"বাঁশি শুনে আর কাজ নাই
সে যে ডা*কাতিয়া বাঁশি"
ময়নাগড়ের দিঘির ধারে সন্ধেবেলায় চুপটি করে বসে আছে বটেশ্বর। চোখে জল, হাতে একখানা বাঁশি। পুবধারে মস্ত পূর্ণিমার চাঁদ গাছপালা ভেঙে ঠেলে উঠবার চেষ্টা করছে। বটেশ্বর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের বাঁশিটার দিকে তাকাল। বহুকালের পুরনো মস্ত বাঁশি, গায়ে রুপোর পাত বসানো, তাতে ফুলকারি নকশা। দিন তিনেক আগে সকালবেলায় ঝোলা কাঁধে একটা লোক এসে হাজির। পরনে লুঙ্গি, গায়ে ঢলঢলে জামা, মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল, মাথায় ঝাঁকড়া চুল। রোগাভোগা চেহারার লোকটা বলল, কোনও রাজবাড়ির কিছু জিনিস সে নিলামে কিনেছে, আর সেগুলোই বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিক্রি করছে।
পুরনো আমলের রুপোর টাকা, জরিবসানো চামড়ার খাপে ছোট্ট ছুরি, অচল পকেটঘড়ি, পেতলের দোয়াতদানি, পাশা খেলার ছক, হাতির দাঁতের পুতুল, এরকম বিস্তর জিনিস ছিল তার সঙ্গে আর ছিল এই বাঁশিটা। বটেশ্বর জীবনে কখনও বাঁশি বাজায়নি, তবে বাজানোর শখটা ছিল। লোকটা বলল, “যেমন তেমন বাঁশি নয় বাবু, রাজবাড়ির পুরনো কর্মচারীরা বলেছে, এ হলো মোহন রায়ের বাঁশি।”
“মোহন রায়টা কে?”। “তা কি আমিই জানি! তবে কেষ্টবিষ্টু কেউ হবেন। বাঁশিতে নাকি ভর হয়।”লোকটা দুইশো টাকা দাম চেয়েছিল। বিস্তর ঝোলাঝুলি করে একশো টাকায় যখন রফা হয়েছে তখন বটেশ্বরের বউ খবর পেয়ে অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে এসে র*ণরঙ্গিনী মূর্তি ধারণ করে বলল, “টাকা কি খোলামকুচি? একটা বাঁশির দাম একশো টাকা! বলি জীবনে কখনও বাঁশিতে ফুঁ দাওনি, তোমার হঠাৎ কেষ্টঠাকুর হওয়ার সাধ হল কেন? ও বাঁশি যদি কেনো তা হলে আমি হয় বাঁশি উনুনে গুঁজে দেব, না হয় তো বাপের বাড়ি চলে যাব।”
ফলে বাঁশিটা তখন কেনা হল না বটে, কিন্তু ঘণ্টাখানেক বাদে বটেশ্বর যখন বাজারে গেল তখন দেখতে পেল বুড়ো শিবতলায় লোকটা হা-ক্লান্ত হয়ে বসে আছে। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে সে বাঁশিটা কিনে ফেলল। ফেরার সময় খিড়কির দরজা দিয়ে ঢুকে গোয়ালঘরের পাটাতনে বাঁশ বাখারির ভিতরে খুঁজে রেখে দিয়ে এলো। আশ্চর্যের বিষয়, সেদিন রাতে তার ভালো ঘুম হলো না। তার কেবলই মনে হচ্ছিল বাঁশিটা যেন তাকে ডাকছে। নিশির ডাকের মতো, চুম্বকের মতো। কেবলই ভয় হতে লাগল, বাঁশিটা চু*রি যাবে
