আবুল মনসুর আহমদ তাঁর লেখা এই আত্মজীবনীতে নিজের শৈশব, বাল্য বা কৈশাের, শিক্ষা, সাহিত্য, আইন পেশা ও সংসার জীবনের কথা লিখেছেন। তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের পটভূমিতে লেখা এই স্মৃতিচারণা পূর্ব বাঙলার মুসলমান মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশের ইতিহাসের মূল্যবান দলিল হয়ে উঠেছে। তাঁর আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর বইটির মতাে এ বইও পাঠককে আকৃষ্ট করবে। সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ে গবেষকদেরও কাজে লাগবে।
Abul Mansur Ahmed (Bangla: আবুল মনসুর আহমেদ) (1898–1979) was a Bangladeshi politician and journalist. His political career helped him writing political satire. He is the most famous political satirist in Bangla literature.
He was honored with Bangla Academy Award in 1960 and Swadhinota Dibosh Padak (Independence Day Medal) in 1979. Tahmima Anam is his granddaughter.
দীর্ঘদিন পর একটা আত্মজীবনী শেষ করে মনে হল নাহ,জীবনকথা লিখবার হলে এভাবেই লিখতে হয়, এমনতরভাবেই গোছাতে হয়। শুধু আমিত্বে আত্মের কথা বলা সম্পূর্ণ হয় না, আমরা'য় নিমজ্জিতে পূর্ণতা পায় আত্মকথা। সেই পূর্ণতাকে আরো রাঙিয়ে তোলে, আত্মকথার রচিয়তা যে যুগের সন্তান, সেই সময়ের আর্থসামাজিক জীবন যখন অমলিনভাবে উপস্থাপিত হয় লেখাতে, স্মৃতিতে।
সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদের "আত্মকথা " বাঙালি মুসলমানের সময়কে ধারণ করেছে যে সময়ে হয়েছে দেশভাগ, হয়েছে সাম্প্রদায়িক তিক্ততা, বেড়েছে ক্রোশ ক্রোশ দূরত্ব। বেশকিছু বেসিক প্রশ্নের মাধ্যমে, ঘটনা বর্ণনার প্রেক্ষিতে মনে বদ্ধমূল কিছু ধারণায় ধাক্কা দিয়েছেন আবুল মনসুর আহমদ। যেমনঃ বাটোয়ারাপূর্ব সাহিত্যে বাঙালি মুসলমান নাই। অথচ বাঙালি মুসলমানরাই ছিল সংখ্যাগুরু। কেন নাই? এক সম্প্রদায় অপর সম্প্রদায়ের ভালো মানতে রাজি না। কেন? এমনই বাঙালি মুসলমানের হালঃ " আরেকটি মজার ব্যাপার এখানে উল্লেখ না করিয়া পারিতেছি না বন্ধুবান্ধবের কাছে শুনিলাম, কলিকাতার বেশ্যারাও মুসলমান খরিদ্দার গ্রহণ করে না । পরে এই কথার এইরূপ ব্যাখা শুনিলাম যে মুসলমান খরিদ্দারদিগকেও "হিন্দু বেশে" অর্থাৎ ধুতি পরিয়া বেশ্যাবাড়িতে যাইতে হয়। " ( পৃষ্ঠা ১৭৭)
আত্মজীবনী হিসেবে এর একটি বিশেষত্ব অধ্যায়ভিত্তিক আকারে তা লেখা। সাধুভাষায় পুরো বই। অথচ পড়তে গিয়ে তা টেরই পাইনি।খুবই সুলিখিত।
জনাব আবুল মনসুর তাঁর বইতে অনেক অজানা তথ্য, ঘটনার কথা লিখেছেন। যেকোনো কৌতূহলী পাঠকমাত্রই তা লুফে নেবে। যেমনঃ দ্বিতীয়পর্যায়ে নবযুগ পত্রিকার সম্পাদনা করছেন আবুল মনসুর। কিন্তু সম্পাদক হিসেবে কাজী নজরুলের নাম ছাপা হত। এই সময়েরই ঘটনা, তখনও নজরুল অসুস্থ হননি। পড়ুন মনসুর সাহেবের জবানিতে,
" ইতিমধ্যে নজরুল ইসলাম সাহেবের মধ্যে একটু-একটু মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা দিল। আগেই শুনিয়াছিলাম, তিনি বরদাবাবু নামে জনৈক হিন্দু যোগীর নিকট তান্ত্রিক যোগ সাধনা শুরু করিয়াছেন। " ( পৃষ্ঠা ২৯৭)
