"মৌলবি" আহমেদ ছফার এই প্রথম একটা বই পড়লাম!
ছোট্ট একটা বই, মাত্র ১১০ পাতার! সব মিলিয়ে ৩ ঘন্টা লাগলো পড়ে শেষ করতে! এই বইটার প্রতিটা পাতাতে মুক্তা ঝরতেছিল! অনেক অনেক রেফারেন্স, অনেক অনেক তথ্য! এর সব কিছুই আপনারে বিমোহিত করতে বাধ্য করবে! লেখাগুলা অবশ্য কিছুটা অগোছালো! অগোছালো হওয়ার কারন ও অবশ্য আছে। এই বইটা আসলে আহমেদ ছফার, তার গুরু 'জাতীয় অধ্যাপক' স্যার আব্দুর রাজ্জাক এর প্রতি গুরুদক্ষিনা! আবদুর রাজ্জাক সাহেব যেহেতু নিজে কিছু লেখেননি, তাই এইসব বই পড়া ছাড়া তাঁকে জানার কোনো রাস্তা ও নাই। এই বইটাকে স্যার আব্দুর রাজ্জাক এর আত্মজীবনী না বলে, স্যার আব্দুর রাজ্জাক এর সাথে আহমেদ ছফা সাহেবের কথোপকথন এবং আহমেদ ছফা তার গুরুকে কিভাবে মুল্যায়ন করেছেন তার একটা ছোট্ট সমষ্টি! আমরা চায়ের টঙ্গে চা-বিড়ি খেতে খেতে দেশ-দুনিয়া-রাজনীতি-সংসার এইগুলা নিয়ে যেভাবে কথা বলি, আহমেদ ছফা এবং স্যার আব্দুর রাজ্জার এর আড্ডাগুলা এমনই ছিল! আমরাও যেমন চায়ের আড্ডাতে গীবত করি, উনাদের আড্ডাতেও এমন গন্ধ পাওয়া যায়! বাংলা-পূর্ববর্তী সময়ে মুসলমানে সমাজ এবং সাহিত্যে তাদের লেখার বৈচিত্র্যের কথা রাজ্জাক স্যারের যেমন মুখের আগাতেই ছিলো, ঠিক তেমনি ছিলো বর্তমান সময়ের কোন সামাজিক নায়ক কোথায় কেমন ছিলো তার খোঁজ খবরও। শেখ মুজিবর রহমান, এ.কে. ফজলুল হক, ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, মুনীর চৌধুরী, বঙ্কিম, নজরুল, রবিঠাকুর, মোতাহের হোসেন – কেউই বাদ যায়নি আলোচনা-সমালোচনার হাত থেকে। সবাইকে দেখলাম প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকেরই চোখে।
কেমন ছিলেন এই স্যার আব্দুর রাজ্জাক?
উনি ছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক, গুরুদের গুরু, চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া!
তার একটা কথা আছে এমন, "প্রথম লাইব্রেরিতে ঢুইক্যাই আপনার টপিকের কাছাকাছি যে যে বই পাওন যায় পয়লা একচোটে পইড়া ফেলাইবেন। তারপর একটা সময় আইব আপনে নিজেই পাইবেন আপনের আগাইবার পথ।"
স্যার আব্দুর রাজ্জাক জানতেন না এমন বিষয় মনে হয় ছিল না, আহমেদ ছফা সেভাবেই তুলে ধরছেন! বইয়ের ফ্ল্যাপের লেখা আছে -"তার পাণ্ডিত্যের খ্যাতি সর্বজনবিদিত। সমকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠসমূহের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের অনেকেই একবাক্যে তার মেধা আর ধী-শক্তির অনন্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন।"
এতো প্যাশনেট একটা মানুষ, এতো পণ্ডিত একটা মানুষ তাও তার নিজের কোন সেলিব্রেটি হওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না, টাকা পয়সার প্রতিও কোন টান ছিল না! মানুষটা কিন্তু চাইলেই পারতেন বিদেশে থেকে নিজের নামযশ কামাতে। তা না করে, এই লোক তার শিক্ষক হ্যারল্ড লাস্কির মৃত্যুর পর গবেষণাপত্র প্রকাশ না করেই চলে আসেন। কারণ তার ধারণা ছিল, লাস্কি ছাড়া আর কেউ সে পেপারের মর্যাদা বুঝবেন না! খুবই একরোখা একটা মানুষ ছিলেন!
