'The Southern Veranda' - the reminiscences of Mohonlal Gangopadhyay (1910-1969), son of famous litterateur Manilal Gangapadhyay and grandson of the great artist Abanindranath Tagore, is a superb piece of literature. In it the author recounts the days of his childhood and early youth that he had spent at Calcutta's Jorasanko with his renowned grandfather. The book is a tale of such endless adventures that happened within the four walls of a house and its premises. Throughout the book there is an undercurrent of melancholy and pathos as those days of sunrise and gaiety were passing away.
জোড়াসাঁকোর পাঁচ নম্বর বাড়ি ছিলো অন্দরমহল; এর দক্ষিণের বারান্দাতেই কাজ করতেন তিন বিখ্যাত প্রতিভাবান সহোদর - গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ। ছোটভাই অবন ঠাকুরের বড় মেয়ের সন্তান মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় তার জবানিতে লিখেছেন এই অম্লমধুর স্মৃতিকথা। এ বাড়িটি ছিলো বড় আজব। এ বাড়ির বড়রা শাসন করে না, এ বাড়ির ভৃত্যদের কাজের জন্য ডাকলে সাড়া পাওয়া যায় না, এ বাড়ির ছোটরা থাকে এক সার্বক্ষণিক পিকনিকে। ছোটদের ছেলেমানুষি উসকে দিতেন অবন ঠাকুর। তাদের নিয়ে দেয়ালিকা করা, যাত্রাপালার দল তৈরি করা, যেখানে সেখানে কুড়িয়ে পাওয়া বস্তু আজব বাক্সে রাখাসহ বহু মজার ঘটনার বিবরণ আছে বইতে। কিন্তু মোহনলালের বয়স বাড়ে, বয়স বাড়ে বাড়িটিরও। বাড়ে আর্থিক অনিশ্চয়তা, কমে প্রতিপত্তি, কমে জৌলুশ, আর্থিক দৈন্যে ধীরে ধীরে এ বাড়িটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন অবন ঠাকুর। বই শেষ হওয়ার পর তীব্র একটা হাহাকার জন্মায় মনে। কালের করাল গ্রাস সবকিছু কেড়ে নেয়।
(৩০ ডিসেম্বর, ২০২৩)
এ স্মৃতিকথা পুরোটাই অবনীন্দ্রনাথকে ঘিরে রচিত। এবার পড়ে তাঁর জীবনযাপনের ধরন দেখে এতো হিংসা হলো! ছিলেন চিত্রকর, মাঝখানে ইচ্ছা হয়নি তাই ৮/১০ বছর ছবি আঁকেননি। লিখেছেন যাত্রাপালা। রবীন্দ্রনাথ তাকে পাশ্চাত্যে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য বিদেশে নিতে চেয়েছেন, অবন ঠাকুর যাননি। রাঁধুনি হওয়ার শখ চাপলো; শুরু করে দিলেন রান্না শেখা। এই না হলে জীবন! নিজের যা করার ইচ্ছা, তা-ই করেছেন আজীবন। এই বাড়ির মানুষ সত্যিই "পিরালি" ব্রাহ্মণ ছিলো। তাই নির্দ্বিধায় মুসলমান বাবুর্চির হাতের রান্না খেয়েছে সেই ছোঁয়াছুঁয়ির যুগে। এহেন বাড়ির মানুষদের জন্যেও কী মর্মন্তুদ পরিণতি যে অপেক্ষা করছিলো! লেখকের নিরাসক্ত, নির্বিকার গদ্য বেদনার ভার দ্বিগুণ করেছে পাঠকের।
নাহ, বায়োটেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং.. এসব শাস্ত্র নিয়ে নাড়াচাড়া জরুরি। নইলে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে ঠাকুর পরিবারে একের পর এক এতো গুণী কেমন করে জন্ম নিলেন সে রহস্য বোঝা যাবে বলে তো মনে হয় না!
অনেকগুলো ঘর, অনেকগুলো মহল, অনেকখানি বাগান জুড়ে মিলিয়ে ছিল জোড়াসাঁকোর প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের বাড়ি। চকমেলানো ছয় নাম্বার বাড়িতে ছিলো অন্দরমহল আর পাঁচে ছিলো বৈঠকখানা। ছেলেবুড়ো, চাকরবাকর সবাই মনে মনে জানত দু'খানা বাড়িই এক। গলির ধারে ছিল তালাভাঙা লোহার খালি ফটক, মস্ত বাগান, তার একধারে বুড়ো নিমগাছ আর কোটরে টুনটুনি পাখিদের বাসা। মেজোছেলে গিরীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর পুত্র গুণেন্দ্রনাথ এবং তারপর গগনেন্দ্র-সমরেন্দ্র-অবনীন্দ্র, বৈঠকখানা মানে পাঁচ নম্বর বাড়িতেই মানুষ। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতি মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন স্মৃতিমেদুর জোড়াসাঁকোর সেই ৫ নাম্বার বাড়ি নিয়ে। শুধু কি বাড়ি-ই? শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যের স্মৃতিবিজড়িত সেই দক্ষিণের বারান্দা আর বাড়ি জুড়ে থাকা, বাড়িকে জড়িয়ে রাখা মানুষগুলোকে নিয়েও...
অবনীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় কন্যা করূণা তিনটি শিশুপুত্র রেখে অকালে মারা গিয়েছিলেন বলে মাতৃহীন নাতিরা ছিলো অবন ঠাকুরের চোখের মণি। তার মধ্যে জেষ্ঠ মোহনলালের ভাগে আদরের অংশটা ছিলো বাড়াবাড়ি রকমের বেশি! মোহনেরও জানা ছিলো সকল কাজের সঙ্গী দাদামশায়ের কাছে কোনো আবদার করলেই নাখোশ হয়ে ফিরতে হবে না। বন্ধুতা ছিলো এমনি নিখাদ! জোড়াসাঁকোর সেই টানা বারান্দায়, লাইব্রেরি ঘরে, গোল বাগানের ফোয়ারার ধারে, চালাঘরের লতায় ঢাকা সামার হাউজে, দপ্তরঘরের কলতলার কোনে... দুটি অসমবয়সী বন্ধুর রূপে-রসে-সুরে, গল্প-ছবি আর গানের আনন্দ-নিকেতনের গল্প এ বই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে ঠাকুরবাড়ির অক্ষয় বিলাসের ওপর যে অর্থনৈতিক ধাক্কা পড়ে তারই জের ধরে একদিন দেনার দায়ে নিলামে ওঠে এবং শেষে বেহাত হয়ে যায় ৫ নম্বর বাড়ি। সেই সঙ্গেই শেষ হয় দক্ষিণের বারান্দার এই গল্প। থেকে যায় হাহাকার। কোন ভাবেই কি সংরক্ষন করা যেতো না সেই আশ্চর্য জাদুপুরী? ভাঙবার আগে কেউ একবারো সামলে রাখার চেষ্টা করেনি অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য বই কিংবা হরেদরে বিকিয়ে দেওয়া অবনীন্দ্রনাথের অমূল্য ছবিগুলো? এইসব, অক্ষম আক্ষেপ-ই, থাকে বাকি, থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার...
অবন ঠাকুর সম্পর্কে যদি জানতে চান কিংবা ঠাকুর পরিবারের উৎসব কিংবা অন্যান্য গল্প.. তাহলে বলব এই বইটা হাইলি রেকমেন্ডেড। এই সব সম্পর্কে জানার আগ্রহ না থাকলেও পড়ার অনুরোধ রইল। অতি চমৎকার একটা আত্মজীবনী। যার মূলে রয়েছে দাদামশাইয়ের গুণেমুগ্ধ এক নাতির জবানীতে তার দাদার গল্প, দাদাবাড়ির গপ্পো, ছেলেবেলার গপ্পো।
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষটা এমন যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত প্রতিভা গিজগিজ করে। অবশ্য ঠাকুর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই কথাই প্রযোজ্য। খোদা যে এদের কী দিয়ে বানাইছেন! কে জানে :3 জোড়াসাঁকোর বাড়ির পাঁচ নাম্বার বাড়ি ছিল অন্দরমহল আর ছয় নম্বর বাড়ি ছিল বৈঠকখানা। পাঁচ নম্বর বাড়ির এই দক্ষিণের বারান্দায় গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ আর অবনীন্দ্রনাথ-তিন ভাই মিলে কাজ করতেন কিংবা অবসর সময় কাটাতেন। তিন ভাইয়ের কল্যাণে এই দক্ষিণের বারান্দা সে সময়কার ভারতের শিল্পকলার পীঠস্থানে পরিণত হয়। উনিশ শতকে এমন কোন জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি নেই, যারা এই দক্ষিণের বারান্দায় কিংবা জোড়াসাঁকোর বাড়ির বিখ্যাত লাইব্রেরি ঘরে আপ্যায়িত হননি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় কন্যার ছেলে মোহনলাল। মা হারা এই শিশুটি ছিল বড্ড বেশি দাদামশাই ঘেঁষা। তার এই প্রিয় নাতির জবানীতে এই বই। বড় দাদামশাই (গগনেন্দ্রনাথ), মেজ দাদামশাই (সমরেন্দ্রনাথ), ছোটদাদামশাই (অবনীন্দ্রনাথ) আর কত্তাবাবা হলেন রবিঠাকুর স্বয়ং। যখন যেই বাতিক উঠছে বাড়ির ছেলেপিলেরা মহোৎসাহে তাই করছে.. আর তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে কে জানেন? স্বয়ং অবিন ঠাকুর! তাকে দেখলেই (তাকে তো আর দেখিনি, যা বর্ণনা পড়েছি) তাতেই মনে হয়েছে উনি হচ্ছেন বুড়ো মানুষের দেহে আটকে পড়া ছোট্ট একজন শিশু। হাঁটতে হাঁটতে লাঠির ফলা দিয়ে হীরে খোঁজা, যখন যেই নতুন খেলনা আসে কিনে ফেলা কিংবা পড়ে থাকা যে কোন ইন্টারেস্টিং কিছু কুড়িয়ে নিজের আজব বাক্সে বন্দী করা, ছেলেপিলেদের দেয়ালিকা বলি, যাত্রাপালার দল বলি.. সবকিছুতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বুড়োশিশু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এছাড়াও ছবি আঁকা, লেখালেখি ইত্যাদি সবকিছু ছাপিয়ে উঠে এসেছে সুরুচিসম্পন্ন এক শিল্পীসত্ত্বার কথা।
এ পৃথিবীতে কোন কিছুই অবিনশ্বর নয়। কালের নিয়মে একদিন চলে গেলেন কত্তাবাবা, চলে গেলেন গগনেন্দ্রনাথ। বেঁচে থাকতে তিন ভাই কখনও আলাদা হননি। বয়সের তফাত থাকলেও তিন ভাই যেন এক প্রাণ। অর্থনৈতিক কারণে বিপর্যস্ত হতে থাকে জোড়াসাঁকোর সেই ঝাঁ চকচকে বাড়িটি। যেই বাড়িতে একটা সময় আলোকসজ্জা, অনুষ্ঠান, বড় বড় লাট-বেলাট কিংবা জ্ঞানীগুণীদের পদচারণায় মুখর ছিল, সেই বাড়িতে একটু একটু করে ফাটল ধরে, ভাঙন ধরে.. ফাটলের ফাঁকে দুর্বল অশ্বত্থের চারা একটু একটু করে পুরুষ্টু হয়, সাজানো-গোছানো বাগানে ফুল গাছের ফাঁকে ফাঁকে গজিয়ে উঠা আগাছার দল ধীরে ধীরে দখল করে নেয় পুরো বাগানটাই। অর্থনৈতিক কারণে দেনার দায়ে নিলামে উঠে জোড়াসাঁকোর বাড়ি। চোখের জলে আর দীর্ঘশ্বাসে ঐতিহ্যবাহী, আজন্মশৈশবের বাড়ি থেকে বিদায় নেন বুড়োখোকা অবনীন্দ্রনাথ। মানুষের জীবন মাঝে মাঝে কি নিষ্ঠুর মনে হয়, না?
