Jump to ratings and reviews
Rate this book

জীবন আমার বোন

Rate this book
Psychedelic journey of an apathetic youth, his sister and the people around them during the political volatility of 71.

158 pages, Hardcover

First published May 1, 1976

27 people are currently reading
533 people want to read

About the author

Mahmudul Haque

20 books112 followers
Mahmudul Haque (Bangla: মাহমুদুল হক) was a contemporary novelist in Bangla literature. He was born in Barasat in West Bengal. His family moved to Dhaka after the partition in 1947. His novels deal with this pain of leaving one's home.

Mahmud gave up writing in 1982 after a number of acclaimed novels. Affectionately known as Botu Bhai and always seen as a lively figure in social gatherings, the rest of the time he was said to lead a solitary life.

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
180 (41%)
4 stars
188 (43%)
3 stars
54 (12%)
2 stars
13 (2%)
1 star
2 (<1%)
Displaying 1 - 30 of 99 reviews
Profile Image for Nusrat Mahmood.
594 reviews750 followers
November 2, 2017
যে বই পড়ে ঘোরে চলে যেতে হয় এবং ঘোর কাটতে দু-তিনদিন চলে যায় সেই বই পড়ার অনুভূতি প্রকাশ করাটা কঠিন, বেশ কঠিন। এর আগে মাহমুদুল হকের ছোট গল্প পড়েছি। সেখানেই বলতে গেলে মোটামোটি বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম। জীবন আমার বোন বইটা সেই অল্প কয়েকটা বইয়ের একটা যার ব্যাপারে প্রশংসা বাদে অন্য কিছু আজ পর্যন্ত কানে আসেনি। বিপরীত প্রতিক্রিয়া পেয়েছি বা যাদের কাছ হতে পেয়েছি তারা কারণগুলো ঠিকমতো ব্যখ্যা করতে পারেননি তাই সেগুলো গোণায় ধরলাম না।

খোকা চরিত্রটা কি যত্ন ও অবহেলা একই সাথে লেখক এমন সুনিপুনভাবে আঁকলেন তা ভেবে আমার আশ্চর্য লাগে। আমি খোকার সাথে নিজের একটা সম্পর্ক খুজে পাই কারণ কোথাও না কোথাও আমি খোকার মতোই। এই যে একটা আসন্ন যুদ্ধ, তারপরও কি নির্লিপ্ততা নিয়ে খোকা ঘুরে বেড়ায় এ আমার রোজকার গল্প। আমার মনে হয় খোকা জানে তাকে কি করতে হবে এবং তা এড়ানো সম্ভব না জেনেই সে বারবার দেশের সংজ্ঞা খুঁজতে বের হয়। তার জীবনে আছে নীলা ভাবীর বেডরুম, লুলু চৌধুরীর খসে পরা আঁচল, বেলীর ব্লাউজের অন্তরালে থাকা রহস্য - এগুলো আশ্রয় করে, প্রত্যাখ্যান করে এক এক সময় এক এক ভাবে খোকা নিজেকে প্রকাশ করে। বন্ধুত্বের বেড়াজালে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে জানে আবার ছেঁড়েছুড়ে চলে আসতেও জানে।

নারী চরিত্রএর ভুমিকা নিয়ে যথেষ্ট খচখচানি থাকলেও কেন জানি প্যাঁচাতে ইচ্ছা করেনা কারণ পড়তে গিয়ে মনে হয় সব গল্পের প্রয়োজনে নিজ নিজ জায়গায় ঠিক সময়ে ঠিকভাবে উপস্থিত ছিল। সেক্সিজম দোষে দুষ্ট তাই মানতে গিয়েও মানিনা।

আফসোস কি জানেন? জীবন আমার বোনের মতো বই থাকা সত্ত্বেও পত্রিকায় আমাদের নায়ক নায়িকাদের এক হুমায়ূন আহমেদের হিমু আর মিসির আলী বাদে কখনো অন্য কোন বইের কথা উল্লেখ করতে দেখলামনা। মাঝে মাঝে জিনিসটা ভাবায়। মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছু সবার জন্য না, সবাই সবকিছু ধারণ করতেও পারেনা।
Profile Image for Shuhan Rizwan.
Author 7 books1,132 followers
May 1, 2016
মাহমুদুল হকের প্রথম পড়া বইটি ছিলো তার অগ্রন্থিত গল্প। লেখার তুঙ্গে থেকেও কলম ত্যাগে যে রোমান্টিক মিথ গড়ে উঠেছে তাকে ঘিরে, অগ্রন্থিত গল্পে তার সত্যতা আমি পাই না। ওভাবেই থেকে যাই বিচ্ছিন্ন আরো কিছু ছোটগল্প পাঠ করে।

তবু তার সমস্ত উপন্যাস, প্রশংসায় যারা বিপুল স্নাত, পড়তে বসে যাই। এশিয়ায় চলমান অদ্ভুত দাবদাহ, ভীতি আর রক্ত সয়ে যাওয়া দেশ, আর নিস্পৃহ জনপদের ছায়া স্ক্রল করে আবিষ্কার করি, জীবন আমার বোন।

ট্রানজিস্টার সেখানে বনবেড়াল, সেখানে দেশ পুড়লেও নীলাভাবীর সমস্ত বয়স এলোমেলো করা যায় দুহাতে। সেখানে প্রতিটি চরিত্র, এতোদিন পরেও ফিরে এসে আমাদের চারপাশের দখল নেয়। যেখানে, যেভাবে গোরভিদাল আর সোফিয়া লরেন জায়গা নেয় রেক্সে, সেখানে-সেভাবেই জাদুকর হয়ে ওঠেন মাহমুদুল হক।

মহৎ সাহিত্যের একটি বৈশিষ্ট্য, মনে হয় যে, তা পড়লে, বলতে ইচ্ছা হয় কিছু। ফোনের স্ক্রিন চেপে ভাব প্রকাশের সেই ক্লান্তিকর অপর্যাপ্ত চেষ্টা আবারো পুনরাবৃত্ত করবার প্রয়াসে মাহমুদুল হক, আপনার কাছে ফিরে আসবো নিশ্চয়ই।
Profile Image for Daina Chakma.
442 reviews785 followers
February 26, 2018
"খোকা শিউরে উঠলো, এতদিন তার কাছে যা ছিল দয়িতা, যামিনী, মদিরার মতো তিন অক্ষরের হালকা পালকে মোড়া পাখির মতো নিছক একটি রোগা শব্দ, এখন তা প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়েছে শহরময়, জনতা!"


কি প্রচন্ড শক্তিশালী কথা! কোট করার লোভ সামলানো গেলনা। অবশ্য কোট করতে গেলে পুরো বইয়ের অর্ধেকটাই কোট করতে হয়।

জীবন আমার বোন গল্পটা ঠিক একাত্তরের নয়। বরং বলা চলে একজন নির্লিপ্ত তরুণের সাইকেডেলিক ভাবনা। কিংবা গল্পটা মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সংকটময় সময়ের, যা খোকা নামক একজন উদাসীন যুবকের চিন্তাজগতের ক্যানভাসে প্রকাশ পেয়েছে। খোকা যেন ঠিক তার সময়ের কেউ নয়। খোকা কখনো চায়ের কাপে দেশ উদ্ধার করা উত্তপ্ত যুবক কিংবা রাস্তাপথে নেমে মিটিং মিছিলের স্রোতে ভাসা জনতার দলে ছিল না। খোকা থ্রিজি কিংবা ফোরজি যুগের "I hate politics" থিওরিতে বিশ্বাসী একজন ঘুণেধরা তরুণ।

মাহমুদুল হক প্রচন্ড শক্তিশালী একজন লেখক। সম্মোহিতের মতো পড়ে যেতে হয় তাঁর লেখনী। কখনও কখনও শব্দের তীব্র আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে হয়। আবার কখনও অদ্ভুত ঘোরের ভেতর চলে যেতে হয়। বইটা শেষ করেছি কাল রাতে। অথচ নতুন একটা সকালেও সেই ঘোর থেকে বের হতে পারছিনা।
Profile Image for Nabila Tabassum Chowdhury.
391 reviews286 followers
January 25, 2016
একটি লেখাকে রিভিউ হিসেবে গণ্য হবার জন্য গুডরিডস রিকোয়ারমেন্ট কমপক্ষে ৫০ শব্দ। 'জীবন আমার বোন' অল্প কিছু বাংলা বইয়ের মাঝে একটি যেখানে এই রিকোয়ারমেন্ট ফুলফিল করে এমন সাতটি রিভিউ রয়েছে। যা 'হাজার বছর ধরে'রও নেই, ( বইটি পড়তে আমার প্রজন্মের সবাই মোটামুটি বাধ্য হয়েছিল), পথের পাঁচালীর ও নেই (যে বই ভাল লাগেনি এমন কোনো মানুষ আমি এখনও বাস্তবে দেখিনি)।

ওয়েল-ডিসকাসড এই বইটি নিয়ে প্রায় সবকিছু বলে ফেলা হয়েছে। বলা হয়েছে মাহমুদুল হকের পাঠককে ঘোরগ্রস্ত করে ফেলার মত লেখনীর কথা। বলা হয়ে গেছে কাপুরুষতার প্রকাশে পিছু না হটার কথা। বলা হয়ে গেছে মানুষ হিসাবে মানুষের অক্ষমতা, দুর্বলতা আর অসহায়ত্বের নগ্ন প্রকাশের কথা।

সমালোচনার ক্ষুদ্র জায়গায় কেউ বলেছেন সেক্সিজমের কথা। বইটাতে সেক্সিজম আছে। এক রঞ্জু ছাড়া আর কোনো নারীরই 'চরিত্র' নামক কিছুর কোনো বালাই নেই। সেক্সিজম এমনভাবে আছে যেন দেহ দিয়ে পুরুষকে ভোলানোই নারীর প্রথম এবং প্রধান কাজ। কিন্তু সেই সেক্সিজম লেখকের নয়। সেক্সিজম খোকাবুর। এটা তার সার্থক চরিত্রায়ন। তাই লেখককে রেহাই দিলাম এই অপরাধ থেকে।

