ফ্ল্যাপে লেখা কিছু কথাঃ ছয়-সাত বছরের একটি বালক জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে বৃষ্টি দেখছে। সিলেটের বিখ্যাত বৃষ্টি। ফিনফিনে ইলসেগুঁড়ি না, ঝুম বৃষ্টি। এই বৃষ্টি এক নাগাড়ে সাতদিন পর্যন্ত চলতে পারে। ছেলেটি বৃষ্টি দেখছে তবে তার দৃষ্টিতে মুগ্ধতা নেই, বিস্ময়বোধ নেই, আছে দুঃখবোধ এবং হতাশা। তাকে সারাদিনের জন্যে আটকে রাখা হয়েছে। আজ সে ঘর থেকে বের হতে পারবে না। সে একটি গুরুতর অপরাধ করেছে।...... উপন্যাস লিখছি না। নিজের শৈশবের কথাই লিখছি। পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা। সবকিছু হুবহু মনে নেই। যে সব জায়গা মনে নেই সেসব জায়গায় Fill up the blank করেছি। লেখকের স্বাধীনতাও ব্যবহার করেছি, তবে যেটুকু না করলেই নয় শুধু ততটুকুই। -হুমায়ূন আহমেদ
ভূমিকাঃ মানুষ যখন মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকে তখন সে ব্যাকুল হয়ে পেছনে তাকায়। আমার মনে হয় তাই হয়েছে। সারাক্ষণই শৈশবের কথা মনে পড়ে। কী অপূর্ব সময়ই না কাটিয়েছি! শৈশবের খণ্ডচিত্র প্রথমে ছাপা হয়েছিল সিলেট বাজার পত্রিকায়। গ্রন্থকারে প্রকাশের সময় কিছু কাটাকুটি খেলা খেলেছি। -হুমায়ূন আহমেদ
Humayun Ahmed (Bengali: হুমায়ূন আহমেদ; 13 November 1948 – 19 July 2012) was a Bangladeshi author, dramatist, screenwriter, playwright and filmmaker. He was the most famous and popular author, dramatist and filmmaker ever to grace the cultural world of Bangladesh since its independence in 1971. Dawn referred to him as the cultural legend of Bangladesh. Humayun started his journey to reach fame with the publication of his novel Nondito Noroke (In Blissful Hell) in 1972, which remains one of his most famous works. He wrote over 250 fiction and non-fiction books, all of which were bestsellers in Bangladesh, most of them were number one bestsellers of their respective years by a wide margin. In recognition to the works of Humayun, Times of India wrote, "Humayun was a custodian of the Bangladeshi literary culture whose contribution single-handedly shifted the capital of Bengali literature from Kolkata to Dhaka without any war or revolution." Ahmed's writing style was characterized as "Magic Realism." Sunil Gangopadhyay described him as the most popular writer in the Bengali language for a century and according to him, Ahmed was even more popular than Sarat Chandra Chattopadhyay. Ahmed's books have been the top sellers at the Ekushey Book Fair during every years of the 1990s and 2000s.
Early life: Humayun Ahmed was born in Mohongonj, Netrokona, but his village home is Kutubpur, Mymensingh, Bangladesh (then East Pakistan). His father, Faizur Rahman Ahmed, a police officer and writer, was killed by Pakistani military during the liberation war of Bangladesh in 1971, and his mother is Ayesha Foyez. Humayun's younger brother, Muhammed Zafar Iqbal, a university professor, is also a very popular author of mostly science fiction genre and Children's Literature. Another brother, Ahsan Habib, the editor of Unmad, a cartoon magazine, and one of the most famous Cartoonist in the country.
Education and Early Career: Ahmed went to schools in Sylhet, Comilla, Chittagong, Dinajpur and Bogra as his father lived in different places upon official assignment. Ahmed passed SSC exam from Bogra Zilla School in 1965. He stood second in the merit list in Rajshahi Education Board. He passed HSC exam from Dhaka College in 1967. He studied Chemistry in Dhaka University and earned BSc (Honors) and MSc with First Class distinction.
Upon graduation Ahmed joined Bangladesh Agricultural University as a lecturer. After six months he joined Dhaka University as a faculty of the Department of Chemistry. Later he attended North Dakota State University for his PhD studies. He grew his interest in Polymer Chemistry and earned his PhD in that subject. He returned to Bangladesh and resumed his teaching career in Dhaka University. In mid 1990s he left the faculty job to devote all his time to writing, playwright and film production.
Marriages and Personal Life: In 1973, Humayun Ahmed married Gultekin. They had three daughters — Nova, Sheela, Bipasha and one son — Nuhash. In 2003 Humayun divorced Gultekin and married Meher Afroj Shaon in 2005. From the second marriage he had two sons — Nishad and Ninit.
Death: In 2011 Ahmed had been diagnosed with colorectal cancer. He died on 19 July 2012 at 11.20 PM BST at Bellevue Hospital in New York City. He was buried in Nuhash Palli, his farm house.
দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি। কান্নাহাসির বাঁধন তারা সইল না সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।
আমার প্রাণের গানের ভাষা শিখবে তারা ছিল আশা উড়ে গেল, সকল কথা কইল না সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।
নানা রঙের সেই দিন গুলি লেখক দুই মলাটের খাঁচায় বন্দি করেছেন তার সুনিপুণ লেখনশৈলী দিয়ে। আত্মজৈবনিক গ্রন্থগুলো সাধারণ ভারিক্কি ধরণের হয়ে থাকে। কিন্তু লেখকের সুগভীর মননশীলতা আর গল্প বলার ঢংএ "কিছু শৈশব" হয়ে উঠেছে হাস্যরসাত্মক এক আনন্দময় রচনা। যা আপনাকে উদ্বেলিত করবে, উদ্ভাসিত করবে আনন্দের জোয়ারে। লেখকের টুকরো টুকরো রঙিন শৈশব-স্মৃতির বর্ণনা আপনাকেও প্রজাপতির ডানায় করে নিয়ে যাবে নিজের রঙিন শৈশবে।
যাইহোক, লেখক তার বইয়ের ভূমিকাতে লিখেছেন " মানুষ যখন মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকে তখন সে ব্যাকুল হয়ে পেছনে তাকায়। আমার মনে হয় তাই হয়েছে। সারাক্ষণই শৈশবের কথা মনে পড়ে। কী অপূর্ব সময়ই না কাটিয়েছি। " নিঃসন্দেহে লেখকের শৈশব ছিল বর্ণীল। আর সেই বর্ণীল শৈশবের কিছু খণ্ড চিত্র এই বইয়ে তুলে ধরেছেন তিনি। ছোট ছোট শিরোনামের গভীর আবেগ আর মায়ায় গেঁথে গিয়েছেন "কিছু শৈশব"। এতে স্থান পেয়েছে লেখকের ছেলেবেলার দুরন্তপনা। দুরন্তপনা করার জন্য প্রচলিত শাস্তির ব্যবস্থাও, পারিবারিক আবহ, বই পড়া, গান শোনা কবিতা আবৃতি ও নাটক মঞ্চায়ন করার মত ঘটনাও। শুধু কি তাই? শৈশবের পাশাপাশি রয়েছে বড় এবং বুড়োবেলার কিছু খণ্ড চিত্র।
স্মৃতিচারণমূলক এই বইয়ে লেখক তার পিএইচডির ফলাফল প্রদানকালীন সময়ের ভয়াবহতম দুঃসময়ের কিছু স্মৃতিও উল্লেখ করেছেন। রয়েছে বড়মামার স্মৃতিময় গল্প। লেখকের এই বড় মামার গল্প আমরা তাঁর বিভিন্ন লেখায় পড়েছি তো বটেই; এই বইয়েও রয়েছে ছোটছোট দুই খণ্ড স্মৃতিকথন। লেখকের শৈশবের অনেকগুলো দিন কেটেছে সিলেটের মিরাবাজারে। লেখাতে সেই বর্ণনাও ফুটে উঠেছে প্রাণবন্ত হয়ে। রয়েছে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দময় বর্ণনা। অনেক ভাইবোন মিলে কোলাহলময় পরিবেশে বেড়ে উঠা আনন্দময় শৈশব পেড়িয়ে তাই তো দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পরে লিখেছেন "কিছু শৈশব"।
আর হ্যাঁ। অন্যপ্রকাশের বইয়ের বাইন্ডিং নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই । এক কথায় অসাধারণ । প্রচ্ছদও ছিল রীতিমতো নজরকাড়া।
তিন অক্ষরের ছোট্ট একটা শব্দ,যে শব্দ আমাদের সাথে জড়িয়ে থাকে আমৃত্যু,স্মৃতির চোরাগলি থেকে হঠাৎ হাতড়ে হাতড়ে যদি কখনো আমরা খুঁজতে যাই দেখা যাবে সেই ছোটবেলার ভালো হোক বা মন্দ ঠিক কোনো না কোনো ঘটনা মনের মধ্যে আলোড়িত করে।
শৈশব স্মৃতির ঝাঁপি তে আমাদের নেহাতই কম কিছু নেই কিন্তু আমার মন খারাপের জায়গা অন্য কোথাও, আমরা হুমায়ূন আহমেদের মতো শব্দ জাদুকর নই,কথার পিঠে কথা বসিয়ে সেই মুক্তোর মালা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মত আচ্ছন্ন করে রাখার মতো শব্দ শক্তি সময় কিছুই নেই। স্রষ্টা অকৃত্রিম আর অকৃপণভাবে সেই ডালা লেখকের হাতে তুলে দিয়েছেন,কোনো ঝাপসা হয়ে আসা ঘটনার উপর কল্পনার প্রলেপ লাগিয়ে মনোহর করার নৈপুণ্য কি সবার থাকে!