জ্ঞানের এমন পাহাড় মানুষকে অহংকারী বানায়, কিন্তু ইনি ছিলেন পুরো উলটো! অনেক বিনীত একজন মানুষ ছিলেন, তাকে উৎসর্গ করে দেশে বিদেশে কম বই বেরয়নি, কম পেপার-জার্নালও না। তবে কেন জানি খুব নির্বিকার থাকতে পারতেন। মানুষ হিসেবে ছিলেন পরোপকারী এবং গুণীজনরে মুল্য দিতে জানতেন! কোন মানুষের ভিতর সামান্য কোন ট্যালেন্ট দেখলে, উনি সেটারে উঠায় আনার জন্য সবকিছু করে দেখাইছেন! দাবাড়ু নিয়াজ মোরশেদ, চিত্রকার এস এম সুলতান এদের তুইলা আনতে উনি অনেক কিছু করছেন! আহমেদ ছফা নিজেও বলেন, স্যার আব্দুর রাজ্জাক এর সাথে পরিচয় না হইলে, উনি আজকের এই আহমেদ ছফা হইতে পারতেন না!
স্যার আব্দুর রাজ্জাক এর সবচেয়ে যে জিনিশটা আমারে আকর্ষণ করছে, সেটা হলো তার সিমপ্লিসিটি! ছেড়াফাটা জামা পড়তেন, পাঞ্জাবী-লুঙ্গি পড়ে বাজারে যাইতেন, বাসায় ফিরার পথে প্যাক কাদায় মাখামাখি হয়ে থাকতো! তিনি পুরান ঢাকার মানুষ ছিলেন, খাস পুরান ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলতেন! কবি জসিমউদ্দিন এর নাম বলতেন জছিমুদ্দিন! পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ধরে রাখছিলেন! অত্যন্ত ভোজনরসিক মানুষ ছিলেন, খাইতে পছন্দ করতেন, মানুষরে খাওয়াইতেও পছন্দ করতেন! একটা জাতির মানদন্ড করতেন এইভাবে, "কোন দেশের মানুষকে চিনতে হলে প্রথমে দেখতে হবে তারা কি খায়, আর তারা কি ধরণের বই পড়ে। কি খায় সেটা জানতে যাবেন কাঁচা বাজারে, আর কি পড়ে সেটা দেখতে যাবেন তাদের বইয়ের দোকানে। পুরো জাতির ব্যাপারে সম্যক ধারণা এখানেই পেয়ে যাবেন"! ব্যাক্তি হিসেবে স্যার আব্দুর রাজ্জাকের কয়েকটা জিনিস আমারে আহত করেছে, তার মধ্যে একটা হইলো তার স্যেকুলারিজম, বইয়ে অবশ্য এইগুলা নিয়ে কথা হয় নাই!
ছোট্ট একটা বই, তাও কেন এতো কথা লিখলাম? "যদ্যপি আমার গুরু" বইটা পড়ে, বই পড়াটা নতুন ভাবে শিখলাম! শেষে তার একটা কথা কোট না করলেই নয়, "লেখার ব্যপারটি অইলো পুকুরে ঢিল ছোড়ার মত। যত বড় ঢিল যত জোড়ে ছুড়বেন পাঠকের মনে তরঙ্গটাও তত জোড়ে উঠব এবং অধিক্ষণ থাকব। আর পড়ার কাজটি অইলো অন্য রকম। আপনে যখন মনে করলেন, কোন বই পইড়্যা ফেলাইলেন, নিজেরে জিগাইবেন যে বইটা পড়েছেন, নিজের ভাষায় বইটা আবার লিখতে পারবেন কিনা। আপনের ভাষার জোর লেখকের মত শক্তিশালী না অইতে পারে, আপনের শব্দভান্ডার সামান্য অইতে পারে, তথাপি যদি মনে মনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবান পারেন, ধইর্যা নিবেন, আপনের পড়া অয় নাই।"