এই বাংলার, ব্যাপক অর্থে এই আসমুদ্রহিমাচল ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন দেশটার পথে প্রান্তরে, পাহাড় অরণ্যে ছড়িয়ে আছে সুর আর সুর। কত রকমের, কত ঘরানার গান।
ট্রেনের চলার তালে তাল মিলিয়ে বাউল গান ধরেছেন গোঁসাই, ঘরছাড়া সাধক মানুষ গাইছেন তাঁর পরম পুরুষের গান, সে গানে মন উদাস হয়ে উড়ে চলে কোন সুদূরের দিকে। আবার ক্লাসরুমের নিষেধ অমান্য করে কোনও লালপাড়ার রাতজাগা কিশোরের কণ্ঠে গুনগুনিয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ, যে গানের অর্থ সে জানে না, তবু গায় কী এক ব্যাকুল তাগিদে। এই গানেরাই বেজে ওঠে পুরীর সাগরবেলায়, সব গান সব সুর মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় অনন্ত সুর সাগরে।
এই সুর এই গান এই ভাষাই একসূত্রে বেঁধে রেখেছে বহু জাতি বহু ভাষা, বহু ধর্মের এই বিশাল দেশকে, যার নাম ভারতবর্ষ। লেখক সেই সুরকেই ধরতে চেয়েছেন এই বইয়ে। অন্য স্বাদের এই বই গানের বই নয়, গান নিয়ে সুর নিয়ে গল্পের বই। মানুষের গান, মানুষের গল্প, যার মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে ভালোবাসা।
আমার এই ক্ষুদ্র পাঠক জীবনে অজস্র পাপ-কার্যের দলে আরেকটি অপরাধ যুক্ত হলো আজ। এমন একটি বইকে স্রেফ কিনে ফেলে রাখার গর্হিত অপরাধ। অন্যতম প্রিয় লেখক, রাজা ভট্টাচার্য। বইটি ওনার নাম দেখেই কেনা। সাথে মৃণাল শীলের সুন্দর প্রচ্ছদের প্রভাব। হঠাৎ কি মনে হতে, সন্ধ্যাবেলায় বইটিকে শেলফচ্যুত করে আশ্চর্য হলাম বেজায়। এসব বই থাকতে, কোন আক্কেলে ভালো থাকার তাগিদে লোকে সেল্ফ-হেল্পের দোরে মাথা ঠোকে?
কি আশ্চর্য, স্নিগ্ধ একটি সংকলন 'ঐকতান'! নামকরণেই বোঝা যায়, বইতে লেখক খুলে বসেছেন সঙ্গীতের ঝাঁপি। শান্ত, সাবেকি চালে বলে গিয়েছেন একের পর এক সুরের গপ্পো। কোনোটায় বৃষ্টিস্নাত কলকাতায় কাদা ঘেঁটে যান রবীন্দ্রনাথ তো কোথাও পুরীর সৈকতে কুস্তি লড়েন খোদ ভীমসেন যোশী! লেখাগুলোতে কোনো পাণ্ডিত্য নেই, বিশ্বাস করুন। নেই গুরুমশায়ের রোষ বা চোখ রাঙানো মিথ্যে আস্ফালন।
ঘরানা বা মার্গ চিনতে পারেন না কোনোকালেই? তাল-কানা নামে অভিহিত হন বারংবার? সারেগামা কি ডোরেমিফা মাথায় ঢোকে না কিসুই? চিন্তার কিছু নেই। আর যাই হোক, 'ঐকতান' কোনো পাঠ্য-বই নয়। অতিসরলিকৃত পন্থায় 'ডামি'দের সঙ্গীত শিক্ষার সস্তা হ্যান্ডবুকও নয়। এই বই এক সিন্দুক স্মৃতির মিনার। লেখকের ব্যক্তিগত জীবন হতে সঞ্চিত নতুন-পুরোনোর মিষ্ট সমন্বয়। মিল ওই একখানেই। সুরের সুতোর অমৃত ডোর।
