এই উপন্যাস এমন এক কাল্পনিক বাংলাদেশের কথা বলে, যে-দেশের শাসনক্ষমতা মৌলবাদী গোষ্ঠীর হাতে। এই জনপদে তখন এক অদ্ভুত অন্ধকার নেমে এসেছে। এখানে গান গাওয়া নিষিদ্ধ, প্রাণীর ছবি আঁকা অপরাধ। জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো প্রচারণা নেই। সেই অন্ধকার জনপদে এক শিল্পী-দম্পতির দুর্দশা ও হয়রানি দিয়ে এই উপন্যাস শুরু হয়। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় আরো বড় প্রেক্ষাপট। ‘অন্ধকারের একশ বছর’-কে বলা যেতে পারে এই উপমহাদেশে ক্রমপ্রসারমান এক অন্ধকারের গল্প। হয়ত এ-গল্প নিছকই কল্পনা। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা কে বলতে পারে? কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তি একান্তই যদি দেশের শাসক হয়ে বসে, কেমন হবে দেশের ভবিষ্যৎ? উপন্যাসটি তারই আভাস জানায়।
Anisul Hoque (Bangla: আনিসুল হক) is a Bangladeshi screenwriter, novelist, dramatist and journalist. He graduated from Bangladesh University of Engineering and Technology, trained as a civil engineer.
His inspiration in journalism and writing started during his student life. After his graduation he joined to serve as a government employee but resigned only after 15 days. Instead he started working as a journalist. He attended the International Writing Program at the University of Iowa in 2010. Currently, Hoque is working as an Associate Editor of a Bengali language daily, Prothom Alo.
His novel মা was translated in English as Freedom's Mother. It was published in Maithili too. He was honored with Bangla Academy Award in 2011.
দরিয়ার পাশে কোনো আওরাতের আসার নিয়ম নেই।তাতে দরিয়ার পর্দা নষ্ট হয়।সমুদ্রের পবিত্রতা নষ্ট করা খুবই গুনাহের কাজ। বইয়ের প্রথম পাতায় উপরোক্ত বাক্য পড়েই পাঠক ধারণা করতে পারবে তারা কীসের গল্প পড়তে যাচ্ছে।এটি ভবিষ্যতের এমন এক সময়ের গল্প যখন ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের উত্থান ঘটেছে,শিল্পচর্চা নিষিদ্ধ, মেয়েদের বাইরে বেরুনো নিষিদ্ধ, জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা যেখানে অপরাধ, এমনকি ফুটবল খেলাও রাষ্ট্রদ্রোহিতা।পড়তে পড়তে প্রশ্ন জাগে,লেখক যে "ভবিষ্যৎ" এর কথা বলেন সেই "ভবিষ্যৎ" কি এসে পড়েনি এর মধ্যে? "এদেশে নবী-রাসূলের ক্রিয়া-কর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে কিন্তু মওদুদীবাদ নিয়ে নয়।" বা কথায় কথায় ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ তুলে মানুষ মারার কথা পড়লে মনে হয় লেখকের কথিত জগতেই তো বাস করছি।আহামরি ভালো কাজ নয়,আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে আনিসুল হককে বহু প্রসঙ্গের অবতারণা করতে হয়েছে যা উপন্যাসের শিল্পগুণ নষ্ট করেছে।কিন্তু লেখাটি দুঃসাহসী ও সময়োপযোগী একথা অস্বীকার করার উপায় নেই।ভাবা যায়?বিএনপি -জামায়াতের আমলে এ বই লিখে লেখক বহাল তবিয়তে আছেন,তখন এই স্বাধীনতাটুকু ছিলো অথচ এ ধরনের "কল্পকাহিনি" লিখতে লেখক এখন আর সাহস পাবেন না।কেন সাহস পাবেন না সেকথা আমি বলবো না।আমি যে কারণে বলবো না,আনিসুল হক সেই কারণেই সাহস পাবেন না।কি নির্মম পরিহাস ইতিহাসের!!!
