"প্রবন্ধগ্রন্থ" শুনলেই পাঠকগোষ্ঠীর অনিহা নতুন কিছু নয়। পাঠকগোষ্ঠীর চাই রমরমা গল্প। যা খুঁজতে খুঁজতে বাঙালি নতুন পাঠকেরা নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে যেতে ইদানীং অনাগ্রহী। আমি সেই তালিকার ব্যতিক্রম কেউ নই। অনাগ্রহ বশত বিগত বছরের ডিসেম্বরে শুরু করে বইটি পড়ে শেষ করেছি আজকে, অর্থাৎ পঁচিশের এপ্রিলে।
আমি সচরাচর এই দীর্ঘসময় ধরে পড়া বইগুলো মানুষকে সাজেস্ট করি না কারণ মনে হয় তাদেরও ভালো লাগবে না, কিন্তু এই বইটি তার ব্যতিক্রম। বইটি না পড়লে আপনি সাহিত্যজগতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ না পেয়ে, দারুণ কিছু বিষয় থেকে বঞ্চিত হবেন। সবগুলো প্রবন্ধ সম্পর্কে আমি তাই খুচরো আলাপ করেছি, লেখাগুলোর গুরুত্ব এতে কতটুকু আমি আপনাদেরকে বোঝাতে পারবো আমি জানি না, তবে সচেতন সকল পাঠককে এই বইটি পড়তে উৎসাহিত করবো।এইজন্য নয় যে বইটি আমার ভালো লেগেছে বরং এইজন্য যে, এই প্রবন্ধগ্রন্থের প্রতিটি লেখাই আলোচনা সমালোচনার দাবিদার। একেকজনের দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা এই বইটির মূল উদ্দেশ্যকে ফলপ্রসূ করবে।নতুবা লেখাগুলো এমন নিশ্চুপভাবেই পড়ে থেকে ক্ষতি করবে বাঙালি সাহিত্যিক এবং পাঠকগোষ্ঠী উভয়কেই। ছোট ছোট করে প্রবন্ধগুলোর মূল যেটুকু আমি ধরতে পেরেছি সেটুকু আপনাদের জানানো আমার গুরুদায়িত্ব,তা-ই করবো আমি।
⚫উত্তর ভূমিকা
বইটির নাম-প্রবন্ধটি লেখার পেছনের ইতিহাস দিয়েই আহমদ ছফা মূল প্রবন্ধ গ্রন্থটি শুরু করেছেন।সেই সাথে নিজের লেখার ভালো দিক সম্পর্কে নিজেই কিছুটা ধারণা দিয়েছেন। ব্যাপারটা অদ্ভুত হলেও প্রবন্ধপাঠে সেটি আগ্রহ আনতে সাহায্য করেছে।
⚫বাঙালি মুসলমানের মন
মূলত এই প্রবন্ধে তিনি বাঙালি মুসলিম পুঁথি সাহিত্যিকদের সমালোচনা করেছেন কড়া ভাষায়, যা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত। এক বাক্যও আপনার কাছে যুক্তিহীন মনে হবে না। মূলত সামাজিক প্রতিক্রিয়া কিভাবে সাহিত্যিকদের জ্ঞানভান্ডার থেকেও বেশি প্রাচীন পুঁথিগুলোকে প্রভাবিত করেছে সেই বিষয়ে তিনি লিখেছেন। তার পাশাপাশি ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্মের গোড়াপত্তনের সঠিক কারণ এবং ভারতবর্ষ যে মধ্যমপন্থী হয়ে সবদিক থেকে বিপথগামী হলো, সে বিষয়ক আলোচনা করেছেন তিনি। মানসিক ভীতি কিভাবে সমাজকে পরিচালনা করে সে বিষয়ক চরম সত্য তিনি মুখের উপর বলেছেন। এতো বলিষ্ট আলোচনা আমি ইতিপূর্বে আহমদ ছফা ব্যতীত কারো লেখাতে পড়িনি।
⚫মানিক বন্দোপাধ্যায়ের একটি চরিত্র
আপনার যদি "পদ্মানদীর মাঝি" উপন্যাসটি পড়া থাকে তবে এই প্রবন্ধ পড়ে আপনি উপভোগ করতে পারবেন।১। ময়নাদ্বীপের মালিক, হোসেন মিয়াকে আমরা সবাই ভিন্নভাবে উপন্যাসে পেলেও, তাকে একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে আহমদ ছফা মূল্যায়ন করেছেন। এই ব্যাপারটিই ছিলো সবচেয়ে চমকপ্রদ। আবার একই সাথে তিনি হোসেন মিয়াকে তুলনা করেছেন গ্রিক মিথলজির জিউসের সাথে যিনি সবকিছুর মূল হয়েও এক প্রকার নির্বিকার ভূমিকা পালন করেন। প্রবন্ধটি পড়লে "পদ্মানদীর মাঝি" উপন্যাসটিকে মাঝিদের দুর্বিষহ জীবনযাত্রা কিংবা ফ্রয়েডীয় প্রেমের বাহিরে গিয়ে অন্যভাবে আপনি আবিষ্কার করতে পারবেন।
