বিশাল দেশ আমাদের এই ভারতবর্ষ। পাহাড় দিয়ে ঘেরা। সমুদ্র দিয়ে ধোয়া। নদী তার গলার মালা। অরণ্য গায়ের রঙিন পোশাক। পর্বত তার মাথার মুকুট। প্রাচীন যুগ থেকে এদেশে এসেছে আৰ্য, পারসিক, গ্রিক, শক, কুষান, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ-আরও নানা জাতি। বিদেশ থেকে কালে কালে বহু পর্যটকের পদচিহ্ন পড়েছে ভারতের মাটিতে। তাঁদের বর্ণনায় চিত্রিত হয়েছে তৎকালীন ভারতের নিজস্ব রূপ। তাদেরই কয়েকজনের বর্ণনা নিয়ে সাজানো এই বই, যেন এক মালায় অনেক রঙের ফুল।
এতে আছে ভারতকথা, মেগাস্থিনিস, ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাঙ, মার্কো পোলো, ইবন বতুতা, আল বেরুণী
Purnendu Patri (sometimes Anglicised as Purnendu Pattrea) was an Indian poet, writer, editor, artist, illustrator, and film director. He was best known for his poems and stories, particularly for his poetry collection Kathopokathan in Bengali, and for his experimentation with book cover design. He also was a researcher of the history of Kolkata.
আজ ২০২২ এর ১৫ আগস্ট, আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনের আজ ৭৫ বছর হয়ে গেল। অজস্র বিপ্লবীদের রক্ত ঝরেছে দেশকে স্বাধীন করতে। বিদেশী শক্তি ইংরেজদের অত্যাচারে রাঙা হয়ে উঠেছিল সেইসময় ভারতের মাটি। তারা দেশকে ভালোবাসেনি, বাণিজ্য করতে এসে একচেটিয়া আধিপত্য অর্জন করে দেশকে লুঠ করেছে। ৭৫ বছর আগের এই ইতিহাস আমাদের সকলের জানা। কিন্তু আজ থেকে ৭০০-১০০০ বছর আগে ভারত কেমন ছিল, কী ছিল তাঁর রূপ তা আমাদের অনেকেরই অজানা। সেই প্রাচীন কাল থেকে অনেক বিদেশী শক্তি ভারতে এসেছে, সাথে এসেছিলেন অনেক পর্যটকও, যাঁরা ভারতকে ভালোবেসে থেকে গেছেন এখানে অনেক বছর এবং পরবর্তীতে নিজের দেশে ফিরে গিয়ে লিখেছেন ভ্রমণকাহিনী। সবসময় যে বিদেশী ভ্রমণকারীদের সব কথা ঠিক ঠিক সত্য হয় তা নয়, তবুও নিজের দেশকে জানার জন্য তাঁদের বর্ণনা প্রয়োজনীয়। তাঁদেরই কয়েকজনের বর্ণনা নিয়ে সাজানো এই বই, যেন এক মালায় অনেক রঙের ফুল।
🔶মেগাস্থিনিস~ গ্রীক বীর আলেকজান্ডারের মৃত্যুর ১৮ বছর পর আরেক গ্রীক যোদ্ধা সেলুকাস সৈন্যগণ নিয়ে আসেন ভারত জয় করতে। কিন্তু মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের কাছে হেরে গিয়ে তিনি তাঁকে ফিরিয়ে দেন গ্রীকদের জয় করা অনেকগুলো রাজ্য এবং সাথে নিজের মেয়ের সাথে বিবাহও দেন চন্দ্রগুপ্তের। এরপর দেশে ফিরে সেলুকাস দূত হিসেবে ভারতে পাঠান মেগাস্থিনিসকে। মেগাস্থিনিসের মতে