বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে লেখা আবদুল্লাহ্ উপন্যাস বাঙালি মুসলমানের সমাজচিত্র হিসেবে মূল্যবান। চিত্রাঙ্কণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লেখকের সমাজ-সমালোচনা। যা ক্ষয়িষ্ণু, যা অসংগত, যা কুসংস্কারাচ্ছন্ন, তাকেই লেখক প্রবলভাবে আক্রমণ করেছেন। ওয়াহাবিদের গোঁড়ামির ছাপবর্জিত হলেও তাঁদের পিউরিট্যানিক মনোভাব যে ইমদাদুল হককে প্রভাবান্বিত করেছিল, তাতে সন্দেহ নেই।
আবদুল্লাহ (১৯৩৩) উপন্যাসে বাঙালি মুসলমান সমাজের যেসব সমস্যার প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে, পিরবাদ তার মধ্যে প্রথম। আবদুল্লাহ্ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, ধর্মপ্রাণ, কিন্তু কুসংস্কারবিরোধী। তার মতে, পির-মুরিদি ব্যবসাটা হিন্দুদের পুরুতগিরির অনুকরণ, ইসলামে তার স্থান নেই। কাসেম গোলদারের বাড়িতে নিজের পিতৃপুরুষের অলৌকিক ক্ষমতার গল্প শুনে তার মনে বিস্ময় জাগে: ‘পুত্রের পীরত্বে পিতার হৃদয়ে এরূপ সাংঘাতিক হিংসার উদ্রেক আরোপ করিয়া ইহারা পীর-মাহাত্ম্যের কি অদ্ভুত আদর্শই মনে মনে গড়িয়া তুলিয়াছে’ পির হওয়ার সহজ পথ ত্যাগ করে আবদুল্লাহ্ চাকরি করে উপার্জন করতে প্রবৃত্ত হয়েছে।
আশরাফ-আতরাফভেদ আরেক সামাজিক সমস্যা। সৈয়দ সাহেবের মাদ্রাসায় এদের পাঠদানের বৈষম্য দেখে আবদুল্লাহ্ বিস্মিত হয় এবং মৌলভী সাহেবকে তার কারণ জিজ্ঞাসা করে। মৌলভী সাহেব জানান, আতরাফ সন্তানেরা তো মিয়াদের সমান চলতে পারে না, তাই সৈয়দ সাহেব এই বিষম শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছেন। আবদুল্লাহ্ যখন বলে, একেবারেই যদি তাদের পড়ানো না হয়, তাহলে কি আরো ভালো হয়ন না?, মৌলভী সাহেব তখন বলেন, গরিবেরা যখন শিকতে চায়, তখন তাদের একেবারে নিরাশ করলে খোদার কাছে কী জবাব দেবেন, তাছাড়া গোম্রারে এলেমদান করলে অনেক সওয়াব হয়, একথা কেতাবে আছে। এই সমস্যার চরম অভিব্যক্তি দেখা যায় মসজিদের ইমাম জোলা বলে যখন সৈয়দ সাহেব তাঁর পিছনে নামাজ পড়তে অস্বীকার করেন, তখন। এমনকী সুফী সাহেব পর্যন্ত সৈয়দ সাহেবের এমন বংশাভিমান সম্পর্কে কোনো কথা বলেন না। এই অশিষ্টতার বিরুদ্ধে আবদুল্লাহ্ এক মূর্তিমান প্রতিবাদ-সে জোলা ইমামের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। বংশমর্যাদা-প্রসঙ্গে মীর সাহেবের কথায় আবদুল্লাহর মনোভাবই প্রতিধ্বনিত হয়েছে: ‘কবরের ওপারের দিকে তাকাবার আমি কোন দরকার দেখি নে।’
পর্দাপ্রথার শ্বাসরুদ্ধকর কড়াকড়ির বিরুদ্ধেও আবদুল্লাহ্ সাহস করে দাঁড়িয়েছে। পল্লীসমাজের পরনিন্দা-প্রবৃত্তি এবং খাতকের প্রতি মহাজনের অত্যাচারের চিত্র-উদঘাটনে কাজী ইমদাদুল হক অকুণ্ঠ। হিন্দু-মুসলমান-বিরোধের পর্যালোচনাও তিনি করেছেন, সেখানে তিনি দায়ী করেছেন সম্প্রদায়কে নয়, ব্যক্তিকে। লেখক বুঝিয়ে দিয়েছেন, সকল সামাজিক মূঢ়তা ত্যাগ করে শিক্ষার আলোকে স্নাত হয়েই তবে সাজকে সচল ও সজীব রাখা যাবে।
Qazi Imdadul Haq was a distinguished poet, essayist, and novelist born in 1882 in the Khulna district. Throughout his professional life, he dedicated himself to education, serving as a teacher and teacher-trainer before eventually becoming the first Secretary of the Board of Intermediate and Secondary Education, Dhaka. Beyond his administrative and pedagogical roles, he was a prominent intellectual figure and a regular contributor to influential magazines such as Bharati and Nabanur.
His literary career was marked by a diverse range of works, beginning with his first published poetry collection, Ankhijal (1900). His notable bibliography includes:
- Essays:Moslem Jagater Bigyan Charcha (1904) and Prabandhamala (Volume I in 1918; Volume II in 1916). - Children's Literature:Nabi Kahini and Kamarer Kando (1919). - Unpublished Works:Latika (1903).
His magnum opus, the novel Abdullah (1933), remains his most significant contribution to Bengali literature. Haq was able to complete the first 30 chapters of the novel before his untimely death in 1926 in Kolkata. To ensure the completion of this vital social portrait, Anwarul Kadir authored the remaining 11 chapters, guided by the original drafts left behind by Haq. Together, these works solidify his reputation as a writer who balanced creative artistry with a deep commitment to social reform.
