What do you think?


তিতুমীর
কেল্লার দেয়ালে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে তিতুমীর। বুকের বাম দিকে লেগেছে গোলার একটা অংশ। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। থেমে গেছে গোলাগুলি। শুরু হবার আগেই শেষ হয়ে গেছে যুদ্ধ। তার পাশে এনে শোয়ানো হয়েছে ছোট ছেলে গওহরকে। কথা রেখেছে গওহর। বুকের পাশেই বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল। একই গোলার আঘাতে ডান পায়ের নীচের অংশ উড়ে গেছে তার। একজন কেউ কাপড় দিয়ে বেঁধে দিয়েছে পাটা। দাঁতে দাঁত চেপে আছে। কষ্ট লুকাতে মুখটা হাসি হাসি। বুঝি বাবাকে সাহস দিতে চাইছে। অনেকগুলো মুখ তাকে ঘিরে বসে আছে। অনেক দিনের, অনেক পরিচিত, অনেক প্রিয় সেসব মুখ। সেই সব মুখের মাঝে জওহর ও তোরাবের মুখ খোঁজে তিতুমীর। দেখতে পায় না। কোথায় তারা? বেঁচে আছে নাকি শহীদ হয়েছে? চলে যাবার আগে তার খুব জানতে ইচ্ছে করে। জিজ্ঞেস করতে যায়, গলা দিয়ে একটা ঘড়ঘড় আওয়াজ বের হয়, কোনো কথা বের হয় না। দাদীজানের, আম্মাজানের মুখটা মনে পড়ে, তাঁদের মুখটা শেষ বারের মতো দেখা হলো না। ময়মুনার কথা মনে পড়ে। জীবনে প্রথম বারের মতো তাকে বলতে চেয়েছিল, ময়মুনা, তোমাকে খুব ভালবাসি, বলা হলো না!
240 pages, Hardcover
Published February 1, 2021
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 4 of 4 reviews
February 2, 2025
পলাশীর প্রান্তরে ডুবেছিল বাংলার স্বাধীনতার শেষ সূর্য। এর পরপর-ই সব বদলে গিয়েছিল। মুসলিম ছায়াতলে যে দেশ শাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ ছিল, সেই মুসলিম জাতিই এরপর থেকে নিপীড়িত, নির্যাতিত। এ তো স্বাভাবিক বিষয়, মুসলমানদের ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা শত্রু মনে করত। কেননা সুযোগ পেলে নিজেদের সাম্রাজ্য কে না ফিরে পেতে চায়?
ফলে ইংরেজরা শাসনের নামে হিন্দু জমিদারদের এক অসীম ক্ষমতা সমর্পণ করে। তার চাপ পরে প্রজাদের উপর। জমিদারদের বাড়ি উঠবে, কর দাও। জমিদারদের ঘরে উৎসব, কর দাও। পুজো-অর্চনা হবে, কর দাও। করে বোঝায় নিষ্পেষিত হয়ে যাওয়া প্রজাদের জীবন বলে কিছু থাকে। সাথে নীলকরদের দৌরাত্ম্য। নীল চাষের নামে চাষিদের জীবন যেভাবে নিঃশেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে, এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। নানান নিয়মের বেড়াজালে সবকিছুই শেষ হতে চলেছে। সূর্যাস্ত আইনের মতো আইন জমিদারদের গলার কাঁটা হয়ে বিঁধেছে। যার শোধ প্রজাদের রক্ত জল করা পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে উশুল করে।
ফকির বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ফকির-সন্ন্যাসীরা লড়াই চালিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয় না। ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করার সাহস তো আছে, কিন্তু বিজয়ের ওই ঝান্ডা ওড়ানোর মতো সক্ষমতা কি আছে?
