কিংবদন্তী বলে, দুশো বছর আগে পরাক্রমশালী রাজা মঙ্গলের রাজত্বের নাম ছিলো ধর্মনগর। সেই রাজা ছিলেন অসম্ভব অত্যাচারী। নিজের কৃতকর্মের শাস্তি একদিন তাঁকে পেতে হয়। কিন্তু অনেকদিন পর সেই রাজা কিংবা রাজার প্রতিচ্ছায়া ফিরে আসে নিজের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে। ওদিকে রাজাকে যে শাস্তি দিয়েছিলো, সেই গজানন জাদুকরও নাকি ফিরে এসেছে। কিন্তু একটা মন্ত্রপূত কৌটোর সাহায্য ছাড়া গজাননের অতিলৌকিক ক্ষমতা কাজ করে না। কৌটোটাও কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
অদ্ভুতুড়ে সিরিজ হচ্ছে আমার মন খারাপের একমাত্র টোটা। পড়লেই মন ভালো হয়ে যায়। গজাননের কৌটো গল্প টাও অনেক ভালো লেগেছে।শুরু থেকেই যেন অন্যরকম।একটু উদাহরণ দি তাহলে - নকড়বাবুর পাশে একটা লোক নিজের কাটা মুণ্ডুটা দু’হাতে বুকে চেপে ধরে বসে আছে। মুণ্ডুটা পিটপিট করে চারদিকে চাইছিল। নকুড়বাবুকে বলল, “বুঝলেন মশাই, গজু কারিগরের হাতটি বড় ভাল। কিন্তু খদ্দেরের ভিড়ে লোকটা হিমসিম খাচ্ছে।”
নকুড়বাবু বললেন, “তাই দেখছি। তা আপনার মুণ্ডু কাটা গেল কীভাবে?” “সে আর বলবেন না। রাতের খাওয়া শেষ করে সবে পায়েসের বাটিতে হাত দিয়েছি, এমন সময় বাড়িতে ডাকাত পড়ল। আমি ‘তবে রে’ বলে যেই লাফিয়ে উঠেছি অমনি ফ্যাচাং........
অদ্ভুতুরের সমস্যা একটা-ই, যখন গল্পে জেঁকে বসি,গোগ্রাসে গিলতে থাকি; ঠিক তখন-ই অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করি যে আমি এখন বইয়ের শেষ পাতায় আছি! তখনই মন খারাপ টা জেগে উঠে,ভাবতে খারাপ লাগে "আরেকটা অদ্ভুতুরে আমার পড়া হয়ে গেল,আমার আরেকটা প্রিয় বই শেষ হয়ে গেল"। হায়,এই ব্যথা কি যে ব্যথা,বোঝে কি আনজনে!!
শীর্ষেন্দুর বইয়ের বিশেষ করে অদ্ভূতুড়ে সিরিজের গল্পগুলোর মজাটা হলো ভারী ভারী কাজের ফাঁকেও একটু একটু করে ৭০-৮০ পাতার বইগুলো হালকা চালে পড়ে ফেলা যায়। কালকে একটা পেপার জমা, সেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাই বইটা আরেকবার পড়ে ফেললাম।
জাদুকর গজানন একটি মিথ, আবার সত্য ভাবলে সত্য। কথিত আছে, রাজা মঙ্গলের হাতে প্রাণ গিয়েছিলো গজাননের। আবার এও শোনা যায়, মরবার পর গজানন হত্যা করেছিলো রাজা মঙ্গলকে। সেই গজানন তার নস্যির কৌটার খোঁজে এখনও এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। আর রাজা মঙ্গলও প্রতিশোধ নেবার জন্য খুঁজে বেড়ায় গজাননকে।
গজাননের কৌটো নিসন্দেহে শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের গল্পগুলোর মধ্যে বেশ মজাদার একটি গল্প। শিশুদের জন্য বেশ ভালো একটি গল্পের বই। গল্পটি খুব ভালো ভাবে ওদেরকে Communicate করবে বলেই ধারণা। শুরুটা কেমন একটা শুকনো শুকনো মনে হলেও আস্তে আস্তে গল্পের ভাবটি জমে উঠে।
গল্পের প্রধান চরিত্র 'ভূত' নাকি 'ভূত নয়' সেটা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরী হতে পারে। সেটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে গল্পের ঘটনার সময়কালকে Magic Realism-এর দৃষ্টি দিয়ে দেখলে খুব একটা দ্বন্দ্বে পড়তে হবেনা। তবে ভূত না হলেও গজাননের শারিরীক গঠন বৈশিষ্ট্যে নানারকম ভুতুড়ে কাণ্ড প্রত্যক্ষিত হয়।
এখানেও দেখা যায়, ঘটনার ঐতিহাসিকতা বিচার করলে গজাননের বয়স দাঁড়ায় প্রায় ২৫০ বছরেরও অধিক কাল। গল্পের শেষে তাঁর সংলাপ পড়া থেকেই একটি স্তোত্র ভীষণভাবে মনের কোণায় উঁকি দিচ্ছিল - সৃষ্টি স্থিতি বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম...ধর্ম সংস্থাপনার্থায়...সম্ভভামি যুগে যুগে..
