বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক সুকুমার সেনের সুগভীর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি সর্বজনবিদিত। বিভিন্ন সময়ে তিনি রচনা করে গিয়েছেন বেশ কিছু গোয়েন্দা গল্প। আশ্চর্যের বিষয় তাঁর গোয়েন্দা চরিত্রটি হলেন মহাকবি কালিদাস। গল্পের সময়কাল তিনি ধরেছেন, খ্রিষ্টীয় প্রথম দু' শতাব্দী। সাধারণ লোককথায়, মেয়েলি ছড়াতে কালিদাসের বুদ্ধি-চাতুর্যের অনেক কাহিনি আমরা জানি। সুকুমার সেনের কথায়, "আগে যদি ডিটেকটিভ গল্পের চলন থাকত তবে আমাদের দেশে ভাল ডিটেকটিভ কাহিনি সেকাল থেকেই পাওয়া যেত।"
পাঠকের অগোচরে চলে-যাওয়া সুকুমার সেনের পাঁচটি গল্পগ্রন্থ সংকলিত করে প্রকাশিত হল 'গল্প সংগ্রহ'। রহস্যের পাশে প্রেক্ষিত হিসেবে পুরাণ-ইতিহাসের অভিনব উপস্থিতি গল্পগুলিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র উচ্চতা। সুকুমার সেনের গোয়েন্দা গল্প বিদেশি গোয়েন্দা গল্পের অনুসরণ করেনি। তাঁর গল্পে মিশে আছে আমাদের প্রাচীন দেশ-কাল-মাটির গন্ধ। লেখক স্বয়ং জানিয়েছেন এক জায়গায়, "সেকালে এখনকার New Scotland Yard, Surete বা Crime Squad-এর মতো কিছু ছিল না। সুতরাং আমার কালিদাসকে বিলিতি গল্পের ডিটেকটিভের সঙ্গে তুলনা করা অনুচিত।" বিদদ্ধ লেখকের সৃজনক্ষমতার অপরূপ স্বাক্ষর এই 'গল্প সংগ্রহ'।
সূচি: কালিদাস তার কালে - হারা মণি, চোরা বউ, শ্লোক-চুরি, হারা ধন, রাজসভায় ষড়যন্ত্র, ভূতের বাতাস, অভিচার, গুপ্তধন, কন্যাদায়, রাজকৌলীন যিনি সকল কাজের কাজি - অধ্বগে বদ্ধরাগা, জামাই জঞ্জাল, ইঁদারা-চুরি, চোর-চক্রান্ত, উদ্ভট চুরি, রাজদ্বারে, পলাতক, ভৈরব-চক্রান্ত, সরেজমিনে, যোগপট্টাবদান, নতুন পুরোনো সত্য মিথ্যা কে করেছে ভাগ - খুড়োমি, পাষাণ-পিহিত, কুম্ভীরক, অপবাদ, তস্কর-মস্করী, ব্রহ্মডাঙ্গা, সাপত্ন্য, নীলপাটোয়ার, জ্যাঠামি, তিথিদুষ্ট, হাটফেরতা যেখানে পড়বে সেথায় দেখবে আলো - ইন্দুমতীর সঙ্কট, প্রাণের ভয়ে, মানের দায়ে, কারবারের ফের, মনাবী, কনে-হরণ আছে তো হাতখানি - বধূকণ্টকী, আঁতুড়-বদল, মধ্যবর্তিনী, শাসনরীতি, দেওয়ালগিরি, ঘাই হরিণী, অন্ধ অপ্রাণের রোষে, মেয়ে ধরা, "মাতা বিত্তং", ভালবাসার ঘায়ে, দেবতার দায়ে, খণ্ডপানা
সুকুমার সেন (১৬ জানুয়ারি ১৯০১ - ৩ মার্চ ১৯৯২) ছিলেন একজন ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্য বিশারদ। বৈদিক ও ধ্রুপদি সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, বাংলা, আবেস্তা ও প্রাচীন পারসিক ভাষায় তাঁর বিশেষ বুৎপত্তি ছিল। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ও পুরাণতত্ত্ব আলোচনাতেও তিনি তাঁর বৈদগ্ধের পরিচয় রেখেছিলেন।