সেইসময় ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড়ো নগর ছিল মগধের রাজধানী পাটলিপুত্র, যা ছিল গঙ্গার ধারে। তাঁর লেখা থেকে জানা যায়, সেইসময় সাধারণ মানুষদের পোশাক ছিল সুতির সাদা কাপড় আর ধনীরা পরতেন রঙিন ঝলমলে পোশাক সাথে গায়ে সোনার গয়না, পায়ে পুরু গোড়ালি ওয়ালা চামড়ার জুতো। জানা যায় সেইসময় মানুষের আয়ু ছিল দীর্ঘ, তাদের আচার-ব্যবহার ছিল সরল। দেশের বেশিরভাগ মানুষই ছিল চাষী। মেগাস্থিনিসের মতে তখন দুর্ভিক্ষ দেখা দিত না, আর তখন না ছিল দাসপ্রথা। তবে এই নিয়ে অবশ্য মতপার্থক্য আছে। এছাড়াও সেইসময়ের বলিদান প্রথা, রাজ্য শাসনের বিভাগ, কর বিভাগের সম্পর্কেও জানা যায় মেগাস্থিনিসের রচিত 'ইন্ডিকা' গ্রন্থের বিবরণ থেকে।
🔶ফা-হিয়েন~ চিনের সেনসি রাজ্যের চ্যাংগান শহরের ছেলে ছিলেন ফা-হিয়েন। তাঁর আসল নাম কুঙ্গ। দীক্ষা নেওয়ার পর নতুন নাম হয় ফা-হিয়েন। মেগাস্থিনিসের প্রায় ৭০০ বছর পর গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে তিনি ভারতে আসেন। তবে রাজদূত হয়ে নন, তিনি পরিব্রাজক হয়ে ভারতে আসেন আর এসে ভারতের রূপ দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। তাঁর লেখা 'ফো-কিউ-কি' থেকে জানা যায় রাজার রাজ্যে ছিল না কোনো অরাজকতা। প্রজারা ছিলেন সুখী। দেশ ছিল প্রকৃতই সুজলা-সুফলা। মানুষেরা ছিলেন অতিথিপরায়ণ। জানা যায় সেইসময় বেশিরভাগ বাড়িঘর ছিল কাঠের। প্রত্যেক বাড়ির সামনে স্তুপের গড়নে আরেকটা করে ঘর থাকতো, যা ছিল বাইরে থেকে আসা অতিথিদের জন্য। মানুষের যাতায়াতের রাস্তাঘাট, রাজপথও ছিল অনেক। ফা-হিয়েন যে সময়ে ভারতবর্ষে এসেছিলেন সেটা ছিল ভারতের স্বর্ণযুগ। সাহিত্য, শিক্ষা, স্থাপত্য, বিজ্ঞান সব কিছু থেকেই তখন ঠিকরে বেড়োচ্ছিল সোনার রোদের রঙ। সাহিত্যে তখন ছিলেন কালিদাস, শূদ্রক, বিশাখদত্ত। গণিতশাস্ত্রে আর্যভট্ট, জ্যোতিষে বরাহমিহির। শিল্প-ভাস্কর্যে অজন্তা, ইলোরা প্রভৃতি। ১৪ বছর নিজের দেশ থেকে দূরে ছিলেন ফা-হিয়েন। আসা-যাওয়ার ৬ বছর বাদ দিয়ে, বাকি ৮ বছরের মধ্যে ৬ বছর তিনি ভারতে থেকে তাঁর রূপ দর্শন করে গেছেন।
🔶হিউয়েন সাঙ~ চিনের হোনান-ফু প্রদেশের দেন-পাও-কু গ্রামের ছেলে হিউয়েন সাঙ ২৮ বছর বয়সে বেড়িয়ে পড়েন বুদ্ধের জন্মভূমি ভারতবর্ষ দেখতে। সেইসময় নেপাল ভারতেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। চিন থেকে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে প্রবেশ করেন তিনি ভারতে। বুদ্ধের জন্মভূমি কপিলাবস্তু ঘুরে, সারা ভারতে বুদ্ধের নিদর্শন দেখতে দেখতে পৌঁছান