এমনই এক উত্তাল সময়েই জন্ম নেয় মীর নিসার আলী। ছোটবেলা থেকেই যে প্রচুর তিতা খেতে পারত। দাদীর আদরের তিতা মিয়া সময়ের বেড়াজালে ধীরে ধীরে হওয়া ওঠে তিতুমীর। ইসলামের শাসন কায়েম করার নিমিত্তে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেষ্টায়, প্রতিবাদের ভাষা প্রতিষ্ঠায়, মানুষের ভরসার এক নাম হয়ে ওঠে তিতুমীর।
এ যাত্রাটা মসৃণ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে তিতুমীর লাঠি খেলায় পারদর্শী ছিল। মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছোটকাল থেকেই। সবার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তিতুমীর ও তার দল। এই তিতুমীরের দিকে যেন খোদ আল্লাহ হাত বাড়িয়ে দেন। তাই হাফেজ নেয়ামত উল্লাহ নামের এক সুফি দরবেশের আবির্ভাব হয় গ্রামে। যাঁর ছায়াতলে কোরআনে হাফেজ হয়, কুস্তিতে পারদর্শী হয়।
তিতুমীরদের জন্ম হয় স্থির থাকার জন্য নয়। কুস্তিতে তার নাম ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না। তাই নজরেও আসে অনেকের। কিন্তু আত্মসম্মানে বলীয়ান তিতু নিজেকে বিকোয় না। একসময় ডানপিটে তিতুমীর হয়ে ওঠে সংসারী। সময়ের বহমান যাত্রায় কোনো এক অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেল খাটতে হয়। সেখানেই দিশা পায় নতুন কর্মপন্থার। হাজি হয়ে ওঠা তিতুমীর আল্লাহর পথে জি হা দের প্রস্তুতি নেয়।
দ্বীনে মোহাম্মদিয়া কায়েম করার চেষ্টায় রত তিতুমীর ও তার অনুসারীদের কর্ম ভালো লাগে না ধর্ম ব্যবসায়ীদের। যুগে যুগে যেকোনো ধর্মেই ধর্ম ব্যবসা লক্ষ্য করা যায়। তিতুমীরের ভাষ্য, কোনো পীরকে অর্থের যোগান দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যায় না। কুসংস্কারমুক্ত ইসলামী ধারণার প্রবর্তন করতে মরিয়া।ফলে ধর্ম ব্যবসায়ীদের আতে ঘা লাগে। তিতুমীরের কর্ম ভালো লাগে না হিন্দু জমিদারদের। ফলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। আর এই যুদ্ধের নিমিত্তেই তৈরি হয় বাঁশের কেল্লা। যেখানেই এক অসীম সাহস বুক চিতিয়ে লড়াই করবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে চোখ রাঙাতে, প্রতিবাদের ভাষায় হার না মানা এক গল্প লিখবে। এরপর?
“তিতুমীর” উপন্যাসটা বীর সেনানী তিতুমীরকে উপজীব্য করে রচিত। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কথা এলেই যে কয়জন বিপ্লবী, বিদ্রোহীর নাম উঠে আসে; বেশিরভাগই অন্য ধর্মাবলম্বী। এখানে ফরায়েজী আন্দোলন, ফকির বিদ্রোহ কিংবা তিতুমীরের কথা অনেকটাই চাপা পড়ে যায়। অথচ ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকেই মুসলিমরাই এই অনাচারের প্রতিবাদ করে এসেছে। লেখক আফতাব আলম যে সেই চাপা পড়ে যাওয়া গল্পকেই একটুখানি তুলে এনেছেন।
সেই সময়ের সামাজিক রূপরেখা লেখক খুব সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। বইটিতে উঠে এসেছে প্রজাদের দুর্দশার কথা, জমিদারদের দৌরাত্ম্য। নীলকরদের কথা ছিল, ছিল ব্রিটিশ কোম্পানির শাসনের খণ্ডচিত্র। ইংরেজরা যেভাবে জমিদারদের ক্ষমতা দিয়েছিল, এই প্রহসন দুই ধর্মের বিভেদকে আরও বিভক্ত করেছে। যদিও প্রজাদের মধ্যে সেই বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেনি। দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা ছিল সর্বত্র, কিন্তু তিতুমীরের বিচক্ষণতা সেই চেষ্টাকে সফল হতে দেয়নি।
