বাহাত্তরে একটা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উঠে দাঁড়াল বাংলাদেশ। সরকারের হাল ধরল আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে দেশে অনেক ওলটপালট হয়ে গেছে। জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ গেছে হারিয়ে। মানুষের আকাঙ্ক্ষা হয়েছে আকাশছোঁয়া। রাজনীতি বদলে যাচ্ছে, সমাজে চাহিদারও পরিবর্তন হচ্ছে। দেশ এগোচ্ছে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। সংসদীয় গণতন্ত্রের পাশাপাশি জন্ম নিয়েছে গোপন রাজনীতির সশস্ত্র ধারা। তিন বছর যেতে না যেতেই হোঁচট খেল সংবিধান। দেশে জারি হলো জরুরি আইন, একদলীয় সরকার ব্যবস্থা।
জন্ম ১৯৫২, ঢাকায়। পড়াশোনা গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ১৯৭০ সালের ডাকসু নির্বাচনে মুহসীন হল ছাত্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বিএলএফের সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দৈনিক গণকণ্ঠ-এ কাজ করেছেন প্রতিবেদক ও সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকোংহে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মাস্টার্স ইন এনজিও স্টাডিজ’ কোর্সের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক। তাঁর লেখা ও সম্পাদনায় দেশ ও বিদেশ থেকে বেরিয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা অনেক বই।
দেশের এই দুর্দিনে যখন কোন বইতেই মন বসলো না, এটাকে কোণা থেকে বের করে এনে পড়া গত সপ্তাহের সেরা একটা সিদ্ধান্ত ছিল।
এখানে মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরপর আমাদের শাসনযন্ত্র কেমন ছিলো, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। মোটামুটি সব তথ্যের পেছনেই লেখক রেফারেন্স দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এই ধরনের বেশিরভাগ বইতে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় - লেখকরা ইতিহাসের কোন কোন চরিত্রকে ঈশ্বর বানিয়ে দেন, আবার কাউকে বানিয়ে দেন সুপারভিলেইন। এক্ষেত্রে মহিউদ্দিন আহমদ স্রোতের বিপরীতে ভালো একটা কাজ করেছেন - পর্যাপ্ত তথ্য প্রদান করে পাঠকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন ব্যক্তি সম্পর্কে যাচাই বাছাই করার কাজটা। এবং এইসব চরিত্র ও ঘটনাবলী নিয়ে আরো জানার আগ্রহ তৈরি করেছেন। প্রচুর তথ্য থাকা সত্ত্বেও বইটাকে গবেষণাগ্রন্থ মনে হয় নাই কারণ উনি এসব নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন নাই পাঠকের ওপর - নিজের উপলব্ধি ও দর্শন লিখেছেন ক্ষেত্রবিশেষে, যেটা যুক্তিপুষ্ট।
History repeats itself - আমরা ওই সময়ের শিশুরাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে বর্তমানের রাজনীতির খুব বেশি অমিল দেখতে পাই না। এমনকি, একই ভুল অর্ধশতাব্দী পরেও আমাদের চোখে পড়ে (হারুন ভাইয়ের এই কথার সাথে একমত আমি)। এক্ষেত্রে লেখকের একটা লাইন খুব মনে ধরেছে - আমাদের রাজনীতিবিদরা কেউ স্টেটম্যান হওয়ার জন্যে রাজনীতি করে না, সবাই রাজপথের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্যে রাজনীতি করে। এই কারণে আমাদের দেশে স্টেটম্যানের সংখ্যা অপ্রতুল। আহমদ ছফার কথায় জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের একটা উক্তি আছে, "ইতিহাস উনাকে (শেখ সাহেব) স্টেটম্যান হওয়ার জন্যে একটা সুযোগ দিছিলো, কিন্তু উনি সেইটা কাজে লাগাইতে পারেন নাই"। এই একটা কথার উপর আমার গুরুত্ব দেয়ার কারণ হচ্ছে, উন্নত বিশ্বে আমরা একটা ট্রেন্ড লক্ষ্য করি - ক্ষমতার পালাবদল হয়, শাসকের পালাবলদ হয়, কিন্তু জাতীয় অগ্রগতি, সমৃদ্ধি থেমে থাকে না, শাসক সেখানে সেবক ও নিয়ামক মাত্র। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায়, সকলেই আত্মতুষ্টি, নিজ শাসনামলের কৃতিত্ব ও বিরোধী দলের শাসনামলের অব্যবস্থাপনার ফিরিস্তি দেয়ায় ব্যস্ত থাকেন। উপরন্তু, আমাদের উঁচু পর্যায়ের নেতারা নিজেরা ব্রিলিয়ান্ট রাজনীতিবিদ হলেও, নির্ভর করে থাকেন একদল চাটুকার, ভন্ড ও আত্মকেন্দ্রিক মানুষের ওপর; উপরন্তু, পরিবারকেন্দ্রিক উত্তরাধিকার ও স্বজনপ্রীতি তো আছেই। এই ঠুনকো ও অদৃশ্য বাবল যতদিন না ভাঙছে, "আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?" প্রশ্নের উত্তর আমরা ততদিন খুঁজে যাবো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
দেশ, দেশের ইতিহাস ও জাতীয় রাজনীতি নিয়ে জানার আগ্রহ ও চেষ্টা প্রতিটি বাঙালির থাকা উচিত। এই বইটা মোটামুটি ভালোভাবেই সেই ব্যাপারে পাঠককে ভালো কিছু সময় উপহার দিবে।
(Also, we need to go through different books to get a clear vision on the said topics, and solely believing in one single book or writer will keep us in darkness. This book might be considered among your first choices)
জাসদের উত্থান-পতনের পর এটি নিঃসন্দেহে মহিউদ্দিন আহমদের সেরা কাজ। এই বইতে তথ্যসূত্রের স্থানটি গ্রন্থ নয়, স্বাধীনতাত্তোর কালে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারই মুখ্য হয়ে উঠেছে। জাসদকে তার হঠকারী রাজনীতির জন্য জব্বর ধোলাই দিয়েছেন মহিউদ্দিন আহমদ। বঙ্গবন্ধু শাসনামল নিয়ে বিশ্লেষণ আগের চাইতে স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী পাঠক পড়তে গিয়ে নতুন নতুন তথ্য পেয়ে আনন্দিত হবেন, চিন্তা এবং বিশ্লেষণের পরিধি বাড়বে৷
তবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আরও গভীরতর আলোচনায় যেতে পারতেন মহিউদ্দিন আহমদ। যাননি। চেষ্টাটা হঠাৎই যাকে বলে স্লো ডাউন করেছেন। বাকশাল নিয়ে বেশ খানিকটা পথ যাওয়া যেতো। সেখানেও 'একটু' তড়িঘড়ি লক্ষ করা গেছে।
প্রায় চারশ পাতার বই। দামও হাতের নাগালে নয়। তবু পড়তে খুব আরাম। দুরন্ত গতি। রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের অবশ্যই পড়া উচিত।
বাংলাদেশের এই সময়কার ইতিহাসটা বেশিরভাগ মানুষেরই অজানা, কিন্তু জানাটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মুজিব একজন ভালো রাজনৈতিক হলেও যে একজন ভালো স্টেটসম্যান ছিলেন না এবং এর খেসারত স্বরূপ নিজের পরিবার সমেত খুন হলেন (যেটা কোনভাবেই জাস্টিফাইড না) এটাই এই বইয়ের মূল কথা।
রাজনীতি আমার ভীষণ পছন্দের টপিক। পড়তাম ও বেশ। কিন্তু রাজনীতির আলোচনায় আমি বন্ধুমহলে চিরকালই মূর্খ, তেমন নাক গলাতে পছন্দ করতাম না। তাছাড়া রাজনীতির আলোচনায় সহনশীল মানুষকে পাওয়া ভীষণই কঠিন। ভীন্ন মতকে সমর্থন করার মতো মানসিকতাও খুব বেশি দেখা যায় না। সকল যুগেই এই এক সমস্যা। বোধ করি বর্তমানে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি প্রকট।
সে যাইহোক, 'বেলা অবেলা : বাংলাদেশ ১৯৭২-১৯৭৫' বইটা পড়ব পড়ব করেও সময় হয়ে উঠছিল না। মহিউদ্দিন আহমদ কে নিয়ে খানিকটা আস্থা কাজ করে। তাই নিশ্চিন্তে পড়া যায়। পিনাকির (পিনাকী ভট্টাচার্য) মতো মাথা আর মেজাজ খারাপ করার মতো কিছু যে তিনি লিখেন না তার প্রমাণ 'জাসদের উত্থান পতন' বইটি দ্রষ্টব্য। লেখক প্রচুর তথ্য আর কোটেশন সংযুক্ত করে ঐ সময়ের দারুণ এক মানচিত্র তৈরি করেছে। নিজের বিশ্লেষণ খুব কম থাকলেও তা এক প্রকার মন্দের ভালো।
শেখ মুজিব কে নিয়ে আমার মতো অনেক পাঠক একটা দোলাচালে ভোগে। বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে শেখ মুজিব যে ভাষণটি দিয়েছিলেন তার সম্পূর্ণ অংশটুকু পড়লে সেই পাল্লাটা একটু হেরফের হতে পারে। বাকশালের যে রুপরেখা উনি তৈরি করছিলেন তা আমার মতে যুগান্তকারী। উনার অসংখ্য ভুল সিদ্ধান্ত (তর্ক সাপেক্ষে) নিয়ে সমালোচনা থাকলেও কিংবা করলেও উনি যে দেশটাকে সত্যিই ভীষণ ভালোবাসতেন তা নিয়ে আমার মনে কোন সংশয় নেই। বাকশালের ঐ প্রথম ভাষণটি আমাকে এই সংশয় মুক্ত হতে অনেক বেশি সাহায্য করেছে।
অনেক বড় একটা বই। কিন্তু ভীষণই দুরন্ত গতির। ইতিহাস অনুরাগী প্রত্যেক পাঠককে রিকমেন্ড করব এই বইটি পড়তে। ভালো লাগবে।
ইতিহাসের প্রতি আমার একটা ভালো লাগা আছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের ইতিহাস। এরই অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপরের ইতিহাস নিয়ে বেশকিছু বই পড়া হয়েছে আমার। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে যা হয়, একেকজন একেক পার্সপেক্টিভ থেকে ঘটনাবলী বিচার করেন। ফলে একটা নিরেট ধারণা পাওয়া আর হয়ে ওঠে না। তাইতো ঐ সময়ের ইতিহাস নিয়ে অনেক পড়া থাকলেও হাতে নিই এই বইটা ; উদ্দেশ্য দেখা যাক নতুন আরও কিছু দিক জানতে পারি কী না!