মাত্র পড়ে শেষ করলাম আনিসুল হকের বেশ তরুন বয়সের একটা উপন্যাস 'অন্ধকারের একশ বছর'। ১৯৯৫ সালে লেখা একটা উপন্যাস কিভাবে সময়ের চেয়ে এত অগ্রগামী হয় সেটা বাংলাদেশের আজকের সময়টার আগে হয়ত কেউ এভাবে অনুভব করতে পারতো না। এই উপন্যাস লেখার পরে ২০ বছর চলে গেল এবং বিগত বিশ বছরে ধীরে ধীরে এই বইয়ের অনেক ঘটনাই একের পর এক ঘটে গিয়েছে। এরপরের ভবিষ্যতের কথা হয়তো আমরা বর্তমান দেখে অনুমান করে নিতে পারি। কিন্তু সেই ভবিষ্যতে কি ঘটতে যাচ্ছে সেটা শেষমেশ অনুমানের হাতে নেই।
বইয়ের রিভিউতে আমি কিছু লিখব না। যারা বইটি নিয়ে কিছুই জানেন না তাদের জন্য শুধু একটা শব্দই লিখে দেয়া যায় 'জামায়াত-ই-ইসলামী'। বাকিসব কিছু যার যার কষ্টকল্পনার বা পড়ে ফেলবার জন্য তুলে রাখলাম।
এরকম একটা বই লিখে ফেলার পর আজকের দিনে আনিসুল হক যতই বাজারি আর পরিবর্তিত মডারেট লেখক হয়ে যান না কেন তাতে আদৌ কোন লাভ আছে বলে অন্তত আমার মনে হয় না। তিনি যদি মনে করে থাকেন যে এই মডারেট রূপ তাকে ঘাতক শ্রেণীর কাছেও গ্রহনযোগ্য করে তুলবে তবে হয়ত সেটা ভুল।
লেখার ধরন আর আঙ্গিক নিয়ে কিছু কথা লেখার আছে। আনিসুল হকের মধ্যে হুমায়ুন আহমেদের অল্প কিছু ছায়া পাই আমি। লেখার ভঙ্গি সাবলিল, পড়তে আটকায় না। আবার হুমায়ুন আহমেদের মতই কিছু শব্দ বা শব্দ গুচ্ছের বার বার ব্যাবহারের অভ্যাসও দেখা যায় এই বইয়ে। পুরো বইটাই বেশ তথ্যবহুল। বইয়ের দামের পাতাতেই লেখা আছে যে যেসব কেতাবি উক্তি ব্যবহৃত হয়েছে তার সবগুলোই সত্য। এর বাইরে আমাদের আশেপাশের সব রাজনীতিবিদদের নামকে পরিবর্তিত উপায়ে তুলে ধরার ব্যাপারটা পুরো উপন্যাসকে আরো বোধগম্য আর আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ভবিষ্যতে লেখক এখনকার মত নিজের ঢোল নিজে পেটানো বাদ দদিয়ে আবার তার এই পুরানো রূপে ফিরে আসবেন এ আশাই মনে নিয়ে লেখা শেষ করছি।
এক কাল্পনিক ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্রক্ষমতা ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে। এমতাবস্থায় দেশে যা ঘটে তা নিয়ে এ উপন্যাস। যদি মনে হয়, হতে পারে বলে যা যা দেখানো হয়েছে বইয়ে, সেসব বাড়াবাড়ি, তাহলে আমি কোনো বালও বুঝি না। আলামত কি গত কয়েকমাস ধরে কম দেখা যাচ্ছে? বইটা পড়তে পড়তেই তো এক বুড়ো-শকুনের মুখে শোনা যায় নারীর নাচ ও গান বিষয়ক এক পরস্পরবিরোধী হাস্যকর কথা। স্বাধীনতা তোমাদের আমরা দেব, কিন্তু এই স্বাধীনতা কোথায় বা কীভাবে প্রয়োগ করতে পারবে তা-ও আমরাই ঠিক করব! স্বভাবতই মনে প্রশ্ন আসে, যে অন্ধকারের কথা উপন্যাস জুড়ে, তা কি সমাগত? বর্তমান সময়টা এ বই পড়ার জন্য খুবই উপযুক্ত। আর আমার পড়া আনিসুল হকের একমাত্র ভালো লেখা এটা।
