একটা সময় ছিল, যখন ‘ভূত’ শব্দটা ‘জুজু’র সমার্থক হয়ে দীর্ঘদিন মনে বাসা বেঁধে ছিল। ‘বাংলার উপকথা’ বা গুপী-বাঘার থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া তেনাদের পরিচয় বিস্তৃত ছিল পাকুড় গাছের ডাল, নিমতলার শ্মশান, থেকে গ্রামের রং না করা মাটির বাড়ির চাল পর্যন্ত। আরেকটু বড় হবার পর দেখলাম ‘তেনারা’ তেমনই আছেন, শুধু বয়সের বিচারে একটু রং পালটিয়ে – পাকুড় গাছ হয়ে গেল কোন পোড়ো বাড়ির বিম, “ভাঁটার মত চোখ, কুলোর মত কান, মুলোর মত দাঁত” কিরকম যেন মরা মাছের চোখ নিয়ে অন্ধকার করিডরে হেঁটে বেড়ানো সাদা পোশাক পরা আবছায়া মূর্তির চেহারা নিল, একটা সুখী পরিবার নির্জন জায়গায় ছুটি কাটাতে এসে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে লাগল। আরেকটু বয়স বাড়তে দেখলাম, এনারা সত্যিই আছেন, কি সবই মানুষের অলীক মনের কল্পনা, এই জায়গাটা অধিকাংশ ভালো সাহিত্যে বা চলচ্চিত্রে পাঠক বা দর্শকের ওপর অনেকটা ছাড়া থাকে (এই জায়গায় সত্যজিতের ‘মণিহারা’র উদাহরণটা না দিয়ে পারলাম না, কারণ আমার জনৈক বন্ধুর মনে হয়েছিল গল্পটা সেরকম উচ্চমার্গের নয়)।
হুমায়ূন আহমেদের ‘ভূতসমগ্র প্রথম খণ্ড’ এই শেষ গোত্রের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ‘উল্লেখযোগ্য’ এই কারণে, প্রথমত ইনি বাংলাদেশের একেবারে প্রথম দিকের সাহিত্যিক, তাই এপার বাংলায় তাঁর বই পড়ার সৌভাগ্য বোধহয় খুব বেশি জনের হয়নি। আর দ্বিতীয়ত, এই ধরণের বই বা এই শ্রেণীর কাহিনী বাংলা সাহিত্যে আর নেই (অন্তত আমার সীমিত জ্ঞানের বিচারে)। হ্যাঁ। সত্যজিৎ, প্রেমেন মিত্তির, বা শরদিন্দুর গুটিকতক কাহিনী বাদ দিলে এরকম মনস্তাত্ত্বিক গল্প-উপন্যাস বাংলায় কম শুধু নয়, নেইই। আরেকটু খোলসা করি। আজকাল (একটু ভুল হল, অন্তত বিগত কয়েক দশক ধরেই) পৃথিবীতে থ্রিলার সাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আলফ্রেড হিচকক যে শাখায় গবেষনামূলক কাজ করেছিলেন, সেই ‘psychological thriller’, আজ তাঁর ‘Vertigo’ থেকে শুরু করে Paula Hawkins এর ‘Girl on The Train’, Stephen King এর ‘Shining’ বা ‘It’, Thomas Harris এর বিখ্যাত Hannibal Lecter series, Jonathan Kellerman বা জাপানি অ্যানিম সিরিজ Death Note পর্যন্ত বিস্তৃত। এই গল্প কনান ডয়েল বা আগাথা ক্রিস্টির আমলে ছিল না তা নয় (যেমন ১৯৪৪ সালে তৈরি হওয়া সিনেমা Gaslight, যেখান থেকে একটা মনস্তাত্ত্বিক অত্যাচার Gaslighting এর নামকরণ হয়েছে, বা ১৯৪৫ সালের J.B.Priestley র নাটক An Inspector Calls, যেখান থেকে অজিত গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘থানা থেকে আসছি’), কিন্তু তখন, মানে যে যুগটাকে ‘গোয়েন্দা কাহিনীর স্বর্ণযুগ (Golden Age of Detective Fiction)’ বলা হয়ে থাকে, তখন নিছক গোয়েন্দা কাহিনী (সূত্রনির্ভর খোঁজতল্লাশি বা deductive reasoning এর ওপর নির্ভরশীল গল্প) লেখারই চল ছিল বেশি। এই বিভাগটি জনপ্রিয় হয়েছে হালে। বাঙালি সাহিত্যিকেরা কেন যে এই বিশেষ শাখাটির প্রতি অমনোযোগী, আজ পর্যন্ত আমি বুঝে উঠতে পারিনি। বোধহয় রহস্য সাহিত্যকে অপাংক্তেয় করে রাখার যে মনোভাব প্রথম থেকেই এদিককার সাহিত্যিকদের মধ্যে ছিল, তার জের এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি তাঁরা। আরেকটা কারণ আছে, যেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত মতামত, খুব সম্ভবত এঁদের মাথার কাজ করতে চাওয়ার অনিচ্ছা।