১৯৭১-১৯৭৫ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ঘটনাবহুল সময়। এই সময়েই দেশ স্বাধীন হয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনে যোগ দেয়, দেশ গড়ার কাজে হাত দেন বঙ্গবন্ধু, নানা ���ারণে দেশের রাজনীতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়, বঙ্গবন্ধুর খুনের ঘটনা ঘটে। এই যে একটা অস্থির সময়, এই সময়টাকে ধরতেই লেখক এই বইটার অবতারণা করেছে��। লেখকের উদ্দেশ্য ছিল খুব পরিস্কার ; এই সময়ে ঘটে যাওয়া প্রধান প্রধান ঘটনা যেমন ছাত্রলীগে বিভক্তি, আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি, রক্ষীবাহিনী, দুর্ভিক্ষ ও তৎকালীন সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, বাকশাল, বঙ্গবন্ধুর খুন, নভেম্বরের অভ্যুত্থান ইত্যাদির পেছনের কারণগুলি সামনে আনা।
প্রথম যে কাজটা লেখক সফলভাবে বইটাতে করেছেন সেটা হলো লেখক একদম ধারাবাহিকভাবে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ঘটনাবলী তুলে ধরেছেন। প্রতিটা ঘটনার প্রেক্ষাপট, পাত্র-পাত্রীদের বয়ান, ঘটনাপ্রবাহ, ফলাফল ইত্যাদি তুলে ধরেছেন সবিস্তারে। আর এই কাজটা তিনি করেছেন রেফারেন্স সহিত। অসংখ্য দেশি-বিদেশি বই, পেপার কাটিং এবং সাক্ষাৎকারের সমন্বয়ে বর্ণিত এসব অধ্যায়গুলো প্রতিটা ঘটনাকে নানা আঙ্গিক থেকে দেখতে সাহায্য করেছে। পক্ষ-বিপক্ষ-নিরপেক্ষ সব পক্ষের বয়ান ব্যবহার করায় প্রতিটা অধ্যায় হয়ে উঠেছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
বইটার সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং অংশ মনে হয়েছে উপসংহার অধ্যায়টা। পুরো বইয়ের আলোচনা দারুণ বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের সাথে তিনি সংক্ষেপে সেখানে তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পক্ষ, মুজিবের স্বজনপ্রীতি ও অজাতশত্রু মনোভাবের ফলাফল, সেনা-রক্ষীবাহিনী দ্বন্দ্ব, বাকশাল গঠনের প্রেক্ষাপট, মুজিব হত্যার প্রেক্ষাপট ইত্যাদি খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। মুজিবকে কাল্ট করার যে রাজনীতি তার সমালোচনা করে লেখক স্পষ্টভাবেই ঐ সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজেদের আত্মসমালোচনা করার উপদেশ দিয়েছেন, নিজেদের ভুল স্বীকার করে সামনে এগুনোর পরামর্শ দিয়েছেন। বাকশালের প্রথম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কপি পরিশিষ্ট অংশে উদ্ধৃত করে লেখক আমার বাকশাল সম্পর্কে বেশকিছু ধারণার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন যা বেশ কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মতো আমাকেও এটা ভাবতে বাধ্য করেছে যে বঙ্গবন্ধু পরিবর্তন চেয়েছিলেন কিন্তু ভুল সময়ে, ভুল মানুষদের নিয়ে। লেখাটাকে সাহসী এ কারণে বলছিলাম যে লেখক বারবার বঙ্গবন্ধুকে স্পষ্ট করেই ‘ You have become the very thing you swore to destroy' বলেছেন। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, হত্যা-নির্যাতন, ভোটকেন্দ্র দখল, লাশের রাজনীতি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ, বিরোধীতায় ষড়যন্ত্র খোঁজার প্রবৃত্তি ইত্যাদি অপরাধের কথা লেখক বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। শেখ মণি নামক এক ইন্টারেস্টিং চরিত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বইটা যে ক্ষমতার রাজনীতিতে থাকার জন্য সবকিছু করতে পারত।
এতকিছুর পরও বইটার বেশকিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। প্রথমত লেখকের জাসদ, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নিয়ে লেখা বই তিনটা পড়া থাকায় নতুন তথ্য খুব কমই পেয়েছি অর্থাৎ আগের তিনটা বইয়ের অনেক তথ্যই লেখক ব্যবহার করেছেন। ( আসলে বাধ্য হয়েছেন বলা যায় কেননা ওসব বইয়েও তো অবধারিতভাবে এই সময়টা এসে গিয়েছে।) দ্বিতীয়ত লেখক বইটাতে যতটা না উত্তর দিয়েছেন তার চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্ন রেখেছেন অর্থাৎ বইটা ঐ সময়ের একটা সিদ্ধান্তমূলক বই হয়ে ওঠে নি বরং ঐ সময়কে জানার একটা সূচনা পর্বের বই হয়ে গিয়েছে। তৃতীয়ত যে বিষয়টা বলা যায় তাহলে শেষদিকের অহেতুক তাড়াতাড়ি। আগস্ট হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত বলতে গিয়ে লেখক যতটা ধীরে চলেছেন এরপরের জেল হত্যাকাণ্ড ও নভেম্বরের অভ্যুত্থানের কথা বলতে গিয়ে ততটাই দ্রুত গিয়েছেন। মুজিব-তাজ সম্পর্ক অবনতি এবং বিচ্ছেদের বিষয় লেখক কেন যেন বিস্তারিত আলোচনা করেন নি বইটাতে যা আরও আলোচনার দাবি রাখে। একইভাবে মুজিব হত্যায় বিদেশি যোগাযোগ থাকার বিষয়ে একটু ইঙ্গিত দিলেও সে বিষয়ে আর খোলাসা করেননি তিনি।
বইয়ের নামটা সুন্দর। জীবনানন্দের কাব্যগ্রন্থের নামের অংশবিশেষকে লেখক বইয়ের নাম এবং বাকি অংশকে একটা অধ্যায়ের নাম হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি। বইয়ের কন্টেন্ট এবং প্রোডাকশন হিসেবে দামটা ( ২৫% ছাড়ে ৫২৫ টাকা) যুক্তিযুক্ত-ই। প্রোডাকশনের যে একটা দিক বাজে লেগেছে তা হলো রেফারেন্স প্রতিটা পৃষ্ঠার নিচে না দিয়ে শেষে একেবারে দেওয়া। ফলে বইটা পড়তে গিয়ে যে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে তা হলো আমাকে রেফারেন্স পৃষ্ঠায় বারবার আসা-যাওয়া করতে হয়েছে যা মনোযোগ খানিকটা কেড়ে নিয়েছে।
১৯৭২-১৯৭৫ একটা অস্থির সময় ছিল। ভুল, শঙ্কা, ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, অবিশ্বাস সেই সময়ের নিত্য সঙ্গী ছিল। ব্যক্তি পূজার আমাদের এই সংস্কৃতিতে সাদা বা কালোর যে বাইনারি রয়েছে তার বাইরে এসে সময়টাকে নিরীক্ষণ করা খুবই প্রয়োজন। মহিউদ্দিন আহমদ সেই কাজটা কিছু হলেও করেছেন, এখন পালা অন্যদের।
লাল সন্ত্রাসের মতো এটাতেও রেটিং দেবোনা ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু মত বদলাতে হলো। ইতিহাসভিত্তিক বইয়ের ব্যাপারে নির্মোহ থাকা, বিশেষ করে রাজনৈতিক বইয়ের ব্যাপারে, শতভাগ সম্ভব না সেটা বলাই বাহুল্য। তবুও চেষ্টা জারি থাকে। লাল সন্ত্রাসকে যত সহজে একপেশে বলা যায়, এই বইয়ের বেলার সেটা ততটা সহজ হবেনা । বিশেষ করে ৭৫ পূর্ববর্তি সময়ের বর্ণনা ও গবেষণা খুবই বিস্তৃত। পচাত্তর পরবর্তী তিনটি সেনা অভ্যুত্থান নিয়ে খুব জলদিই বলে গেছেন। বইয়ের বর্ণনা ও গতি সুপাঠ্য, তবে যত না উত্তর দিয়েছে এই বই, তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলে গেছে। রাজনীতির বই, তাই সেটাই স্বাভাবিক। লেখকের সম্ভবত সেসময়ের ঘটনা নিয়ে আরও কিছু আলাদা বই লেখার পরিকল্পনা আছে। ( ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রকাশিত)। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির একটা টাইমলাইন জানতে আগ্রহীদের জন্য ইতিহাসপাঠ শুরুর ক্ষেত্রে কাজের একটা বই, তবে কেবলই শুরুর জন্যেই।
