নবীগঞ্জ থেকে মাইল-দেড়েক দূরে রেলস্টেশন। একরাতে সেখানে নামলো এক পেল্লায় মানুষ, বিচিত্র তার সাজপোশাক। তবে লোকটাকে দেখে মোটেও মানুষ বলে মনে হয় না, বরং দত্যিদানবের মতোই ভাবভঙ্গি তার। লোকটা সেই রাত্তিরে যাকেই সামনে পেলো, তাকেই প্রকাণ্ড থাবায় পাকড়াও করে একজনের নামঠিকানা জিজ্ঞেস করতে লাগলো। দত্যিটার যেনো খুব দরকার ওই লোকের সঙ্গে।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
নবীগঞ্জ গ্রাম। শান্তিপূর্ণ এই গ্রামটিতে হটাৎ এক অশান্তি শুরু হলো। গ্রামে কোথা থেকে আগমন ঘটলো এক দৈত্যের। আসলে ঠিক দৈত্য না দৈত্যরূপী মানুষ। এই দৈত্যের সাথে প্রথম দেখা হয় গ্রামের স্টেশনের পয়েন্ট মাস্টার ভজনলালের। ট্রেন থেকে নেমেই ভজনলালকে কারো ঠিকানা বা পরিচয় জানতে চাইলো দৈত্য। বেচারি ভজনলাল! ভয়েই আধমরা। কি আর জবাব দেবে। জবাব না পেয়ে দৈত্য ঢুকে গেলো নবীগঞ্জ গ্রামে। কারোর খোজেঁ।
এরপর দেখা হলো গ্রামের পাচুঁ চোরের সাথে। পাচুঁ চোরের সেদিন টার্গেট ছিলো রায়বাড়ি। কিন্তু পাচুঁর সেদিন কপাল খারাপ। তাই তো চুরি করতে বের হয়েই পথে দেখা সেই দৈত্যের সাথে। চুরিটা আর সেদিন করা হলো না। পাচুঁ চোরের পর দৈত্যের সাথে সাক্ষাৎ হয় গ্রামের দুঃখবাবুর। দুঃখবাবু নামের সাথে জীবনের তার খুব মিল। আসলেই মানুষটা বড় দুঃখী। বড্ড নিরীহ আর সহজ-সরল। গ্রামের স্কুলের মাস্টার ছিলেন তিনি।
কিন্তু ওই যে সহজ-সরল আর নিরীহ মানুষ। তাই ছাত্ররা মানতো না তাকে। তাই চাকরি হারাতে হয় তাকে। গ্রামের মানুষজন এমনকি তার স্ত্রী-পুত্ররাও তার খোজঁখবর রাখে না। তাই তো দৈত্যটার সাথে দেখা হওয়ার পর ভাব জমানোর চেষ্টা করেন আমাদের দুঃখবাবু। কিন্তু তার সাথেও ভাব হলো না দুঃখবাবুর। ও হ্যাঁ ইদানিং আবার দুঃখবাবু ভূতের উপদ্রবে আক্রান্ত। সকাল-সন্ধ্যা ভূতের গাট্টা খেয়ে বেচারা আরো নাস্তানাবুদ। পুটেঁ সর্দার গ্রামের বুড়োদের একজন। একসময় ডাকাতি করে বেড়াতেন। বয়সের ভারে এখন আর ডাকাতি করতে পারেন না। কানেও শুনেন না ঠিক মতো। তবে মজার কথা হলো, তিনি রাত বারোটার পর কানে শুনতে পান। দৈত্যের দেখা তিনিও পেয়েছিলেন। দৈত্যকে যমদূত ভেবে যা করলেন পুটেঁ সর্দার...!
