শৈশব আমাদের জীবনে ফেলা আসা দিনগুলোর মতো একটা আবছায়া অনুভূতি। বড় হতে হতে যা ফিকে হতে থাকে। অনেকেই হয়তো বলে, আমি আমার শৈশবকে খুব ভালোবাসি। মিস করি। কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। শৈশব আসলে হারিয়ে যায় নিজের বড় হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই। আপনার বার্ধক্যে যখন আপনাকে প্রশ্ন করা হয়, আপনার জীবনে সবচেয়ে বেশি আনন্দদায়ক ঘটনা কী? আপনি তখন শৈশব মনে করতে পারবেন না। আপনার চাকরি জীবনে উন্নতি, কিংবা বৈবাহিক জীবনে প্রিয়জনকে কাছে পাওয়া, অথবা প্রথম সন্তান জন্মদানের মুহূর্ত আপনার মনে পড়বে। অথচ শৈশবে ছোট ছোট যে বিষয় আপনাকে আনন্দ দিত, মুগ্ধ করত; তার কথা কি আপনার মনে পড়ে? তবুও আপনার শৈশব নিয়ে আপনি গর্ব করেন, যদিও এই শৈশব অনেক আগে ফেলে এসেছেন। স্মৃতিতে মাঝে মাঝে ভেসে উঠলেও থাকে অনুভব করেন কি না, এই প্রশ্ন করাই যায়!
একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বকে আমরা ভেঙেচুরে জানতে পছন্দ করে। তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই। কেমন ছিল তাদের দিন? কীভাবে কাটাতো সময়? হুমায়ূন আহমেদের তার সেই দিনগুলোর একটা খণ্ডচিত্র তুলে এনেছেন “কিছু শৈশব” বইটিতে। এখানে তার সিলেট জীবনের মীরাবাজারে থাকার টুকরো টুকরো দিনগুলো উঠে এসেছে।
এই যেমন, খুব দুরন্ত থাকা হুমায়ূন আহমেদকে নানান কারণে শাস্তি দেওয়া হতো। সে শাস্তি হতো ক্ষণস্থায়ী। মায়ের রাগ আর ক্ষোভকে হেসে উড়িয়ে দিতেন বাবা। কখনও কাপ পিরিচ ভাঙা, বা অসময়ে বৃষ্টিতে ভেজার মতো উপলক্ষ্য নিয়ে আসত শাস্তি দেওয়ার।
সময়ের ব্যবধানে মানুষের বয়স যেমন বাড়তে থাকে, তেমন করে সমাজ, পরিবেশ, প্রকৃতিতে এক আমূল পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের ঢাকার সাথে আজকের ঢাকার কি মিল আছে? সিলেট কি একইরকম থাকবে? না! তা থাকার কারণ নেই। আপনার শৈশব যে বাড়িতে কেটেছে, সেই বাড়িতে আপনি যদি পঞ্চাশ বছর পর প্রবেশ করেন, চিনতে পারবেন। কতকিছু বদলে যায় সময়ের সাথে সাথে। কিন্তু যে বাড়িতে শৈশবে হুমায়ূন আহমেদের মতো মানুষ ছিলেন, বৃদ্ধ হয়ে ওঠা হুমায়ূন আহমেদের সেই বাড়িটাকে যিনি একইরকম রেখেছেন, আগলে রেখেছেন; তাকে কোন বিশেষণে বিশেষায়িত করা যায় জানি না। হুমায়ূন আহমেদ গল্পকথক ছিলেন। গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি পাঠকদের মন জয় করেছেন। তিনি কতটা বাস্তব গল্প বলেছেন, কতটা কাল্পনিক ঘটনা মিশিয়েছেন; তিনিই বলতে পারবেন। আমরা ধরে নিই এই গল্পগুলো সত্যি। এই আবেগগুলো বাস্তব।