( বই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা গুডরিডসে বেশ কিছু রিভিউতে ইতিমধ্যে হয়েছে, আমিও সেগুলোর সাথে সহমত। লম্বা আলোচনায় আগ্রহী পাঠক পড়ে নিতে পারেন।)
মহিউদ্দিন আহমদ বহুল পঠিত লেখক হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন আমার পঠনতালিকায় ছিলেন না। দেশের উত্তাল অবস্থায় মনে হল, বাসায় থাকা "বেলা অবেলা ১৯৭২-১৯৭৫" টা পড়েই দেখি, এর চেয়ে আর উপযুক্ত সময় আর হয় না। সম্প্রতি উনার এক বইমেলাতেই গাদা গাদা বই প্রকাশ হওয়ার পর এখন অনেকেই সন্দিহান উনার বইয়ের মান আর আগের মতন আছে কিনা, তবে প্রথম দিককার বইয়ের মান আসলেই ভাল তা বেলা অবেলা পড়েই বুঝলাম।
বেলা অবেলা বইটা মূলত স্বাধীনতা পরবর্তী অস্থির সময়ের যে ঘটনাবলী তাকে কেন্দ্র করে লেখা। সে সময়ের ঘটনাবলী ভাসা ভাসা জানলেও একটা সংক্ষেপিত মূল ঘটনাভিত্তিক আলোচনা পড়ার দরকার ছিল। প্রচুর বইয়ের রেফারেন্স এবং তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিবৃতি বইটিকে অন্য মাত্রা দিল। শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার সংগ্রামী নায়ক হিসেবে সফল ছিলেন, উনার মতন ক্যারিজমেটিক রাজনীতিবিদ দেশে এখনও হয়নি, হবেও কবে সে নিয়ে কারও নিশ্চয়তা নেই। তবে মানুষ হিসেবে সবার ই কিছু কমতি আছে, বঙ্গবন্ধুর কমতি টা ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গায়। রাষ্ট্র পরিচালকের ভুল হওয়ার সুযোগ কম, কেননা, তার সিদ্ধান্তের উপর শত লক্ষ মানুষের ভাগ্য নিস্পেষিত। সেই ভুল কম হওয়ার জন্যই প্রতিটি রাষ্ট্রপ্রধান একগাদা যোগ্য উপদেষ্টা রাখেন, কিন্তু, পরিপ্বার্শ ঘেরা উপদেষ্টাগণ যদি চাটুকার এবং স্বার্থলোভী হন তাহলে সে রাষ্ট্রনায়কের পতন অনিবার্য।
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালীর জাতীয় জীবনের খুবই উল্লেখযোগ্য অংশ। মুক্তিযুদ্ধ জনজীবনের যুদ্ধ, কিন্তু সে উল্লেখযোগ্য ত্যাগ যখন শুধুমাত্র ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর ক্ষমতায় থাকার ম্যান্ডেট হয়ে যায় তা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তুলবে স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগকে যার ফল বইতে হয়েছে ৭৫ পরবর্তী সময়ে। যদিও বাহাত্তরেই আওয়ামী লীগের মধ্যেই ভাঙন পরবর্তী দুর্দশার সম্ভাব্য চিত্র অংকন করছিল। বর্তমান সময়ে এসে মনে হচ্ছে, সেই পুরনো চিত্র আবার দেখছি, সে সময় শুধুমাত্র এতদিন বইতেই সীমাবদ্ধ ছিল, আজ উত্তাল পরিস্থিতিতে চোখের সামনে বিদ্যমান।
সাধারণ মানুষের কাছে তার মৌলিক চাহিদা ছাড়া তেমন কোন চাহিদা তেমন মাইনে রাখে না। রাজপরিবারের বা রাজা রাজরাদের মধ্যকার সংঘাতেও তাদের কিছু যায় আসে না যতদিন না তাদের রুটিরুজিতে আঘাত হানে। উপমহাদেশের রাজনীতির দুর্বলতা খুব সম্ভবত এইটেই, সাধারণ মামুষ বরাবরই এর ভুক্তভোগী।
বইটি সবার পড়া দরকার, জানা দরকার কেন সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ হলো। সাধারণ মানুষ কতটুকু দুর্ভোগ দেখেছে। এত এত বইয়ের রেফারেন্স মিলিয়ে দেখার শক্তি, সামর্থ্য আর সময় কোনটাই আমার নাই, তবে, বহু বিজ্ঞজন বলেছেন, বইটি এই বিষয়ে অন্তত সুলিখিত, তাই বইয়ের অনেক তথ্যের উপর ই আশ্বাস রাখলাম।
সময়টা ৭২-৭৫। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশ। তবুও জনগণের চোখেমুখে উপচে পড়া আশার আলো। অঙ্কুরিত স্বাধীনতার বীজ পরিস্ফুটনের যৌক্তিক সময়। চারিদিকে উন্মাদনা। স্বাধীন দেশ, স্বাধীনতার স্বাদ পেতে তাই হুলস্থুল কান্ড। অথচ সবার প্রাপ্য মেটানোর ক্ষমতা দারিদ্র্য-পীড়িত এই দেশটির কি আদৌ ছিল?
দেশ তখন অস্থিতিশীল। নতুন একটা রাষ্ট্র দাঁড় করানোর মত গুরুদায়িত্ব। সঙ্গে প্রয়োজন বিশেষ সংস্কার। অন্যদিকে যুদ্ধের নেপথ্যে থাকা একের পর এক নায়ক-মহানায়কদের মূল্যায়ন নিয়ে উঠে আসে নানান বিতর্ক। আপাতদৃষ্টিতে দেশটা দাঁড়ায়, ক্রাচে ভর করে।
সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র কিংবা পুঁজিবাদীদের রেষারেষিতে বিকলাঙ্গ একটা দেশ যখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছিল না খেয়ে মরছিল তখন আরেক শ্রেণি। আফসোস, নিরাশায় কাবু জাতির ভেতরে ভীতি ভর করতে করতে এক সময় স্বাধীন দেশে পরাধীনতার শ্লোক রচিত হতে থাকলো একের পর এক।
"রাজা যায় রাজা আসে তবুও প্রজাদের দুঃখ কমে না"
দিনে গুম, রাতে লাশ পড়ে। বন্যা-খরায় মানুষ মরে। ক্ষুধার্ত জাতির কপালে কাফনের কাপড় পর্যন্ত জোটে না। ওদিকে বিশেষ কোটে সজ্জিত হয়ে পান চিবোতে চিবোতে দেশের গণ্যমান্য রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের মুখে শোনা যায়, 'আহা, দেশটা তো রসাতলে যাচ্ছে!'
এ দেশটা রসাতলে যাচ্ছিলো ঠিকই; তবে তা পলিটিশিয়ানদের ভীড়ে। মিছিলে জনতার মাঝে উত্তেজনা ছড়ানোই হয়ে উঠছিলো যেন মূখ্য। কিন্তু বিক্ষোভ মিছিলে জনসাধারণের উদ্দেশ্যে কেবলমাত্র জ্বালাময়ী ভাষণই স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে পারে না..
রাজনীতিতে দেশ পরিচালনায় দরকার ছিলো একজন সত্যিকারের 'স্টেটসম্যান' এর পেশাদারত্ব। সরকার বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রদোহীতা নয়, সরকারের সমালোচক মানেই শত্রুপক্ষের এজেন্ট, স্বাধীনতার শত্রু নয় এবং ক্ষমতার পোশাক গায়ে মোড়ালেই কেবল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না।
গণতন্ত্রের মোড়কে চলতে থাকলো স্বৈরতন্ত্রের চক্র। সাথে একের পর এক দলীয় রাজনৈতিক কোন্দল, ব্যাক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি, ক্ষমতার লড়াইয়ের লাগামহীন প্রতিযোগিতা, সামরিক-বেসামরিক আমলাদের ক্ষমতার বলয়, সুযোগসন্ধানীদের অর্থলিপ্সা আর কূটনীতির সঙ্গে গভীর ষড়যন্ত্র..
অথচ সাধু-মহাসাধু নিরিখে ব্যস্ত জাতির সবচেয়ে আগে জেনে নেওয়া উচিৎ ছিল যে, ক্ষমতার পালাবদল কেবলমাত্র মুদ্রার এপিঠ এবং ওপিঠ; বিপ্লবের বিপরীতে সন্ত্রাস আর সন্ত্রাসের বিপরীতে বিপ্লব। ক্ষমতার কবলে পড়ে রাজা ক্রমশ হয়ে ওঠে দৈত্য অথবা তা হয়ে উঠলে ব্যর্থ হলেও সে ব্যর্থতাকে আড়ম্বর করে সাজায় রাজার-ই প্রাণপ্রিয় সেনাপতিরা। দলে দলে চলে গোপন ষড়যন্ত্রের মহড়া।
রাজনীতির নাটাইটা ছিল তারই হাতে, স্বাধীনতার ঘোষক যিনি। কিন্তু ব্যাক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি যে আধুনিক সরকারব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়! অবশেষে, "দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান" প্রহরের সময় আসে এবং ইতিহাসের সেরা অথচ পরাজিত এক রাজার কুৎসা রচিত হয়..