পুরো বইটা আনন্দ আর কলহাস্যে মুখর হয়ে থাকলেও শেষ দিকে এসে দীর্ঘশ্বাস পড়বে পাঠকেরও। পাঠকের আফসোস.. বাড়িটাকে কেন সময়মত সংরক্ষণ করা হলো না? এতো এতো বই কেন বিক্রি করে দিতে হলো? কতো ছবি! তৈজসপত্র এমনি এমন চলে গেলো! কোথায় কার সংরক্ষণে আছে সেসব? আদৌ কী আছে? আরও কতো প্রশ্ন! আফসোস!
আই উইশ! একটা টাইম মেশিন থাকতো! তাতে চড়ে ঠাকুর বাড়ির আঙিনায় একটা ঢুঁ মেরে আসতাম। বর্ষা মঙ্গলের রিহার্সালে কিংবা ঠাকুর বাড়ির বাচ্চাদের যাত্রাপালার আসরে বা অবিন ঠাকুরের রান্নার ক্লাসে... আই উইশ! আই উইশ!
দক্ষিণের বারান্দা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতি মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা। জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর বাড়িতে থাকাকালীন সময়ের নানা ঘটনা উঠে এসেছে। অত্যন্ত সুখপাঠ্য। অবনী ঠাকুর অধিকাংশ বই জুড়ে ছিলেন। নানাবিধ গুণের অধিকারি মানুষটার একটা ঝলক দেখা যায় এই বইয়ে। একটা মায়া পড়ে গেছে দক্ষিণের বারান্দা পড়তে পড়তে। বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়টা তাই মন খারাপ হয়ে যায়, সেখানেই বই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বিষণ্ণ ভাবটা থেকে যায়। যারা স্মৃতিচারণ ভালোবাসেন অথবা ঠাকুর পরিবার নিয়ে আগ্রহী তারা পড়তে পারেন। বেশ লাগবে।
পড়লাম, মুগ্ধ হলাম এবং অবন ঠাকুরের প্রতি একরাশ হিংসা ছিটিয়ে দিলাম। কী সুখী একজন মানুষ ছিলেন তিনি! দৈনন্দিন জীবনের ছকে নিজেকে বেঁধে রাখেননি তিনি। কখনো রঙ তুলি নিয়ে ছবি এঁকেছেন, কখনো বনসাই নিয়ে মেতে উঠেছেন। বাড়িতে নাটক নামানো, রান্নার এক্সপেরিমেন্ট, ভূত ধরা অভিযান; কতকিছুই করেছেন মনের আনন্দে! মুক্ত বিহঙ্গের মতো কী নির্ভার জীবন! ঠিক এমন একটা জীবনই তো চাই।
মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের চমৎকার গদ্যে ঠাকুরবাড়ির দক্ষিণের বারান্দার দাঁড়িয়ে দেখে এলাম অবন ঠাকুর ছবি আঁকছেন আর গল্প করছেন কবি জসীমউদদীনের সাথে। জসীমউদদীনের লেখা "ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়" স্মৃতিকথায়ও দক্ষিণের বারান্দা এবং অবন ঠাকুরের অনেক গল্প শোনা যায়।
"ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়" দুইবার পড়েছিলাম, এই বইখানাও আরেকবার পড়ব এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
কার বাড়ি? ঠাকুর বাড়ি। কোন ঠাকুর? ওবিন ঠাকুর - ছবি লেখে।
কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির লোক ওবিন ঠাকুর। পুরো নাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রতিথযশা চিত্রশিল্পী তিনি। ছোটদের জন্যও প্রচুর লিখেছেন। জাদু ঘোরের মতো সেই লেখা! এই ওবিনবাবুরই বৈঠকঘর ছিল দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের পাঁচ নাম্বার বাড়িটা। বাড়ির দক্ষিণের বারান্দার ছায়াতলে বসে ছবি আঁকতেন তিনি। বাড়ির সামনে নারকেল গাছ ঘেরা বাগান। বাগানে বেঁধে দেয়া বুলবুলি আর টুনটুনি পাখির বাসা। বাড়িতে চওড়া কাঠের সিঁড়ি। এই বাড়ির প্রতিটি কোণে জন্মকাল থেকে একটু একটু করে স্মৃতি গড়ে তুলেছেন ঠাকুরবাড়ির তিন মহীরথী - গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ। মোহনলাল ছিলেন অবনীন্দ্রনাথের কন্যা করুণা ও জামাতা মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র৷ ঠাকুরবাড়ির একপাল দস্যি ছেলের গুরু ছিলেন তিনি। তারা ছুটোছুটি করে এই পাঁচ নাম্বার বাড়িকে মাতিয়ে রাখত। বালক বয়সে মাতৃহারা হয়েছিলেন বলে অবনঠাকুরের আদর ভালোবাসা একটু বেশিই পড়েছিল তার ভাগে!
