উপহাস যিনি করেন, প্রচলিত সমাজের নিয়ম অনুসারে ধরেই নেয়া হয়, তিনি, যাকে উপহাস করলেন, তার চেয়ে অনেক বেশী বুদ্ধি ধরেন। বুদ্ধিমত্তার এই পার্থক্যই উপহাসকারীর ভেতরে উপহাসিত ব্যক্তির ওপর এক ধরনের অধিকারবোধের জন্ম দেয়; নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হবার অধিকার। মানব চরিত্রে যুগ যুগ ধরে এটিই আচরিত হয়ে আসছে। এ কারণেই কাউকে মুখ ভেংচি কাটলে মানুষ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, কিছুটা বিপন্ন অনুভব করে, আর মনে মনে হয়ত ভেংচি কেটে দেয়া ব্যক্তির সাথে নিজের বুদ্ধিমত্তার কোথাও বেশকম হয়ে গেলো কী না তা হিসেব করতে থাকে। ভেংচি খাওয়ার দলে কেউ আসলে থাকতে চায় না। সবাই মুখ ভ্যাংচাতেই চায়। আবার, সমাজে এমন এক শ্রেনীর মানুষও আছেন যারা তাদের সকল ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, উপহাস ও মুখ ভ্যাংচানিকে একটি বিন্দুতেই কেবল কেন্দ্রীভূত করেন। সেই বিন্দুটি হল যৌনতা। পৃথিবীর যে কোন ভাষায়ই কাউকে অপমানের চূড়ান্ত করতে হলে যৌনতাকেই টেনে আনতে হয়। সবচেয়ে খারাপ খারাপ গালিগুলো যৌনতা কেন্দ্রিক। সবচেয়ে মুখরোচক নিন্দা যৌনতা কেন্দ্রিক। অপমান করবার সংক্ষিপ্ততম রাস্তা, সেও যৌনতা কেন্দ্রিক-ই। খালি গায়ে শর্টস পরে ক্লাসরুমে যাওয়াটাকে সমাজ যেমন নিন্দনীয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, তিরস্কারের অস্ত্র হিসেবে যৌনতার ভাষাও ঠিক একইভাবে অরুচিকর বলেই নির্ধারিত হয়েছে। যৌনতা সংক্রান্ত শব্দের প্রয়োগে বিদ্রুপ করাটায় খুব একটা মেধার প্রয়োজন আসলে পড়েনা। মানব শরীরের তিন-চারটি প্রত্যঙ্গের নাম ও তাদের সমার্থক কয়েকটি শব্দ জানলেই চলে। বাকিটা কেবল বিদ্রুপের লক্ষ্য ব্যক্তির পরিবারের সদস্য-সদস্যাদের সাথে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের যে কারো সাথে কাল্পনিক যৌনক্রিয়া ঘটিয়ে সেই শব্দগুলোর যথার্থ প্রয়োগ মাত্র। যৌনতার বুদ্ধি সকল প্রাণীরই সহজাত বুদ্ধি। বিনা আয়াসেই এ বুদ্ধির উদ্ভব ঘটানো সম্ভব। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ যদি মানুষের বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক হয়, ব্যঙ্গের সকল উপকরণকে যৌনতায় কেন্দ্রীভূত করাটা চিন্তার সীমাবদ্ধতার পরিচায়ক।
‘সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে’ হুমায়ূন আজাদের ‘প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ’ উপন্যাস। হাসির উদ্রেককারী একটি বাক্যও এখানে নেই। আছে শুধুই নিরেট কাঠখোট্টা ব্যঙ্গে মানব চরিত্রের যৌনকাতর সত্ত্বাটির বিশ্লেষণ। উত্তম পুরুষে বর্ণিত গল্পের নায়ক মাহবুব একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ব্রিজ বানানো যার পেশা। সেতু বলার চেয়ে ব্রিজ বলাটাই তার কাছে শ্রেয়তর। নদীর ওপর ব্রিজ বানাতে বানাতে মাহবুব একসময় মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্রিজ দেখতে পায়। প্রতিটি সম্পর্কই আসলে এক একটি ব্রিজ, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে মানবিক বোধগুলো। কিন্তু মানুষ যখন প্রবল ভাবে যৌনতৃষ্ণায় তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে, সম্পর্কের ব্রিজ গুলোকে সব একে একে ভেঙ্গে পড়তে দেখে মাহবুব, ভেঙ্গে যায় তার মানবিক বোধগুলো। এই ভেঙ্গে পড়ার গল্পটিকে ফোটাতে হুমায়ূন আজাদ ব্যবহার করেছেন তাঁর একান্ত নিজস্ব ঘরানার গদ্যের। মাহবুবের যৌনকাতরতার ভেতর দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন সমাজের চিত্রটা, যেখানে কমবেশী সবাইই একইরকম তৃষ্ণার্ত। হুমায়ূন আজাদের ব্যঙ্গের ধরণটা তাঁর নিজের মতই। সরাসরি কথার আধিক্য বেশী, তবে খুব শ্রতিমধুর কিছু নয়। শিল্পিত কিছু তো নয়ই। প্রচুর অপ্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবালুতা আছে উপন্যাসে, একটা সময়ে যা বিরক্তির উদ্রেক করে। বাড়ীর কাজের মেয়ে কদবানুর “বুকের দুটি পেঁপে” কিংবা মাহবুবের হস্তমৈথুন কে “মধুর চাক ভেঙ্গে মধু বের করা” নাম দিয়ে তার হাস্যকর বর্ণনা দিয়ে উপন্যাসকে দীর্ঘায়িত করেছেন। এ ধরনের ভাষার প্রয়োগ খুব বেশী নেই মূলধারার প্রচলিত সাহিত্যে, সেটিরই সুযোগ লেখক নিতে চেয়েছিলেন কী না কে জানে! প্রায়ই মনে হয়েছে স্রেফ এই শব্দগুলোর প্রয়োগের উছিলাতেই ১৪৪ পৃষ্ঠার উপন্যাস তিনি লিখেছেন!
হুমায়ূন আজাদের পর্যবেক্ষণ বেশ তীক্ষ্ণ, এটি তিনি নিজেও খুব ভালো উপলব্ধি করতে পারতেন এবং তা প্রকাশ করার ব্যাপারে তাঁকে প্রায়শয়ই বেশ উদগ্রীব ঠেকেছে। এ কারণেই উপন্যাসের বিভিন্ন অংশ কেবল তাঁর পর্যবেক্ষণ শক্তির প্রদর্শনী-ই, সাহিত্য সেখানে কমই ছিলো।
প্রিটেনশন, ভাবালুতা, পর্যবেক্ষণ, মানব চরিত্রের বিশ্লেষণ, সব মিলিয়ে ভালো মন্দ দুই-ই ছিলো ‘সব কিছু ভেঙ্গে পড়ে’-তে, তবে আমার বিচারে মন্দ দিকই বেশী লেগেছে। লেবু বেশী কচলালে তিতা হয়, অনর্থক যৌনতা উপন্যাসটিকে নোংরাই করেছে কেবল।
বিশেষ সতর্কীকরণঃ ১৮ বছরের নিচে কিশোর কিশোরীদের এই বইটি নিজ দায়িত্বে পড়তে হবে। বাবা-মা টের পেলে তাদেরই পিঠের ওপর সব কিছু ভেঙ্গে পড়তে পারে!