কিন্তু, "রাজা যায় রাজা আসে তবুও প্রজাদের দুঃখ কমে না"
ইতিহাস বলার দুইটা প্রধান সমস্যা রয়েছে। এক, ইতিহাসের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে পাঠক যেন বিরক্তবোধ না করেন। সেজন্য ভাষা বা বলার ভঙ্গিটা যেন একঘেয়ে না হয়। দুই, ইতিহাস বলতে গিয়ে নির্মোহ থাকা। এই দুটো সমস্যাই মহিউদ্দিন আহমদ বেশ দক্ষতার সাথে সামাল দিয়েছেন।
ইতিহাস বলেছেন গল্প বলার ঢঙে, চেষ্টা করেছেন নির্মোহ থাকার। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে (যেমন জেলহত্যা, জিয়াউর রহমান) বিস্তারিত আলাপ আশা করেছিলাম। কেন জানিনা মহিউদ্দিন আহমদ এখানে তেমনকিছু উল্লেখ করেননি।
It is always a pleasure to read Mr. Mohiuddin's book on political history, specially I must say he has mastered the art of telling history. The trap of telling a political history is getting biased by own experience and the view of others to writer's self. However, Mr. Mohiuddin handles it with care. To see, the Father of the nation in an unbiased spectacle is quite hard, besides being an ardent fan of Sirajul Alam Khan aka the Nucleus, it must be hard for him to write it linearly. Moreover, you can get a representation of the political and economical situation at that time in a newborn/newly independent country with a lot of references. The book is based on the interview of several eye-witnesses but the writer enunciated it with his language skill.
দেশ স্বাধীন করা মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশে ত্রাসের নাম ছিলো। কী নির্মম একটা ব্যাপার! এরকম বহু করুণ অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতায় শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের পথচলার ইতিহাস।
স্বাধীনতা উত্তর একটি দেশ। সেই দেশের রাষ্ট্রপতি একজন কিংবদন্তি। তবু সেই দেশ ক্রমেই সমস্যায় জর্জরিত হয়েছিল। কিংবদন্তি মানুষটার জনপ্রিয়তা মিলিয়ে যেতে লাগল, ক্রমাগত ভুল সিদ্ধান্ত নিতে লাগলেন তিনি।
বইতে লেখক বাংলাদেশের সেই প্রথম দিককার বিশৃঙ্খল দিনগুলির কথা তুলে এনেছেন। প্রসঙ্গক্রমে অস্থির সময়কার দেশের রাজনীতির কথাও এসেছে। তবে পচাত্তরের ক্রান্তিকালের ইতিহাস একটু দ্রুতই টেনেছেন। উপসংহারে নিজের মতামত দিয়েছেন এই সময়টা নিয়ে। এই অংশটা বেশ চমৎকার লেগেছে আমার।
ইতিহাস ভিত্তিক লেখা আমার সবসময় ভালো লাগে।আর তা যদি হয় স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাহলে আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। কারণ স্বাধীনতা পরবর্তী ব্যাপার গুলো আমি জানি কম, আর যাও জানি কেমন জানি ধোঁয়াশা লাগে। তথ্যগুলো সঠিক কিনা কিংবা একদমই নিরপেক্ষভাবে লেখা কিনা এসব প্রশ্ন রয়েই যায়। কিন্তু আমার মনে হয় ইতিহাসভিত্তিক অধিকাংশ লেখাই হয়তো নিরপেক্ষ ভাবে লেখা যায় না।তবে লেখক যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন নিরপেক্ষ ভাবেই ইতিহাস তুলে ধরতে।স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে ৭৫ এর আগ পর্যন্ত অনেক ঘটনার বিস্তারিত আলোচনা থাকা সত্ত্বেও কয়েক জায়গায় আমার খাপ ছাড়া মনে হয়েছে,ঘটনার ধারাবাহিকতা একটু অসামঞ্জস্য লেগেছে এবং ৭৫ এর আগস্টের ঘটনা গুলো কেমন জানি তাড়াহুড়ো করে শেষ করেছেন বলে মনে হলো আমার। তবে লেখক ইতিহাস জানার আগ্রহ অনেকখানিই মেটাতে পেরেছেন সাথে অনেক প্রশ্নও সৃষ্টি করেছেন। লেখা খুবই সাবলীল ছিল,পড়ে আরাম পেয়েছি। আমার মত রাজনীতি জ্ঞান শূণ্য মানুষদের জন্যেও বই টি কিন্তু একদম সহজবোধ্য।
১৫ আগস্ট কেন ঘটেছিল, এর সাফাই (কিংবা বর্ণনা) বোধহয় অনেকভাবে দেয়া যাবে। বঙ্গবন্ধু শুধু বাগাড়ম্বর ছিলেন, করিৎকর্মা ছিলেন না— এমন একটা মনোভাব আছে অনেকের মধ্যে। ‘কেন, ওই সময়ের পেপার-পত্রিকার হেডলাইনগুলো পড়লেই তো তাঁর ইনকম্পিটেন্সি ধরা পড়ে!’ — মাথায় ঘিলু থাকা প্রণিমাত্রই ইহা স্বীকার করিবেন, রাজনীতি কখনো এতো সোজা না।
লেখক মহিউদ্দিন সাহেব তার বইতে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন জনের আলাপ-আলোচনা তুলে ধরে ৭২-৭৫ সালের একটা সম্যক চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। কখনো কখনো তিনি সফল। এবং স্বাভাবিকভাবেই কিছু কিছু সময় তার ঘাটতি রয়ে গেছে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শুরু পর্যন্ত তিনি চমৎকারভাবে এগিয়ে হঠাৎ করেই যেন কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছেন বলে মনে হয়। দোষটা প্রকৃতপক্ষে তার না অবশ্য। প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারি তুমুল জনপ্রিয় এক নেতা কিভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, কেনই বা তার পতন– সেই ইতিহাস বড়ই বিতর্কিত, ধোঁয়াশাময় এবং একইসাথে ভয়ংকর বললেও ভুল হবে না। সেসময়ের চিত্রনাট্যের নায়করা কখনোই মুখ খোলেনি, যবনিকা-পতন পরবর্তী তাদের কর্মকাণ্ড হয়তো ধামাচাপা দেয়া হয়েছে, নতুবা প্রোপাগান্ডা দিয়ে বিস্মৃত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে প্রত্যেক সরকারই।
এতো বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও কিভাবে আমাদের ইতিহাসবিদগণ নিরপেক্ষ ইতিহাস লিখলেন, এটা ভেবে বড়ই অদ্ভুত লাগে। এই ইতিহাস আদৌ সঠিক কিনা– সেটাও কিন্তু চিন্তার বিষয়। সেদিক থেকে তাই বোধ করি এই বই একটু ব্যতিক্রম। বেলা-অবেলায় লেখক ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরেছেন, ইতিহাসের সাক্ষীদের জবানবন্দী নিয়েছেন, তবে বিচার-বিবেচনা কিংবা মন্তব্যের গুরুদায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন পাঠকের কাছেই। এটাই বোধহয় হয় বইটার সবচেয়ে বড় দূর্বলতা। তাছাড়া ৭৫ এর ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে মনে হয় ৪-৫ টা বই লিখে ফেলা সম্ভব, মাত্র শেষের ১০০ পৃষ্ঠায় লেখক এর কতটা বিচার করতে পেরেছেন সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে অবশ্য। তিনি শুধু প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু হেঁয়ালিপনা করে যেই উত্তর রেখেছেন প্রশ্নের আড়ালে — আর আমার মাথায় যা এসেছে সেটা কি লেখকের মাথাতেও ছিল কিনা– এমন দোটানায় পড়তে হয়েছে মাঝেমধ্যেই।
১৯৭৫ এর আগস্ট পূর্ববর্তী ঘটনা জানার জন্য বইখানা চমৎকার। আগস্ট পরবর্তী ঘটনায় কোথায় যেন একটা কিছু ছিল না। এর দায়ভার কি লেখককে দিবো, নাকি ডকুমেনটেশনের অভাবকে?– বলা মুশকিল। এখনকার রাজনৈতিক অঙ্গনকেও বোধহয় এর জন্য একটু-আধটু ভালোই দোষারোপ করা যেতে পারে।
মোটামুটি নিরপেক্ষভাবে ইতিহাস বলার চেষ্টা ছিল বইতে। সেজন্য মহিউদ্দিন আহমদ সাধুবাদ প্রাপ্য। তবে লেখক যেভাবে উত্তর অপেক্ষা অধিক প্রশ্ন জাগিয়ে মনের ভিতর এক ইতিহাস-ক্ষুধাবোধ জাগ্রত করেছেন— তারজন্য তাকে ধন্যবাদ দিব নাকি অভিসম্পাত করবো, এ নিয়ে আমি ভয়ানকভাবে দ্বিধান্বিত।
স্বাধীনতা আমরা কিভাবে পেলাম, তা মোটামুটি সবার জানা, কিন্তু ঠিক কী হয়েছিল তারপর? কেনই বা যে ব্যাক্তি একটি দেশ এর কারিগর, যিনি দিলেন স্বাধীনতার প্রেরণা, তার মরণ হল সেই দেশের লোকের হাতের? আজকে যদি কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয় জাসদ এর ব্যাপারে, আমরা কিছুই বলতে পারব না. এই জাসদ এর জায়গা পেয়েছে আজকের বিএনপি. কিন্তু কিভাবে সৃষ্টি হল ছাত্রলীগ এর থেকে জাসদ? কে এই বা সিরাজুল আলম খান? সাদা লম্বা লম্বা দাড়ি এবং চুল সহ এই লোক যে এক সময়ে বঙ্গবন্ধু এর কাছের মানুষ ছিল, সেই একই ব্যাক্তি কিভাবে became his enemy? ইতিহাস এর যে অংশ আমাদের কাছে অজানা, তার biggest ডকুমেন্ট এই বই.