তথাপি সেক্সিজমের দোষ থেকে লেখককে রেহাই দিলেও বইয়ের জেন্ডার নির্ধারণের দায়ভার থেকে লেখককে রেহাই দেয়া সম্ভব হলো না। একটি বইয়ের ক্লীবলিঙ্গ হবার কথা থাকলেও মাঝে মাঝে বইয়ের স্রষ্টারা বইকে একখানা বিশেষ লিঙ্গ প্রদান করে থাকেন। সেক্সিজমের সাথে এর ক্ষুদ্র প্রভেদ রয়েছে। সেক্সিজমে একটি বিশেষ সেক্সকে হেয় করা হয়ে থাকে, তুলনামূলকভাবে অন্যটিকে মহত্ত্ব প্রদানের মাধ্যমে। আর জেন্ডার নির্ধারণের ব্যাপারটি একটু আলাদা। নারী-পুরুষ মনের কিছু অনুভূতি রয়েছে যা একেবারে অনন্য। ভেন ডায়াগ্রাম করলে যা একে অপরকে স্পর্শ করবে না। আবার কিছু অনুভূতি সার্বজনীন। ভেন ডায়াগ্রামে যা একটি আরেকটিকে স্পর্শ করে থাকে। যখন একটি বইয়ের অনুভূতির প্রাধান্য রচিত হয় ভেন ডায়াগ্রামে বিশেষ একটি জেন্ডারের স্পর্শ না করা অনুভূতিটুকু নিয়ে তখন বইটির জেন্ডার নির্ধারিত হয়ে যায়। এই বইটির জেন্ডার দুঃখজনক ভাবে আমার জেন্ডারের বিপরীত। তাই খুব সম্ভবত আমার ঘোরগ্রস্ততা পাঁচতারা স্পর্শ করে না। কাপুরুষতার প্রকাশ আমাকে পাঁচ তারা পরিমাণ কাবু করে না। দুর্বলতা, অক্ষমতা এবং অসহায়ত্বের নগ্ন প্রকাশে আমি পাঁচতারা পরিমাণ বিচলি�� হয়ে পড়ি না।

শেষ কিছু পাতা বাদে বইটির সময় কাল মার্চ, ১৯৭১। সারাটা সময় ধরে খোকাবাবু মুক্তির সংগ্রামকে পাশ কাটিয়ে চলার কঠিন প্রচেষ্টার পরও এটি নিজের জায়গা করে নেয় তার ভাগ্য-বিধাতার আসনে। এই ব্যাপারেও খুব বেশি কিছু না লিখেই পারলাম, সাহায্য করলো পেরিক্লিসের পাঠকপ্রিয় উক্তি - “Just because you do not take an interest in politics doesn't mean politics won't take an interest in you. ”। শুধু ছোট্ট একটা ইম্প্রোভাইজেশন হবে, 'পলিটিক্সে'র জায়গায় 'টাইম' বসবে।

এই, এতটুকুই।
Profile Image for Rifat.
505 reviews335 followers
June 7, 2023
Psychedelic journey of an apathetic youth, his sister and the people around them during the political volatility of 71. যিনি বইটিকে গুডরিডসে এড করেছিলেন তিনি ডেস্ক্রিপশন বক্সে এই লাইনটিই লিখেছেন। গত পরশু যখন বইটা পড়া শেষ করে কিছু লিখতে বসলাম তখন বই সম্পর্কে আসলে কী লিখবো তা মাথায় আসছিল না, কেননা আমি দিশেহারা ছিলাম। হুট করে যখন আজকে লাইনটা দেখলাম তখন মনে হলো- তাইতো! এটাই তো। মুক্তিযুদ্ধ আসলে একটা প্রসঙ্গমাত্র, কালরাত্রি উপন্যাসের ইতি টানার একমাত্র উপায়! নইলে মাহমুদুল হক যেভাবে শব্দের পর শব্দ জুড়ে পাঠককে এক মিহি অথচ তীব্র সুরে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন তা থেকে বের হওয়ার উপায় ছিল না। শব্দের ব্যবহারে পারদর্শিতা কী ভীষণ অদ্ভুত! এজন্যেই বুঝি ভাষা সাহিত্যের এত কদর!

মাহমুদুল হকের "জীবন আমার বোন" আমার কাছে সাধারণ সত্ত্বার প্রতিফলন হিসেবে ধরা দিয়েছে। সময়কালটা ৭১ এর শুরুর দিকে হলেও আসলে মুক্তিযুদ্ধ উপন্যাসের মূল অংশ নয়। উপন্যাসের মূল অংশ বছর বাইশের অতি সাধারণ ব্যক্তিত্বের খোকা আর খোকার মাথায় চলতে থাকা শব্দের ঝড় যার কাছে গিয়ে আমরা বুঝতে পারি সত্যিই সে খুব সাধারণ। কেননা এত অস্থির সময়ে হেঁটে চললেও তার মনে হয় এসব রক্তারক্তি কিংবা যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই কাজেই যুদ্ধে যাওয়ার কিংবা ট্রেনিং নেয়ার তাড়না তারমধ্যে মাথাচাড়া দেয় না; ঠিক যেমন এই সাধারণ আমাদের পথ চলতে মনে হয় মৃত্যু আমাদের দ্বারে আসবে না, আমাদের শরীর বহন করা কোনো যান দুমড়েমুচড়ে যাবে না! অতি সাধারণ মানুষের মতোই খোকার মস্তিষ্কে শুধু খোকাই, আর আছে ওর অতি আদরের বোন রঞ্জু, শান্ত তিরতিরে পুকুরের গভীরে জড়াজড়ি করে থাকা অঞ্জু আর মঞ্জু, আর দরজায় খিল দেয়া একটি নির্লজ্জ দুপুর যে দুপুরে উষ্ণতা ছড়িয়ে ছিল নিজের থেকে বছর দশের বড় নীলাভাবী। যেহেতু পুরো বইটি খোকার মাথায় চলতে থাকা গল্প কাজেই খোকার সব নারীকেই বেলী বাগানের সদস্য ভাবাকে তেমন কিছু মনে হয় না।

৩য় মাহমুদুল হক পাঠ। ঘোর লাগানিয়া, খরস্রোতা নদীর মতো অবিরাম বয়ে চলেছে যেন!


৭ জুন, ২০২৩
Profile Image for Nadia Jasmine.
214 reviews18 followers
March 25, 2021
মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’ পড়া অজানা এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে। তিনি শব্দের ও সংলাপের সিঁড়ি দিয়ে পাঠককে ক্রমাগত এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যান যে নিজেদের দৈনন্দিন সংলাপ ও অনুভূতিকে খুব যাচ্ছেতাই মনে হয়। মনে হয়, যে আহা, এমন করে কথা বলা বা এমন ভাবে চিন্তারা কেন আমাদের মধ্যে তাঁর মতো সহজাত হয়ে আসে না। অথচ, শব্দের অলি-গলি পেরোতে থাকা আমরা ঠিকই একটা গল্পে ঢুকে যাই, তা হয়তো অতো ঘটনাবহুল নয়, কারন, গল্প চলছে খোকার মাথায়। তাঁর চোখ দিয়ে আমরা এমন এক সময়কে দেখতে থাকি, যা নিয়ে আমাদের চিন্তার মধ্যেও ছিল না যে ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষ বাদে ঐ সময়ে খোকার মতো কেউও ছিল। কারন, যুদ্ধের এই সময়ের কথা ভাবলেই আমাদের মনে ভাসতে থাকে আতংকগ্রস্থ মানুষের নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য বর্ডার পার হওয়া এবং যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণে নিজেদের নিবেদিত করা সে সময়ের যুবসমাজ। কিন্তু, খোকা যুদ্ধে যাওয়া নিয়ে বা পাকিস্তানীদের তাড়ানো নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল না। তাঁর জীবনে রঞ্জু, তাঁর বোন সবটা জুড়ে আছে, আর নীলাভাবীর প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে কাটানো একটি দুপুর আছে। এর মধ্যে খোকার নির্লিপ্ততা ও পলায়নপ্রবণতাকে পাত্তা না দিয়েই এক সময়ে যুদ্ধ চলে আসে।

খোকা এমন দেখেই তাঁর সাথে একাত্নবোধ না করা মুশকিল। একাত্তর যে একাত্তর হবে, তা তো সে জানতো না। ঠিক যেমন আমরা জানতাম না, মহামারী কখন অতিমারী হয়ে যাবে বা এরপর কি হবে। সমস্যা হল, পালাতে থাকা এবং না থাকা দুইজনের উপরেই যে ভবিতব্য ভর করে, এটাই লেখকের শব্দজালে যাকে ইন্দ্রজাল বললে অত্যুক্তি হয় না তাতে আমরা দেখতে থাকি। শেষে যখন খোকা নিজের স্খলনের জন্য একচেটিয়াভাবে মেয়েদের ‘চারিত্রিক ত্রুটিকে’ দোষারোপ করতে থাকে, তখন তাঁর অসচেতন চিন্তা অতোটা মেজাজ খারাপ করে না। কারন, খোকাকে সুদূরপ্রসারী চিন্তা করার মতো কেউ মনে হয় না। বরং, এটাই বোঝা যায় যে গভীর ভাবনার চেয়ে অতি আবেগই তাঁর বেঁচে থাকার মূল সম্বল।

লেখক এমন এক চরিত্র তৈরি করেছেন, যাকে সিরিয়াসলি নিলে চরিত্রের চিন্তাভাবনাও ধারণ করতে হয়, যা জরুরী মনে করি নি। খোকার মতো ভাবনায় থাকা মানুষেরা আসলেই ছাপ ফেলে না, তা লেখক নিজেই বলেছেন। নির্ভার খোকার জীবনের পরিক্রমা নিয়ে লেখকও নির্লিপ্ত, কারন, হঠাৎ জেগে উঠে তছনছ করে সব পাল্টে দেওয়া কারোর গল্প তিনি বলতে চান নি। এমন সাধারণ একটা চরিত্র তৈরি করতে হলে ভেতর থেকে উচিৎ-অনুচিতের অনেকটুকু ফেলেই তৈরি করতে হয়। কিছুটা খোকার মতোই সব বিচারের আওতায় না এনে শুধু দেখে যেতে হয়।’জীবন আমার বোন’ একারনেই সবসময়ে প্রাসঙ্গিক থাকবে। যুদ্ধের আগের সময়টা নিয়ে এমন এক কাহিনী মাহমুদুল হক বলেছেন, যা সব কালকে এবং যুদ্ধে আক্রান্ত হতে পারে এমন সব দেশের (সেটা কোন দেশ না?) এক উদাসীন এবং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা কারোর মনে উঁকি দেয়, যার কোন দোষ নেই, কিন্তু, টিকে থাকার রসদও নেই।
Profile Image for SH Sanowar.
121 reviews29 followers
February 12, 2024
জীবনের এতোগুলো শরৎ হেমন্ত পার করে ক'বারই বা জোর দিয়ে বলতে পেরেছি, 'আমি জীবনে সঠিক সময়ে এই ঠিক কাজটাই করেছি!?' মনে নেই। হয়তো একবারও না! কিন্তু "জীবন আমার বোন" পড়ে আমার সেই অনুভূতি হয়েছে। এখন আমি বলতে পারি, এই বইটি শেষ করার মতো মহৎ কার্যটি ঠিকঠিক সময়েই সমাধা করেছি। এই বইটা পড়ার জন্য এরচেয়ে ভালো সময় বোধহয় আর হয়না। মাহমুদুল হকের ঘোরলাগা ভাষায় সময়ের বৈতরণী পার হয়ে আমি যেন অন্য একটা সময়ে ভ্রমণ করে এলাম। মাথাভর্তি রোদ নিয়ে হেঁটে বেড়ালাম খোকার সাথে যুদ্ধপূর্ব টালমাটাল অস্থির সময়টাতে। মাহমুদুল হক এমন ঘোরলাগা ভাষায় গল্পের বয়ান করলেন, মনে হোলো কেউ কানের কাছে মুখ রেখে গড়গড় করে মন্ত্র পড়ে যাচ্ছে আর আমি ঘোরগ্রস্তের মতো মুগ্ধ হয়ে তার মন্ত্রপাঠ শুনছি৷ আর লেখায় উপমার ব্যবহার? 'অন্ধকারে হাত-পা ছুড়ে পিংপং খেলার মতো' যা 'ঘুমের ভেতরে বালকের পেচ্ছাবের' মতো অলক্ষ্যে বয়ে যায় আরোপিত কোনো ভাব ছাড়াই।


