একজন কমলালেবু নামের হীন বইটারে এক বিদগ্ধ পাঠক দেখলাম পাঁচ তারা দিয়েছেন, ত ঐ বইটারে তিনি তারকাখচিত করার কারণ কী হইতে পারে এই ভাবনায় রিভিউ পড়তে গিয়ে মনে হইলো, রিভিউটা বা তারা কয়টা জীবনানন্দ সাহেবের জীবনীনির্ভর ঐ ঠোঙাপ্রদায়ী উপন্যাসটার জন্য না, বরং দাশবাবুর গোটা ক্যারিয়ারের জন্য। বই প্রসঙ্গে কিছু নাই, জামান সাহেবরে নিয়ে বুরবক সমাজে যে আষ্ফালন, তাও নাই, আছে শুধু নিজের জীবনে জীবনানন্দ সাহেবের উপস্থিতির ফিরিস্তি, সেও আবার দাশপ্রদত্ত শব্দের হিড়িক বাঁধায়ে।
আমি যদি ঐ কিসিমে আগাই, তাহলে আমাকেও এই বইটারে, অর্থাৎ স্পেনিশ ট্রাজেডিরে পাঁচ তারা দিতে হয়, বলতে হয় যে এই বইয়ের নাম আর আমার জীবন কীভাবে বালিশের ওয়াড়ের দুই খণ্ড কাপড়ের মত জোড়া লেগে গেছে, এখন হয়ত কেবল কোনো সরল কৌতূহল-ওলা শিশুই পারে এই ওয়াড়ের জীবনের এইখানেই ইতি টানতে, একটু একটু করে সেলাই খুলে ফেলার মাধ্যমে। আরো বলতে হয় আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি, এই নাটকের হিরোনিমোর মত, এর ভাবশিষ্য নাটক হ্যামলেটের নামচরিত্রের মত, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি সুবর্ণা -
কিন্তু আমি আসলে এই বই নিয়ে দুই চারটা কথা বলাটারেই আগায়ে রাখবো। সুতরাং, শুরু করি।
টমাস কিডেরে আমার একজন চৌকস ঔপন্যাসিক মনে হইছে। হ্যাঁ, তখন উপন্যাস লেখার চল ছিলো না ঠিক, আর এইটাই ভাবায়, এখন যেই দক্ষতা পরম আরাধ্য, অন্য সময়ে সেই দক্ষতার দৌড় কতদূর - পরিচিতজনেরা দেখি হিপহপ করতেছেন কেউ কেউ - ভাবেন একবার, আঠারোশ ঊননব্বুইয়ে হিপহপের বদান্যতা কি টের পাইতো কেউ? টমাস কিডের কবিত্বশক্তি কিছুটা ফেলনা গোছের, শেক্সপীয়র-মার্লোর মত উত্তম কাব্য তিনি সিঞ্চন করতে সমর্থ হন নাই, প্রথমদিকে গায়ে না লাগলেও একটু পরপর ধামাকাদার ফরমুলাইক বাণী আওড়ানো অসহ্যই ঠেকে একটা সময় পর। ও আইজ, নো আইজ আমার অবশ্য বেশ লাগছিলো - কিন্তু কিড যেইটা পারেন খুব ভালোমতন, সেইটা হচ্ছে গল্প দাঁড় করানো - চরিত্র না, চরিত্রের ক্ষেত্রেও অন্যরা বেশ খানিকটা আগায়ে থাকবেন, কিন্তু কিড সাহেবের গল্প আগায় অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে, অনেক কিছু ঘটে তার নাটকে, তিনি কাহিনীরে জায়গা দেন, এবং চরিত্রেরা ছোটো বড়ো মাঝারি যাই হোক, তারা কাহিনীর পথে বাঁধা না হয়ে বরং পিচ্ছিলকারক হয়ে দাঁড়ায়, রাস্তা আরো মসৃণ হয়ে ওঠে।
বালতাজার লরেঞ্জো আর বেল-ইম্পেরিয়ার কথোপকথন, বা পেরিং-কী-যেনোকে মারবার পর হিরোনিমোর সত্য-আবিষ্কার, এইসবই এত চমৎকারভাবে আঁকা, বা লরেঞ্জো আর হোরাশিওর মাঝে গণিমত ভাগ বাটোয়ারা, হিরোনিমোর সাথে সন্তানহারা আরেক বৃদ্ধের কথোপকথন, এইসব একটা গড়পড়তা নাটকরে কাহিনীর বিচারে অসাধারণ করে। শেষের দিকে বিদেশী ভাষারে সম্বল করে যে হুলস্থুল, সেটা মঞ্চায়িত করা অসম্ভব মনে হয়, এবং আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাসরে দৃঢ় করে যে কবিত্ব যতখানিই হোক, গল্প সাজানোর বিচারে টমাস কিড এইযুগের বহুত ঔপন্যাসিকেরে তুড়ি মেরে ফেলে দেয়ার ক্ষমতা রাখতেন। চরিত্রগুলি আরেকটু মাংশল হইত যদি -
আহ সময়, ঠিক সময়ে না আসতে পারলে আর কীসের সময়। তাও ভালো ছাপাখানা আবিষ্কারের পর কিড সাহেবের আগমন, তাই তাঁরে পড়তে পারা গেলো।
আর ঠিক সময় কী তাই বা কে জানে। কে জানে, সামনে হয়ত এইসব লেখাজোকা থাকবে না আর, দেখা যাবে হয়ত এই নাই ঐ নাই, দেখা যবে কেউ হয়ত বলছে উনি বা তিনি হতে পারতেন চমৎকার অমৌকিক বা তমৌকিক - সময়ের ধারণাটারেই গুবলেট মনে হয় আমার মাঝে মাঝে।