প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কিত বিষয়ে লিখা ঢাউস একটি বই কোন পাঠক যদি আলটিমেটলি পড়ে শেষ করতে পারে তাহলে নিশ্চয় বইটি তার ভালোই লাগবে অথবা বইটি অন্তত খারাপ লাগার কথা নয় যদি বইটি নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে এবং যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত নিয়ে লেখা হয়। সেই গ্রহণযোগ্যতা কতখানি সেই বিবেচ্য বিষয় নিয়েই আলোচনা করতে চাচ্ছি।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসকে কয়েকটি কাল পর্বে ভাগ করা যায় তার মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ঘটনাবহুল ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হল ১৯৭২-১৯৭৫ সময়কাল। কারন এত কম সময়ের ভেতর সামরিক এবং বেসামরিক প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এত রক্তপাত, হত্যাকান্ড আর ক্ষমতার পালাবদল আধুনিক বিশ্বে খুব কম দেশেই সংঘটিত হয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে আওয়ামীলীগ সরকারের ব্যর্থতার চিত্র লেখক বেশ ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন তবে তা সাধারণ জনগনের ভাষ্যে যতটা এসেছে তার চেয়ে বহুলাংশে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক চরিত্রের ভাষ্যে এসেছে কারন হতে ���ারে লেখক একটি গবেষণা গ্রন্থ লিখতে চেয়েছিলেন কিন্তু ঐতিহাসিক এত সব ঘটনার নাটকীয়তা আর তার সাক্ষাতকারভিত্তিক বিচার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখক আরও অনেক রোমাঞ্চকর গল্প তুলে এনে বইটিতে একটা ফিকশনাল আমেজ দিয়ে ফেলেছেন।
ইতিহাসের সত্যাসত্য নির্ধারণ লেখকের জন্যে কঠিন কাজ কারন এখানে ইতিহাসের সত্যাশ্রয়ী বয়ান নির্মান করতে গিয়ে লেখকের ইতিহাসের নায়ক-খলনায়ক, বিজিত -পরাজিত সব পক্ষের এবং ব্যক্তির সাক্ষাতকার-বয়ান গ্রহণ করতে হয় সেক্ষেত্রে কমবেশি সবার মধ্যেই আত্বপক্ষ সমর্থন, ঘটনার দায় এড়ানোর চেষ্টা এবং নিজেকে ঘটনার নায়ক হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা থাকে। এই যায়গায় লেখক নিজে কোন সিদ্ধান্ত না দিয়ে ঘটনাপরম্পরার সাথে সংযুক্ত একাধিক ব্যক্তির বয়ান তুলে এনে তার সত্যতা নির্ধারণের দায় পাঠকের হাতেই তুলে দিয়ে পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন।
গণতন্ত্রের বিপরীতে দুনিয়ার সব দেশেই জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি করার প্রবণতা বিদ্যমান বাংলাদেশও সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার আগে ও পরে দুই সময়ের জাতীয় পর্যায়ের নেতা ও শাসকগোষ্ঠীর জনসম্পৃক্ততার ধরন দেখলেই বোঝা যায়। শেরে বাংলা, ভাষানী, শেখ মুজিব প্রমুখ জনগনের নেতা হয়ে উঠতে গিয়ে একধরনের বাগরম্বরতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। গলা ফাটিয়ে ও মাঠ-রাজপথ কাপিয়ে জনতার ম্যান্ডেট আদায়, দাবিদাওয়া পুরণ ও আন���দোলন কর্মসূচী সফলে পারঙ্গমতা দেখিয়ে একেকজন 'ডেমাগগ' হয়ে উঠেছিলেন কিন্তু দক্ষ হাতে প্রশাসন চালিয়ে কেউ স্টেটসম্যান হয়ে উঠতে পারেন নাই যার খেসারত জনগণকেই দিতে হয়েছে সবসময়।
১৫ ই আগষ্ট হত্যাকান্ডের ঘটনা নিয়ে যতটা দালিলিক বিশ্লেষণ ও ইন্টার্ভিউ দ্বারা আরও সত্য উদঘাটনের দরকার ছিল ততটা হয়নি। হত্যাকান্ডের সাথে সরাসরি জড়িত কারও ইন্টার্ভিউও ছিলোনা। জাসদের অনেক নেতাকর্মীর বয়ান পাওয়া গেলেও ৭২-৭৫ এ তাদের ভূমিকা বিস্তারিত ভাবে আসেনি তা সম্ভবত জাসদ নিয়ে ইতিপূর্বে লেখকের একটি ডেডিকেটেড পাঠকনন্দিত বই থাকার কারনে। ১৫ আগষ্ট পরবর্তী দুটি সেনা অভ্যুত্থান নিয়ে আরও আলোচনার অবকাশ ছিল বিশেষ করে সেনাবাহিনীর আভ্যন্তর নিয়ে কারন ওইসকল অভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতেই প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলো পরবর্তীতে আরও সুসংহত ও পেশাদার হয়ে ওঠে।
পরিশিষ্ট সংযোজনীতে বাকশালের প্রথম অধিবেশনে দেয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষন জুড়ে দেয়া আছে যা থেকে বাকশাল নিয়ে তার মনোভাব আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানা যায়।
বেলা অবেলা বইয়ের বিশেষত্ব হল ঐতিহাসিক সত্যতা নিরুপনে লেখক কোন রেফারেন্স ও উদ্ধৃতির আশ্রয় নেননি বরং ঘটনাবলীর সাথে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষ ব্যক্তিদের সাক্ষাতকারের মাধ্যমে তা করেছেন যা পাঠককে ইতিহাসের কানাগলিতে ঘোরাবে গভীর পাঠোদ্ধার করিয়ে।
ইতিহাসের বই পড়ার সবথেকে বড়ো বিড়ম্বনা হলো পক্ষপাতিত্ব, এই ধরুন একজন পাকিস্তানি ইতিহাসবিদ যখন ১৯৭১ এর ডিসেম্বরের ঢাকা নিয়ে লেখেন, তখন বলেন ঢাকার পতন হয়েছে, আর আমরা বলি ঢাকা মুক্ত হয়েছে। সুতরাং লেখাতে পক্ষপাতিত্ব থাকেই, তাই এই ধরনের বই পড়লে আপনাকে কেবল তথ্য গুলো বাছাই করতে হবে, এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ইতিহাসের কাঠামো দাড় করানোর জন্য সবথেকে ভালো পন্থা হচ্ছে নানান পক্ষের বই পড়া।
বেলা-অবেলার লেখক মহিউদ্দিন আহমদের লেখা বাংলাদেশের বিজয় পরবর্তী ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়ের বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তুপ থেকে দেশের ঘুরে দাঁড়ানো এবং রাজনৈতিক উত্থান পতন নিয়ে একটা ফাস্ট ফরওয়ার্ডে ধারণা নিয়ে লেখা বই। যেখানে আপনি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর চিত্র পেয়ে যাবেন।
১৯৭২ থেকে ৭৫, তিনটা বছর বলতে খুব বেশি সময় লাগে না, কিন্তু এই সময়টা পার হতে ঠিক তিন বছরই লাগে। আর এই তিন বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এতোটা উত্তপ্ত ছিলো যে একটা সাড়ে তিনশ পাতার বইয়ে তা সম্পূর্ণ তুলে আনা কখনই সম্ভব নয়। তবে এই সময় নিয়ে আপনাকে একটা ধারণা তৈরি করে দিতে পারবে বইটি, ইতিহাসের এই বাক বদলের সময় নিয়ে পড়ে আপনার আগ্রহ আরো বেড়ে যাবে।
১৯৭২ এর ৮ই জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়েই শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ নামক দেশটির হাল ধরলেন, বিধ্বস্ত ধ্বংসস্তুপ থেকে গড়ে তুলা শুরু করলেন দেশকে। প্রথমেই তিনি বছরের ভিতর সংবিধান করে ফেললেন, আদায় করা শুরু করলেন নানান দেশ থেকে স্বীকৃতি। এদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশেও আস্তে আস্তে উত্তপ্ত হওয়া শুরু করে যার প্রধান কারণই ছিলো শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমানের স্বজনপ্রীতির কারণেই ছাত্রলীগ দুইভাগ হয়ে যায়, যার একভাগ পরে সিরাজুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে জাসদ হয়ে যায়। আর অন্যটা শেখ ফজলুল হক মণির নেতৃত্বে চলে যায়।
বইটি পড়তে গিয়ে আমার প্রতিটা সময় মনে হয়েছে শেখ মণি, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার ডান হাত হিসেবেই কাজ করে গেছেন। আর ১৫ই আগষ্টের পরিণতি হওয়ার পিছনের কারণেও নিয়ে যাওয়ার পিছনে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি এই শেখ মণিও একটা কারণ ছিলো।
বঙ্গবন্ধু এদিকে দেশে এসেই ভারতের সাথে কিছু চুক্তি করলেন, যা মানুষের মনে ক্ষোভ ভারতবিরোধী মনোভাব তৈরি করে দিয়েছিলো। তারপর পাকিস্তানের সাথেও বসে বন্ধি বিনিময় করলেন, ভারতীয় সেনাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠালেন। আর যাওয়ার সময় তারা বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের থেকে জব্দ করা যুদ্ধ সরঞ্জামও নাকি নিয়ে গিয়েছিলো।
তারপর ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়, যেখানে আওয়ামিলীগ বিজয় লাভ করে সরকার গঠন করে। আর এই প্রথম নির্বাচনই অনেক জায়গায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়। শেখ মুজিবের আসনের প্রার্থীকে অপহরণ করে নির্বাচন করতে না দেওয়ার অভিযোগ উঠে। বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামিলীগের কর্মীরা ভোট মেরে নিয়ে নেয়, অনেক মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়েও ভোট দিতে পারেনি তখন। কারণ ভোট আগেই হয়ে গেছে। আর এখান থেকেই শুরু হয় আওয়ামিলীগ রাজনৈতিক দলের সহিংসতা।