সেই সময়ে সুশাসন বলতে কিছু ছিল না। ক্ষমতাধরদের হাতে জিম্মি ছিল আইন কানুন। মজলুমদের জন্য কখনোই আইন সঠিক পথে হাঁটেনি। যারা ক্ষমতা, অর্থের প্রতিপত্তিতে আয়েশ করেছে— তারাই এই আইনকে নিজেদের সুবিধার্থে পরিচালিত করেছে। ফলে অত্যাচারিত হয়েই তিতুমীর বাহিনীর সঠিক বিচার পাওয়া হয়নি। একটি ন্যায় বিচারের অভাবে সবকিছু কেমন বদলে গেল। আন্দোলন হয়তো এখানেই বেগবান হয়েছে। সেই সাথে সেই সময়ের রাজনৈতিক বিষয়ের দিকেও লেখক আলোকপাত করেছেন। ইসলামী একাধিক বিদ্রোহ, শাসনের নামে ইংরেজদের শোষণ এখানে আলোচ্য বিষয়।
আগেই বলেছি, সেই সময়ের জমিদারদের ধর্মীয় দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা চালিয়েছে। এক সাথে হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি জীবনযাপন করে, তাদেরকেই উস্কে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। মসজিদ পোড়ানো যেন সেই উস্কানির বহিঃপ্রকাশ। এর বিপরীতে তিতুমীর চাইলে অনেক কিছুই করতে পারত; কিন্তু শান্ত, ধীরস্থির তিতুমীর সুদূরপ্রসারী ভাবনা দিয়ে কঠিন সময়গুলো প্রতিহত করেছে। ধর্মীয় ভিন্নতা মানুষের মধ্যে সবসময় বিভেদ করে না। আপোষহীন সত্তায় কেউ কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তলে। স্বজাতি বলে কিছু হয় না এখানে। অন্যায় যে করে সে-ই অপরাধী। ভিন্ন ধর্মের কেউ যেমন শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারে, নিজ ধর্মের মানুষও বিশ্বাসঘাতক হয়। সবকিছুই মননের উপর নির্ভরশীল।
কথিত আছে, একজন পুরুষের সাফল্যের পেছনে একজন নারীর হাত থাকে। তিতুমীরের গল্পেও এমন একজন ছিল। একজন ময়মুনা হয়তো ইতিহাসে জায়গা পায় না, কিন্তু শেষ সময় পর্যন্ত তিতুমীরের মনে থেকে যায়। তিতুমীরের স্ত্রী হয়ে যখন ময়মুনা আসে, তখন সে নিতান্তই কিশোরী। সেই সময় থেকে তিতুমীরের ছায়া হয়ে উঠেছিল। স্বামীকে কখনও সঠিকভাবে নিজের করে পায়নি। তিতুমীর সবসময় ছুটেছেন। তারপরও আস্থা হারাননি, ভরসা হারাননি। সবসময় স্ত্রীর সহযোগিতা পেয়েছেন। এমন স্ত্রী ছিলেন বলেই হয়তো তিতুমীর আল্লাহর পথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। যিনি স্বামী, সন্তানকে আল্লাহর পথে জেহাদের অনুমতি দিয়েছেন। এমন মহীয়সী নারী ইতিহাসে না থাকলেও ইতিহাস গড়ার কারিগর হিসেবে মনে ঠিকই জায়গা করে নেয়।
আফতাব হোসেনের লেখনশৈলী ভালো। তবে কাহিনি কিছুটা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটছিল বলে কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে। যদিও ভাষাগত দিক দিয়ে লেখায় তৃপ্তি পেয়েছি। তবে আরো কিছুটা বিস্তৃত কলেবর হতে পারত। তবে ইতিহাসের গল্পে তিনি ছাড় দেননি। তিতুমীর সম্পর্কে সংক্ষিপ্তরূপে জন্যে বইটি পড়ে নেওয়াই যায়।
পরিশেষে, যুদ্ধ যখন চারিদিক থেকে অশনি সংকেত দেয়; তখন নির্ভার থাকার উপায় নেই। একটুখানি অসতর্কতা অনেক বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। শত্রুপক্ষ সবসময় ওঁৎ পেতে থাকে। আর সুযোগের অপেক্ষা করে। নিঃশ্বাসের যে বিশ্বাস নেই। এক মুহূর্তের বিষয়, তারপর?