আবুল মনসুর শতভাগ রাজনীতিক তা পুরো বই পড়তে গিয়ে মাথায় রেখেছিলাম। তাঁর নীতি বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি হিন্দু বাঙালি হতে আলাদা। তাই তাদের কথাসাহিত্য প্রভৃতিও আলাদা হবে ইত্যাদি তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। লিখেছেনও তা সোজাসুজি। তবে কি মনসুর সাহেব সবক্ষেত্রে ঘটনা বয়ানে সাধুতা রক্ষা করেছেন বলতে পারিনা। কেননা পুরো বই পড়ার পর বাঙালি মুসলমান সন্তান আবুল মনসুর আহমদকে অনেকখানি ভুল-ত্রুটির ঊর্ধে বোধ হয়। তাতেই ফিকে হয়ে আসে আত্মজীবনী লিখবার অন্যতম শর্তঃ নিজের প্রতি সৎ থেকে যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষভাবে স্মৃতিকে ঘাঁটিয়ে তার বর্ণনা লেখা।
তবুও এক মুসলমান কংগ্রেসীর, এক কৃষক-প্রজা আন্দোলন কর্মীর, এক সুসাহিত্যিক এবং একজন রাজনীতিবিদের কলমে নিজের সময়ের ছবিকে অঙ্কন যথেষ্ট সুখপাঠ্য হয়েছে তা অস্বীকার করা মিথ্যার সমতুল্য হবে।
দুর্দান্ত। তান্ত্রিককে গুরু ধরে কবি নজরুলের নিজের মৃত ছেলেকে দেখার ঘটনা, এক কৃপণ জজকে চিত্রগুপ্তের বগি ঘটনা শুনিয়ে শিক্ষা দেওয়া, ফজলুল হকের "আম গাছে মানুষ ঢিল ছোঁড়ে, শ্যাওড়া গাছে ঢিল ছোঁড়ে না" ডায়লগ, নাম বিকৃতির উচিৎ পাটকেল এরকম সেরা সেরা সব ঘটনার সমাহার বইতে।
আত্মজীবনী অনেক পড়েছি, কিন্তু এমন অকপট আত্মকথা কমই পড়েছি। এমনকি পড়িনি বললেও ভুল হবে না বোধহয়৷ আবুল মনসুর আহমদ এর লেখনশৈলী এমনিতেই দারুণ রসাত্মক। তাঁর ভাষাশৈলী একটু আলাদা হলেও কৌতুকরস আর তীক্ষ্ণ শ্লেষের সাথে প্রাঞ্জল বর্ণনায় একটা নেশার মতো অবস্থার সৃষ্টি করে দিতে পারেন। তাঁর এই আত্মজীবনীটি একটা বিশেষ সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে। তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, সম্ভ্রান্ত মুসলিমদের মনোভাব, ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পালাবদল এইসব অতি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস উঠে এসেছে বইটিতে। বইটাকে ভাগ করা হয়েছে শৈশব, সাহিত্য জীবন, আইনী জীবন, সাংবাদিক জীবন ইত্যাদি ভাগে। এতে সুস্পষ্টভাবে লেখকের জীবনের নানান সময়কার ভাবনা চিন্তার পরিবর্তন ধরা গেছে। লেখকের পরিবার ফরায়েজী মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই প্রচণ্ড ধর্মবিশ্বাসী এবং তীব্র আত্মসম্মানবোধযুক্ত একজন মানুষ ছিলেন লেখক। তাঁর মেধা এবং প্রজ্ঞা শৈশব-কৈশোরেই তাঁর পরীক্ষার ফল, প্রবন্ধ লেখন এবং আচরণের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। স্থানে স্থানে গ্রামীণ নানান সংস্কৃতি, কুসংস্কার এর সাথে হিন্দু-মুসলিমের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে। সাম্প্রদায়িকতা তখন বেশ প্রকটভাবেই উপস্থিত থাকলেও পারস্পরিক প্রীতিরও একটা জায়গা ছিল। লেখক যখন নিজ এলাকা ছেড়ে বড় শিক্ষামাধ্যমে যান তখন নানান ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্ব