পথে ঘাটে মানুষের লাশ পড়ে থাকে। পুলিশ আর শেখ মুজিবের গড়ে তুলা রক্ষীবাহিনীর সাথে রাজনৈতিক দল গুলোর সংঘর্ষে লাশ পড়তে শুরু করে। খবরের কাগজের পাতায় লাঞ্ছনা, ধর্ষণ আর খুনোখুনির সংবাদ ছাপা হতে থাকে প্রায়ই। এইসময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাজউদ্দীনের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিলো না, একসময় তাজউদ্দীন মন্ত্রী পরিষদ থেকে পদত্যাগই করে ফেলেন। তাজউদ্দীনের জন্য আমার প্রচন্ড মায়া হয়, শেখ মুজিবের অনুপস্থিতে যুদ্ধের সময় মানুষটা দেশের জন্য অনেক করেছিলেন। বিনিময়ে পেয়েছেন অবহেলা, লাঞ্ছনা আর শেষে তাকে ছিটকে পড়তে হয়েছিলো।
এদিকে রাজনীতিকদের সাথে সামরিক বাহিনীরও সম্পর্ক ভালো ছিলো না বলা যায়, এই সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটে মেজর ডালিমের সাথে আওয়ামিলীগ কর্মীর বিবাদ, আর এখানে সুষ্ঠু সমাধান না হওয়ায় শেখ মুজিবের প্রতি ক্ষোভ জন্মে সামরিক বাহিনীর অনেকের। এবং কী পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করা অনেককে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগও কারণ হিসেবে ছিলো।
চুয়াত্তরের আগষ্ট সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে বন্যা দেখা দেয়, ফলে দেখা দেয় খাদ্যঘাটতি, দুর্ভিক্ষ। দূর্নীতি, অনিয়ম আর শেখ মুজিবুর রহমানের বার্মার সাহায্য গ্রহণ না করা, আমেরিকার মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ না করার জন্য এর ভয়াবহতা ছিলো প্রচন্ড। সরকারি হিসাব মতে ৩০হাজারের মতো মানুষ মারা গেলেও, অনেকের ধারণা তা লাখ ছাড়িয়েছে। এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে আকাশচুম্বী হয়ে যায়।
যুদ্ধ পরবর্তী সময়টা আরো বেশি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিলো, গুপ্তহত্যা, গুম, রাজনৈতিক সংঘাত দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। এদিকে ৭৫ এর শুরু থেকেই শেখ মুজিব এক দলীয় শাসনব্যবস্থার কাজ শুরু করে দেন পুরোদমে, গঠন করেন বাকশাল যার বিরোধীতা করে ওসমানী ও মইনুল পদত্যাগ করেন। ২৫ জানুয়ারি সংসদে চতুর্দশ সংশোধনী বিল পাশ করে একই দিনে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে নিজে শাসনভার গ্রহণ করে শপদ নেন। এদিকে মানুষ কেউ ভয়ে কেউ সজ্ঞানে বাকশালে যোগ দিতে শুরু করেন। প্রায় ১৫০টিরও বেশি বেসরকারি পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবশ্য তখনকার সময়ে বিতর্কিত সংবাদ বা সরকার বিরোধী সংবাদ প্রচারের আগে তা শেখ মুজিব নিজে দেখে নেওয়ার বর্ণনাও বইয়ে আছে।
আর শেখ মুজিবের এসব কাজের পরিণতি ডেকে আনে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট। এই কাজটা যারা করেছিলো তাদের বিবৃতি আছে বইটিতে। সেইদিনটি নিয়ে নানান জনের কথা গুলো লেখক সাজিয়েছেন বইয়ে। অবশ্য শেখ মুজিবকে হত্যার পরই যে সব ঠিক হয়ে গেছে এমন না, বরং লাশের পর লাশ পড়েছে আরো। ১৫ই আগষ্ট শুধু বঙ্গবন্ধু পরিবার খুন হয়েছে এমন কিন্তু না, সেদিন আরো দুটো পরিবারকেও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছিলো কিন্তু এই দুই পরিবারের কথা এই বই পড়ার আগে আমিও জানতাম না। আগষ্টে মুজিবের পরে ক্ষমতায় বসেছিলো মোশ��াক, সেও বেশিদিন ঠিকতে পারেনি। একের পর এক যেমন লাশ পড়েছে, চলেছে ক্ষমতা বদলও আর এর পিছনে সবথেকে বেশি ভূমিকা ছিলো দেশের সামরিক বাহিনীর।
ইতিহাস নিয়ে লেখা বইয়ের সবথেকে বড়ে সমস্যা হচ্ছে কঠিন বর্ণনা, অবশ্য এই বইয়ের বর্ণনা আমার কঠিন লাগেনি। লেখক ১৯৭২ থেকে ৭৫র সময়টাকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে বর্ণনা করেছেন। নানান সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর ও বিবৃতি, বিভিন্নজন থেকে নেওয়া সাক্ষাৎকারকে লেখক গুছিয়ে একটা উপন্যাসের মতো করেই ধাপে ধাপে ৭২ থেকে ৭৫ এর ঘটনাগুলোকে সাজিয়েছেন। যারা বা যেখান থেকে এসব নেওয়া হয়েছে তার রেফারেন্স বইয়ের শেষে উল্লেখ আছে তবে এসব বইয়ের ভিতরে ফুটনোট করে দিলেই উপকারে আসতো। এক্ষেত্রে নানান জনের নানান দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা উঠে এসেছে বইটিতে। এই বই পড়েই আপনি ৭২ থেকে ৭৫ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ জেনে যাবেন এটা ভাবা উচিত হবে না, তবে সময়টা কেমন ছিলো এবং এই সময়ের উল্লেখযোগ্য বিষয় নিয়ে জানা ও আরো আগ্রহ জন্মাবে। বইটিতে অনেকগুলো বিষয়ের বা ব্যক্তিরই কর্মকাণ্ড বিস্তারিত উঠে আসেনি। কেবল একটা ধারণা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সিরাজুল ইসলাম, রক্ষীবাহিনী, তাজউদ্দীন আহমদ, ১৫ই আগষ্ট ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
এতদিন পর্যন্ত ইতিহাস চর্চায় দেখেছি ৭১ এর পর থেকে রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে খুব একটা আলোচনা কেউ করতে চায় না, এবং কী ৭১ থেকেই হুট করে চলে আসা হয় ৭৫ এর ১৫ই আগষ্টে, কিন্তু এই মধ্যকার সময়ের আলোচনা কেন কম হতো বইটি পড়লে ধারণা পাবেন। তবে বঙ্গবন্ধু যাই করুক না কেন ১৫ই আগষ্টের পরিণতিটা সুখকর বলা যায় না। তাছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং এর আগের অবদান স্বয়ং তার খুনিও এক বিবৃতিতে স্বীকার করেছে এবং কী তাকে এখনও সম্মান করে বলেও উল্লেখ আছে।
যাইহোক যারা ৭২-৭৫ এর রাজনৈতিক ইতিহাসের পালাবদল নিয়ে সারাংশ একটানে পড়ে নিতে চান তাদের জন্য মহিউদ্দিন আহমদ এর এই বই্টি ভালো চয়েস হবে। বর্ণনাও কঠিন না হওয়ায় শুরু করার পর শেষ না করা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে বইটি, কারণ ঐই সময়ের রাজনৈতিক পরিবেশের ইতিহাস রাজনৈতিক উপন্যাসের মতোই আকর্ষণীয়, চমকপ্রদ।
দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর একটা ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে মাথা তুলে দাড়ানোর জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পথচলা শুরু নব স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের। সাধারন মানুষ থেকে শুরু করে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী সর্বত্র আকাশছোঁয়া উচ্চাকাঙ্খা। সবার শুধু চাই চাই। শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে সব সেক্টরে। সাথে প্রাকৃতিক দূর্যোগ, দূর্নীতি, চুরি,ডাকাতি ও রাহাজানি। আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল, ক্ষমতা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। বিরোধী দলগুলোর সশস্ত্র রাজনৈতিক ধারাতে প্রবেশ । সেনাবাহিনীতে ধূমায়িত অসন্তোষ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। চারিদিকে ষড়যন্ত্র। সামাল দিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অবস্থা নাজেহাল। গঠন করলেন বাকশাল৷ গঠনের অব্যবহিত পরেই ঘটল ইতিহাসের নৃশংসতম ১৫ আগস্ট অভ্যূথান। শুরু হল সামরিক বাহিনীর মধ্যে ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করার সশস্ত্র প্রতিযোগিতা। অভ্যূথান, পাল্টা অভ্যূথানে দেশের অবস্থা টালমাটাল। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে সংগঠিত ঘটনাপ্রবাহ ও চালচিত্র লেখক তুলে ধরেছেন সযত্নে ও নির্মোহ থেকে।
পাইকারি হারে ইতিহাসের বই ছাপান বলে এতদিন লেখকের উপরে কেন জানি আস্থা পাইনি। মনে হয়েছিল হয়ত নিতান্তই পপুলার ইতিহাস হয়ত নতুন কিছু নেই, নইলে এতগুলো মুদ্রণ হচ্ছে আবার লেখকও কোন হেনস্থার শিকার না হয়ে বহাল তবিয়তে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছেন, টক শোতে যাচ্ছেন, কী করে?