আমাদের তাও তো শৈশব বলে কিছু ছিল,এখানকার এই ইট পাথরের দালানকোঠায় শৈশব আটকে গেছে কোচিং টিচিং আর গেমিং এর মধ্যে।শিশিরভেজা সকালের সৌন্দর্য,খা খা দুপুরে লুকিয়ে চুরিয়ে খেলতে যাওয়া,বাদলা দিনে সদলবলে বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে মায়ের বকুনী খাওয়ার এইসব গল্প তাদের কাছে রূপকথার চেয়ে কম নয় কিংবা আসলেই তা শুধুমাত্র গালগল্প ।
ভাগি্যস হুমায়ূন আহমেদ খেয়ালেই হোক বা শৈশব স্মৃতির টানে এসব অমূল্য রতন বইয়ের কালিতে খচিত করে রেখে গেছেন,কলমের জাদুতে নিয়ে গেছেন সিলেটের মীরাবাজারে সৌখিন খেয়ালী উদার ফয়জুর রহমান আর সবদিকে দশভুজার মতো আগলে রাখা আয়েশা ফয়েজের নামান্তে ছোট হলেও ভাই দেবর আত্মীয় পরিজন পরিবেষ্টিত সংসারে,যেখানে গরীবের ঘোড়ারোগের মতো ঘোড়া কেনা,কবিতা বাসর, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার সাথে সাথে লঙ্গরখানায় খাওয়া, সাহিত্য সভায় যুক্ত হওয়া,বড় মামার নিত্য নতুন কাজকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়া,ছোট বোন শেফুকে নিয়ে কথকতা এসব কিচ্ছু বাহুল্য মনে হবে না।ভাষার এখানে কোনো গুরুগম্ভীর সমাবেশ নেই,নেই উপমার আনাগোনা তাও পড়ার সময় আর শেষে ভালোলাগায় ,ভালোবাসায় মন ভরিয়ে দেওয়ার সেই চিরায়ত রীতি
একজীবনে হুমায়ূন কে নিয়ে কাঁদা ছোড়াছুড়ি করার , বিতর্কিত করে তোলার মালমশলা যেমন লোকের হাতে সদা বারুদের মত মজুদ থাকে ঠিক তার সমান্তরালে সাধারণ পাঠকের মনে তার লেখার জন্য আকুন্ঠ ভালোবাসা আর মায়া
অন্যের লেখা নকল করলে এক কথা, নিজের লেখা নিজে নকল করলে কেমন যেন হয়ে যায় না ব্যাপারটা? লেখক নিজের লেখা "আমার ছেলেবেলা" বই থেকে নকল করে লিখেছেন "কিছু শৈশব।" প্রথমটা পড়ার পর দ্বিতীয়টা না পড়লেও চলে।
হুমায়ূন আহমেদের ছোটবেলার স্মৃতি রোমন্থন। যে ছোটবেলাটা সিলেটে কেটেছে সেই ছোটবেলা। একজন ছোট বাচ্চা হিসেবে, একজন বন্ধু হিসেবে, একজন বড় ভাই হিসেবে কিভাবে উনি উনার ছোটবেলাকে দেখতে পান এই বইটি পড়ে বুঝা যাবে এবং আমার মনে হয়েছে এটি একটি চমৎকার বই। আর এই চমৎকার বইয়ের উল্লেখযোগ্য এবং আহামরি ভালোলাগা চরিত্র ফজলুল করিম সাহেব। মাঝে মাঝে যখন সবকিছু ভারী ভারী মনে হয় তখন হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়া শুরু করি এবং বেশিরভাগ সময় নিরাশ হই না। এবারও নিরাশ হই নি।
মিষ্টি। কিছু অধ্যায় খুব ভালো লেগেছে। কিশোর সমগ্র বইয়ে মামার গল্পটা পড়েছিলাম, এখানে রিপিট হয়েছে তাই আবারও পড়া হলো। ভালোই লাগলো। লেখকের নির্লিপ্ততা প্রশংসনীয়। নিজের গল্প এতটা নির্লিপ্তভাবে সবাই বলতে পারে না।
বইঃ কিছু শৈশব লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ ধরনঃ আত্মজীবনী প্রকাশিতঃ ২০০৭ পৃষ্ঠাঃ ৯৫ রেটিংঃ ৫🌟/৫🌟
🍀কাহিনী সংক্ষেপঃ
বইটিতে হুমা���়ূন আহমেদ তাঁর ছোটবেলার বিভিন্ন ঘটনা , খেলার সাথী, পরিবার, তাঁর শৈশব যে সকল জায়গায় কেটেছে(মূলত সিলেটের মীরাবাজার ) সেসকল জায়গার বর্ণনা তুলে ধরেছেন |
🍀পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ
উপন্যাসটি ১৬ অংশে বিভক্ত আর পৃষ্ঠা ও বেশী নয় | তাই খুব তাড়াতাড়ি পড়া শেষ হয়ে যাবে | চমৎকার একটি বই | বইটি পড়ে লেখকের ব্যাপারে অনেক অজানা তথ্য জানতে পাড়বেন |
হূমায়ুন আহমেদ তাঁর আত্মজীবনীমূলক বইগুলো এত সুন্দর করে লিখেন যে পড়তে অনেক ভালো লাগে | আশা করি , আপনাদেরও অনেক ভালো লাগবে |
This entire review has been hidden because of spoilers.
শৈশব আমাদের জীবনে ফেলা আসা দিনগুলোর মতো একটা আবছায়া অনুভূতি। বড় হতে হতে যা ফিকে হতে থাকে। অনেকেই হয়তো বলে, আমি আমার শৈশবকে খুব ভালোবাসি। মিস করি। কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। শৈশব আসলে হারিয়ে যায় নিজের বড় হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই। আপনার বার্ধক্যে যখন আপনাকে প্রশ্ন করা হয়, আপনার জীবনে সবচেয়ে বেশি আনন্দদায়ক ঘটনা কী? আপনি তখন শৈশব মনে করতে পারবেন না। আপনার চাকরি জীবনে উন্নতি, কিংবা বৈবাহিক জীবনে প্রিয়জনকে কাছে পাওয়া, অথবা প্রথম সন্তান জন্মদানের মুহূর্ত আপনার মনে পড়বে। অথচ শৈশবে ছোট ছোট যে বিষয় আপনাকে আনন্দ দিত, মুগ্ধ করত; তার কথা কি আপনার মনে পড়ে? তবুও আপনার শৈশব নিয়ে আপনি গর্ব করেন, যদিও এই শৈশব অনেক আগে ফেলে এসেছেন। স্মৃতিতে মাঝে মাঝে ভেসে উঠলেও থাকে অনুভব করেন কি না, এই প্রশ্ন করাই যায়!
একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বকে আমরা ভেঙেচুরে জানতে পছন্দ করে। তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই। কেমন ছিল তাদের দিন? কীভাবে কাটাতো সময়? হুমায়ূন আহমেদের তার সেই দিনগুলোর একটা খণ্ডচিত্র তুলে এনেছেন “কিছু শৈশব” বইটিতে। এখানে তার সিলেট জীবনের মীরাবাজারে থাকার টুকরো টুকরো দিনগুলো উঠে এসেছে।
এই যেমন, খুব দুরন্ত থাকা হুমায়ূন আহমেদকে নানান কারণে শাস্তি দেওয়া হতো। সে শাস্তি হতো ক্ষণস্থায়ী। মায়ের রাগ আর ক্ষোভকে হেসে উড়িয়ে দিতেন বাবা। কখনও কাপ পিরিচ ভাঙা, বা অসময়ে বৃষ্টিতে ভেজার মতো উপলক্ষ্য নিয়ে আসত শাস্তি দেওয়ার।
সময়ের ব্যবধানে মানুষের বয়স যেমন বাড়তে থাকে, তেমন করে সমাজ, পরিবেশ, প্রকৃতিতে এক আমূল পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের ঢাকার সাথে আজকের ঢাকার কি মিল আছে? সিলেট কি একইরকম থাকবে? না! তা থাকার কারণ নেই। আপনার শৈশব যে বাড়িতে কেটেছে, সেই বাড়িতে আপনি যদি পঞ্চাশ বছর পর প্রবেশ করেন, চিনতে পারবেন। কতকিছু বদলে যায় সময়ের সাথে সাথে। কিন্তু যে বাড়িতে শৈশবে হুমায়ূন আহমেদের মতো মানুষ ছিলেন, বৃদ্ধ হয়ে ওঠা হুমায়ূন আহমেদের সেই বাড়িটাকে যিনি একইরকম রেখেছেন, আগলে রেখেছেন; তাকে কোন বিশেষণে বিশেষায়িত করা যায় জানি না। হুমায়ূন আহমেদ গল্পকথক ছিলেন। গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি পাঠকদের মন জয় করেছেন। তিনি কতটা বাস্তব গল্প বলেছেন, কতটা কাল্পনিক ঘটনা মিশিয়েছেন; তিনিই বলতে পারবেন। আমরা ধরে নিই এই গল্পগুলো সত্যি। এই আবেগগুলো বাস্তব।
টুকরো টুকরো কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের পরিবার এখানে উন্মুক্ত হয়। একজন কিশোরী স্বামীর সংসারে এসে কি পরিমাণ লড়াই করে তার দৃষ্টান্ত হুমায়ূন আহমেদের মা। হুমায়ূন আহমেদের বাবা কিছুটা বেখেয়ালি ছিলেন। তিনি তার শখ পূরণ করতে এমন অনেক কিছুই কিনে আনতেন, যার অনেকটাই হয়তো তাদের সাংসারিক জীবনে প্রয়োজন নেয়। তবুও এর সাথে লড়াই করে মা যেভাবে সংসারী হাল ধরেছেন, তা অনন্য।
বাবা সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদ একটি কথা বলছেন। তিনি বলেন, বাবার কাছ থেকে তিনি একটা গুন পেয়েছেন — মুগ্ধ হবার ক্ষমতা। তার বাবা অল্প কিছুতেই মুগ্ধ হতেন। হুমায়ূন আহমেদও তাই। আমার মনে হয় সেই মুগ্ধ হবার ক্ষমতা ছিল বলেই ছোট ছোট বিষয়ে দারুণভাবে বিশ্লেষণ করতে পারতেন। জোছনা, বৃষ্টি, প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা তিনি যেমন উপলব্ধি করতেন, পাঠকের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতেন। এই মুগ্ধতাগুলো বইয়ের প্রতিটি অংশে অনুধাবন করা যেত।
এই বইতে আপনারা পাবেন হুমায়ূন আহমেদের বন্ধুদের কথা। তাদের সাথে খেলাধুলা কিংবা শৈশবে কাটানো মুহূর্তগুলো মুহূর্তেই আমাদের শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদ অকপটে সব স্বীকার করেছেন। আমাদের বর্তমান সময়ের প্রজন্মের শৈশব প্রযুক্তি, স্পার্টফোন, কম্পিউটারে সীমাবদ্ধ। তারা মুক্ত আকাশের নিচে খেলাধুলা করেনি। ছুটে বেড়ায়নি বন্ধুদের সাথে। গ্রামে এখনো এমন শৈশবের ছোঁয়া পাওয়া গেলেও শহর যেন নিষ্প্রাণ। আজকালকার সমাজ যে ভালো না। বদ্ধ, চারদেয়ালের মাঝে খোলা আকাশ কোথায় পাওয়া যাবে? সেই সাথে শৈশবের মুগ্ধতা, যা দেখা বা শোনা তা-ই বিশ্বাস করা এই নিজেকে খুব সাধারণ বিষয় উপস্থাপন করা ছিল এই বইয়ের দারুণ কিছু দিক।