"জীবন আমার বোন" পড়তে পড়তে আমার নিজেকে কখনো খোকা কখনো মুরাদ কখনো ইয়াসিন কিংবা রাজীব ভাই মনে হয়েছে। আমি মানেই যেনো সবাই, সবার ভেতরে আমি আছি। আর সবাই মানেই যেনো আমি, আমার ভেতরে সবাই আছে। পড়তে পড়তে রঞ্জু মঞ্জু অঞ্জুকে মনে হয়েছে আমারই বোন। বিবিধ ভাবনা চঞ্চল করেছে চিত্ত। এমন ভাবনাও এসেছে, জীবন আসলে কী? ‘আসলে জীবন মানেই শৈশব। জীবনভর মানুষ ওই একটা ঐশ্বর্যই ভাঙিয়ে খায়, আর কোন পুঁজি পাট্টা নেই তার।’ আর শৈশব কী? শৈশব হলো যা হারিয়ে যায়, যা তলিয়ে যায়; যার বিভ্রম মাথায় নিয়ে মানুষ সারাজীবন পার করে। শৈশব হলো হারানো কয়েন, শ্যাওলায় ঢেকে যাওয়া লাল বল, পুকুরের অতলান্তে তলিয়ে যাওয়া মঞ্জু অঞ্জু রঞ্জু। শৈশবটা আসলে জীবন যা কেবলই তলিয়ে যেতে থাকে রঞ্জু অঞ্জু মঞ্জুর মতোই। আর জীবন হলো পুকুরের অতলান্তে তলিয়ে যাওয়া আমার শৈশব, আমার বোন। জীবনটা আসলে আমার আপনার সকলের বোন।


~১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
Profile Image for DEHAN.
281 reviews86 followers
February 7, 2020
খোকার জন্য মায়াই লাগে। অঞ্জু গেলো ,মঞ্জু গেলো । এক ছিলো রঞ্জু সেও গেলো...জীবন নামক গভীর পুকুরে সবাই ভেসে থাকতে পারে না।আর যাদের ভাগ্যে আগে থেকেই ডুবে যাওয়া নির্ধারণ করা ছিলো- হাজার চেষ্টা করেও তাদের বাঁচানো যায় না।
Profile Image for Anik Chowdhury.
188 reviews44 followers
June 23, 2023
মুক্তিযুদ্ধ যখন আর পাঁচটা উপন্যাসের বিষয়বস্তু হয় তখন সাধারণত তা উক্ত বইয়ের প্রধান বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। তার সাথে বইয়ের মূল চরিত্র হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা পালন করা বিশেষ চরিত্র। এইখানেই 'জীবন আমার বোনের' মূল পার্থক্য। এই বইয়ে মুক্তিযুদ্ধকে দেখা হয়েছে দূর থেকে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে। মূল চরিত্র 'খোকা', সে-ও দেশে এগিয়ে আসা সগ্রামকে দেখছে অনেকটা খোলা চোখে। যুক্তিতর্ক দিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেও সে সক্রিয় নয়। আমাদের চারপাশে আমরা অনেক মানুষ দেখি, যারা ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ করে, আলোচনাও করে থাকে কিন্তু সেই ঘটনার স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা তা দেখা যায় না। খোকা তার নিজস্ব চিন্তার জগত তোলপাড় করে ফেলে। সেখানে যুক্ত হয় তার ছোট বোন রঞ্জু, নীলাভাবী, লুলু চৌধুরী, মুরাদ অনেকেই। লেখক সবকিছুকে নিয়ে খোকার চারিদিকে স্থাপন করে দিয়েছেন। খোকার চিন্তার জগৎতে তাই হানা দেয় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জন। নীলভাবীর মতো চরিত্র চরিত্র কত উজ্বল! বিক্ষিপ্ত চিন্তা গুলোকে জোড়া লাগানো, সংসারের যাঁতা কলে পিষ্ট হয়ে যখন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, সংসারে একটা সময় পর যে উচ্ছিষ্টটা থাকে তা আর কিছুই নয়, অপর জনের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো। এরমাঝে হিজিবিজি চিন্তার শৈলী তৈরি করে গল্পের খোকা তোলপাড় করে দেয় আমাদের। তার চিন্তা, চেতনার ভিতরে প্রবেশের যে স্বাদ তা পাঠককে উপলব্ধি করে নিতে হয় গভীর চেতনার দ্বারা। ভাসা ভাসা সেসব চিন্তার জগতের সুতো ধরে গভীর এক গোলক ধাঁধায় প্রবেশ করিয়ে দেয় লেখক। শব্দ আর বাক্যের অদ্ভুত সুন্দর খেলায় লেখক মেতেছিলেন পুরো বই জুড়ে। এমন ধারার জাল বিছিয়ে লেখক পাঠকদের টেনে নিয়ে যান গল্পের স্রোতের আরো গভীরে। এই কারণে 'জীবন আমার বোন' হয়ে উঠেছে ভিন্নধর্মী।
Profile Image for Ummea Salma.
126 reviews127 followers
November 30, 2022
'কালো বরফ' পড়ে যদি কেউ 'জীবন আমার বোন' পড়তে বসে তাহলে মস্ত বিপদ। কারণ 'কালো বরফ' পড়ার পর আপনার expectations এত আকাশচুম্বী হবে যে কোন ভাবেই লেখকের এই ঘরনার লেখায় মন বসবে না। লেখকের লেখনী নিয়ে কথা বলার মত যোগ্যতা আমার নেই। তবে সত্যি কথা বলতে এই বই আমার জন্য না। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে টুকটাক অনেক বই পড়েছি আমি, এজন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যে কোন বই ভীষণ টানে আমাকে। সেই আগ্রহ নিয়েই basically বইটা শুরু করা। কিন্তু কোনভাবেই ভালো লাগে নাই আমার। যদিও বইটা মুক্তিযুদ্ধকালীন বই, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বই ছিলো না। শুধুমাত্র রঞ্জু আর খোকার ভাই বোনের যে একটা মধুর সম্পর্ক সেটা ছাড়া আর সবকিছুই মাথার উপর দিয়ে গেছে। নীলা ভাবির সাথে খোকার সম্পর্ক আমার কাছে স্রেফ সময় নষ্ট লাগছে। মানে এটা এই গল্পের ভিতরে না আনলেই পারতো। যুদ্ধের আগের উত্তাল সময়ের সাথে এরকম একটা জিনিস কিভাবে যায় কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকলো না।
পুরা বইটাই খুব অগোছালো। মাঝে মাঝে পড়তে পড়তে খেই হারিয়ে ফেলেছি যে আসলে ঘটনা কোনদিকে যাচ্ছে। তবে পড়ে যতটুকু বুঝেছি সেটা হচ্ছে বইটা মূলত তরুণ প্রজন্মের যুদ্ধবিষয়ক ভাবনা নিয়ে লেখা। কিন্তু শেষটুকু খুব মন খারাপ আর হৃদয়স্পর্শী।
আরো অনেক বয়স হলে, যখন নিজের চিন্তা ভাবনার আরো অনেকখানি পরিবর্তন হবে তখন আরেকবার পড়ে দেখবো, ভালো লাগাইতে পারি কি না!
Profile Image for Karishma Anika.
48 reviews52 followers
May 6, 2021
এখনো ঘোরের অধ্যে আছি। মাহমুদুক হক একজন শব্দের জাদুকর। এত অসাধারণ উপমাশৈলী!
Profile Image for Injamamul  Haque  Joy.
100 reviews115 followers
July 8, 2021
মাহমুদুল হক এই বইয়ে যেটা করেছে সেটাকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করলে দাঁড়ায়— শব্দজব্দ খেলা। যে খেলায় কোনো তিক্ততা নেই, অভক্তি নেই, যে খেলায় মাথা ধরে না, মেজাজ খিঁচড়ে যায় না। যে খেলার দরুন মন্ত্রমুগ্ধের মত পাতা উল্টিয়ে যেতে হয় গল্পের শুরু থেকে শেষ এবং ভেতরে জন্ম নেয় কিছু নস্টালজিয়া। কিছু হাহাকার। কিছু পাওয়া না পাওয়ার নেক্সাস। তৈরী হয় স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে ঘৃণা। তৈরী হয় মুরাদ, ইয়াসিন, রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা। জন্ম নেয় রঞ্জু, রাজীবদের প্রতি ভালোবাসা আর সমবেদনা। আর খোকা? তার প্রতি একরাশ ধিক্কার।

জয় বাংলা।
Profile Image for Alvi Rahman Shovon.
500 reviews17 followers
March 27, 2026
মাহমুদুল হকের লেখা শেষ উপন্যাস 'পাতালপুরী' পড়া হয়েছে আমার আগে। 'জীবন আমার বোন' উপন্যাসটি আমার পড়া লেখকের দ্বিতীয় বই। অবশ্য বইটি শুধু পড়িনি। পড়া এবং অডিও বুক শুনে শেষ করেছি; যখন যেভাবে সময় বের করতে পেরেছি।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার আগে দেশে যে অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সেই সময়ের প্রতিচ্ছবিই মলাটবন্দী হয়েছে এই বইয়ে। গল্পের মূল চরিত্র খোকার মাধ্যমে প্রতিকীরূপে এগিয়েছে বইয়ের কাহিনী।

লেখকের লেখনীশৈলী চমৎকার। যথাযথ শব্দচয়ন বইয়ে উনার লেখাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। চিন্তা - ভাবনাকে এমন কাব্যিক মাধুর্যতা দিয়ে লেখক এমন বিবরণ দিয়েছেন যে পাতার পর পাতা শুধু পড়েই যেতে ইচ্ছে করে।