যাই হোক অবশেষে পড়া হল। ৭২-৭৫ নিয়ে খুব কৌতূহল। শুরুটা করার জন্য বেশ ভালো বই মনে হল এটা।
সুবিশাল ও সীমাহীন সংগ্ৰাম, লড়াই, আত্মত্যাগ ও জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে বাংলাদেশ নামক এক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তবে কথায় আছে যে স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা ঢের কষ্টের, একাত্তর পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জন্য ঠিক এই প্রবাদটি প্রযোজ্য।
বাহাত্তরে যেখানে সবকিছু গুছিয়ে সুন্দর একটি রাষ্ট্র গঠন করার প্রয়াসের প্রয়োজন ছিল সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ও একে অপরের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লো। "কার কাছে থাকবে ক্ষমতা" এটিই বোধহয় মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখনকার সময়ে। ভঙ্গুর দেশটির সাধারণ জনগণের দিকে দৃষ্টিপাত করার ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা খুব কম মানুষেরই ছিল।
বাংলাদেশের বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর সময়কার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সার-সংক্ষেপ নিয়ে এই বইটি। বাহাত্তরে দেশে ফিরেই শেখ মুজিবের রাষ্ট্রক্ষমতা গ্ৰহণ, ক্ষমতার টানপোড়নে আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন দল "জাসদ" গঠন, মুজিব গঠিত রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, তেয়াত্তরের নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা মত-বিরোধ, স্বাধীনতা পরবর্তী জনসাধারণের নানা ভোগান্তি, গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন, সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার অপচেষ্টা, বাকশাল গঠন করে দেশের সামগ্রিক ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকার গ্ৰহণ, রাজনৈতিক নেতাদের চাটুকারিতা ও দুর্নীতিগ্ৰস্ত হয়ে পড়া, সেনাবাহিনীর ভিতর অন্ত-কোন্দল, পঁচাত্তরে পরপর তিনটি সেনা অভ্যুত্থান এসকল বিষয় নিয়ে বইটি আলোচিত।
বইয়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে আপাতত প্রশ্ন করার মতো জ্ঞান আমার এখনো হয়নি, লেখক সবদিকের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। একপাক্ষিক না হয়ে শুরু করলে অনেক কিছুই নিজের মতো করে বাছ বিচার করা যায় তবে সেক্ষেত্রে আরও জানতে হবে, সেই আগ্রহটুকু অন্তত থাকা উচিত। আগ্ৰহের উল্লেখ করলাম এইজন্য যে, বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়াতে ইতিহাসবিদদের কোনো কমতি নাই, আবার তাদের বচন গোগ্ৰাসে গিলে ফেলার মতো মানুষেরও অভাব নাই, এতে নতুন নতুন গালগল্প তৈরি হচ্ছে। পড়তে বড্ড অনীহা এই জাতির, এইজন্য আমাদের মগজ ধোলাই করাও খুব সহজ।
শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আমলে সারাটা সময় কাটিয়েছেন গণতন্ত্রের জন্য কিন্তু নিজের দেশের প্রথম নির্বাচনের আগে যখন বলেন ৭ মার্চের পর লাল ঘোড়া দাবড়িয়ে দেবো তখন থেকেই বোধ করি আমাদের উলটো যাত্রার শুরু। বাংলাদেশকে জানতে হলে অতি অবশ্যই ৭২-৭৫ পাঠ জরুরি। এই সময়টাতেই আসলে দেশের গণতন্ত্রের ছায়াতলে স্বজনপ্রীতি, কাল্ট ওয়ারশিপের টোন সেট হয়ে যায়। ৭২ দেশের রাজনীতিবিদদের পলিটিশয়ান থেকে স্ট্যাটসম্যান হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু আমরা জনতোষণের সহজ পথই বেছে নিয়েছিলাম। যে পথে আমাদের যাত্রা এখনো চলমান। বেলা-অবেলা বইটা ওই উত্তপ্ত সময় ঘিরেই এগিয়েছে। টু বি ভেরি স্পেসিফিক ফ্রম ০৮.০১.১৯৭২ টু ০৭.১১.১৯৭৫। বইটার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বইটা প্রকাশিত হয়েছে ২০২০ সালে তাই কিছু বিষয়ে রাখঢাক যে ছিল তা না বললেও অনুমান করা যায়।
বিরোধী রাজনীতি করা আর সরকা��� হয়ে ��েশ চালানোর মধ্যে ফারাক বিস্তর। বিরোধীদলে বসে যেসব সমস্যার জন্য সরকারকে দায়ী করা যায়, সরকারে বসলে সেসবের সমাধান করা লাগে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষের আকাঙ্খা ছিল আকাশচুম্বী, কিন্তু দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা আওয়ামী লীগের ছিল শূন্যের কাছাকাছি। স্বাধীনতার আগে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভাষা ছিল প্রতিবাদ আর সংগ্রামের। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর দলটার মনোজগতের খুব বেশি পরিবর্তন এসেছিল তা মনে করার কারণ নেই। জনযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতাকে পুঁজি করে নেতাকর্মীদের ব্যবসা করার ধরণ বার্তা দেয় রাষ্ট্র সকল নাগরিকের তা মানতে পারে নি দলটির সিংহভাগ অংশ।
ষাটের দশকের মাঝনাগাদ বৈশ্বিক কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভাজন রেখার পথ ধরে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট আন্দোলন দুইধারায় বিভক্ত হয়। পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধ ও নকশাল আন্দোলন দেশের মূলধারার কমিউনিস্টদের আরো ক্ষত-বিক্ষত করে। স্বাধীনতার পরবর্তী প্রধান বিরোধীদল (ভোটের হিসেবে না) জাসদ সে অর্থে বামদল ছিল না। জাসদ ছিল আওয়ামী লীগেরই একটা অংশ, মুক্তিযুদ্ধের উপজাত ফসল। জাসদের সৃষ্টি আওয়ামী লীগের বুদ্ধি ও শক্তিক্ষয়ের কারণ। আহমদ ছফার মতে এ হলো বাপের বিরুদ্ধে পুত্রের বিদ্রোহ। কিন্তু কেন জাসদ তৈরির প্রয়োজন পড়ল এ নিয়ে আলোচনার অবকাশ আছে।
বঙ্গবন্ধুর উত্থান চরম রোমাঞ্চকর আর শেষটা ভয়াবহ। ৭৫ এর আগস্টের ঘটনা সেনাবাহিনীর স্রেফ দুটো ইউনিটের বিদ্রোহ বলা মুশকিল। জাসদ জন্মলগ্নই থেকেই সরকার পতনের দাবি তোলে। দেশের বেশিরভাগ কমিউনিস্ট দল বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ব্যাখা করে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ হিসেবে। Circumstantial Evidence বলে মোশতাক, মেজর জিয়া, কর্ণেল তাহের, মেজর খালেদ মোশারফ আগে থেকেই অভ্যুত্থানের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন। শেখ মুজিবের মতো ঝানু রাজনীতিবিদ তার পতনের ধ্বনি শোনেন নি তা বিশ্বাস করা মুশকিল। খুব সম্ভবত তাই শেষ পথ হিসেবে একক সিদ্ধান্তে বেছে নিয়েছিলেন বাকশাল। বাকশাল একদলীয় সংসদকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় পরিণত করেন। অবশ্য এই একদল অবশ্য গঠনের চেষ্টা হয়েছিল সব দল-মতকে নিয়েই। যার ফর্মূলা ৭২ এই দিয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান। অবশ্য বাকশালকে সফল করার মতো দক্ষ দল শেখ সাহেবের হাতে কখনোই ছিল না।
কেন মাত্র ৩.৫ বছরে আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরুদ্ধে জনগণের সমর্থন তলানিতে নেমেছিল? সরকার প্রধান হিসেবে দায় শেখ মুজিব এড়াতে পারবেন না তা নিশ্চিত। মহিউদ্দিন আহমেদ যেমন মোটাদাগে আওয়ামী লীগের দুর্নীতিপরায়ন নেতাদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর নমনীয়তাকে দায়ী করছেন তেমন দায় দিয়েছেন তাদেরকেও যারা বঙ্গবন্ধুকে গড সিন্ড্রোমে ভোগার সুযোগ দিয়েছিলেন। বারবার উঠে এসেছে ফজলুল হক মণির উচ্চাভিলাসের কথা। এছাড়া দায় দিয়েছেন রক্ষীবাহিনী, পাকিস্তান ফেরত সেনাবাহিনীর অফিসারদের সেনাবাহিনীতে পূণর্বাসন, যুদ্ধপরাধীদের বিনা বিচারে ছেড়ে দেওয়া বা বাকশালের মতো বহুল আলোচিত উপকরণের। দ্রুত নির্বাচন আর সংবিধান প্রণয়ন যেমন ছিল এই সময়ের সাফল্য, তেমন ছিল পত্রিকার ওপর সেন্সরশিপ, ভিন্ন মতকে বলপূর্বক দমনের সংস্কৃতি। বইয়ের সবচাইতে চাঁচাছোলা আলোচনা এসেছে ৭৫ আগস্টের পর। অনেকের লেখায় কর্ণেল তাহের, মেজর খালেদ মোশারফ দুজনকেই একটু সফট দৃষ্টিতে দেখা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু তারা দুজনেই মূলত ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে পরাজিত। তাই আপনি দেখবেন জেল হত্যার সময় খালেদ মোশারফ ছিলেন আগস্টের খুনি মেজরদের সাথে ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে আলোচনায় আর কর্ণেল তাহেরকে দেখবেন ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহের পর জিয়াকে সেনাদপ্তরের বাইরে এনে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকতে।