[জানিনা সংস্কৃত উচ্চারণটা বাংলায় ঠিকভাবে লিখা হলো কিনা। ভুল লিখলে নিশ্চয়ই ক্ষমা করবেন]
অনেক দিন পর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কোন বই পড়লাম, তাও আবার অদ্ভুতুরে সিরিজের। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আমার অন্যতম প্রিয় একজন লেখক। ওনার সব ধরনের লেখাই আমার ভীষন পছন্দের। শিশু কিশোরদের জন্য ওনার লেখা এই অদ্ভুতুরে সিরিজের বইগুলো বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম সেরা সংযোজন। ৮ থেকে ৮০ সবারই এই অদ্ভুতুরের বই গুলো ভালো লাগবে। বিচিত্র নানা রকম সব চরিত্র নিয়ে একেকটা কাহিনী আর প্লটও চমকপ্রদ। "গজাননের কৌটো " ও তার ব্যাতিক্রম নয়।
কিংবদন্তী অনুসারে, দুশো বছর আগে পরাক্রমশালী রাজা মঙ্গলের রাজত্বের নাম ছিলো ধর্মনগর। সেই রাজা ছিলেন অসম্ভব অত্যাচারী। মল্লযুদ্ধের নাম করে অন্যায় ভাবে প্রজাদেরকে মেরে ফেলত। কিন্তু একদিন আসে যেদিন জাদুকর গজানন রাজা মঙ্গলকে তার প্রাপ্য সাজা দেয়। হঠাৎ দুশো বছর পর আবার সেই কিংবদন্তী জেগে ওঠে, রাজা মঙ্গলের মত আরেকজন পালোয়ান মত লোক ধর্মনগরে আসে জাদুকর গজাননের খোঁজে। রায় বাড়িতে হামলা চালায় গজাননের একটা কৌটোর জন্য। আবার অনেকেই নাকি গজাননকেও ঘুরে বেড়াতে দেখেছে,সে নাকি বাতাসে ভেসে বেড়ায় আর সদাশিব রায় নামে কাউকে খোঁজে। আসলে গজানন কে? রক্ত মাংসের মানুষ নাকি ভুত? নাকি দুশো বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কোন মিথ? আর সে সদাশিবকেই বা খুঁজছে কেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে হলে পড়তে হবে এই চমৎকার বইটি।
বিচিত্র চরিত্রের আনাগোনার জন্য অদ্ভুতুরে সব সময়ই সেরা। " গজাননের কৌটোর" ক্ষেত্রেও একই কথা বলবো। এক বৈঠকে পড়ে ওঠার মত বই।
অত্যন্ত মজাদার শুরু, শেষটাও বেশ ভালো লেগেছে। ওভারঅল দেখতে গেলে অদ্ভুতুড়ে সিরিজের টপ টেনের মধ্যে এই বইটা থাকবে। গজানন জাদুকরের হারিয়ে যাওয়া কৌটো নিয়েই এই গল্পের যাবতীয় ঘটনা। পড়লে সময় পেরিয়ে যাবে কখন বোঝাই মুশকিল।
53% অদ্ভুতুড়ে সিরিজের এই বইটা বেশি মনোমুগ্ধকর হলো না। ভিলেন মান্ডুক, আবু ও পুতুলের মতো কচিকাঁচারা, রায় বাড়ির কর্তা ও তাঁর চার পুরুষের জ্যান্ত সংসার, পাড়ার উকিল মায় গজানন পর্যন্ত কারো চরিত্র পাঠকের কাছে ধরা পড়লো না। কেবল এইটুকু জানা গেল, গজানন বাতাসে ভেসে থাকে, বয়েস তার দুশোর বেশি, আর সে একটি নস্যির ডিবে খুঁজছে। এই সিরিজের অন্যান্য উপন্যাসের তুলনায় এই কাহিনীটি একটু ভাসা ভাসা মতো উবে গেল। যদিও লেখনীর রস অব্যাহত। বইয়ের কলেবর বড়ো নয়, তাই একঘেয়েও লাগার কথা নয়। মোদ্দা কথা - খারাপ নয়। এবার আরেকটি অদ্ভুতুড়ে শুরু করতে হবে।।