Jump to ratings and reviews
Rate this book

রামগোলাম

Rate this book
হরিশংকর জলদাস তাঁর আগের তিনটি উপন্যাসে জেলেদের সমাজজীবন আর পতিতাদের ক্লেদময় জীবনের কাহিনি শুনিয়েছেন। রামগোলাম হরিজনদের জীবনভাষ্য। ব্রহ্মা নাকি শুধু বিষ্ঠা সাফ করানোর জন্য নিজের শরীরের ময়লা থেকে মহীথর সৃষ্টি করেছিলেন। সেই সৃষ্টিকাল থেকে আজ পর্যন্ত তারা অচ্ছুৎ। ময়লা পরিষ্কার করার জন্য কানপুর, এলাহাবাদ প্রভৃতি জায়গা থেকে এই সম্প্রদায়কে মোগল নবাব আর ইংরেজরা এ দেশে এনেছিল। নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল তাদের। কিন্তু এখন তাদের কোণঠাসা অবস্থা। পর্যাপ্ত থাকার ঘর নেই, পানি নেই; কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তাদের ঘর, বিদায় করে দেওয়া হচ্ছে চাকরি থেকে; তাদের প্রথা-সংস্কার-ধর্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। প্রকাশ্যে তাদের স্পর্শ করতে বাধে, কিন্তু গোপনে ভোগ করতে দ্বিধা নেই। মেথরদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় মিশে দলিত, অধিকারবঞ্চিত এই সম্প্রদায়কে নিয়ে হরিশংকর এমন একটি উপন্যাস লিখেছেন, যেখানে মহাভারত, মনুসংহিতা, পুরাণকথা আর বর্তমানের মেথরজীবন একাকার হয়ে উঠেছে। বঞ্চনা, প্রেম, যৌনতা-মেথরসমাজের আদ্যোপান্ত ইতিহাস যেন রামগোলাম।

192 pages, Hardcover

First published February 1, 2012

2 people are currently reading
93 people want to read

About the author

Harishankar Jaladas

64 books97 followers
Harishankar is a promising Bangladeshi author. The most significant point to notice is that all the four novels produced from Harishankar's pen sketch the life of the downtrodden, some of whom are from among fisherfolks, some from among prostitutes and some others are the 'harijons' or 'methors'.