⚫রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতি সাধনা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ছোটবেলা থেকে গণ্যমান্য এক আসনে বসিয়ে, বলতে গেলে, চোখের উপর কালো পর্দা পেঁচিয়েই বেশিরভাগ মানুষ ভক্তি করে আসে। আমাদের প্রজন্মের হাতে গোণা কয়েকজন মানুষ তার সাধনা, তার কাজের বিস্তৃতি এবং সেগুলোর বিস্তৃতি সম্পর্কে জানি। স্বীকার করুন বা নাই করুন, পাঠ্যবইয়ের লেখাগুলো পড়ে কিংবা বাপ-দাদার কাছে প্রসংশা শুনে এবং "নোবেল" প্রাপ্ত লেখক হবার সুবাদেই আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ তাকে বড় একজন সাহিত্যিক হিসেবে মেনে নেই।
এই তেতো সত্য মেনে নিয়েই আপনি যখন আহমদ ছফার এই প্রবন্ধ পড়তে শুরু করবেন, তখনই বুঝবেন রবীন্দ্রনাথ কিভাবে কবিগুরু হয়ে উঠেছিলেন, কিভাবে তার পারিপার্শ্বিকতা তাকে সাহায্য করেছিলো আর পাঁচজন বাঙালির থেকে উঁচু মানের মনন ধারণ করতে। কেবল তার নিজস্ব জ্ঞানভান্ডারই নয়, তার পিতামহ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাবও যে তার সাহিত্য-সংগীতে বড়সড় একটা জায়গা দখল করে আছে, সে বিষয়ে লেখক উক্ত প্রবন্ধে আলোকপাত করেছেন।
⚫শিক্ষার দর্শন
এই প্রবন্ধকে অবশ্যই প্রাথমিক স্তর থেকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা প্রয়োজন।কেবল বাংলাদেশ নয়, সামগ্রিকভাবে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রই কমবেশি নিজেদের স্বার্থে শিক্ষাব্যবস্থাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং কিভাবে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে সেই দিকটিকে সুক্ষ্মভাবে তিনি এই প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করেছেন। একই সাথে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য নিয়েও তিনি প্রশ্ন রেখেছেন। কোন রাষ্ট্রই যে ধর্মরাজ্য নয়, এবং নিজ প্রয়োজনে সত্যকে বিকৃত করার প্রচলন যে বহু আগে থেকেই চলমান, সে বিষয়ক ইঙ্গিতও তিনি দিয়েছেন।আর সেই বিকৃত সত্য শিশুকাল থেকে মানুষের মধ্যে প্রবেশ করানোর অন্যতম মাধ্যমও যে বাধ্যতামূলক রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা, সেটিও তিনি উল্লেখ করেছেন সুদূরপ্রসারী আলোচনার মাধ্যমে।
আমাদের মধ্যে, স্কুল কলেজের ইতিহাস বিষয়ক বইগুলোকে ইতিহাসের বাইবেল হিসেবে ধরে নেয়ার মানসিকতা কাটাতে, এই প্রবন্ধ বিশেষভাবে সকলের পড়া উচিত৷ আমার মতে এই পুরো বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চমানের প্রবন্ধ ��টি।
⚫বার্ট্রান্ড রাসেল
আচ্ছা, আমাদের মধ্যে ক'জন মানুষ বার্ট্রান্ড রাসেলকে নিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা রাখে?