এখানে নিজের বাবা, মা, দাদা, দাদি, নানাকেও খুব সাধারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। দাদিকে সেই ছোট্ট বয়সে বিষাদ সিন্ধু পড়ে শোনানোর আবেগ যেন নিখাঁদ বাস্তব। নানাভাই বাড়িতে এলেই আনন্দের ধুম পড়ে যেত। এ যেন ঈদের আগেই আরেকটা ঈদ। নানার সাথে ভাইবোনদের সখ্যতা, ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ সবকিছুকে হার মানায়। কিন্তু দাদা এলেই ভিন্ন চিত্র। সব গম্ভীর, নীতিকথা শিশুদের আর কত ভালো লাগে? তবুও বিদায়ের দিনে মন খারাপ লাগে। দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে।
এখানে লেখক তার মামা, চাচা, ভাইবোনদের কোথাও তুলে এনেছেন। শৈশবের দিনগুলো বেশ ভালোভাবেই স্থান পেয়েছে। লেখকদের ক্ষেত্রে একটা বিষয় বেশ উল্লেখযোগ্য। তাঁরা নিজেদের বিশেষ মুহূর্তগুলোকে গল্পে স্থান দিয়ে পারেন। যে ঘটনা মনের মধ্যে দাগ কেটে যায়, তা দিয়েই কোনো না কোনো গল্প লিখে স্মৃতির পাতায় জমা রাখতে পারেন।
হুমায়ূন আহমেদকে অনেকে নাস্তিক বলেন। হয়তো তিনি তা-ই। ধর্মকর্মে মন ছিল না সম্ভবত। কিন্তু প্রগতিশীল নাস্তিকদের মতো তিনি ধর্মের অবমাননা কোনোদিন করেননি। বরং তিনি যেভাবে ধর্মকে উপস্থাপন করেছেন, তাতে বোঝা যায় ধর্মীয় জ্ঞান তার বেশ প্রবল। এখানেও বেশ কিছু জায়গায় তিনি ধর্মকে টেনে এনেছেন। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছেন, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। আর যিনি এভাবে বলতে পারেন, তিনি কখনও কোনো ধর্মকে অসম্মান করতে পারেন না।
হুমায়ূন আহমেদের লেখায় একটা বিষয় আপনি নিয়মিত পাবেন। তা হলো হিউমার। তাঁর লেখার সাথে সাথে হিউমার যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানে মামার বিয়ের কাহিনির সাথে শ্রাবণ মেঘের দিন সিনেমার বিখ্যাত সেই গানের ইতিবৃত্ত জড়িয়ে থাকা, কিংবা বন্ধু টগরের গু বিষয়ক তথ্য, অথবা মাজারের সবচেয়ে বড় পাতিল নিয়ে তার ভাবনা — এই ভাবনাতেই একজন শিশুর শৈশব আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তখন যা-ই তাকেই পৃথিবীর প্রথম, বড়, সেরা বলে মনে হয়।
হুমায়ূন আহমেদের মায়ের সাথে ঘটা একটি ঘটনা আমার ভালো লেগেছে। হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের সংসারে অনেক টানাপোড়েন ছিল। আর্থিক দিক দিয়ে অনেক কষ্টেই দিন কেটেছে। তারপরও বাবা একদিন মায়ের জন্য একটা ঘড়ি কিনে আনেন। দামী সেই ঘড়ি। কিন্তু ছোট্ট হুমায়ূন অনেক কৌতূহলী। খুঁজে বের করে সেই ঘড়িতে এমন কারিগরি ফলিয়েছেন, এরপর ঘড়ি আর ঠিকঠাক চলে না। তখন হুমায়ূন ছোট। তার সামর্থ্য ছিল না। যখন সামর্থ্য হলো ঠিক একই ধরনের ঘড়ি মায়ের জন্য কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন।
যদিও তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ নিয়ে মায়ের সাথে মনোমালিন্য চলমান। নিজের আক্ষেপ এখানে লেখক অকপটে বর্ণনা করেছেন। কোনো এক যুক্ত দিয়ে মায়ের সাথে জিতে এসেছিলেন। কী সেই যুক্তি, তা জানার বড্ড আগ্রহ ছিল। কিন্তু লেখক লিখেননি। হয়তো পারিবারিক কিছু বিষয় উন্মুক্ত করতে চাননি বলেই হয়তো।
শৈশব থেকে বার্ধক্য, অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। নির্ভার জীবন থেকে দায়িত্বজ্ঞানের জন্ম হয়। কাঁধে চেপে বসে দায়িত্বের বোঝা। তবুও কখনও ইচ্ছে করে শৈশবে ফিরে যেতে। কিন্তু সময়ের পরিভ্রমণ যেখানে সম্ভব না, সেখানে পিছনে ফিরে যাওয়ার উপায় থাকে না। তাই মাঝে মাঝে এভাবে স্মৃতিচারণ করতে হয়। লেখকদের জন্য যা সহজ। আর আমাদের মনের মধ্যেই শৈশব বড্ড অসময়ে উঁকি দেয়।