এই বইটা শেষ করার পর আমাকে বিষন্নতা এমন ভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে এটা থেকে বের হতে বেশ কিছুদিন লাগবে আমার বোধ করি। অসাধারণ লেখনীশৈলীর মাঝে হারিয়ে যেতে চাইলে নিঃসন্দেহে হাতে তুলে নিতে পারেন বইখানা।

এক নজরে:
বইয়ের নাম: জীবন আমার বোন
লেখক: মাহমুদুল হক
প্রকাশনী: সাহিত্য প্রকাশ
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৫৮
মুদ্রিত মূল্য: ৩৫০ টাকা
Profile Image for Anika.
29 reviews42 followers
August 26, 2017
আমার পড়া মাহমুদুল হকের প্রথম বই। পড়তে গিয়েই মাথায় প্রথমেই আসল ইনি এক অসাধারণ কথাশিল্পী। উপমার যাদুকর বললে অত্যুক্তি হবে না। প্রত্যেকটি ঘটনা ব্যাখার জন্য তুলনাহীন সব রুপক, উপমার অবতরণ ঘটাতে পারেন এই লেখক। তাঁর এই অনন্যসাধারণ লেখনশৈলীর জন্যই বইটির স্থান এক অন্য উচ্চতায় থাকবে পাঠকদের কাছে।
বইটির ঘটনা ও কিছুটা ইউনিক। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা বই শুনলেই মোটা দাগে যে কাহিনী মাথায় আসে, ঠিক সেরকম কিছু নেই বইটিতে। যুদ্ধ শুরু আগের যে দোদুল্যমান অবস্থা, মানুষের স্বাভাবিক জীবনে যে অস্থিরতা তার ই কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। সেই সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভিতরে ভিতরে কী হচ্ছে, সঠিক খবরের অভাবে মানুষের মনে যে দ্বিধা-দ্বন্দের উপদ্রব তারই প্রতিচ্ছবি মূল চরিত্র খোকা। কারো ধারণা স্বাধিকার আন্দোলন, স্বশত্র সংগ্রামই এক মাত্র উপায়, আবার কারো মনে হচ্ছে এ সব ই কিছু সংখ্যক মানুষের বানোয়াট কথাবার্তা। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম খোকা আর মুরাদের কথোপকথনে। লেখক নিজের মনের দ্বিধাই উপস্থাপন করেছেন যেন তাঁর সৃষ্ট এই দুই চরিত্রের মধ্য দিয়ে। গল্প ইউনিক, নিঃসন্দেহে তা বলা যায়, বইটি পড়ার সময় থেকে শেষ করা পর্যন্ত একটা কিন্তুভাব থেকে যায়, ঠিক বোঝা যায় না আর সে জন্যই সম্পূর্ণ স্যাটিস্ফেকশন টা আসে না।
Profile Image for Titu Acharjee.
261 reviews36 followers
April 30, 2021
এই বইয়ে অন্য এক মাহমুদুল হক'কে দেখতে পেলাম। উনার আগের বইগুলোর তুলনায় 'জীবন আমার বোন' কোথায় জানি একটু অন্যরকম, স্বতন্ত্র।
Profile Image for Shishir.
204 reviews47 followers
March 14, 2025
"খোকার মনে হয় এই তো সেই রঞ্জু, এ আমার কতো চেনা, রুপোর তোড়াপরা ঝুমঝুমি বাজানো ছোট্টবেলার সেই রঞ্জু, মুরাদ একে চেনে না, কাব্যচর্চার ঘোড়ারোগ দিন দিন বানোয়াট করে তুলেছে তাকে।

রঞ্জুর স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে খোকা স্বস্তি পায়, সুস্থ হয়; এমন স্নিগ্ধ এমন নির্মল এমন নিষ্কলঙ্ক হতে পারে কেবল করুণাধারা।"

- কিছু লেখা পড়লে বিস্মিত হতে হয়। আফসোস হয়, আগে পড়িনি বলে। এটা তেমনই লেখা। সার্থক নামকরণ, ব্রিলিয়ান্ট !!
Profile Image for Zunaed.
54 reviews123 followers
October 7, 2020
"দেশ তাহলে একটা পুকুর। অঞ্জু মঞ্জুর মত এর নিস্ততরঙ্গ নিথর তলদেশে চিরকালের মত হারিয়ে গিয়েছে রঞ্জু।"

কাল যখন পড়ছিলাম তখন আমি মেঘনার উপর। ঈদের ছুটিতে ঢাকা ফাঁকা, সেই ফাঁকে আমিও ট্রেনে চেপে বেরিয়ে পড়লাম। ভৈরব ব্রিজের উপর থেকে মেঘনার জলরাশি দেখতে দেখতে মনে হল, দেশ পুকুর না, দেশ হল মেঘনা— দেশ মেঘনার মত উত্তাল, মেঘনার মত সুন্দর, মেঘনার মত শক্তিশালী। দেশ আমার কাছে মেঘনার মত, এক সুখের অনুভূতি, যা চোখের সামনে আসতেই আমার মনে হয়, এই নদী পেরুলেই তো ব্রাহ্মণবাড়িয়া! আমার শৈশবের কৈশোরের শহর!

"জীবন আমার বোন" মাহমুদুল হকের লেখা আর আমার পড়া প্রথম উপন্যাস। প্রথম বইয়েই আমাকে মুগ্ধ করেছেন লেখক। উনার লেখায় মাঝে একবার ঢুকে গেলে আর বেরুনোর উপায় নেই। পড়তে হবে, লোকটার লেখা আরো পড়তে হবে।

উপন্যাসটা একাত্তরের মার্চে ঢাকার পটভূমিতে লেখা, খোকা নামের এক শিক্ষিত বেকারের জবানিতে। খোকার মা মারা গেছেন বছর কয়েক আগে, বাবা কর্মসূত্রে ছিলেন রাওয়ালপিন্ডি। ধানমন্ডির বাড়িতে থাকতো সে আর বোন, রঞ্জু। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় বেকার হওয়া সত্ত্বেও কাজ নিয়ে ভাবতে হয় না খোকার, কাজের মাঝে তার কাজ যখন খুশি ঘুমানো, আর যখন খুশি বেরিয়ে আশা।

রঞ্জু খোকার ছোটো বোন। সময়ে সময়ে অবশ্য বড় বোনের ভূমিকাতেও তাকে দেখা যায়। অতিরিক্ত সিগারেট খেতে থাকা খোকাকে তার শাসন, খোকার মৃত্যু নিয়ে কথায় অমঙ্গলের ভয়ে চোখে পানি চলে আসার ব্যাপারগুলো পড়ার সময় মনে হচ্ছিল, আমারও একটা বোন থাকলে খুনসুটি আর শাসনে খুব একটা মন্দ হত না!

বইটাতে বেশ কয়েকবার কাফকার মেটামরফোসিস বইটার উল্লেখ আছে। মেটামরফোসিসের গল্প গ্রেগর সামসার রূপান্তরের পরের গল্প, আর এই গল্প খোকার পরিণত খোকায় পরিণত হবার। আমি সেসময়ে ছিলাম না, কিন্তু যত শুনেছি আর পড়েছি তাতে মনে হয়েছে, সেই সময়টাতে প্রত্যেকটা বাঙালির মাঝেই মেটামরফোসিস হচ্ছিল, সকলেই যোগ্য হয়ে উঠছিল একটা সংগ্রামের জন্য, যে সংগ্রাম স্বাধীনতা এনে দেবে, মুক্তি এনে দেবে।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের কাছ থেকে দাম নিয়েছে অনেক, সেই দামে আমরা কিনেছি স্বাধীনতা। মহাকালের হিসেবে ৪৫ বছর তেমন বড় সময় না। আবার একজন মানুষের জীবনকালের হিসেবে খুব ছোটো সময়ও না। আমাদের পরিবর্তন কিন্তু এখনও থেমে নেই, কিন্তু এই সময়ে আমাদের চিন্তাভাবনায় যে পরিবর্তন হচ্ছে, সেটা খানিকটা ভাবাবার মতই। পরিবর্তনটা সত্যিই ইতিবাচক, নাকি নেতিবাচক? আমরা পিছনে হাঁটছি না তো? দেশের মানুষের একটা বিরাট অংশকে যখন দেখি উগ্রবাদীদের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন রাখে, একের পর এক হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে যায় কেবল মাত্র ধর্মের নাম নিয়ে এসব করা হচ্ছে বলে, তখন দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় হয়। সামাজিক গণমাধ্যমের প্রসারে কতটুকু লাভ ক্ষতি হয়েছে জানি না, তবে এর কল্যাণে অনেকের মনের কদর্য রূপটা চোখের সামনে ফুটে উঠছে। কাল (২ জুলাই, ২০১৬) গুলশানের জঙ্গি হামলার পর যখন কাউকে ব্যাপারটা নিয়ে মজা করতে, কাউকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিতে, আবার কাউকে এই নিয়ে রাজনীতিতে মাততে দেখি আর যাই হোক, কোনোভাবেই নির্ভয় হতে পারি না। এইসব কথা হয়তো বইয়ের রিভিওয়ে অপ্রাসঙ্গিক। হোক, আমি তো আর রিভিও লিখছি না, সেই যোগ্যতা আমার কই? আমি লিখছি পাঠ-প্রতিক্রিয়া। পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় পাঠের সময়ের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করাই যায়।

