মনজুর রশীদ খান এ বইয়ে তাঁর সৈনিক জীবনের ঘটনাপরম্পরা তুলে ধরেছেন সরস ঘরোয়া ভঙ্গিতে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বাঙালি ক্যাডেটদের কঠোর জীবন, একাত্তরের ২৫ মার্চের আগে ও পরে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বাঙালি সেনাদের অবিশ্বাসের চোখে দেখা, তাঁদের বিরুদ্ধে গৃহীত হয়রানিমূলক নানা ব্যবস্থা, পাকিস্তানে আড়াই বছরের বন্দিজীবন শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে তাঁর যোগদান, ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনীতে সৃষ্ট গোলযোগে উচ্ছৃঙ্খল সেনাসদস্যদের নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকা, প্রেসিডেন্ট জিয়ার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান-পূর্ব এবং পরবর্তীকালের কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্যে সমৃদ্ধ এ বই। পাশাপাশি জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনামল, সামরিক সচিব হিসেবে তাঁর দেখা রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক নানা ঘটনা এবং নব্বুইয়ের এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন, তাঁর পদত্যাগ, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের শাসনাধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন এবং পরবর্তীকালে উদ্ভূত জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রায় অনুপুঙ্খ বিবরণও লেখক তুলে ধরেছেন। এ বই বাংলাদেশের দীর্ঘ এক কালপর্বের সামরিক-রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে ।
খুবই ভালো একটা বই। নিজের কর্মজীবনে খুব কাছ থেকে দেখা নানা ঘটনা লেখক উল্লেখ করেছেন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করেছেন। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে বন্দী থাকা মনজুর রশীদ পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হন এবং '৭৫, '৮১, '৯০ সবই দেখেছেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু, জিয়াউর রহমান কারো ক্ষেত্রেই কোন আবেগী ব্যাখ্যায় তিনি যাননি। কেবল ঘটনা বলেছেন। বইয়ে লিখেছেন, এরশাদের সামরিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অনিচ্ছায় এবং লেখাতেও এরশাদের প্রতি কোন পক্ষপাত দেখা যায়নি। সমালোচনা যা করেছেন তাও ব্যক্তি এরশাদের না বরং তার কাজের।
মনজুর রশিদ খানের এই বই নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সীমান্তে কর্মরত থাকার কারণে তিনি নানা অনিয়ম দেখেছেন এবং সেসব লিখেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে পোস্টেড অবস্থায় সেখানকার অবস্থা, সেটলারদের সাথে পাহাড়িদের দূরত্বের কথা এবং সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এভাবে আর কেউ লিখেছেন কিনা জানি না। এ ছাড়াও এরশাদের শেষ দিনগুলো এবং সাহাবুদ্দিন আহমদের সময়কার ঘটনাবলী জানার জন্য এই বই চমৎকার একটা মাধ্যম।
গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর রাত দশটায় আচমকা বিটিভিতে রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ নিজের পদত্যাগ এলান করেন। এই স্বৈরশাসকের পদত্যাগের পর দেশের পরিস্থিতি কেমন দাঁড়ায় তা নিয়ে রাষ্ট্রপতির তৎকালীন সামরিক সচিব মেজর জেনারেল (অব.) মনজুর রশীদ খান লিখেছেন,