◾বই : তিতুমীর
◾লেখক : আফতাব হোসেন
◾প্রকাশনী : ঐতিহ্য
◾ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
ফলে ইংরেজরা শাসনের নামে হিন্দু জমিদারদের এক অসীম ক্ষমতা সমর্পণ করে। তার চাপ পরে প্রজাদের উপর। জমিদারদের বাড়ি উঠবে, কর দাও। জমিদারদের ঘরে উৎসব, কর দাও। পুজো-অর্চনা হবে, কর দাও। করে বোঝায় নিষ্পেষিত হয়ে যাওয়া প্রজাদের জীবন বলে কিছু থাকে। সাথে নীলকরদের দৌরাত্ম্য। নীল চাষের নামে চাষিদের জীবন যেভাবে নিঃশেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে, এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। নানান নিয়মের বেড়াজালে সবকিছুই শেষ হতে চলেছে। সূর্যাস্ত আইনের মতো আইন জমিদারদের গলার কাঁটা হয়ে বিঁধেছে। যার শোধ প্রজাদের রক্ত জল করা পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে উশুল করে।
ফকির বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ফকির-সন্ন্যাসীরা লড়াই চালিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয় না। ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করার সাহস তো আছে, কিন্তু বিজয়ের ওই ঝান্ডা ওড়ানোর মতো সক্ষমতা কি আছে?
এমনই এক উত্তাল সময়েই জন্ম নেয় মীর নিসার আলী। ছোটবেলা থেকেই যে প্রচুর তিতা খেতে পারত। দাদীর আদরের তিতা মিয়া সময়ের বেড়াজালে ধীরে ধীরে হওয়া ওঠে তিতুমীর। ইসলামের শাসন কায়েম করার নিমিত্তে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেষ্টায়, প্রতিবাদের ভাষা প্রতিষ্ঠায়, মানুষের ভরসার এক নাম হয়ে ওঠে তিতুমীর।
এ যাত্রাটা মসৃণ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে তিতুমীর লাঠি খেলায় পারদর্শী ছিল। মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছোটকাল থেকেই। সবার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তিতুমীর ও তার দল। এই তিতুমীরের দিকে যেন খোদ আল্লাহ হাত বাড়িয়ে দেন। তাই হাফেজ নেয়ামত উল্লাহ নামের এক সুফি দরবেশের আবির্ভাব হয় গ্রামে। যাঁর ছায়াতলে কোরআনে হাফেজ হয়, কুস্তিতে পারদর্শী হয়।
তিতুমীরদের জন্ম হয় স্থির থাকার জন্য নয়। কুস্তিতে তার নাম ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না। তাই নজরেও আসে অনেকের। কিন্তু আত্মসম্মানে বলীয়ান তিতু নিজেকে বিকোয় না। একসময় ডানপিটে তিতুমীর হয়ে ওঠে সংসারী। সময়ের বহমান যাত্রায় কোনো এক অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেল খাটতে হয়। সেখানেই দিশা পায় নতুন কর্মপন্থার। হাজি হয়ে ওঠা তিতুমীর আল্লাহর পথে জি হা দের প্রস্তুতি নেয়।
দ্বীনে মোহাম্মদিয়া কায়েম করার চেষ্টায় রত তিতুমীর ও তার অনুসারীদের কর্ম ভালো লাগে না ধর্ম ব্যবসায়ীদের। যুগে যুগে যেকোনো ধর্মেই ধর্ম ব্যবসা লক্ষ্য করা যায়। তিতুমীরের ভাষ্য, কোনো পীরকে অর্থের যোগান দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যায় না। কুসংস্কারমুক্ত ইসলামী ধারণার প্রবর্তন করতে মরিয়া।ফলে ধর্ম ব্যবসায়ীদের আতে ঘা লাগে। তিতুমীরের কর্ম ভালো লাগে না হিন্দু জমিদারদের। ফলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। আর এই যুদ্ধের নিমিত্তেই তৈরি হয় বাঁশের কেল্লা। যেখানেই এক অসীম সাহস বুক চিতিয়ে লড়াই করবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে চোখ রাঙাতে, প্রতিবাদের ভাষায় হার না মানা এক গল্প লিখবে। এরপর?
