অসম্ভব সুন্দর একটি বই!! ইসলামের আদর্শের উপর নিজের জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসলামের ইতিহাস পাঠ করা ও এর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জীবন ও কর্মনীতি অধ্যয়ন করার গুরুত্ব অপরিসীম। বইটি ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সংস্কারকদের সংক্ষিপ্ত জীবনীর সংকলন। আল্লাহ তা'য়ালা যে কিভাবে এই দ্বীনকে তাঁর বিশেষ বান্দাদের মাধ্যমে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ফিতনা বা বিকৃতি থেকে সুরক্ষা করেন, এটাই হলো এই বইয়ের মূল আলোচনার বিষয়।
বইয়ের অসাধারণ ভূমিকা থেকেই যে কেউ আলি মিয়া রহ. এর জ্ঞানের গভীরতা, লিখার সৌন্দর্য,কঠোর শ্রম ও গবেষণা সম্পর্কে আন্দাজ পেয়ে যাবেন ইন শা আল্লাহ। ভূমিকা পড়ার পরে ইসলামের ইতিহাসের উজ্জলতম তারকারাজিদের জীবন ও কর্মনীতি নিয়ে পড়তে আগ্রহী ও ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল সোনালী ইতিহাস পাঠে আগ্রহী কেউ বইটি না পড়ে রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।
শুরুতেই শায়েখ লিখেছেন কিভাবে সময়ের বিবর্তনে ও নতুন নতুন মোকাবিলার সম্মুখিন হয়ে বিভিন্ন ধর্ম বা মতবাদ তার মূল শিক্ষা থেকে সরে যায়। অনেক সময় তা হয় সেইসকল ধর্মেরই অনুসারীদের বিকৃত কর্মনীতি বা বিকৃত ব্যাখ্যারই ফলে। আবার অনেক সময় তা হয়ে থাকে বিভিন্ন বাহ্যিক বিষয়াবলির ফলে যেমন, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব, প্রচলিত বা আধুনিক চিন্তাধারার প্রভাবে ইত্যাদি। উদাহরণ হিসেবে শায়েখ এখানে হিন্দুধর্ম ও খৃষ্টান ধর্মের উল্লেখ করেছেন ও তাদের বিকৃতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস অত্যন্ত সুন্দর ও সহজভাবে তুলে ধরেছেন।
আল্লাহ তা'য়ালার এই উম্মাহর উপর বিশেষ রহমত যে তিনি নিজেই এই দ্বিনের হেফাজত করার দায়িত্ব নিয়েছেন। আর এরই উদ্দেশ্যে তিনি যুগে যুগে এই উম্মাহর মধ্যে এমন সব বান্দার আবির্ভাব ঘটিয়েছেন বা এখনো ঘটাচ্ছেন যারা এই দ্বীনকে তার মূলের উপর টিকিয়ে রাখতে নিজের সর্বস্ব কোরবানি দিয়ে চলেছেন । আর আল্লাহ আশ-শাকুরও তাদের মুখলিস প্রচেষ্টায় এমন অস্বাভাবিক বরকত দিয়েছেন যে তারই বদৌলতে আজ চৌদ্দশত বছর পরেও আমরা আমাদের প্রাণ থেকে প্রিয় এই দ্বীনকে অক্ষুণ্ন অবস্থায় পেয়েছি।
যাদের নিয়ে বইটি লিখাঃ-
★উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ.
★হাসান আল বসরী রহ.
★ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.
★ইমাম আবুল হাসান আশাআরী রহ.
★ইমাম গাযালী রহ.
★শায়েখ আব্দুল কাদির জিলানী রহ.
★আল্লামা ইবনে জাওযী রহ.
★নুরুদ্দীন জংগী রহ.
★সালাহউদ্দিন আইয়ুবী রহ.
★শায়খুল ইসলাম ইযযুদ্দিন ইবনে আব্দুস সালাম রহ.
★মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী রহ.