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
13 (14%)
4 stars
30 (32%)
3 stars
35 (38%)
2 stars
12 (13%)
1 star
1 (1%)
Displaying 1 - 23 of 23 reviews
Profile Image for DEHAN.
278 reviews83 followers
March 16, 2019
কাকদের উপর চোখ রেখে গুরুচরণ বললো
"কাকদের জীবন আর আমাদের জীবন সমান"
-মানে? তোমার কথা বুঝতে পারছি না জ্যাঠা। খোলসা করে বলো।
- আমরা আর কাকরা সমান। সকাল হবার সঙ্গে সঙ্গে ওরা ময়লা- আবর্জনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর সকাল হলে আমরা কি করি? কাঁটা, টুকরি,বেলচা কোদাল নিয়ে ওই আবর্জনা সাগফাইয়ে লেগে যাই। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা গু খায় কাকরা। আর আমরা সেই গু মাথায়, কাঁধে করে ছিপাতলির কুয়ার দিকে রওনা দেই৷
কাকদের সাথে আমাদের পার্থক্য আছে কি কোন?
- তুমি ঠিক বলেছ জ্যাঠা। এইরকম আমি ভাবি নি কোনোদিন। তাইলে এক অর্থে আমরা কাউয়ার জাত।
Profile Image for Imtiaz Emu.
60 reviews33 followers
July 3, 2019
উপন্যাস না বলে 'কলাম' বলা ভালো। পুরো উপন্যাস জুড়ে হরিজন বা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের মেথরদের দুর্দশার কাহিনীর বর্ণনা করা হয়েছে। তাহলে কেন কলাম বলছি? কারণ উপন্যাসে কোন কাহিনী নেই। যাও আছে, সেটা হচ্ছে এই দুর্দশা থেকে মুক্তির একটি ছোট্ট প্রয়াস। সুতরাং এই ক্ষুদ্র প্রয়াসের সাপেক্ষে এটাকে উপন্যাস বলতে আমি নারাজ। অনেক অযাচিত ক্যারেক্টার, বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং খাপছাড়া সময়কাল আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে লেখক হয়তো তাড়াহুড়ো করেছেন। রামগোলাম এখানকার মূল চরিত্র হলেও তার আবির্ভাব ঘটেছে উপন্যাসের মাঝে, যেখানে প্রথম দিককার কাহিনী রামগোলামের দাদু গুরুচরণের। রামগোলামের উপরে উঠে আসার কাহিনীও বেশ খাপছাড়া। খুব দ্রুত প্রসঙ্গ পরিবর্তন এবং সময়কালের ব্যবধান রামগোলাম চরিত্রটাকে পাঠকের কাছে ফুটিয়ে তোলা হয়নি ঠিকমতো।
শেষাংশের বিষয়টা ভালো। খুব দ্রুততার সাথে শেষ করেননি লেখক। পুরো লেখা জুড়ে যেখানেই যাবেন সেখানেই দেখবেন মেথরদের প্রতি অবিচার অত্যাচার কিংবা তাদের হাহাকারের চিত্র। একটা সমাজে কেবল দুঃখই থাকে না, সুখও থাকে। লেখক যা সুখ দেখিয়েছেন তা যৎসামান্য।
প্রতিটা উপন্যাসেরই কিছু না কিছু সারকথা বা মুখ্য পংক্তি থাকে। দুঃখিত কিন্তু আমি গড়পড়তা সাধারণ লেখনীর বাইরে এখানে কিছু পাই নি।
Profile Image for Tahjiba Adrita.
103 reviews34 followers
September 3, 2017
দহনকাল, জলপুত্র এই বই দুইটি পড়ার পর মনে হয়েছিল হরিশংকর জলদাস হয়ত একটু ওভাররেটেড লেখক হয়ে গেছেন, হয়ত তার পারিবারিক স্ট্রাগল, অনেক কষ্ট করে আজ এতদূর আসা,নিম্নশ্রেণিদের নিয়ে কথা বলা এসব কারনেই তার বই গুলো অনেক বেশী জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, কিন্তু লেখার ভিতরকার রসদ গুলো কেমন জানি ফিকে, টানছিল না। কিন্তু তার "রামগোলাম" বইটা এক কথায় অসাধারণ লেগেছে,এক বসায় শেষ করার মত বই। মাঝে মাঝে কিছু কিছু ব্যাপার একটু অহেতুক মনে হয়েছে, মনে হয়েছে সেই টপিক গুলো না এনে হরিজন, মেথর দের ইতিহাস, তাদের সংগ্রাম গুলো আরো একটু ভালো করে তুলে আনা যেত।অনেক চরিত্রের সংমিশ্রণ ছিল কিন্তু প্রতিটা চরিত্রই ছিল একে অপরের সাথে সংযুক্ত। কোন চরিত্রকেই ওভার রেটেড মনে হয়নি। গল্পের প্রয়োজনেই প্রতিটা চরিত্রের জন্ম। "সবার উপরে মানুষ সত্য" এই কথা টা যে আসলেই একটা শুধু কথার কথা বইটি পড়ে আবার তা মনে হল।বই টি একই সাথে শিক্ষণীয়, আবার বই এর কিছু কিছু অংশ বিনোদনও দেয়। সহজভাষায় সুপাঠ্য একটি বই :)
Profile Image for Mahiya Tabassum.
24 reviews71 followers
May 14, 2020
সময়ের ধারাবাহিকতায় একের পর এক সাহিত্য রচিত হলেও এপার কিংবা ওপারের কোন লেখকের লেখাতেই সমাজের কতিপয় নিচু স্তরের মানবগোষ্ঠীর বিশেষ বর্ণনা চোখে পড়ে নি আমার, তারা হলেন মেথর, সুইপার, ডোম- শ্রেণি। এরা 'হরিজন, দলিত' নামেও পরিচিত। আমাদের সমাজে দলিত-হরিজনরা অস্পৃশ্য, অচ্ছুত। এদের স্পর্শে জাত যাওয়ার ভয়ে বোধ করি উঁচু জাতের লেখকেরা কদাচিৎ তাদের জীবন সম্পর্কে জানতেন বা জানার আগ্রহ বোধ করতেন।

'রামগোলাম' বইটিতে আবর্জনাকর্মীদের জীবনব্যবস্থার সরল, সাধারণ বর্ণনা মেলে।
লেখার ধরণ, সাহিত্য, প্লট, ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদি বিবেচনায় বইটিকে মানসম্মত উপন্যাস বলা যায় না।
তবে হরিজনদের জীবনভাষ্য হিসেবে হরিশংকর জলদাস প্রশংসার দাবিদার।
Profile Image for শাবেকুন  শামস্.
25 reviews6 followers
January 19, 2026
হরিশংকর জলদাসকে আমি সর্বপ্রথম চিনেছি তার কসবি উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে। জলনির্ভর মানুষদের নিয়ে উনার মতো আর কেউ অত নিঁখুতভাবে কোনো কিছু লিখতে পারেননি যতটা উনি পেরেছেন। তাই এবারও যেমনটা ভেবেছিলাম সেরকমই রামগোলাম।