এ দেশের জন্মলগ্নেই রাজনীতি ঢুকে পরে অসুস্থতার চোরাগলিতে। কোন রাজনৈতিক দলই দেশের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করতে পারে নি। তবে সবচাইতে বড় সুযোগটা হারিয়েছে আওয়ামী লীগই। ১৯৬৬-৭৩ ব্যাপক জনসমর্থন নিয়েও দলটি পারে নি দেশের মানুষদের বাংলাদেশের পতাকাতলে আনতে।
বইয়ের শুরুটা বেশ চমৎকার। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সূচনা অবস্থাটা ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। জাসদের উত্থান, ছাত্রলীগের কোন্দল, প্রভুর আসনে শেখ মুজিবকে বসানো ইত্যাদি বিষয়ের প্রাথমিক একটা ধারণা পাওয়া যায়।
কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ বইয়ে আসেনি। এবং শেষ দিকটা ছিল খুবই তাড়াহুড়োয় লেখা। ৭২ সাল পুরোটা মোটামুটি ভালোই এসেছে। কিন্তু তারপরেই হালকা হালকা বর্ণনায় এগিয়ে গেছে বই। এই বইয়ের অনেক পাঠক এই অভিযোগটা করেছেন যে, লেখক শেষ দিকে খুবই তাড়াহুড়ো করেছেন।
বিশেষ করে ৭৫ সালের বর্ণনাটা আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন ছিল। শেখ মুজিবের মৃত্যু পরবর্তী ঘটনা খুবই কম এবং ঝাপসাভাবে এসেছে। কিছু কিছু ঘটনা এতই সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে, পাঠক আগে থেকে সামান্য ইতিহাস না জানলে পুরো বিষয়টি বুঝতে একটু কষ্ট হবে।
মহিউদ্দিন আহমেদ সাবলীল ভাষায় লিখেন, পড়তে আরাম পাওয়া যায়। বোরিং লাগে না। এক সময় রাজনীতির বই মানে ছিল রসকষহীন ভারি টাইপের হবে। মহিউদ্দিন সাহেব এই থিমটা বদলে দিয়েছেন। বর্তমানে এ ধারা অনুসরণ করে আরও অনেকেই ভালো ভালো বই লিখছেন।
আমাদের দেশে যে দল ক্ষমতায় থাকে তার দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল, ইতিহাস বিকৃতি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল—অধিকাংশ পাঠক ইতিহাসকে সন্দেহের চোখে দেখত। সরকারকে খুশি করার জন্য লেখা হয়েছে অথবা সত্যি কথা লিখলে তো এই বই বেরোনোর কথা না। আওয়ামী লীগ যেকোনো উপায়ে ব্যান করে দিত এই বই। তবু ক্ষমতার চৈখ উপেক্ষা করে কিছু কিছু ইতিহাস লেখা হয়েছে এ সময়ে।
আর ইতিহাস সবসময় একপেশে হওয়ার সন্দেহ তো রয়েই যায়।
মহিউদ্দিন আহমেদ আমার খুব পছন্দের লেখক, বিশেষ করে বাংলাদেশের যুদ্ধের আগের এবং যুদ্ধের পরের ইতিহাসের জন্য।
বইটিতে উনি যুদ্ধের পরে ১৯৭২-১৯৭৫ পর্যন্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং তার পরিবর্তি তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। এই বইটি মুলতু সে সময়ের শেখ মুজিব আর আওয়ামী লীগের রাজনীতির উত্থান পতনের উপর বেশি ফোকাস করা। যুদ্ধের পর কিভাবে সাধারণ নাগরিকদের উপর পাতি নেতাদের অত্যাচার, বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ নোংরা রাজনীতি, মুজিববাদ, ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ দিল্লী চুক্তি, ইসলামাবাদে ইসলামিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু এর যাওয়া নিয়ে দেশে তৈরী হওয়া রাজনৈতিক দলাদলি, তাজউদ্দিনকে দূরে সরায় দেয়া, জাসদের অবস্থান, ৭৪ এর দুর্বিক্ষ এবং নেতাদের ভুল সিদ্ধান্ত, দুর্বিক্ষ এর পরিণাম, বাকশাল, সেনা ক্যুপ, বঙ্গবন্ধু হত্যা এগুলো নিয়ে লেখা এই বইটায়।
দেশের ওই সময়ের লীগের ইতিহাসের জন্য এর থেকে বেটার বই পাওয়া দুস্কুর, বাকি যেগুলা পাওয়া যায় সেখানে নেতাদের সমালোচনা কম, পা চাটাচাটি বেশি।
মহিউদ্দিন আহমেদ সেসময়ে গণকণ্ঠের রিপোর্টার ছিলেন, অনেক কিছু অনার নিজের দেখা আবার অনেক কিছু অনেক ব্যক্তির সাথে সংলাপ করার পর লিখা, সেগুলোরও রেফারেন্স দেয়া আছে।
গণকণ্ট তখন জাসদের ফ্রন্ট ছিলো। তাই উনার বই গুলোতে জাসদের রেফারেন্স একটু বেশি, তবে উনি জাসদ এবং সমাজতন্ত্র (Socialism) রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও সেটার সমালোচনা করতে মিস করেন নাই।
বইয়ের শুরুটা বেশ চমৎকার। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সূচনা অবস্থাটা ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। জাসদের উত্থান, ছাত্রলীগের কোন্দল, প্রভুর আসনে শেখ মুজিবকে বসানো ইত্যাদি বিষয়ের প্রাথমিক একটা ধারণা পাওয়া যায়।
কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ বইয়ে আসেনি। এবং শেষ দিকটা ছিল খুবই তাড়াহুড়োয় লেখা। ৭২ সাল পুরোটা মোটামুটি ভালোই এসেছে। কিন্তু তারপরেই হালকা হালকা বর্ণনায় এগিয়ে গেছে বই। এই বইয়ের অনেক পাঠক এই অভিযোগটা করেছেন যে, লেখক শেষ দিকে খুবই তাড়াহুড়ো করেছেন।
বিশেষ করে ৭৫ সালের বর্ণনাটা আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন ছিল। শেখ মুজিবের মৃত্যু পরবর্তী ঘটনা খুবই কম এবং ঝাপসাভাবে এসেছে। কিছু কিছু ঘটনা এতই সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে, পাঠক আগে থেকে সামান্য ইতিহাস না জানলে পুরো বিষয়টি বুঝতে একটু কষ্ট হবে।
মহিউদ্দিন আহমেদ সাবলীল ভাষায় লিখেন, পড়তে আরাম পাওয়া যায়। বোরিং লাগে না। এক সময় রাজনীতির বই মানে ছিল রসকষহীন ভারি টাইপের হবে। মহিউদ্দিন সাহেব এই থিমটা বদলে দিয়েছেন। বর্তমানে এ ধারা অনুসরণ করে আরও অনেকেই ভালো ভালো বই লিখছেন।
আমাদের দেশে যে দল ক্ষমতায় থাকে তার দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল, ইতিহাস বিকৃতি এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল—অধিকাংশ পাঠক ইতিহাসকে সন্দেহের চোখে দেখত। সরকারকে খুশি করার জন্য লেখা হয়েছে অথবা সত্যি কথা লিখলে তো এই বই বেরোনোর কথা না। আওয়ামী লীগ যেকোনো উপায়ে ব্যান করে দিত এই বই। তবু ক্ষমতার চৈখ উপেক্ষা করে কিছু কিছু ইতিহাস লেখা হয়েছে এ সময়ে।
আর ইতিহাস সবসময় একপেশে হওয়ার সন্দেহ তো রয়েই যায়।
যুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য ছিলো সবচেয়ে জটিল সময়৷ আকাশ সমান স্বপ্ন ও আশা নিয়ে যে স্বাধীনতা মানুষ অর্জন করেছিলো, যুদ্ধের পর সব কিছুতেই ভাটা দেখা দেয়৷ এর পিছনে ছিলো ক্ষমতাসীনদের ভুল স্বীদ্ধান্ত, অপশক্তির কুটচাল ও আন্তর্জাতিক নানান কৌশল।
কি হতে পারতো আর কি হয়ে গেলো তা কেউই বুঝে উঠতে পারেনি এই সময়টাতে। একের পর এক রাজনৈতিক ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চাপ মিলিয়ে সময়টা ছিলো খুব ঘোলাটে৷ এই সময়ের বিশেষ বিশেষ ঘটনা নিয়েই বইটি সাজানো হয়েছে।
লেখকের আগের বইগুলোর চেয়েও এটি ভালো হয়েছে। তবে আগের মত গা বাঁচিয়ে লিখেছেন মনে হয়েছে৷ লেখক কোনো ঘটনা নিয়ে কোনো নিজের কোনো মন্তব্য দেয়নি বা খুব বেশি বিশ্লেষণেও যায়নি৷ শুধু মাত্র উৎস ডাটা উল্লেখ করেই দায়িত্ব শেষ করেছেন। ফলে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে স্বীদ্ধান্ত নিতে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আরো ১০ বছর৷
Good. An analytical history book on the period of 1972 to 1975 of Bangladesh, the period when Bangladesh was ruled by Sheikh Mujibur Rahman, the famine of 1974 occurred because of the corruption and mismanagement of the ruler and the ruling party, Baksal (one party ruling system-one man dictatorship) was introduced and JSD (National Socialist Party) was formed by Sirajul Alam Khan Dada Bhai.
বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর রাজনৈতিক পরিক্রমার সুন্দর প্রামাণ্য বইটা, নামটা যুত্সই । রাজনীতির ইতিহাস আর পালাবদলের ক্রমের ধারণা পেতে বইটা খুবই সাহায্য করবে । বইটায় ব্যবহৃত দলিল নিয়েও অসন্তুষ্টি নেই । অনেক পড়ার মত বই খুঁজে পাবেন বাংলাদেশ নিয়ে ।
যারা ঐ অস্থির সময়টা নিয়ে জানতে চান - অবশ্যপাঠ্য ।