এই পর্যন্ত ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলাম, এমন সময় হাতে এল হুমায়ূন আহমেদের এই বইটা। এঁর কোন লেখাই আমি আগে পড়িনি, শুধু নামটা জানতাম এনার মৃত্যু আর কিশোর ভারতীর কল্যাণে (আরও একটা কারণ আছে, সেটায় পরে আসছি)। বলতে খারাপ লাগলেও এটা সত্যি, কখনো কখনো মৃত্যু মানুষকে বেশি জনপ্রিয় করে দিয়ে যায় তার জীবদ্দশার তুলনায়। ২০১২ সালে তিনি চলে যাবার পরের মাসে কিশোর ভারতীর সম্পাদকীয় বেরিয়েছিল তাঁকে নিয়ে। বরাবরের বিনীত মানুষটির একটা অভিযোগ মনে আছে এখনও, এপার বাংলার (মানে আমরা) পাঠকরা বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে খুব বেশি ওয়াকিবহাল নন, যতটা তাঁরা আমাদের সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন। তখন মাথায় নিইনি (নাকি নিয়েছিলাম ?)। আজ বুঝলাম কথাটার সত্যতা। এই বইয়ের পরতে পরতে উঁকি দিয়ে গেছে শীর্ষেন্দু, সুনীল, রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের নাম।
হুমায়ূন আহমেদ মূলত যে দুটি চরিত্রের জন্য সবচেয়ে খ্যাতিমান, তার দুটির একটি মিসির আলির ৫ টি কাহিনী রয়েছে এ গল্পে। যিনি পেশাতেই অ্যাবনরমাল সাইকোলজির অধ্যাপক (মিসির আলি, হুমায়ূনবাবু নন), তিনি যে ভূতপ্রেতে বিশ্বাস করবেন না, এ বোঝা আর এমনকি শক্ত? অদ্ভুত জিনিস নিয়েই তো তাঁর কারবার। তবু ‘আস্তিক’ দের জন্যও জায়গা ছাড়া রয়েছে মিসির আলির কাছে, তা তিনি মানুন কি নাই মানুন। মিসির আলির প্রথম উপন্যাস ‘দেবী’, যার জের আছে তাঁর পরবর্তী উপন্যাস ‘নিশীথিনী’ তেও। প্রথমটির কাহিনী আবর্তিত হয় এক নারী রানুকে ঘিরে, যার সর্বক্ষণের সঙ্গী এমন একজন, যাকে দেখা যায় না, অনুভব করা যায়। তাঁর স্বামী মিসির আলির কাছে আসেন চিকিৎসার জন্য, যা তাঁকে টেনে নিয়ে যায় রানুর ছোটবেলায়। তাতে কি রহস্য সমাধান হয়? বোধহয় না। নাহলে এর রেশ পরবর্তী উপন্যাসে গেল কি করে? মিসির আলির অন্য কাহিনীগুলির মধ্যে আছে ‘বৃহন্নলা’, ‘আমি ও আমরা’, আর ‘বিপদ’। মিসির আলি নেই, এরকম কাহিনী রয়েছে আরও ৫ টি। সবকটি উপন্যাস নয়, গল্পও আছে। শুধুমাত্র ভালো বলে এদের ছোট করতে চাই না। শুধু বলব, বাইরে উঁকি দেবার আগে ঘরের সম্পদটা চেখে দেখবেন না?
বইয়ের কাহিনীর সাথে পাল্লা দিয়েছে তার সজ্জা। প্রতিটি কাহিনীর প্রচ্ছদে একটা করে ছবি, সেটাও হাতে আঁকা নয়, গ্রাফিক্সে করা। কিন্তু এত পরিশীলিত আর তাৎপর্যপূর্ণ সেসব ছবি, না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত। মূল প্রচ্ছদটার কথা না বলে পারছি না। একটা ঘর দেখা যাচ্ছে, যে ঘরটার দুদিকে দুটো বন্ধ দরজা, জেলখানায় জেরকম থাকে। দুটো দরজা থেকেই অসংখ্য হাত বেরিয়ে এসে পরস্পরকে ধরতে চাইছে, কিন্তু তাঁদের ব্যবধান এতই বিস্তর, তারা কেউই পেরে উঠছে না। ব্যস, এইটুকুই। এই আলো-আঁধারি, রহস্যময়তা হুমায়ূনের লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। মিল পাওয়া যেতে পারে রামকৃষ্ণদেবের কথার সাথেও “নুনের পুতুল সাগর মাপতে গিয়ে আর ফিরে আসে না।” তথাকথিত ভূতদের ভিলেন বানিয়ে ফেলার চেষ্টা এ কাহিনীতে নেই। আমেরিকার North Dacota State University থেকে polymer chemistry তে ডক্টরেট হুমায়ূনের রসায়নের দর্শন প্রভাব বিস্তার করেছে বইয়ের পাতাতেও।
এবার একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে রাখি, যেটার কথা আগে এড়িয়ে গেলাম। কলকাতার পরিচালক শেখর দাস একটা সিনেমা করেছিলেন ২০১৩ সালে ‘ESP: একটি রহস্য গল্প’ বলে, যেটার কাহিনীর সাথে ‘দেবী’র আশ্চর্য মিল। ওনাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, ছবির গল্পটা নাকি মৌলিক। সিনেমাটায় গল্পকার হিসেবে নাম আছে শিবাশিস রায়ের। কি সাংঘাতিক ব্যাপার! হুমায়ূন বাবু যখন লিখেছিলেন (১৯৮৫), আর ইনি যখন লিখছেন, দুজনের চিন্তাভাবনাই একেবারে একই খাতে ছিল! স্বয়ং মিসির আলিও এই রহস্যের সমাধান করতে পারতেন কিনা জানা নেই।
শেষ করি নিজের একটা অনুভূতির কথা দিয়ে। হুমায়ূন নিজে আহমেদ হলেও তাঁর উপন্যাসের নায়িকা কিন্তু এক তথাকথিত হিন্দু দেবী। আজকের প্রেক্ষাপটে এটা কি অন্যরকম বার্তা নিয়ে আসতে পারে?
প্রকাশক ‘অন্যপ্রকাশ’। ISBN: 984 868 185 X. শুধুমাত্র মিসির আলির কাহিনী পাওয়া যাবে কাকলি পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ‘মিসির আলি সমগ্র’র তিনটি খণ্ডে।