তিনি নালন্দায়। নালন্দায় যখন তিনি আসেন, তখন সেখানকার অধ্যক্ষ ছিলেন শীলভদ্র। হিউয়েন সাঙ তাঁরই শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। হিউয়েন সাঙের লেখা 'সি-য়্যু-কি' গ্রন্থের বিবরণ থেকে জানতে পারি নালন্দার স্থাপনের নানাবিধ ঘটনা। জানতে পারি সেইসময়কার শহর-গ্রামগুলোর অবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, রাজা বা সম্রাটদের রাজ্যশাসনের ব্যবস্থা প্রভৃতি। বিভিন্ন বৌদ্ধমঠ ছাড়াও তিনি কুমাররাজা এবং হর্ষবর্ধনের প্রাসাদেও ছিলেন কিছুদিন। আর সব জায়গাতেই তিনি বৌদ্ধধর্মের জ্ঞান প্রচার করে গেছেন। ১৬ বছরের মধ্যে ১৩ বছর তিনি ভারতে কাটিয়ে নিজের দেশে ফিরে যান। ভারতকে তিনি যে গভীরভাবে ভালোবেসেই এতোগুলো বছর এখানে থেকে গিয়েছিলেন, তা তাঁর বিবরণী থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
🔶মার্কো পোলো~ ভেনিসের এক পর্যটক নিকোলো পোলোর ছেলে হলেন মার্কো পোলো। চেঙ্গিস খানের নাতি কুবলাই খাঁ-ই তাঁকে মাত্র সতেরো বছর বয়সে পাঠিয়েছিলেন পৃথিবীর দূত হিসেবে। তাঁর বিবরণী থেকে জানা যায় রাজার আয়ের বেশিরভাগ খরচ হতো ঘোড়া কিনতে। বছরে প্রায় ২০০০ এর মতো ঘোড়া কিনতেন রাজা। সেইসময় মূর্তি পুজোর প্রচলন ছিল। সবচেয়ে বেশি ভক্তি করতো ষাঁড়কে। জানা যায় সেইসময় ছেলেদের স্বাবলম্বী করার জন্য ১৩ বছর হলেই তাদের কিছু অর্থ দিয়ে বাড়ির বাইরে বের করে দেওয়া হতো। ভারতবর্ষের ভেতরে সেভাবে না ঢুকে, কেবল দেশের বিভিন্ন সমুদ্রতীরে কাজের জন্য নেমেই তিনি ভারতবর্ষকে উপলব্ধি করে গেছেন।
🔶ইবন বতুতা~ ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ-বিন-তুঘলকের সময় যে পর্যটক ভারতে এসেছিলেন তিনিই হলেন ইবন বতুতা। আফ্রিকার অধিবাসী এই ইবন বতুতার পুরো নাম আবু আবদুল্লাহ মহম্মদ ইবন বতুতা। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী দেখতে বেড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁর লেখা ভ্রমণকাহিনী যার সংক্ষিপ্ত নাম 'রেহালা', তা থেকে তৎকালীন ভারতের অনেক তথ্য জানা যায়। তিনি মহম্মদ-বিন-তুঘলককে একসঙ্গে দেবতা এবং দানব বলেছেন। জানা যায় সম্রাট ছিলেন নিষ্ঠাবান মুসলমান। দর্শন, কবিতা, গণিতে তিনি দক্ষ ছিলেন। জানতেন চিকিৎসা এবং অনেক ভাষাও। কিন্তু সকল ভালো গুণের মধ্যে একটাই খারাপ গুণ ছিল, যা হলো তাঁর অত্যাধিক রেগে যাওয়া। রেগে গেলে ন্যায়পরায়ণ থেকে হয়ে উঠতেন নরখাদক। ইবন বতুতার বিবরণী থেকে জানা যায় তখনকার সতীদাহ প্রথার কথা। এক সতীকে জলন্ত চিতায় আহূতি দেওয়া দেখে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। ২৮ বছর নিজের দেশ থেকে দূরে থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি দেশে ফিরে যান।