“তিতুমীর” উপন্যাসটা বীর সেনানী তিতুমীরকে উপজীব্য করে রচিত। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কথা এলেই যে কয়জন বিপ্লবী, বিদ্রোহীর নাম উঠে আসে; বেশিরভাগই অন্য ধর্মাবলম্বী। এখানে ফরায়েজী আন্দোলন, ফকির বিদ্রোহ কিংবা তিতুমীরের কথা অনেকটাই চাপা পড়ে যায়। অথচ ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকেই মুসলিমরাই এই অনাচারের প্রতিবাদ করে এসেছে। লেখক আফতাব আলম যে সেই চাপা পড়ে যাওয়া গল্পকেই একটুখানি তুলে এনেছেন।
সেই সময়ের সামাজিক রূপরেখা লেখক খুব সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। বইটিতে উঠে এসেছে প্রজাদের দুর্দশার কথা, জমিদারদের দৌরাত্ম্য। নীলকরদের কথা ছিল, ছিল ব্রিটিশ কোম্পানির শাসনের খণ্ডচিত্র। ইংরেজরা যেভাবে জমিদারদের ক্ষমতা দিয়েছিল, এই প্রহসন দুই ধর্মের বিভেদকে আরও বিভক্ত করেছে। যদিও প্রজাদের মধ্যে সেই বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেনি। দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা ছিল সর্বত্র, কিন্তু তিতুমীরের বিচক্ষণতা সেই চেষ্টাকে সফল হতে দেয়নি।
সেই সময়ে সুশাসন বলতে কিছু ছিল না। ক্ষমতাধরদের হাতে জিম্মি ছিল আইন কানুন। মজলুমদের জন্য কখনোই আইন সঠিক পথে হাঁটেনি। যারা ক্ষমতা, অর্থের প্রতিপত্তিতে আয়েশ করেছে— তারাই এই আইনকে নিজেদের সুবিধার্থে পরিচালিত করেছে। ফলে অত্যাচারিত হয়েই তিতুমীর বাহিনীর সঠিক বিচার পাওয়া হয়নি। একটি ন্যায় বিচারের অভাবে সবকিছু কেমন বদলে গেল। আন্দোলন হয়তো এখানেই বেগবান হয়েছে। সেই সাথে সেই সময়ের রাজনৈতিক বিষয়ের দিকেও লেখক আলোকপাত করেছেন। ইসলামী একাধিক বিদ্রোহ, শাসনের নামে ইংরেজদের শোষণ এখানে আলোচ্য বিষয়।
আগেই বলেছি, সেই সময়ের জমিদারদের ধর্মীয় দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা চালিয়েছে। এক সাথে হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি জীবনযাপন করে, তাদেরকেই উস্কে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। মসজিদ পোড়ানো যেন সেই উস্কানির বহিঃপ্রকাশ। এর