'তোমাকে আজ সিক দেখাচ্ছে।' 'কেন বলুন তো?' 'তা তো জানি না,' ভিজিলেন্সের ফাইলটা নিয়ে বড়সাহেবের ঘরের দিকে ওঠার উপক্রম করে সান্যালদা হাসলেন। রানার মনে হল, ওঁর কি আর একটা দাঁত পড়ল, নাকি... তা কোথা থেকে উড়ে এসে ঠোঁটের এমন একটা ঠোক্কর মেরেই তো সঙ্গে সঙ্গে ডানা খুলতে দেওয়া যায় না, রানা তাই তাড়াতাড়ি কথা বাড়াল, 'কই সে রকম কিছু তো ফিল করছি না সান্যালদা, এক সেই পেটের ব্যথাটা-' 'না-না। সে তো জানি।'
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় (Sandipan Chattopadhyay) (২৫ অক্টোবর ১৯৩৩ - ১২ ডিসেম্বর ২০০৫) বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বাঙালী সাহিত্যিক। পশ্চিমবঙ্গের হাংরি আন্দোলনের সাথে ছিলেন শুরু থেকে, যদিও পরে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর বিনয় মজুমদারের মত তিনিও সরে আসেন সেই আন্দোলন থেকে।
লিখেছেন একুশটি উপন্যাস, ষাটের অধিক গল্প, অসংখ্য নিবন্ধ। যুক্ত ছিলেন দৈনিক আজকালের সাথে, দৈনিকটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে। বাংলা সাহিত্যের 'আভাঁ-গার্দ' লেখকদের মাঝে অন্যতম তিনি। তার উল্লেখযোগ্য রচনাগুলি হল ক্রীতদাস ক্রীতদাসী (১৯৬১), সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী ও অন্যান্য গল্প (১৯৬৯), এখন আমার কোনো অসুখ নেই (১৯৭৭), হিরোশিমা মাই লাভ (১৯৮৯), কলকাতার দিনরাত্রি (১৯৯৬) ইত্যাদি। তিনি বঙ্কিম পুরস্কার ও সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের পুরস্কার জগত্তারিণী স্বর্ণপদকও লাভ করেছিলেন।
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের লেখাকে বলা হয় মেদহীন ও ভাবালুতা বর্জিত, তাঁর গদ্য কখনও অলংকারে আচ্ছন্ন হয় না । স্বাধীনতা উত্তর ভারতবর্ষে যে ক'জন সচেতন গদ্যকারের আবির্ভাব হয়েছে, সন্দীপন তাদের মধ্যে অন্যতম। রুক্ষ গদ্য শৈলী, মেপে মেপে লেখা আর শব্দ ভাণ্ডার থেকে ঠিক যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু নেওয়া ওঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সন্দীপনের লেখার সরলতা শুধুমাত্র ভাষাগত নয়, বরং তা চিন্তাধারাতেও প্রতিফলিত হয়। আর এই সরলতা আবার কখনো কখনো জটিল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে, কাহিনীর সরলতা এবং জীবনঘনিষ্ঠতা পাঠককে চরিত্রগুলোর খুব কাছাকাছি টেনে আনে, পাঠক সেই চরিত্রে নিজেকে দেখতে পায়। তখনি জটিলতা সৃষ্টি হয়। এই গদ্য যেন মধ্যবিত্ত জীবনের এক নিয়মিত অথচ জটিল চিত্র আঁকে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সন্দীপনের লেখা কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শে আটকে থাকে না। বরং তিনি সমাজের নানা স্তরের অন্তর্দ্বন্দ্ব, ব্যর্থতা এবং মানুষের নিত্যদিনের লড়াইকে নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর লেখায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের উপস্থিতি থাকলেও, সেটি ঠিক রাজনীতি নয় বরং সাধারণ মধ্যবিত্ত ছাপোষা মানুষের জীবনের রাজনীতির প্রভাব মাত্র, যা চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থার পটভূমি হিসেবে কাজ করে।
'আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি' উপন্যাসের ভঙ্গিতে রচিত হলেও ঠিক উপন্যাস হয়নি। তবে তাতে কিছু যায় আসে না কারণ শক্তিশালী গদ্য শৈলী, বিষয়বস্তু আর বর্ণনা কৌশল যথেষ্ট এই রচনার জন্য। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রানা, রানা ঘোষ। আর রানার জীবনের কয়েকটি দিক শুধু উঠে এসেছে এই গল্পে। তার অফিস, অফিসের কলিগদের সাথে সম্পর্ক, কাজ পাওয়ার বিভিন্ন কৌশল যেমন আছে একদিকে অপর দিকে আছে কলিগদের অতীতের ছোঁয়া। যেই অতীতে আছে চারু মজুমদার আর চীনের চেয়ারম্যান কথা, আর আছে রানার ব্যক্তি জীবনের টুকটাক কথা। গল্পের আরেক দিকে আছে জয়ন্তীর কথা। জয়ন্তীর গল্পই স্বতন্ত্র আরেকটা উপন্যাস হতে পারত, মাঝ পথে শুরু হওয়ার জয়ন্তীর গল্প পড়ার সময় মনে হয়েছে হয়ত জয়ন্তীই এই পুরো আখ্যানের নায়ক। রানা আর জয়ন্তীর সম্পর্ক, ভালোবাসা আর জয়ন্তীর অভিমান আর তৃতীয় ব্যক্তির যে ত্রিকোণ সম্পর্ক, তা বেশ শক্তিশালী একটা গল্প মনে হয়েছে। আর শেষের দিকে রানার জীবনের আরও একটা মানুষের উপস্থিতি তার উপর নির্ভরশীলতার দিকটা ইন্টারেস্টিং। রানার মাঝে জয়ন্তীর প্রতিবিম্ব দেখতে পেয়েছি কিছুটা।
তবে, এই লেখার নাম করণের সার্থকতা আমি ঠিক ধরতে পারিনি। হতে পারে লেখক নকশাল আন্দোলন কে ঠিক সামনে আনতে চায়নি, এজন্য আরব গেরিলা শব্দ ব্যবহার করেছেন। ঠিক জানিনা আমি! সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের 'আমি ও বনবিহারী' পড়েছিলাম বছর খানের আগে, ঐ লেখা হজম করা কঠিন মনে হয়েছিল। সেই তুলনায় এটা সহজ ছিল।
"রাখতে রাখতে রাখতে রাখতে একদিন মাটির ঘড়াও পুকুরঘাটের শানে একটা গর্ত তৈরি করে। প্রেমও সেরকম আর কী। থাকতে থাকতে থাকতে থাকতে অমনি একটা গর্ত তৈরি হবে একদিন। ঘড়াটাও আর নড়বড় করবে না।"