সংকলনটি কলেবরেও ছোট। মাত্র ১২৭ পাতা। এর মাঝেই হালকা চালে, আড্ডার আমেজে টুকরো স্মৃতিসমূহ। এদের সিংহভাগের মূলে মাথাচাড়া দেয় ভ্রমণের কীট। বাঙালির চিরায়ত মানসভ্রমণ। গিরিডির পাহাড়, পুরুলিয়ার পলাশবন, জলঙ্গীর পদ্মাপাড়। স্বপরিবার ও স্ববান্ধব ছুটে যান লেখক বারংবার। ভ্রমণের নেশায়, ঘোরার মাঝেই ফিরে ফিরে পান অভিজ্ঞতাদের খোঁজ।
এই অভিজ্ঞতাদের স্বরূপ মানুষ-মানুষ, এদের মর্মে গানের বীজ, রঙে মাটির ছোপ, গন্ধে ভারতবর্ষের অমলিন ঐতিহ্য। সত্যিই তো। সুরের সামনে আত্মসমর্পণের এই শিশুতোষ আনন্দ আর কিসে মিলে? যেন মন্দিরের বাঁধানো সোপানে মাথা ছোয়ানোর চরম প্রাপ্তি। এসব বই পড়ে তাই হিংসে হয় বেজায়। এই ইউটিউব, স্পটিফাইয়ের যুগে, ঘরের চার-দেওয়ালে আবদ্ধ হয়ে যান্ত্রিক পন্থায় গান খোঁজায় সুখ থাকলেও, শান্তি আছে কি?
মনে পড়ে যায়, ছেলেবেলার সেই পুরোনো টেপ রেকর্ডারটির কথা। ওতে শোনা মায়ের কেনা বাংলা ব্যান্ডের হালফিলের ক্যাসেট। ছাতে বসে, লাউ-মাচার ছায়ায় ছড়ার গান তোলার সুখ-স্মৃতি। বা সিকিমগামী টেম্পোর স্পিকারে অচেনা পাহাড়ি সুর চিনে নেওয়ার নিষ্পাপ আনন্দ। স্মৃতি জিনিসটার ধরনই বুঝি ছোঁয়াচে। আহা, দুটো কলি যদি সত্যিই গাইতে পারতুম! নিদেনপক্ষে, একটি বাদ্যযন্ত্র? কিছুই জানি না। শেষমেশ, ওই শ্রবণেন্দ্রিয়ই সই। প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, ডোন্ট কেয়ার। সবই তো সঙ্গীত। সর্বভূক হওয়াতেই আসল গর্ব।
অবশ্য, রাজা ভট্টাচার্যের বই, তাতে কিঞ্চিৎ রামায়ণ থাকবে না, তাই হয়? বইয়ের সাতটি অধ্যায়ের নাম, রামায়ণের সাতটি কাণ্ডের অনুরূপ। সেই আদি থেকে উত্তর, সবটাই। দিনের শেষে, এই দেশে বোধহয় এমন কোথাও পৌঁছনো সম্ভব নয়, যেখানে রামের পদচিহ্ন নেই; এমন প্রসঙ্গ নেই, যাতে রামের উল্লেখ নেই। আর আছে সঙ্গীত। যার ধরণ ভিন্ন। কোথাও বাউন্ডুলে ও কলহপরায়ণ, তো কোথাও মধুর ও মিলনস্বরুপ। মাতৃরূপি প্রকৃতির নির্ভেজাল বর্ণলিপী।
এরই মাঝে, প্রায় সূর্য-কিরণ ন্যায় জাজ্বল্যমান অকাট্য মানবধর্ম। উপেক্ষা করে, সাধ্য কার? আমিও তাই পাতা উল্টে যাই। মন খারাপের রাত্তিরে, গুনগুন করি লালনের সুর। অন্য কোনো উপায় দেখি না আর। দেখতে চাইও না বুঝি।
একটানা সুর, এককতা মানুষের: রাজা ভট্টাচার্যের ‘ঐকতান’
যে দেশে এক ঘণ্টার মধ্যেই বাউলের আকাশভেসে যাওয়া সুর থেকে শুরু করে ভূপেন হাজারিকার দ্রোহগর্ভ গলায় ভেসে আসে ধরণীর গান—যে দেশে রেডিয়ো ঘুরিয়ে মুহূর্তেই কানে পড়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত, পাশেই বাজে কিশোর কুমার; রাঘব চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠস্বরের ঘন মেঘের পাশে ধরা দেয় পিনাকী বোসের দিগন্তছোঁয়া সুর—সে দেশের গল্প আলাদাভাবে না বললে অন্যায়। সে দেশটির নাম ভারতবর্ষ।