সাহিত্যের সাথে পরিচিত হয়ে তাঁর ধর্মীয় ভাবনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। নানা উত্থান পতন, বদলের মধ্য দিয়ে বারবার তাঁর ধর্মীয় চিন্তার পরিবর্তন ঘটেছে। তিনি মুসলিম স্বকীয়তা, সংস্কৃতির একজন প্রকৃষ্ট ধারক ছিলেন৷ দুই ধর্মের মানুষের অন্যায় আচরণেরই প্রতিবাদ করতেন। মনেপ্রাণে একজন বাঙালি মুসলিম ছিলেন কিন্তু অসাম্প্রদায়িক ভাবনা লালন করতেন, যদিও তাঁর আচরণ, কথাবার্তায় অনেক হিন্দু বন্ধুই ভুল বুঝতেন। রাজনৈতিক জীবনে কংগ্রেসপন্থী ছিলেন, ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর একনিষ্ঠ সমর্থক। পরবর্তীতে পাকিস্থানপন্থী হন। সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক জীবন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কাজী নজরুল ইসলামের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক শেষ দিকে শীতল হয়ে পড়ে। নবযুগ পত্রিকার সাথে সম্পর্ক ছেদের সময়টুকু বেশ টানাপোড়েন এর। তাঁর প্রবন্ধ রচনার প্রতিভার পরিচয় শৈশবেই পাওয়া যায়৷ যদিও লেখক স্বীকার করেছেন যে সেটা ঠিক মৌলিক ছিল না, অনুবাদ ছিল। তবুও সেই অনুবাদটাই তাঁর রচনার গুণে প্রায় মৌলিক হয়ে ওঠে ভূয়সী প্রশংসা কুড়ায়। লেখকের জীবনে তাঁর স্ত্রী এর ভূমিকা শতকণ্ঠে ব্যক্ত করেছেন, যেটা বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনীতে বেশ কমই পাওয়া যায়। তাঁর রাজনৈতিক জীবন এবং আইন পেশা দুইক্ষেত্রেই তাঁর স্ত্রী এর প্রভাব অপরিসীম। যদিও বয়সের হিসেবে একটা গোলমাল করেছেন লেখক। দুইজনের জন্মসাল লেখা যথাক্রমে ১৯২৬ এবং ১৯১৬, অর্থাৎ ১০ বছরের ব্যবধান৷ অথচ তার কয়েক লাইন পরেই লেখক বলছেন, ১১ বছরের এক বালিকার পক্ষে ৩০ বছরের এক যুবককে তুমি বলে সম্বোধন করা কঠিন। অর্থাৎ এখানে আবার ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে ১৯ বছর! তবে ব্যবধান যাই হয়ে থাকুক, দাম্পত্য জীবনে যে তিনি অত্যন্ত তৃপ্ত ছিলেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। লেখকের নিজস্ব জবানের প্রতিটা কথাই ভালো লেগেছে এমন বলব না। মাঝে মাঝে ব্যক্তিত্বের তীব্রতা এবং অকারণ জেদ আমার ভালো লাগেনি। কিন্তু বইটা একটা রত্নবিশেষ। একজন প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের বেড়ে ওঠা, তাঁর নানান চিন্তার উন্মেষ এবং বদলের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া, নানান সুকুমার ক্ষেত্রে অবদান রাখার পাশাপাশি রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা, বিখ্যাত সব ব্যক্তিদের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওঠাপড়া ইত্যাদি পাঠ অনেক ভাবনার খোরাক জ���গায়, অনেক দ্বিধা দূর করে দেয়, লেখককে এক নতুন চোখে দেখতে শেখায়। বিশেষত তাঁর বৈষয়িক ভাবনাগুলো বেশ আলোড়িত করে। তাই আবুল মনসুর আহমদ এর এই অকপট আত্মজীবনী বাংলা সাহিত্যের একটি অত্যুজ্জ্বল রত্নের পাশাপাশি একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।
