শেষ দিককার অর্জুন। ২০১৯ সালে বই হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এ জিনিস পড়তে বসলে, কয়েকটা কথা মাথায় রাখতে হয়। বিশেষত, লেখকের বয়স ও শরীরের হিসেব। জীবনের শেষ কটা বছর, বিভিন্ন প্রতিকূলতায় ভুগেছিলেন সমরেশ মজুমদার। সেসবের প্রভাব যে তার লেখায় পড়বে, তাতে আর আশ্চর্যের কি। আমার এই অর্জুন পড়া, তাই ঠিক সাহিত্যরসের খোঁজে নয়। বরং প্রিয় সাহিত্যিকের কলমে প্রিয় চরিত্রকে নিয়ে আরো একটা গল্প পাবো, তারই আশায়।
উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পায় কিশোর ভারতীর পাতায়। ফলস্বরূপ, অনেকটা সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে পটভূমি রচনা করেছেন লেখক। এ জিনিস, শেষ-দিকের আনন্দমেলার অর্জুনগুলোতে পাওয়া দুষ্কর। পূজাবার্ষিকীর স্বল্প পরিধিতে গল্প গুটিয়ে নেওয়ার একটা তাড়াহুড়ো থাকে, যা এটায় মিসিং। এক দিক থেকে ভালোই। কারণ এর ফলে, গল্পটি শুরু হয়েছে দিব্যি। ভালো লাগে, প্রসেনজিৎ নাথের করা প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণও।
বাইক নিয়ে চিলাপাতার জঙ্গল মাঝে হাইওয়ে ধরে চলে, অর্জুন। জঙ্গুলে নিয়মে অন্ধকার নামে দ্রুত। আলো-আঁধারির মধ্যে বাইক খারাপ হয় তার। সেখানেই রাস্তার ধারে, সে আবিষ্কার করে একজোড়া পা। ঝোপের ভেতরে পড়ে থাকা এক মহিলার শরীর! ভদ্র ঘরের সন্তান। সে মৃত কি জীবিত, সেসব প্রশ্নের মাঝেই নানান বন্য-বিপত্তির সম্মুখীন হয় অর্জুন। আমরা যারা উত্তরের বাসিন্দা, তাদের কাছে ছবিটা অনেক বেশি পরিষ্কার। জলপাইগুড়ি থেকে আলিপুরদুয়ার যাওয়ার মাঝে চিলাপাতার জঙ্গল। বাইক বা গাড়িতে, প্রায় ২-৩ ঘণ্টার জার্নি। দুই-ধারে ঘন জঙ্গল, মাঝে পিচের রাস্তা। কিছুক্ষণ পর পর, অ্যানিমাল ক্রসিং-এর সাইনবোর্ড। একটা জোলো জঙ্গুলে সুবাস, সাথে একচেটিয়া শৈত্য। এই বুঝি, হাতি বেরোয়!
বলাই বাহুল্য, বইয়ের প্রথমাংশ পড়ে কিছুটা আশাবৃদ্ধি হয়। সাথে সমরেশ মজুমদারের কলমে, উত্তরবঙ্গের টুকরো ইতিহাস। বিশেষত, কোচ রাজা ও ভুটানিদের মাঝে দ্বন্দ্বের ঘটনাবলী। ভালো লাগে। মনে পড়ে যায়, এই কলমেই এক সময় 'কালাপাহাড়'-এর মতন দুর্দান্ত উপন্যাসের জন্ম।
কিন্তু বাধ সাধে, গল্পের পরবর্তী অংশ। মেজর আর অমল সোমের উপস্থিতি এমনিতে উপভোগ্য হলেও, এই উপন্যাসে একেবারেই ভালো লাগে না। দ্বিতীয় ভাগে, তাদের আগমন গল্পটিকে অর্জুনের থেকে দূরে নিয়ে যায়। সোলো ট্রিপ হঠাৎ করেই গ্রুপ অ্যাডভেঞ্চারে পরিণত হয়। অমল সোমের প্রেজেন্সে অর্জুনের কেচোর মতন গুটিয়ে যাওয়াটা, প্রথম দিকের উপন্যাসগুলোতে মানিয়ে গেলেও। এত বছর পড়ে, এত অভিযান বাদে, মানা মুশকিল। ওনার নেতৃত্ত্বে ভালোমানুষের মতন মাথা নেড়ে যাওয়াতেই যেন অর্জুনের পরিচয়। কিসের আর সত্যসন্ধানী সে?
গল্পটি তাই শেষমেশ নিজগুণে দাড়াতে পারে না। চোখে পড়ে বেশ কিছু ভুল-ভ্রান্তিও। বনমোহন নামক এক জনৈক চরিত্রের সাথে অর্জুনের পরিচিত হওয়ার সময়, বানারাহাট থানার ওসি জানান, "ওর নাম অর্জুন। আমাদের খুব সাহায্য করে।" পরবর্তী পৃষ্ঠায় সেই একই বনমোহন যখন সুধোয়, "আপনার নামটা আমার এখনও জানা হয়নি।" তখন সু-সম্পাদনার অভাবটা নেহাৎই চোখে লাগে। এছাড়াও, কয়েক পৃষ্ঠার ব্যবধানে, অর্জুনের মায়ের খবর জানতে অমল সোম একই প্রশ্ন দুবার করেন। অর্জুনও সেটার উত্তর দুবার দুরকম দেয়।
গল্পের মাঝবরাবর, অর্জুনের বাড়িতে ল্যান্ডলাইনে দু-তিনটে ফোন আসে। সাহায্যের ফোন। প্রেরকেরা শিলিগুড়ির বাসিন্দা। একই সমস্যা-সংক্রান্ত আর্তি। চিলাপাতার কেসে ব্যস্ত থাকায়, অর্জুন সরাসরি 'কমিট' করতে পারে না। তবে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। মজার ব্যাপার, এই ঘটনার কোনো উল্লেখই আর পরবর্তীতে করা হয় না। লেখক বোধকরি ভুলে যান পুরোটার অস্তিত্ব। তাকে খুব একটা দোষারোপ করা অনুচিত। এখানে মূল গাফিলতিটা নামী প্রকাশক এবং তাদের এডিটিংয়ের। যাই হোক, এর চেয়ে বেশি নিট-পিকিং করে কাজ নেই। ভালো মন্দের মিশেলে, কতকটা ওই চমৎকার শুরুর জন্যেই দু-তারা ব্যয় করলাম। বাকিটা আপনাদের মর্জি।
২/৫