এই বইটা যখন পড়ি, তখন আমি সম্ভবত ক্লাস নাইনে পড়ি। বইয়ের প্রচ্ছদটা এত সুন্দর! আমি এখনও কোথাও বইটা দেখলে একটু সময় নিয়ে প্রচ্ছদটা দেখি। কী যেন একটা মায়া আছে ছবিটাতে! ছবিটা দেখে মনে হতো, "সিলেটের বৃষ্টি কি আসলেই এত সুন্দর?" গত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বলছি, সিলেটের বৃষ্টি আসলেই সবচেয়ে সুন্দর, সবচাইতে সুন্দর! আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয়, সিলেটে মাইগ্রেশনের অ্যাপ্লিকেশন করার পেছনে আমার প্রিয় লেখকের জন্মস্থান হওয়াটাও প্রভাব ফেলেছে! কে জানে! 😅 যাই হোক, বইটা লেখকের ছোটবেলা নিয়ে। কখন কী কারণে কীভাবে শাস্তি পেয়েছেন, তাদের বাসায় যে হেল্পিং হ্যান্ড ছেলেটা ছিলো–তার কথা, লেখকের স্কুলের কথা, টিচারের কথা, বাবা আর মায়ের কথা...এমন অনেক কিছু। পড়তে খুবই ভালো লাগে, মনে হয় চোখের সামনে সবকিছু দেখতে পাচ্ছি। প্রিয় একজন লেখকের লেখক হবার পেছনের ছোট ছোট গল্পগুলো পড়তে অবশ্যই ভালো লাগার কথা। বইটার শেষটা আমার মনে আছে হয়তো কিছুটা। লেখক ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে পড়া আলোর ফুল হাত দিয়ে ধরতে চান, কিন্তু কিছুতেই পারেন না। লেখকের মনে হয়, তার সারাজীবন কেটে যাবে সেই আলোর ফুল ধরতে না পারার কষ্টে। এরপর থেকে কোনো ভেন্টিলেটর দিয়ে এমন সূর্যের আলো পড়লে আমিও মনের অজান্তে আলোর ফুল ধরার চেষ্টা করি। পারি না। এটাকে আমার জীবনের অন্যতম প্রধান আক্ষেপ বলা যায় হয়তো! পছন্দের বই।
পড়া শেষ হলে বইটা নিয়ে একটা বড়সড় রিভিউ দিব। এমনই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু, জীবন বড় যান্ত্রিক এবং ছকে বাঁধা। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হবে। তার আগে এক কাপ চা হাতে নিয়ে এই লেখাটা। যাই হোক, আমার মত নস্টালজিক যারা, তারা এই বই একবার নয় বারবার পড়তে চাইবে। সামনে আবার পড়লে একটা বড়সড় রিভিউ দিবো। কথা দিলাম।
'আমার ছেলেবেলা' ছিলই — সেটাকে পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করা যেতো: ব্যবসায়িক কারণ ছাড়া এই বই কেন লিখলেন তার কারণ খুঁজে পেলাম না। সেখানে যা অল্প করে বলা, এখানে তা অধিক; সেখানে যা অধিক করে বলা, এখানে তা অল্প। এক বই হলো দুই বই।
দীর্ঘদিন বই পড়া হয়না, বই ধরলেই কেমন জানি বিরক্তি লাগে। রিডার্স ব্লককে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে আসলাম এতদিন নাকি সে রিডার্সব্লকেই পেয়ে বসলো জানি না। জুলাইয়ের পর থেকে বই পড়াতে কচ্ছপ গতি এসেছে, আর বেড়েছে 'Currently Reading' এ বইয়ের সংখ্যা। অনেকেই সাজেশন দিলো হুমায়ূন পড়। পাঠক সমাবেশে বন্ধুর দেখাদেখি "এক বসায় পড়া যায়" এমন বই নিয়ে বসবো ইচ্ছে ছিল। হঠাৎ মাথায় খেয়াল চাপলো, হুমায়ূনের জীবনী তো ইচ্ছে করেই এতদিন এড়িয়ে গেলাম সব পড়া শেষ হলে তারপর ধরবো বলে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে 'নানা ঋষির নানা মত' এই সমাজে চাউর আছে। যে জীবনে কোনোদিন হুমায়ূনের কোনো লেখা বই পড়া তো দূরে দুএকটা বইয়ের নামও বলতে পারবে তাকেও রঙবেরঙের তত্ত্ব দিতে শুনি। তাই খেয়াল চাপলো মাথায় একটু চেষ্টা করে দেখি "ছাই(!) উড়াইয়া" দেখি রতন মিলে কিনা। সে যাত্রার প্রথম বই 'কিছু শৈশব'। হুমায়ূনের বাবা ছিলেন পুলিশের ইন্সপেক্টর। চাকরি সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর পোস্টিং ছিল। হুমায়ূনের শৈশব কেটেছে সিলেটের জিন্দাবাজার এলাকায়, তাই বইয়ের পুরোটাই জিন্দাবাজারকে কেন্দ্র করে লেখা শৈশব স্মৃতি।বই পড়তে পড়তে বন্ধুর সাথে শিশুদের মতন হেসে "নাকের পানি চক্ষের পানি" এক করে দিয়েছি। বইয়ের পুরো কাহিনী শিশু হুমায়ূন আর তার ছোট ছোট বন্ধু বান্ধবকে কেন্দ্র করে আগালেও উঠে এসেছে তাঁর মামার কথা, শাওনের কথা, শাওনের গর্ভপাতের কথা এবং দ্বিতীয় বিয়ের পর পারিবারিক বয়কটের কথা। দেখি সামনে আর কি কি পাওয়া যায়!
