জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর - ভারতে মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই তিনি সমাধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, বার বার পরাজিক হয়েও ঘুরে দাড়িয়েছেন। ছিলেন দক্ষ প্রশাসক, শাসন করেছেন বিস্তীর্ণ ভুখন্ড।
এই পর্যন্ত বাবর আর পাঁচ/দশজন শাসকের মতই - শাসক, যোদ্ধা আর প্রশাসক।
কিন্তু বাবরের সাথে আর দশজন প্রতাপশালী শাসকের বিস্তর ফারাক ছিল। বাবর কবি ছিলেন - তাঁর স্বপ্ন ছিল তিনি বেঁচে থাকবেন নিজের সৃষ্টিতে। কবি বাবর আর যোদ্ধা বাবরের মাঝে সবসময় যে দ্বন্দ চলত তা বাবরকে ক্ষতবিক্ষত করেছে সারাজীবন। বাবর শিল্প ভালোবাসতেন, চাইতেন এমন মহান কিছু সৃষ্টি করবেন যা তাঁকে দিবে সেই মানসিক প্রশান্তি প্রবল প্রতাপান্বিত বাদশাহ হতে গিয়ে যা তিনি হারিয়েছিলেন। আর দশজন সাধারণ শাসক যখন শুধু রাজ্যবিস্তারের জন্যই রাজ্যবিস্তার করেছেন, বাবর তখন কেবলি স্বপ্ন দেখতেন এক বিশাল ঐক্যবদ্ধ সম্রাজ্যের যা তাঁকে সাহায্য করবে বিশাল আর অসাধারণ কিছু সৃষ্টি করতে - যেই সৃষ্টি কালের অতলে হারিয়ে যাবে না। বাবর লুটেরা ছিলেন না, যেমনটি ছিলেন সারা দুনিয়ার অধিকাংশ শাসক। ভারতবর্ষ জয় করার পর তিনি চেয়েছিলেন এই দেশের মানুষের মন জয় করে প্রকৃতই তাদের শাসক হয়ে উঠতে। বাবর বলতেন ভারত তাঁর দ্বিতীয় মাতৃভূমি।
বাবর তাঁর স্বপ্ন কি পূরণ করতে পেরেছেন? এই প্রশ্নের জবাব দেবে মহাকাল। তবে বাবর ঠিকি বেঁচে আছেন নিজ হাতে লেখা তাঁর বিখ্যাত আত্নজীবনি 'বাবরনামা'র মাধ্যমে। আর বাবরের বংশের একজনই সৃষ্টি করেছেন তাজমহল, যা নিয়ে সারা দুনিয়া গর্ব করে এখনো। বাবর বেঁচে আছেন সন্তানের প্রতি অপত্য ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে যিনি প্রিয় পুত্র হুমায়ুনের সুস্থতার জন্য হুমায়ুনের বদলে নিজের জীবন নিয়ে নেয়ার দোয়া করেছিলেন মহান আল্লাহর দরবারে।
কালের বিবর্তনে তাজমহল বিবর্ণ হয়ে যাবে - হয়ত একসময় ধ্বংসও হয়ে যাবে কিন্তু বাবর ঠিকি বেঁচে থাকবেন "বাবর নামায়"। বাবর বেঁচে থাকবেন তাঁর 'বাবর' নামের সার্থকতা নিয়ে - একজন দোষে গুণে মিলিয়ে মানুষ হিসেবে যিনি তাঁর বাঘের মত শক্তি আর আকাশের মত বিশাল অন্তর নিয়ে হেঁটে বেড়িয়েছেন একসময় এই ধুলির ধরায়।
"হিংসা, স্বার্থপরতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাসা বাঁধে অজ্ঞ, প্রতিভাহীন, মানসশক্তিহীন ব্যক্তির মনে। শিল্পের উচ্চস্তরে বিশেষত অকর্মণ্যেরা প্রতিভাবানদের জায়গা দখল করে রাখে। তাঁদের প্রতিভাকে প্রকাশ হতে দেয় না, নিধন করে তাঁদের প্রতিভাকে। এই পৃথিবীতে সবচেয়ে যা অমঙ্গলকর তা হল প্রতিভাহীনদের হিংসা।"