এক রাতের ভিতরেই দৈত্যের সাথে অনেকের দেখা হয়। জাদুকর নয়ন বোস, হরিহর পন্ডিত, গ্রামের সবচেয়ে হাড়কিপ্টা হাবু বিশ্বাস। পরদিন সকালে গ্রামে হৈচৈ পড়ে যায়। কে এই দৈত্য? কি উদ্দ্যেশ্যেই তার আগমন? সেই মজার রহস্যজনক কাহিনী জানতে পড়তে হবে "নবীগঞ্জের দৈত্য" বইটি।
নবীগঞ্জে শরৎকালের সকাল। চারদিকে বেশ নরম রোদ। গাছে-গাছে পাখি ডাকছে। প্রজাপতি উড়ছে। গরুর হাম্বা শোনা যাচ্ছে। হরিহরের পাঠশালায় ছেলেরা নামতা মুখস্থ করছে। মহিমের পিসি উঠোনের কোণে ভাত ছড়িয়ে কাকদের ডাকাডাকি করছে। পাঁচু চোর সারারাত চু*রির চেষ্টা করে বাড়ি ফিরে পান্তাভাত খেতে বসেছে। রায়বাবু রুপোবাঁধানো লাঠি হাতে প্রাতভ্রমণ করতে বেরিয়েছেন, সঙ্গে কুকুর।
হাড়কেপ্পন হাবু বিশ্বাস খালের জলে গামছা দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। নিমাই আর নিতাই দুই বন্ধু পুকুরের ধারে বসে দাঁতন করতে করতে সুখ-দুঃখের গল্প করছে। শিকারি বাসব দত্ত তার দাওয়ায় বসে পুরনো ব*ন্দুকটায় তেল লাগাচ্ছে। জাদুকর নয়ন বোস বাইরের ঘরে বসে পামিং-পাসিং প্র্যাকটিস করছে। হরেন চৌধুরী ওস্তাদি গানের কালোয়াতি করে যাচ্ছে। আর বটতলায় হলধরের কাছে বসে ন্যাড়া হচ্ছে পুঁটে সর্দার। নবীগঞ্জের মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার এমনই হয় রোজ রোজ।
নবীগঞ্জের একসময়ের জাঁদরেল রাজা ছিলেন ক্ষেত্রমোহন, তিনি বহুদিন গত হয়েছেন। তস্য পুত্র পূর্ণচন্দ্রও আর নেই। তবে ক্ষেত্রমোহনের নাতি আজও আছে। তার নাম বীরচন্দ্র। নামে বীর হলেও বীরচন্দ্র মোটেই বীর নয়। সাঙ্ঘাতিক লাজুক প্রকৃতির বীরচন্দ্র রাজবাড়ির ভেতরে লোকচক্ষুর অন্তরালে বাস করে। কারও সঙ্গে দেখা করে না। একা-একা বীরচন্দ্র যে প্রাসাদের মধ্যে কী করে তা কেউ জানে না। বিয়েটিয়ে করেনি। রাজবাড়ির সেই জৌলুস নেই, দাস-দাসী, দারোয়ান, বরকন্দাজ ওসব কিছু নেই। থাকার মধ্যে এক বৃদ্ধ চাকর বনমালী আছে। আর আছে আরো অধিক বৃদ্ধ এক রাঁধুনি। একজন সরকারমশাইও আছেন বটে, কিন্তু আদায়-উশুল নেই বলে তিনি বসে বসে মাছি তাড়ান আর মাঝেমধ্যে বাজারহাট করে দেন।
নবীগঞ্জের সবচেয়ে দুঃখী লোক হলেন দুঃখহরণ রায়। ছোটখাটো, দুর্বল, ভিতু এই মানুষটি একসময়ে নবীগঞ্জের স্কুলে মাস্টারি করতেন। কিন্তু ছেলেরা তাঁর কথা মোটেই শুনত না, ক্লাসে ভীষণ গণ্ডগোল হত। হেডসার প্রতাপচন্দ্র মার্কণ্ড অবশেষে দুঃখবাবুকে ডেকে বললেন, “এভাবে তো চলতে পারে না। আপনি বরং কাল থেকে আর ক্লাস নেবেন না, কেরানিবাবুকে সাহায্য করবেন। ওটাই আপনার চাকরি।”