❝কিছু শৈশব❞ আমার পড়া হুমায়ূন আহমেদের প্রথম বই। প্রথম পড়ার পর আমার রিয়্যাকশন ছিলো - ওনার আরও আরও বই পড়তে হবে আমার। এতোদিনে আমি ওনার অনেক বই-ই পড়েছি। তবে এবার বইটা পড়তে গিয়ে বুঝতে পেরেছি যে বইটাতে ওনার প্রথম আত্মজৈবনিক উপন্যাস "আমার ছেলেবেলা"-র গল্পগুলোই ঘুরে ফিরে এসেছে। লেখক অবশ্য কয়েকবার এটা উল্লেখও করেছেন কয়েক জায়গায়। তবে যে ব্যাপারটা পড়তে গিয়ে বেশ চোখে লেগেছে তা হলো "আমার ছেলেবেলা"য় উল্লেখিত কিছু ঘটনার বর্ণনা এই বইয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপে পেয়েছি। যেমন তার দাদার মৃত্যুর গল্পটা ওটাতে একভাবে লেখা আর এখানে আরেকভাবে। লেখকের কয়েকটা বইয়ে পূর্বেও কিছু তথ্যগত ত্রুটি নজরে পড়েছে। হয়তো লেখক তার লেখায় এসব ছোটখাটো ভুল নিয়ে কখনো মাথা ঘামাননি। পারফেকশনিস্ট হওয়ার ইচ্ছা বা চেষ্টা তার ছিলো না। কিন্তু তাই বলে আত্মজীবনিতেও!! লেখকের স্বাধীনতা ব্যবহার করে গল্প বলতে গিয়ে তিনি কিছু কিছু জায়গায় ঘটনাগুলোকে বাড়তি রঙ চড়িয়ে উপস্থাপন করেছেন।
কিছু শৈশব বইয়ে হুমায়ূন আহমেদ, তার সিলেটে কাটানো শৈশবকে তুলে ধরেছেন। সেখানে বন্ধু বান্ধবের সাথে ছুটাছুটি, নানান নতুন নতুন খেলা আবিস্কার করা, মার্বেল গিলে জাদু দেখানো। ছোটবোন শেফুকে নিয়ে হুমায়ুনের ঘুরাঘুরি। লাইব্রেরি যাওয়ার বিশাল পথ পাড়ি দেওয়ার পথসঙ্গী হত এই শেফু, ইকবালও মাঝে মাঝে যেত।
বইটার একটা অংশ জুড়ে হুমায়ুন তার বড় মামার স্মৃতিচারণ করেছে। তার মামা তাদের কাছে থাকত আর প্রতিবছর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় ফেল করত। তার মামার পুঁথিগতবিদ্যায় বেশি একটা আগ্রহ ছিল না, বেশিরভাগ সময় সাহিত্যচর্চা আর হুমায়ুনসহ তাদের ভাইবোনদের দিয়ে নাটক করিয়ে সময় কাটাতেন। ৩য় বার ইন্টারমিডিয়েট ফেল করার পর তার মামাকে বিয়ে করিয়ে দেয়া হল। তারপর শুরু হল মামা মামীর শত্রুতা থেকে ভালোবাসার গল্প।
হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের স্মৃতিচারণমূল এই বইটি তুলে ধরছে, মানুষের জীবনটাই ছোট, বড় গল্পের সমাহার।
কেন জানি বইটা ভালো লাগলো।কিছু জায়গায় লেখকের টিপিক্যাল লেখার ধাঁচ থাকলেও,পুরো লেখায় ফুটে উঠেছে শৈশবের এক বালকের কাহিনী।সিলেট শহরের বৃষ্টি দিয়ে যে জীবন বৃত্তান্ত শুরু।হুমায়ুন আহমেদের অটোবায়োগ্রাফির খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ আছে,তবে সীমিত আকারে।আর আছে তার কিছু তিক্ততার কথা। বইটা পড়ে সিলেটের বৃষ্টির কথা মনে পড়ছে,সিলেট সুন্দর শহরে যদি শৈশবটা কাটানো সম্ভব হতো!!
হুমায়ূন আহমেদের আত্মজীবনীর যারা নিয়মিত পাঠক তারা নিঃসন্দেহে অবগত থাকবেন যে তাঁর মত অসাধারণ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের অল্পসংখ্যক লেখকই লিখেছেন।আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থসমূহকে তিনি অনন্য এক মাত্রায় নিয়ে গেছেন।যা পড়তে পড়তে বারংবার মনে হয় আত্মজীবনীও এত সাবলীল, এত সহজ সরল, এত চমকপ্রদ আর সিনেমাটিক ভাবে লেখা যায়!