পাঁচ নাম্বার বাড়িটা আজ আর নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার আর্থিক দৈন্যের ধাক্কা সইতে না পেরে এই বাড়ি বেহাত হয়ে যায়। পরে এই বাড়িটিকে ভেঙে ফেলা হলে মুছে যায় নবজাগরণের বহু অমূল্য ইতিহাস। তাই বাড়ির স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা থেকেই মোহনলাল লিখেছেন দক্ষিণের বারান্দা। লিখেছেন বাড়ির আনাচে-কানাচেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আদরের স্মৃতিকথা। সেই লেখাতে বারবার উঠে এসেছে দাদামশায় অবনীন্দ্রনাথের কথা। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও এই বাড়ি নিয়ে লিখেছেন স্মৃতিচারন মূলক বই জোড়াসাঁকোর ধারে আর আপন কথা।
লিখতেন তিনি ছোটবেলা থেকেই। ঠাকুরবাড়িতে জন্ম বেড়ে উঠা অথচ সাহিত্যের সাথে সদ্ভাব থাকবেনা তাও কি হয় নাকি! দাদামশায় বলেছেন প্রতিদিন সকালে উঠে পাঠে বসার আগে স্বপ্নের কথা লিখে ফেলতে হবে। বারান্দায় বসে দু'তক্তা শীরামপুরী কাগজ কেটে আঠা জুড়ে বানানো "স্বপ্নের মোড়ক"কে রোজ রোজ স্বপ্নের গল্প লিখতো বাড়ির ছেলেমেয়েরা। একবার ঠিক হলো হাতে লেখা পত্রিকা ছাপা হবে। পত্রিকার নাম দেয়া হলো দেয়ালা। ইন্সটাগ্রামে প্রিয় বাংলা শব্দ খুঁজছিলাম একদিন। একজন বলেছিল প্রিয় শব্দ দেয়ালা। অর্থ খুঁজে পেলাম দেয়ালা হলো স্বপ্নের ঘোরে শিশুর হাসিকান্না। ভারী মিষ্টি একটা শব্দ!
দাদামশাইয়ের শখ ছিল পাথর কুড়ানো। নানা বর্ণের আর আকারের পাথর কুড়োতেন তিনি। ছেলেমেয়েদের বলতেন - "যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন!" বহুল প্রচলিত এই বাংলা কথাটি তাঁরই প্রথম বলা কিনা বলতে পারিনা। পুরানো ভাঙা কাঁচ পেলে তা খুদে মূর্তি গড়তেন অবনঠাকুর। আর ফুল পাতা থেকে বের করতেন দেশীয় রং। এ কথা সে কথা আরও কথা জমা পড়েছে মোহনলালের স্মৃতিকথায়! ছবি বলে ভ্রম হয় সেসব। পড়তে পড়তে মনে হয় মায়ার জগতে হারিয়ে যাচ্ছি! মোহনলালবাবু অবশ্য এই লিপিকে স্মৃতিকথা বলতে নারাজ। তাঁর ভাষ্যমতে এ হলো দক্ষিণের বারান্দায় বসে বসে হালকা মেঘের দিকে তাকিয়ে দখিন হাওয়া পাওয়ার মতো।
যান্ত্রিক বইখানা পাঠ করে আর সে হাওয়ার একটুখানি পরশ পেয়ে অত সুখ হলো। না জানি ফিজিক্যাল বই হাতে নিয়ে অক্ষর ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়ার আনন্দ কতখানি হবে! দ্রুত বইটি সংগ্রহ করে নিজের সংরক্ষণের ঝুলিতে না ভরলে আর চলছে না!