সে যাক, শুরুর মত শেষটাও মেঘনাতেই হোক। কারণ এতসব ভয়ের মাঝেও মেঘনা আমায় সাহস দেয়। মেঘনার জলে প্রতিফলিত সূর্যকিরণ বলে, আশা আছে! এই আশা নিয়েই তো বেঁচে আছি। বাংলাদেশ মুক্ত থাকুক সকল অপশক্তির আঘাত থেকে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাক সামনে, অনেক দূরে। এদেশের নরম মাটিতে শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকুক ত্রিশ লক্ষ রঞ্জুরা, অশান্ত হয়ে দেশ যেন তাদের ঘুমে কোনো ব্যাঘাত না ঘটায়।
This entire review has been hidden because of spoilers.
Profile Image for Adham Alif.
337 reviews81 followers
June 27, 2023
শব্দের খেলায় মাহমুদুল হক বাজিমাত করলেন। মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে আশেপাশের উত্তাল পরিবেশ। সে সময়কে ছাপিয়ে গল্পের মূল চরিত্র খোকার ভেতরে চলা উথাল-পাথাল অনুভূতির আচ পাই আমরা। নীলাভাবি, রঞ্জু, বেলী, মুরাদ কিংবা রাজীব ভাই একেকটা চরিত্র সেই অনুভূতির উত্তপ্তটা বাড়িয়েই যায় কেবল। আমরা জানতে পারি মানুষের একান্ত ব্যাক্তিগত অনুভূতির নাম "যন্ত্রণা"। যন্ত্রণার চেয়ে নিজস্ব কোনো অনুভূতি নেই।
Profile Image for Syeda Ahad.
Author 1 book133 followers
May 25, 2016
মুক্তিযুদ্ধের সেই বিপর্যস্ত আবার রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া সময়ের উপর এই প্র��ম এভাবে লেখা কোনো বই পড়লাম। সারা দেশ যখন কি হয় কি হয় নিয়ে ব্যস্ত, একদিকে দেশের স্বাধিকার রক্ষা নিয়ে মানুষের চেষ্টা-ত্যাগ, অপরদিকে মানুষজনের নিজের জীবন নিয়ে পালাবার পথ খোঁজার হাহাকার - সেই সময়ে সবকিছুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ভাবনার জ্বাল বুনে যাওয়া এক তরুণের গল্প। সে সবই দেখে, একটু বেশি করে খতিয়েই দেখে বরং অন্য সবার চেয়ে। স্বাধীনতার নামে দিনরাত এদিকে সেদিকে ঘুরে খোঁজখবর নেয়া বন্ধুর এই ছোটার পেছনে সে তার ক্যারিয়ার গড়ে নেবার লুকানো ইচ্ছা বুঝে ফেলে, দিনরাত সভা-মিছিল করে বেড়ানো মানুষের পেছনে সে গড্ডালিকা প্রবাহ দেখে, জাতির ঐক্যবদ্ধ রূপের পেছনে সে দেখে ক্ষমতাসীনদের কলকাঠি নাড়া হাত। আবার এই খোকাই সবাই যখন জীবনেের ভয়ে ঢাকা খালি করে ফেলছে, তখন প্রশ্ন তোলে, সবাই চলে গেলে লড়বে কে?! এই খোকাই আশেপাশের সবকিছুর মধ্যে থেকেও না থেকে বেঁচে থাকলেও নিজের বোনকে আগলে রাখতে চায় পারিপার্শ্বিক সব ধরনের কদর্যতা থেকে। সব কিছুর প্রতিই তার প্রশ্নবিদ্ধ মন কটাক্ষ করে বেড়ায়। তাই, যদিও এখানে বইয়ের বর্ণনায় দেখলাম 'এক উদাসীন তরুণের কাহিনী', আমার তা মনে হয়নি।

যুদ্ধ বড় অদ্ভুত এক সময়, নিজে কখনো সামনে থেকে না দেখলেও দেশি-বিদেশি নানান যুদ্ধের বই পড়ে আর যারা সেই সময়ে বেঁচে ছিলেন তাঁদের মুখে শুনে অন্তত এটুকু বুঝেছি যে, যুদ্ধ একেকজনকে একেকভাবে বদলে দেয়- একেকজনকে একেকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই নিজে যতই ৭১-এর ইতিহাস পড়ে রাগে-দুঃখে-হাহাকারে-অসহায়তায় দুমড়ে যাই, এই খোকাকে ঠিক উদাসীন বলতে পারি না। পেছন ফির�� তাকালে সময়কে যত বিশদভাবে দেখা যায়, সময়ের মধ্যে থেকে তা পারা যায় না; আবার বর্তমানকে যেভাবে যাচাই করার উপায় থাকে, অতীত সেভাবে দেখা যায় না। তাই এই খোকা, মুরাদ, রঞ্জু, লুলু চৌধুরী, রাজীব ভাই বা নীলাভাবি কাউকে দুর্বল-শক্তিশালী-খারাপ-ভালো এসব যাচাই করতে চাইছিনা। তারা এই বইয়ের কল্যাণে রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ- সে সময়ের বা এই বইয়ের ভাষা অনুযায়ী, 'সকল সময়ের' মানুষ।

ব্যক্তিগতভাবে, বইয়ের একটা খুব ছোট একপেশে দিক চোখে পড়েছে, তা হল মেয়েদের প্রতি লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি। নিছক খোকার চরিত্র সাজাতে গিয়েই তিনি এমনটা করেছেন, না তার ব্যক্তিগত হতাশা বা মনোভাবের ছাপ পড়েছে, বুঝতে পারিনি। এছাড়া, বাকি সব কিছুই- বিশেষ করে ভাষা, উপমা, রূপক, আর শব্দের ব্যবহার দেখে আমি এক কথায় মুগ্ধ! অবশ্যই পড়ার মত বই; একটু সময় নিয়ে বুঝেশুনে পড়ার মত বই- নিঃসন্দেহে!
Profile Image for মোমিন Ahmed .
114 reviews50 followers
Read
July 10, 2023
বইটা এবার শেষ না করেই রেখে দিচ্ছি এই কারণে যে একবার একটা বই শেষ করে ফেললে সেটা দ্বিতীয় বার পড়া আমার জন্য প্রায় অসম্ভব। আমি এই বইটা আর একবার ট্রাই করবো।
বইটা পড়ার জন্য একটা অখন্ড অবসর আর মনোযোগ দরকার।
Profile Image for Shanto.
45 reviews16 followers
January 23, 2014
ভেবেছিলাম ঘোর কেটে গেলে লিখব, অথবা সম্ভবত ঘোর কেটে গেলেই লিখব। সেই ভেবেই অপেক্ষা করছিলাম, দু-চার দিন, কিন্তু ঘোর কাটল না, কাটছে না, বরং ঘোরের মধ্যেই পড়ে ফেললাম আরেকটা বই। সে জন্যেই লিখতে বসা। ঘোর কাটার অপেক্ষায় থাকলে হয়ত লেখাই হয়ে উঠবে না। লেখা না হয়ে ওঠা আরও অনেক সম্ভাবনাময় লেখার মত হারিয়ে যাবে, অনেক লেখাই যে রকম ভ্রুণ অবস্থায় হারিয়ে যায়। অবশ্য তাতে বিশেষ কিছু ক্ষতি হয়নি বা হয়না। আমি এমন কিছু লিখিয়ে নই যে আমি লিখিনি বলে কেউ অপেক্ষায় দাঁতে কামড়ে হাতের নখ ক্ষয় করে ফেলবে অথবা আমি লিখেছি বলেই লেখা পড়ে কেউ দুরন্ত পায়চারীতে অস্থির করে দেবে অন্ধকার ব্যালকনি। তাছাড়া আমি লেখকও নই, না লিখলে আমারও যে বিশেষ কিছু এসে যায় এমন নয়। কিন্তু এই লেখাটা সেরকম কোন উদ্দেশ্যেই লেখা নয়, লেখার উদ্দেশ্য অনেকটাই উগড়ে দেবার মত, এমন উগড়ে দেবার অনুভূতি অনেক দিন কোন বই পড়ে হয় নি।

কথাটা পরিষ্কার করেই বলতে হবে, এটা সম্ভবত কোন বুক রিভিউ নয়, সম্ভবত এটা কিছুই নয়। কিছু হতে হবে তেমন পরিকল্পনা করে লিখছিও না, শুধু যতটুকু উগড়ে দিতে পারলে নিজের আরাম হয়, স্বার্থপরের মত শুধু সেটুকু উগড়ে দেব সম্ভবত। তবে উগড়ে দেবার একটা সমস্যা আছে, সেটা বোধহয় খুব একটা হিসেব করে দেয়া যায় না। বিবমিষার জন্য দোষী সাব্যস্ত পানীয় বা খাবারের সাথে গতকালের খাওয়া নির্দোষ পুষ্টিকর আর অনাকাঙ্খিত খাবারের অংশও বের হয়ে আসে নির্দ্বিধায়, আবার অনেক সময় অধিক পুষ্টিকর খাদ্যের ভার দেহ সহ্য করতে না পেরে উগড়ে দেয় নির্বিচারে, আমার অবস্থা বোধহয় কিছুটা সেরকমই। এখন এই অবস্থায় লিখতে গেলে অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু যদি লেখা হয়ে যায় অথবা যেটুকু উগড়ে দেব ভেবেছিলাম সেটা যদি না বেরোয়, সে দোষ পাঠক আমাকে দিলেও তার দায় নিতে আমি অপারগ।

শুরুটা সাদামাটা, একটু বেশিই হয়ত, চমক নেই কোন। ভাইবোনের সংসার, খুঁনসুটি, ঝগড়া, হাসাহাসি আর অভিমান। এই নিয়ে শুরু। এর মধ্যে নতুন কিছু নেই যে আচ্ছন্ন হয়ে যেতে হবে, কিন্তু এই কিছু না থাকার মধ্যেই লেখক আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেন। অদ্ভুত তাঁর উপমার ব্যবহার, একেবারেই অন্যরকম তাঁর ঘটনার বর্ণনা। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়েছি আগেই, তুলনা করাটা ঠিক হবে না হয়ত, কিন্তু বর্ণনা আর উপমায় মাহমুদুল হক আর ইলিয়াসকে পাশাপাশি না রাখলেও কাছাকাছি রাখা যেতে পারে। কিন্তু ঠিক সেই কারনেও এই লেখার অবতাররণা নয়।

একেবারে আটপৌঢ়ে ঘটনা আর কথোপকথনের পেটে ছুরি চালিয়ে মাহমুদুল হক একেবারে নাড়িভুড়ি পর্যন্ত বের করে আনেন নির্লিপ্তভাবে, অনেকটা ইলিয়াসের মতই। কিন্তু পড়ার সময় আমি লেখককে টের পাই না একেবারেই, গল্পের মধ্যে ততক্ষণে আমি ঢুকে পড়েছি খোকা হয়ে। বুঝতে না বুঝতেই রঞ্জু, মঞ্জু আর অঞ্জু আমার বোন হয়ে যায়। মঞ্জু আর অঞ্জু তলিয়ে যেতে থাকে অতলে, ঠিক জীবনের মত, রঞ্জু বেঁচে থাকে সেও জীবনের মত। জীবন অদ্ভুত! জীবন যেন ঠিক খোকার বোনের মত, জীবন যেন অনেকটা ঠিক আমার বোনের মত।

এই লেখাটা ২০১২ তে পড়তে পারতাম বা ২০১১ বা তারও আগে। মাহমুদুল হক আগে কেন পড়িনি সেজন্যে শুরু করার পর থেকেই একটু মন খারাপ হতে থাকে। এই লেখককে চিনতে এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম? সচলের কনফুসিয়াস কোন একটা লেখায় বোধহয় এনাকেই বলেছিলেন সাঁপুড়ে লেখক, অদ্ভুত সম্মোহনে সম্মোহিত করে ফেলেন। কিন্তু বইটি যতই পড়তে থাকি যতই একটা করে পৃষ্ঠা পড়া হয়, ততই মনে হয় এই বই পড়ার জন্য এর চেয়ে ভাল সময় বোধহয় আর হতে পারত না, একটা করে পৃষ্ঠা আগাতে থাকে আর মনে হয় এই বইটা ঠিক এই সময়েই পড়তে হত। আর ঠিক সেইজন্যেই বইটি নিয়ে লিখতে বসা।

বইটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা। পুরোটা ঠিক মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিও নয় বরং আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ব্যক্তিগত জীবনের যে সংকট, যে টানাপোড়েন, যে দ্বন্দ্ব, যে হিসেব-নিকেশ, সেইসব উঠে এসেছে খোকা নামের এক আত্নমগ্ন, আপাতসচেতন, পড়ুয়া অথচ নির্বোধ যুবকের জীবনের মধ্যে দিয়ে। এক হিসেবে গল্পের নায়ক বা মূল চরিত্র তাকে বলা যেতে পারে, কারন তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় সব চরিত্র আর সংলাপ। অথচ একটু খেয়াল করে দেখলেই বোঝা যায় গল্পের মূল চরিত্র আসলে সেই সময়ের সংকট, সেই সময়ের স্বপ্ন, সেই সময়ের নির্মাণ আর বিনির্মাণ। আর আরেরকটু খেয়াল করলে বুঝতে পারি, সেই সংকট কেবল সেই সময়ের নয়, বরং সেই সংকট সেই সময়কে অতিক্রম করে কখন যেন আজকের নাস্তার টেবিল, রাস্তার পাশে চায়ের দোকান অথবা রাজপথের সংকট হয়ে উঠেছে।

'জীবন আমার বোন'কে আমি দেখলাম দুই হাজার তের এর ভেতর দিয়ে অথবা অন্যভাবেও বলা যায় দুই হাজার তের কে দেখলাম 'জীবন আমার বোন'-এর ভেতর দিয়ে। সম্প্রতি আমি মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে চেষ্টা করেছি শাহবাগের সানগ্লাস চোখে লাগিয়ে, তাতে মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করা হয় হয়ত, শাহবাগের সানগ্লাস চোখে লাগিয়ে সত্তর আর একাত্তরের ক্যানভ্যাস দেখতে গেলে পুরো ক্যানভাসের অনেকটাই ঢাকা পড়ে হয়ত। কিন্তু এর চেয়ে ভাল সানগ্লাস আমার হাতে আর কীইবা আছে! আমি বরং দুই হাজার তের বা শাহবাগকে সানগ্লাস হিসেবে না দেখে একটা দূরবীন হিসেবে দেখি। 'জীবন আমার বোন' সেই দূরবীনের লেন্স নয় বরং ফোকাস রিং, তাতে আগের চেয়ে অধিক দূরত্বে যে দৃষ্টিপাত করতে পারি তা নয়, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক পরিষ্কার দেখি এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। এই জায়গাতেই জীবন আমার বোন শুধু একাত্তরের গল্প নয়, এটা হয়ে ওঠে দুই হাজার তের এরও গল্প। এটা একাত্তরের ঢাকা থেকে আজকের শাহবাগে এসে থমকে দাঁড়ায়, আমি আর আমার বন্ধুদের চ্যাটবক্সে আর ফেসবুক স্ট্যাটাসে। চায়ের কাপে অথবা স্কাইপ ভাইবারে এক একটা 'জীবন আমার বোন' রচিত হতে দেখি। আমার আশেপাশের সবাই, আমি তুমি আর সে সবাই মিলে কেউ হয়ে যাই খোকা, কেউ মুরাদ বা ইয়াসীন, কেউ নীলাভাবী বা লুলু চৌধুরী, কেউ বা বোকার মত রাজীব ভাই হয়ে বসে থাকি। আর কেউ কেউ অঞ্জু মঞ্জু রঞ্জু হয়ে কেবল তলিয়ে যায় জীবনের মত। আর কোন কোন খোকা না বুঝে শুধু সেই রঞ্জু মঞ্জু আঞ্জু���ে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে জীবনটাকেই কোথায় যেন হারিয়ে ফেলে।

খোকার মধ্যে যখন খুঁজে পাই এই সময়ের ফেসবুকের বামপাশে 'আই হেইট পলিটিক্স' ঝুলিয়ে রেখে চেগেভারার টি-শার্ট পরে ঘুরে বেড়ানো তরুণটিকে, তখন এই লেখাটি না লিখে উপায় থাকে না। অথবা রাজনীতিকে বইয়ের পাতায় আটকে ফেলে রাজনীতিবিদদের গালাগাল দেয়া মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া তরুণীর ফেসবুক স্ট্যাটাসের সাথে খোকার এই উপলব্ধির পার্থক্য কতটুকু? “রাজনীতির ব্যপারটাই আগাপাস্তলা একটা জমকালো ছেনালি; একজন শিক্ষিত নাগরিকের দায়িত্ব সম্পর্কে তার পুরোপুরি ধারণা থাকলেও ভোটার লিস্টে সে তার নাম তোলেনি। রাজনীতির ব্যাপারটা তার কাছে শিকার ফসকাতে না দেওয়া হুবহু সেই মাদামোয়াজেল ব্লাশের মত”।

অথচ এই অস্থির সময় কাউকে রেহাই দেয় না। ফেসবুক বা টি-শার্টে 'আই হেইট পলিটিক্স' ঝুলিয়ে রাখা যে তরুণ প্রতিদিন অ্যালিয়ন, প্রেমিও বা সদ্য কেনা বাইকের পিছে প্রেমিকাকে চাপিয়ে ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, সাইলেন্সার খুলে রেখে বিশাল শব্দে জানান দিয়ে যে যুবক বসুন্ধরার ফাঁকা রাস্তায় কার রেসিং করে বন্ধুদের সাথে, হরতাল বা অবরোধে তাকেও রিকশা বা হাঁটা পায়ে পৌছাতে হয় গন্তব্যে, কখনও বা পৌছানোই হয়ে ওঠে না। সেই ঘৃণা করা পলিটিক্সের উত্তাপ তার গায়ে এসেও যখন লাগে তখন সেও কি খোকার মত করে ভাবে নি বা ভাবে না? এইসব প্রশ্ন আমাকে পেয়ে বসে, তাই লিখতে বসি।

এইসব ঝামেলা, ফেসবুক আর রাজপথের উত্তাপ থেকে আমি বা আমরাও কি কখনও খোকার মত নীলাভাবীর ড্রইংরুমে আশ্রয় খুঁজিনি? এতসব তর্কবিতর্ক, গালাগালি আর কথার মারপ্যাচে একে অপরকে হেনস্থা করার সময় খোকার মত আমারও কি কখনও অর্থহীন মনে হয়নি সবকিছু? আমিও কি কখনও এসব থেকে মুক্তি চেয়ে খোকার মতই কোন এক সেগুনবাগিচার দিকে অগ্রসর হতে হতে মনে মনে বলে উঠিনি? নিজেকে বোঝাইনি? “কথার প্যাঁচে ফেলে একে অপরকে অহেতুক হেনস্তা করার অপপ্রয়াসই নেই ওখানে। আড্ডা আর তর্কের মুখোশ এঁটে বন্ধুরা যখন মাঝে মাঝে হীন মনোবৃত্তির আশ্রয় নিয়ে একে অপরের নামে কাদা ছোড়াছুড়ি করে, জারিজুরি ফাঁসের ব্যপারে পরস্পর নোংরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়, তখন তার মন বিশ্রী রকম তেতো হয়ে যায়”।

কিন্তু নীলাভাবীর ড্রয়িংরুমে সেই আগের নেশা কোথায়? সময় বোধহয় সবসময় আর নীলাভাবীদের নিয়ে ভাবার সময় দেয় না, সময়ের প্রয়োজনেই সময়কে চিনতে হয়। এই সময় আর সেই সময়ের মাধ্যে পার্থক্য কতটা? পার্থক্যের মাত্রা হিসেব করতে গেলে হয়ত বিস্তর ফারাক পাওয়া যাবে, কিন্তু প্রকৃতিগত মিল সম্ভবত ব্যপক। খোকার মত তাই এখন আমার বা অনেকেরই অনুভূতি হয়, “কি দ্রুত বদলে যাচ্ছে যাবতীয় দৃশ্যপট, বদলে যাচ্ছে মুখের আদল, দ্রুত দ্রুত, দ্রুত এবং ধাবমান, গ্লেসিয়ারের মত দাবমান; দুর্মদ মৃত্যুর মত দরগলমান গ্লেসিয়ার। এই সময়ে কত বন্ধু হারিয়ে ফেললাম, কত মুখোশ খুলতে দেখলাম, কত মুখই বদলে গেল”, মিছিলে হাজার মানুষে মানুষে হাজার পার্থক্যের ভেতরেও একটা শ্লোগান থাকে, সেই শ্লোগানে সুর না থাকলেও গানের মত মনে হয়। সেই সময়ের শ্লোগান আর এই সময়ের শ্লোগানের মধ্যে ফারাক কতটুকু? এই বদলে যাবার মিছিলে কেউ যোগ দেয় কেউ যোগ দেয় না, কিন্তু সেই মিছিলের উত্তাপ সবার গায়েই লাগে, সেটা কেউ উপলব্দি করতে পারে, কেউ বা খোকার মত পালিয়ে বেড়ায়। এই উত্তাপের মাত্রা একাত্তর আর আজকে এক নয় নিঃসন্দেহে, কিন্তু সেই উত্তাপের প্রকৃতি আর কারন অনেকটাই অভিন্ন।

“সমস্ত ব্যাপারটা খোকার কাছে নিছক খেয়ালখুশি চরিতার্থ করার মত কিছু একটা মনে হয়, মিছিলের মানুষগুলোর মুখে দুরারোগ্য অসুস্থতার অক্ষর পড়তে থাকে সে। কোন স্তরের মানুষের সঙ্গেই আমার কোন সম্পর্ক নেই, কেমন একটু ভিন্নধাতে গড়া আমি- খোকা মনে মনে নিজেকে সামাল দিতে থাকে, কি ঘটছে না ঘটছে আমি তার কোন তোয়াক্কাই করি না, অথচ ফুটপাতের পানওয়ালা থেকে মাটিকাটা কামালারাও কমবেশি কিছু না কিছু বলতে সক্ষম; সময় বদলে দেয় মানুষকে, অথবা মানুষই কান মুচড়ে চাঙ্গা করে তোলে প্রাণশক্তি-বিবর্জিত নির্জীব সময়কে, এবং আমি কোন কিছুর ভিতর নেই। দেশ দেশের কল্যাণ, দেশের ভবিষ্যত, দেশপ্রেম, এসবের কিছুই তার মগজে ঢোকে না। এইসব ভজকট ব্যাপারে নিরর্থক অপচয়িত না হয়ে বরং শিথিল আলসেমির ভিতর ডুবে থাকা ভাল, অন্তত নিরাপদ তো বটেই।” এই গল্প একাত্তরের না গতকালকের এই পার্থক্য কে এঁকে দেবে? সময়কে অস্বীকার করে কূপমন্ডুক হয়ে বেঁচে থাকতে চাওয়া নপুংসক প্রজন্ম শুধু এই সময়ের সন্তান নয়। এরা সবসময়ই ছিল, সময়ের উত্তাপ থেকে বেঁচে থাকতে এরা নীলাভাবীর আঁচলের নীচে আশ্রয় নিতে চায়। কিন্তু নিষ্ঠুর সময় নীলাভাবীকে চিনতে পারে না। নীলাভাবীর আঁচলও একসময় সময়ের উত্তাপে গলে যায়।