এবং যিনি সেই দেশে ছড়িয়ে থাকা সুরের ঐক্যতান ধরার সাধনায় নিমগ্ন, তিনি কেবল লেখক নন—একজন সঙ্গীতযাত্রী, সুরের তীর্থভ্রমণকারী। তাঁর হাতে বই নয়, যেন এক অদৃশ্য সরস্বতী-বীণা, যার প্রতিটি তারে বাঁধা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লোকস্মৃতি, জাতিস্মারক, আর রাগরাগিণীর অনুরণন।
রাজা ভট্টাচার্যের ঐকতান ঠিক তেমনই এক স্মৃতি-ভরা সুরবিন্দু। এটি এমন একটি বই, যা কেবল পড়া যায় না—শোনা যায়, অনুভব করা যায়। যেমন কোনও নির্জন বিকেলে দূর থেকে ভেসে আসে হারমোনিয়ামের আবছা ধ্বনি, কিংবা কারও অচেনা গলার লয়ে পুরোনো কোনও গান অজান্তেই মনে বাজে। এই বই পড়তে পড়তে মনে হয়—গানই একমাত্র ভাষা, “that speaks directly to the soul, without the need of translation.”
ঐকতান হল সেই আত্মিক অনুরণন, যেখানে এক সুরে বাঁধা পড়ে যায় বহুস্বরের ভারতবর্ষ। এই বই পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায় বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ যেহরাবাই আগেওয়ালার সেই কথাটি—“In music, there is no Hindu or Muslim. There is only sur, taal, and bhav.” ঐকতান হল সেই নিখাদ অনুভব যেখানে জাতি-ধর্মের বেড়া ভেঙে মানুষ হয়ে ওঠে এক, শুধু সুরের ছায়াতলে।
এই বই কোনও সংগীততাত্ত্বিক গ্রন্থ নয়। এখানে নেই রাগ-রাগিণী, তাল-তানপুরার খুঁটিনাটি আলোচনার ভার। এখানে 'সুর' কোনও তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়—এ এক অনুভূতির প্রবাহ, এক অন্তর্গত অভিজ্ঞতা। বরং আছে কাদামাখা পায়ে পুরুলিয়ার পদ্মাপাড় ঘুরে বেড়ানো, আছে বর্ষার জলে ভিজে ফেরা গিরিডির পাহাড়ঘেরা গ্রামে হারিয়ে যাওয়া এক রবীন্দ্রনাথ, কিংবা ট্রেনের কামরায় বসে হঠাৎ শুনে ফেলা এক সন্ন্যাসী বাউলের গান—যার সুরে ভেসে যায় মন।
আছে সেই রাত্রির কথা, যখন চাঁদের আলোয় কারও গলায় অকারণ ভেসে ওঠে রাগ পিলুর বেদনাঘন স্পন্দন। আছে সেই অপ্রত্যাশিত কুস্তির বর্ণনা, যেখানে পুরীর সৈকতে এক অলৌকিক দৃশ্যের মধ্যে ভীমসেন যোশীর গান হয়ে ওঠে এক দেবতা-সম মুহূর্ত।
‘ঐকতান’ আসলে সংগীতের নামে লেখা এক আত্মজীবনী, যেখানে লেখক নিজেকেই খোঁজেন সুরের ছায়ায়। এ এক সুরভরা জীবনদর্শন, যেখানে সত্যি করে বিশ্বাস করা যায়—"ঈশ্বর বাঁচিয়ে রাখেন সুরকারের হাত।"
বা, আরও গভীরে গেলে বলা যায় রবীন্দ্রনাথের সেই অনন্ত উপলব্ধির পথ ধরেই: “সুরে সুরে মিলন হল প্রাণে প্রাণে…”
এই বই যেন ঠিক সেই মিলনের রূপরেখা।
পাঠ ও প্রাপ্তির মধ্যবর্তী সেতু