বইটি সম্পর্কে আগ্রহ জমাতে এই নামগুলোই যথেষ্ট বলে আশা করি। আর এর মধ্যে যদি লেখক হোন আলী মিয়া রহ.!! আপনাদের কথা জানি না আমার জন্যে এতোটুকুই যথেষ্ট।
বইটিতে উক্ত মনীষীদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে যা আমাদের সকলের জন্য বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর সেগুলো হলোঃ- আল্লাহ ভীতি, দুনিয়া বিমুখিতা, শাসকদের বিরুদ্ধে বা সংশোধনে নির্দ্বিধায় কথা বলা, জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান, সময়ের প্রয়োজন বোঝে কাজ করা হোক তা সবার কাছে অপ্রিয় ইত্যাদি। এসব বিষয় থেকে এই যুগের আলেমদের অনেক কিছু শিখার আছে।
আর আমাদের সাধারনের জন্যেও। আমরা যেন যুগের প্রয়োজন বুঝে দাওয়াতি কাজ করি, ছোট-খাটো ফিকহি বিষয় নিয়ে বিতর্কে না জড়াই, হ্বক্কানি আলেমদের সাথে জনসাধারণের পরিচয় করিয়ে দেই ইত্যাদি।
বইটির বর্ণিত ইতিহাস থেকে আমরা সকলেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাবো ইন শা আল্লাহ। তবে একটা অন্যতম লক্ষণীয় দিক হলো হ্বক্কানী আলেমদের সাথে জালিম শাসকদের সম্পর্কের ধরণ। জালিমদের বিরুদ্ধে তাদের কি অবস্থান ছিলো এই বিষয়টি ভালো করে লক্ষ্য করা আর হ্বক্কানি আলেমদের চেনা আজ সময়ের অন্যতম দাবি। যে আলেম নির্বাচন করতে ভুল করেছে সে নির্ঘাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।
বইটির আরেকটি সুন্দর দিক হলো বইটিতে উক্ত মনীষীদের জীবনী হিজরী প্রথম শতাব্দী থেকে হিজরী সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে এসেছে। আর শায়েখ জীবনী গুলোর মাঝে মাঝে সে সময়ের প্রেক্ষাপট বুঝার জন্যে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তথ্য বহুল ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু অধ্যায় যোগ করেছেন। যেগুলো বইটির সৌন্দর্য ও পূর্ণতা আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
নেতিবাচক দুটি দিক। মুসলিমবিশ্বে মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী রহ. এর শিক্ষার প্রভাব অনস্বীকার্য। মাওলানার রচিত কিতাব "মসনবি" পুরো বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। শায়েখ নদভী নিজেই মসনবি বইতে কিছু ভুল আছে বলে আলোচ্চ এই বইয়ে উল্লেখ করেছেন। আবার তিনিই সে বই থেকে এখানে এমন কিছু উক্তি তুলে ধরেছেন যেগুলোর শুদ্ধতা আমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে হয়েছে!! অতএব এ ব্যাপারে পাঠককে একটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে বলে মনে করি।
আর দ্বিতীয় নেতিবাচক বিষয়টি হলো বইয়ের অনুবাদ নিয়ে, বইয়ের প্রথম দিকের অনুবাদ তেমন ভালো ছিলো না। আবার শেষের দিকে বেশ ভালো হয়েছে। এই পার্থক্যের কারণটা আমার বোধগম্য হয়নি।
বইয়ের বাধাই, প্রচ্ছদ, পৃষ্ঠার মান, ফন্ট ইত্যাদি খুবই উচ্চ মানের ও রুচিসম্মত। এসব বিষয়ে মাকতাবাতুল হেরা আসলেই প্রশংসনীয় কাজ সম্পাদন করেছে। আল্লাহ সংশ্লিষ্ট সকলকে উত্তম প্রতিদান দিন এতো সুন্দর ও মূল্যবান একটি বই উপহার দেয়ার জন্যে। আলি মিয়া রহ ও বইয়ে উল্লেখিত সকল মনিষীদের জান্নাতুল ফিরদৌস নসিব করুন। আমীন। সকল প্রশংসা বিশ্বজাহানের একক স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর।।