আজ তার বউ বিকেলে পাড়া-বেড়াতে গেছে। সেই ফাঁকে বাঁশিটি বের করে নিয়ে দিঘির ধারে এসে বসেছে বটেশ্বর। বটেশ্বর বাঁশি বাজাতে জানে না বটে, কিন্তু বাঁশিটাকে সে বড় ভালবেসে ফেলেছে। কিন্তু হায়, বটেশ্বর বাঁশিতে ফুঁ দিতেও জানে না।বিমর্ষ মনে বাড়ি ফিরে বাঁশিটা গোয়ালঘরে যথাস্থানে রেখে বটেশ্বর যখন ঘরে ঢুকল তখন তার বউ বলল, “ওগো, আজ সন্ধেবেলায় দুটো লোক তোমার খোঁজে এসেছিল।” জিজ্ঞেস করল একজন বুড়ো মানুষের কাছ থেকে আমরা একটা রুপো বাঁধানো বাঁশি কিনেছি কি না। যদি কিনে থাকি তবে তারা বাঁশিটা ডবল দামে কিনে নেবে।
বটেশ্বরের বউ নাকি বলেছে একজন বুড়োমানুষ বাঁশি বেচতে এসেছিল বটে, দরদামও হয়েছিল, কিন্তু শেষ অবধি আমরা নিইনি। তখন তারা জিজ্ঞেস করল, বাঁশিটা কে কিনেছে তা বটেশ্বরের বউ জানে কি না। বটেশ্বর সব শুনে চুপচাপ রইলো। কোনো কথার জবাব দিলো না। চিন্তিত মুখে সে কুয়োপাড়ে হাত মুখ ধুতে গেল। বাঁশিটার কী এমন মহিমা যে, লোকে ডবল দামে কিনতে চায়! ঘটনাটা বেশ চিন্তায় ফেলে দিলো তাকে। তবে এটা বোঝা শক্ত নয় যে, বাঁশিটা খুব সাধারণ বাঁশি হলে লোকে বাড়ি বয়ে খবর করতে আসতো না। সুতরাং বটেশ্বরের বুকের ধুকধুকুনিটা কমলো না। কী আছে ওই বাঁশিতে?
🥅পাঠ প্রতিক্রিয়া 🥅
গল্পগুলো একটু অদ্ভুত। সচরাচর যেমন গল্প হয় ঠিক তেমন নয়। খানিকটা কল্পনা, খানিকটা বাস্তব আবার কিছুটা বোধহয় অনুমান। তবে এই গল্পগুলো কিশোরদের লাগবে ভালো বারবার এটা বলাই বাহুল্য। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের "অদ্ভুতুড়ে সিরিজ" আমার খুবই পছন্দের সিরিজ বলা যায়। "মোহন রায়ের বাঁশি" অনেকদিন আগে একবার পড়েছিলাম। তবে তখন তো আর রিভিউ লিখতাম না তাই ভাবলাম বইটা নিয়ে এবার একটু আলোচনা করা যাক। কারণ গল্পটা আর যাই হোক মন্দ নয়। গ্ৰাম্য পটভূমি আছে, আছে কিংবদন্তি, রাজরাজাদের কথা। এবং এখানে কিছুটা জাদুময় ব্যাপারও আছে। ছোট সাইজের বই, তবে বর্ণনা বেশ ভালো। কিশোর উপযোগী দারুন লাগবে। তবে সবাই এই ধরনের বই পড়ে অভ্যস্ত কী না জানি না। টুইস্ট কিন্তু শেষটায় অতটা আহামরি না। তাই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না হয়তো। অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বইগুলো হালকা মেজাজে পড়লে ভালো লাগবে এবং মনে হবে আরেকটা পড়ি বরং।
তবে ওই যে যারা কমেন্ট দেন ছোটবেলায় পড়লে ভালো লাগতো তারা আসলে এসব বইয়ের মজা থেকে বঞ্চিত বলে মনে হয়। আমার এই ধরনের বই ভালো লাগে। খুব আহামরি না আবার বেশ ভালোও লাগবে চরিত্রগুলো। নাম যেহেতু অদ্ভুতুড়ে সিরিজ তো কিছু ভৌতিক কীর্তিও থাকবে স্বাভাবিক। এবং এই সিরিজের বইগুলো আমি তখনই পড়ি যখন ভারী ভারী টপিকে বই পড়তে ক্লান্ত হয়ে যাই। তখন বেশ রিল্যাক্স ফিল করি।
🥅বইয়ের নামঃ "মোহন রায়ের বাঁশি"
🥅লেখকঃ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
🥅ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৩.৭/৫