বইটি পড়ে আমার নিজেরই আত্মজীবনী লিখতে ইচ্ছা করছে। আমার তো আর কলমের জোড় নেই। কিন্তু পড়ে বেশ কিছু বিষয় জেনেছি, যা অসাধারণ ছিলো। সেই সাথে আমার জীবনের সাথে অনেক কিছু মিল পেয়েছি, তা আমাকে অবাক করেছে। নিজের জীবনকে অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেছেন, নিজের স্ত্রী সম্পর্কে যেসব কথা বলেছেন তা আমাকে ঈর্ষান্বিত করেছে।
আত্মজীবনী এত সুন্দর করে গুছিয়ে লিখা যায় এই বই পড়ার আগে জানা ছিলো না। রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, আইনজ্ঞ, সাহিত্যিক অর্থাৎ বহুমুখী প্রতিভা যাকে বলে তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ আবুল মনসুর আহমদ।
লেখকের দীর্ঘ দশ বছরের(১৯৫৮-১৯৬৮) কাজ এই "আত্মকথা" এবং সেটা যে উনি খুব ভালোভাবেই করতে পেরেছেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় এর ভেতরের দিকে। "আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর" বইটা এই আত্মজীবনীরই রাজনৈতিক অংশ ছিলো, পাবলিশারদের ইচ্ছায় সেটা আলাদা করে প্রকাশিত হয়।
এতে উঠে এসেছে ধর্মালোচনা, ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতি, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কৃষক-প্রজা পার্টি, স্বরাজ আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন, প্রজা আন্দোলন, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন, সিপাহী বিদ্রোহ, তৎকালীন বেশকিছু সংবাদপত্রের কথা, প্রভৃতি। তবে সম্পূর্ণ বইজুড়ে যে আবহটা ছিলো সেটা হচ্ছে তৎকালীন মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তাভাবনা।
ধর্ম নিয়ে লেখকের নিজস্ব চিন্তাভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গি বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়েছে। উনার মতটা অনেকটা এরকম যে, সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসই ধর্মের মূল বিষয়। এছাড়া বাদবাকি যা কিছু আছে(বিশ্বাসের অবশিষ্ট এবং সমস্ত ক্রিয়া-কর্ম) ধর্মের অনুষঙ্গ। এগুলোকে ঔষধের অনুপানের সাথে তুলনা করে উনি বলেছেন দেশ ও অবস্থাভেদে ধর্মের এসব নন-ফান্ডামেন্টাল বিষয়গুলোর উনিশ-বিশ করা যেতে পারে এবং করা উচিতও, না করাটা অবস্তব ও ইমপ্র্যাকটিক্যাল।
ধর্মীয় স্কলার ছাড়া ধর্ম নিয়ে এধরণের কথা বলা উদ্ধতারই প্রকাশ।
এছাড়াও কিছু আলোচনা ছিলো একঘেয়ে। যেমন পঞ্চম খণ্ডের সাহিত্যিক জীবন(গরমামুলি)। এছাড়াও পুরো বইটি সাধুভাষায়+আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহারের কারণে কিছু কিছু জায়গা বুঝতে বেগ পেতে হয়েছে।
তবে সব মিলিয়ে এটা আমার জন্য সুন্দর একটা জার্নি ছিলো। এতবড় বই অথচ পড়তে তেমন ক্লান্তি লাগেনি।
(অনেকেই আবুল মনসুর আহমদকে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে চিনে থাকেন উনার বিখ্যাত বই "আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর" এর সুবাদে। অনেকে যেটা জানেন না সেটা হল, লেখক জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক "দি ডেইলি স্টারে"র সম্পাদক মাহফুজ আনামের পিতা।)