বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাস তিথিডোর (প্রথম প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ১৯৪৯) বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের এক অমর রচনা। এটি নিছক এক প্রেমের উপন্যাস নয়; বরং এটি এক পরিণতির খোঁজে অগ্রসর হওয়া আত্মার সংবেদী অভিযান, যেখানে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের গভীর অন্তঃশীল রূপটি ধরা পড়ে। বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল, রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ, স্বাধীনতা-পূর্ব সামাজিক টানাপোড়েন—সবকিছু মিলিয়ে উপন্যাসটি হয়ে ওঠে একটি সময়চিত্র ও মানসিকতার রূপায়ণ।
উপন্যাসের শিরোনাম ‘তিথিডোর’ নিজেই একটি কাব্যিক রহস��য। এটি বোঝায় বিবাহের শুভ মুহূর্ত, প্রেম ও প্রজ্ঞার এক বন্ধনসূত্র, যা এই উপন্যাসে রূপ পায় স্বাতী ও সত্যেনের সংবেদনশীল প্রেমে।
উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে রাজেন মিত্র ও শিশিরকণা দম্পতির সংসারে। তাঁদের ছয় সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ স্বাতী হলেন উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু। রাজেন, একজন আত্মসুখে নিমগ্ন কিন্তু সংবেদনশীল মানুষ, তাঁর সন্তানদের স্নেহভরে বড় করে তোলেন। তবে মায়ের অকালম��ত্যু স্বাতীর মনোজগতে রেখে যায় স্থায়ী ছায়া। এই ছায়াময় মনের পরিপক্বতার মধ্য দিয়েই আমরা দেখি স্বাতীর শৈশব থেকে যৌবনে উত্তরণ।
স্বাতীর অন্তর্মুখীনতা ও সাহিত্যানুরাগ—বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ও কোলরিজের প্রতি টান—তাকে আলাদা করে তোলে। তার প্রেমের পরিণতি ঘটে সত্যেন রায়ের সঙ্গে, যিনি একজন শান্ত স্বভাবের, মননশীল কলেজ শিক্ষক। সত্যেন কেবল প্রেমিক নন, স্বাতীর সাহিত্যচর্চার সহযাত্রী, তাঁর অন্তর ও অভিজ্ঞতার সহযাত্রী।
উপন্যাসে প্রবীর মজুমদার, এক বিত্তবান ও বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় পাত্র, যিনি রাজেনের পছন্দ হলেও স্বাতীর নৈকট্য লাভে ব্যর্থ হন। এই দ্বন্দ্ব—প্রেম ও বাস্তবতা, আত্মার সন্তুষ্টি ও আর্থিক নিশ্চয়তার মধ্যে—বাংলার মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের অন্তর্লীন দ্বন্দ্বকে প্রতিফলিত করে।
উপন্যাসের এক অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্ত হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ ও বাইশে শ্রাবণ। সত্যেন রায় শান্তিনিকেতনের খবর পৌঁছে দেন স্বাতীর কাছে—“সোনার তরী ভেসে চলেছে আলোর নদী বেয়ে অন্ধকারের দিকে।” রবীন্দ্রনাথ এখানে কেবল একজন কবি নন, বরং এক আবেগগত, আত্মিক উপাদান; তাঁর মৃত্যু স্বাতী ও সত্যেনের সম্পর্ককে আরও গাঢ় করে তোলে।
এই অংশে বুদ্ধদেব বসুর এক দুর্লভ সাহিত্য কৌশল নজরে আসে—তিনি নিজের রচনার বাইরের এক ঐতিহাসিক ঘটনার আবেগকে এমনভাবে অন্তঃপ্রবাহিত করেছেন যে তা কাহিনির গতি থামিয়ে দেয় না, বরং চরিত্রের অভ্যন্তরীণ মনোজগৎকে আরও গভীরভাবে উন্মোচিত করে।