"সামগ্রিক চিত্রটা ছিল ভয়াবহ রকমের অরাজক ও বিশৃঙ্খলাময়। হাজার হাজার লোক রাস্তায়। কিছু ঘরবাড়ি, দোকানপাট হামলা ও ভাঙচুরের শিকার হয়। ট্রাক ও মোটরসাইকেলে করে রাজনৈতিক কর্মীরা ঘুরতে থাকেন এবং খুঁজতে থাকেন মন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির নেতাদের। পুলিশের এক রিপোর্ট থেকে আভাস পাওয়া গেল, প্রেসিডেন্ট ও তাঁর মন্ত্রীরা যাতে বিমানে পালাতে না পারেন, তা নিশ্চিত করার জন্য রাস্তায় অবরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে । পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ডিএমপির পুলিশ কমিশনার শাহজাহানকে টেলিফোন করি ৷ তিনিও ভয়াবহ সব খবরই জানিয়ে আমাকে আরও বললেন, সেনাবাহিনীর সাহায্য ছাড়া কিছুই করা যাবে না। পরিস্থিতি দ্রুত মারাত্মক অবস্থার দিকে মোড় নিচ্ছে । তিনিও আমাকে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করলেন। সেনাবাহিনী আবারও মোতায়েন করা হচ্ছে এবং শিগগিরই তারা অবস্থান নিতে যাচ্ছে বলে আমি তাঁকে আশ্বস্ত করি। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময়ই সিজিএস জেনারেল সালাম পুলিশ কন্ট্রোল রুমে গিয়ে পৌছান। আমি পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর সঙ্গেও কথা বললাম। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে আমাকে বললেন, দিনের আলোয় রাজপথে জনতার সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি তাদের উত্তেজনাও বাড়বে এবং বাড়বে তাদের ধ্বংসাত্মক প্রবণতাও । আমাকে অনুরোধের সুরে তিনি বললেন, ‘এসব বন্ধ করতে সত্বর কিছু একটা করুন ।
লক্ষ করছিলাম, যতই সময় যাচ্ছে, উৎসবমুখর জনতা ততই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠছে। আমি আরও চিন্তিত হয়ে পড়লাম এ কথা ভেবে যে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা রাজনৈতিক নেতাদের হাত থেকে অন্তর্ঘাতমূলক কাজে প্ররোচনাদাতা শ্রেণীর হাতে চলে যায়। রাজনৈতিক কর্মীরা দুষ্কৃতকারীদের হাতের পুতুল হয়ে যায় ৷ সুযোগসন্ধানী, দাঙ্গা সৃষ্টিকারী ও লুটেরাদের প্রতিপত্তি বেড়ে যায়। "
হরহামেশাই নিজের ওয়াদা থেকে ফেরত আসার জন্য এরশাদ মশহুর ছিলেন। তার এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মনজুর রশীদ খান জানতেন। পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও নয়া রাষ্ট্রপতি শপথের আগপর্যন্ত এরশাদই রাষ্ট্রপ্রধান। মনজুর রশীদ লক্ষ করলেন, এরশাদ আবারও নিজের অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছেন। কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছেন। প্রয়োজনে সামরিক আইন জারি করতে সেনাবাহিনীকে তিনি প্ররোচিত করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জে. নুরুদ্দীন ও প্রভাবশালী কর্মকর্তা মে. জে. সালামের তাতে সায় নেই। তখন এরশাদ সন্ধান করছেন তার অনুগত সেনাকর্মকর্তাদের। এদের মধ্যে প্রধান হলেন সাভারে অবস্থিত নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি। এরশাদের এসব কৌশল নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছিলে সেনাপ্রধান নুরুদ্দীনের গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতির কারণে। তিনি সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা নিতে উৎসাহী ছিলেন না।
এরশাদের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণ করেন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তিনি দশ মাসের মাথায় দেশের ইতিহাসে অন্যতম সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে জয়ী দল বিএনপির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ও নিজের জগৎ বিচারবিভাগে ফিরে যান। মনজুর রশীদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সততার কথা শতমুখে লিখেছেন। সাহাবুদ্দীন আহমদ যতদিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, ততদিন তার কোনো আত্মীয়স্বজনকে পারতপক্ষে নিজের বাড়িতে আসতে মানা করে দেন। রাষ্ট্রের সুবিধা যতটুকু না নিলেই নয়, ঠিক ততটুকুই নিয়েছেন। ইদানীং যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের সঙ্গে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের কোনো মিল পাবেন না৷