আমি অন্তত আমার এতোগুলো বছরের শিক্ষাজীবনে এই মানুষটি সম্পর্কে কোনোদিন বিন্দুমাত্র ভাবিনি, কবে কোথায় ঠিকভাবে তার নাম পড়েছিলাম বলে নেই। হ্যাঁ, মনে আছে মোতাহের হোসেন চৌধুরি তার "সভ্যতা" ও "সুখ" নামে দুটি লেখার অনুবাদ করেছিলেন। মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় এই দুটোর নাম জান প্রাণ দিয়ে মুখস্ত করেছিলাম, আমার জানামতে এখনকার সিলেবাসেও এই নাম দুটোর গুরুত্ব মোতাহের হোসেন চৌধুরীর অনুবাদ হিসেবে অপরিসীম। বিষয়টা একই সাথে হাস্যকর এবং শঙ্কা জনক।
এই প্রবন্ধে আহমদ ছফা মূলত একটি গন্ডির মধ্যে থেকেও কিভাবে রাসেল নিজেকে, নিজের আশেপাশের চিন্তাধারা থেকে নিজেকে মুক্ত করেছেন এবং নিজস্ব দর্শন সৃষ্টি করার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছেন সেটির দিকে আলোকপাত করেছেন। ইংরেজদের প্র্যাক্টিকাল মনোভাবকে ছাপিয়ে গিয়ে বনেদী খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণকারী রাসেল পেরেছিলো নতুন ভাবনা ভাবতে। এর পেছনে তার বাবার নাস্তিকতায় বিশ্বাস কোনোভাবে জড়িত কিনা সেই প্রশ্ন ছোড়ার পাশাপাশি জার্মান ক্লাসিকাল দর্শন থেকে তিনি কতোটা ভিন্নধরণের মতবাদ দিয়েছেন সেসকল বিষয়ে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
⚫ভবিষ্যতের ভাবনা
ফেসবুকের কল্যাণে আপনি আমি বসে বসে এখন যেই যুদ্ধ বিগ্রহ নিয়ে হালকা মাথা ঘামাচ্ছি, এই বিষয়টি নিয়ে তিনি আলোচনা করে গেছেন ১৯৬৭ সালে! বিশ্বের সকল যুদ্ধ বিগ্রহের মূল কারণ এবং প্রতিটি সংঘাত কিভাবে ভবিষ্যতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধকে স্বাগতম জানাচ্ছে এবং কতটা ইন্ধন যোগাচ্ছে সেসব বিষয়ে তিনি সুদূরপ্রসারী আলোচনা করেছেন উক্ত প্রবন্ধে। যা আমি পড়লাম ২০২৫ সালে এসে,অনেকে না পড়েই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলো আর আপনাদের মধ্য থেকে অনেকেই সেটা পড়ে ওঠার সময় করতে পারেননি। এই গোটা তালিকার মধ্যে তাই কিছু মানুষের হিটলারকে মহান পুরুষের আসনে বসিয়ে শ্রদ্ধাভক্তি করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়! এই বিষয়টাও এই প্রবন্ধ পড়ে কিছুটা হলেও আমার বোধগম্য হয়েছে।
⚫বাঙলার ইতিহাস প্রসঙ্গে
তুলনামূলকভাবে বেশ ছোট একটি প্রবন্ধ। বাঙলার সর্বস্তরের জনগণের এই ইতিহাসে যে প্রাপ্য স্থান কোন অংশে সমাজের উচ্চশ্রেণির চেয়ে কম নয়, সে বিষয়টিতে মূলত তিনি আলোচনা করেছেন।
⚫একুশে ফেব্রুয়ারি উনিশ শ' বাহাত্তর