Literary Works * Abdullah * Alexandriar Prachin Pustakagar (The Ancient Library of Alexandria) * Abdur Rahmaner Kirti (The great deeds of Abdur Rahman) * France-e Muslim Odhikar (Muslim Conquest of France) * Alhamra * Pagal Kholifa (The Crazy Caliph) * Muslim Jagater Biggan Charcha (Science in th
এই বইটার প্রকাশকাল ১৯৩৩। হিসাব করে দেখলাম, আমার দাদির জন্ম ওই সময়েই হবে অথবা কিছুটা পরে। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার, দাদির কাছ থেকে যেসব কথা শুনতে শুনতে কানব্যথা করে এখনও, সেই চরিত্রগুলোই হুবহু এই উপন্যাসে আছে। তবে দাদি নিজেও তেমনই এক অন্ধকারাচ্ছন্ন চরিত্র! পীরপ্রথা, পীরের পিছে নিজের সর্বস্ব দেওয়া, মাজার পূজা, সুস্থ জ্ঞানার্জনকে ঘৃণা করা এগুলো তাঁর মধ্যে এখনও বহাল।
উপন্যাসের প্রথা-ভাঙার নায়ক আবদুল্লাহর মাধ্যমে এইসকল ধার-করা-রীতি ও কুসংস্কার বাস্তবভাবে উঠে এসেছে। ইসলাম কুসংস্কার ও অজ্ঞানতার পক্ষপাতী নয়–বরং জ্ঞানার্জনে যুক্ত ও পৌত্তলিকতাপ্রবণ চিন্তা থেকে মুক্ত থাকার এক জীবনব্যবস্থা।
এই বইয়ের এত কম রেটিং দেখব, আশা করিনি। কারণ, সাহিত্যের ১০০টা বইয়ের মধ্যে উপন্যাসটা থাকবে হয়তো। বাংলার গ্ৰামে ইসলামের যে কদাকার রূপ ব্যাপক আকারে চালু ছিল, তা জানতে বইটা অত্যন্ত সহায়ক বলে মনে করি।
'আবদুল্লাহ' উপন্যাসটি নিয়ে লেখা শুরু করার পূর্বে এর স্রষ্টা কাজী ইমদাদুল হককে নিয়ে একটু লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬) ছিলেন একাধারে লেখক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও সর্বোপরি একজন চিন্তাবিদ। সমাজের বিভিন্ন দিক তিনি তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখতেন। পেশাগত কারণে সমাজিক সমস্যাগুলো তিনি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন এবং সেগুলো তাঁর লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লেখাটি হল- তাঁর প্রথম উপন্যাস 'আবদুল্লাহ'।
'আবদুল্লাহ' উপন্যাসটি মূলত তৎকালীন ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত একটি উপন্যাস। উপন্যাসটি প্রকাশ করা শুরু হয় আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে ১৯১৮ সালে। প্রায় দেড় বছর কাল সময় ধরে কাজী ইমদাদুল হক মুসলিম ভারত পত্রিকায় এই উপন্যাসটির ৩০টি পরিচ্ছেদ প্রকাশ করেন। এরপর আকস্মিকভাবে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপন্যাসটিও অসমাপ্ত থেকে যায়। উপন্যাসটির অবশিষ্ট ১১টি পরিচ্ছেদ তাঁর মৃত্যুর পর খসড়া অবলম্বনে তাঁর বন্ধু কাজী আনারুল কাদির সম্পন্ন করেন।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাঙালি মুসলমান সমাজে যেসব কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও অজ্ঞতা মহামারী আকার ধারণ করেছিল, কাজী ইমদাদুল হক উপন্যাসটিতে তারই সুনিপুণ চিত্রায়ন করেছেন। উপন্যাসটির মূল চরিত্র আবদুল্লাহর মধ্য দিয়ে একজন প্রতিবাদী যুবকের অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছেন, যে কিনা তথাকথিত পীর বংশের ছেলে হয়েও কুসংস্কারমুক্ত ছিল। সে বুঝতে পেরেছিলো কেবল মাদ্রাসা শিক্ষায় মুসলমানদের দুরবস্থা মিটবে না। যুগের প্রয়োজন অনুসারে মুসলমানদেরকে ইংরেজি শিক্ষায় পারদর্শী হতে হবে।
হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদে আবদুল্লাহ বিশ্বাসী নয়। সে যখন এক স্কুল থেকে বদলি হয়ে অন্য স্কুলে যাচ্ছিলো, তখন তার ছাত্রদের বিদায়কালে বলেছিল- "আর্শীবাদ করি, তোমরা মানুষ হও, প্রকৃত মানুষ হও- যে মানুষ হলে পরস্পর পরস্পরকে ঘৃণা করতে ভুলে যায়, হিন্দু মুসলমানকে মুমলমান হিন্দুকে আপনার জন বলে মনে করে।" এ উক্তি থেকে বুঝা যায়, তৎকালীন সাম্প্রদায়িক সমাজে আবদুল্লাহর মত উদারমনা মানুষ কতটা প্রয়োজন ছিল।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে নারীদের কঠিন পর্দাপ্রথা মেনে চলতে হতো। তাদেরকে ডাক্তার দেখানো হতো না। উপন্যাসটিতে দেখা যায়, আবদুল্লাহর বোন হালিমার নিউমোনিয়া হলেও শ্বশুরবাড়ি থেকে ডাক্তার দেখাতে চায় না। আবদুল্লাহ ও তার ভগ্নীপতি আবদুল কাদের রীতিমত জোর করে হালিমাকে ডাক্তার দেখায়। হালিমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাড়ির বাইরে নেয়ার সময়ও বাঁধা আসে। রেল-স্টিমারে চড়লে পর্দার ব্যাঘাত ঘটবে যে! যাই হোক, আবদুল্লাহ ও আবদুল কাদেরের প্রচেষ্টায় হালিমা সুস্থ হয়।
আবদুল্লাহর শ্বশুর সৈয়দ সাহেব একজন ধর্মান্ধ ব্যক্তি। বংশ গরিমার নামে ব্যয়বহুল অর্থহীন আচার অনুষ্ঠান এবং উঁচু-নিচু ভেদাভেদ করাই ছিল তার কাজ। এজন্য মক্তবে পড়তে আসা প্রতিবেশীদের গরিব ছেলেমেয়দেরকে উচ্চ তালিম দিতে হুজুরকে মানা করেন তিনি। আবার, উপন্যাসের এক পর্যায়ে তিনি নিচু বংশজাত ইমামের পেছনে নামায পড়তে অস্বীকৃতি জানান। ধর্মান্ধ একজন ব্যক্তি যখন সাম্যের ধর্ম ইসলামে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ করেন, তখন তাকে ভণ্ড ছাড়া আর কী বা বলা যায়!