দুঃখবাবু একথায় খুব দুঃখ পেয়ে চাকরি ছেড়ে দিলেন। তাঁর দজ্জাল স্ত্রী চণ্ডিকা এতে প্রচণ্ড রেগে গিয়ে দুঃখবাবুকে খুব কড়া কড়া কথা শোনাতে লাগলেন দুবেলা। দুঃখবাবু অগত্যা বাড়ির বাইরের দিকে একখানা খোঁড়া ঘর তুলে আলাদাভাবে বাস করতে লাগলেন। তাঁর দুটো ছেলে রাম আর লক্ষ্মণ নবীগঞ্জের কুখ্যাত ডানপিটে দুষ্টু ছেলে। তাদের অত্যাচারে লোকে জর্জরিত।
রেলস্টেশন নবীগঞ্জ থেকে মাইল-দেড়েক দূরে। ব্রাঞ্চ লাইনের ছোট্ট স্টেশন। সারাদিনে দুখানা আপ আর দুখানা ডাউন গাড়ি যায়।
রাত দশটার ডাউন ট্রেনটা পাস করানোর জন্য পয়েন্টসম্যান ভজনলাল স্টেশনে এসেছে। এ-সময়টায় স্টেশন মাস্টারমশাই থাকেন না। ভজনলাল ডাল রুটি পাকিয়ে রেখে সময়মতো চলে আসে। ট্রেন পাস করিয়ে দিয়ে খেয়ে ঘুম লাগায়। এই ট্রেনে যাত্রী থাকে না। কেউ নামেও না, ওঠেও না।
আজও ট্রেনটা পাস করাচ্ছিল ভজনলাল। কিন্তু ট্রেনটা এসে দাঁড়াতেই সামনের কামরার একটা দরজা পটাং করে খুলে গিয়ে একটা দৈত্যাকৃতির বিভীষিকা নেমে এল। পরনে জরির পোশাক ঝলমল করছে। এরকম লম্বাচওড়া লোক ভজনলাল জীবনে দেখেনি। দুখানা হাত যেন শালখুঁটি, কাঁধ দু’খানা গন্ধমাদন বইতে পারে, আর বুকখানা যা চওড়া ভজনলালের খাঁটিয়াখানা বোধ হয় তাতে এঁটে যায়। লোকটা কামরা থেকে লাফ দিয়ে নেমে সামনে ভজনলালকে দেখেই হুহুঙ্কারে জিজ্ঞেস করল, “উও কাঁহা?”
ভজনলাল ভয়ে ভয়ে বুঝতে পারলো লোকটা কাউকে খুঁজছে কিন্তু তাকে কী আর ভজনলাল চেনে! ভজনলাল দেখল লোকটা এগিয়ে যাচ্ছে স্টেশন থেকে নবীগঞ্জের দিকে। নবীগঞ্জে এই নতুন লোকটার আগমন ঘটেছে কেন? সে কী চায়? কাকেই বা খুঁজছে? অবশ্য লোক না বলে দৈ*ত্য বলা ভালো। নবীগঞ্জে নতুন দৈ*ত্যের আগমন ঘটেছে।
🕯️পাঠ প্রতিক্রিয়া🕯️
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের "অদ্ভুতুড়ে সিরিজ" আমার খুবই পছন্দের সিরিজ বলা যায়। "নবীগঞ্জের দৈ*ত্য " অনেকদিন আগে একবার পড়েছিলাম। তবে তখন তো আর রিভিউ লিখতাম না তাই ভাবলাম বইটা নিয়ে এবার একটু আলোচনা করা যাক। ছোট সাইজের বই, তবে বর্ণনা বেশ ভালো। কিশোর উপযোগী দারুন লাগবে। তবে সবাই এই ধরনের বই পড়ে অভ্যস্ত কী না জানি না। টুইস্ট কিন্তু শেষটায় অতটা আহামরি না। তাই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না হয়তো।
