"আমাদের এদিকটায় বিশেষত শীতের মরশুমে যখন ধরাতলে একদল হা ঘরে যাযাবর নারী-পুরুষ তাদের বাচ্চাকাচ্চাসহ ছেঁড়া-ফাটা তাপ্পি-মারা ঘাগরা-চুড়িদার কাছা-মারা-ধুতি, ইত্যাদি জামাকাপড়ে সজ্জিত হয়ে গাধা-ঘোড়া-মেনি বাঁদর-নাকে দড়ি বাঁধা ভালুক-কথা বলা কাকাতুয়া নিয়ে গ্রামের ধারে কোথাও হাটচালায় কী গাছতলায় তাঁবু গাড়ে, তখনই—ঠিক তখনই, মাথার উপরে ‘মেঘপাতাল’এ উদয়াচল কি দিকচক্রবালে একদঙ্গল ‘কারিকুরি’ পাখিরা কখনও বৃত্তাকারে কখনবা অর্ধচন্দ্রাকারে কখনও এক সরলরেখায় কারিকুরি বা কারুকার্য করতে করতে, আঁকতে আঁকতে উড়ে আসে। ‘কারিকুরি’–বলা যেতেই পারে কালোকুলো।" এই সমস্ত পরিযায়ী পাখিদের আসা-যাওয়ার নিদাঘ কালে আবর্তিত এক কিশোরের চোখে দেখা কালোকুলো জনপদ-জীবন- -আখ্যান ‘উড়ে যায় কারিকুরি পাখিরা'।
নলিনী বেরার জন্ম পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গোপীবল্লভপুরের নিকট বাছুরখোয়াড় গ্রামে। ছোটবেলা থেকে দারিদ্রের সাথে লড়াই করে পড়াশোনা করেছেন তিনি। তাঁর শিক্ষা সম্পন্ন হয় মেদিনীপুর কলেজে ও পরে নকশাল আন্দোলনের কারণে ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে। ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের আধিকারিক হিসাবে চাকরিতে ঢোকেন।
কবিতা লেখা দিয়ে তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু। ১৯৭৯ সালে নলিনী বেরার প্রথম গল্প 'বাবার চিঠি' দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি পল্লীপ্রকৃতি নিয়ে সমাজসচেতন সাহিত্যরচনায় পারদর্শী। তাঁর উপন্যাসগুলি হল শবরচরিত, কুসুমতলা, ফুলকুসমা, দুই ভুবন, চোদ্দ মাদল, ইরিনা এবং সুধন্যরা, এই এই লোকগুলো, শশধর পুরাণ ইত্যাদি। চার দশকের সাহিত্যচর্চায় অজস্র ছোটোগল্প ও উপন্যাস লিখেছেন।
২০০৮ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান নলিনী বেরা তাঁর শবরচরিত উপন্যাসের জন্য। সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা উপন্যাসের জন্য ১৪২৫ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি। পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্ত ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা ছাত্রা ছাত্রীদের জন্য দান করেন এই সাহিত্যিক।
সুবর্ণরেখার তীরবর্তী গ্রাম। অজলা, ঊষর ও জঙ্গলময়। এখানে ধোয়া ধোয়া ময়লাটে চাঁদ ওঠে। এখানে নামে কাঁকরবর্ষী বাউড়ি বা হিমরাত। ধবো ধবো জ্যোৎস্না। তার উপর কুহড়া বা কুয়াশা।এখানে বাস করে নানা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। এখানে বুনো ভেড়ার পাল হঠাৎ চলে আসে দুর্গম পথ বেয়ে।যুদ্ধবাজ মোরগদের লড়াই দেখতে উদগ্রীব হয়ে থাকে মানুষ।শীতকালে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে কারিকুরি পাখি। যাত্রাপালা হয়। যাত্রা দেখার টাকা নেই তো কি হয়েছে? প্যান্ডেলের বাইরে একের পিঠে এক, তার পিঠে আরেক, এভাবে চড়ে চড়ে সবার উপরের জন যাত্রা দ্যাখে। কিছুক্ষণ পর সে নিচে নামে,তার পরেরজন সুযোগ পায় দেখার। এরা চ্যাঙনা ম্যাঙনা,রুন্ডু উরুন্ডুর দল। পর্দায় সাপ দেখে চিৎকার করে ভয়ে বেরিয়ে আসে মা। এসে গাড়ির সব খড় ফেলে দেয়।এতোগুলো সাপের দু একটা যদি এখানেও থাকে! ব্রাহ্মণের উচ্ছিষ্ট খাওয়ার জন্য হামলে পড়ে মানুষ। কাঁধে ঝোলা হাতে দরিদ্র এক পথিক লেখকের চোখে হয়ে যায় হিউয়েন সাঙ। নিশীথে ভয়াল হিম ধরানো গলায় কারা যেন ডাকে, তাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গরুর টাটকা গোবর দিয়ে ত্রিমূর্তি তৈরি করা হয়। ঘরের গরু দড়ি-বাঁধা অবস্থায় মারা গেছে। গৃহকর্তার গলায় 'পাঁঘা"; সে খড় চিবুচ্ছে আর "হাম্বা হাম্বা" বলে ভিক্ষা করছে; এটাই প্রায়শ্চিত্ত করার নিয়ম। মেয়ের বিয়ের জন্য নিজেদের ছাগল বেচতে হয়, বেচতে হয় সাড়ে তিনকাঠা জমি, নিঃশব্দে কাঁদে মা। দরিদ্র জনপদেও উৎসব আসে। তখন প্রতিটা ঘরের নাচদুয়ারে ঝকঝকে কাঁসার থালায় প্রদীপ আর জল ধোয়া কুরচির মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অনূঢ়া যুবতী আর কিশোরী বালিকারা। "সেদেশে বার মাসে তের পরব। কী নেই? রোহিণ’ ‘গাজন’ ‘আগুন-মাড়া’ ‘জিভ-ফোঁড়া’ পিঠ-ফোঁড়া’, ‘ঝুলন’ ‘গম্হা’ চিত’ ঈদ’ ‘করম' ‘ভাদু’ ‘দাঁশাই’ ‘পাতা-বিধার মেলা' ‘বাঁধনা' ‘সহরায়’ ‘মকর’ ‘মকরযাত’ ‘বালিযাত’ ‘এরিকসিম্’ ‘হারিয়ারসিম্’ ‘সারহুল’ ‘দিশমসেঁদ্রা’।
যে গল্পগুলো আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছয় না তা নিবিড় নিষ্ঠায় তুলে ধরেছেন নলিনী বেরা। তুলে ধরেছেন নিজের বেড়ে ওঠার সময়কে। এ এক আশ্চর্য জীবন ও জনপদের গল্প।