টুকরো টুকরো কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের পরিবার এখানে উন্মুক্ত হয়। একজন কিশোরী স্বামীর সংসারে এসে কি পরিমাণ লড়াই করে তার দৃষ্টান্ত হুমায়ূন আহমেদের মা। হুমায়ূন আহমেদের বাবা কিছুটা বেখেয়ালি ছিলেন। তিনি তার শখ পূরণ করতে এমন অনেক কিছুই কিনে আনতেন, যার অনেকটাই হয়তো তাদের সাংসারিক জীবনে প্রয়োজন নেয়। তবুও এর সাথে লড়াই করে মা যেভাবে সংসারী হাল ধরেছেন, তা অনন্য।
বাবা সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদ একটি কথা বলছেন। তিনি বলেন, বাবার কাছ থেকে তিনি একটা গুন পেয়েছেন — মুগ্ধ হবার ক্ষমতা। তার বাবা অল্প কিছুতেই মুগ্ধ হতেন। হুমায়ূন আহমেদও তাই। আমার মনে হয় সেই মুগ্ধ হবার ক্ষমতা ছিল বলেই ছোট ছোট বিষয়ে দারুণভাবে বিশ্লেষণ করতে পারতেন। জোছনা, বৃষ্টি, প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা তিনি যেমন উপলব্ধি করতেন, পাঠকের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতেন। এই মুগ্ধতাগুলো বইয়ের প্রতিটি অংশে অনুধাবন করা যেত।
এই বইতে আপনারা পাবেন হুমায়ূন আহমেদের বন্ধুদের কথা। তাদের সাথে খেলাধুলা কিংবা শৈশবে কাটানো মুহূর্তগুলো মুহূর্তেই আমাদের শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদ অকপটে সব স্বীকার করেছেন। আমাদের বর্তমান সময়ের প্রজন্মের শৈশব প্রযুক্তি, স্পার্টফোন, কম্পিউটারে সীমাবদ্ধ। তারা মুক্ত আকাশের নিচে খেলাধুলা করেনি। ছুটে বেড়ায়নি বন্ধুদের সাথে। গ্রামে এখনো এমন শৈশবের ছোঁয়া পাওয়া গেলেও শহর যেন নিষ্প্রাণ। আজকালকার সমাজ যে ভালো না। বদ্ধ, চারদেয়ালের মাঝে খোলা আকাশ কোথায় পাওয়া যাবে? সেই সাথে শৈশবের মুগ্ধতা, যা দেখা বা শোনা তা-ই বিশ্বাস করা এই নিজেকে খুব সাধারণ বিষয় উপস্থাপন করা ছিল এই বইয়ের দারুণ কিছু দিক।
এখানে নিজের বাবা, মা, দাদা, দাদি, নানাকেও খুব সাধারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। দাদিকে সেই ছোট্ট বয়সে বিষাদ সিন্ধু পড়ে শোনানোর আবেগ যেন নিখাঁদ বাস্তব। নানাভাই বাড়িতে এলেই আনন্দের ধুম পড়ে যেত। এ যেন ঈদের আগেই আরেকটা ঈদ। নানার সাথে ভাইবোনদের সখ্যতা, ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ সবকিছুকে হার মানায়। কিন্তু দাদা এলেই ভিন্ন চিত্র। সব গম্ভীর, নীতিকথা শিশুদের আর কত ভালো লাগে? তবুও বিদায়ের দিনে মন খারাপ লাগে। দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে।
এখানে লেখক তার মামা, চাচা, ভাইবোনদের কোথাও তুলে এনেছেন। শৈশবের দিনগুলো বেশ ভালোভাবেই স্থান পেয়েছে। লেখকদের ক্ষেত্রে একটা বিষয় বেশ উল্লেখযোগ্য। তাঁরা নিজেদের বিশেষ মুহূর্তগুলোকে গল্পে স্থান দিয়ে পারেন। যে ঘটনা মনের মধ্যে দাগ কেটে যায়, তা দিয়েই কোনো না কোনো গল্প লিখে স্মৃতির পাতায় জমা রাখতে পারেন।
