এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে স্বল্পায়ু লেখক কায়েস আহমেদের জীবৎকালে প্রকাশিত চারটি বই ‘অন্ধ তীরন্দাজ’ (১৯৭৮), ‘দিনযাপন’ (১৯৮৬), ‘নির্বাসিত একজন’ (১৯৮৬) ও ‘লাশকাটা ঘর’ (১৯৮৭) এবং আরো বেশকিছু অগ্রন্থিত লেখা। লেখকের অকালমৃত্যুর এক বছর পর প্রকাশিত সংকলনটির ভূমিকা লিখেছেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।
কায়েস আহমেদ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের শক্তিশালী কথাশিল্পী। তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৫ মার্চ; পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার শ্রীরামপুর থানার বড়তাজপুর গ্রামে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়ো। তাঁর মাতার নাম ওলিউন্নেসা, পিতার নাম শেখ কামাল উদ্দীন আহমেদ। দেশভাগ ও পিতার চাকরিবদলের সূত্রে তাঁর পরিবার ঢাকায় আগমন করে এবং বসবাস আরম্ভ করে। কায়েস আহমেদ ১৯৬৪ সালে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন; অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু অনার্স শেষবর্ষে থাকা অবস্থায় তাঁর পড়ায় ছেদ পড়ে।
কলেজে আই.এ পড়ার সময় তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ‘পূর্বদেশ’-এ। দৈনিক ‘গণকন্ঠ’ ও ‘সংবাদ’-এ তিনি সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। তবে কায়েস আহমেদের আজীবন পেশা ছিল শিক্ষকতা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে বাংলার শিক্ষক ছিলেন। বিয়ে করেন ১৯৮৩ সালে। একমাত্র পুত্রের নাম অনীক আহমেদ। ১৯৯০ সালে তিনি হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেন। কায়েস আহমেদ ১৪ জুন, ১৯৯২ সালে আত্মহত্যা করেন।
একজন লেখকের বলার খুব বেশি কিছু থাকতে পারেনা, একথা আমি কায়মনোবাক্যে মানি। তারপরেও বলতেই হবে, কায়েস আহমেদ একটু বেশিই স্বল্পপ্রসূ লেখক। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের তিনি মোটেই কোনো দিকপাল নন, প্রচারের শীর্ষে থাকা দৈনিকের রগরগে সাহিত্য পাতায় তাঁকে নিয়ে আদিখ্যেতাও করা হয়না মোটেই, বইমেলার চটকদার সব বইয়ের মাঝে তাঁর দুই মলাটে আবদ্ধ সাহিত্যকীর্তিকে খুঁজে পাওয়াও ভার হবে। এতকিছুর পরেও কায়েস আহমেদকে অস্বীকার করা যায়না, তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র একটি ঠাঁই দিতেই হয়। কেন? এ সওয়ালের হদিস পেতে হলে আমাদের একটু সামনে যেতে হবে।
একটা কথা হলফ করে বলা যায়, বাজারি সাহিত্যের পলকা রোশনাই কায়েস আহমেদকে কখনো টলাতে পারেনি। তিনি লিখেছেন কম, কিন্তু যে চেতনাকে তিনি ধারণ করেছেন , যে বিশ্বাস তাকে রসদ যুগিয়েছে, তার দ্যুতি তাঁর রচনা থেকে হামেশাই ঠিকরে পড়েছে। ইলিয়াস “ মরিবার হ’লো তার সাধ” প্রবন্ধে তাঁকে নিয়ে বলতে পেরেছেন,
প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশিরভাগ লেখকের কাছে লেখাটা হল অভ্যাসমাত্র-চাকরিবাকরি আর ব্যবসাবাণিজ্য আর দেশপ্রেমের ঠেলা সামলাতে এনজিও বানিয়ে মালপানি কামাবার সঙ্গে তখন এর কোনো ফারাক থাকে না। তখন লেখায় নিজের সুখ আর বেদনা জানান দেওয়াটা হয়ে দাঁড়ায় তেল মারা আর পরচর্চার শামিল। লেখক হিসেবে সেই সামাজিক দাপট কায়েসের শেষ পর্যন্ত জোটেনি। তাই, কেবল মানুষের খুঁত ধরে আর দুর্বলতা চটকে সাহিত্যসৃষ্টির নামে পরচর্চা করার কাজটি তাঁর স্বভাবের বাইরেই রয়ে গেল। আবার “এই দুনিয়ায় সকল ভালো/ আসল ভালো নকল ভালো...” এই ভেজাল সুখে গদগদ হয়ে ঘরবাড়ি, পাড়া ,গ্রাম, সমাজ ,দেশ, পৃথিবী, ইহকাল ও পরকাল সবকিছুতেই তৃপ্তির উদ্গার শুনিয়ে মধ্যবিত্ত পাঠকদের তেল মারার কাজেও তিনি নিয়োজিত হননি।