অল্প কিছু বই থাকে সুস্বাদু খাবারের মতো। তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতে হয়। তাড়াহুড়ো করতে নেই। এই বইটি ঠিক তেমন একটি বই। অবন ঠাকুরের এক অন্তরঙ্গ প���িচয় পাওয়া যায় বইটিতে, তাতে তিনি হয়ে উঠেন আরো কাছের মানুষ। ছেলেমানুষী যত ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ, যা আসল ছেলেমানুষকেও ছাড়িয়ে যায়। তুচ্ছ ক্ষুদ্র সব জিনিস আগলে রাখা, রঙ বানানো, নুড়ি জমানো, বাচ্চাদের নানা বুদ্ধি দেয়া এইসব ব্যাপারে মোহনলালের দাদামশায়ের জুড়ি মেলা ছিল ভার! একবার দার্জিলিং বেড়াতে গেলেন সপরিবারে, সেখানে লাটের দুই ছেলে হুজ্জতি করছিল এক চিনেবাদামওয়ালীর সাথে। অবনদাদু লাঠি উঁচিয়ে গিয়ে ছেলেদের হটিয়ে চিনেবাদামওয়ালীর বাদামগুলো বাঁচালেন। এরপর চলল চিনেবাদামওয়ালীর ঝুলোঝুলি, বাদাম নেবার জন্য, ফ্রিতে! তি��িও নেবেন না! শেষে আরেকবার অনেক বছর পর যখন দার্জিলিং গেলেন সেই মেয়েটি তার বাবাসহ দেখা করতে এল। এবার আর বাদাম না নিয়ে পারা গেল না। এরপরেই সেই মোক্ষম কথা, 'চিনেবাদামওয়ালী তাই ঠিক চিনে রেখেছে!' ওমন ঘটনা পড়ে যেমন মন ভরে ওঠে তেমনি হাসি চেপে রাখাও দায় হয়ে যায়। অবনঠাকুর ছাড়া আর কার মাথায়ই বা আসতে পারে ধুঁতি কোঁচানোর কল আবিষ্কারের কথা? শিশুর হৃদয় নিয়ে বড় এই মানুষটির কত কত সরস গল্প যে ছড়িয়ে আছে বইটির পাতায় পাতায়! কত হাসির ছররা ছেটানো বইটিতে শেষদিকে বিষাদের সুর। মন খারাপ হয়ে যায়। সব পরিবর্তন ভালো লাগে না, মনে হয় কিছু ব্যাপার একরকমই চিরকাল থেকে যাক। দক্ষিণের বারান্দা কার্যত শূন্য হয়ে গেলেও পাঠকমনে সজীব তিন দাদামশায়ের কীর্তিতে, তাঁদের তুলিতে, তাঁদের রেখায়, তাঁদের লেখায়।
আমার কিছু বন্ধু আছে যারা নষ্ট জিনিস মেরামত কিংবা অব্যবহৃত টুকরো কিছু দিয়ে নানানসব জিনিস বানিয়ে তাক লাগিয়ে দেয়। ওদের প্রতি ঈর্ষা হয়। অবন ঠাকুরও অমন একজন চরিত্র। যদিও জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির গল্পকে কেন্দ্র করে এই বই কিন্তু প্রায় সব ঘটনাতেই অবনীন্দ্রনাথ বাবু উপস্থিত।
লেখা পড়ে মনে হয় প্রকৃতই গুনী মানুষ ছিলেন তিনি৷ নিজের অর্জিত জ্ঞানের পাশাপাশি প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে বহুকিছু কাজ করে ফেলতেন। সবচেয়ে বেশি দক্ষতা ছিলো ছবি আকায়। অসম্ভব দ্রুততায় চমৎকার সব ছবি আকতে পারতেন। তাছাড়া নানান রকমের উপাদান দিয়েও ছবি আকার সরঞ্জাম বানিয়ে ফেলতেন অবলীলায়। শিল্পীর চোখই যে মুখ্য তার প্রমাণ মেলে তার কাজকর্মে।
অবন ঠাকুরের ছবি আকা, রান্নার কারিশমা, বাগানে পাখি ধরার হম্বিতম্বি সহ বেশকিছু উপভোগ্য ঘটনা আছে বইতে।
গুডরিডসে রিফাত আপু এই বইটা রেকমেন্ড করেছিলেন। বইয়ের লেখক এবং বিষয়বস্তু নিয়ে আপুর রিভিউটা ইচ্ছে করেই তখন পড়িনি। ধান্দা ছিল একদম কিছুই না জেনে যতটা সম্ভব পড়ার আনন্দ নেওয়া।
তো এখানে সেখানে খুঁজতে যেয়ে একদিন এক ফেইসবুক গ্রুপে পিডিএফ পেয়ে গেলাম। পড়ার শুরু করতেই টের পেলাম যে এই দক্ষিণের বারান্দাটি আর কোন বাড়ির না, বরং ৫ নম্বর জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দা। এ বারান্দাতেই প্রতিদিন তিন সহোদর বসতেন নিজ নিজ ধ্যানে মগ্ন হয়ে। গগন, সমর আর অবন। জ্যেষ্ঠ এবং কনিষ্ঠ ভাতৃদ্বয়ের সাধনা চিত্রশিল্প, মধ্যম ভ্রাতার পুস্তক পাঠ। তবে কনিষ্ঠ ভ্রাত্রা অবনীন্দ্রনাথকে নিয়ে কথা বলে শেষ হবার না।
মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন অবন ঠাকুরের দৌহিত্র। মানে কন্যার পুত্র। তার জবানীতে এই পুরো বইটি জুড়ে ছড়িয়ে আছেন অবন ঠাকুর। প্রায়ই মহৎ ব্যক্তিদের মহীরুহ বলে আখ্যায়িত করার প্রচলন আছে। কিন্তু আমি অবন ঠাকুরের ক্ষেত্রে এই উপমা টানতে মোটেও রাজি না। গাম্ভীর্য মহীরুহকে কেমন যেন জাপটে ধরে থাকে সব সময়। তাতে কী এত রঙবেরঙের উজ্জ্বল ফুল ফোটে? সে কি বাতাসে এমন আমোদ পায়? শিশুদের মতো অদম্য কৌতূহলী। নুড়ি পাথরেও খুঁজে বেড়াতেন হীরা-জহরত। না বাপু সে লোভ নয়। এ হচ্ছে অবনের রবিকা'র সেই 'যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই' শিক্ষা। নুড়ি ভেঙে রত্ন না পেলেও, হাতে হাতে খোদাই করে গড়ে তুলতেন অন্য আরেক রত্ন। প্রস্তর মূর্তি। ভেঙে যাওয়া, ফেলে দেওয়ার মতো তুচ্ছ টুকরো-টাকরা সযত্নে জমিয়ে রাখতেন। তিনি শিশুদের মত আমোদপ্রিয়। ক্লাব-নাটক-পালা-পুঁথি নিয়ে মেতে থাকতেন হর-হামেশা। আর শিল্প যে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে, সেটা তো নতুন করে বলার কিছু নেই। দিন-রাত সাধনা করার মত নিষ্ঠা, একাগ্রতা যে আজ দুর্লভ, কোন সন্দেহ নেই তাতে।
যাই হোক। পুরো বইটা তো এখানে তুলে দেওয়ার কোন মানে হয় না। পূর্ব পাঠের রেশ ধরে লেখক অবনীন্দ্রের পর এই বইতে এসে শিল্পী এবং ব্যক্তি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও যেন আমাকে একদম পেয়ে বসলেন।
এই বই পড়ার পর আমার মাথায় শুধু ঘুরছে কয়েকটা জিনিস। সময় চলে যায় ,সাথে মানুষেরাও হারায়। শুধু পড়ে থাকে স্মৃতি ,অমূল্য স্মৃতি। একসময় সেই স্মৃতিও ম্লান হতে থাকে কিংবা রয়ে যায় ইতিহাস হয়ে বইয়ের পাতায়। এই স্মৃতিগুলোই মানুষকে হাসায় ,আবার কাঁদায় ,হয়তো বা মানুষের দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়।
প্রথিতযশা তিন শিল্পী গগণেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের রূপকথা পাঁচ নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দাকে কেন্দ্র করে গ্রথিত হয়েছে মোহনলাল গঙ্গাপাধ্যায়ের লেখা এই বইটিতে । বহির্বিশ্বের যাবতীয় ঘটনাকে উপেক্ষা করে এক চিলতে বারান্দা ও তার চতুষ্পার্শের বন্ধনে এই তিন মহীরূহের জীবনালেখ্যকে রসেবসে পরিবেশণ করা সহজ নয় । কিন্তু লেখক মোহনলাল ঠিক সেই কাজটিই করেছেন, এবং করেছেন তাঁর অত্যন্ত সুখপাঠ্য রচনাশৈলীর মধ্যে দিয়ে ।
মোহনলাল অবনীন্দ্রনাথের জামাতা সুসাহিত্যিক মনিলাল গঙ্গাপাধ্যায়ের পুত্র । জোড়াসাঁকোর দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের পাঁচ নম্বর বাড়িতেই তাঁর জন্ম এবং সেখানেই কেটেছে তাঁর শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের প্রাথমিক দিনগুলি । দাদামশায় অবনীন্দ্রনাথের ছায়াসঙ্গী মোহনলাল সেই সব আনন্দঘন মুহূর্তগুলির ইতিহাস ধরে রেখেছেন 'দক্ষিণের বারান্দা' নামক গ্রন্থে । কত মূল্যবান শিল্প, কত বিখ্যাত রচনা, কত কৌতুকময় ঘটনার সাক্ষী এই বারান্দা । বড়দাদামশায় গগনেন্দ্রনাথের কিউবিজম ছবি আঁকার প্রথম ইতিহাস রচিত হয়েছিল এই বারান্দায়, অবনীন্দ্রনাথের আরব্য উপন্যাসের সাঁইত্রিশখানা ছবির সৃষ্টিও এই বারান্দায় । আর দৈনন্দিন জীবনের আরোও কত সুখ দুঃখের স্মৃতির সাক্ষী যে এই বারান্দা তা এই বইটি না পড়লে জানা যাবে না ।
তিন ভাইয়ের স্মৃতিপটে রচিত হলেও আদপে এই বইটির মূল কাহিনী মোহনলালের চোখে অবনীন্দ্রনাথের নান্দনিক শিল্প সুষমার উপলব্ধি । শুধু চিত্রশিল্প বা কারুশিল্পই নয়, অবনীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরও পূজারী ।দাদামশায়ের সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য আহরণের এক অনির্বচনীয় অনুভূতির বর্ণনা আমরা পাই এই বইতে ..