তবে গ্ৰামীন ভাইবে বর্ণনাগুলো ভালো লাগলো। আমার এই ধরনের বই ভালো লাগে। খুব আহামরি না আবার বেশ ভালোও লাগবে চরিত্রগুলো। নাম যেহেতু অদ্ভুতুড়ে সিরিজ তো কিছু ভৌতিক কীর্তিও থাকবে স্বাভাবিক। এবং এই সিরিজের বইগুলো আমি তখনই পড়ি যখন ভারী ভারী টপিকে বই পড়তে ক্লান্ত হয়ে যাই। তখন বেশ রিল্যাক্স ফিল করি।
এই সিরিজ সবার জন্য নয়। কিশোর উপন্যাস পড়েন যারা নিয়মিত কিংবা এখনো যাদের কিশোর উপযোগী বইগুলো ভালো লাগে তাদের জন্য পারফেক্ট। বাকিরা পড়লে হয়তো বলতে পারেন আরেকটু ছোটবেলায় পড়লে বুঝি মজা পেতাম।
কেউ বোকা থাকবে তো কেউ চালাক। চালাক বোকাকে ঠকাবে না। আবার বোকাও প্রয়োজনের সময় ঠিকই তার অংশের কাজটা করে দেবে। বোকাকে চালাক ফেলে সামনে এগোবার চেষ্টা করবে না। বরং সবাই মিলেমিশে এগোতে চাইবে। অনেক আনন্দ করবে। এই তো শীর্ষেন্দুর গঞ্জ! শীর্ষেন্দুর গঞ্জ ছড়িয়ে পড়ুক আমাদের মনে মনে।
ছোটবেলায় আজব গাঁয়ের আজব কথা নামে একটা সিনেমা দেখেছিলাম, অনেক হাসির সিনেমা ছিলো, ওটা যে এই বই অবলম্বনে বানানো তা তখন জানতাম না, জেনেছি অনেক পড়ে। অদ্ভুতুরের অনন্য বই গুলোর মতই মজাদার বই এটি। নবীগঞ্জের শান্ত-সরল গ্রামে এক রাতে হঠাৎ করেই দেখা দেয় এক দৈত্যাকৃতি লোক, যার আগমনকে ঘিরে শুরু হয় রহস্য আর উত্তেজনা। এই গল্পে রহস্য, কৌতুক আর নিখাদ গ্রামবাংলার স্বাদের এক কম্বো পাওয়া যায়। একাধিক চরিত্র- পয়েন্টসম্যান ভজনলাল, চোর পাচুঁ, দুঃখবাবু, পুঁটে সর্দার, জাদুকর নয়ন বোস, যেন প্রত্যেকেই একেকটা ছোট গল্পের মত। বিশেষ করে দৈত্যরূপী লোকটির খোঁজাখুঁজি, দুঃখবাবুর মজার কান্ড কারখানা আর গ্রামে ঘটে চলা অদ্ভুত ঘটনার পেছনের রহস্য ধীরে ধীরে উন্মোচিত হওয়াটা দারুণ আকর্ষণীয়। হালকা মন নিয়ে পড়ার মতো একটি বই, যেটা ক্লান্তি কাটানোর জন্য দারুণ উপযোগী। কিশোর থেকে শুরু করে বড়দের কাছেও আনন্দদায়ক হতে পারে এই মজার গ্রাম্য রহস্যগল্পটি।
শান্তশিষ্ট গ্রাম নবীগঞ্জ। নামে মাত্র রাজা বীরচন্দ্র রায়চৌধুরীর গ্রামে তেমন বড় কোনো সমস্যা নাই, মোটামুটি শান্তিতেই আছে এর বাসিন্দারা। কিন্তু হঠাৎ করে গ্রামে যখন এক দৈত্য উপস্থিত হলো তখন হৈচৈ পড়ে গেল গ্রামে। আসলে ওটা দৈত্য না, অতিকায় এক মানুষ যে খুঁজে বেড়াচ্ছে আরেকজনকে। প্রথমে গ্রামের মানুষদের সে নাজেহাল করলও অচিরেই গ্রামের পন্ডিত মাধব ঘোষাল বের করে ফেলল তার আসল পরিচয়। কিন্তু তাতে সমস্যা বাড়ল বৈ কমল না। গুপ্তধন, ডাকাতদল, খুন ইত্যাদি নানা কথা শোনা যেতে লাগল। এবার?
