কয়েকবছর আগে আমাকে একজন এই বই suggest করেছিল দেশভাগের ইতিহাস জানার জন্য। তখন দেশভাগের পুরো ঘটনা জানার জন্য মুখিয়ে থাকতাম, এতদিন সেই আগ্রহে ভাটা পড়েছিল। "হস্তান্তর" বই এখন পড়ে বুঝলাম, দেশভাগের মতো এতো বড় ঘটনার কি সামান্য অংশটুকুই আমরা জানি। স্বাধীনতার অর্ধশতক সাব টাইটলে এই বই প্রকাশ হলেও এই বই আসলে পুরোটাই দেশভাগ নিয়ে। ১৯৪৬-৫১ সময়কালে সাংবাদিক কিংবা একজন সাধারণ মানুষ হিসাবেও লেখক অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা এবং ব্যক্তিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। আর সাংবাদিক থাকার কারনেই হয়তো অন্য লেখকদের মত নিজের রাজনৈতিক কিংবা জাতিগত আবেগ, বিশ্বাসকে এক পাশে রেখে লিখতে পেরেছেন। দেশভাগ ছাড়াও আছে পশ্চিম বঙ্গের রাজনীতি, আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচার, জ্যোতি বসু - বিধান চন্দ্র রায়ের উত্থান, আসামের ভয়াবহ ভূমিকম্প, নেপালের টালমাটাল রাজনীতি। তখন নেপাল ছিল তিব্বতের মতোই নিষিদ্ধ দেশ। " প্রায় ৫০ বছর আগের নেপাল যাত্রার সঙ্গে বর্তমানের শৌখিন সফরের কোনও তুলনা হয় না। তখন বিহারের দিক থেকে নেপাল যাওয়ার সহজতম উপায় ছিল বীরগঞ্জ থেকে মিটার গজ ট্রেনে তরাই অঞ্চল পার হয়ে হিমালয়ের পাদদেশে পৌঁছানো। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে কাঠমান্ডুর উপকণ্ঠে। মাঝখানে দুটি পাহাড় ও অজস্র চরাই-উতরাই। ... দুটিরই উচ্চতা ৯০০০ ফুট।"
তবে বইয়ের প্রধান আকর্ষণ অবশ্যই দেশভাগ। অন্যন্য বইয়ের মতো পুরো ভারত কিংবা নিজের পরিবার নিয়ে আলোচনা করেই দেশভাগ বর্ণনা দেন নি। বাংলা ভাগকে কেন্দ্র করে উঠে এসেছে - ১৯৪৬ এর কলকাতা কিলিং, নোয়াখালীতে গান্ধীজীর অবস্থান, অখণ্ড বঙ্গের জন্য কিছু রাজনিতিকের চেষ্টা, সীমানা নিয়ে ব্রিটিশদের প্রস্তাব, শরণার্থী সঙ্কট। লেখক যখন দাঙ্গা হামলা নিয়ে বর্ণনা দেন, মনে হয় ঐ সময়ের মানুষগুলি কি সব নিজেদের বিবেক বুদ্ধি হারিয়েছিল নাকি। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, জিন্নাহ মনে করতেন হিন্দু মুসলিম যে আলাদা জাতি, তারা এক সাথে থাকতে পারবে না, তার প্রমাণ হচ্ছে এই দাঙ্গা, তাহলে এতগুলি বছর হিন্দু মুসলিম কিভাবে একসাথে থেকেছে কিংবা ভারতবর্ষের অন্য জায়গায় না হয়ে কেন শুধু বাংলাতেই ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান দিবসেই দাঙ্গা শুরু হল। আর কি অদ্ভুত ব্যপার, যারা ২০ বছর আগে অখণ্ড বাংলার দাবিতে আন্দোলন করেছিল, তারাই একে অপরকে শেষ করায় মেতে উঠেছিল। শঙ্কর ঘোষ এক জায়গায় বলছেন, আমি জানতামই না আমার বাসা হিন্দু পাড়ায় এবং অফিসে যাওয়ার রাস্তা মুসলিম এলাকার মধ্য দিয়ে। হত্যা করার পর ঘাতকরা কাপড় উঠিয়ে নিশ্চিত হয়, জাত ঠিক ছিল কিনা। কলকাতার দাঙ্গার খবর শুনে নোয়াখালীতে হিন্দু এলাকায় দাঙ্গা শুরু হয়। নোয়াখালীর সেই দাঙ্গা এবং স্থানীয় হিন্দুদের আস্থা ফেরাতেই গান্ধীজী সেখানে ছিলেন। তখনকার সময়ের দুর্গম , যোগাযোগ বিছিন্ন, দরিদ্র, অশিক্ষিত নোয়াখালীর দাঙ্গার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। দুর্ভাগ্য যে, নোয়াখালীর সেই দাঙ্গার কথা খুঁজে পাওয়া যায় না। মনে হয় , এমন ঘটনা হয়তো ঘটেই নি। সবই ছিল হিন্দু লেখক আর কংগ্রেসের প্রোপাগান্ডা।
বইয়ের একটা বড় অংশে বর্ণনা করা হয়েছে, অখণ্ড বঙ্গের জন্য করা শেষ চেষ্টা। একবছর ধরে দাঙ্গা হামলা চলে ততদিনে হিন্দু মুসলিমরা একে অপরের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। যদিও শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম, সোহ্রাওয়ার্দীরা চেষ্টা করলেও তা ছিল জনমতামত বিছিন্ন। এবং যখন হাই কমান্ডের সাথে প্রস্তাব নিয়ে বিরোধ বাধে, তারা তখন আর নিজেদের দাবি ধরে রাখতে পারেন নি।
শঙ্কর ঘোষ তিন খণ্ডে "হস্তান্তর" প্রকাশ করেছেন। উপরের রিভিউ দেয়া হয়েছে প্রথম খণ্ড এর উপর ভিত্তি করে।