১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি সরল ছিল না। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান ছিল সংঘাতময়। অভ্যন্তরীণ ঘটনাবলিরও ছিল নানামুখী স্রোত। মুক্তিযুদ্ধের তিনজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর অন্তরঙ্গ এই কথোপকথন উম্মোচন করেছে সে সময়ের নানা অজানা তথ্য। গভীর বিশ্লেষণে জানা তথ্যে যুক্ত করেছে নতুনতর মাত্রা। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই।
মঈদুল হাসান একজন লেখক এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। তিনি ১৯৩৬ সালের ২৯ জুলাই, বাংলা ১৪ শ্রাবণ, ১৩৪৩ সালে বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন; সেখানেই শৈশব কাটে তার।
পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৯৫৬-৬০)। শেষ বর্ষের ছাত্র অবস্থায় তিনি সেই সময়ের বহু প্রচারিত দৈনিক ইত্তেফাক-এ সম্পাদকীয় লেখা শুরু করেন। এতে করে তিনি পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গতিধারা পর্যবেক্ষণ করেন গভীরভাবে।
একসময়ে তিনি সাংবাদিকতা ছেড়ে দেন। ১৯৭১ সালে তিনি প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পালন করেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে ভারতের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছিল তাঁর অন্যতম দায়িত্ব।
❝ He who doesn’t understand (read know) history is doomed to repeat it. ❞
প্রতিটা যুদ্ধের কিছু অংশ আমাদের সামনে আসে। বাকি যত অংশ আমাদের চোখের বাইরে চলে যায় তা নিসঃন্দেহে আমাদের জানা উচিত। ইতিহাস থেকে পূর্নভাবে জ্ঞান না পেলে ভবিষ্যতের যাত্রা কখনো নির্ভুল হতে পারে না।
যদিও বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের অন্ধকার, অচেনা দিক গুলোতে খুব সামান্যই সামনে আনা হয়েছে তারপরও তা তুলনামূলক ভাবে অনেক। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য এই ধরনের কাজ আরো বেশি করা উচিত।
বইটা মুক্তিযুদ্ধে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ তিনজন ব্যক্তির কথোপকথন। সাধারণত মুক্তিযুদ্ধের আলোচনায় যে বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকে কিংবা এড়িয়ে যাওয়া হয় কিংবা ঢেকে রাখা হয় সেসব বিষয় আলোচিত হয়েছে। সেজন্য বইটির ঐতিহাসিক মূল্য অনেক।
তাদের আলাপে ঘুরেফিরে বার বার এসেছে মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক দল বিশেষত আওয়ামী লীগের অদূরদর্শীতা আর সমন্বয়হীনতা। সামরিক বিভাগের হ-য-ব-র-লতা, অফিসারদের অন্তঃদন্দ্ব, সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর অযোগ্যতা ও নানামুখী ভুল সিদ্ধান্ত ইত্যাদি। দেখা যায় বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দিকগুলো কতটা ধ্বজভঙ্গ ছিল। আরেকটা অপ্রিয় সত্য, যেটা পপুলার কালচারে আলোচিত তো হয়ই না, বরঞ্চ উলটোভাবে উপস্থাপন করা হয়, যুদ্ধে ভারতের সম্পৃক্ততা। এখানে দেখা যায়, অপ্রিয় হলেও, যুদ্ধের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ভারত কীভাবে যুক্ত। বোঝা যায় ভারতের ভূমিকা কতটা বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী।
মুক্তিযুদ্ধের এই অন্ধকার দিকগুলোতে আরো আগেই আলো ফেলা উচিত ছিল। তারপরেও যে এতটুকো হয়েছে তাও অনেক। এ ধরনের বিষয় নিয়ে আরো কাজ হওয়া উচিত। কারণ ইতোমধ্যেই যুদ্ধে সরাসরি জড়িত অনেকে মারা গিয়েছেন। আর দুয়েক দশকের মাঝে বাকি অনেকেই মরে যাবেন। তখন ইচ্ছা থাকলেও আর তাদের কথা লিপিবদ্ধ করা যাবে না। তাই দেরি করা সমীচীন নয়। ইতিহাস ইতিহাসই, ইতিহাসে যা ঘটেছে তা ঘটেছেই। যত তিক্তই হোক, যত অপ্রিয় সত্যই বেরিয়ে আসুক, ইতিহাসের অনালোচিত এই দিকগুলোকে সংরক্ষণ করা জরুরি।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে। ভবিষ্যতে ও হবে। তবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িত এই তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কথোপকথন আমাদের সামনে আজকে যেমন খুলে দিচ্ছে অনেক সত্য অনেক প্রশ্ন ভবিষ্যতে ও এই বই অনেক যুক্তিতর্কে আমাদের কাজে আসবে। মুক্তিযুদ্ধের সাথে নিবিড়ভাবে মিশে যাওয়া আমাদের তিন মহীরুহ। এই বই তাদের দেখা জানা শোনা এবং পর্যালোচনার দলিল।
মুক্তিযুদ্ধের তিন মহিরুহের কথোপকথন। আমার ব্যক্তিগত একটা আগ্রহের যায়গা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এই সম্পর্কে অসংখ্য বই আমি পড়েছি। কিন্তু প্রচলিত বইয়ের থেকে এটা ভিন্ন ধাচের, ভিন্ন স্বাদের! সমাজে প্রচলিত বয়ান থেকে আলাদা হয়ে ভিন্ন কিছু জানার এক অনন্য বই। পড়ার সময় বারবার মনে হচ্ছিল আসলেই কি এটা সত্য! কিন্তু পরক্ষণেই মনে হচ্ছিল, এটা সাধারণ কোন লোকের লেখা বা বলা ঘটনা না। মুক্তিযুদ্ধের তিন মহিরুহের লেখা বই। তাঁদের কথোপকথন। পরিশেষে ইতিহাস বিকৃতিকারীদের হাত থেকে মুক্তি পাক মহান মুক্তিযুদ্ধ। আলোর মুৃখ দেখুক সত্য ঘটণার। তা যতোই তেতো হোক!
'মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের' উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রকাশের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে অন্যতম ছিলো ২০০২ সালে যুদ্ধের নেপথ্যে থাকা তিনজন বিশিষ্ট ব্যক্তির নয় দিন ব্যাপী যৌথ আলাপ আয়োজন ও রেকর্ড করা। এই তিনজন ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান সেনাপতি এ কে খন্দকার, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মঈদুল হাসান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গঠিত যুব শিবিরের মহাপরিচালক ও পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস আর মীর্জা৷ অডিও ক্যাসেটে ধারণকৃত এই যৌথ আলাপের লিখিতরূপ হলো 'মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর'। এমন ইতিহাসবরেণ্য ব্যক্তিরা যখন স্বাধীনতার ত্রিশ বছর পর এসে আলাপ করেন যুদ্ধের আড়ালে আবডালে থাকা বিষয়াবলি নিয়ে তখন তা অনেকটা মিথবাস্টিং এর পর্যায়ে গিয়ে পৌছে এবং নিঃসন্দেহে গুরুত্বসহকারে বিবেচনার দাবী রাখে।
আলোচনাগুলো সাজানো হয়েছে অসহযোগ আন্দোলন প্রতিরোধযুদ্ধ, স্বাধীনতার ঘোষণা, সশস্ত্র লড়াই, সেনাবাহিনীর মনস্তত্ত্ব, পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা সেনাসদস্য প্রসঙ্গ, যুব শিবির প্রসঙ্গ, গেরিলা তৎপরতা, যৌথ সামরিক নেতৃত্ব, অন্যান্য বাহিনী প্রসঙ্গ, মুজিব বাহিনী, স্বাধীনতার পরবর্তী প্রসঙ্গ - বিষয়াবলিতে ভাগ করে।
বাংলাদেশের নয় মাসব্যাপী চলা স্বাধীনতাযুদ্ধের কয়েকটা রূপ ছিলো - রাজনৈতিক, সামরিক এবং গণযুদ্ধ। যুদ্ধচলাকালীন এবং পরবর্তী প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই এই পক্ষগুলো একে অপরের সাথে অন্তর্দ্বন্দে লিপ্ত ছিলো। এই বইয়ের অনেকটা জুড়ে আলোচনায় উঠে এসেছে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যবর্তী দ্বন্দ্ব। যুদ্ধের প্রাক্কালে দেশের পরিস্থিতি আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে মার্চের শুরুতে দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর নীরব তৎপরতা লক্ষ্য করা স্বত্বেও রাজনৈতিক নেতাদের কোন প্রকার প্রতিরোধ পরিকল্পনা ও যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহনে অনাগ্রহ। তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তারা মার্চের শুরুতেই দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও যোগাযোগ মাধ্যম নিজেদের দখলে নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর যেকোনো আক্রমণ তৎপরতা রুখে দেওয়ার পরিকল্পনা জানালেও তা সম্ভব হয়নি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অসহযোগিতায়৷
স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে এই বইতে। সেখানে উঠে এসেছে বাস্তবে কীভাবে কোন রাজনৈতিক নির্দেশনা ছাড়াই সেনাবাহিনী ২৫ মার্চের নৃশংসতার বিরূদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে লড়াই করতে বাধ্য হয়েছিলো এবং কীভাবে স্বাধীনতা পরবর্তী দেশে এই ঘোষণার সময়কাল ও ঘোষকের নাম রাজনৈতিক দলগুলোর প্রোপাগান্ডায় রূপ নেয়।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বেশ কিছু কালো অধ্যায়ের নেপথ্যে ছিলো সেনাবাহিনী। তার কারন পর্যালোচনায় আলোচকরা দায়ী করেছেন যুদ্ধের শুরুতে লম্বা সময় ধরে ভারতে অবস্থানকারী রাজনৈতিক নেতাদের সিদ্ধান্তহীনতার কারনে দেশে সম্মুখ সমরে অবস্থানকারী সেনাদের স্বাধীন মনোভাবাপন্ন হয়ে ওঠাকে।