🔶আল বেরুনি~ ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে খোরাজেমের ফার্স নামের এক শহরতলিতে এক ইরানি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আল বেরুনি। তাঁর প্রকৃত নাম আবু রায়হান মহম্মদ বিন আহমদ। গজনির সুলতান মামুদ খোরাজেমে আক্রমণ করে সেখানকার সম্রাটকে পরাজিত করে সকলকে বন্দি করে নিয়ে যান, যার মধ্যে ৪৪ বছরের আল বেরুনিও ছিলেন। জ্যোতিষে পারদর্শিতার জন্য সুলতানের দরবারে তাঁর ডাক পড়তো এবং কিছুকাল পর সুলতানের সুনজরেও পড়ে যান তিনি। এরপর এই সুলতানের সঙ্গেই তিনি ভারতবর্ষে আসেন। তাঁর লেখা থেকে জানা যায় তৎকালীন মানুষের খাদ্য, পোশাক, ধর্মীয় ও রসায়ন-বিজ্ঞান চর্চার দিকগুলো। তাঁর লেখা বিখ্যাত বইয়ের নাম 'ভারততত্ত্ব', যাতে রয়েছে ৮০টি অধ্যায়। ভারতের ধর্ম, সাহিত্য, শাস্ত্র, জ্যোতিষ, ব্যাকরণ, শ্রেণিভেদ প্রভৃতি নিয়ে লেখা আছে এই বইতে। তিনি নিজেও প্রচুর বিষয় নিয়ে চর্চা করতেন। ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। আর এই ৭৫ বছর বয়সের প্রত্যেকটি দিনই ছিল তাঁর জীবনে কর্মময়।
অসম্ভব ভালো একটি বই। ধীরে ধীর�� বইটি পড়ে এর রসাস্বাদন করতে হয়। বইটিতে খুব সহজ সরল ভাষায় সমস্ত পর্যটকদের রচনাগুলির বর্ণনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল ���মি সেইসময়তে পৌঁছে গেছি আর নিজের চোখেই সব দেখতে পাচ্ছি। ভারতের নানান তথ্য পরিবেশনের সাথে পর্যটকদের জীবন কাহিনীও এখানে বেশ সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে, যা এককথায় অসাধারণ। যারা ঐতিহাসিক বই পড়তে ভালোবাসেন তারা পড়ে দেখতে পারেন বইটি, আশা করি ভালো লাগবে।
প্রচ্ছদকার, কবি, ঐতিহাসিক পূর্ণেন্দু পত্রী বেশ সুন্দর একটি কাজ হলো "ওদের চোখে মোদের ভারত" বইটি। অখন্ড ভারতের ইতিহাস নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তাদের প্রাথমিক দিকের
পড়াশোনা হিসাবে বইটি কাজে লাগতে পারে।
সেই প্রাচীনকাল থেকে দূর সবদেশ থেকে পন্ডিতজনের এসেছে ভারতবর্ষ ভ্রমণ। বুঝতে এদেশের শাসক ও জনসাধারণের জীবনযাত্রা। জানতে এদেশের সমৃদ্ধ দর্শন, ধর্ম ও জ্যোতিষ শাস্ত্রের গ্রন্থগুলো্কে। তেমন ছয়জন বিদেশী পর্যটকে চোখের কেমন ছিল ভারত তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উঠে এসেছে বইটিতে।