সৈয়দ সাহেবের ঠিক বিপরীত চরিত্র দেখতে পাওয়া যায় মীর সাহেবের মাঝে। সৈয়দ সাহেব রক্ষণশীলতা এবং মীর সাহেব প্রগতিমুখিতার প্রতীক। সৈয়দ সাহেবের বংশাভিমান এবং ধর্মের নামে অধর্মের বিপরীতে মীর সাহেবের বাস্তববুদ্ধি, মানবিক বোধ ও সংস্কারপন্থা উপন্যাসটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
উপন্যাসটির অসামঞ্জস্যতা নিয়ে একটু বলি। আগেই জানিয়েছি, উপন্যাসটির অবশিষ্ট ১১টি পরিচ্ছেদ কাজী ইমদাদুল হকের মৃত্যুর পর খসড়া অবলম্বনে তাঁর বন্ধু কাজী আনারুল কাদির সম্পন্ন করেন। এর ফলে উপন্যাসটির ধারাবাহিকতা কিছুটা হলেও বিঘ্নিত হয়েছে। হঠাৎ করেই যেন তাড়াহুড়ো করে উপন্যাসটি শেষ করে হয়েছে। কাজী ইমদাদুল হক যদি পুরো উপন্যাসটি শেষ করে যেতে পারতেন, তাহলে হয়তো 'আবদুল্লাহ' উপন্যাস হিসেবে আরও সম্পূর্ণ হয়ে উঠতো।
সবশেষে বলা যায়, 'আবদুল্লাহ' কাজী ইমদাদুল হকের এক অনবদ্য কীর্তি। তাঁর এ উপন্যাসটি বাঙালি মুসলমান সমাজের স্বরূপ তুলে ধরেছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'আবদুল্লাহ'র প্রশংসা করে বলেছিলেন, "'আবদুল্লাহ' বইখানি পড়ে আমি খুশি হয়েছি- বিশেষ কারণ, এই বই থেকে মুসলমানদের ঘরের কথা জানা গেল।" সমাজ সচেতন ও মুক্তমনা পাঠকদের জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য উপন্যাস।
বইটিতে মুসলমানদের অন্তঃপুরের বা ভেতরের খবর নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। স্বাধীনতাপূর্ব ভারতবর্ষে পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজের নানান সমস্যা বেশ সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন লেখক। পর্দাপ্রথার কড়াকড়ি, আশরাফ -আতরাফ সম্পর্কসহ নানান বিধিনিষেধ নিয়ে চলমান দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়েছে। এজন্য "আব্দুল্লাহ"র ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু অর্ধেকের পর থেকেই লেখা অগোছালো। শেষটা একদমই একপেশে।
১৯১৮ সালের কোনো এক সময়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় ইমদাদুল হকের মানসপটে এই উপন্যাসের ছককাটা শুরু হয়।যার বাস্তবরূপায়ন "মোসলেম ভারত"পত্রিকায় ৩০টি পরিচ্ছেদ আকারে বের হতে থাকে। পরবর্তীতে পত্রিকাটা আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাঝপথে কিছু দিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায় উপন্যাসটি। লেখকের মৃত্যুর পর বন্ধু আনারুল কাদির খসড়া থেকে বাকি ১১টি পরিচ্ছেদ শেষ করেন, তাড়াহুড়ো এবং হাতবদলের জন্য উপন্যাসের গতি কিছুটা পাল্টে গেলেও মূল ভাব থেকেছে বরাবরের মতই অক্ষুন্ন।
এ যুগে চিকিৎসা ব্যবস্থা সহ আরো নানান চমৎকার সব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও সামান্য জ্বর ঠান্ডায় কুপোকাত হয়ে মাতৃআচলের নিচেই যেখানে প্রশান্তি খুঁজতে থাকি , কাজকর্ম পড়াশোনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে তালবাহানা করতে যেখানে পিছপা হইনা, সেখানে অ্যান্টিবায়োটিক সহ আরো নানা ধরনের চিকিৎসার অপ্রতুলতার সময়ে এমন কিছু লিখতে পারাটা আসলেই বেশ বড় রকমের মনোবল আর সৃষ্টিশীল চিন্তা না থাকলে পেরে উঠা টা সম্ভব নয়।
সে যুগের কঠিন পর্দা প্রথা , নানাধরনের গোঁড়ামি ,অপরের বিরুদ্ধে কূটকচালি সবই নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে যাওয়া বিশেষ করে যে ব্যক্তি নিজেকে সাচ্চা মুসলমান বলে অষ্টপ্রহর দাবি করেন তার বাড়ির গৃহবধূ কে বের করে এনে তাবিজ কবজ আর কবিরাজির বাইরে চিকিৎসা করানো বিশেষ করে দস্তুর মত পাস করা হিন্দু ডাঃ দিয়ে দেখানোর মত এক অসম্ভব কঠিন কাজকে দৃঢ়তা আর মনোবলের সাথে করেছে আব্দুল্লাহ,সাথে বন্ধু হিসেবে আব্দুল কাদির এবং আব্দুল খালেক ছিল সাথী। বোনের এই মহাবিপদে শ্বশুরের রক্তচক্ষু কে তোয়াক্কা না করে নিয়েছিল সাহসী পদক্ষেপ, মূল্য হিসেবে কটাক্ষ আর কিছুদিনের জন্য পাওয়া স্ত্রীর সান্নিধ্য হারানোর পরও সে ছিল অবিচল। নিজেদের কে বড় মুসলমান দাবি করা অথচ বিধবা বিবাহকে অচ্ছুৎ ভাবা সমাজে থেকেও দায়িত্ব নিয়েছিল বিধবা মালেকার।
নিজের পেশার প্রতি একনিষ্ঠতা প্রকাশ করে ছাত্রদের মনে সহজেই জায়গা করে নেওয়া এই মানুষটিকে; উপন্যাসের শেষে এবং মুখব���্ধের অনেক জায়গায় আবদুল্লাহ কে বরাবরই এ উপন্যাসের নায়ক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে এই লেখার নায়ক একজন নয়, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মিথ্যে মানমর্যাদা নিয়ে বড়াই করে সত্যকে জলাঞ্জলি দেওয়া মুসলিম সমাজের করুন অবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতে্যকটি মানুষ ই আমার কাছে এ গল্পের নায়ক
সে সৈয়দগরিমায় গা না ভাসিয়ে দেওয়া মাদ্রাসা শিক্ষার বাইরে কাফেরী বিদ্যা তথা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া আবদুল কাদের বা পিতার বংশানুক্রমে চলে আসা পীর সাহেবের মহান দায়িত্ব পালন না করে নিজ পায়ে দাঁড়ানো আবদুল্লাহ,কিংবা মুসলিম সমাজে নিন্দনীয় কাজ সুদব্যবসা করেও গরীব অসহায় মানুষের পাশে বিপদে আপদে দাঁড়ানো মীর সাহেব,অথবা ভোলানাথের সেই ডাঃ পুত্র যে হিন্দু মুসলমান ভেদাভেদ না করে হালিমার চিকিৎসায় অকাতরে সাহায্য করে নিজ সমাজে নিন্দনীয় হওয়া,বা সেই গরীব তথাকথিত সমাজের মাপকাঠি হিসেবে নীচুস্তরের মানুষ আকবর আলি যে কিনা বিপদে ত্রাতার ভূমিকায় আব্দুল কাদির আর আব্দুল্লাহ কে আশ্রয় দিয়েছেন অগুনতি বার।এরা প্রত্যেকেই আমার কাছে সমানভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।
