আসলে আমি নিজেও ভাবি নি বইটাকে তিন তারা দেবো। পড়ার আগে বেশ উৎসাহ নিয়ে শুরু করেছিলাম...এখন যে উৎসাহ একেবারে দমে গেছে, তা নয়। কিন্তু দীপাবলী চরিত্রটাকে আমার খুব একটা ভালো লাগছে না। জানি, ভালো-খারাপ মিলিয়েই মানুষ, কিন্তু এই মেয়ে এত জাজমেন্টাল, সেল্ফ-অ্যাবজর্ব্ড, সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগা যে আমার ওকে নিতে কষ্ট হচ্ছে। এটা বলাতে আমাকেও জাজমেন্টাল মনে হচ্ছে কি না, কে জানে!
শুরুটা বেশ সুন্দর ছিলো। খুব ভালো লাগছিলো পড়তে। অমরনাথ, অঞ্জলি, দীপাবলী, মনোরমার ছোট্ট সংসারটা বেশ ভালোই লাগছিলো। এরপর দীপার বিয়ে এসে সব ওলটপালট হয়ে গেলো। একে একে বের হয়ে যেতে থাকলো সবার কদর্য রূপ। অবশ্য অমরনাথকে কি আমি লোভী বলবো? আমি জানি না। ঐ যে বললাম, কোনো মানুষই ভালো-খারাপের ঊর্ধ্বে নয়? আমার মনে হয় লোভটা এসেছিলো তার below the bar জীবনযাপন থেকে। যারা খেয়ে-পরে বাঁচে, তাদেরকে অমন বিলাসবহুল জীবনযাপনের হাতছানি দেখালে সেটা উপেক্ষা করাটা বেশ কষ্টের। কিন্তু তার জন্য কিন্তু তিনি কম আত্মগ্লানিতে ভোগেন নি। সেই কারণে ওর চরিত্রটার প্রতি আমার বেশ শ্রদ্ধা কাজ করেছে।
তবে আমাকে যদি বলা হয়, আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র কে? আমি অবশ্যই বলবো সত্যসাধন মাস্টারের কথা। তার শেষটায় আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নি। যুগে যুগে তার মত যত শিক্ষক এসেছেন, কিংবা আসছেন, সবার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো।
দীপার জীবনকে স্টার জলসা/জি বাংলার নাটক কিরণমালার কাহিনী বললেও ভুল হবে না। ওর জীবনে সমস্যার আসলে কোনো শেষ নেই। তার আগে বলি ওকে কেন আমার জাজমেন্টাল, সেল্ফ-অ্যাবজর্ব্ড এবং অন্যান্য মনে হয়েছে।
মেডিকেলে আমাদের ব্যাচে একটা মেয়ে ছিলো ঠিক এমন। হোস্টেলে শুরু থেকেই গণরুমের কোনো মেয়ের সাথে ওর খাতির ছিলো না, কিন্তু ব্যাচের ছেলেদের সাথে ওর বেশ খাতির। এ নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু সমস্যাটা হলো, ওর অনেক ছেলে বন্ধু থাকায় ও নিজেকে সুপিরিওর, এবং অন্যদের থেকে আলাদা ভাবতে শুরু করলো। দীপার মধ্যেও আমি এই pick-me-girl tendency দেখতে পেয়েছি, যেটা ফেমিনিস্ট হিসেবে আমাকে খুব বিরক্ত করেছে। মনে হচ্ছিলো ওর সব কর্মকাণ্ডেই একটা লোক দেখানো ভাব। এই যে দেখো, ছেলেরা আমার সাথে নিজে যেচে কথা বলতে আসে, এই দেখো, আমি "অন্য মেয়েদের মত" শাড়ি-চুড়ি-গহনা নিয়ে কথা বলি না, এই দেখো, আমার চিন্তাধারা তোমাদের কারোর মত নয়...