এরশাদের পতন রাতারাতি হয়নি। ২০২৪ সালের মতো বিস্তৃত আকারে না হলেও স্বৈরাচার এরশাদকে হটাতে অনেকেই আত্মবলিদান দিয়েছিলেন। শহিদ নূর হোসেন ও ডাক্তার মিলনের নাম এখনো আমাদের হৃদয়পটে অক্ষয়।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীনের বড়ো কোনো ম্যান্ডেট ছিল না। তিনি ছিলেন একান্তই নির্বাচনমুখী। স্বৈরাচার এরশাদ ও তার দলীয় নেতা-কর্মীদের দুর্নীতি তদন্তে আমিনুল হককে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এর বাইরে প্রেস আ্যন্ড পাবলিকেশন্স আইন রদসহ কিছু সংস্কার তার হাত ধরেই হয়েছে। কিন্তু আমূল সংস্কার করা যায়নি। একটি গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার গঠনের সুযোগ পেয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি কীভাবে আবারও পুরোনো রাজনৈতিক বৃত্তেই ফিরে যায়, সেই প্রসঙ্গে মনজুর রশীদ খান লিখেছেন,
" ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ামাত্রই বিএনপির নেতাদের মধ্যে একধরনের অতি আস্থাশীল দাম্ভিক ভাব লক্ষণীয় হয়ে ওঠে । নিজেদের রাজনৈতিক সমর্থন ও প্রশাসনিক দক্ষতা সম্বন্ধে নবনিযুক্ত মন্ত্রীরা খুবই নিশ্চিত ছিলেন । তাঁদের আচার-আচরণ, কাজকর্ম ও কথাবার্তায় বিরোধী দলগুলোর প্রতি, বিশেষত আওয়ামী লীগের প্রতি অতিমাত্রার বিদ্বেষভাবই প্রকাশ পেতে থাকে। ক্ষমতা লাভের গর্বে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সহযোগিতা ও সমঝোতাকে তাঁরা নিষ্প্রয়োজনীয় মনে করেন। এমনকি প্রেসিডেনশিয়াল সরকারপদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও তাঁরা অস্থায়ী প্রেসিডেন্টকে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখতে থাকেন। "
বাংলাদেশে সংস্কার কতটা জরুরি তা নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতির চালচিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যায়।
তিন দশকের বেশি সময় পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন মনজুর রশীদ। প্রেষণে বঙ্গবন্ধুর আমলে বিডিআরে (বর্তমান বিজিবি) নিযুক্ত ছিলেন। চোরাকারবারের রকমফের নিয়ে দীর্ঘ বর্ণনা পাওয়া যায়।
সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা বনাম পাকিস্তান ফেরত কর্মকতাদের যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, তা দেশের জন্য কল্যাণকর হয়নি৷ মনজুর রশীদ নিজে পাকিস্তান ফেরত ছিলেন। তাই তার বয়ানে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের কীর্তি খুব একটা ইতিবাচক নয়।
প্রায় সাড়ে তিন শ পা��ার বইটির প্রকাশক প্রথমা। মনজুর রশীদের গদ্য বেশ সুন্দর। ছোটো ছোটো সরল বাক্যে লিখেছেন। পড়তে ভালো লাগে। সেনাবাহিনী নিয়ে ধারণা পাওয়া যায়। আর, বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এরশাদ ও তার পতনের পরবর্তী অংশ।
সাদামাটা স্মৃতিচারণ। এরশাদের সামরিক সচিবের দায়িত্বকালের অংশটুকু মুখ্য। একটা ব্যাপার চোখে পড়েছে, লেখক একটি স্বাধীন দেশের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্তা হওয়ার পরও অতি নতজানু ভাষায় যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিযাবেথ ও রাজপরিবারের সাথে সাক্ষাতের কথা স্মরণ করেছেন। পরপর দুটি উপনিবেশ থেকে বেরিয়ে আসা জাতির একজন জেনারেল যদি ভেতরে ভেতরে এমন ইঙ্গন্যুব্জ হন, তাহলে বাকিদের কাছ থেকে আত্মসম্মান আশা করাও কঠিন। আশা করি ভবিষ্যতের বাংলাদেশি জেনারেলদের স্মৃতিচারণে আত্মসম্মানজ্ঞানের ছাপ আরো স্পষ্ট হবে।
লেখকের লেখার ধরন খুব একটা ভালোনা... অনেক কিছুতেই নিজের মাথা বাঁচায়ে লেখার প্রবণতা লক্ষ করা যায়... অবশ্য বাংলাদেশে বসে রাজনীতি-সম্পর্কিত দুই-চার লাইন লিখতে এইটুকু করতেই হয়। পাকিস্তান আমলের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বেশ পাঠযোগ্য। তাছাড়া অন্যান্য ব্যাপারেও ওনার অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে এরশাদের আশেপাশে, পড়ে অনেক কিছুই জানা গেলো। আবারো: লেখার ধরণ বেশ বুমার-মার্কা; কাজেই 'এক চিমটি লবণ' সহকারে পড়া উচিত।