হুমায়ূন আহমেদের এক অদ্ভুত সৃষ্ট চরিত্র মনজুর। জীবনে কোনো কিছু না পেয়ে বড়ো হওয়া মনজুরের হারানোর কোনো কিছুই নেই, ছিলো না কখনো। এর মাঝেই তার যা আছে তার মূল্য সে দিতে জানে তার মত করে।
ভালোবাসার ধারণাকে বুকে ধারণ করা আর কাউকে ভালবাসা দুটো সম্পুর্ণ ভিন্ন ব্যপার। ভালোবাসার ধারণাটা একটা স্বার্থপর ব্যাপার, অন্যদিকে কাউকে ভালোবাসা একটা স্বার্থহীন ব্যপার। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আমরা ভালোবাসার ধারণাকে বুকে ধারণ করলেও ভালবাসতে পারি খুব কম। মানুষ জন্মগত ভাবেই স্বার্থপর, আর তাই ভালবাসার ধারণাকে বুকে ধারণ করতে পারে সহজে কিন্তু কাউকে ভালবাসতে হলে সাহস লাগে, স্বার্থহীন হতে হয়।
আপনি যখন কারো প্রেমে পড়বেন, তখন তাকে নিয়ে ভাবতে আপনার ভালো লাগবে, তার সাথে ঘুরতে ভালো লাগবে, তার হাত ধরতে ভালো লাগবে, তার কথা শুনতে ভালো লাগবে, এইযে সব ভালো লাগা, এসবই আপনাকে কেন্দ্র করে। এখানে আপনি স্বার্থপর। এই অনুভূতিটা হলো ভালবাসার ধারনা। বেশিরভাগ মানুষ ভালবাসার ধারনার প্রেমে পড়ে। অন্যদিকে আপনি যখন আপনার প্রেমিক/প্রেমিকা/ স্বামী/স্ত্রীর জন্য নিজের Materialistic Comfort কে বিসর্জন দিয়ে তাকে কোন Materialistic Comfort অথবা Emotional Comfort দিতে পারেন, তখন আপনি তাকে ভালবাসতে পারছেন ধরে নিবেন। এখানে আপনি স্বার্থহীন, ঠিক যেভাবে বাবা-মা তার সন্তানকে ভালবাসে স্বার্থহীন ভাবে; ঠিক সেইভাবে।
সাধারণত যেসকল মানুষ ভালোবাসা পেয়ে বড় হয় তারা পেতে পেতে এত অভ্যস্ত হয়ে পরে যে, তারা শুধু ভালবাসার ধারণার প্রেমে পরে থাকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা জানে না কীভাবে ভালবাসতে হয়, তারা ধরেই নেয় যে, ভালবাসার ধারণাটাই বুঝি ভালোবাসা।
আর যেসকল মানুষ ভালোবাসা না পেয়ে বড়ো হয়, তারা খুব গভীরভাবে ভালোবাসতে জানে, কিন্তু প্রকাশ করতে জানে না। অবশ্য সবাই এমন হয় না। বেশিরভাগই এমন হয়।
গল্পে মনজুর হলো এমন একজন মানুষ যার জীবন শুরু থেকে ভালোবাসাহীন ভাবে কেটে গেছে। চৈত্রের দুপুরে এক রাশ বৃষ্টির মত মীরা তার জীবনে আসলো এবং ভালোবাসায় ভিজিয়ে দিয়ে আবার হারিয়ে গেলো।
অন্যদিকে মীরা ভালোবাসা পেতে পেতে বড়ো হওয়া মানুষ, যে ভালোবাসার বাহ্যিক রূপ দেখে অভ্যস্ত, অব্যাক্ত ও অপ্রকাশিত ভালোবাসার রূপ কেমন তা সে জানে না। যে ভালোবাসা দেখা যায় না, সে ভালোবাসা ছুঁতে পারার ক্ষমতা তার নেই। তাই মঞ্জুরের ভালোবাসা সে দেখতে পারেনি, ছুঁতে পারেনি।
অন্য এক চরিত্র জাহানারা, জীবনের নিষ্ঠুরতা তাকে মানুষ চিনতে শিখিয়েছে। সে জানে ভালোবাসার অনেক রূপ থাকে, সে জানে ভালোবাসার অনেক রঙ থাকে, সে জানে অনেক ভালোবাসা বাইরে থেকে দেখা যায় না, তাকে ছুঁয়ে দেখতে হয় মনের গভীরতা দিয়ে, সে জানে কিভাবে ভালোবাসতে হয় কিন্তু সে জানে না কিভাবে ভালোবাসার অধিকার নিয়ে নিতে হয় অথবা সে জানে কিন্তু পারে না।
তবুওতো আমাদের জীবন চলে যায়। কেউ কেউ ভালোবাসা পেয়েও হারায়, কেউ কেউ ভালোবাসার অপেক্ষায় নিজেকে হারায়, কেউ কেউ ভালোবাসতে বাসতে নিজেকে হারায়।
বইয়ের ভালো লাগা কিছু লাইন:
শিশুদের মধ্যে কিছু মজার ব্যাপার আছে। তারা প্রতিদান আশা করে কিছু করে না। কখনো না। বড়রাই সবসময় প্রতিদান চায়।
বোকারা নিজেদের চালাক মনে করলে দোষ। বুদ্ধিমানরা মনে করলে দোষ নেই।
মানুষের কোনো ইচ্ছাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
মানুষ হবার অনেক যন্ত্রণার একটি হচ্ছে- যা বলতে প্রাণ কাঁদে তা কখনো বলা হয় না।
শুধু সদগুণ নিয়ে পরিপূর্ণ মানুষ হয় না। যাদের ভেতর শুধুই সদগুণ, মানুষ হিসেবে অনেক নিচের দিকে তাদের অবস্থান।
একজন মানুষ যার ভেতরে মহৎ গুণাবলি ছাড়া আর কিছুই নেই, রাগ নেই, হিংসা নেই, ঘৃণা নেই সে কী করে জান? সে আশপাশের মানুষদের অসম্ভব কষ্ট দেয়। আমরা তাকে এড়িয়ে চলি। ক্ষেত্রবিশেষে পরিত্যাগ করি। কারণ আমরা তাকে সহ্য করতে পারি না।
যেসকল মানুষের মাঝে মানবিক ত্রুটিগুলো অনুপস্থিত তারা পরিপূর্ন মানুষ না।
ভালবাসার বাস হচ্ছে হৃদয়ে। তাকে চোখে দেখা যায় না। আমরা করি কি, নানান কাণ্ডকারখানা করে তা দেখাতে চাই যেমন ফুল কিনে আনি, উপহার দেই। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে এক ধরনের ভান আছে - ভানটা হচ্ছে আমাদের ত্রুটি। যে মানুষের মধ্যে এই ত্রুটি নেই সে ভালবাসা দেখানোর চেষ্টা করবে না।