বইটির শুরু যেন এক ধ্রুপদী আলাপন—নির্ঘোষ দিয়ে নয়, বরং হৃদয়ের গহীন থেকে উঠে আসা এক অন্তরস্বরে। লেখক বলেন, "এই বাংলার, ব্যাপক অর্থে এই আসমুদ্রহিমাচল ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন দেশটার পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে সুর আর সুর..." এই বাক্যে যেন ধরা থাকে একটি দীর্ঘশ্বাস, একটি জাতির সঙ্গীতময় আত্মজৈবনিক ইতিহাস।
সেই সুরের শরীরে কখনও আছড়ে পড়েছে শ্রাবণের শিস-তোলা বৃষ্টি, কখনও তা ছুটে নিয়ে গেছে লেখককে অনাম্নী ভ্রমণের ঘোরে। ট্রেনের ঝকঝকে কামরায়, পুরুলিয়ার কাদা ভরা চৌরাস্তার মোড়ে, অথবা শিশিরে ভেজা কোনো ভোরবেলার পদ্মাপারে—সবখানেই সেই সুরের উপস্থিতি।
রাজা ভট্টাচার্য এই সংকলনে গানের সূত্র ধরে খুঁজে পেয়েছেন মানুষকে, তাঁর মুখ, চোখ, উচ্চারণ, স্পর্শ ও স্মৃতিকে। খুঁজেছেন মননকে—গভীর জীবনদর্শনের ধ্যানী নিরীক্ষাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা—খুঁজে পেয়েছেন ভালোবাসাকে। কারণ গানই তো সেই শেষ আশ্রয়, যা মানুষকে মানুষে বেঁধে রাখে, সুরে গাঁথে ভাষার সীমারেখার ওপারে।
Rabindranath once said, “Music fills the infinite between two souls.” এই বই সেই অনন্ত শূন্যতাকে সুরে সুরে পূর্ণ করে তোলে—এক পাঠকের আত্মা থেকে আরেক পাঠকের হৃদয়ে সেতুবন্ধন রচনার নিঃশব্দ প্রয়াসে।
পুরাণের সুর ও সুরের পুরাণ: বইটির প্রতিটি অধ্যায়ের নাম রামায়ণের কাণ্ডের অনুরূপ—আদি থেকে উত্তর, যেন সঙ্গীতের বেণুবাদ্যে মেলে জাতীয় পুরাণের পুনঃপাঠ। এই নামকরণের মধ্যেই এক নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি—গান শুধু রস নয়, তা স্মৃতি, তা সংস্কার, তা এক গভীর ঐতিহ্যের নিত্যপথিক অনুরণন।
এই কৌশলে লেখক যেন বলে ওঠেন—এই দেশ আর এই সুর, তারা কেউ আলাদা নয়। সুর নেই এমন কোনও দেশ নেই, আর এই দেশ ছাড়া সুরও যেন অসম্পূর্ণ। অরণ্যকাণ্ডের ঘন ছায়া হোক বা সুন্দরকাণ্ডের জয়গান—সবখানেই বাজে এক অলক্ষ্য বাঁশি, যার ধ্বনি মিশে যায় মাটির গন্ধে, মানুষের গলায়, নদীর কলধ্বনিতে।
"রামচন্দ্র কোথাও নেই, তবু সবখানেই আছেন"—এই আদিগন্ত, বহুযুগান্তরের সত্যকে রাজা ভট্টাচার্য এই বইয়ে বুনেছেন নিঃশব্দে, অনবদ্যভাবে। তাঁর ভাষা চিৎকার করে কিছু বলে না, কিন্তু প্রতিটি বাক্যের অন্তঃসুরে থাকে এক প্রগাঢ় ঋদ্ধতা—যেন রামায়ণ, কেবল ধর্ম নয়, এই ভূখণ্ডের সুরলোকে রচিত এক অন্তর্জাত চেতনার উৎসার।
স্মৃতি-সুরের মিলনমালা
‘ঐকতান’ পড়তে পড়তে পাঠকের মনে নেমে আসে এক আশ্চর্য অনুভব—যেন খুলে বসেছে পুরোনো দিনের ক্যাসেটের বাক্স, যেন আবার ফিরে গিয়েছেন সেই লাউ-মাচার নিচে বসে মাকে গুনগুন করতে শোনার দিনগুলোয়, কিংবা সেই সিকিমগামী টেম্পোর কাঁচভাঙা স্পিকারে ভেসে আসা অচেনা পাহাড়ি সুরের দিকে চাওয়া নীরব বিস্ময়ে। রাজা ভট্টাচার্য গানের বিশ্লেষণ করেন না—তিনি গানকে ব্যবহার করেন জীবনের গল্প বলার হাতছানি হিসেবে। তাঁর লেখায় নেই পরিভাষা, নেই পাণ্ডিত্য জাহিরের অপ্রয়োজনীয় ভার। আছে শুধু এক অন্তরঙ্গ কথোপকথন, যেখানে পাঠক নিজেই পরিণত হন সেই যাত্রার সঙ্গী, সেই গানের অন্তঃস্বর।