মজার একটা বই। সিরিজের অন্যান্য বইয়ের মতো এখানেও আছে অদ্ভুত কিছু চরিত্র আর ভূতের কাজকারবার। সাথে মাধব ঘোষালের গোয়েন্দাগিরি বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে বইটাতে। পয়েন্টসম্যান ভজনলাল, চোর পাঁচু, মাস্টার দুঃখবাবু, অবসরপ্রাপ্ত ডাকাত (!) পুঁটে সর্দার প্রতিটা চরিত্রই মজার ছিল। প্রথমদিকে দুই বধির পুঁটে সর্দার আর হলধরের সংলাপ বা ভুজঙ্গবাবুর নাম নিয়ে এলোমেলো কাজকারবারে বেশ মজা পেয়েছি। দৈত্যরূপী কিঙ্করের সাথে দুঃখবাবু আর পুঁটে সর্দারের প্রথম সাক্ষাৎও বেশ মজাদার ছিল। শেষটায় একটু তাড়াহুড়ো হয়ে গিয়েছে, এছাড়া বাদবাকি সুন্দর ছিল। সিরিজের অন্যতম পছন্দের একটা বই।
অলস বৃষ্টির দিনে এমনি এমনি পড়ার মত বই। দুঃখবাবুর গাট খাওয়া থেকে শুরু আর নবীগঞ্জে বিশালদেহী এক লোকের আগমণে কাহিনী জমে উঠে, কোন এক লোককে খুঁজতে এসেছে সে। আর সেই সাথে গাঁয়ের চমৎকার সব চরিত্র। কিশোর বয়সে পড়লে হয়তো আরও বেশি ভালো লাগতো।
অদ্ভুতুড়ে সিরিজের অন্যতম প্রিয় গল্প। চাইব শীর্ষেন্দু বাবু যেন এই সিরিজ লেখা বন্ধ না করেন, কারণ এগুলো আমার কাছে শৈশবে ফিরে যাওয়া টাইম মেশিনের মতো কাজ করে।
#এক্কেবারে পাতে দেওয়ার যোগ্য নয়, gimmik আর hype-এর ডানায় ভর দিয়ে ভেসে থাকা ওভাররেটেড বই
বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ : Overrated মানেই খারাপ না। অনেক সময় বইগুলো cultural বা emotional value-র জন্য বড় হয়ে ওঠে, অথচ সাহিত্যমান হয়তো তেমন উঁচু নয়।
গল্পটা শুরু হয় বেশ দারুণ এক premise নিয়ে – দৈত্য আছে, গ্রামে রহস্যঘন ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কয়েক পাতা পড়লেই বোঝা যায়, সবই ঢেঁকিতে চিঁড়ে বানানো কল্পনা। suspense তৈরির যত ফোস্কা আওয়াজ, সবই শেষে গিয়ে ফাঁকা বেলুন।
এই গল্পে যত না ‘রহস্য’, তার চেয়ে বেশি ‘রহস্যের ভান’। যেন পাঠককে গিমিকে চুমু খাইয়ে চুপ করিয়ে রাখা হচ্ছে।
শীর্ষেন্দুর trademark হলো চরিত্রদের quirky ভাব, আর সেইসব হাস্যরসে মাখানো দিনপঞ্জি। কিন্তু এখানে সেই রসটা এত overused, আর রহস্যের সঙ্গে এত poorly blend করা, যে পুরো জিনিসটা একধরনের tone-confused সাহিত্য-খিচুড়ি হয়ে দাঁড়ায়।
পড়তে পড়তে মনে হয় – এটা কি কমেডি? নাকি ট্রেজেডি? নাকি গোয়েন্দা উপন্যাস? নাকি মফস্বলের রামগরুড়-রিপোর্ট?
না আছে কোনোকিছু layered চরিত্রায়ন, না আছে বাস্তবধর্মিতা। যেন সব চরিত্রকে ফেলে দেও���়া হয়েছে লেখকের পুরনো মানসিক কস্টিউম বাক্সে – যেখানে প্রত্যেকেই পূর্বনির্ধারিত ছাঁচে কথা বলে, হাসে, ঘুরে বেড়ায়।
"দৈত্য" তো বলতে গেলে চরিত্রই না – একটা ভয় দেখানো কল্পনার ফাঁকা প্যাকেট, যার শূন্যতাকে লেখক রহস্য বলে চালিয়ে দিয়েছেন।
এই বইয়ের কাহিনির গঠন এতটাই lazy যে পাঠক একসময় জানে – "হ্যাঁ, শেষে কেউ দৈত্য বের হবে না, সব ভুল বোঝাবুঝি, অতএব চা খাও, বাড়ি যাও!"
Suspense বা চমকের আশা যদি থাকে, পাঠককে হতাশ হতে হবে। গল্প শেষে মনে হয়, লেখক যেন নিজেই নিজের ওপর একটু বিরক্ত – "এতটাও কি ক্লিশে লেখার দরকার ছিল, শীর্ষেন্দু?"