শুন্য হাতে মাতৃভূমি ছেড়ে যাযাবর জীবনে পা রেখেও বংশপরম্পরায় পাওয়া ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি নিজের মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি বাবর। তাই তো হিরাতে পৌছে সেখানকার শাসকদের যৌথবাহিনীর মাধ্যমে শয়বানির বিরুদ্ধে একত্রে যুদ্ধে যাওয়ার আহ্বান জানান বাবর। কিন্তু হিরাতের শাসকেরা খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি বাবরের কথায় যার পরিণাম স্বরুপ আবারও অর্জনের তালিকায় শয়বানির শাসন ক্ষমতা হিরাতের মাটিতেও স্থান পায়। শুরু হয় লুটপাট ও শহর জুড়ে তান্ডব এবং আবারও নারীদের নিয়ে পুতুলখেলা। ক্ষমতার চূড়ায় বসে শয়বানি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে যার ফলে ইরানের ইসমাইল শাহ'র দলের কাছে ধূর্ত লোকটি প্রাণ হারায়।
ইসমাইল শাহ্'র সঙ্গে বাবর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করলেন কারণ এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই কেবল বাবরকে তার মাতৃভূমি মাভেরাননহরে পা রাখতে সাহায্য করবে। ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের খেলাটি যে কঠিন হবে তা বাবরের জানা ছিল তাই তো ইসমাইল শাহ্'র সঙ্গে অসম সমঝোতার বেড়াজালে পা রাখতে দ্বিধা করেননি সে। বন্ধুত্বের সূচনা স্বরুপ শাহ্ তার দূতের মাধ্যমে বাবরকে বারোটি তাঁরাযুক্ত লাল মুকুটের উষ্ণীষ উপহার পাঠালেন যেখানে বারোটি তাঁরা ইমামপন্থি মুসলমান অর্থাৎ শিয়া মতাবলম্বীদের ১২টি ইমামকে নির্দেশ করে কিন্তু বাবর ও তার অনুসারীরা পয়গম্বর মুহাম্মদের চারইয়ার বা চারজন খলিফা অর্থাৎ সুন্নি মতাবলম্বীতে বিশ্বাসী।
সমঝোতা করে অবশেষে শয়বানির দলের বাকীদের হারিয়ে সমরখন্দের মাটিতে পা রাখেন বাবর। তবে বাবরের সৈন্যদের পাশাপাশি এবার আগমন ঘটে শাহ্'র সৈন্যদেরও। সমরখন্দের জনগণরা বিদেশি সৈন্যদলদের ঘৃণার চোখেই বরণ করলেন যার প্রধান কারণ ছিল ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস। বাজারে বিরোধী পক্ষ গুজব ছড়াতে লাগলো যে শাহ্'র সৈন্যরা নিষ্ঠুর, তারা বাধ্য করছে লোকদের শিয়াপন্থি হতে , বাবর হয়ে গিয়েছে শিয়াপন্থি। মারপিট শুরু হলো নতুন মুদ্রার ব্যবহার নিয়ে যেই মুদ্রাতে রয়েছে ইসমাইল শাহ্'র প্রতিকৃতি ও শিয়া ইমামদের নাম যা সাধারণ লোকেরা ব্যবহার করতে নারাজ, তারা দাবি করলো পুরানো শয়বানির আমলের মুদ্রার প্রয়োগের। বাবরের অক্ষর শেখানো নিয়ে শুরু হলো বাঁধা বিপত্তি , বেড়ে চললো ধর্মান্ধদের সংখ্যা, শিল্পের চর্চা হয়ে উঠলো অসম্ভব। শুরু হলো বিদ্রোহ, আবারও রক্তপাত ও পরিশেষে অজ্ঞতার কাছে পরাজয় মেনে নেওয়া।