ষাটের দশকের ছোটগল্পের ভরা জোয়ারের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন কায়েস আহমেদ। তবে বাঁধাগতের জোয়ারে তিনি গা ভাসিয়ে দেননি, নিজের বিশিষ্টতাকে তিনি সযত্নে লালন করেছেন, লকলকিয়ে একে বেমক্কা বেড়ে উঠতে দেননি। তাঁর প্রথম ছোটগল্পগ্রন্থ “অন্ধ তীরন্দাজ” এই সাধনারই ইঙ্গিতবাহী। তবে লেখক হিসেবে তিনি এই গ্রন্থে যথেষ্ট পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন, এমন বলাটা ভুল হবে। তিনি প্রায়শই নিরীক্ষা করেছেন, কারণে বা অকারণে, কিন্তু মাঝে মাঝেই তিনি খেই হারিয়েছেন, গল্পগুলো যেন দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে, কদাচিত কোন কানা গলিতে গিয়ে গোত্তা খেয়েছে। কাহিনির প্রতি, ডিটেলসের প্রতি তার মোহগ্রস্ততার কারণে চরিত্রগুলোর সহজাত পরিবৃদ্ধি তাই অনেক ক্ষেত্রেই ঠোকর খেয়েছে। তার দুর্দান্ত কিছু প্লটও ঠিক একই কারণে হয়ে উঠেছে বক্তব্যপ্রধান। তবে ডিটেলসে তাঁর অত্যাগ্রহ যে অমূলক নয়, সেটা কিন্তু মাঝেমাঝেই বিমূর্ত হয়ে উঠেছে, ঝিলিক দিয়ে উঠেছে-
গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে, জন্ডিস রোগীর মতো ফ্যাকাশে, ক্রমাগত নিঃশোষিত হয়ে আসতে থাকা বনতুলসী, চিচ্চিড়ে, আশ শ্যাওড়া বন আর পিঙ্গল ঘাসের গায়ে লেপ্টে থাকা প্রায় ফুরিয়ে আসা দুপুর যেন থমকে আছে, গাছের পাতা নড়ে না, তামাটে রং এর উপুড় হয়ে থাকা বিশাল সরার মতো আকাশের নীচে শেষ অক্টোবরের পৃথিবী যেন চুপ করে আছে।
কিছু কিছু গল্পে পরাবাস্তবতার ছাঁচে ঢেলে তিনি নিরীক্ষা করতে চেয়েছেন, “যাত্রী” গল্পের মত। নিঃসঙ্গতার বীভৎস রুপ এই গল্পে প্রকট হয়ে উঠেছে, আর কেন জানি মনে হয়েছে, এই নিঃসঙ্গতাটুকু লেখক বোধকরি প্রশ্রয়ই দেন, একে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন, এর নির্যাসটুকু আহরণ করেন যতনভরে। বন্দী দুঃসময় ঠিক এই ধাঁচের আরেকটি গল্প, ক্লিশে প্রাত্যহিকতায় খাবি খেতে থাকা একজন মানুষ চেনা গন্ডিতে ঘুরপাক খেতে থাকে অবিরত, সে পালাতে চায় কিন্তু সে পথের দিশা তার মেলেনা। এদিক দিয়ে বরং অন্ধ তীরন্দাজ ও সম্পর্ক গল্পে এসে লেখক অনেকটাই থিতু হয়েছেন, ডানা মেলা ভাবনাগুলোর রাশ সময়মাফিক টেনে ধরেছেন। চরিত্রগুলো এই দুটি গল্পে ন্যায্য বিকাশ পেয়েছে, অনাবশ্যক ডিটেইলে গল্প ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েনি।"অন্ধ তীরন্দাজ" গল্পে একদল বেদিশা যুবকের ছাইচাপা হতাশা, বা "সম্পর্ক" গল্পে দুই বন্ধুর পুনর্মিলনীর পরবর্তী ধেয়ে আসা বাস্তবতা নির্মাণে লেখক অনেকটাই সংযত, বরং বলা ভাল অনেকটাই সফল। অথচ দৃশ্যকল্পের প্রতি স্বভাবজাত মুগ্ধতার আঁচ এখানেও পাওয়া যায়, কিন্তু কখনোই তা বেসুরো হয়ে উঠেনা, বরং কায়েস আহমেদকে ঘিরে মনোযোগী পাঠকের প্রত্যাশার পারদ ক্রমেই চড়তে থাকে।
ভাবুন একটা সাগরের মাছের কথা, যে লাফ দিতে গিয়ে পানি থেকে অনেক উপরে উঠে পড়ে প্রথম সূর্যের তীব্র আলো দেখে ফেলে, কিন্তু যান্ত্রিক নৌকার প্রোপেলারে ধাক্কা লেগে তার নিজের পাখনা ভেঙ্গে যায়। এখন সে তলিয়ে যাচ্ছে সাগরের অতলে। আস্তে করে উপরের ফেলে আসা আলোটুক মিলিয়ে যাচ্ছে। আলোর গোলক ছোট হতে থাকছে আর শীতল অন্ধকার চারপাশে চাঁদরের মত জড়িয়ে ধরছে আপনাকে, আপনিই মাছটা। তলিয়ে যাচ্ছেন, অন্ধকারে। তলিয়ে যাচ্ছেন অতলে। অন্ধকারে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে আপনার, সময় যেতে যেতে যখন ভাবলেন অন্ধ হয়ে গেছেন, তখনই পাতালে দেখলেন হঠাত একটা জ্বলজ্বলে গাছ। উজ্জ্বল নীলচে তেজস্ক্রিয় সবুজ। আপনি কি সেদিক যাবেন? ভাবছেন। কিন্তু বেশি ভাবতে পারছেন না। আপনি তো মাছ।