একশ বছর কত দীর্ঘ, একশ বছরের অন্ধকার কত গভীর অন্ধকারে থাকি বলে হয়ত জানি না! এত শক্ত বিদ্রুপাত্মক গ্রন্থনা নাড়িয়ে দেয়ার মত। '৯৫ এর বই এখনো তার প্রেক্ষাপট হারায়নি, এখনো সত্য এ ব্যাপারটা কত আচানক! হতে পারত এ একশ বছর বিগত একশ বছর। কিন্তু অবাক করে দিয়ে এ একশ বছর ভবিষ্যতের জন্য ছিল। একশ বছরের অন্ধকার আলো এনে দেবে সে কথাও বলে না। এরপর যা হবে তার জন্য 'অন্ধকার'-ও হয়ত যথেষ্ঠ নয়। বইয়ের গান এখানে গাই নি। এ বইয়ে গান গাওয়ার কিছু নেই। কৌতুকের অন্তরালে জাতির কিছু বিষাদ লুকিয়ে আছে। বিষাদ যখন লুকিয়ে থাকে তখন সে বিষ মেরে ফেলা যায় না। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে ধরে নিলেও আসলে প্রশ্ন থেকে যায় এ উন্নয়ন কার জন্য। মনের দিক থেকে তো আমরা স্বাধীন হতে পারলাম না। অনেকে জানেই না, হাড়-চর্মের ভেতর যে মন আছে। সে মনের স্বাধীনতা থাকা চিন্তা করার ব্যাপার তো আরেক আরেক ধাপ স্বাধীনতার ব্যাপার। পুরোটা চোখ দিয়ে আকাশ দেখার আনন্দ বুকে ভরে নিয়ে যেন হাঁটি এ দিনের জন্য এগোই। অন্ধকার আছে, থাকবে। কিন্তু দীপ এখনো নিভে নাই, আমরা এখনো বিলীন হই নাই। পৃথিবী এখনো নির্মল, তরুণ। সাম্প্রদায়িকতা শব্দটা দিয়ে একদিন আমরাই স্টিকার বানাব। প্রাচীন ও অচল শব্দের স্মৃতিতে সচল স্টিকার।
২১ বছর আগে লেখা বই,এখন বড় বেশি প্রাসঙ্গিক। ইতিহাস নিজের পুনরাবৃত্তি করে,কথাটা আসলেই সত্যি।এই বঙ্গীয় বদ্বীপে নিরাশার ইতিহাস তাই বারবার ফিরে আসে।আমরা ভীত হই এই বইয়ের পটভূমিতে থাকা জনপদকে দেখে,মনে আশংকা ���াগে।
লেখক আশার জয়গান দিয়ে শেষ করেছেন।আমি অতটা আশাবাদী না।তাও,সামান্য কিছু আশা নিয়েই থাকব,ভেবে নেব এ বই যেন কখনও বাস্তবতার প্রতিরূপ না হয়ে দাঁড়ায়।
পুটুনদা ও যে এক সময় ভালো বই লিখত এইটা না পড়লে বিশ্বাস করতাম না। আহা... বড্ড সময়ে আমরা একজন ভালো লেখক হাড়ীয়েছী।বদলে পেয়েছি একজন পা লেহনকারী চাবচিকা। যার বই এখন পড়লে বমি আসে ।
উগ্রবাদী রাজনৈতিক, সেটা মৌলবাদী হোক বা আর যাই হোক, তাদের হাতে কোন একটা দেশের ক্ষমতা চলে গেলে কি হতে পারে সেটা খুব সুন্দরভাবে আনিসুল হক তার এই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। যে জেনারেশন তার লেখায় নাক সিটকায় তাদের অবশ্যই উচিত আনিসুল হকের এই বইটি পড়া।
যে বাংলাদেশ কখনো দেখবো বলে ভাবিনি, যে বাংলাদেশ দেখার জন্য ১৯৭১ সালে লক্ষ লক্ষ শহীদের তাজা রক্তের বিনিময়ে এই দেশ পাকিস্তানী হানাদার মুক্ত হয়নি, সেই বাংলাদেশটাই আজ থেকে ২৩ বছর আগে আনিসুল হক তার এই "অন্ধকারের একশো বছর" উপন্যাসটায় দেখিয়েছিলেন, এই অন্ধকার বিপর্যয়ের স্বরুপটা বোঝাতে, গভীরতাটা বোঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন! এই অসামান্য উপন্যাসটা বেরিয়েছিল তার আঙ্গুল ফুঁড়েই! নিয়তির নির্মম পরিহাসটা হচ্ছে এই যে আজ ২৩ বছর পর সেই আনিসুল হক বদলে গেছে একেবারেই, বস্তাপচা আর হালকা সব ক্র্যাপ প্রসব করছেন নিয়মিত, সাথে মুফতে