এই ছয় পরিব্রাজকের ভারত দর্শন এবং ভারতের জীবনযাত্রা নিয়ে বইটি লেখা। এর মাঝে প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে সবার প্রথমে এসেছিলেন মেগাস্থিনিস। লিখেছিলেন ইন্ডিকা নামের একটি বই। বইটি কালের গর্ভের হারিয়ে গেলেও অনেকের লেখায় ইন্ডিকার তথ্য পাওয়া যায়।
ফা হিয়েন এবং হিউয়েন সাঙ মূলত বৌদ্ধধর্মকে গভীরভাবে জানতে এসেছিলেন ভারতবর্ষে যেহেতু গৌতম বুদ্ধের জন্ম এবং নিবার্ণ প্রাপ্তি ঘটেছিল ভারতের মাটিতেই।
মার্ক পোলো ভারতের মূল ভূ-খন্ডে না এলেও উপকূলীয় কিছু রাজ্যে চীনের সম্রাট কুবলাই খানের নির্দেশে এসেছিলেন। উনি ভারত সম্পর্কে কম দেখলেও দেখেছেন নিখুঁত ভাবে আর বর্ণনাও দিয়েছেনে চিত্তাকর্ষক। যদিও ওনার সংখ্যা জ্ঞানে অপরিপক্কতা ছিল। অধিক সংখ্যা কিছু দেখলেই বলতেন লাখে লাখে।
আফ্রিকান বংশোদ্ভুত ইবনে বতুতা ভারতবর্ষের একট পূর্ণাঙ্গ চিত্র এঁকে গেছেন তার রেহালা নামক গ্রন্থে। চৌদ্দ শতকের ভারতের মানুষের জীবন যাপন, খাদ্যভাস, পোষাক এসবকিছু সম্পর্কে তিনি লিখে গেছেন। সুলতান তুঘলকের সম্মানে তিনি দিল্লীর একটি আদালতে আট বছর কাজীর পদে নিযুক্ত ছিলেন।
অমিত প্রতিভার অধিকারী আল বিরুণী ছিলেন একাধারে ছিলে সাহিত্যিক, দার্শনিক, রসায়নবিদ, ঐতিহাসিক, জ্যোতিষ এবং আর অনেক বিষয়ে পারদর্শী। সুলতান মাহমুদের বন্দী হয়ে দীর্ঘদিন থাকার পর এসেছিলেন ভারতবর্ষে। হিন্দুদের জীবনযাত্রার বেশ সমালোচনা চোখে পড়ে ওনার ভারততত্ত্ব গ্রন্থে। তবে সেগুলোকে একেবারে অসত্য বলে উড়িয়ে দিতে পারেনি আধুনিককালে ভারতের ঐতিহাসিকগণ।
১০৬ পৃষ্ঠার এই বইটিতে অনেক বেশি কিছু প্রত্যাশা করা ভুল হবে। তবে বইটি এই ছয়জন মহান পরিব্রাজকদের ভারতের উপর লেখা বইগুলোর উপর পাঠককে আগ্রহী করে তুলবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ইবনে বতুতার রেহালা এবং বিরুণীর ভারততত্ত্ব পড়ার ব্যাপার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি এই বইটি পড়ার পর।
ভারতবর্ষ এক বিরাট দেশ। খুব প্রাচীন যুগ থেকে এদেশে এসেছে আর্য, পারসিক, গ্রীক, শক, কুষণ, হূণ জাতি।
মধ্যযুগে এসেছে এসেছে আরব, তুর্কি, আফগান, মোগল জাতি। ভারতবর্ষ সকলকেই আলিঙ্গন করে নিয়েছেন। এখানে হিন্দু, মুসলমান, জৈন, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, শিখ কত রকমের ধর্মের পাশাপাশি বাস।
গ্রীক দেশের একজন নামকরা ঐতিহাসিকের নাম হেরোডোটাস। আর পারস্য সম্রাট আরটাজারেকসস-এর একজন গ্রীক চিকিৎসকের নাম টিসিয়াস। এঁরা দুজন বিভিন্ন পর্যটকের মুখ থেকে শুনে শুনে ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখেছিলেন। হোরোডোটাসের বর্ণনায় আছে অনেকখানি সত্যি। টেরিয়াসের বর্ণনায় আছে অনেকখানি কল্পনা।