এসব মনে হয় কায়েস আহমেদ এর লেখা পড়লে।
বইয়ের সব চরিত্রই কাল্পনিক। তবু এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অস্বীকার করতে পারেন না আপনি। এমনকি নিজের জীবনের ছায়াটিরও হয়তো দেখা মিলবে এই মানুষগুলোর মধ্যে। প্রাত্যহিক অনাড়ম্বর ভাষায় এমন সব কাহিনি, যার আপাত সরল চেহারার আড়ালে আছে বহুস্তরে সজ্জিত এক একটি ভাবনার জগৎ।
তাত্ত্বিক আলাপে লেখার মান কেমন, সেই আলাপে যাবো না। আবার জোর করে কাউকে বইটা পড়তে বলছিনা। এমন না যে আমি আপনি বইটা না কিনলে লেখকের অনেক আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। পড়ে দেখতে পারেন, হয়ত ভাল লাগবে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রবন্ধ থেকে যে কয়জন লেখকদের সম্পর্কে জানতে পারি, কায়েস আহমেদ তাদের মাঝে একজন। মূলত তার সম্পর্কে করা উচ্ছ্বসিত প্রশংসার কারণেই আগ্রহ জন্মে লেখনীর সাথে পরিচিত হতে। বইটির শুরু হয়েছে গল্পগ্রন্থ অন্ধ তীরন্দাজ দিয়ে। এর গল্পগুলো কেমন যেনো, অদ্ভুত-বিষন্ন-ছন্নছাড়া। এরপর রয়েছে নির্বাসিত একজন উপন্যাস। স্বল্প পরিসরের এই উপন্যাসের বিস্তৃতি খোকার শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত। কিন্তু এর যাত্রাপথও মসৃণ নয় বলেই মনে হয়েছে। নাম-উপন্যাসের সাথে রয়েছে একটি ছোট গল্প, যেটি নির্দেশ করে দেশের অস্থিরতাকে। লাশকাটা ঘর গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো যেন অনেকটাই পরিণত। প্রথম গল্প 'পরাণ' পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিলো এটা অনায়াসে উপন্যাসে রূপ নিতে পারতো। 'মহাকালের খাঁড়া' গল্পে অসাধু ব্যবসায়ী ভরত কোলের এবং তার লম্পট ছেলের ওপর ঘৃণা যতোটা না হয়, ভরত কোলের জন্যে মায়া হয় তার চেয়ে কিঞ্চিত বেশি। 'দুই গায়কের গল্প' পড়তে গিয়ে ভ্রম হয়, এগুলো কি গল্প? নাকি চলমান একটি উপন্যাসের বিভিন্ন অধ্যায়! চরিত্র ও ঘটনাবলি অবাধে বিচরণ করে চলেছে এ গল্প থেকে সে গল্পে। নামগল্পটি নিত্যকার কলহ-জীবন-যাপনে যে সবাই লাশকাটা ঘরেরই বাসিন্দা তারই প্রকাশ। 'গগনের চিকিৎসা তৎপরতা' গল্পে আমরা দেখা পাই গগনের, যে কিনা চাঁদের ঘা সারিয়ে তুলতে চায়। 'মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটে ও মালপদিয়ার রমণী মুখুজ্জে' কি গল্প না স্মৃতিচারণ তা ধোঁয়াশা হয়ে আচ্ছন্ন করে রাখে। কখনো কখনো যে নিজদেশেই পরবাসী হয়ে থাকতে হয়, তা কেউ বরণ করে নেয় আবার কেউবা যে তা থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়; তারই প্রকাশ এতে। 'নচিকেতাগণ'-র পটভূমি ১৯৭১, অন্যান্য গল্পের তুলনায় স্বল্প পরিসরের হলেও আঘাত হানে হৃদয়ের অনেক গভীরে। 'নিরাশ্রিত অগ্নি' এবং 'ফজর আলীর গল্প' এ দুটি হুবহু একই গল্প। এ কি ছাপাখানার ভূতের কাজ, না লেখকেরই রসিকতা কে জানে! 'লাশকাটা ঘর'এর চরিত্র এবং কাহিনী ফিরে আসে দিনযাপন উপন্যাসে।
মোটের ওপরে আমার কাছে মোটামুটিই লেগেছে। বড্ড যেনো আগোছালো প্রতিনিয়তই যে নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে যাবার প্রয়াস সেকারণেই মনে হয়।