পালন করে চলেছেন সেওসব ক্র্যাপের ক্যানভাসারের দায়িত্বও! তবে সবচেয়ে বড় যে অপরাধটা তিনি করে চলেছেন সেটা হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক ব্যালেন্সমারানী ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীর হাত থেকে বাঁচতে তাদেরই একজন হিসেবে কথা বলা, আকারে ইঙ্গিতে ইনিয়েবিনিয়ে দেশবিরোধী চক্রান্তকারীদের কর্মকান্ডকে জাস্টিফাই করা। কিন্তু তবুও তার এই "অন্ধকারের একশো বছর" বইটা কোনভাবেই একটু গুরুত্ব হারাচ্ছে না, মিজানীদের একে একে ঝুলিয়ে দিলেও দাউদীদের আমরা ঝোলাতে পারিনি, পারিনি ধর্মান্ধতার কবলে একটু একটু করে প্রিয় বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া ঠেকাতে! তবুও আমরা, একের পর এক কোপ আর জবাইয়ের পরেও দাঁড়িয়ে আছি, সংখ্যায় হয়তো দিন কে দিন কমছি, কিন্তু হাল ছাড়িনি। আমরা হয়তো হাঁটু ভেঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়বো, কিন্তু কখনো হাঁটু গেড়ে মাথা নীচু করে মেনে নেবো না। অন্ধকার আছে, থাকবে। কিন্তু দীপ এখনো নিভে নাই, আমরা এখনো বিলীন হই নাই। পৃথিবী এখনো নির্মল, তরুণ।
we would rather die standing than live on our knees!
বেশ অন্যরকম একটা বই। অন্যরকম হলেও বইয়ের দৃশ্যপটগুলো চোখের সামনে খুব সহজেই ভেসে আসছিল। বইয়ে যে অন্ধকারের কথা লেখক বারবার বলেছেন, তা এই জনগোষ্ঠীর উপর নেমে আসা খুব বিচিত্র নয়।
যে সময় বইটির প্রথম প্রকাশ, ১৯৯৫ সাল— তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে লেখাটা দুর্দান্ত সাহসী! লেখক বলেছেন একটি কাল্পনিক ভবিষ্যতের কথা। কওমী লীগ, এনএনপি আর জামাতিয়া সে ভবিষ্যতের তিনটি রাজনৈতিক দল। জামাতিয়ার বিশিষ্ট নেতা স্যালোয়ার হোসেন দাউদি, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে এনএনপির নেত্রী বেগম ওয়ালিদার সাথে জোট করেন। কাল্পনিক ভবিষ্যৎ হলেও পাঠককে এর বেশি আর কিছু বলে দিতে হয় না।
অনেক কিছু তুলে ধরেছেন লেখক এই অন্ধকারের মাঝে। আমি যে বাংলাদেশকে দেখতে পাচ্ছিলাম, তার সাথে ইরানকে তুলনা করা যায়। ইরাক বা সিরিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত না, আবার সৌদি আরবের মতো সম্পদশালীও না। ধর্মের নামে রাজনীতি, রাস্তায় নেই কোন শাড়ি পরা নারী, রবীন্দ্র সংগীতের সুর কবে গেছে হারিয়ে— এ তো ভীষণই অন্ধকার...
ডিস্টপিয়ান ফিকশন হিসেবে বইটার কাহিনী দশে দশ পেলেও, লেখনিটা আমার কাছে দুর্বল লেগেছে। সবকিছুই আছে। তবে সাসপেন্সটা ধীরে ধীরে তৈরি হলে ভালো হতো। আর যেহেতু ভবিষ্যতের গল্প, পারিপার্শ্বিক বর্ণনায় আরো কিছু প্রত্যাশা ছিল। সর্বোপরি, গল্প বলার যে ধরনটা লেখক বেছে নিয়েছেন, তা আমার কাছে পছন্দ না। এটা বিভিন্ন পাঠকের কাছে বিভিন্ন রকম লাগবে।
এরকম প্রেক্ষাপট নিয়ে সাহসী লেখা আর তেমন নেই বাংলাদেশে। তাই পড়েই দেখুন!