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে বাঙালি জাতি পেয়েছিলো নিজেদের ভাষার অধিকার, তবুও সে ভাষাকে যথাযথ ভাবে চর্চার প্রয়োজনীয় রসদ তারা একাত্তরের আগে ঠিকঠাক ভাবে পায়নি। কাজেই বাহাত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিলো একটি নতুন সূর্যদয়। নিজের ভাষা, নিজের দেশ-আর সেই দেশের জন্য নিজ ভাষায় স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চার অবাধ সুযোগ। সম্ভাবনার কোন কমতি তখন বাঙালিদের জন্য ছিলো না। তখন বোধহয় জ্ঞানচর্চা কিংবা জাতির অগ্রতির জন্য সবরকম সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাঙালি পিছিয়ে ছিলো বুদ্ধিদীপ্ত মানুষদের অভাবে।যা পাকিস্তানিরা আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে করে গিয়েছিলো ১৪ই ডিসেম্বর।তার পাশাপাশি সদ্য স্বাধীন হওয়া নতুন রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক অবস্থা তো ছিলোই। নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে আমাদের দিতে হতো অনেক সময়, পরিচর্যার মূল জায়গা ছিলো নতুন শিশুরা। তাদের দিতে হতো জ্ঞানচর্চার সব রকম সুযোগ। যার মাধ্যমে বাঙালিরা মাথা উঁচু করে তাদের স্বাধীন হয়ে ওঠার সুমিষ্ট ফল বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করতে পারতো।সেই আশার বাণী শুনিয়ে আহমদ ছফা বাহাত্তর থেকে বাঙালিকে জেগে ওঠার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করলেন। পঁচিশে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয়বার স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে আরেকবার সেই আশার কথা স্মরণ করা জরুরি! আর পেছন দিকে তাকিয়ে ১ম স্বাধীনতা পরবর্তী অপূর্ণতার কথা স্মরণ করার প্রয়োজনীয়তাও অনুধাবন করা জরুরি। আমাদের জন্য আবার আহমদ ছফার মতো দেশ ও জাতির সর্বময় কল্যাণ কামনাকারী মহান ব্যক্তিত্ত্বের পুণর্জাগরণ জরুরি। ভীষণভাবে জরুরি।
⚫বাংলার চিত্র ঐতিহ্য:সুলতানের সাধনা
এস এম সুলতান কেন বাংলার আর পাঁচজন চিত্র শিল্পী থেকে আলাদা এবং তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণ বিশ্লেষণ করে আহমদ ছফা লিখে ফেলেছেন গোটা একটি প্রবন্ধ। মনে পড়ে ক্লাস সেভেন কি এইটে চারুকারু বইয়ে এই বিখ্যাত লোকটির কিছু কাজ সম্পর্কে হালকা পাতলা জেনেছিলাম, আফসোস হয় এই প্রবন্ধটা ওইখানে না পেয়ে, আজ এতো বছর পরে এসে পড়ার জন্য।
বাংলার বুকে শিল্পকর্ম সৃষ্টির ইতিহাস থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সময়টা কিভাবে চিত্রশিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছে এবং একই সাথে কেনো হাতেগোণা কয়েকজন সেই তালিকায় টিকে থাকলো আর বাকিরা ঝরে পড়লো, সেসব বিষয়ের চমৎকার বিশ্লেষণ। এটি সবচেয়ে বড় আকারের প্রবন্ধ বলে একটু ঝিমিয়ে গিয়েছিলাম পড়তে পড়তে। তবে শেষপাতে মিষ্টি কিছু খাওয়ার মতোই, শেষাংশে গিয়ে প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি বোধগম্য হওয়ায় এটিকেও অনেক উন্নত মানের লেখা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি।
⚫দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্ক