এক জায়গায় লেখেন—
"এই যে সুর, তারও কোনও ঠিকঠিকানা নেই। বর্ষার সকালে জয়জয়ন্তী হতে পারে, চাঁদের রাতে পিলু।"
এই একটি পঙ্ক্তিতেই ধরা পড়ে বাংলা গানের চিরন্তন বৈচিত্র্য ও মানুষের অভিজ্ঞতার অসীম ব্যাপ্তি। সুর এখানে নিছক ধ্বনি নয়, হয়ে ওঠে এক জীবনভাব, এক চলমান অস্তিত্ব।
রাজার গদ্য ঠিক যেন রাগের আলাপ। ধীরে ধীরে খুলে যায় তার স্তর, একেকটি বাক্য একেকটি তান হয়ে বেজে ওঠে পাঠকের চেতনায়। কোনও দম্ভ নেই, আড়ম্বর নেই, কিন্তু আছে এক নির্মল, শুদ্ধ সংগীতের মতো আকর্ষণ, যা একবারে মনে ঢুকে পড়ে। যেমন Kumar Gandharva একবার বলেছিলেন— “A true note touches not the ear, but the soul.”
‘ঐকতান’-এর প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন সেই ‘true note’-এর পরম স্পর্শ।
শ্রবণের প্রজাপতি: স্মৃতিসিন্দুকে 'ঐকতান'
ঐকতান পড়ে পাঠকের মনে এক ধরনের নরম হিংসা জন্মায়—কেন এই বই আগে পড়া হয়নি? কেন এমন একটি জীবনভর সঙ্গে রাখা গানের গল্প এতকাল শুধু বইয়ের তাকে মুখ গুঁজে পড়ে ছিল? এই বই কোনও আত্মজীবনী নয়, তবু তাতে আত্মার স্পষ্ট সাক্ষর রয়েছে। এটি কোনও ট্র্যাভেলগ নয়, কিন্তু তার প্রতিটি পাতায় জেগে থাকে ভ্রমণের ঘোর, পথের ধুলো, ট্রেনের জানালার বাইরে বয়ে যাওয়া সুরেলা হাওয়া। এটি কোনও তথাকথিত ‘রিভিউযোগ্য’ পাণ্ডিত্যগর্বিত পাঠ্য নয়, বরং একান্ত অনুভবযোগ্য এক স্মৃতিসিন্দুক, যাকে ছুঁতে হয় কান পেতে—ঠিক যেমন কোনও হারিয়ে যাওয়া সুরকে ধরা যায় শ্রবণের শুদ্ধতায়।
লেখকের গদ্য এমন সহজ, যেন তা পাঠকের মনের ভাষা। কোনও আত্মম্ভরিতা নেই, কোনও স্থুল ব্যাখ্যা নেই—আছে শুধু হৃদয়ের টান। বারবার ফিরে আসে মানবিকতার ছায়া, এক অসীম করুণার ছোঁয়া, যে করুণা আমাদের সকলের, এই উপমহাদেশের চিরন্তন ঐতিহ্যের।
বইটি শেষ করে পাঠকের মনে হতে পারে—সত্যিই তো, “সঙ্গীতই ভাষার একমাত্র নির্জন আশ্রয়।” (“Music is the silence between the notes.” — Claude Debussy)
আর সেই নির্জনতাই হয়তো আমাদের গভীরতম অনুভবের একমাত্র ভাষা। ঐকতান সেই ভাষাতেই লেখা।
উপসংহার: ঐকতান কেবল একটি বই নয়, এটি এক মানসিক শ্রবণানন্দ। এখানে গল্প আছে, কিন্তু তা কোনও রচনাকেন্দ্রিক কাহিনি নয়; এখানে স্মৃতি আছে, কিন্তু তা আত্মমুগ্ধ অন্ধতার নয়। বরং এই বই পাঠককে নিয়ে যায় এমন এক শব্দস্নিগ্ধ ভ্রমণে, যেখানে কখনও পুরুলিয়ার মাটির গন্ধ, কখনও জলঙ্গির ধারে রূপালি জ্যোৎস্না, আর কোথাও এক ভাঙা হারমোনিয়ামের নিঃশেষ রিডের মতো অনুরণিত হতে থাকে হারিয়ে যাওয়া কোনও সুর।