স্বাধীনতা-উত্তর দেশে বিশৃঙ্খলা ও দূর্নীতির অন্যতম কারন হিসাবে আলোচকরা আরো দায়ী ��রেছেন মুক্তিযুদ্ধের আগে লম্বা সময় ধরে চলতে থাকা অন্যায় নিপীড়ন ও আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজের শাসন কাঠামোর সাথে ভেঙে পড়া মূল্যবোধের কাঠামোকে। গণমানুষের যুদ্ধে রূপ নেওয়া এই যুদ্ধ যেভাবে সাধারণ মানুষের ভিতরে ঢুকে বিপর্যস্ত করেছিলো পুরো দেশকে৷ রাজনৈতিক দল, সেনাবাহিনী ও সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রিত করে সমন্বিত পুনর্গঠনের পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তীতে তা বাদ দিয়ে পুরানো পাকিস্তানি দৃষ্টিভঙ্গির আদলেই গড়ে উঠেছিলো স্বাধীন বাংলাদেশ, যার মাশুল এই দেশকে দিতে হচ্ছে আজও।
শেষ চ্যাপ্টারে ১৯৭১ সালের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গ্রুপের দ্বারা সংঘটিত লুটপাট, ডাকাতির কথা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু মিত্রবাহিনীর লুটপাটের বিষয়টা একদম উল্লেখই করেননি তিনজনের কেউ। প্রথমার বই তাই।
মুক্তিযুদ্ধের উপ-সেনাপতি একে খন্দকার, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের বিশেষ সহকারী ও সাংবাদিক মঈদুল হাসান এবং যুবশিবিরের পরিচালকের এস আর মীর্জা একত্রিত হলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের কথা বলতে।
এ ত্রয়ীই মোটামুটি একই সুরে কথা বলেছেন। শেখ মুজিব কিংবা তাঁর দল আওয়ামীলীগের পাকিস্তানি আক্রমণ রোধে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না বলেই তিনজনই দাবী করেছেন। বিশেষত, একে খন্দকার এ নিয়ে সোচ্চার ছিলেন।কেন শেখ মুজিব ২৫ শে মার্চ রাতে সরে না গিয়ে গ্রেফতার হলেন, সেই পুরনো প্রশ্নকে জীয়ন্ত করে নানা তথ্য দিয়েছেন। যা সূক্ষ্মবিচারে বিতর্কিত বটে।
যুদ্ধে তাজউদ্দীনের নেতৃত্ব নিয়ে খোদ আওয়ামীলীগের মাঝেই কতশত দ্বন্দ্ব- বিবাদ ছিল তার খানিকটা নমুনা নিয়ে কথাবার্তা বলেছেন তিনজনই।
যুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধ পরিচালনায় কীসব বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল তার নিয়েও তাঁরা খোলামেলা বাতচিত করেছেন।
তিনজনই বেশ অনালোচিত অংশে আলো ফেলবার চেষ্টা করেছেন। আবার তিনজনই সকল বিষয়ে সহমত পোষণ করাতে আলোচনার গন্ডি একমুখী মনে হচ্ছিল।
তাঁরা যেসব কথা বলেছেন তা নিয়ে আরো কাজ হওয়া উচিত।বিশেষত, তথ্য 'ক্রসচেক' করাটা অপরিহার্য। তাতে হয়ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কিছুক্ষেত্রে নতুন করে লিখতে হবে, স্বীকার করে নিতে হবে তেতো সত্য।
প্রদীপের নিচে যে অন্ধকার থাকে, এই বই তারই প্রমান । মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত সকল পক্ষের দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ভুল পদক্ষেপের বয়ান ফুটে উঠেছে আলোচক তিনজনের ভাষায় । কিছু বিষয় বার বার উল্লেখ করায় কিছুটা বিরক্তি লেগেছে... তবে ইতিহাসের এই অনালোচিত অংশগুলো হয়ত আরও গবেষণার দাবী রাখে ।
বইটিতে পরিষ্কার সাক্ষ্য-প্রমাণের কিছু অভাব রয়েছে। সেজন্য এটিকে ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী হিসেবে ধরে নেয়াটা উচিত হবে না। তবে হ্যাঁ, বইটিকে ইতিহাস গবেষোণা'র একটি গুরুত্বপুর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা যেতেই পারে।