জীবন আমার বোন কোন গল্পকে ঘিরে আগায় না, গল্প সেখানে থমকে থাকে বেশিরভাগ সময় নীলাভাবীর বেডরুম অথবা লুলু চৌধুরির খসে পড়া আঁচলে, কখনও রঞ্জুর সাথে খুনসুটিতে, মুরাদ বা ইয়াসীনের সাথে চায়ের কাপে। থমকে থাকা এক একটা মুহুর্ত থেকে মাহমুদুল হক এক একটা রত্ন বের করে নিয়ে আসেন। সেই রত্নের জ্যোতি শুধু সেই সময়ে আটকে থাকে না, সেটা অতীতকে পেছনে ফেলে ঘটমান বর্তমানের অংশ হয়ে ওঠে। মুরাদ যখন সময়কে কাজে লাগিয়ে তার কবিতার একটা বই প্রকাশের কথা ভাবতে থাকে, আমরা তখন মুরাদের মধ্যে আজকের শাহবাগকেও কি কিছুটা খুঁজে পাই না?

অথবা গল্পের সেই আসাদের সাথে আমাদের রাজীবের পার্থক্য কোথায়? খোকা যখন বলে, “আমি ভাবতেই পারি না আসাদ নেই। খুব কষ্ট হয় আমার। এই যে ও নেই, তার জন্য কার কি এমন ক্ষতি হয়েছে, কি এমন যাচ্ছে আসছে?” আমার কিন্তু ঠিক ঠিক রাজীবের কথা মনে হয়। রাজীব ঠিক আমার মতই একজন ছিল হয়ত, কিন্তু আজকে আমার কী এমন আসছে যাচ্ছে? আবার ঠিক তখনই আমার ভেতর থেকেই মুরাদ কি বলে ওঠেনি, “চোখটা নিজের দিক থেকে ফিরিয়ে দেশ ও দশের স্বার্থের মাপকাঠিতে ফেলার চেষ্টা কর, দেখবি আজ আর এটা নিছক একটা নাম নয়, ঝকঝকে সোনার তরোয়ালের একটা প্রতীক, বিশাল দেশের ওপর স্থির বিদ্যুতের মত যা ঝুলে রয়েছে।”? রাজীব কি আমাদের আজকের আসাদ নয় অথবা লেখক কি আসাদের নাম দিয়ে আমাদের রাজীবের কথাই বলেন নি? ঝকঝকে সোনার তরোয়ালের সেই প্রতীক কি আজকের রাজীব নয়?

লাইন ধরে ধরে কোটেশান দেব বলে এই লেখা লিখতে বসিনি। সেটা করতে গেলে পুরো বইটিই এখানে তুলে দিতে হবে। গল্পের ডাইমেনশানও একমাত্রিক বা দ্বিমাত্রিক নয়, কম করে হলেও ত্রিমাত্রিক বা চতুর্মাত্রিক। সেই আলোচনায় যাব বলেও লিখতে বসিনি। সেটা বুক রিভিউ যদি কখনও লিখতে বসি তখন চিন্তা করে দেখব। খোকার চরিত্র বিশ্লেষণ করে খোকার গুষ্টি উদ্ধার করাও আমার আজকের লেখার উদ্দেশ্য নয়। শুধু বইটি পড়তে গিয়ে আমি বারবার যখন নিজের মধ্যে কখনও খোকা, কখনও মুরাদ বা কখনও লুলু চৌধুরীকে খুঁজে পেয়েছি, তখন মনে হয়েছে এই বইটি এখন শুধু আমি একা পড়লে হবে না, 'জীবন আমার বোন' এই সময়ে সবাই মিলে পড়তে হবে। না হলে যখন খোকার মত আমি বা আমরা বুঝতে পারব, তখন দেখব, অর্ধনিমজ্জিত যে বোনকে আমি বা আমরা জীবন মনে করে আঁকড়ে ধরছি, নিজেকে আড়াল করে মিছিলের উত্তাপ থেকে পিঠ বাঁচাতে চাইছি, সেই বোন কখন যেন টুপ করে সময়ের এঁদো পুকুরে ডুবে গেছে।

রিভিউ প্রথম প্রকাশ হয়েছিল সচলায়তনেঃ http://www.sachalayatan.com/shopnobaz...
Profile Image for Akash.
456 reviews161 followers
April 1, 2026
'জীবনের জটিলতাকে ঘৃণা করি, মনেপ্রাণে ঘৃণা করি।'

প্রতিটা বিপ্লব আমাদের উচ��চাভিলাষী করে তোলে। কিন্তু খোকা জানে দিনশেষে বিপ্লব নিয়ে সবাই শুধু ব্যবসা করে। মুরাদের মতো কবি, লুলু চৌধুরীর মতো সুবিধাবাদী সবাই। এজন্যই খোকার কাছে দেশের চেয়ে মানুষ বড়। খোকা রাজনীতির প্রতি চরম উদাসীন কিন্তু ভীষণভাবে রাজনীতি সচেতন। অনেকের কাছে খোকা চরিত্রটাকে বিরক্তিকর লাগবে কিন্তু যদি অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন তবে খোকার মধ্যে আধুনিক প্রজ্ঞা অবলোকন করতে পারবেন।

উপন্যাসের পটভূমি ১৯৭১ সালের মার্চের শুরু থেকে ঠিক মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। খোকার বয়ানে একজন নির্লিপ্ত তরুণের সাইকেডালিক ভাবনার বিচরণ। খোকা যেন দূরে কোথাও বসে নিরপেক্ষ নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাই এই উপন্যাস হয়ে উঠেছে যুদ্ধ নিয়ে পৃথিবীতে যত উপন্যাস রচিত হয়েছে সেসব উপন্যাসের মতোই সমমানের ক্লাসিক। যার পাঠ আবেদন সমগ্র মানবজাতির জন্য।

'প্রত্যেকটি মানুষের যন্ত্রণা যার যার নিজের মতো, কারো সঙ্গে কারো মিল নেই, এই একটিই সম্পত্তি যা কারো কাছ থেকে ধার নেওয়ার প্রয়োজন হয় না।'

এতো এতো বিশৃঙ্খলা, রক্তারক্তি, বিকৃতির মধ্যে খোকা তাই শৈশব নিয়েই বেঁচে থাকতে চায়; যেমনটা চাই আমারা সবাই। তাইতো খোকার বয়ানে লেখক বলে,
'শৈশব জীবনে বারবার আসে কেন? আসলে জীবন মানেই শৈশব; জীবনভর মানুষ এই একটা ঐশ্বর্যই ভাঙিয়ে খায়, আর কোনো পুঁজিপাট্টা নেই তার।'

তাইতো খোকার কাছে জীবন মানেই অঞ্জু, মঞ্জু, রঞ্জু। জীবন মানেই তার তিন বোন। জীবন খোকার বোন; জীবন আমার বোন। জীবন মানেই একটা পুকুর। যেখানে আমরা সবাই বিলীন হয়ে যাব।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস হিসেবে 'জীবন আমার বোন' ভীষণ আন্ডাররেটেড। সকল পাঠক নয় শুধু সকল সচেতন নাগরিকের মনোযোগ দাবি রাখে এই বই। রেকমেন্ডেড।

'জীবনে দুঃখ পেতে হয়। দুঃখের এই একটা চরিত্র, সে সুযোগ পেলে পিষে ফ্যালে বটে, শেখায়ও প্রচুর; সাহস করে, মাথা উঁচু রেখে, বুক টান করে যারা তার মুখোমুখি দাঁড়ায় তারা কেউ কখনো খালি হাতে ফেরে না'
Profile Image for Shahidul Nahid.
Author 5 books140 followers
Read
November 5, 2016
শুরুর দিকে ভালো লাগছিলো অনেক... মাঝের পর থেকে কেন জানি টানতেছিল না আর। গুবলেট হয়ে যাচ্ছিলো সব ! অনেকেই পাঁচ তারা দিয়েছে এই বইটাকে, হয়তো আমার মাথার উপর গিয়েছে বলে বোধগম্য হয় নাই ... আবার পড়তে হবে, ধৈর্য্য নিয়ে।
112 reviews
March 30, 2021
অন্য সব বই এর মতো গুডরিডস এই বইটার সন্ধান পাই।বই সম্পর্কে দু লাইন পড়তে গিয়ে ছোট্ট করে দু তিনটা Quote চোখে পড়ে এবং সাথে সাথে যেন মনে দাগ কাটে,তো একরকম সেই লোভে পড়েই বইটা নিয়ে বসি।প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর সেই ঘোর কেটে যায়।বইটার Quote তুলে আনতে চাইলে যে অর্ধেক বইটাই তুলে আনতে হচ্ছে মশাই!

'জীবন আমার বোন' উপন্যাসটিতে মার্চ,১৯৭১ এর এক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।'খোকা' নামে গল্পের মূল চরিত্রের চোখে আমরা সেই চিত্র দেখতে পাই।লেখক যেন চরিত্র টাকে কিছুটা স্নেহ আর অনেকটা অবহেলার সমন্বয়ে তৈরি করেছেন।যুদ্ধের সেই চরম অস্থিরতার সময়েও বীরের তালিকায় নিজের নাম লিখানোর বদলে দেশের সংগা খুজতেই বেশি সময় ব্যয় করতে দেখা গেছে খোকাকে।অবশ্য এই নির্লিপ্তিতার জন্য তাকে দোষ ও দেয়া যায় না।তার জগৎ যে নিলাভাবির আঁচলের স্নিগ্ধতা,বেলীর লিখা চিঠিখানা,লুলু চৌধুরীর বদনাম,মুরাদকে বাক্যবাণে হারানো আর অনেক্ষাণি অংশ জুড়ে বোন 'রঞ্জু' কে ঘিরে!

কিছু জায়গায় লিংগবাদ চোখে পড়েছে।ভেবেছিলাম এক তারা কি তবে কাটা যায়?পরক্ষণেই মনে হয়েছে 'খোকা'র করা লিংগবাদের জন্য লেখক কে কেন এক নম্বর কম দেব বলুন তো?