কিছু শৈশব বইটির ভূমিকায় লেখক লিখেছেন- 'মানুষ যখন মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকে তখন সে ব্যাকুল হয়ে পেছনে তাকায়।আমার মনে হয় তাই হয়েছে।সারাক্ষণই শৈশবের কথা মনে পড়ে।কী অপূর্ব সময়ই না কাটিয়েছি!' "কিছু শৈশব" বইটি জুড়ে লেখক লিখে গিয়েছেন তাঁর অদ্ভুত সুন্দর শৈশবের অসংখ্য ঘটন-অঘটন আর আনন্দ বেদনার কাব্য। বইয়ের শুরুতে দেখা যায় ছয়-সাত বছরের এক বালক জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে তবে তার মনে দুঃখ।একটা গুরুতর অপরাধের কারণে তাকে সারাদিনের জন্য আটকে রাখা হয়েছে।কাঠের সিন্দুকের উপর রাখার সবকটা চিনামাটির প্লেট সে একসাথে ভেঙ্গেছে।বালক মাতা ঘোষণা করেছেন এখন থেকে সবাই প্লেটে করে খেলেও বালক খাবে মেঝেতে।মেঝের একটা অংশ পরিষ্কার করে রাখা হবে,সেখানেই ভাত-তরকারী দেয়া হবে।
হুমায়ূন আহমদের সেই জাদুকরী উপন্যাসের মত লাগছে কি? উপন্যাস নয়,বইটিতে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন নিজের শৈশবের কথাই। তাঁর এই শৈশবগাঁথা যে তাঁর লেখা যেকোন উপন্যাসের চেয়েও বেশি নাটকীয় আর আকর্ষনীয় তা পাঠক বইটি পড়া শুরু করা মাত্রই বুঝতে পারবেন। বইটি জুড়ে আছে লেখকের শৈশবের বন্ধুদের কথা। আছে 'মাথামোটা শঙ্কর' যার সাথে লেখক পুকুরে দাপাদাপি করে শৈশব কাটিয়েছেন, আছে'জ্ঞানী টগর' যার ধারণা ফর্সা মানুষদের আল্লাহ তা'আলা গু দিয়ে বানিয়েছেন, আছে 'মতিন' যে কিনা বন্ধুদের ম্যাজিক দেখানোর অভিপ্রায়ে দিনের পর দিন মার্বেল গিলে ফেলে অবশেষে পেটভর্তি মার্বেল নিয়ে বাবার সাথে লন্ডনে পারি জমিয়েছিল। লেখকের শৈশব স্মৃতির সাথে উতপ্রোতভাবে জড়িত পারুল আপা,বড় মামা,নানাজান এর মত মানুষদের অদ্ভুত গল্পে সাজানো আছে বইটি।
শৈশব অসম্ভব সুন্দর একটা সময়। "কিছু শৈশব" আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও সেই অদ্ভুত সুন্দর মায়াময় সময়টাতে আবার নিয়ে যাবে।লেখকের দুষ্টুমি,মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঝুম বৃষ্টিতে ঝাপাঝাপি,প্রফেসর এর বাড়ি থেকে আমি চুরির গল্প পড়তে পড়তে আপনার মনে হবে-'আরে এতো আমি! এতো আমারি গল্প!' শৈশবে ফিরে যাওয়ার এই আনন্দময় যাত্রায় আপনাকে স্বাগতম।
শৈশব—আমাদের সবার জীবনের এক অপরূপ অধ্যায়, কিন্তু তা মনে গেঁথে রাখার সৌভাগ্য কজনের হয় ? হুমায়ূন আহমেদ তার "কিছু শৈশব" বইতে সেই বিস্ময়কর দিনগুলোকেই ফিরিয়ে এনেছেন অকপটে, মায়াভরা কলমে । এটি কোনো সাজানো-গোছানো উপন্যাস নয়, বরং লেখকের জীবনের খণ্ড খণ্ড স্মৃতি, যেখানে রয়েছে শাস্তি, দুরন্তপনা, বই-পড়ার অভ্যেস, নাটক, গান, এমনকি শৈশবের বৃষ্টিভেজা দুপুরগুলোরও মুগ্ধকর বর্ণনা ।
সাধারণ আত্মজৈবনিক বইগুলো যেভাবে ভারী আর আবেগে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে, হুমায়ূন সেখানেও ব্যতিক্রম । তার সহজ, স্বচ্ছ ভাষায় লেখা এই স্মৃতিগুলো আমাদের নিয়েও যায় নিজেদের শৈশবে—যেখানে ছিল না মোবাইল, ছিল খেলার মাঠ, গল্প, কৌতুক, আর সরল আনন্দ ।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে—এই বই পড়ে মনে হয়, আমাদের শৈশবগুলোও একেকটা উপন্যাস হতে পারতো, যদি আমাদের লেখার হাতটা হতো হুমায়ূনের মতো ।
পড়তে পড়তে হারিয়ে যেতে হবে হুমায়ূন আহমেদের শৈশবের বৃষ্টিভেজা স্মৃতিময় শহর সিলেটে। মনে হবে আমি নিজে সেই বালক হুমায়ূন, হাফপ্যান্ট পরে সাদাকালো শৈশবের ঝাপসা অলিগলিতে ঘুরে ফিরছি। ধূসর হয়ে আসা বাল্যকালের স্মৃতি কী অসাধারণ ভাবে লেখক তুলে ধরেছেন!