কাবুল থেকে বাবরের এবার পরিকল্পনা ছিল ভারতবর্ষ চলে যাওয়ার। নিজের দেশের মানুষের অজ্ঞতা তার মনকে বিষিয়ে তুলেছিল যার কারণে এবার ভিনদেশে পাড়ি জমানোর উদ্যোগ নেয় সে। লাহোরে জয়লাভ করে বিখ্যাত পানিপথ ( যা কোনো পানির পথ নয় ) হয়ে দিল্লির দিকে অগ্ৰসর হওয়ার মুখে ইব্রাহিম লোদির বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালিত করে বাবর ও তার অনুসারীরা। পূর্ব রণ অভিজ্ঞতা ও কামান গাদাবন্দুকের সহায়তায় যুদ্ধ চালনা করে বাবর। ভাগ্য সহায় ছিল বলে ভারতের হস্তীবাহিনীর নিকট কামানের কৌশল ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত যা জয়ী করে বাবরকে। বিরাট এই বিজয় খুব একটা স্বস্তির কারণ হতে পারেনি বাবরের জীবনে কেননা ভারতবর্ষের তীব্র তাপদাহ, বেগদের প্রতিনিয়ত বিদ্রোহী হয়ে ওঠা, ভিনদেশের ভিন্ন ভিন্ন প্রথা বিশেষ করে নিজেকে প্রতিনিয়ত দখলদার মনে করা ছিল তার অস্বচ্ছন্দতার কারণ।
পঞ্চাশোর্ধে পেরিয়ে পাওয়া না পাওয়া সবকিছুর হিসাব কষতে শুরু করে বাবর। ত্রিভুবনে সবকিছু পাওয়া অসম্ভব হলেও জীবন তাকে দিয়েছে মহিমের মতো স্নেহময়ী ও বন্ধুসুলভ স্ত্রী কিন্তু মহিমের পর রাজ্য ধরে রাখার খাতিরে আরও দুই বিয়ে করে এও বুঝেছে যে কাউকেই সুখী করতে পারেনি এই শাসক। তবে মহিম ও তার পুত্র, বংশের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী মির্জা হুমায়ুন যেন বাবরের এক টুকরো প্রশান্তির জায়গা। হুমায়ুনের বাবার প্রতি গভীর অনুরাগ ও মুগ্ধতা , বাবরের শিল্পচর্চার কিছুটা আয়ত্ত করার চেষ্টা, শাসক নয় বরং জন্মদাতাকে কাছ থেকে জানার স্পৃহা বরাবরই বাবরের মনে শান্তির আভাস বয়ে আনে। জীবনের শেষদিনগুলোতে বাবরনামা লিখেই সময় কাটাতেন এই শাসক যার শুরুটা বহু বছর আগে থেকেই, যেখানে জীবনের খন্ড খন্ড চিত্রগুলো অশোধিত ভাবেই লিপিবদ্ধ করে সবার নিকট তুলে ধরার বাসনা হয় তার। অতএব নশ্বর দুনিয়ার চিরন্তন ধ্রুব সত্য মৃতু্যকে আলিঙ্গন করে ইহজীবন থেকে বিদায় নেন শাহ ও কবি জাহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর।
লেখক বইয়ে একটা ব্যাপার উল্লেখ করেন যে যদিও আমরা বাবরকে মোগল রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলে জানি কিন্তু বাবর ও তার বংশের কেউ নিজেদের মোগল বংশের বলে দাবি করেননি, বরং তাঁরা নিজেদের তুর্কি বলেই অভিহিত কর���েন। এবার যদি অনুবাদ নিয়ে বলি তবে আমার কাছে অনুবাদ সাবলীল মনে হয়নি, পুরো বাক্য একাধিক বার পড়ে অর্থ বুঝতে হয়েছে যা দুইটা খন্ডের বেলায় ঘটেছে।
জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর - মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। সমরখন্দ পুনরুদ্ধার করা থেকে শুরু করে দিল্লি দখলের পরে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত কাহিনি লেখক বর্ণনা করেছেন এখানে।
কাহিনিগুলোর বেশিরভাগই আগে জানা থাকায় বুঝতে সমস্যা হয়নি। যদিও অনুবাদটা কেমন যেন কাঠখোট্টা গোছের মনে হয়েছে।