এগুলো আমাকে খুব বিরক্ত করেছে। আমিও হোস্টেলে থেকেছি, এবং এমন অসংখ্য মেয়ে আছে যারা মনিপুরী শাড়ি নিয়ে অবসেসড, সাথে বাঁশিও বাজায়, আবার সাইকায়াট্রিতে এফসিপিএসও করছে। শাড়ি-চুড়ি-গহনা নিয়ে থাকলেই সে কোনো অংশে কি দীপার চেয়ে কম? আশ্চর্য চিন্তাধারা এই মেয়ের! আর ছেলেদের সাথে কথা বলার ব্যাপারটা। দীপা মনে করে, ছেলেরা অনেক উচ্চমার্গীয় কথাবার্তা বলে, মেয়েদের সাথে কথা বলতে গেলে ঐ শাড়ি-চুড়িতেই ফিরে আসতে হবে, এটা কোনো কথা? ও নিজে কোন মেয়ের সাথে উচ্চমার্গীয় কথা বলে উল্টিয়ে ফেলেছিলো? পুরো বইয়ে কোথাও তো দেখলাম না! মায়া যখন কমিউনিজম নিয়ে ওর সাথে কথা বলতে চায়, তখনো ও এড়িয়ে চলে মায়াকে। আবার এদিকে, রাধা কয়টা শাড়ি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পরে, সেটাও ও লক্ষ্য করে। তাহলে তো বাবা তুমিও সেই জিনিসটাই হলে, যেটা তুমি ঘৃণা করো!
আর এই মেয়ের প্রেমে পড়ার ক্ষমতা, বাপ রে বাপ! মনে হচ্ছিলো যার সাথে একটু ভালোমতন কথা হয়, তারই প্রেমে পড়ে যায়। আবার সে কি না জাজ করতে যায় ওর রুমমেটকে, রাধাকে, রমলাকে, যে তারা কার সাথে কেন প্রেম করছে এবং কেন ছেড়ে দিচ্ছে! আরে বাবা, এতে নাক গলানোর তুমি কে? তাছাড়া, নিজেকে অতিরিক্ত feisty প্রমাণ করার একটা আকুলতাও এই মেয়ের মধ্যে দেখা যায়, এবং সেটাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষের সামনে। কেন? ব্যাপারটা কি তোমাকে অন্যরকম সুপিরিওর ফিল করায়?
আরো বলতে পারতাম, কিন্তু ফলোআপে যেতে হবে। কিছুটা বিরক্তও লাগছে এত বদনাম করতে। যাই হোক, মোট কথা হচ্ছে দীপাবলীকে আমার ভালো লাগে নি। ও ছোটবেলায় ভালো ছিলো, বড় হয়ে যেন কীরকম একটা মন-মানসিকতা হয়ে গেছে ওর। সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগা মানুষ বরাবরই আমার অপছন্দের, তাই এতগুলো কথা বলা। থ্যাংক গড যে আমি টিনএজ বয়সে এই বই পড়ি নি, তাহলে নিজেকে এমন pick-me-girl হিসেবে পরিণত করার একটা চেষ্টা করে ফেলতাম হয়তো। বড় হয়ে (নাকি বুড়ো হয়ে?) পড়ছি দেখে নিজেকে ওসব আবেগ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারছি।
অঞ্জলিকেও বিরক্ত লাগছে। ওর লোভ অমরনাথের চেয়েও বেশি। ওর ভাই সুভাষেরও।
মনোরমাকে মোটামুটি লেগেছে।
প্রতুল, অসীম, শমিত এবং বেশিরভাগ পুরুষ চরিত্রকেই বেশ বিরক্তিকর লেগেছে। শুধুমাত্র সত্যসাধন মাস্টার ছাড়া।
যাই হোক, এই বই পড়ে আপ্লুত হয়ে কোনো টিনএজ মেয়ে যদি রিভিউ লিখতে এসে আমার লেখাটা ভুলক্রমে পড়ে ফেলে, তাকে বলি, মেয়েরাই মেয়েদের বড় শত্রু, কথাটা ঠিক না। শত্রু আমরা নিজেরা তৈরী করি�� বন্ধুও। আশা করি জীবন তোমাকে সেই শিক্ষা দেবে।
দ্বিতীয় খণ্ডে যদি ওর ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট না হয়, প্রচন্ড বিরক্ত হবো।