এক অদ্ভূত অন্ধকার নেমে আসে এ জনপদে। ইনকিলাব বা ইসলামি বিল্পব ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে জামাতিয়ারা। শিল্প সাহিত্য চর্চা বন্ধ। বদরিয়া বাহিনী ইচ্ছেমত মওদুদীবাদের ব্যাখায় দেশ চালাচ্ছে আর বলছে ইসলামী শাসন। এক চিত্রশিল্পী দম্পতির মাথার উপর নেমে আসে ঘোঁর অন্ধকার। সাগরপাড়ে আপনমনে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার অপরাধে বন্দী করা হয় সফি আকবরকে। নিজ সক্ষমতা প্রমাণে বারো বছরের কিশোরীকে বিয়ে করে অত্যাচার করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় একশো পেরেনো আতিউর রহমান মিজানী। উপন্যাসের আতিউর রহমান মিজানী, স্যালোয়ার হোসেন দাউদীরা আমাদেরই খুব পরিচিত কিছু মানুষের প্রতিচ্ছবি।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে লেখা লেখক আনিসুল হকের অনবদ্য সৃষ্টি এ উপন্যাস। খুব সাহসী এ উপন্যাসটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে গোঁড়া জামাতিদের ভুলগুলো দেখিয়েছে, তুলে ধরেছে ইসলাম আর মওদুদীবাদ সম্পূর্ণ আলাদা। বর্তমানের পরিস্থিতি বিবেচনায় অবশ্যপাঠ্য বলা যায়।
বইটা শেষ করে অনেক সময় ধরে পিছের ফ্ল্যাপ এ তাকিয়ে ছিলাম। একজন লোকের ছবি। মাথ�� সুন্দর করে আচরানো। মুখে গোফ। ২৫-৩০ বছর আগের ছবি হবে হয়ত। এখন তার মাথার চুল আর গোফ এ সাদার পরিমাণই বেশি।
বইটা পড়ে ভাবছি, এ কি আসলেই বাংলার গাবরিয়েল গাউসিয়া মার্কেট, আমাদের পুটুনদার লেখা? এ কি করে সম্ভব? এরকম রাজনৈতিক কল্পকাহিনী উনি লিখেছেন, এটা বিশ্বাস করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।
এটি একটি কাল্পনিক পৃথিবীর গল্প। যেখানে, ৯০ এর দশকে, ইনকিলাব বিপ্লব হয়, এবং এর পরবর্তী ১০-১৫ বছরে, কিভাবে দেশ অন্ধকার থেকে আরো অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায়, তার বর্ণনা। একটা "what if" ধরণের উপন্যাস। লেখা বেশ ভাল। তবে অনেক জায়গায় এক নামের বদলে অন্য নাম ব্যবহ���র হয়ে গেছে, যদিও ঘটনার প্রবাহে বুঝা গেছিল কার কথা বলা হচ্ছে। এরপরও ব্যাপারটা চোখে পড়ার মত।
বইটা লিখতে বেশ পড়ালেখা করতে হয়েছে, এটা তার দেয়া রেফারেন্স দেখলেই বুঝা যায়।
এখন একটা দুঃখ মনে ঘুরঘুর করছে, ২০-২৫ বছর আগে লেখা এই বইয়ে আমাদের পুটুনদা সবার পুটু মেরেছেন, আর এখন পুটু চেটে লেখেন। ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে গেল।
৫ তারার উপরে দেওয়া গেলে দিতাম! অসাধারণ বই! 'এ-দেশ সবকিছু বড় তারাতারিও ভুলে যায়,সবকিছুর প্রতি অপরিসীম উদাসীনতা এই দেশের,এ-দেশ সবকিছুকে অগ্রাহ্য করবার,বিস্মৃতির অতলে চাপা দেবার ক্ষমতা রাখে।' সত্যিই তোহ! অল্টারনেট হিস্ট্রি জন্রার বই বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি আছে বলে মনে হয়না(আমার জানায় ভুল থাকতে পারে) ,এই বইটি তার একটি। কোন রাখঢাক না রেখেই লেখক গুল-মে-আজম,আতাউর রহমান মিজানী,স্যালোয়ার হোসেন দাউদী এর কাহিনী লিখে গেছেন। আমি অবাক হই এই ভেবে যে বইটা ১৯৯৫ সালে লেখা!!!