বিপরীতে তিতুমীর চাইলে অনেক কিছুই করতে পারত; কিন্তু শান্ত, ধীরস্থির তিতুমীর সুদূরপ্রসারী ভাবনা দিয়ে কঠিন সময়গুলো প্রতিহত করেছে। ধর্মীয় ভিন্নতা মানুষের মধ্যে সবসময় বিভেদ করে না। আপোষহীন সত্তায় কেউ কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তলে। স্বজাতি বলে কিছু হয় না এখানে। অন্যায় যে করে সে-ই অপরাধী। ভিন্ন ধর্মের কেউ যেমন শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারে, নিজ ধর্মের মানুষও বিশ্বাসঘাতক হয়। সবকিছুই মননের উপর নির্ভরশীল।
কথিত আছে, একজন পুরুষের সাফল্যের পেছনে একজন নারীর হাত থাকে। তিতুমীরের গল্পেও এমন একজন ছিল। একজন ময়মুনা হয়তো ইতিহাসে জায়গা পায় না, কিন্তু শেষ সময় পর্যন্ত তিতুমীরের মনে থেকে যায়। তিতুমীরের স্ত্রী হয়ে যখন ময়মুনা আসে, তখন সে নিতান্তই কিশোরী। সেই সময় থেকে তিতুমীরের ছায়া হয়ে উঠেছিল। স্বামীকে কখনও সঠিকভাবে নিজের করে পায়নি। তিতুমীর সবসময় ছুটেছেন। তারপরও আস্থা হারাননি, ভরসা হারাননি। সবসময় স্ত্রীর সহযোগিতা পেয়েছেন। এমন স্ত্রী ছিলেন বলেই হয়তো তিতুমীর আল্লাহর পথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। যিনি স্বামী, সন্তানকে আল্লাহর পথে জেহাদের অনুমতি দিয়েছেন। এমন মহীয়সী নারী ইতিহাসে না থাকলেও ইতিহাস গড়ার কারিগর হিসেবে মনে ঠিকই জায়গা করে নেয়।
আফতাব হোসেনের লেখনশৈলী ভালো। তবে কাহিনি কিছুটা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটছিল বলে কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে। যদিও ভাষাগত দিক দিয়ে লেখায় তৃপ্তি পেয়েছি। তবে আরো কিছুটা বিস্তৃত কলেবর হতে পারত। তবে ইতিহাসের গল্পে তিনি ছাড় দেননি। তিতুমীর সম্পর্কে সংক্ষিপ্তরূপে জন্যে বইটি পড়ে নেওয়াই যায়।
পরিশেষে, যুদ্ধ যখন চারিদিক থেকে অশনি সংকেত দেয়; তখন নির্ভার থাকার উপায় নেই। একটুখানি অসতর্কতা অনেক বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। শত্রুপক্ষ সবসময় ওঁৎ পেতে থাকে। আর সুযোগের অপেক্ষা করে। নিঃশ্বাসের যে বিশ্বাস নেই। এক মুহূর্তের বিষয়, তারপর?