অন্য সব বিষয়ে নির্লিপ্ত ও কতকটা লাম্পট্য চোখে পড়লেও বোন রঞ্জুর সামনে খোকা যেন আদর্শ ভাই!চিরায়ত ভাই বোনের চিত্রই লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন অনেকখানি মায়া দিয়ে।

বইখান পড়ার পর আমার প্রিয় কথাশিল্পীর তালিকাটা হালনাগাদ করতে হবে দেখছি!অনেকদিন পর একজন লেখকের শব্দের ইন্দ্রোজালে এতক্ষণ বন্দী ছিলাম।

বি.দ্র. যারা উপন্যাসে প্রাপ্তবয়স্ক শব্দ নিতে পারেন না,তাদেরকে এটি পড়তে নিরুৎসাহিত করবো।
Profile Image for Saiful Sourav.
103 reviews71 followers
January 22, 2023
জীবন আমার বোন ঠিক যুদ্ধের নয়, যুদ্ধকালিন উপন্যাস । যেখানে একজন ভাই খোকা ও তার বোন রঞ্জু শহরের প্রত্যন্ত জায়গায় থাকে । যুদ্ধের মধ্যেও উদাসিন হেঁটে বেড়ায় খোকা । বোনের সাথে ঝগড়াটে কিন্তু আনন্দম এক সম্পর্ক তার । আজ না, কাল না করেও কোথাও আশ্রয় নিতে যায় না সে বোনকে নিয়ে । যেন এই পরিস্থিতির সাথে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই এবং এসবের কিছুই সে চায়নি । এদিকে যখন শহরে ঢুকে পড়েছে পাকবাহিনী এবং সমস্ত দেশ মুহূর্মুহু আক্রমণে ভঙ্গুর প্রায়, তখন খোকার চোখে ঝরে পড়ছে অন্ধকার । বন্ধুদের আড্ডায় বাকপটু খোকাকে যুদ্ধ পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যতা বিধানে স্বাভাবিক ভাবেই কোনঠাসা হতে দেখা যায় । ক্ষণিকতা, মুড বেইজড কথা-বার্তার প্র্যাকটিস ও অসহিষ্ণু আচরণ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ব্যক্তিকে গ্রাস করে যেন । ভেঙে পড়া ঝুরঝুরা দালানের ধ্বংসাবশেষে ঝুলে থাকে জীবন আমার বোন ।
মাহমুদুল হকের কাব্যভাষায় শব্দের সংস্হানে গল্পের রূপরেখা ছায়ার মতো চলতে থাকে । খোকা কেন যুদ্ধের মধ্যে গ্রেগর সামচা বনে গেল সে সূত্রটা কি পাওয়া যাচ্ছে ৪৭'এর দেশ বিভাগে, যখন লেখকের বয়স আট এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকায় সপরিবারে যাত্রা বা আগমনের দুই যুগের প্রান্তে যুদ্ধ পরিস্হিতি?
Profile Image for Saiqat .
60 reviews1 follower
October 16, 2021
আমরা সবাই স্বপ্ন। স্বপ্নের ভিতরেও আরেক স্বপ্ন সে স্বপ্নটাই আমরা। আর আমরা আমাদের স্বপ্নের মতোই শূন্য!
Profile Image for সারস্বত .
240 reviews141 followers
June 17, 2022
এবারের ৪৪তম বিসিএসের একটি প্রশ্ন এসেছিল 'খোকা' ও 'রঞ্জু' মাহমুদুল হক-এর কোন উপন্যাসের চরিত্র। কাকতালীয়ভাবে ঠিকই তখন আমি এই উপন্যাসটি পড়ছিলাম। উপন্যাসটির নাম 'জীবন আমার বোন'।

উপন্যাসে ঘটনা প্রবাহ কাল ১ মার্চ থেকে ২৭শে মার্চ ১৯৭১ সাল; যে সময়কালে শোষণের ও প্রতিবাদের পারস্পরিক বারুদের যোগান, ইন্ধন আর বিষ্ফোরণে একসাথে সংঘটিত হয়েছিল। ২৫শে ,মার্চের আগে প্রায় শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত ঢাকা শহরের মানুষ শহর ছেড়ে প্রাণের দায়ে পালিয়েছে, ঘুরতে গেছে, আড্ডা জমিয়ে দিয়েছে কোন রেস্টুরেন্ট কিংবা লেকের কাছে, পরকীয়া করতে গেছে কোন নিস্তব্ধ দুপুরে, অন্যের পরিবারের দুর্বল স্থান লক্ষ্য করে বন্ধুকে খোঁচা মেরেছে নিষ্ঠুরভাবে, অবশেষে দেশের পরিস্থিতি বাড়াবাড়ি আর কিছু হবে না নিজেকে বলে ঘুমাতে গেছে মাঝরাতে। শেষ অবধি পুরোদমে বেঁচে থেকেছে।

কিন্তু সময় মুহুর্তে বদলে গেছে। ২৫ শে মার্চ। এলোপাথাড়ি ফায়ারিং। বিকট শব্দে মর্টার সেল বিষ্ফোরণ। ঘরের লাশ তখন রুমমেট, রিক্সার উপর লাশ, নীচে লাশ, বস্তির ঘরে ঘরে লাশ, ��লেজের ক্যান্টিনে লাশ, নদীর কূলে জমা লাশ, পুকুরের জলে লাশ। শহরের চারিদিকে মৃতদেহ প্রদর্শনী। অদ্ভুত তার বৈচিত্রতা। সৃষ্টিতে কোথাও কোন কার্পণ্য নেই। সেই লাশ ঠেলে কেউ পুরোদমে মরে বেঁচেছে আর কেউ বেঁচে থেকে ধুকে ধুকে মরেছে। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জাহেদুল কবির খোকা। পূর্বোক্ত দুই শ্রেণীর মাঝে দ্বিতীয়।

খোকা, যাকে বাঁচাতে গিয়ে অঞ্জু আর মঞ্জু যমজ বোন ডুবে মরেছে। সময়ের ব্যবধানে অনেক দূরের সময়কে মনে হয় এই তো সেদিন আর আবার সেই একই সময়ের ভিন্ন ঘটনাকে মনে হয় সেই অন্য কোন জন্মে হয়েছিল এসব।

সেই খোকা রেক্সের আড্ডা পরিত্যাগ করে এগিয়ে যায় নীলাভাবীর দিকে। নীলাভাবী যে কিনা খোকাকে প্রথম দিয়েছে দুর্লভ কিংবা অনিবার্য পৌরুষত্বের স্বাদ। নীলাভাবীর বাসার পথের মাঝে প্রতিবাদ পরিবেশ, মিটিং মিছিল খোকাকে প্ররোচিত করতে গেলে তার মাঝে জেগে ওঠে 'লোলচর্ম নীতিবাগীশদের চিড়-খাওয়া করব'। দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, গণতন্ত্র, পুজিবাদ, শ্রেণীসংগ্রাম সব আস্তাকুড় থেকে তুলে এনে আরেকবার আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে দেয় খোকা। শ্রমিকের আন্দোলন আইজেন-স্টাইনের চলচ্চিত্র, পাবলো নেরুদার কবিতা, গেরিভিদালের বই, পিকাসোর দেয়ালচিত্র শোষিত আর শাসিতদের মাঝে শান্তির উদ্দীপনা যোগাতে ব্যর্থ হয়। সেই ব্যর্থদের দলে খোকাও একজন। অথচ খোকাই অভিযোগকারী।

খোকার একমাত্র জীবিত ছোট বোন রঞ্জু। যাকে কল্পনায় গড়তে গিয়ে মনে হয়েছে '৭১ এর কোন নারীচরিত্র নয়। এই চরিত্র ২০২২ সালেরও হয়তো ২০৪৫ এরও, হয়তো আরও সময় পেরিয়েও সে একইরকম। চুপচাপ থাকা, হুট করে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া, চুপিসারের গড়ে তোলা নিজের চারপাশে এক অভেদ্য দেয়াল, কত সরল অথচ কত ধাঁধা, কত কোমল অথচ কত সুক্ষ্ম। খোকার খালাত বোন বেলীর মত চরিত্রকে বরং বেশি আধুনিক আর টেকসই মনে হবার কথা ছিল। অথচ রঞ্জু যেন কোন শব্দ আর রহস্য বলে আধুনিক থেকেও বেশি স্পষ্ট, চিরন্তন।

উপন্যাসে এক একটা দিন গড়ায় আর কোথায় যেন মনের ভেতর চুপিসারে রঞ্জুর জন্য দুঃচিন্তা বাড়তে থাকে আর খোকার প্রতি আসে বিরক্তি। সরীসৃপের মত বুকের ভর দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে আসে ২৫ শে মার্চ। খোকা তবুও থাকে নিরুদ্বেগ। দুঃচিন্তা আর উদাসীনতার লড়াইতে উদাসীনতার বার বার দুঃচিন্তার ছকের মন্ত্রীর খেয়ে দেয়।

অবশেষে আসে সেই দিন, সেই রাত। তারপর গল্পটা ভীষণ আলাদা। অথচ আলাদা কিছু নয়। গল্পটা '৭১ এর ৯০ ভাগ যুবকের জন্য একই। শুধু কিছু যুবক বাদে যারা মুরাদ, ইয়াসিন, রহমান হতে পেরেছিল। জাহেদুল কবির খোকারা তীক্ষ্ম মেধা আর তীব্র প্রতিভা নিয়েও পরিবর্তি ৯ মাস পালিয়ে বেড়িয়েছি কিংবা বিলাপ করেছে প্রিয়জনের লাশের উপর। অন্যদিকে মুরাদরা বাংলায় স্নাতকের ছাত্র হয়ে, কারখানার শ্রমিক হয়ে, কৃষক হয়ে, পাড়ার মাস্তান হয়ে, অজ্ঞ হয়ে, সরল হয়ে, সাহসী হয়ে স্বাধীন দেশ নামক এক তীব্র ঝোঁক নিয়ে লাশ হয়েছে কিংবা হয়নি কিন্তু কোনদিন আফসোস করেনি।
Profile Image for Tahsina Syeda.
207 reviews68 followers
December 19, 2016
মাহমুদুল হক-এর জাদুকরী লেখনী এখানে উপস্থিত, কিন্তু বইটা পড়ার সাথেসাথে ৪ তারা রেটিং দিলেও পরে কমিয়ে ৩-এ আনতে হলো। সম্ভবত এটা এমন বই যে ভাষার জাদুর ঘোরটা কেটে যাওয়ার পর দুর্বলতাগুলো বেশি করে মনে পড়ে। কালো বরফ বা অনুর পাঠশালার সমপর্যায়ের নয় এই বই। তবু পড়ার মত তো নিশ্চয়ই।
Displaying 1 - 30 of 99 reviews