অসম্ভব সাহসী একটি বই। নব্বই এর প্রেক্ষাপটে লিখা হলেও বইটি বর্তমানের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।হয়ত আমাদের দেশের অনাগত ভবিষ্যত ফুটে উঠেছে লেখকের কল্পনার ক্যানভাসে। বাংলাদেশ এ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ভবিষ্যত কেমন হতে পারে তা বুঝা যায় বইটি পড়লে।একসময় আমরা এই মৌলবাদিদের দৌরাত্ম্য দেখতে পেতাম,এখন বাংলাদেশ তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক দেশ হলেও,এর জনগনের মানসিকতা কেমন তা প্রায়ই চোখে পরে।আসলে নব্বই এর দশকের মৌলবাদি গোষ্ঠী সাধারন মানুষের মনে সাম্প্রদায়িকতার বীজটি বপন করে গিয়েছে। আনিসুল হক যে একসময় এত সাহসী বই লিখেছেন,তা সত্যি অবাক করার মত,বইটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি।সাথে দুঃখ ও লেগেছে,পাঠকের ন্যায় লেখকেরও মৃত্যু হয় অনেকসময়।
George Orwell এর বিখ্যাত 1984 উপন্যাসটা পড়িনি। তবে এটা থেকে যে মুভিটা বানানো হয়েছে সেটা দেখেছি। এই উপন্যাসেও অনেকটা সেই কায়দায় একটা dystopian সমাজের চেহারা দেখান হয়েছে বলে মনে হল। এবং মুভি দেখার মত বইটা পড়ার সময়ও বারবার মনে হচ্ছিল এটা আসলে কাল্পনিক ভবিষ্যতের কোন গল্প নয়, আমাদের বর্তমান সমাজের ভিতরই আছে এই সমাজ, রাষ্ট্রের ভিতরেই আছে এই রাষ্ট্র।
১৯৭৭-৮৬র দিকে, কোনো এক ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানে হঠাৎ শাড়ি পড়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা দিলো সরকার, বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান, টেলিভিশন ও অনুষ্ঠানে। নিরুৎসাহিত করা হল কবিতা, সেন্সরিং হল গান। তারা কোনো হিন্দুয়ানী কালচার সমর্থন করবেনা। এই কিছুদিন আগে খবরে দেখলাম, তালেবান সরকারও আফগানিস্তানে ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করে দিচ্ছে।
এবার চলুন ধরি, এমন সাম্প্রদায়িক, উগ্রপন্থী, মৌলbaddie কোনো দল যদি দেশের শাসনভার হাতে নেয় তাহলে দেশটা কেমন হতো? 'অন্ধকারের একশ বছর' এর মূল উপপাদ্য এটাই। লেখককে আপনারা চেনেন এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে অপছন্দ করি নানা কারণে। কিন্তু মুসলিম প্রধান একটি দেশে ঘিলুহীন উগ্রপন্থীদের ভেতর বসে এমন কিছু লেখা আসলেই সাহসী কাজ, এই সাধুবাদ তিনি পাবেন।
বাঙালি মুসলমান হিসেবে এই বইটি পড়তে হলে শুরুতেই ডিসক্লেইমার- আপনি যদি সমালোচনা, খোঁচা, তিরস্কার সহ্য করতে না পারেন, যদি সামান্যতেই আপনার ধর্মানুভুতি ও রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত লাগে, যদি আপনি বিপরীত আলোচনা গ্রহণ করতে একদমই অপরাগ হয়ে থাকেন, তাহলে সাইডে চাপুন। বইটি পড়ার শুরুতেই মেনে নিতে হবে আপনার গায়ে লাগার মতো কথা এখানে থাকতে পারে। আপনাকে পড়তে হবে সম্পূর্ণ নিউট্রাল অবস্থা থেকে।
বইটি একই সাথে ডিস্টোপিয়া এবং অল্টারনেট হিস্টোরি রিপ্রেজেন্ট করে। বাংলায় ডিস্টোপিয়া নিয়ে লেখা অপ্রতুল, অল্টারনেটিভ হিস্টোরি তো নেই বললেই চলে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটা যদি ভিন্ন হত, তাহলে কেমন হত এই জনপদের গল্পটা, একটি দল, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান করছিলো, তারা যদি দেশের শাসনভার তুলে নিতো, তাহলে গল্পটা কেমন হত সেই অংশটুকুকে আমরা সাইডে রেখে বইটি ডিস্টোপিয়া তত্ত্বকে কতটুকু সমর্থন করে মূলতঃ সেটা দেখবো এই আলোচনায়। [স্পয়লার এলার্ট]