হুমায়ূন আহমেদকে অনেকে নাস্তিক বলেন। হয়তো তিনি তা-ই। ধর্মকর্মে মন ছিল না সম্ভবত। কিন্তু প্রগতিশীল নাস্তিকদের মতো তিনি ধর্মের অবমাননা কোনোদিন করেননি। বরং তিনি যেভাবে ধর্মকে উপস্থাপন করেছেন, তাতে বোঝা যায় ধর্মীয় জ্ঞান তার বেশ প্রবল। এখানেও বেশ কিছু জায়গায় তিনি ধর্মকে টেনে এনেছেন। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছেন, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। আর যিনি এভাবে বলতে পারেন, তিনি কখনও কোনো ধর্মকে অসম্মান করতে পারেন না।
হুমায়ূন আহমেদের লেখায় একটা বিষয় আপনি নিয়মিত পাবেন। তা হলো হিউমার। তাঁর লেখার সাথে সাথে হিউমার যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানে মামার বিয়ের কাহিনির সাথে শ্রাবণ মেঘের দিন সিনেমার বিখ্যাত সেই গানের ইতিবৃত্ত জড়িয়ে থাকা, কিংবা বন্ধু টগরের গু বিষয়ক তথ্য, অথবা মাজারের সবচেয়ে বড় পাতিল নিয়ে তার ভাবনা — এই ভাবনাতেই একজন শিশুর শৈশব আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তখন যা-ই তাকেই পৃথিবীর প্রথম, বড়, সেরা বলে মনে হয়।
হুমায়ূন আহমেদের মায়ের সাথে ঘটা একটি ঘটনা আমার ভালো লেগেছে। হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের সংসারে অনেক টানাপোড়েন ছিল। আর্থিক দিক দিয়ে অনেক কষ্টেই দিন কেটেছে। তারপরও বাবা একদিন মায়ের জন্য একটা ঘড়ি কিনে আনেন। দামী সেই ঘড়ি। কিন্তু ছোট্ট হুমায়ূন অনেক কৌতূহলী। খুঁজে বের করে সেই ঘড়িতে এমন কারিগরি ফলিয়েছেন, এরপর ঘড়ি আর ঠিকঠাক চলে না। তখন হুমায়ূন ছোট। তার সামর্থ্য ছিল না। যখন সামর্থ্য হলো ঠিক একই ধরনের ঘড়ি মায়ের জন্য কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন।
যদিও তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ নিয়ে মায়ের সাথে মনোমালিন্য চলমান। নিজের আক্ষেপ এখানে লেখক অকপটে বর্ণনা করেছেন। কোনো এক যুক্ত দিয়ে মায়ের সাথে জিতে এসেছিলেন। কী সেই যুক্তি, তা জানার বড্ড আগ্রহ ছিল। কিন্তু লেখক লিখেননি। হয়তো পারিবারিক কিছু বিষয় উন্মুক্ত করতে চাননি বলেই হয়তো।
শৈশব থেকে বার্ধক্য, অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। নির্ভার জীবন থেকে দায়িত্বজ্ঞানের জন্ম হয়। কাঁধে চেপে বসে দায়িত্বের বোঝা। তবুও কখনও ইচ্ছে করে শৈশবে ফিরে যেতে। কিন্তু সময়ের পরিভ্রমণ যেখানে সম্ভব না, সেখানে পিছনে ফিরে যাওয়ার উপায় থাকে না। তাই মাঝে মাঝে এভাবে স্মৃতিচারণ করতে হয়। লেখকদের জন্য যা সহজ। আর আমাদের মনের মধ্যেই শৈশব বড্ড অসময়ে উঁকি দেয়।
▪️বই : কিছু শৈশব
▪️লেখক : হুমায়ূন আহমেদ
▪️প্রকাশনী : অন্যপ্রকাশ
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪/৫