‘তিথিডোর’ বাংলা সাহিত্যে বুদ্ধদেব বসুর আধুনিক গদ্যভাষার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তাঁর কবিসত্তা গদ্যেও অনুরণিত; প্রকৃতির বিবরণ, চরিত্রের অন্তর্জগৎ, সংলাপ—সবকিছুতেই একধরনের কবিতাময় আবেশ রয়েছে।
এই উপন্যাসে তিনি পরিহার করেছেন ঐতিহ্যবাহী কাহিনিকেন্দ্রিকতা বা নাটকীয় মোচড়। পরিবর্তে তিনি গড়ে তুলেছেন অনুভবের এক ধীর অথচ গভীর জ্যামিতি, যেখানে সম্পর্কের সুর ও অনুরণন পাঠককে ধীরে ধীরে আবিষ্ট করে। মননশীলতা, ভেতরকার সংঘাত, ব্যক্তিগত নির্বাচন—সবকিছু নিঃশব্দে বিস্তার লাভ করে।
যেখানে শরৎচন্দ্রের প্রেমোপন্যাসে বিরহ, দারিদ্র্য, সামাজিক বাঁধা ও কাহিনির গতির উপর জোর থাকে, সেখানে ‘তিথিডোর’ এক স্নিগ্ধ আবেগপ্রবাহ। শরৎচন্দ্রের নায়িকারা অনেক সময় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমে পড়েন, কিন্তু স্বাতীর যাত্রা সেই অর্থে সংগ্রামী নয়; বরং তা এক অনুরণনময় পরিণতির অভ্যন্তরীণ অন্বেষা।
বলা যায়, স্বাতী হলেন রবীন্দ্রনাথের মায়াময়ী, ভাবনাপ্রবণ নারীচরিত্রের উত্তরসূরি—কিন্তু বুদ্ধদেবের কলমে তিনি আরও বাস্তব, আরও গভীর। তাঁর প্রেমে কোনও আত্মবিসর্জন নেই, বরং আছে আত্মবিকাশের পরিণতি।
সত্যেনও এই ধারারই প্রতিভূ। তিনি উত্তাল নন, নন নাটকীয়; তাঁর উপস্থিতি যেন এক মৌন নদীর মত—যা স্বাতীর অন্তরস্পর্শে ভেসে যায়। এক্ষেত্রে সত্যেনকে তুলনা করা যায় Atticus Finch বা Jane Eyre-এর Rochester-এর সঙ্গে—যাঁরা নায়িকার অভ্যন্তরীণ জগতের সহযাত্রী হয়ে ওঠেন।
উপন্যাসের ব্যাকড্রপে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কলকাতায় জাপানি বোমাবর্ষণের আতঙ্ক, দেশভাগ ও স্বাধীনতার প্রাক্কালে সামাজিক অস্থিরতা। এই ঐতিহাসিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাতীর নিঃসঙ্গতা, প্রেম ও পারিবারিক টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পায়।
যেমন—প্রবীরের বিত্তবান অথচ আধ্যাত্মিক শূন্যতা কিংবা বিজনের ব্যবসায়িক চাতুরী এই মূল্যবোধগত সংকটকে তীব্র করে তোলে। উল্টোদিকে, সত্যেনের নির্লিপ্ততা ও সাহিত্যপ্রেমই স্বাতীর মন জয় করে। এটি যেন এক শ্রেণীসংকট ও মূল্যবোধের সন্ধিক্ষণ।
‘তিথিডোর’ কেবল এক প্রেমের উপন্যাস নয়, এটি একটি যুগের মানসিক-সাংস্কৃতিক বিবর্তনের দলিল। উপন্যাসটি একাধারে স্মৃতিমেদুর, মননশীল, এবং গভীরভাবে সংবেদনশীল। বুদ্ধদেব বসু সাহিত্যের যে ভাষা নির্মাণ করেছেন তা নিছক অলঙ্কার নয়—তা আত্মার ভাষা।
স্বাতী ও সত্যেনের মিলন তাই নিছক বিবাহ নয়—তা এক নৈতিক বিজয়, এক মূল্যবোধের স্বীকৃতি। এই উপন্যাস আমাদের শেখায়—প্রেম মানে কেবল আকর্ষণ নয়, প্রেম মানে সেই অনুরণন, যা নিজের গভীরতা চিনে নিতে শেখায়।
‘তিথিডোর’ পড়তে হয় ধীরে—একটি শীতের দুপুরে, কিংবা বাইশে শ্রাবণের কান্নাময় হাওয়ায় বসে। কারণ এ উপন্যাস শুধু পড়া যায় না—এ উপন্যাসে থাকতে হয়, অনুভব করতে হয়, এবং নিজের হৃদয়েও তিথিডোর বেঁধে নিতে হয়।
অলমতি বিস্তরেণ।