অরওয়েলের ১৯৮৪ কে যদি 'ডিস্টোপিয়া' সংজ্ঞার আদর্শ ধরে তুলনামূলক আলোচনা করি- ১) এখানে রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনীতি পরিচালনা হয় ধর্মকে পুঁজি করে। ২) এখানে কোনোপ্রকার ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই। সকলের জীবনব্যবস্থা নির্ধারিত হয় সরকার প্রদত্ত আইনের মাধ্যমে। পোশাক থেকে সংস্কৃতি, পুরোটাই সরকার নির্ধারিত। সকলেই সরকারের নজরদারিতে বন্দী। ৩) বদরিয়া বাহিনী নামে রাষ্ট্রায়ত্ব বিশেষ বাহিনী চাইলেই যে কাওকে জবাবদিহির নামে অপদস্থ ও গ্রেফতার করতে পারে। ৪) রাজনৈতিক কারণে রাষ্ট্রের মানুষের ভাষাকেও পরিবর্তনের চেষ্টা করতে দেখা যায়। ৫) নাগরিকদের শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত কিছুর বাইরে সকল চর্চা বন্ধ করা হয়। ৬) রাষ্ট্রের উন্নয়ণে বেহাল দশা হলে, নাগরিকদের সামনে অগুরুত্বপূর্ণ কাল্পনিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে তাদের ব্যস্ত রাখা হয়। ৭) ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী শাসনব্যবস্থা পরিচালনার কথা বলে শাসকগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির জন্য ধর্মীয় আইন ও সংবিধানেও যথেচ্ছ পরিবর্তন ঘটায়। যেমন- অ্যাটউডের 'দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল' বইতে 'গিলিয়াড' রাষ্ট্র ওল্ড টেস্টামেন এর একটি পরিবর্তিত ও আইনসংক্রান্ত ভার্শন ব্যবহার করতো তাদের সুবিধা অনুযায়ী। ৮) ভিন্ন মতাবলম্বীদের শত্রুজ্ঞান করা হয় ও বাকিসব রাজনৈতিক বিরোধীদল বা মতবাদ রাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। ৯) নাগরিকদের উপর এমন কিছু কাজ চাপিয়ে দেয়া হয়, যেগুলো করতে কোনো নাগরিকেরই বাধ্য হবার কথা নয়। ১০) রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা পুরোটাই রাজনৈতিক দল পরিচালনা করে সার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে।
- পয়েন্টগুলো ভালোভাবেই ডিস্টোপিয়ার সংজ্ঞাকে স্যাটিসফাই করে আমার ধারণা। কিন্তু বইয়ের সবচাইতে বড় সমস্যা অতি কথন। একই বিষয় বা একই ধরণের বিষয় নিয়ে প্রচুর কপচানো হয়েছে। ইসলামের সবচাইতে কুখ্যাত ও বহুল চর্চিত কিছু তত্ত্বই বারবার ঘুরেফিরে চরিত্রগুলো ব্যবহার করেছে কিছু ক্ষেত্রে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক ভাবে। এতকিছুর ঠিক কতটুকু দরকার ছিল আমি জানিনা, কারণ এট সাম পয়েন্ট একশ পৃষ্ঠার বইতেও আপনার বিরক্তি ধরে যেতে পারে। তিনি যদি এসবে একটু লাগাম ধরে রাখতে পারতেন, বইটি আরও চমৎকার হতো। বইটিতে উল্লেখিত রাজনৈতিক দলটির নাম 'জামাতিয়া মওদুদিয়া', যারা ছিল মুক্তিযুদ্ধের পরিপন্থি,এ দলের কিছু প্রথমসারির নেতার নাম গুলমে-আযম, আতিউর রহমান মিজানী, স্যালোয়ার হোসেন দাউদী। সচেতন যেকোনো পাঠকমাত্রই বুঝবেন আঙ্গুলটির নির্দেশ কোনদিকে। আমি আর সেদিকে যাচ্ছিনা। এই অঞ্চলের মানুষ এমনিতেই উগ্রপন্থী। কোনো বিশ্বাস, সেটা ধর্মীয় হোক বা রাজনৈতিক, এখানে এসে তার পরিণতি নির্ঘাত হবে এক্সট্রিমিজমে গিয়ে।
যাহোক, শুরুতে শুরু করা ছোট গল্পটা শেষ করি, কারণ গল্পটার একটা অর্থ আছে। তো পাকিস্তানে চলছে শিল্প সংস্কৃতির উপর কড়াকড়ি। এরমাঝে কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ এর মৃত্যুদিবস উৎযাপিত হবে লাহোরে। সেই আয়োজনে সহস্র মানুষকে স্তম্ভিত করে একটি কালো শাড়ি পড়ে মঞ্চে উঠলেন গায়িকা ইকবাল বানু। ভরা মজলিস কাঁপিয়ে গাইলেন, 'হাম দেখেঙ্গে'!