পশ্চিমবঙ্গের সাথে সাম্প্রতিক সময়ে যে রেশারেশি ধর্মের দোহাই দিয়ে চলছে, তার যুক্তিযুক্ত কোন সমাধান কোন লেখকের পক্ষ থেকে এসেছে কিনা সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।তবে আহমদ ছফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে পশ্চিম বাংলার সহযোগিতার মূল কারণ বিশ্লেষণ করেছেন যুক্তিযুক্ত ভাবেই। দুই বাংলার সাহিত্য নিয়ে তিনি বাঙালি হিসেবে সংশয় প্রকাশ করেছেন। জানতে চেয়েছেন সেই কারণ যার জন্য পশ্চিম বাংলা ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হবার পর এতো বছরেও কেনো সাহিত্যাঙ্গনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারেন নি।বাংলাদেশের মুসলমান সমাজ তাদের ধর্মীয় অনুভূতির জন্য বাঙালি হিসেবে বিকশিত না হয়ে মুসলিম রাষ্ট্রের গন্ডিতে বাঁধা পড়ে থেকে পিছিয়ে ছিলো, পশ্চিম বাংলার তো এমন কোন বাঁধা ছিলো না! এই বিষয়কে ঘিরে একটু চমৎকার আলোচনা আছে এই প্রবন্ধে। পাশাপাশি একাত্তরের পর পর পশ্চিমবাংলার সংবাদপত্রগুলোর যে মনোভাব তিনি তুলে ধরেছেন, তা বর্তমান সংবাদ মাধ্যমগুলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সমাধানের উপায় আহমদ ছফা দিয়ে গিয়েছেন, কিন্তু অবুঝ দুই জাতির সাধারণ জনগণ রাজনৈতিক দ্বন্দের ভীড়ে নিজেদের অস্বিত্ব হারিয়ে ফেলে, ক্রমাগত সংঘাত ছাড়া ভবিষ্যতে কিছু করতে পারবে কিনা, সে বিষয়ে আমি সন্দিহান।
⚫দস্তয়েভ্স্কি
এই প্রবন্ধের সমাচলোনা করতে দস্তয়েভস্কি কে আগে জানা প্রয়োজন। সেই যাত্রায় আমি নিজেই বহু পিছিয়ে। দস্তয়েভস্কির লেখার জগত নিয়ে যাবতীয় ধারণা ব্যতীত এই প্রবন্ধের মর্মার্থ উদ্ধার সম্ভব নয়। তবে সাদা চোখে দেখলে, এই প্রবন্ধে টলস্টয় এবং দস্তয়েভস্কি'র মানুষকে চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে যে তফাৎ সেটি প্রকাশিত হয়েছে দারুণভাবে। জানিনা "বাঙালি মুসলমানের মন" প্রবন্ধে এই অংশটির সংযুক্তির কারণ। সম্ভবত মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারলে আমার পক্ষে এই বিষয়ক আলোচনা করা সম্ভব হবে। প্রবন্ধটি তোলা থাকুক, একদিন আবার পড়বো আশা করি।
⚫একটি প্রাতিস্বিক গ্রন্থ
ফরহাদ মজহারের "প্রস্তাব" গ্রন্থটির সমালোচনা করে এই প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে। যেহেতু বইটি পড়া নেই তাই ফরহাদ মজহারের মনস্তত্ত্বকে ধরা সম্ভব হয়নি, আহমদ ছফা তার যে আলোচনা করে গিয়েছেন সেটিও তাই আমার জন্য অধরা রয়ে গেলো।
পুরো প্রবন্ধগ্রন্থ পড়ে শেষ করে বুঝলাম, আমার জ্ঞানের পরিধি এখনো বহু সীমিত। আরো এগোতে হবে, জানতে হবে। "বাঙালি মুসলমানের মন" প্রবন্ধের সার্থকতা হলো এর বহুমাত্রিক আলো��না।আপ��ি বুঝতে পারবেন, আপনার কি কি জানা প্রয়োজন৷ নিঃসন্দেহে এই বইটির গুরুত্ব বাঙালি মুসলমান সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণধর্মী শ্রেষ্ট গ্রন্থ। হয়তো তার সকল মতামতের সাথে সবাই একমত হবেন না, তবুও আমি বলবো বাঙালি পাঠকগোষ্ঠীর জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ।