Mahmudul Haque (Bangla: মাহমুদুল হক) was a contemporary novelist in Bangla literature. He was born in Barasat in West Bengal. His family moved to Dhaka after the partition in 1947. His novels deal with this pain of leaving one's home.
Mahmud gave up writing in 1982 after a number of acclaimed novels. Affectionately known as Botu Bhai and always seen as a lively figure in social gatherings, the rest of the time he was said to lead a solitary life.
নিম্নপাড়ার হাল-হাকিকাতের মাঝে এক দুঃখিনীর জীবনালেখ্য। আহা জীবন! জীবন কারো জন্য নারকেলের জীর্ণ ছিবড়ে; ভেতরের কোমল শাঁসের জন্য যার অস্তিত্বের বেড়ি। অতল না ঘাঁটলে ওই ছিবড়ে জীর্ণতাটুকুই চোখে পড়ে, শাঁসটুকু রয়ে যায় আড়ালে। মাহমুদুল হক ঘোর লাগানো অনবদ্য ভঙ্গিতে ঐ শাঁসটুকুর পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছেন কেবলমাত্র।
‘কালো বরফ’, ‘খেলাঘর’, ‘জীবন আমার বোন’—মাহমুদুল হকের ৮টি উপন্যাসের মধ্যে এ তিনটির নাম সর্বাধিক শোনা যায়। এগুলোর পাশে বসার যোগ্যতা রাখে বলে মনে করি ‘নিরাপদ তন্দ্রা’ও। ব্যক্তিগত পছন্দে ‘কালো বরফ’-এর পরেই আমি স্থান দিই এটিকে।
"জয়পাড়ার সচ্ছল এক বয়াতি পরিবারের মেয়ে। ভালোবেসেছিলো একজনকে। ভালোবেসে মা ভাইবোনের মায়া ছেড়ে পালিয়ে এসেছিল তার কাছে- শুরুটা তো এই! এরপর প্রথমে কেরামত আলী, কেরামত আলী থেকে কোবাত আলী, কোবাত আলী থেকে আকদ্দস, আকদ্দস থেকে কাঞ্চন, কাঞ্চন থেকে কাশেম গুন্ডা, হিরণ একটা লুটের মাল! কিন্তু একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছেন? প্রায় সকলের নামই ক প্রধান। এক ক থেকে আরেক ক, এই হল হিরন। এই ক কখনো অগ্নি, এই ক কখনো মন, কখনো রোগ, কখনো পানি, কখনো দেহ, কখনো দীপ্তি, কখনো ময়ূর। বোধ হয় তাই ক- এর বাইরে কোনদিন যেতে পারলো না সে।"
বইটার শেষের পার্টে হিরনের বেঘোর আত্মকথন উপন্যাসটাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে।
লেখকের কাব্যপনা কখনো বা গল্পকে কিছুক্ষণ প্রচ্ছন্ন করে রাখতে পারে। যা বলতে বলতে নিয়ে যাবে অন্য এক নদী, ধারণা ও জীবনের তীরে। ভুল লোকের হাত ধরে সংসারের স্বপ্নে গ্রাম থেকে পালিয়ে শহুরে চৌকাঠে হাত বদলে অন্যত্র গিয়ে পড়ে একজন যুবতী নারী, হিরণ। ক্লেদাক্ত কর্কট শহরের বাইরে থেকে দেখা যায় চকচকে আলোকোজ্জ্বল আর ভেতরে ভেতরে চলে বাক্সে বাক্সে বিভ্রমী গন্তব্য। তারপরও শেকল ভেঙে তার বেরিয়ে আসা, জীবনের পক্ষে কাছের মানুষ, দূরের মানুষদের চিনতে শেখা, দ্বিধা থরোথরো অমরাবতীর ধুলোর দিনে ফেরা আর নিজের পরিচয়কে খুঁজে চলার অবিরাম, অভিরাম ভার। শহরের পথে যেন মানুষেরা হাঁটে না এ গল্পে, মানুষদের হাঁটায় যেন শহরের পথ বাঁচার আশায়, তাগিদে। গল্পটা শুধু গল্পই না, রং ও অলো-আঁধারির এক যুক্তি ও কল্পনার বিমূর্ত চিত্রের মত অথচ গতিময়।
বাংলা, দর্শন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি—একটার পর একটা শেলফ ঘেঁটে যাচ্ছি, মনমতো বই চোখে পড়ছে না। একদম শেষমাথায়, অন্ধকারে, গাদা গাদা কাগজে ঠাসা ধুলোময় কাঠের আলমিরা সদৃশ একটা শেলফে চোখ গেল। এই আসবাবের বয়সটা আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম—ঘুনে খাওয়া দেহ, রংচটা, প্রাচীন। নিচ থেকে দু'নম্বর তাকে মাহমুদুল হকের নামটা দেখে চমকে উঠলাম। এখানে উনার নামটা দেখব বলে বিন্দুমাত্র আশা করিনি। বইটা বের করে হাতে নিতেই দেখি, তড়াক করে ফর্মাগুলো খুলে হাতে চলে আসলো। পোকামাকড়ের ডিম, ধুলো মিলে যাচ্ছেতাই রকমের অবহেলায় পড়ে আছে বইখানা। কোনোমতে নাম লিখিয়ে বাসায় নিয়ে আসলাম সেটা। তারপর রয়ে-সয়ে, দুপুরের পর এবং ঘুমানোর আগে কয়েক ডজন বৈঠকের পর সম্পূর্ণটা (১৪০ পেজ) পড়ে শেষ করলাম। পাশাপাশি এটাও বুঝতে পারলাম যে আমার ভেতরের কলকব্জা সব ধীর হয়ে গেছে। এই মন্থর গতি নিয়ে বন্ধু-বান্ধবের সামনে নিজেকে পাঠক বলে ফাপড় নেওয়াটা লজ্জাজনক হবে।
[“নিরাপদ তন্দ্রা”]
এই শব্দ দুটি একসাথে জুড়ে দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র মাহমুদুল হকেরই আছে। দীর্ঘক্ষণ জ্বাল খাওয়া দুধের ঘন সরের মতো মখমলে বাক্যের গাঁথুনি, শব্দ নিয়ে কবিতা কবিতা খেলা, আর হৃষ্টপুষ্ট অনুভূতির বিকিরণ—একসাথে কেমন জানি একাকার হয়ে যায় তার গল্পে।
শহরের গা ঘেঁষে ব্যাঁঙ-ছাতার আদলে গড়ে ওঠা এক বস্তিতে কাহিনীটা জমতে শুরু করে—ফকিরচাঁদ সর্দারের বস্তি সেটা। ঘটনা খুব একটা সেখানে ঘটেনা —হরদম গালমন্দ, চিৎকার, টানাহেঁচড়া আর খুন-খারাবি।
[“প্রয়োজন হয় না বলে এখন আর আমি দিন-তারিখের কোনে। হিশেব রাখি না। তবে রবিবারটা সহজেই ধরা যায়। ইদ্রিস প্রেসে যায় না। গোটা বস্তি এলাকা সরগরম হয়ে থাকে, মনে হয় একটা সাপ্তাহিক হাট বসেছে। হৈ-হল্লা, ঝগড়া-ফ্যাসাদ, খিস্তি-বিখিস্তি সমানে চলতে থাকে। তারপর দুপুরের আগেই আবার সব ঠাণ্ডা। প্রায় জনমানবশূন্য হয়ে যায় বস্তির এক একটা দিক। ইদ্রিস ঘরে বসে বসে চোটপাট করে, ব্যাটাদের পেটে ভাত নেই, পরনে নেংটি নেই, তবু চাঁদির ওপর থেকে সূর্য সরতে না সরতে ঝোড়োকাকের মতো যক্ষ্মারোগীগুলো মাঠে গিয়ে জমবে।”]
মূল ঘটনাটা ইদ্রিসের তক্তপশের এক দীর্ঘ ইতিহাস। ইদ্রিস কম্পোজিটর—প্রেসের কালি, লেড আর সিসা নিয়ে যার কারবার। গল্পের আরেক মুখ্য চরিত্র হলো হিরণ। আমরা হিরণকে যতটুকু চিনি, তার সবটা বস্তির নানা ঘোর কেউটে চরিত্রদের মুখ থেকে শোনা। ইদ্রিসের মুখ থেকেই সর্বপ্রথম শোনা যায় তার কথা। হিরণ কোনো স্বর্গের অপ্সরা নয়। তবে এক হিরণকে নিয়ে যা বিতিকিচ্ছিরি ঘটনার সূত্রপাত ওই বস্তিতে ঘটেছিল—তা বোধহয় সেই হেলেন অফ ট্রয়কে নিয়েও ঘটেনি।
[“হিরনের মাথায় চুল একটু বেশিই ছিলো, আকদ্দস প্রায়ই অনুযোগ করে বলতো, তোমার চুলটা খানিকটা ছেঁটে ফেল, বড় বেশি তেল খরচা হচ্ছে, তেল না দিলেও চুলের কোনো ক্ষতি হয় না। আসল কথা হলো রোদে নিয়মিত চুল শুকোনো। রোদে যে ভিটামিন ডি আছে। এদিকে মাসে একদিন চুলে তেল পড়তো কি না সন্দেহ।”]
এক হাত থেকে অন্য—ছেঁড়া হাজার টাকার নোটের মতো। টাকার মূল্যটা চাই, তবে ছেঁড়া টাকা বহনের ইচ্ছা নেই। কেরামত থেকে ইদ্রিস, তারপর কোবাত আলী, আকদ্দস হয়ে কাঞ্চন, তারপর কই থেকে কই—সবার তন্দ্রার ভেতরে বসবাস হিরণের। তপোবনে নীলাভ মায়াহরিণী যেন! কেমন আছে হিরণ? মুক্তি কি পেয়েছিল সে অজস্র তন্দ্রার ভেতর থেকে?
[“...হাড়গোড় ভাঙা দ হয়ে শুতে খুব আরাম। মায়ের পেটের ভেতরও আমরা দ হয়ে থাকি, অথচ কি আশ্চর্য দ দিয়ে কি সব দারুণ দারুণ শব্দ তৈরি হয়--দর্প দণ্ড দংশন দগ্ধ দস্য.....”]
বই : নিরাপদ তন্দ্রা লেখক : মাহমুদুল হক প্রকাশ : ডিসেম্বর, ১৯৭৪ প্রচ্ছদ : নওয়াজেশ আহমদ পর্যালোচনা : মিনহাজ জোস্টার তারিখ : ১লা অক্টোবর,২০২৫
পুরো বইটা জুড়ে বিভিন্ন চরিত্রের বয়ানে হিরনের দুর্বিষহ জীবনচরিত শুনতে বিরক্তিকর লাগছিল, মনে হচ্ছিল বইটি দু' তারার অধিক যোগ্য নয়। কিন্তু এরপর এল বইয়ের শেষের কয়েক পৃষ্ঠায় হিরনের লাগাতার স্ট্রিম অফ কনশাসনেস। মানুষের বয়ানে নির্মিত বিমূর্ত চরিত্র, দুর্ভাগ্যের প্রতীক হতে মেয়েটি হয়ে উঠল একজন রক্ত মাংসের মানুষ; অঘটনের পর্বতসম বোঝা ও একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তের যাঁতাকলে পিষ্ট একজন প্রেমপীড়িত অভাগা। বইটা আর তারকা ও রেটিং এর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকল না। মানুষের মুখের কথা ও মনের বিষে রন্ধিত একটি অনাত্ম্য, অলক্ষুণে সত্ত্বা হতে মাত্র ৩-৪ পৃষ্ঠার আত্মকথায় হিরন যেভাবে চোখের কোণে অশ্রুবিন্দুতে রুপান্তরিত হল - মাহমুদুল হকের শক্তিমত্তা আর এই বইটির মাধুর্য ঠিক এখানেই।
মাহমুদুল হক বাংলা সাহিত্যের অগ্রজপ্রতিম লেখক। তাঁর রচনার ভাষা স্বতন্ত্র একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে বহমান। প্রথাগত রীতির বাইরে গিয়ে সংলাপ ও গল্পের নির্মাণের মাধ্যমে পাঠককে অসাধারণ কিছু লেখা উপহার দিয়েছেন। 'নিরাপদ তন্দ্রা' তেমনই একটি উপন্যাস। মূলত একটি নারী চরিত্রের জীবনকে ভাষার সূক্ষ্ম কাজের মাধ্যমে ছাপার হরফে এনেছেন লেখক।
কামরান রসুল একজন অকর্মণ্য যুবক। যার কাছে অতিরিক্ত শ্রমের কোনো মূল্য নেই। তার জীবনে তিনটি জিনিসই প্রধান; খাদ্য, বাসস্থান এবং বই। এই তিন জিনিস হলেই নিশ্চিন্তে দিন কাটিয়ে দিতে পারে। সে প্রায়ই চাকরি বা বাসস্থান পরিবর্তন করে। বই কেনার ক্ষেত্রে পুরনো ফালতু বইগুলোই কিনে থাকে। এতে টাকা কম লাগে। দেখা গেল পিঁপড়াদের নিয়ে একটা বই কিনে পড়া শুরু করে দিল। সর্বশেষ ডেকোরেশন এর দোকানের চাকরি অনেকটা ব্ল্যাকমেইল করে ৫০০ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয় সে।
চাকরি ছাড়ার পর স্থান হলো করাতিটোলায় ফকিরচাঁদ সরদারের বস্তিতে। প্রেসে কাজ করার সময় ইদ্রিস কম্পোজিটরের সাথে পরিচয় হয়েছিল। সেই সুবাদে বস্তিতে ইদ্রিসের সাথে মিলে একটি ঘর ভাড়া করে থাকা শুরু করে কামরান রসুল। ঘরভাড়া বাকি পড়ায় ফকিরচাঁদ সর্দার বেকার দেহাতি ছুতোর মিস্ত্রির একটা তক্তোপোশ আটক করেছিল। সেই তক্তপোশ কামরানের জন্য ৫ টাকা দিয়ে কিনে আনে ইদ্রিস। তক্তপোশের অবস্থা বহু হাতবদল হওয়া মেয়ের মতো হলেও সস্তা ভেবে কিনে নেয়। তক্তপোশের পায়ার ওপরে খড়িমাটি দিয়ে 'আমার সোনা মানিক দালহাপ্পু দালহাপ্পু বলে কাঁদে' লেখা ছিল। ইদ্রিস জানায় এই তক্তপোশের বিরাট এক ইতিহাস আছে। ইদ্রিস সেই ইতিহাস বলতে শুরু করলে প্রথমদিকে কামরান আগ্রহ না দেখালেও আস্তে আস্তে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠে। মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে ইদ্রিসও ঘটনাগুলো বলে যায়।
তক্তপোশের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে বয়াতি বাড়ির মেয়ে হিরণের নাম। পুরো ইতিহাসটা জানা যায় ইদ্রিস কম্পোজিটর ও জলিল বুকির মুখ থেকে। সেখানে কামরুন রসুল শুধুই শ্রোতা। ইদ্রিসের প্রেসের ম্যানেজার ছিল কেরামত আলি। কেরামত আলি তার গ্রামের মেয়ে হিরণকে ভালোবেসেছিল। ভালোবাসাকে পূর্ণতা দানের উদ্দেশ্যে পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে পালিয়ে এসেছিল কেরামত আলির হাত ধরে। এদিকে ঢাকায় আসার পর যখন দেখলো পুলিশি হাঙ্গামা হতে পারে তাই হিরণকে ইদ্রিসের কাছে রাখে এবং ২০ টাকা দিয়ে এই তক্তপোশটি কিনে দেয়। এদিকে তাদের তখনো বিয়ে হয়নি এবং প্রেসেও একদিন পুলিশ আসে।কেরামত আলি ফেরার হয়। হিরণের কী হবে তাহলে? ইদ্রিসই বা কীভাবে বস্তির মধ্যে এমন ভদ্র ঘরের মেয়েকে নিরাপত্তা দিবে?
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে একজন নারী যে সমাজেই বসবাস করুক না কেন; অভিভাবকহীন থাকলে বিস্তর ঝামেলা পোহাতে হয়। হিরণ ভদ্র পরিবারের মেয়ে হলেও যখন তার সাথে পালিয়ে আসা অভিভাবক লাপাত্তা হয়; তখন তাকে সবাই লুটের মাল মনে করে নিজের করায়ত্ত করতে চায়। ইদ্রিস নিজেও সেই প্রবৃত্তি থেকে বের হতে পারেনি। এই একটা উপন্যাসে এত উপমা, বাগধারা, প্রবাদ ছিল যা অন্য কোনো উপন্যাসে দেখিনি। তবে এতে গল্পের সৌন্দর্যের কোনো ক্ষতি হয়নি। অধিকাংশ ঘটনাই ইদ্রিস ও জলিলের জবানিতে জানা যায়। মাঝেমধ্যে কামরান রসুলের বক্তব্যও ছিল। তবে গল্পের শেষ কয়েক পৃষ্ঠা অসাধারণ ছিল। হিরণ কি শুধু একটু নিরাপদ তন্দ্রার কাঙাল হয়ে পড়েছিল? নাকি আরো বৃহৎ কিছুর আকাঙ্খা ছিল! হ্যাপি রিডিং।
পৃথিবীতে আছে বিচিত্র রকমের মানুষ আর বিচিত্র তাহাদের মন। আর আছে বিচিত্র রকমের বই পড়ুয়া। বই যারা পড়ে তারা সুন্দর গোছালো, পরিপাটি হবে এমনটা আশা করা ভুল। আগোছালো আইলসা, কুঁড়ে ফন্দি বাজ মানুষ ও বই পড়ুয়া হয়ে থাকে। জ্ঞান অর্জন ছাড়া শখ ও একা একা সুন্দর সময় কাটানোর জন্য অনেকেই বই পড়ে থাকেন। বই কেনার সামর্থ্য না থাকলেও নানা কায়দা-কৌশল করে হলেও তারা বই যোগাড় করে ও পড়ে থাকেন।
এমনই এক বিচিত্র বই পড়ুয়া যার কাছে অতিরিক্ত পরিশ্রমের কোন মূল্য নাই। কয়েকটা চাকরি ছেড়ে অবশেষে যে চাকরিটা ছাড়লো সেখান থেকে সে ৫০০ টাকা পায়, তাই নিয়ে বস্তিতে ইদ্রিসের সাথে বস্তিতে একটা ঘর ভাগাভাগি করে থাকে, প্রেসের প্রুফ দেখার কাজের সময় থেকে ইদ্রিসের সাথে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব। থাকাট জায়গা পেয়ে সে মহা শান্তিতে শুয়ে শুয়েই কাটিয়ে দিতে লাগলো দিনগুলো, টাকা শেষ হলেও সে যে কাজের সন্ধান করতে এ লক্ষণ তার মাঝে দেখা গেল না। এরই মাঝে একদিন সেই বস্তিরই একজনের থেকে একটা খাট কিনে নিলো ইদ্রিসের কথাতে,যে খাটের আছে এক লম্বা ইতিহাস।
মানুষ কত ভাবে লড়াই করে টিকে আছে এই পৃথিবীতে তা ভালোভাবে খেয়ে পড়ে সুন্দর জীবন কাটানো মানুষ গুলো কখনই বুঝতে পারে না। জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত বেঁচে থাকার জন্য যে সংগ্রাম, সেখানে আত্মসম্মান, মান-মর্যাদা, চরিত্র, মায়া-দয়া, ভালো ব্যবহার সব তুচ্ছ। জীবন চলবে তার নিয়মে কিছু মানুষ বেঁচে থাকবে কীটপতঙ্গের জীবন নিয়ে। সেখানে শুরু বেঁচে আছি এই স্বস্তিটুকুই আছে নিদারুণ যন্ত্রণার মাঝে। লেখক মাহমুদুল হক এর " নিরাপদ তন্দ্র" এক বস্তি জীবনের সরল রেখার বিচিত্র জীবন এর কাহিনি। সরল কারণ এখানের জীবনে কোন আড়ম্বর নাই, আছে জটিলতা, টিকে থাকার দারুণ এক লড়াই। হেরে যেতে যেতে কত মানুষ কি কায়দা করে বেঁচে আছে এটাই " নিরাপদ তন্দ্রা"।
" থ এর মত অমন থমকে কেন , দ হয়ে শুচ্ছি বলে? আপনি জানেন না, হাড়গোড় ভাঙা দ হয়ে শুতে খুব আরাম। মায়ের পেটের ভেতর ও আমরা দ হয়ে থাকি, অথচ কী আশ্চর্য দ দিয়ে কী সব দারুণ শব্দ তৈরি হয়। "
দ এর এহেন দরদমাখা লেখার দরুন দৃষ্টান্তমূলক দাগ দেগে যান দর্শক তথা পাঠক দের মনে। তাইতো বারবার ফিরে আসতে হয় লেখকের এই দ এর দোরগোড়ায়...।।।
এটা কার গল্প? কথকের? যে পুরো বই জুড়ে শুধু আরেক চরিত্রের কথা শুনে গেছে? কি নির্মোঘ নির্লিপ্ততা না দেখিয়েছে কথক শুরুতে। অথচ, শেষের দিকে তার আগ্রহ যেন বীজ থেকে চারা গজিয়ে বাড়ার মতো বাড়তে থাকে। নাকি ইদ্রিস মিয়ার গল্প ছিলো? মুখচোরা ইদ্রিস পরের গল্প বলেই খালাস, নিজের গল্প আর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে নি। আকুতির বীজ মাটির গর্ভেই পচিয়ে ফেলেছিল। অঙ্কুরোদগমের অবকাশই যার হয়ে উঠেনি তাঁর? বয়াতি কন্যা হিরণ? এটা হয়তো তার গল্প। জীবনের প্রতিটা মুহুর্ত যে অনিশ্চয়তায় কাটিয়েছে, যাকেই আশ্রয় করে ভেসে থাকতে চেয়েছিল সেই ডুবিয়েছে। যেখানেই গেছে, অঘটন ঘটে গেছে। এতসব ঘটন অঘটনের ভিড়েও হিরনের আশার বাতি কখনো নেভেনি। শুধু এটুকু নিশ্চিত জানা যাবে না, চাতকের মতো বৃষ্টির খোঁজে থাকা মেয়েটার চাওয়াটা পূরণ হয়েছিল কিনা? পেয়েছিল কিনা সেই আকাঙ্খিত বস্তুর খোঁজ? একটুখানি নিরাপদ তন্দ্রার?
মাহমুদুল হকের বইগুলো এক বসাতেই পড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। এইটাও তাই করলাম। নিরাপদ তন্দ্রা ছোট্ট বই।
যাকে ঘিরে গল্প টেনে নিয়ে যায় সেই প্রোটাগনিষ্ট একটি মেয়ে, বয়াতি পরিবারের একটি মেয়ে, ভালবেসে একজনের সাথে শহরে পালিয়ে এসে ভীষণ এক নরককুণ্ডে আটকে যায়। পুরুষ থেকে পুরুষান্তরে হাত বদল হতে থাকে সে, যেন সে একটা লুটের মাল! এই লুটেরা সমাজের এক ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে নিয়েই এই গল্পের কারবার।
বরাবরের মতো এবারো মুগ্ধ হলাম মাহমুদুল হকের সৃষ্টিশীল কথাসাহিত্যে!
Ironically, নিরাপদ তন্দ্রার কোনো চরিত্রের তন্দ্রাই নিরাপদ নয়। ভাগ্য বিড়ম্বনা কিংবা নিয়তির ফেরে তাদের তন্দ্রা প্রতিনিয়তই বিঘ্নিত হচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে।
নিজের ভাষায় 'একজন অকর্মণ্য' যুবকের উত্তম পুরুষের জবানীতে নিরাপদ তন্দ্রার পটভূমিতে প্রবেশ। অতঃপর, পর্যায়ক্রমে স্বেচ্ছায় কষ্ট অভিলাষী হিরন, নিজের সাথে লুকোচুরি খেলতে থাকা ইদ্রিস আলী, সঙ্গদোষে ভেসে যাওয়া কাঞ্চন, ধুরন্ধর জলিল মিয়ার আগমন। সবাই কেবল ঘোর তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো অনিশ্চয়তার রেখা ধরে কখনও হেঁটে চলেছে, কখনও দৌড়াচ্ছে। সেই রেখা কেন্দ্রে বসে হিরন তার ভাগ্যের দিকে চেয়ে ক্রুর হাসি হাসছে। নিরাপদ তন্দ্রার অনিরাপদ ঘটনাপ্রবাহ এমনই।
সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হিরন হলেও আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল গল্পকথক অর্থাৎ সেই 'অকর্মণ্য যুবক' নিজেই। পড়তে পড়তেই বইয়ের কোনো এক অংশে নিজেকে আবিষ্কার করলাম ফটিকচাঁদ বস্তির এক খোপরিতে। যেন বা গল্পকথক আমি নিজেই। যে কিনা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন, যার বেঁচে থাকার একমাত্র বিলাসিতা বই পড়া, মোটামুটি খেতে-পরতে পারলেই যার দিন স্বাচ্ছন্দ্যে কেটে যায়। কোনো আশা নেই, ভরসা নেই, প্রাপ্তি নেই, যোগাযোগ নেই, সংযোগ নেই। যার জীবন অন্য দশজনের মতো ঘটনাবহুল নয় অথচ বসে বসে নির্লীপ্ত চোখে আশেপাশের মানুষের ঘটনাবহুল জীবন প্রত্যক্ষ করছে ।
বৃষ্টিমুখর এসব দিনে মাহমুদুল হকের বৃষ্টির প্রতি ভাবালু মনোযোগ, আমাকে কিছুক্ষণের জন্য ফটিকচাঁদ বস্তির একটা ছোট্ট খুপরিতে বসিয়ে, হিরন নামের একটা সাধারণ মেয়ের ভাগ্যকথা কিংবা ইদ্রিস আলীর অনিরাপদ তন্দ্রার কথা শোনালো...। আমি শুনলাম... মুগ্ধমনে কেবল শুনেই চললাম...
...
" ইচ্ছে করেও মানুষ কাঁদতে ভালোবাসে, সর্বনাশকে লালন করতে ভালোবাসে। মানুষের যাবতীয় প্রবণতার এটা হয়তো একটা অসুস্থ দিক, কিন্তু অসুস্থ হলেও অস্বীকার করার মতো নয়। " - নিরাপদ তন্দ্রা, মাহমুদুল হক
" I desire the things that will destroy me in the end." – Sylvia Plath
দুটো উক্তির মধ্যে ঠিক কোথায় কতটুকু কি মিল আছে, বুঝতে পারছি না। কিন্তু কোথায় যেন একটা রবীন্দ্রনাথের সেই "সকল নিয়ে বসে আছি, সর্বনাশের আশায়" লাইনটির সুর শুনতে পেলাম।
নিরাপদ তন্দ্রা থেকে নিরাপদ ঘুমের যাত্রায় যাদের জীবন বারবার বাধা পায়, তাদের কপালে সর্বনাশ ছাড়া অন্য কোনো পরিণতি সম্ভব কি?
মাহমুদুল হকের অন্যান্য উপন্যাসের চেয়ে এইটা স্লো। এইজন্য পড়তে আরাম পাওয়া যায় না।
সুন্দর একটা গল্প হতে পারতো। এক প্রেসের ম্যানেজারের হাত ধরে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা মেয়ে কীভাবে সেই ম্যানেজার এর সাথে একদিনও সংসার করতে পারলো না এবং পরবর্তীতে তার সাথে কী হলো সেটাই এই বইয়ের উপজীব্য।
লেখক এটাকে বিরক্তিকর গল্পে পরিণত করে ফেলেছেন। বিশেষ করে হিরন নামের মেয়েটির গল্পকে বড্ড বেশি ন্যাকামি মার্কা ও নাটুকে করে ফেলেছেন। গল্প হুটহাট খেই হারিয়েছে বারবার।
আমার ভালো লাগেনি। কিন্তু অনেকেই এটাকে ভালো বলেছেন। কার কেমন লাগবে তা কখনো আগে থেকে বোঝা যায় না।
মাহমুদুল হক আমার কাছে অসাধারণ একজন লেখক। তার ‘জীবন আমার বোন’ পড়ে আমি মোটামুটি থমকে গিয়েছিলাম। যদিও নিরাপদ তন্দ্রা বইটি সেই জায়গায় যেতে পারেনি, তারপরেও উনার লেখনির গুণে কোন গল্পই আর সাধারণ থাকেনা। আবার একইভাবে চিন্তা করলে কোন জীবনই তুচ্ছ বা নগণ্য নয়, তাই সেই জীবনের গল্পগুলিও ঠিক ঠিক আলোবাতাস পেলে সেইরকমই অসামান্য হয়ে উঠে। যদিও এই গল্পটি যে ঠিক কাকে নিয়ে, এর কেন্দ্রে কি আসলে হিরণ নাকি ইদ্রিস কম্পোজিটর, নাকি সবাইকে নিয়েই তালগোল পাকানো একটা কিছু, কে জানে! মাঝে মাঝে একটু চিন্তায় পড়ে যেতে হয়। আবার এও হতে পারে যে, এটি শুধুই একটি গল্প, আর চরিত্রগুলি আমাদের আশেপাশের মানুষগুলিরই প্রতিফলন। এখন পাঠকেরাই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
বইটার একটা দিক লক্ষ করে বেশ মজা পেলাম, এ��টি মাত্র বইয়ে এত পরিমাণ বাগধারা, প্রবাদবাক্য আর দেখি নি আমি। এবং ব্যাপারটা অবশ্যই লেখকের ইচ্ছাকৃত মনে হয়েছে।
হিরনের দুর্বিপাক পড়তে খারাপ লাগছিল না, চলনসই। কিন্তু শেষের চার পৃষ্ঠা একদম স্তম্ভিত করে দিয়েছে। আহা!
ষাটের দশকের মূলতঃ ঢাকার বস্তিকে কেন্দ্র ক'রে লেখা এই উপন্যাস। পুরোনো ঢাকার করাতিটোলার বস্তি। অনেকের কাছেই লেখাটাকে ছন্নছাড়া মনে হবে, উপন্যাসের মূল দুই চরিত্রের, হিরন ও ইদ্রিস, জীবনের বর্ণনে ঘ্যানঘ্যানে ভাব আসতে পারে কিন্তু মাহমুদুল হকের স্পর্শ মানেই অন্য কিছু, অন্য এক মার্গ, যা অনেক উঁচুতে। বস্তির গুন্ডা-বদমাশ-চোর-গাঁটকাটাদের সঙ্গে আছে ইদ্রিসের মতো নিরীহ মানুষ, যে নিজের ভালোবাসার, প্রেমের কথা ব'লতে পারে না, জ্বলতে থাকে অনলে। হিরনের চরিত্রে এক ট্র্যাজিক নারীচরিত্র পাই। লেখকের মতে, সে যেন লুটের মাল, সমানে হাতবদল হ'য়ে চলেছে। পুরো উপন্যাসজুড়ে লেখক নিজে একজন দর্শক, অবজার্ভার। বাস্তবের কঠিন রূপটা তুলে ধরতে অতিবাস্তবতায় চলে গেছেন আর শেষ ক'রেছেন হিরনের এক মোনোলগে, যেন স্ট্রিম অফ কনশাসনেস, যেন এক জাদুবাস্তবে চ'লে গিয়ে উপন্যাসের ইতি। লেখকের মানবতা, মানবিকতা ফুটে উঠেছে পদে পদে, সমাজের এই নিম্ন শ্রেণির মানুষগুলোকে খোলা মন নিয়ে দেখেছেন।
তবে উপন্যাসের একটা তারা খসে গেছে লেখকের মাত্রাতিরিক্ত উপমার ব্যবহারে। অনেক অনেক বেশি ক'রে ফেলেছেন। কিছুটা হয়রান করবে পাঠককে, তবে উপভোগ করারও সুযোগ আছে। একটানা বৃষ্টি হচ্ছে, আষাড়ের বৃষ্টি, তার টায়ারের চপ্পলটাও ভেসে কোথায় চলে গেছে, তিনি লিখছেন - 'শনি থেকে শুরু করে একটানা তেরোদিন বৃষ্টি, মাথার খুলির ভিতরেও একহাঁটু পানি।'
"প্রথমে নিজের সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। অামি একজন অকর্মণ্য যুবক। আমার নিজের কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শ্রমের কোনো মূল্য নেই।"
একটা উপন্যাসের শুরু যদি এতটা সাবলীল আর সুন্দর হয়, কেমন করে সে উপন্যাস পড়া শেষ হবে না। খুবই আনন্দ নিয়ে পড়ে ফেললাম হিরনের গল্প। যদি হিরনের জীবন আনন্দদায়ক ছিল না। লেখকের ঘটনার প্রভাব বর্ণনা ছিল অসাধারণ।
পুরোটা বই জুড়ে এক নারীর চরিত্র চিত্রন ছিলো বিভিন্নজনের বয়ানে। বিরক্তি এসে গিয়েছিলো। কাহিনীর মোড় যেন আর শেষ হয় না। অবশেষে.... শেষের কয়েকটি পৃষ্ঠা.... চোখের কোণে পানি আর মাথায় ঘুরতে থাকা কিছু লাইন....
কেরামত ম্যানেজার বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হিরনকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসে।বিপদ বুঝে ইদ্রিসের কাছে হিরনকে বস্তিতে রেখে সরে পড়ে।বস্তির বিরূপ পরিবেশে বেঁচে থাকার সবরকম চেষ্টায় হিরন করে।এর হাত থেকে ওর হাতে ঘুরতে থাকে হিরন। কিন্তু কোথাও মানুষ বলে আর বাঁচতে পারে না। একটা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সদা ব্যাকুল হিরন।এই আশ্রয় সে ইদ্রিসের কাছেই পেতে পারতো। কিন্তু কাপুরুষ ইদ্রিস মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারলো না।
বইটি মূলত এক নারীকে কেন্দ্র করে লেখা যার প্রয়োজন ছিল নিরাপদ আশ্রয়ের। আশ্রয়ের প্রয়োজনে তার সাথে ঘটে যায় বিচিত্র সব ঘটনা। এই বইয়ের একটি বিশেষত্ব হলো লেখকের ভাষা। তিনি বইয়ে বিচিত্র সব শব্দ ব্যবহার করেছেন।যা বেশ প্রশংসনীয়। তারপরও কয়েকটি জায়গায় আমার কাছে ধোঁয়াশা হয়ে রইল। আবার পড়তে হবে কোনোদিন।