নারী চরিত্রের দিক থেকে রাবেয়া আমার কাছে বেশ সাবলীল এবং সে যুগের তুলনায় বেশ ভালোই প্রগতিশীল মনে হয়েছে।অথচ আব্দুল্লাহর স্ত্রী হিসেবে সালেহা সর্বদাই বাবার ছত্রছায়ায় থেকে এক আপাদমস্তক জড়বস্তুতে পরিনত হয়েছে ,তাকে আমার ম্রিয়মাণ লেগেছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।হালিমা মালেকার খুব বেশি ভূমিকা না থাকলেও উপন্যাসের তাদের ঐ সামান্য উপস্থিত ভালোলাগার অনুভূতি জাগায়।
বঙ্গভঙ্গের পূর্ববর্তী সময়ে বাংলার তথা উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের অজ্ঞতা, তাদের অনগ্ৰসরতার কারন এবং সেই তুলনায় হিন্দু সমাজের উত্তরোত্তর সাফল্যের পটভূমি জানতে চাইলে এই লেখাটা খুব বেশি তথ্যবহুল না হলেও তৎকালীন সমাজের একটি পরিস্কার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে পাতায় পাতায়।
উনার এই একটি উপন্যাসই পড়লাম। ১৯৩৩ সালে লেখা এ উপন্যাসে তখনকার সমাজের ঘরের কথাই যেন তিনি শক্তিশালী লেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। আর সবশেষে তিনি মানবতার জয়গানই গেয়ে গেছেন বলে আমার মনে হয়েছে। [good book]
বইয়ের নামঃ আবদুল্লাহ লেখকঃ কাজী ইমদাদুল হক বইয়ের ধরণঃ সামাজিক উপন্যাস প্রকাশনাঃ অ্যাডর্ন পাবলিকেশন প্রথম প্রকাশঃ ১৯৩৩ পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৬৪ মূল্যঃ ২২১ টাকা (১৫% ছাড়ে)
মানব জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ধর্ম। সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে মানুষের জীবনে এর অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকলেও এটি অনেক সংবেদনশীল একটি ব্যাপার মানুষের কাছে। এ সংবেদনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে ধর্মকে কেন্দ্র করে নিজেদের আখের গোছানোর ব্যবসায় নামবার ঘটনা মানব সভ্যতার ইতিহাসে বেশ প্রাচীন একটি প্রথা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত ভারত উপমহাদেশেও এমন চর্চা নতুন কিছুই নয়। বরং ধর্মভীরু মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে ধর্মের নামে বিভিন্ন ব্যবসায় নামা এ অঞ্চলে বেশ শক্তপোক্ত শেকড় গেড়ে বসেছে সময়ের পরিক্রমায়। এর সাথে সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে সমাজে প্রচলিত নানা কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি।
এরকম নানা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের গল্প নিয়ে লেখা এক উপন্যাসের নাম "আবদুল্লাহ"। তৎকালীন ভারতের সমাজ বাস্তবতার চিত্রকে উপজীব্য করে রচিত এ উপন্যাসে মূলত ধর্মীয় নানা গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের চিত্র দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিশেষত বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ কালে ভারতের মুসলিম সমাজের প্রকৃত চিত্র এ উপন্যাসে দারুণভাবে উঠে এসেছে। পাশাপাশি উক্ত সময়ে প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে যেসব সচেতন মানুষেরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে এসব সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে আজীবন প্রাণপণ লড়াই করেছেন, তাদের গল্প নিয়েই এ উপন্যাসের গল্প। এছাড়া, তৎকালীন জমিদার ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের জীবনযাত্রা ও জীবন দর্শন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা মেলে এ উপন্যাসে। এক কথায়, সমাজের প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামি ও তার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া একদল মানুষের লড়াইয়ের গল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে এ উপন্যাসের গল্প। রবীন্দ্রনাথের ভাষ্যমতে, তৎকালীন সময়ের মুসলমান সমাজের ভেতরের গল্প জানতে হলে এ উপন্যাসটি পড়বার কোনো বিকল্প নেই।
উপন্যাসের গল্পের সূচনা হয় উক্ত উপন্যাসের নায়ক আবদুল্লাহর পিতা ওলিউল্লাহর মৃত্যুর ঘটনার মধ্য দিয়ে। এ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাদের পরিবারে নেমে আসে ভয়াবহ রকমের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দুনিয়া থেকে বিদায় নিলে, পড়ালেখার খরচ এখন কীরূপে জুটবে, সে চিন্তায় অস্থির সময় কাটে তার। শুরু হয় নতুন এক জীবন সংগ্রাম। ধর্মকেন্দ্রিক আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা থাকলেও সে পথে হাঁটবার রুচি হয়না তার। এ নিয়ে তার শ্বশুরকুলের লোকেদের খোঁচা উঠতে-বসতে হজম করতে হয় তাকে। এ সংক্রান্ত কথা উঠলেই তার ইংরেজি শিক্ষা তথা ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রচলিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া নিয়ে সর্বদা খোঁটা দেওয়া হতে থাকে। উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে সহায়তা করা দূরে থাকুক; কীভাবে তাকে এ পথ থেকে নিবৃত্ত করা যায়, সে চেষ্টার যেন অন্ত নেই তাদের। তখনকার দিনে পুরো সমাজের চিত্র বলতে গেলে এরকমই ছিল। অন্যদিকে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মুসলিম সমাজের এ অনগ্রসরতাকে কাজে লাগিয়ে তরতর করে উঠে যায় সফলতার শীর্ষচূড়ায়। এমতাবস্থায়, সামান্য স্কুলমাস্টার আবদুল্লাহ উক্ত সমাজব্যবস্থায় প্রচলিত নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। পদে পদে বাধার সম্মুখীন হলেও একসময় সে জয়ী হয় এ লড়াইয়ে। আর এ জয়ের গল্পকে নিয়ে এগিয়ে যায় উপন্যাসের গল্প। কীভাবে আসে সে পরম আকাঙ্ক্ষিত বিজয়? প্রিয় পাঠক! জানতে চান সে কথা? তবে অনতিবিলম্বে পড়ে ফেলুন দারুণ সুখপাঠ্য ও শিক্ষণীয় এ উপন্যাস।