ভাষার ইতিবৃত্ত (বাংলা ভাষাতত্ত্বের একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা) Women's Dialect in Bengali (বাংলা মেয়েলি ভাষা নিয়ে গবেষণামূলক রচনা) বাংলা স্থাননাম (বাংলা স্থাননাম নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ) রামকথার প্রাক-ইতিহাস (রামায়ণ-সংক্রান্ত তুলনামূলক পুরাণতাত্ত্বিক আলোচনা) ভারত-কথার গ্রন্থিমোচন (মহাভারত-সংক্রান্ত তুলনামূলক পুরাণতাত্ত্বিক আলোচনা) ব্রজবুলি সাহিত্যের ইতিহাস বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (৫ট খণ্ডে, সুকুমার সেনের সবচেয়ে বিখ্যাত বই, বাংলা সাহিত্যের একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক ইতিহাস) বাঙ্গালা সাহিত্যের কথা বাঙ্গালা সাহিত্যে গদ্য বঙ্গভূমিকা (বাংলার আদি-ইতিহাস সংক্রান্ত গ্রন্থ) বাংলা ইসলামি সাহিত্য দিনের পরে দিন যে গেল ( আত্মজীবনীমূলক রচনা )
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'লোকায়ত দর্শন' বইয়ে সুকুমার সেনকে 'ভাষাচার্য' বলে বিশেষায়িত করেছেন। বস্তুত, সুকুমার সেনকে বিশেষায়িত করতে গিয়ে সম্ভবত শব্দটাকেই বিশেষায়িত করা হয়েছে, কেননা সেন মশাই এমন এক পণ্ডিত, যাকে কোন বিশেষণ বা উপাধি দেওয়া বাহুল্য। তিনি নিজ নামে, নিজ গুণেই পরিচিত।
বাংলা ভাষায় সুকুমার সেনের পাণ্ডিত্যের কথা অনেকেই জানেন। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই নানা অর্জন তাঁর ঝুলিতে। সুনাম এবং স্বনামের সঙ্গে কর্মজীবন অতিবাহিত করেছেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের উপর রচনা করেছেন পাঁচ খণ্ডের গ্রন্থ। এর বাইরেও ভাষা এবং সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন, সেসবের মূল্যও অনেক।
সুকুমার সেন কিছু গল্প লিখেছিলেন। মজার ব্যপার হলো গল্পগুলো সবই যাকে বলে 'গোয়েন্দা গল্প'। প্রশ্ন হলো, এ আর এমন কি ব্যপার? যে কেউই লিখতে পারে। হ্যাঁ, যে কেউই লিখতে পারে, অনেকেই লিখেছেন। কিন্তু সুকুমার সেনের গোয়েন্দা চরিত্রটি অতি প্রাচীন, আবার অভিনব। সুকুমার সেনের গোয়েন্দা হলেন কালিদাস।
কোন কালিদাস?
'মেঘদূত' রচয়িতা মহাকবি কালিদাস।
মূলত সুকুমার সেন, কালিদাসকে গোয়েন্দা হিসেবে উপস্থাপন করে গল্প লিখলেও তা আমাদের পরিচিত মূলধারার 'ডিটেকটিভ' গল্প নয়। তিনি বর্তমান অর্থাৎ সুকুমার সেনের সময় থেকে অনেক পেছনে গিয়ে রহস্য কিংবা সমস্যা সমাধানমূলক গল্পের মাধ্যমে সেই সময় এবং সমাজ জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন।
সুকুমার সেনের পাঁচটি গল্পগ্রন্থের সংকলন এই বই। প্রতিটি বইয়ে আছে আবার অনেকগুলো গল্প। হিসেব করিনি, তবে গল্পের সংখ্যা চল্লিশের কাছাকাছি।
উজ্জয়িনিতে কালিদাসের বসবাস। বিক্রমাদিত্যের সভাকবি কালিদাস স্বনামে পরিচিত। কেবল কবি প্রতিভা না, সেই সঙ্গে তিনি প্রখর বুদ্ধির অধিকারী। সে বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি সমাজ ও রাজ্যের অনেক সমস্যার সমাধান করেন। কখনও কখনও রাজ্যের বাইরেও সে কাজে যান কালিদাস।
সেকালের উজ্জয়িনীতে খুন জখম ধর্ষণ হয় না। হলেও কদাচিৎ। কিন্তু কখনও কারও বউ চুরি হয়ে, লাউ চুরি হয়। মন্দিরের সেবায়েতের সামনে মৃত্যু হয় এক মেয়ের। আবার কখনও ছোট রানি, রাজকুমারের মৃত্যুর মতলব আঁটেন। সে সবের সমাধান কে করবেন? আবার কে, কালিদাস। ভূত প্রেতের উপদ্রব থেকে শুরু করে, মেয়েলী হিংসার সমাধান আছে কালিদাসের কাছে।
শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, এ কেমন গোয়েন্দা?