"আমাদের চোখের সামনে কুয়াশা আস্তে আস্তে ভোরের হাওয়ায় সরে যাচ্ছে । খানিক পরেই হঠাৎ কোথা থেকে আলো এসে পড়ল বরফের চুড়োয় । তার পর মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যেতে থাকল বরফের চেহারা, আকাশের চেহারা ! জেগে উঠতে থাকল পৃথিবী । রঙের আর আলোর ঢেউ বয়ে গেল চারিদিকে । আর সেই গাছপালার ফ্রেমে আঁটা কাঞ্চনজঙ্ঘার স্থির চিত্র যেন কথা কয়ে উঠল কল কল করে । দু’জনে চুপটি করে অনেক্ষণ ধরে দেখলুম, যতক্ষণ না সূর্য বেশ খানিকটা উঠে পড়লেন আকাশে ।"
জীবনের কোনো আনন্দই নিরবচ্ছিন্ন হয় না । অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জোড়াসাঁকোর প্রকাণ্ড জমিদারিকেও তার পতনের মুখ দেখতে হয়েছিল । দেনার দায়ে বাড়ি যখন বিক্রীর কথা উঠল তখন দাদামশায় বুঝলেন 'জোড়াসাঁকোর মনে ভাঙন ধরেছে' । তারপর একদিন জোড়াসাঁকো বাড়ির মায়া কাটিয়ে একে একে সবাই চলে গেলেন তাঁদের নতুন বাসার উদ্দেশ্যে ।
দক্ষিণের বারান্দার নিজের প্রথম স্মৃতি থেকে যাত্রাপথের শুরু - গোটা সফরটিতেই মোহনলাল পাঠককে নিয়ে চলেন এক স্মৃতি বিজড়িত পথের মধ্যে দিয়ে । যার কেন্দ্রবিন্দু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পীমন - কখনো তিনি চিত্রশিল্পী, কখনো বা যাত্রাপালার লেখক আবার কখনো রন্ধনশিল্পী বা শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উপাসক । বইটি অত্যন্ত সুখপাঠ্য এবং জোড়াসাঁকোর পাঁচ নম্বর বাড়ির ইতিহাসের এক বিশ্বস্ত দলিল ।
ঠাকুরবাড়ির ৫ নম্বর মহলের বাসিন্দাদের বিচিত্রসব কার্যকলাপ-কাহিনী স্বাদু গদ্যে চিত্রিত করেছেন অবন ঠাকুরের দৌহিত্র মোহনলাল। ঠাকুরবাড়ি সম্পর্কে জানতে বিশেষ ভালোলাগা কাজ করে। জানার আগ্রহের চেয়ে মুগ্ধতার আকর্ষণ বেশি প্রবল! শতাব্দীর মহাপ্রলয়ের ভাঙন যখন ঠাকুরবাড়িকেও এড়ায় না, শেষটায় এখানকার পাঠ চুকিয়ে সবাই যখন বরানগরের গুপ্তনিবাসের পথ ধরে—মন অজান্তেই খারাপ হয়ে ওঠে এক অমোঘ শঙ্কায়!
আমরা যারা প্রতিনিয়ত বই পড়ি তাদের সকলের মধ্যে একটা সুপ্ত বাসনা অহরহই থেকে যায়। তা হলো, কিছু একটা লেখা। কিন্তু লেখা কি এত সহজ? আমাদের মনের মধ্যে চিন্তার এবং কল্পনার ঢিবি সর্বক্ষণ তৈরি হতে থাকে । কিন্তু লেখার সূচনা কিভাবে করবো তা ভেবে উঠতেই সময় চলে যায়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের এই সমস্যার এক বিকল্প সমাধান জোগাড় করে দিয়েছে। উনি বলেছেন, প্রতিদিন রাত্রে আমরা যা স্বপ্ন দেখি তা সকালে উঠে লিখে ফেলতে - দেখা যাবে মোটামুটি একটা সুন্দর গল্প দাড়িয়ে যাবে সেখান থেকে। আমি চিন্তা করে দেখলাম সত্যিই তো, আমার স্বপ্ন গুলো Percy Jackson এর বইয়ের পাতা থেকে কম রোমাঞ্চকর নয়। যদিও আমি এখনও এই অভ্যাস রপ্ত করিনি তবে অদূর ভবিষ্যতে করার ইচ্ছে রইলো।
'দক্ষিণের বারান্দা' হলো এরকমই অনেক anecdote-এ ঠাসা এক রোমাঞ্চকর স্মৃতিচারণা। এই বইয়ের সবটা জুড়ে রয়েছে লেখকের দাদামশাই অর্থাৎ অবন ঠাকুরের সব বিচিত্র কাহিনী (অভ্যাস) এবং তার কাটানো কিছু সেরা মুহূর্ত লেখকের পছন্দের দক্ষিণের বারান্দায়।
জোড়াসাঁকোর ছয় নম্বর বাড়ির সংলগ্ন জমিতে দ্বারকানাথ এক বিরাট অট্টালিকা নির্মাণ করেছিলেন। সেটি তাঁর বৈঠকখানার বাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেই দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের পাঁচ নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় এই বইয়ের পাতায় পাতায় প্রতিফলিত হয়েছে। আজ আর এই বাড়ি নেই কিন্তু 'দক্ষিণের বারান্দা' বইয়ের প্রতিটা পাতার মধ্যে দিয়ে সেই বাড়ি জমজাট পরিবেশ আজও বেচে আছে।
বইটা পড়ে শুধু আনন্দ পেয়েছি তা নয়, আমার ছোটবেলার মামার বাড়ির স্মৃতিও সতেজ হয়ে গেছে। আবন ঠাকুর যে এত মজার মানুষ এবং এত বিচিত্র এক ব্যাক্তি তা এই বইটা না পড়লে জানতে পারতাম না। আমি যতটা হেসেছি বইটা পড়ে ঠিক ততটাই আবার অবাক হয়েছি। বার বার মনে হয়েছে এরকম ইচ্ছাও মানুষের হয়!? আবার যখন বইয়ের শেষের দিকে এসে পৌঁছেছি তখন হঠাৎ ই মনটা কেমন যেনো খারাপ হয়ে গেলো। ঠিক যেনো মনে হলো, অঝোরে বৃষ্টি পড়া সবেমাত্র বন্ধ হয়েছে , আমি দাড়িয়ে সেই দক্ষিণের বারান্দায় আর নিচে একটা হলুদ ট্যাক্সি থেকে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছেন মহোনলালকে তার দাদামশাই।
জীবন্ত বর্ণনা, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের নানান কৌতুক কাহিনী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার আজগুবি সব খেয়াল নিয়ে সৃষ্ট এই উপন্যাস ১০০/১০০। এতটুকু ক্লান্তি আসেনি পড়তে, খালি কখনো কখনো নিজের অজান্তেই পৌঁছে গেছি সেই পাঁচ নম্বর বাড়িতে।
জোড়াসাঁকোর দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের পাঁচ নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় বসে গগণেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই তিন ভাই মিলে ছবিতে, গল্পেতে, কৌতুকে, আনন্দে, রূপে, রসে, সুরে মিলে রচনা করেছিলেন যেন এক রূপকথা। গগণেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ এবং সর্বোপরি অবনীন্দ্রনাথ ছিলেন আনন্দময় পুরুষ। ফলে জোড়াসাঁকোয় তাঁদের বাসভবন পাঁচ নম্বর বাড়িটি ছিল এক আনন্দ নিকেতন। অবনীন্দ্রনাথের দৌহিত্র মোহনলাল তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের প্রারম্ভে ওই বাড়িতে থাকাকালীন যে দুর্লভ আনন্দের স্বাদ পেয়েছিলেন সেই সব আনন্দময় দিনগুলির ছবিই এঁকেছেন এই বইতে। "দক্ষিণের বারান্দা" সেই আনন্দ নিকেতনের নিরবিচ্ছিন্ন আনন্দোৎসবের এক অপরূপকথা।
বই কি তুলতুলে হয় ! হয়। সিগনেট প্রেস এর ছাপানো মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের "দক্ষিণের বারান্দা' বইটি হাতে নিয়ে পড়তে আমার এমনটিই উপলব্ধি হয়েছিল। তুলতুলে বই। যেমন চমৎকার কাগজ, তেমনি ফুটফুটে ছাপা, সেরকম বইয়ের সাইজ। আহা! এমন বই বহুদিন হাতে নিয়ে পড়িনি। বইটি পড়তে পড়তে মন যেমন আনন্দে আপ্লুত ছিল , চোখও পেয়েছে বড্ড আরাম।আর বইয়ের পাতা উল্টাতে মন টের পেয়েছে আঙুলের ব্যবহার। আমার অসুস্থতা ভুলিয়ে রাখতে এটা আমার মেয়ের কৃতিত্ব। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতি মোহনলাল এর সাথে সাথে নিজেই তখনকার পরিবেশে স্থাপিত হয়েছিলাম।তার দাদামশাই যেন আমারো দাদামশাই --- এই বড়বেলায় এ অনুভূতি পাওয়ার তুলনা নেই। কত শিল্পী, জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটেছিল জোড়াসাঁকোর বাড়িতে তা বিবৃত হয়েছে এ বইয়ে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মালি রাঁধুনীও বাদ পড়েনি মোহনলালের এ স্মৃতি কথা থেকে। জোড়াসাঁকোর পাঁচ নাম্বার বাড়িতে একটি ক্লাবের সভাপতি ছিলেন আমাদের পল্লীকবি জসিমউদ্দীন সেই মজার কাহিনী বইটিতে আছে। মোহনলালের কত্তাবাবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছেন বিভিন্ন ঘটনার ফাঁকে ফাঁকে। শিশুদের সাথে মিশে থাকার এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। ছিল বিচিত্র কিছু খেয়াল। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরিত্র বুঝতে এ বইটি পাঠ আবশ্যিক। শেষ পৃষ্ঠায় জোড়াসাঁকোর পাঁচ নাম্বার বাড়ি থেকে--- দক্ষিণের বারান্দা থেকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিদায় বুকে বাজে বৈ কি।
বেশ সময় নিয়েই শেষ করলাম। বহুদিন ধরেই একটা আগ্রহ ছিল ঠাকুরবাড়ির গল্প ঠাকুরবাড়ির মানুষের বর্ণনায় পড়ার। হুট করেই Goodreads এ পেয়ে গেলাম এই বই। মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই স্মৃতিকথা পড়তে পড়তে যেন প্রতিটি ঘটনা জীবিত মনে হচ্ছিলো। যদিও ঠাকুরবাড়ির রীতিনীতি, উৎসব সবকিছুই সাধারণের মানুষের জীবনযাত্রা থেকে অনেক বিপরীত। যেমন স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে বিদেশি পণ্য বর্জনের ঘটনায় বেগ পেতে হয়েছিল তাদের, কেননা তাদের জীবনযাত্রায় খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল বিদেশি পণ্যসামগ্রী। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় হাজারো গল্পের জন্ম হয়েছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসেছে কিন্তু একসময় ছেড়ে দিতে হয়েছে সেই জায়গা, রয়ে গেছে শুধু গল্পগুলো।
ঠাকুরবাড়ি সম্পর্কে লেখা সব কিছুই সুখপাঠ্য। তার ওপর অবন ঠাকুরের জীবন ছিল এককাঠি সরেস, অমন সুন্দর ছবি-গল্পের ছন্দ মেলানো মানুষটি কে লেখক কেমন আপন বানিয়ে দিলেন গল্প বলার ঢঙে। প্রিয় বইয়ের তালিকায় থাকল এটি।
অবন ঠাকুরের অনবদ্য জীবন ধারা এই বইয়ের উপজীব্য। আহা, লেখক কত ভাগ্যবান যে তিনি এই ঐশ্বরিক মানুষের সৌহার্দ্য পেয়েছেন।লবন তৈরির গল্প, বনসাইয়ের গল্প সহ আরও কত অমৃতবৎ গল্প। একটাই অভিযোগ এই বই বড্ড ছোট? একদিনেই শেষ হয়ে গেল , দুঃখজনক!