঙ্খলা করবে। কিংবা মেয়েলী সমস্যার সমাধানে স্ত্রী ইন্দুমতীর সাহায্য, কখনও তাঁকে দিয়েই তদন্তের প্রাথমিক কাজ করানো, আমাদের জানায় যে কেবল মাঠে তদন্ত করেই সমাধান হয় না, প্রয়োজন আরও সূক্ষ্ম বুদ্ধির।
সুকুমার সেনের এ গল্পগুলো আমাদের সাহিত্যে ও ইতিহাসের সম্পদ। মেয়েলী ব্রত থেকে শুরু করে তন্ত্র মন্ত্র, ধর্ম দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সুকুমার সেনের ভাষার ব্যবহার মনোমুগ্ধকর। সেকালের ভাষা অনুসরণ করে লেখা গল্পে যখন তিনি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন, তা শ্রুতিকটু লাগে না। প্রতিটি গল্প আপনাকে দেবে এক অমৃত রসের সন্ধান।
জয়তু সুকুমার সেন!
**পোস্ট পড়ে আবেগে এই বই কিনে পড়তে শুরু করবেন না। এই বই সকলের জন্য না। মূলত ভারতের দর্শন, ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে এবং জটিল ভাষায় অভ্যস্ত না হলে বই পড়ে বিষোদ্গার করতে পারে। সেটা ভালো হবে না।