Действительно хорошая книга. Чем-то напоминает монгольскую трилогию Василия Яна, особенно начало, где ещё нет войны и нашествия и неторопливо описывается повседневная жизнь Хорезма, перед бурей. Уже прошло прилично времени с тех пор как я читал "Бабур-Наме", многое выветрилось у меня из головы. Многие особенности этого удивительного и необычного произведения переданы и в книге Кадырова. Поражает постоянное чувство изменчивости судьбы. Вот пир победителей, врывается гонец с вестью об очередной измене знати, и вот уже надо прыгать в седло и спасаться бегством. И удивляет пугающая для нашего времени смесь утонченности и жестокости. После пира с чтением изящнейших стихов вполне в духе времени можно было отправится наблюдать жестокую казнь с отрубанием разных конечностей. Автор это ухватил - как в одной душе помещалась такая искренняя личная проза и прекрасные стихи (здесь верю на слово, не владею тюркским или фарси) и в тоже время сочленялись указы о казнях. А что делать? Чтобы царствовать приходится творить жестокость, иначе её совершат другие, царственность пришла к Бабуру вместе с кровью и только с кровью могла бы его покинуть. Но Бабур-поэт пережил таки Бабура-падишаха, нет уже той империи, что он построил (он бы думаю, удивился если бы рассказали как царство его потомков сокрушили англичане, народ с острова на краю света), а слова его живы.
"বাবর" দ্বিতীয় খন্ডে মূলত ফুটে উঠেছে মির্জা জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর এর ভারতীয় উপমহাদেশ জয়ের কাহি। পানিপথে দিল্লীর শাসক ইব্রাহীম লোদীকে পরাজিত করে বাবর এই উপমহাদেশে তাঁর সাম্রাজ্যের সূচনা করেন। তিনি শুধু রাজ্যে দখল করতে নয়, অত্যাচারী শাসক হিসেবে নয় বরঞ্চ এই ভারতীয় উপমহাদেশের লোকেদের সাথে একসাথে মিলে এই অঞ্চল পরিচালনা করতে চেয়েছেন। স্থানীয় রীতি- নীতি, লোকেদের ধর্ম-বিশ্বাস, আচার ব্যাবহার ইত্যাদির উপর যাতে কোন আঘাত না হানে এর জন্যে তাঁর অনুগত সকল সৈন্য এবং বেগদের প্রতি তাঁর কড়া নির্দেশ ছিল। শুধু রাজ্য দখল করে তিনি রাজা হতে চান নি। এ অঞ্চল জয়ের পর এর সামগ্রিক উন্নয়নে তিনি প্রত্যক্ষ নির্দেশ দিয়েছেন। মনোমুগ্ধকর স্থাপত্য গুলো নির্মাণ করতে তিঁনি দূর দুরান্ত থেকে স্থপতি, কর্মী নিয়ে এসেছেন যা আজো এ উপমহাদেশে গৌরবের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। বিভিন্ন অঞ্চলের রাজা দের সাথে সন্ধি করে তিনি হানাহানি - রক্তপাত বন্ধ করতে পেরেছিলেন, জীবনের শেষ ভাগে পুত্র হুমায়ুনের কাছে রাজ্যভার অপর্ণ করে তিনি চোখ বুজেন। তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে আফগানিস্তানের সেই পাহাড় ঘেরা সুন্দর বাগিচা সমৃদ্ধ এলাকায় তাঁর কবর দেয়া হয়।
সেখানেই শুয়ে আছেন এক মহান বীর, এক যোদ্ধা, এক কবি, যিনি নিজ চেষ্টায় দক্ষতায় এক বিরাট অঞ্চলের শাসক হয়েছিলেন, এক বিরাট সাম্রাজ্যের বুনিয়াদ গেঁথে গেছেন।