২০২১ সালটা ছিল এক অদ্ভুত সময়—বিশ্বজুড়ে অতিমারির ক্লান্তি, বিভ্রান্তি, আর মানুষের চরম হতাশার পরেও বেঁচে থাকার সেই অসামান্য প্রবণতা। সেই সময়েই হাতে এলো সৈয়দ মুজতবা আলীর 'হিটলার'—এক পাতলা অথচ ক্ষুরধার প্রবন্ধসঙ্কলন, যা যেন ইতিহাসের রক্তাক্ত ছায়ায় দাঁড়িয়ে পাঠককে হাসিয়ে চিন্তায় ফেলতে জানে।
এটি কোনো কেতাবি জীবনী নয়—এই বই ইতিহাসের মুখে ব্যঙ্গের কালি, আর রাজনীতির গালে চপেটাঘাত। আলীর লেখনীতে হিটলার যেন কেবল এক ভয়ংকর নেতা নয়, এক সাংস্কৃতিক সঙ্কট, এক চূড়ান্ত আত্মপ্রবঞ্চনার প্রতীক। হিটলারের জাতীয়তাবাদ, নাৎসি মতাদর্শ, যুদ্ধের বীজ—সবই উঠে এসেছে ব্যঙ্গের চাদরে মোড়ানো তীব্র বিশ্লেষণে।
এই বইয়ের আসল শক্তি মুজতবা আলীর স্বভাবসিদ্ধ রসবোধ। তিনি হিটলারকে কেবল একজন ইতিহাসের খলনায়ক হিসেবেই দেখেননি, বরং সেইসব জনতাকেও প্রশ্ন করেছেন—যারা তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করেছিল। তাঁর লেখনীতে হিটলার ভয়ংকর, কিন্তু পাঠকের চোখে ব্যঙ্গাত্মক করুণ রসের চরিত্রে পরিণত হন।
২০২১ সালে, যখন গোটা পৃথিবী আবার নতুন করে ‘নেতৃত্ব’-এর অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে, তখন এই বই পড়া এক অনন্য অভিজ্ঞতা। হিটলারের গল্প শোনার চেয়ে, মুজতবা আলীর চোখ দিয়ে তা দেখা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ, শিক্ষণীয় এবং আশঙ্কাজনকভাবে প্রাসঙ্গিক।
সংক্ষেপে, এই বই শুধু ইতিহাসের পাতা নয়, আমাদের সময়েরও এক সতর্কবার্তা—অন্ধ বিশ্বাস আর জাতীয়তাবাদের মোহ আজও ফিরতে পারে অন্য মুখোশে। আর সৈয়দ মুজতবা আলী? তিনি সেই সতর্ক বাঙালি, যিনি ব্যঙ্গের আগুনে ইতিহাসকে আলোকিত করতে জানেন।
অলমতি বিস্তরেণ।