এবার আসি চরিত্র বিশ্লেষণে। উপন্যাসের নাম ও উপর্যুক্ত আলোচনা পড়ে এতক্ষণে প্রিয় পাঠক নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন, কে এ উপন্যাসের নায়ক! তবুও বলি, কেন্দ্রীয় চরিত্র নির্ভর এ সামাজিক তথা চিরায়ত উপন্যাসে প্রধান ভূমিকায় রয়েছে দরিদ্র স্কুলমাস্টার আবদুল্লাহ। অর্থনৈতিক দিক থেকে সে দরিদ্র হলেও ন্যায়নীতি ও নিষ্ঠার দিক থেকে সে অটল। সমাজের প্রচলিত নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার ব্যাপারে সে বদ্ধপরিকর। এ কাজে কোনো প্রকার শাসানি বা চোখরাঙানি মানতে নারাজ সে। তৎকালীন সমাজের কর্তাব্যক্তিদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এক অকুতোভয় বিজয়ী বীরের নাম আবদুল্লাহ। বাংলার ইতিহাসে এ নামে কোনো দিগ্বিজয়ী যোদ্ধার অস্তিত্ব না থাকলেও আবদুল্লাহ চরিত্রটি যেন হয়ে উঠেছে নব্য ও আধুনিক সমাজের হার না মানা এক যোদ্ধার প্রতিচ্ছবি। কেননা, উক্ত চরিত্রের মধ্য দিয়ে ন্যায়বান ও নিষ্ঠাবান এক আধুনিক তরুণকে উপস্থাপন করা হয়েছে তৎকালীন সমাজের প্রেক্ষাপটে। এ ক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হয়েছে, তৎকালীন সময়ে Bengal Renaissance বা বাঙালি নবজাগরণ নামে সমাজ সংস্কারের যে নব জোয়ারের সূচনা হয়, এ উপন্যাস যেন তার দর্পণস্বরূপ। উল্লেখ্য যে, উক্ত নবজাগরণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বেশিরভাগই সনাতন ধর্মাবলম্বী হলেও কিছু মুসলিম নেতাও এতে যুক্ত ছিলেন। আবদুল্লাহ নিজেও যেন তাদের-ই প্রতিচ্ছবি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রাখা সৈয়দ আব্দুল খালেককে। সম্পর্কের বিচারে আবদুল্লাহর শ্বশরমশাই এ লোকটি মুসলমান সমাজে সৈয়দ সাহেব নামেই অত্যধিক পরিচিত। সৈয়দ বংশের উত্তরাধিকারী হবার সুবাদে সমাজে বেশ দাপট রয়েছে তার। এ দাপট তাকে একরকম ধর্মান্ধে পরিণত করে। বংশ মর্যাদার গৌরবে অনেক ক্ষেত্রে তার বুদ্ধিবিবেচনা হ্রাস পেয়ে বসে। যুক্তিতর্কের ধার না ধেড়ে তিনি সর্বদা বংশ মর্যাদার বিচারে ব্যস্ত রাখেন নিজেকে। মুখে তার সদা ইসলামের বাণী ফুটলেও আশরাফ-আতরাফের নামে মানুষের মাঝে বিভাজন সৃষ্টিতেই যেন তার যত আনন্দ! অথচ ইসলামে স্পষ্টভাবে বংশ মর্যাদার ভিত্তিতে কারো ক্ষেত্রে বিভাজন বা বৈষম্য সৃষ্টির ব্যাপারে নিষেধ করা আছে। এমন ধর্মের নামে আরো অনেক কুসংস্কারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত একজন মানুষ সৈয়দ সাহেব। সার্বিক বিচারে, তিনি তার জামাতা আবদুল্লাহর পুরোপুরি বিপরীত স্বভাবের একজন মানুষ। এ চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রচলিত সমাজের একজন রক্ষণশীল, গোঁড়া স্বভাবের মানুষকে উপস্থাপন করা হয়েছে। বস্তুত তৎকালীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম সমাজে এমন স্বভাবের লোকের দেখা অহরহ মিলত। ধর্মকে এরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতেন। পুরো সমাজ যেন এদের করাতলে ছিল। গুটিকয়েক লোক পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে এরা পুতুল নাচের পুতুলের মত করে নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখনো খুঁজলে যে সমাজে এহেন মানুষ পাওয়া যাবেনা, তা কিন্তু নয়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশ বহু বছর আগেই স্বাধীন হয়েছে......আধুনিক প্রযুক্তিতে আমরা অনেক এগিয়ে গিয়েছি। কিন্তু এখনো আমাদের মন থেকে এখনো ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের ভূত পুরোপুরি দূর করতে পারিনি। ধর্মকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক কালের নানা উগ্রবাদী হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিবেচনা করলে এ সত্যতার প্রমাণ মিলবে।
উক্ত দুইটি প্রধান চরিত্র বাদেও আরো কিছু চরিত্রের উপস্থিতি এ উপন্যাসের গল্পকে এক আলাদা মহিমা দান করেছে। গল্পের তাগিদে এসব চরিত্র চিত্রণের ফলে উপন্যাসের গল্প আলাদা এক মর্যাদা লাভ করেছে। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে গল্পের মোড় ঘুরে যেতে এসব চরিত্রের ভূমিকা এককথায় অনবদ্য। এসব চরিত্রের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য চরিত্র হচ্ছেঃ হালিমা, সালেহা, আবদুল কাদের, মীর সাহেব, খান নেওয়াজ, সামাদ, রাবিয়া, হরনাথ সরকার, রঘুনাথ সরকার প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এসব চরিত্র এ গল্পে মুখ্য ভূমিকা পালন না করলেও গুরুত্বের বিচারে সার্বিক দিক থেকে পিছিয়ে ছিল না কোনোভাবেই। নিজস্ব স্বকীয়তার বলে উদ্বুদ্ধ হয়ে এসব চরিত্র উক্ত উপন্যাসের গল্পকে আলাদা এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে, যা উক্ত উপন্যাসকে এক জনপ্রিয় উপন্যাস হিসেবে পরিচিতি দান করেছে।
এবার আসি ভাষারীতি ও শব্দচয়নের গল্পে। সাধুভাষায় রচিত হলেও এ উপন্যাসে শব্দচয়ন বেশ চমকপ্রদ লেগেছে আমার কাছে। ভাষারীতি সাধুভাষা হলেও কোথাও কোনো শব্দ দুর্বোধ্য মনে হয়নি আমার কাছে। এছাড়া শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চমক রয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনীয় আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দের যথাযথ প্রয়োগে কোথাও কোনো অনর্থকতা বা জটিলতার সৃষ্টি হয়নি। পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ এক আলাদা মাহাত্ম্য যোগ করেছে এ উপন্যাসে। এমন বিচিত্র ভাষারীতি ও শব্দচয়ন এ উপন্যাসটিকে বাংলা সাহিত্যের এক বিখ্যাত উপন্যাসে পরিণত করেছে। এমন বিচিত্রতা উপন্যাসটিকে যুগ যুগ ধরে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের মনে বাঁচিয়ে রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।