এই বই পড়া মানে এক নিঃশব্দ সন্ধ্যায়, জ্যোৎস্নার নিচে বসে নিজের জীবনের প্লেলিস্টে ফিরে যাওয়া—সেই গানগুলোতে, যেগুলো কখনও শেখা হয়নি, তবু আত্মায় গাঁথা হয়ে গেছে। আর তখনই টের পাওয়া যায়, গান আসলে শেখার বিষয় নয়, তা অনুভবের, আত্মসমর্পণের, আত্মচেতনার আর এক নাম। Music is not what you hear—it’s what you remember when the sound fades.
রাজা ভট্টাচার্যের ঐকতান সেই উপলব্ধিরই এক অনুপম সংগীতসঙ্গী—যে সঙ্গী কোনও গানের তাল-মাত্রা বোঝে না, কিন্তু বোঝে সেই অস্ফুট হাহাকার, যা একরাশ শব্দের মধ্যেও নিঃশব্দ থেকে যায়।
এ এমন এক বই, যা বারবার পড়া যায়, তবু প্রতিবার মনে হয়, কোনও নতুন সুর যেন এখনও ঠিক ধরতে পারিনি।
"এই যে সুর, তারও কোনও ঠিকঠিকানা নেই। বর্ষার সকালে জয়জয়ন্তী হতে পারে, চাঁদের রাতে পিলু।"
‘ঐকতান’ — ভারতের সঙ্গীত বিষয়ক এই লেখা রাজা ভট্টাচার্যের একটি অনবদ্য সৃষ্টি, যেখানে সুরের জটিলতা এবং আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীরতা তুলে ধরা হয়েছে।
‘ঐকতান’ হচ্ছে একটি অমূল্য স্মৃতিসিন্দুক। যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় এক অসীম অনুভব টান রয়েছে, যেখানে পাল্লা দেয় স্থান-কাল, একত্রিত হয় সঙ্গীতের অজানা অধ্যায়। লেখকের গদ্যে প্রতিটি বাক্য যেন এক সুরের ধ্বনি—‘সুর’ এখানে একটি অনুভূতির প্রতীক। লেখক সঙ্গীতকে জীবনের নানা দিক উন্মোচনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি সঙ্গীতের বিশ্লেষণে নয়, বরং জীবনের গল্প বলার একটি মাধ্যম হিসেবে এটি গ্রহণ করেছেন।
এই বইয়ে যে সুরের ঐকতান ধরা পড়েছে, তা কেবল আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়, বরং জাতি, ধর্মের বেড়া ভেঙে এক নতুন সঙ্গীতময় চেতনা তৈরি করেছে। লেখক দেখিয়েছেন যে সঙ্গীত কিভাবে আমাদের জীবনকে আকার দেয় এবং আমাদের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে।
পাঠকের হৃদয়ে ‘ঐকতান’ নেমে আসে এক আশ্চর্য অনুভবের সঙ্গে, যার প্রতিটি সুর যেন একটি ভ্রমণ, যা আমাদের আত্মার গভীরে প্রবাহিত হয়। তিনি বর্ণনা করেছেন কিভাবে সুর আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, এবং সেই সুরের ছায়া আমাদের স্মৃতিপটে অঙ্কিত হয়ে থাকে। এই অভিব্যক্তি আমাদের জানায় যে সঙ্গীত একাকিত্বকে দূর করে, ও একত্রিত করে আমাদের অভিজ্ঞতাগুলোকে।
"পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয়! পথের দু'ধারে আছে মোর দেবালয়!"
