তৎকালীন হিন্দু সমাজের প্রচলিত জঘন্য প্রথার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে রাজা রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠা করেন "ব্রাহ্ম সমাজ"। মূর্তিপুজা অস্বীকার করে এক ব্রহ্মের উপাসনার ডাক দেওয়া হয়। রোধ করা হয় সতীদাহ প্রথা। সমাজে তখন লাগল পরিবর্তনের হাওয়া। সেই হাওয়ায় যেন আরেকটু বেগ দিল ১৭ বছর বয়সী এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান যুবক হেনরী লুইস ভিভিয়ান ডিরোজিও। ১৮২৬ সালে সেই অল্প বয়সেই সে ইংরেজী ও ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিল কলকাতা হিন্দু কলেজে। তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব দ্বারা আকর্ষণ করতে লাগল একঝাঁক মেধাবী শিক্ষার্থীদের। তাদের নিয়ে সে গঠন করল "অ্যাকাডেমিক এসোসিয়েশান"। এখানে ইতিহাস,সংস্কৃতি,দর্শন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিতর্কের আয়োজন করা হত। কোন কিছুর প্রতি অন্ধ বিশ্বাস না করে যুক্তিবিদ্যার সাহায্যে জীবন গড়ার আদর্শ তুলে ধরেছিলেন তাদের মাঝে। গড়ে উঠল তার একদল অনুসারী যারা নিজেদের অভিহিত করল "ডিরোজিয়ান" হিসেবে। "সত্যের জন্য বাঁচা, সত্যের জন্য মরা" - এ ছিল তাদের ব্রত।
তবে প্রাচ্যের সংস্কৃতির প্রতি অবহেলা ও পাশ্চাত্য সংষ্কৃতির অন্ধ অনুকরণের কারণে তারা এমন কিছু কুঅভ্যাসে লিপ্ত হয়েগিয়েছিল যে অনেকে তাদের ভাল চোখে দেখতে পারে নি। যেমন, গোমাংস ভক্ষণ, মদ্যপান, বারবণিতা গমণ ইত্যাদি। তারা হয়ে উঠল উচ্ছৃঙ্খল ও মা বাবার অবাধ্য সন্তান। যার ফলে তারা শিক্ষিত বাঙ্গালীর সমর্থন আদায় করতে পারেনি। যেভাবে হঠাৎ তাদের আগমন হয়েছিল, সেরকম সহসাই তাদের পরিসমাপ্তি ঘটে।
একেই কি বলে সভ্যতা প্রহসনে মাইকেল মধুসূদন দত্ত সেই ইয়ং বেঙ্গল সমাজের ছবি তুলে ধরেছেন। মধুসূদন নিজেও যদিও বেশ মদ্যপ ছিলেন তবুও তিনি সেটাকে সভ্য হিসেবে গণ্য করেননি। তাই তিনি ধীক্কার জানিয়েছেন - একেই কি বলে সভ্যতা?
মধুসূদন সেই রক্ষণশীল সমাজকেও ছাড় দেননি যারা বাহিরে সাধুর বেশ ধরে থাকেন কিন্তু অন্তরে লুকায়িত থাকে কপটতা,ভন্ডামী। তাদের মুখোশও উন্মোচন করে দিয়েছেন পরবর্তি প্রহসন - বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ তে। একদম শেষের কবিতাটিতে সেটাই যেন ফুঁটে উঠেছে -
বাইরে ছিল সাধুর আকার,
মনটা কিন্তু ধর্ম্ম ধোয়া।
পুণ্য খাতায় জমা শূন্য,
ভন্ডামিতে চারটি পোয়া।।
শিক্ষা দিলে কিলের চোটে,
হাড় গুঁড়িয়ে খোয়ের মোয়া।
যেমন কর্ম্ম ফললো ধর্ম্ম,
বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁয়া।।