কিন্তু আসল ব্যপার হচ্ছে, আমাদের চিন্তা করতে হবে কালিদাসের সময়ের হিসেবে। সে সময়ে এসব সমস্যাই গুরুতর ছিল। মূলত সুকুমার সেন, কালিদাসের মাধ্যমে আমাদের নিয়ে গেছেন বিক্রমাদিত্যের উজ্জয়িনীতে এবং আমাদের দেখিয়েছেন সে সময়টাকে।
এ গল্পগুলোয় ফুটে উঠেছে সময়ের চিত্র। মানুষের মন। নানা উপকথা, কিছু পুরাণ, মেয়েলী ব্রতকথা ব্যবহারের মাধ্যমে বিচিত্র কিন্তু মনোজ্ঞ সব গল্প লিখেছেন। কালিদাসের সমস্যা সমাধানে যে বুদ্ধির ছাপ দেখা যায় তা মূলত সুকুমার সেনের প্রজ্ঞা।
যেমন কোন কোন গল্পে দেখা যায় কালিদাস রহস্যের সমাধান করেও দোষীকে শাস্তি দিলেন না, কিংবা রাজসভার বাইরে তা প্রকাশ হলো না। কেননা প্রকাশ হলে তা সমাজে বিশৃঙ্খলা করবে। কিংবা মেয়েলী সমস্যার সমাধানে স্ত্রী ইন্দুমতীর সাহায্য, কখনও তাঁকে দিয়েই তদন্তের প্রাথমিক কাজ করানো, আমাদের জানায় যে কেবল মাঠে তদন্ত করেই সমাধান হয় না, প্রয়োজন আরও সূক্ষ্ম বুদ্ধির।
সুকুমার সেনের এ গল্পগুলো আমাদের সাহিত্যে ও ইতিহাসের সম্পদ। মেয়েলী ব্রত থেকে শুরু করে তন্ত্র মন্ত্র, ধর্ম দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সুকুমার সেনের ভাষার ব্যবহার মনোমুগ্ধকর। সেকালের ভাষা অনুসরণ করে লেখা গল্পে যখন তিনি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন, তা শ্রুতিকটু লাগে না। প্রতিটি গল্প আপনাকে দেবে এক অমৃত রসের সন্ধান।
জয়তু সুকুমার সেন!
**পোস্ট পড়ে আবেগে এই বই কিনে পড়তে শুরু করবেন না। এই বই সকলের জন্য না। মূলত ভারতের দর্শন, ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে এবং জটিল ভাষায় অভ্যস্ত না হলে বই পড়ে বিষোদ্গার করতে পারে। সেটা ভালো হবে না।
পুরানতত্ত্ব আলোচনাতে তাঁর বৈদগ্ধের পরিচয় পাওয়া যায়, তবে তিনি একজন ভাষাতাত্ত্বিক, এছাড়াও তিনি একজন সাহিত্য বিশারদ। এতোদিন তাঁকে চিনি ভাষাতত্ত্ববিদ হিসেবেই। তবে তিনি চমৎকার একজন গল্পকার ও বটে।
তাঁর পাঁচ টি গল্পগ্রন্থ সংকলিত করে প্রকাশিত এই 'গল্প সংগ্রহ '। পাঁচ টি গল্পগ্রন্থে মোট পঞ্চাশটি গল্প আছে আর সব গুলো গল্পই গোয়েন্দা গল্প। আর আশ্চর্য এক বিষয় প্রতিটা গল্পের প্রধান চরিত্র মানে গোয়েন্দা কালিদাস, মানে সেই কালিদাস যিনি উজ্জয়িনী থাকেন, কবি কালিদাস, যিনি উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রমাদিত্যের সভাকবি।
গোয়েন্দা গল্প যেমন হয়, কবি সুকুমার সেন গোয়েন্দা গল্পই লিখেছেন এবং চমৎকার ভাবে এখানে সেই কবি কালিদাস কে গোয়েন্দা চরিত্রে দেখিয়েছেন সাথে সেই সময়ের উজ্জয়িনী ও তার আশেপাশের এলাকার সমাজ ও জীবনচিত্র এখানে তুলে এনেছেন সুন্দর ভাবে। বিক্রমাদিত্যের রাজ সভা ও রাজ্যের হালচাল এর চমৎকার এক বর্ণনা যা এই সময়ে বসে সেই সময়টাকে দেখা।
এই গল্প সংকলন টা পড়ার আগে পর্যন্ত সুকুমার সেন এর নাম দেখলেই চোখের সামনে ভেসে উঠতো " বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাস " বইটা। খটমটে এক বইয়ের খটমটে এক লেখক বলেই এতোদিন জানতাম। কিন্তু এতো চমৎকার গল্প লেখেন তা এই গল্পগুলো না পড়লে জানাই হতো না। প্রতিটা গল্প বড্ড বেশী স্নিগ্ধ সুন্দর।