এর পরে গ্রীক দেশের আলেকজান্ডার যখন ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন, তখন সাথে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁর দেশে ফিরে গিয়ে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে অনেক কিছু লিখেছিলেন। তখন থেকেই ভারতবর্ষ সম্পর্কে কৌতূহলটা আরো বেশী করে ছড়িয়ে পড়ল ইউরোপে। ঐ গ্রীক দেশ থেকেই এলেন সেলুকাসের দূত মেগাস্থিনিস।
গ্রিস-এর পর চীনদেশ থেকে এলেন সু-মা কিয়েন। তাঁকে বলা হয় চীন দেশের হেরোডোটাস। এঁর লেখায়য় ধর্মের কথাই বেশী। তবে অন্য বর্ণনাও আছে। এর পর চীন থেকে আসেন আরও দুজন-- ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ।
এরপর অষ্টম শতাব্দীতে আরব দেশ থেকে এসেছিলেন আলবেরুনি। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইতালি থেকে মার্কো পোলো। আফ্রিকা থেকে চতুর্দশ শতাব্দীতে ইবন বতুতা। পঞ্চদশ শতাব্দীতে চীন থেকে মা হুয়ান। এরপর ইতালি নিকোলো কণ্টি। পারস্য থেকে আব্দুর রাজ্জাক। রুশ দেশ থেকে আথেনেসিয়াস নিকিতিন। পর্তুগাল থেকে পায়েজ আর নুনজি।
তারপর মোঘল যুগে র ্যালফ ফিচ, টমাস রো, টেভারনিয়ে, বার্নিয়ে, মানুচি। প্রত্যেকেই এসেছেন ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে। তবে একটা ব্যাপারে সকলের খুব মিল, সকলেই খুব ভালোবেসেছেন ভারতবর্ষ কে।
অনেক সময়ে এসেছে এ ভারতবর্ষে অনেক পর্যটক নানা বেশে তবে সেখান থেকে লেখক মাত্র কয়েক জনকে নিয়ে আলোচনা করেছেন এই বইটা তে।
মেগাস্থিনিস ফা-হিয়েন হিউয়েন সাঙ মার্কো পোলো ইবন বতুতা আল বেরুণী।
গুণী এই ব্যক্তিদের জীবনের বেশ অনেকটাই লেখক তুলে এনেছেন, যার সাথে বেশীর ভাগটাই মিশে আছে আমাদের ভারববর্ষে র মজার ও অজানা নানা তথ্য। উনাদের এই ভারববর্ষ নিয়ে লেখা মূল্যবান বইয়ের কিছু হারিয়ে গেলেও সেই বইয়ের থেকে তথ্য পাওয়া যায় পরের অনেক লেখকের লেখাতে, তাতে বোঝা যায় কি সব তথ্য দিয়ে সাজানো ছিলো সে বই, সেগুলো সব দলিল এখন।
বইটা কতোটা ভালো এটা বলে বোঝানো যাবে না, ভালো খাবরের স্বাদ যেমন অনেক সময় মুখে লেগে থাকে বইটা পরার পরের অনুভূতি টা ঠিক সে রকমই।
বইটির আলোচ্য বিষয় কয়েকজন বিদেশি পর্যটকদের চোখে অতীত ভারতবর্ষের অচেনা ইতিহাস তুলে ধরা।বইতে লেখক আলোচনা করছেন ছয়জন পর্যটকদের ( মেগাস্থিনিস ,ফা-হিয়েন,হিউয়েন সাঙ,মার্কো পোলো,ইবন বতুতা,আল বেরুণী ) সংক্ষিপ্ত যাত্রাকাহিনী , বৌদ্ধধর্মের প্রচার এবং সেই সময়ের ভারতবর্ষের জনজীবনের হালচাল। প্রসঙ্গক্রমে বইতে বাংলাদেশের কিছু চিত্রও দেখা যায়।