চট্টগ্রাম মেথরপট্টির কাহিনী রামগোলাম। মেথর'রা সমাজে সবথেকে নিচু জাত। বলা চলে তাদের কোনো জাতই নেই। তারা মানুষ নন কারণ তারা মেথর। তারা অচ্ছুত,অস্পৃশ্য। তাদের দিনের আলোয় ছুলে জাত চলে যায় কিন্তু রাতের আধারে ভোগ করা যায়।

এমনকি হিন্দু পুরাণমতে দেবতা'রা স্বয়ং ব্রহ্মাও তার গায়ের ময়লা থেকে সৃষ্টি করেছেন মহীথরদের। অমৃতের পুত্র সবাই হলেও মেথর'রা নন।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলি নদীর তীর ঘেষে পাঁচতলা পাঁচতলা দু'টো বিল্ডিং বরাদ্দ করে দিয়েছেন মেথরদের জন্য। সেখানের এক পট্টি হরিজনের সর্দারের নাতি রামগোলাম। সর্দার এমন নাম রেখেছেন যাতে তার নাতি'কে হিন্দু কিংবা মুসলমান কেউ অস্পৃশ্য করতে না পারে।

নানা প্রতিকূলতার মধ্যে রামগোলাম মেট্রিক পাশ দিয়ে ফেললো। হরিজন সমাজের প্রথম শিক্ষিত। নিজেদের অধিকার সর্ম্পকে সচেতন। কিন্তু করপোরেশনের মাথায় বসা মানুষদের নানা ষড়যন্ত্র,নানা প্রতিবন্ধকতায় মেথরদের ধর্ম আর কর্ম দুটোই যেতে চলেছে।

কী করে মুক্তি মিলবে তাদের? আদৌও কী মুক্তি মিলবে(!)
Profile Image for Ësrât .
516 reviews85 followers
February 1, 2020
মুগ্ধতা,প্রত‍্যাশা,আর হতাশার পারদমাত্রা মাঝামাঝি অবস্থানেই থাকবে বইটা
Profile Image for রেজওয়ান আহমেদ.
12 reviews9 followers
July 23, 2021
'রামগোলাম' - শুচিধরার কারিগর

মানবিক সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কথাসাহিত্য লিখতে গিয়ে নিম্নবর্গের মানুষের জীবন ও বৃত্তিকে উপজীব্য করেছেন হরিশংকর জলদাস। মেথর সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনের আখ্যান 'রামগোলাম' নিয়ে কিছু লেখার অভিপ্রায়ে বসা। অপরাপর লেখায় শুরু থেকেই সাম্যের গান গাইতে দেখা যায় না ঔপন্যাসিককে। সেদিক দিয়ে 'রামগোলাম' স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। শুরুতেই রামগোলামের নামকরণের প্রেক্ষিতে ধর্মনিরপেক্ষতার একটা ছাপ দেখা যায়।

দাদা-নাতির সুসম্পর্ক দেখানোর একটা প্রবণতা লক্ষ্যণীয় হরিশংকর জলদাসের লেখায়। রামগোলাম গুরুচরণকে শুরুর দিকে ভয় পেলেও ধীরে ধীরে সহজ হয় ��ম্পর্ক। 'বাতাসে বইঠার শব্দ' উপন্যাসের চন্দ্রনাথ হালদারের উল্লেখ করা যায়। সুব্রতর সাথে তাঁর একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রচনা করেন ঔপন্যাসিক। বাঙলা কথাসাহিত্যে পূর্বপুরুষ-উত্তরাধিকারের এরকম স্বস্তিকর, সুখকর বন্ধনের দৃষ্টান্ত বিরল। মঈনুল আহসান সাবেরের একটা প্রতীকী গল্পে ('তিকি-লিকির গল্প') এমন বন্ধনের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। এছাড়া পল্লীকবির বিখ্যাত 'কবর' কবিতার কথক-শ্রোতা এমন বন্ধনের উদাহরণ।

মেথরদের জীবনের বাস্তবতা তাদেরকে সমাজের আর দশটা মানুষের প্রাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রাখে। বলাবাহুল্য এই বাস্তবতা মোটাদাগে সমাজের ওপরতলার মানুষের তৈরি করে দেওয়া। সবচে বেশি করে চোখে পড়ে শিক্ষার বিষয়টি।

এ প্রসঙ্গে হরিশংকর জলদাসের সৃষ্ট মা চরিত্রের বুনট চোখে পড়বার মতো। তাঁর লেখায় মায়েরা সন্তানের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে সচেতন। তাই এরা নিজেরা যেখানে, যেমনই থাকুক, সন্তানকে শিক্ষিত করতে বদ্ধপরিকর। চাঁপারানী শিউচরণের সাথে রীতিমতো দাম্পত্য-কলহের আয়োজন করে রামগোলামের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। 'জলপুত্র' অথবা 'কসবি' উপন্যাসে অবশ্য ভুবনেশ্বরী অথবা মোহিনীদের কারো পরামর্শের পরোয়া করতে হয়নি সন্তানকে শিক্ষিত করার ব্যাপারে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শওকত ওসমান দুজনেই মা চরিত্র লিখেছেন আলাদাভাবে 'জননী' নামের উপন্যাসে। সেই মায়েরাও সন্তানকে শিক্ষিত করার ব্যাপারে সচেতন।