সর্বোপরি, বিভিন্ন দিকের সমন্বয়ে এক দারুণ সুখপাঠ্য উপন্যাস। পাশাপাশি, তৎকালীন মুসলিম সমাজের হালচাল জানতে এটা বেশ সহায়ক হবে বলে মনে করি আমি। এ দিক থেকে এটাকে শিক্ষণীয় উপন্যাস-ও বলা চলে। সামাজিক জীবনযাত্রার অনেক দিক জানা যাবে এতে। আশা করি, অন্য পাঠকেরাও অনেক উপকৃত হবেন এ বইটি পড়ে।
'আবদুল্লাহ' কাজী ইমদাদুল হকের সর্বশেষ রচনা। জীবদ্দশায় উপন্যাসটির ৩০ পরিচ্ছেদ রচনা করেছিলেন। বাকি ১১ পরিচ্ছেদ লেখকের অকালমৃত্যুর পর আনোয়ারুল কাদীর রচনা করেছেন মূল লেখকের খসড়া অনুসারে। দুইজনের রচনাশৈলীর পার্থক্য থাকলেও কাহিনি প্রবাহে কোনোরকম জটিলতা সৃষ্টি হয়নি।
'আবদুল্লাহ' উপন্যাসে আমাদের মুসলিম সমাজের পীরপ্রথার অন্ধ অনুকরণ, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, জাত-পাতের বড়াই ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। গত শতাব্দীতে এই সমস্যাগুলো প্রকট ছিল। তবে বর্তমান সময়ে যে নেই তা বলা যাবেনা। এখনো আমাদের দেশে নানারকম কুসংস্কারে মানুষের মন আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আবদুল্লাহ হলেও তার পাশাপাশি সামাজিক সমস্যাগুলোও যেন একেকটি চরিত্রের মাঝে বিরাজ করে তাদের মূল চরিত্রে স্থান দিয়েছে। আব্দুল্লাহ একটি প্রতিবাদী চরিত্র। পীরগঞ্জের ক্ষয়িষ্ণু পীরবংশের উত্তরাধিকারী ওলিউল্লাহর পুত্র আবদুল্লাহ। আব্দুল্লাহর বিএ পরীক্ষার আগে ওলিউল্লাহ মারা যান। এতেই আব্দুল্লাহ পড়ে যায় বিপাকে। পড়ালেখার খরচ চালানো কষ্ট হয়ে যায়। আর কিছুদিন পড়ালেখা চালিয়ে পরীক্ষায় পাশ করতে পারলেই ভালো একটি চাকরি পাবে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। মায়ের পরামর্শ ছিল বাপ-দাদাদের পারিবারিক ব্যবসা অর্থাৎ পীর-মুরিদানের মাধ্যমে সংসার চালাক আবদুল্লাহ। কিন্তু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়াতে আবদুল্লাহ এটাকে গর্হিত কাজ বলে মনে করে। আবদুল্লাহ বিয়ে করেছিল তারই এক আত্মীয়া সালেহাকে। আবদুল্লাহর শ্বশুর সৈয়দ আবদুল কুদ্দুস একজন ধার্মিক ও পরহেজগার মানুষ। সৈয়দ বংশ হওয়াতে জাতের অহংকারে আবদুল্লাহর কাছে নিজের মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু আত্মীয় হওয়ার সুবাদে ও ওলিউল্লাহর পীড়াপীড়িতে বিয়েতে রাজি হন। তবে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে দেন নি।
আবদুল্লাহর মেজ সম্বন্ধী সৈয়দ আবদুল কাদের। যার সাথে আবার বিয়ে হয়েছে আবদুল্লাহর বোন হালিমার। আবদুল কাদের ও আবদুল্লাহ উভয়ই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার দরুন এদের দুজনকেই সৈয়দ সাহেব দেখতে পারতেন না। একসময় চাকরির খোঁজে আবদুল কাদের বাড়ি থেকে চলে যান বাবার সাথে রাগ করে।
মীর মোহসেন আলি সম্পর্কে আবদুল্লাহর ফুফা হন। মীর সাহেব সুদের কারবার করেন বলে আবদুল্লাহর পরিবার কিংবা অন্যান্য মুসলিম উচু বংশীয়রা তাঁর সাথে সদ্ভাব রাখেন না। এমনকি তাঁর বাড়িতে খাবার খাওয়াও গর্হিত কাজ করেন। এদিকে মীর সাহেব যখন দেনার দায়ে বিপর্যস্ত ব্যক্তির ঋণ শোধ করেন কিংবা গরিব সন্তানের পড়ালেখার খরচ দেন তখন সমালোচকরা এর পেছনে নেতিবাচক উদ্দেশ্য আছে চিন্তা করে হাসাহাসি করে।
উপন্যাসে গত শতাব্দীতে বাঙালি মুসলিম সমাজের চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক। সৈয়দ বংশের সন্তান হওয়াতে মক্তবে তাদের বেশি শেখার অধিকার থাকলেও, অ-সৈয়দদের অল্প কিছু শিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। সুদখোরকে এড়িয়ে চললেও আশরাফ-আতরাফ জাত্যাভিমানের ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করে অহংকার করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেন না সৈয়দ আবদুল কুদ্দুস। শুধু জোলার ছেলে বলে ইমাম হওয়া সত্ত্বেও তার পেছনে নামাজ আদায়ে অস্বীকারও করেন তিনি। মূলত সৈয়দ আবদুল কুদ্দুসের মধ্য দিয়ে লেখক আবহমান মুসলিম সমাজের বিভিন্নরকম কুসংস্কারকে চিত্রায়িত করেছেন। মুসলিম সমাজের বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থানের জটিলতাও দেখা যায় উপন্যাসটিতে। মুসলমানের বাড়ি হিন্দু ভাড়া নিয়ে বসবাস করলেও, কোনো হিন্দুর বাড়িতে মুসলমানকে বাড়ি ভাড়া দেয় না। আবার যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে চাকরিতে ঢুকলেও শুধু মুসলিম পরিচয়ের কারণে হিন্দু সমাজের রসিকতার মধ্যে পড়তে হয় অনেককে।
কালজয়ী একটি বই। তৎকালীন বাঙালি মুসলমান সমাজের মানসিক ও সামাজিক চরিত্রের প্রতিফলন কাজী ইমদাদুল হক এঁকেছেন নিপুণ হাতে। হ্যাপি রিডিং।
'আবদুল্লাহ' এক অন্ধকার সময়ের উপন্যাস। এক শতাব্দী পেরিয়ে আরেক শতাব্দীর যে যুগসন্ধিকাল, সেই সময়ের পরিবর্তনের হাওয়া কারো জন্য পালে লাগা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বাতাস, কারো জন্য দমকা হাওয়া। শিক্ষার অভাবে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া মুসলমান সমাজ, আর সে শিক্ষাকে কাজে লাগিয়েই এগিয়ে যাওয়া হিন্দুসমাজ; ধর্মীয় গোঁড়ামি আর সামাজিক দ্বন্দ্ব; তা কাটিয়ে উঠতে কিছু মানুষের স্রোতের প্রতিকূলে প্রাণপণ নৌকা বাওয়ার গল্প এই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য।
রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাস সম্পর্কে বলেছিলেন, বইটি পড়ে তিনি খুশি হয়েছেন। বলেছেন, "এই বই থেকে মুসলমানদের ঘরের খবর জানা গেল।… এই বই আমাকে ভাবিয়েছে। দেখলুম ঘোরতর বুদ্ধির অন্ধতা হিন্দুর আচারে হিন্দুকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করেছে সেই অন্ধতাই ধুতি চাদর ত্যাগ করে লুঙ্গি ও ফেজ পরে মুসলমানের ঘরে মোল্লার অন্ন জোগাচ্ছে।"
উপন্যাসটা পড়া শুরু করি প্রায় মাসখানেক আগে। সম্প্রতি ফাঁকিবাজ শ্রেণীর পাঠক হয়ে যাওয়ায় বইটা অর্ধেক পড়ে টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছিলাম। আজকে বাকি অর্ধেক একদম এক বসায় শেষ করলাম। টু বি অনেস্ট, বইটা এক বসায় শেষ করার মতোই একটা বই।
কাজী ইমদাদুল হকের একমাত্র উপন্যাস আবদুল্লাহ। মজার ব্যাপার হলো, বইটা উনি একা লেখেননি। শেষের দিকের কিছু পরিচ্ছেদ লিখেছেন আনোয়ারুল কাদীর, মতান্তরে শাহাদাৎ হোসেন; অবশ্য তাতে ভাষাগত বা গঠনগত হেরফের চোখে পড়ে না। লেখকের মৃত্যুর সাত বছর পর বইটি প্রকাশিত হয়।
বইতে দেখানো হয়েছে, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে নারাজ ও লজ্জিত, তৎকালীন সম্ভ্রান্ত মুসলমান সমাজ খোন্দকারি ব্যবসা বা মুরিদানে লজ্জিত ছিলো না (বেসিকালি মুরিদদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে খাওয়া) ; অথচ পড়ালেখা করে চাকরি বা ব্যবসায় তাদের অরুচি। তালুক বিক্রি বা বন্ধক রেখে হলেও মসজিদের কারুকাজ করানোয় সোয়াব, অথচ জোলার ছেলে ইমামতি করলে তার পিছনে নামাজ পড়তে তাদের জাত যায়। বিনা চিকিৎসায় ঘরের বউকে মরতে দেয়া যায়, তবু পর্দাপ্রথার লঙ্ঘন করা যাবে না, এটাই বিশ্বাস। একইভাবে এসেছে হিন্দু সমাজের কথাও। বর্ণপ্রথা, অস্পৃশ্যতার মতো কুপ্রথাও উঠে এসেছে লেখকের ক্ষুরধার লেখনীতে। কেন্দ্রীয় চরিত্রকে লেখক কুসংস্কারের বেড়াজাল টপকে বের করে এনেছেন, তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে সম্পূর্ণ উপন্যাস। একটি গৌণ চরিত্রের মাধ্যমেই লেখক দেখিয়েছেন, ডাক্তারকে থাকতে হয় ধর্ম বা বর্ণভেদের ঊর্ধ্বে। তবে, নারী চরিত্রগুলি আরেকটু বিকশিত হতে পারতো বলে আমার মনে হয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই রকম সাহসী একটা লেখা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। উপন্যাসের প্রবাহ এবং ভাষাগত দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্নের জায়গাই নেই। অপ্রথা এবং কুপ্রথার বিরুদ্ধে একটি উপন্যাস কতোখানি প্রতিবাদ জানাতে পারে, আবদুল্লাহ উপন্যাসটি তারই প্রমাণ।
'আবদুল্লাহ' উপন্যাসটি মূলত তৎকালীন ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত একটি উপন্যাস। উপন্যাসটি প্রকাশ করা শুরু হয় আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে ১৯১৮ সালে। প্রায় দেড় বছর কাল সময় ধরে কাজী ইমদাদুল হক মুসলিম ভারত পত্রিকায় এই উপন্যাসটির ৩০টি পরিচ্ছেদ প্রকাশ করেন। এরপর আকস্মিকভাবে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপন্যাসটিও অসমাপ্ত থেকে যায়। উপন্যাসটির অবশিষ্ট ১১টি পরিচ্ছেদ তাঁর মৃত্যুর পর খসড়া অবলম্বনে তাঁর বন্ধু কাজী আনারুল কাদির সম্পন্ন করেন।
আবদুল্লাহ্ উপন্যাসটিতে উনিশশতকের বাঙ্গালী মুসলিম সমাজের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে উপন্যাসটির মূল চরিত্র আবদুল্লাহ্ এবং অন্যান্য আনুষাঙ্গিক চরিত্রগুলোর মাধ্যমে। সেই সময়ে যখন হিন্দু সমাজ ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ করে চাকুরী কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন মুসলমান সমাজ নিজেদের ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং জাত্যাভিমানের কারণে সেসব থেকে যেন একশত হাত দূরে সরে থাকে। ইংরেজ সরকারের নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই হোক বা আর যে কোনো কারনেই হোক, তখনকার পশ্চাদপদ মুসলমান সমাজকে অগ্রসর করার জন্য উদারভাবে চাকরীতে তাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছিল। তবে, শত বছরের কুসংস্কার আর নায়েবিপনার অহংবোধের খোলস দ্বারা বেষ্টিত মুসলিম সমাজ সেই খোলস ভেঙ্গে পাশ্চাত্যের ডাকে সাড়া দেওয়াটা সহজ ছিল না। প্রতিটি পদে পদে ছিল বাঁধা, ছিল সন্মানহানীর ভয়, ছিল হিন্দুদের জাত যাবার মতনই ইমানহারা বা কাফের হবার আতঙ্ক। তথাপি গল্পের মূল চরিত্র আবদুল্লাহ্ সহ আরও কিছু পার্শ্ব চরিত্র শত বাঁধা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কাজী ইমদাদুল হক তৎকালীন মুসলমান সমাজে সেই পরিবর্তনেরই ছবি এঁকেছেন এবং ধর্মের লেবাসে যে কুসংস্কার আর গোঁড়ামি আচ্ছন্ন করেছিল সমাজকে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ উপন্যাসটির প্রশংসা করে বলেছেন, 'আবদুল্লাহ্' বইখানি পড়ে আমি খুশী হয়েছি, বিশেষ কারণ এই বই থেকে মুসলমানদের ঘরের কথা জানা গেল।
বাংলা একাডেমি থেকে বইটি প্রকাশের সময় সম্পাদনা করেন-আবুল আহসান চৌধুরী। তিনি তার সম্পাদনা অংশে বলেন--বিষাদ সিন্ধু " আর "আনোয়ারা" বইয়ের পরে বাংলা মুসলিম সাহিত্যের তৃতীয় সেরা বই বলা হয় "আবদুল্লাহ " উপন্যাসটিকে। তৎকালীন নব্য মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজকে নিয়ে লেখা প্রথম সার্থক উপন্যাস এই বইটা। কেন্দ্রীয় চরিত্র আবদুল্লাহ হলেও বইয়ের কাহিনী মুলত তৎকালীন মুসলিম সমাজব্যবস্থা। পীর প্রথার মূলে কুঠারাঘাত করা হয়েছে এই পুস্তকে। আরবি-ফার্সি শিক্ষার পরিবর্তে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে শরীফ আতরাফ প্রসঙ্গ আর হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্ব।