সার্বিকভাবে, ‘ঐকতান’ একটি অমূল্য রত্ন, যা পাঠককে নিয়ে যায় স্মৃতির গন্ধে ভরা এক চলমান সুরের অন্বেষণে। রাজা ভট্টাচার্যের এই রচনা যে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শুধুমাত্র আবহমান করে তা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন দিশা নির্দেশ করে—এটাই ‘ঐকতান’ এর মহিমা।
অতএব, হে পাঠক.. অবিলম্বে বইটিকে হাতে তুলে নিন এবং সুরের পথ ধরে নতুন জগতের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ুন।
◻️"এই যে সুর, তারও কোনও ঠিকঠিকানা নেই। বর্ষার সকালে জয়জয়ন্তী হতে পারে, চাঁদের রাতে পিলু।"
◻️এই বাংলার, ব্যাপক অর্থে এই আসমুদ্রহিমাচল ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন দেশটার পথে প্রান্তরে, পাহাড় অরণ্যে ছড়িয়ে আছে সুর আর সুর। কত রকমের, কত ঘরানার গান। ট্রেনের চলার তালে তাল মিলিয়ে বাউল গান ধরেছেন। গোঁসাই, ঘরছাড়া সাধক মানুষ গাইছেন তাঁর পরম পুরুষের গান, সে গানে মন উদাস হয়ে উড়ে চলে কোন সুদূরের দিকে। আবার ক্লাসরুমের নিষেধ অমান্য করে কোনও লালপাড়ার রাতজাগা কিশোরের কণ্ঠে গুনগুনিয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ, যে গানের অর্থ সে জানে না, তবু গায় কী এক ব্যাকুল তাগিদে। এই গানেরাই বেজে ওঠে পুরীর সাগরবেলায়, সব গান সব সুর মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় অনন্ত সুরসাগরে। এই সুর এই গান এই ভাষাই একসুত্রে বেঁধে রেখেছে বহু জাতি বহু ভাষা, বহু ধর্মের এই বিশাল দেশকে, যার নাম ভারতবর্ষ।
লেখক সেই সুরকেই ধরতে চেয়েছেন এই বইয়ে। অন্য স্বাদের এই বই গানের বই নয়, গান নিয়ে সুর নিয়ে গল্পের বই। মানুষের গান, মানুষের গল্প, যার মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে ভালোবাসা।
◻️পাতায় পাতায় যেমন গানের মুকুল ধরেছে, তেমনি জীবন দর্শনের মুকুলও রয়েছে, শুধু পাঠকের বোঝার অপেক্ষা। এ এমন এক বই, যা বারবার পড়লেও প্রতিবার সবকিছু যেন নতুন করে আবিষ্কার করা যায়। এ এমন এক, যাকে কোনো রিভিউ-টিভিউয়ের গন্ডিতে বাঁধা যায়না, উচিতও নয়, আমিও পারিনি। ভীষণ সাদামাটা-আটপৌরে লেখা, কিন্তু কি অসামান্য তার প্রভাব। গানের মত বেঁধে রাখতে বোধহয় আর কিছুই পারে না। ভাবপ্রকাশে ভাষার বাধা ঘুচিয়ে দিতে পারে একমাত্র গানই। সুরের কোনও ভাষা হয়না। তেমনি এই বইকে বোঝানোরও কোনো ভাষা হয়না, শুধু পড়ে অনুভব করতে হয়।