◾বই : তিতুমীর
◾লেখক : আফতাব হোসেন
◾প্রকাশনী : ঐতিহ্য
◾ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
January 31, 2026
Rating : 4.5/5
➤ তিতুমীর :
পাঠ্যপুস্তকে হালকা করে নাম শুনলেও বাংলার এই মহান বীর সম্পর্কে বিস্তারিত কোথাও পড়িনি। লেখকের মতে– এটা ইতিহাসের কোনো বই নয়, ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস মাত্র। তারপরও জানার পরিধি আগে থেকে বেড়েছে। সত্যি বলতে তিতুমীর কে নিয়ে আগে কখনো ঘেটেও দেখা হয়নি (বলতে আফসোস লাগছে)।
সেদিক বিবেচনায় বইটা কাজে দিয়েছে। একটা ধারণা গড়ে উঠেছে নিজের ভেতর। সামনে ইন শাআল্লাহ বিস্তারিত জানার ইচ্ছে আছে। বইয়ের ভাষাগত দিকের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ২৪০ পেইজের এক বই একটানে ( কিছুক্ষণ পড়ে বিরতি দিয়েছি অবশ্যই) শেষ করেছি একপ্রকার বলা চলে। ভাষা, কাহিনি সবই ছিলো দারুণ টানটান। বিরক্তবোধ হয়নি পড়তে গিয়ে, আলহামদুলিল্লাহ।
যারা উপন্যাস পড়তে চান (অবশ্যই হিস্টোরিকাল জনরায় ) , তারা 'তিতুমীর' চেখে দেখতে পারেন। আশা করি খারাপ লাগবেনা। সবশেষে ধন্যবাদ, Mosharrof Shihab কে। বইটা পড়তে দিয়ে বাধিত করেছে বলে। আর সাথে বন্ধু 'মুক্তাদির' কে, বইটা সম্পর্কে সেই ১ম জানিয়েছে ও পড়তে বলেছে।
➤ তিতুমীর :
পাঠ্যপুস্তকে হালকা করে নাম শুনলেও বাংলার এই মহান বীর সম্পর্কে বিস্তারিত কোথাও পড়িনি। লেখকের মতে– এটা ইতিহাসের কোনো বই নয়, ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস মাত্র। তারপরও জানার পরিধি আগে থেকে বেড়েছে। সত্যি বলতে তিতুমীর কে নিয়ে আগে কখনো ঘেটেও দেখা হয়নি (বলতে আফসোস লাগছে)।
সেদিক বিবেচনায় বইটা কাজে দিয়েছে। একটা ধারণা গড়ে উঠেছে নিজের ভেতর। সামনে ইন শাআল্লাহ বিস্তারিত জানার ইচ্ছে আছে। বইয়ের ভাষাগত দিকের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ২৪০ পেইজের এক বই একটানে ( কিছুক্ষণ পড়ে বিরতি দিয়েছি অবশ্যই) শেষ করেছি একপ্রকার বলা চলে। ভাষা, কাহিনি সবই ছিলো দারুণ টানটান। বিরক্তবোধ হয়নি পড়তে গিয়ে, আলহামদুলিল্লাহ।
যারা উপন্যাস পড়তে চান (অবশ্যই হিস্টোরিকাল জনরায় ) , তারা 'তিতুমীর' চেখে দেখতে পারেন। আশা করি খারাপ লাগবেনা। সবশেষে ধন্যবাদ, Mosharrof Shihab কে। বইটা পড়তে দিয়ে বাধিত করেছে বলে। আর সাথে বন্ধু 'মুক্তাদির' কে, বইটা সম্পর্কে সেই ১ম জানিয়েছে ও পড়তে বলেছে।
April 4, 2025
লেখকের লেখনশৈলী,বাচনভঙ্গি এতো সাবলীল যে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে গেছি।
বইটি কিন্তু মোটেও ছোটো নয়।
তবে ২৪০ পৃষ্ঠার বইটি এতো দ্রুত কিভাবে শেষ করেছি তা নিজেও টের পাইনি!
বইটির রেশ অনেকদিন পর্যন্ত থেকে যাবে।
বিঃদ্রঃ এটি কোনো রিভিউ নয়। জাস্ট বইটি সম্পর্কে ভালো লাগা জানালাম ৪-৫ লাইনে।
রেকমেন্ডেড।✅
বইটি কিন্তু মোটেও ছোটো নয়।
তবে ২৪০ পৃষ্ঠার বইটি এতো দ্রুত কিভাবে শেষ করেছি তা নিজেও টের পাইনি!
বইটির রেশ অনেকদিন পর্যন্ত থেকে যাবে।
বিঃদ্রঃ এটি কোনো রিভিউ নয়। জাস্ট বইটি সম্পর্কে ভালো লাগা জানালাম ৪-৫ লাইনে।
রেকমেন্ডেড।✅
Read
June 14, 2023Didn't enjoy tbh. 😑
Displaying 1 - 4 of 4 reviews