এই উপন্যাসটি বাংলার মুসলিম জনগণকে নিয়ে রচিত প্রথম উপন্যাসগুলির একটি। যে সময়ের কাহিনি, সে সময়ে বাংলার উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত মুসলিম সমাজ ইংরেজ শাসনামলে পিছিয়ে পড়ছিলো, ইংরেজি শিক্ষা ও ইংরেজ শাসকদের প্রতি অবজ্ঞা, দীর্ঘদিনের মুঘল শাসনআমল থেকে চর্চিত আরবি, ফারসির মতো মধ্যপ্রাচ্যের ভাষা নিয়েই শিক্ষা চালিয়ে যেতে আগ্রহী থাকায় এবং আগের মতোই সেই ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ের চাকুরি পাওয়ার আশা ইত্যাদি একদিকে উচ্চবিত্তকে ক্রমাগত পিছিয়ে দিচ্ছিলো সরকারি কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষায়, আর অন্যদিকে গ্রামবাংলার আপামর সাধারণের যে নানা রকমের অশিক্ষা কুশিক্ষা তা গ্রামবাংলার আপামর কৃষি নির্ভর কম-শিক্ষিত জনগণকেই বেঁধে রেখেছিলো।
কলেজের সিলেবাসে থাকা এই উপন্যাস আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে পড়েছিলাম প্রথম এবং প্রায় শতবছর আগের বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের পারিবারিক, সামাজিক মনমানসিকতার প্রতিফলন আকর্ষণীয় লেগেছিলো। নিজে না শিখে, না বুঝতে চেষ্টা করে, নিজের উন্নয়নের চেষ্টা নিজে না করে, অন্যের উপর নির্ভর করে ধর্ম পালন, ধর্মের জ্ঞানেই আবদ্ধ থাকা, জোর জবরদোস্তি অন্যের উপরে নিজের আদর্শ চাপিয়ে দেয়া, পারিবারিক, সামাজিক চিন্তাচেতনার সাথে শতবছর পরে আজকের বাংলাদেশে বাঙা���ি মুসলিম চেতনার এই উপন্যাসের সাথে মিল আছে কিনা মিলিয়ে দেখা বেশ একটা চিন্তার খোরাক হতে পারে।
বিষাদ সিন্ধু " আর "আনোয়ারা" বইয়ের পরে বাংলা মুসলিম সাহিত্যের তৃতীয় সেরা বই বলা হয় "আবদুল্লাহ " উপন্যাসটিকে। তৎকালীন নব্য মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজকে নিয়ে লেখা প্রথম সার্থক উপন্যাস এই বইটা। কেন্দ্রীয় চরিত্র আবদুল্লাহ হলেও বইয়ের কাহিনী মুলত তৎকালীন মুসলিম সমাজব্যবস্থা। পীর প্রথার মূলে কুঠারাঘাত করা হয়েছে এই পুস্তকে। আরবি-ফার্সি শিক্ষার পরিবর্তে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে শরীফ আতরাফ প্রসঙ্গ আর হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্ব।
I read this book in high school when it was part of out Bengali literature syllabus. An extra-ordinary book that depicts Muslim society during the early 20th century.
আবদুল্লাহ্ উপন্যাসটিতে উনিশশতকের বাঙ্গালী মুসলিম সমাজের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে উপন্যাসটির মূল চরিত্র আবদুল্লাহ্ এবং অন্যান্য আনুষাঙ্গিক চরিত্রগুলোর মাধ্যমে। সেই সময়ে যখন হিন্দু সমাজ ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ করে চাকুরী কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন মুসলমান সমাজ নিজেদের ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং জাত্যাভিমানের কারণে সেসব থেকে যেন একশত হাত দূরে সরে থাকে। ইংরেজ সরকারের নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই হোক বা আর যে কোনো কারনেই হোক, তখনকার পশ্চাদপদ মুসলমান সমাজকে অগ্রসর করার জন্য উদারভাবে চাকরীতে তাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছিল। তবে, শত বছরের কুসংস্কার আর নায়েবিপনার অহংবোধের খোলস দ্বারা বেষ্টিত মুসলিম সমাজ সেই খোলস ভেঙ্গে পাশ্চাত্যের ডাকে সাড়া দেওয়াটা সহজ ছিল না। প্রতিটি পদে পদে ছিল বাঁধা, ছিল সন্মানহানীর ভয়, ছিল হিন্দুদের জাত যাবার মতনই ইমানহারা বা কাফের হবার আতঙ্ক। তথাপি গল্পের মূল চরিত্র আবদুল্লাহ্ সহ আরও কিছু পার্শ্ব চরিত্র শত বাঁধা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কাজী ইমদাদুল হক তৎকালীন মুসলমান সমাজে সেই পরিবর্তনেরই ছবি এঁকেছেন এবং ধর্মের লেবাসে যে কুসংস্কার আর গোঁড়ামি আচ্ছন্ন করেছিল সমাজকে তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ উপন্যাসটির প্রশংসা করে বলেছেন, 'আবদুল্লাহ্' বইখানি পড়ে আমি খুশী হয়েছি, বিশেষ কারণ এই বই থেকে মুসলমানদের ঘরের কথা জানা গেল।
তবে মারাত্মক অসুখে মৃত্যুবরণ করার ফলে লেখক ৩০টি অনুচ্ছেদের পর আর লিখে যেতে পারেন নি। উপন্যাসটির খসড়া অবলম্বন করে বাকি ১১টি অনুচ্ছেদ লেখেন তারই এক বন্ধু। ফলে শেষতক উপন্যাসটির চরিত্রগুলো কেমন যেন চুড়ান্ত পরিণতি লাভ করতে পারেনি। তড়িঘড়ি করে যেন দাঁড়ি টানা হয়েছে।
আব্দুল্লাহ কাজী ইমদাদুল হকের একটি প্রভাবশালী উপন্যাস, যেখানে সমাজের ধর্মীয় কুসংস্কার, সংস্কারবাদ এবং সত্য ধর্মের অনুসন্ধান উঠে এসেছে। প্রধান চরিত্র আব্দুল্লাহ শিক্ষিত, প্রগতিশীল মনোভাবাপন্ন একজন ব্যক্তি, যে সমাজের প্রচলিত ভ্রান্ত ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে দাঁ'ড়ায়। উপন্যাসটি বিশেষভাবে ধর্মীয় সচেতনতা ও সামাজিক পরিবর্তনের বার্তা বহন করে, যা তখনকার মুসলিম সমাজে নতুন চিন্তার পথ দেখিয়েছে।
এই উপন্যাসটি যখন পড়ি, তখন অনুমান করতে পারি যে, কেন কাজী ইমদাদুল হক উপন্যাসটি রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। বিস্ময়করভাবে আজ একশো বছর পর এই উপন্যাস আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।