"নবীগঞ্জের দৈত্য" আজও আলোচনায় শুধু একটা কারণে – আমরা এই বইটা পড়েছি সেই বয়সে, যখন চায়ের কাপের বুদবুদের মধ্যেও অ্যাডভেঞ্চার দেখতাম।
তাই এটা হয়তো মনে জায়গা করে নিয়েছে, কিন্তু নির্ভেজাল সাহিত্য হিসেবে বইটা একেবারেই shallow, inconsistent, আর craft-এর দিক থেকে একদম safe-zone-এ বসে থাকা এক lazy creation।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা মানেই যেন আমাদের শৈশবের ছায়া পড়ে থাকা দুপুর, বর্ষার ছুটির ঘোরলাগা বিকেল, আর সেইসব সাদা কাগজে আঁকা রহস্যের ম্যাপ, যা এখনও বুকের ভেতরে দোলা দেয়।
আমি নিজে একেবারে ঈশ্বরের মতো ভক্তি করি শীর্ষেন্দুকে। যাঁর লেখার হাতে ছিল সময়ের ছোঁয়া, যাঁর কলমে ছিল একইসাথে চমক, চিন্তা আর চিরন্তন এক নিজস্ব স্টাইল।
তবে, এই ভক্তির ভেতরেও যে সততার জায়গাটা রয়েছে, সেটা থেকেই বলি—বৃহত্তর পাঠকপ্রেক্ষিতে "অদ্ভুতুড়ে" সিরিজটাকে আমরা একটু বেশি হাইপ দিয়ে ফেলেছি।
এখন আসল কথা — অদ্ভুতুড়ে সিরিজ কি সত্যিই ততটা "অদ্ভুত"?
মনে রাখতে হবে, এই সিরিজ যখন জনপ্রিয়তার চূড়ায়, তখন বাস্তবে শীর্ষেন্দুর লেখক-জীবনের ‘Prime Phase’টা হয়তো পেরিয়েও গেছে।
আমার জন্ম ১৯৭৯-এ। আমার স্পষ্ট ধারণা, শীর্ষেন্দুর ক্রিয়েটিভ শিখরটা আমাদের জন্মের পাঁচ-ছয় বছর আগে শুরু হয়ে, জন্মের দশ-বারো বছর পর অবধি ছিল সবচেয়ে উর্বর।
অথচ আজকের অনেক পাঠক — বিশেষ করে মিলেনিয়াল পাঠকমহল — "অদ্ভুতুড়ে" সিরিজের টাইমলাইনকে একটু stretch করে নেন। গল্পগুলোর গায়ে এমন এক nostalgia filter বসানো হয়, যাতে ওভাররেটেড হাইপটাকে কেউ আর প্রশ্নই করে না।
কিন্তু সত্যি বললে — এই সিরিজ অনেকটাই uneven, inconsistent
“ভূত”, “জ্যান্ত বাড়ি”, “ভেলকি বিজ্ঞানী”, “আলৌকিক শক্তি” — সব কিছু মিশিয়ে এক চটজলদি মেনু, যার মধ্যে কিছু গল্প আসলেই ব্রিলিয়্যান্ট (যেমন “মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি”), কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গল্পগুলো পড়ে মনে হয় যেন শীর্ষেন্দু নিজেই নিজের ছায়াকে follow করছেন।
এগুলো original invention কম, self-reference বেশি। মানে একধরনের "নিজের তৈরি myth"-এ বারবার ফিরতে থাকা।
সুতরাং, একটা প্রশ্ন থেকেই যায়: এই সিরিজটা সত্যিই timeless? নাকি কেবলমাত্র আমাদের nostalgia-র smoke machine-এ তৈরি হওয়া আলো?
আমি বলি—ভালো গল্প timeless হয়, সিরিজ নয়। "অদ্ভুতুড়ে" সিরিজের কিছু বই নিশ্চয়ই থাকবে পাঠক-মানচিত্রে, কিন্তু পুরো সিরিজটাকে "প্যারালাল ফেলুদা" বা "সমকালীন হ্যারি পটার" বানিয়ে ফেলা আসলে একধরনের sentimental inflation।
একদম শেষে নবলবো, "নবীগঞ্জের দৈত্য" – বইটা যতটা স্মৃতি, তারচেয়েও কম সাহিত্য। গল্পে নতুনত্ব নেই, চরিত্রে ছন্দ নেই, আর দৈত্যটার তো হিম্মতই নেই!
এই বই আসলে এক ধরণের “childhood placebo” – যেটা পড়ে মনে হয় “বাহ, শীর্ষেন্দু তো!”, কিন্তু একটু বড়ো হলে ঠান্ডা মাথায় ভাবলে বোঝা যায় – “বাহ” বলে ওঠাটাও হয়তো অভ্যাস ছিল, উপলব্ধি নয়।