ফ্ল্যাপে লেখা কথাগুলো পড়ে বইখানা আর না পড়ে পারলাম না। দেশ পরিচালনার ক্ষমতা সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে চলে গেলে কী বিদঘুটেই না হবে। ধর্মের অপব্যবহার, সংকীর্ণতা, দলগত কোন্দল যে কত নোংরা তার পরিচয় পাওয়া যায় এই বইয়ে। এই বইয়ের কাহিনী; সুবিধাবাদী কিছু মুষ্টিমেয় ব্যক্তি নিজেদের প্রয়োজনে ধর্মের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে জনপদকে অন্ধকারে ফেলে রাখেন। যে জনপদ ভোরের সূর্যের আলোয় আলোকিত হলেও সেখানে জন্ম নেয়না কোন মুক্তমনা মানুষ। নিকষ কালো অন্ধকার যেন সবসময়ই শকুনের মতন হানা দিয়ে বেড়ায় সেই জায়গায়।
ধর্ম সবসময়ই সংযমের কথা বলে, স্বার্থবাদের না। সাহসী একটি বই।
"সবাই তাকায় রফিকুল হকের দিকে।রফিকুল হক নীরবতা ভাঙেন। তিনি বলেন, “আমাদের কলেমা তৈয়ব ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ এর প্রথমেই কেন লা ইলাহা বলা হল? এর মানে কি? কোন উপাস্য নেই। তারপর বলা হল, ইল্লাল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া।এর ব্যাখ্যা কী? এর ব্যাখ্যা এই যে,অতীতের যত বিশ্বাস, যত সংস্কার সব প্রথমে অস্বীকার করা হল।তারপর শাদা পৃষ্ঠার মত শূন্য হৃদয়ে লেখা হল আল্লাহর নাম। জ্ঞানচর্চার মূল ব্যাপারটিও তাই।প্রথমে সব সংস্কার থেকে মুক্ত হতে হবে। সব বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।তারপর জানার চেষ্টা করতে হবে, সত্য কি। আমি সেই জ্ঞানের সন্ধানই করছি”
এমন একটা বয়সে বইটি প্রথম হাতে নিয়েছিলাম, যখন কিছুই বুঝিনি। অথচ এখন পড়ে মুগ্ধ! ডার্ক, ডিস্টোপিয়ান ফিকশন হিসেবে এমন দুর্দান্ত সাহসী উপন্যাস আর কি এরমাঝে বাংলা ভাষায় লেখা হয়েছে?
পুটুনদার একসময় মেরুদণ্ড ছিলো যেটা কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে। যে বা যাদের নিয়ে এই স্যাটায়ার তাদেরই ক্ষমতায় থাকার সময় প্রকাশ। এরপর দুনিয়া এগিয়েছে, বাংলাদেশও। কিন্তু মানুষ হয়ে গেছে ছেঞ্ছিতিব। একটু গায়ে টোকা লাগে তো নিষিদ্ধ করে দাও সব, একটুখানি বিতর্ক তো ঐ বইয়ের লেখকের বই বর্জন, প্রকাশনী ভাঙচুর। বাটে পেলে লেখককেও টোপকে দাও। এসবই আধুনিক সহিষ্ণু জাতির বৈশিষ্ট্য বোধ করি। তো যেটা বলছিলাম, পুটুনদা এসময়ের হলে নির্ঘাত এই বই লেখার সাহস করতেন না।
বিষয়বস্তুর সাহসিকতা বাদ দিলে বইটা খুবই অন্তঃসারশূণ্য। সাদামাটা কাহিনী। চরিত্রগুলোয় নাই কোনো গভীরতা। তবে যা আছে তা হচ্ছে আফগানিস্তানের হালত যদি বাংলাদেশের হতো তবে কী হতে পারতো...