বাস্তবতা অবশ্য ভোগায় মেথরদের ঠিকই। কী সেই বাস্তবতা? ঘুরেফিরে সেই সামাজিক বঞ্চনার চর্বিতচর্বন। রামগোলামদের জন্য বিশেষায়িত স্কুলটিতে শেষ পর্যন্ত তাদেরই প্রায় জায়গা হয় না। এরকম একটা পরিবেশ থেকে রামগোলাম একা এসএসসি পাস করে শেষ পর্যন্ত। বাকিদের বিদ্যের দৌড় অল্পতেই শেষ। সেই স্কুলের সব শিক্ষকও মেথরবান্ধব নন। যাঁরাও বা এদের নিয়ে ভাবে, তাদেরও ক্ষেত্রবিশেষে চুপ থাকতে হয় প্রয়োজনীয় সমর্থনের অভাবে। রামগোলামের আখ্যানে স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা এবং কুতুবুদ্দীন মাস্টারই কেবল মেথরদের নিয়ে ভাবেন। 'জলপুত্র' উপন্যাসে দেখা যায় সন্দ্বীপ থেকে দীনদয়াল মাস্টার জেলেদের সন্তানদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে আসে‌।

স্কুলের সকল শিক্ষকের মধ্যে সমান আন্তরিকতা আর ভালোবাসা মেথরদের জন্য ছিল না। কারো কারো ব্যক্তিগত সংকটও বড়ো হয়ে যে ওঠেনি এমন নয়। হরিমোহন জলদাস চরিত্রটি শিক্ষকের। তার শয়নে-স্বপনে একটাই ভাবনা। বলা ভালো দুর্ভাবনা - তার পূর্বপুরুষের পদবিটি। 'জলদাস' পদবিটি তাকে শিক্ষকের মর্যাদা থেকে খর্ব করে রাখে। সমাজের এই বৈষম্যমূলক আচরণ তাকে ভাবায়। ভাবাতে ভাবাতে রাগিয়েও তোলে বটে। সমাজ থেকে পরিবার, কোথাও যখন পদবি বিব্রত করতে ছাড়ে না, তখন রাগ না হওয়া কি স্বাভাবিক? এই রাগ-ক্রোধ হরিশংকর জলদাসের জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসল হয়ে কথাসাহিত্যে ফলেছে। কখনো বিয়েতে কখনো বা আবার প্রেমে ('কসবি' - তপন-কৃষ্ণার প্রেম)। এমনকি অর্বাচীন জলদাসসন্তান 'সেন' হয়ে যেতে পর্যন্ত ভাবে না। 'রঙ্গশালা' উপন্যাসের ছদ্মবেশী খুনির অভিজ্ঞতা তাই বলে।

জাতের ক্ষুদ্রতায় চায়ের দোকানে পর্যন্ত অপদস্থ হবার কাহিনি রয়েছে 'রামগোলাম' উপন্যাসে। বলাবাহুল্য, এও ঔপন্যাসিকের জীবন ঘষে লেখা সত্য। পল্লীকবির উপন্যাস 'বোবা কাহিনী'তে দেখা যায় ফরিদপুর বাজারের মিষ্টান্নের দোকানে ছুৎমার্গের সংস্কার মানতে গিয়ে বছিরকে ছোঁয়া বাঁচিয়ে সেবা করছে দোকানি। রামগোলাম স্বয়ং, সেও কি এর বাইরে? রিকশাচালকের অবহেলার সেইটুকু গল্পাংশ এমন -

ডাক্তার তপনলাল ভৌমিকের চেম্বারের সামনে রিকশা থেকে নেমে রামগোলাম অন্যমনস্কভাবে একটা দশ টাকার নোট এগিয়ে দিল রিকশাওয়ালার দিকে। রিকশাওয়ালা বলল, 'বিশ টেকা দেন স্যার।'
রামগোলাম এবার রিকশাওয়ালার দিকে ভালো করে তাকাল। হাঁটুনাম লুঙ্গি পরা রিকশাওয়ালাটির গায়ে ছেঁড়া একটি শার্ট। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। দু চোখের কোনায় রাতের পিচুটি লেগে আছে। দারিদ্র্য তার পোশাকে-আশাকে, সারা গায়ে। ভেতরে চাগিয়ে ওঠা রাগ দমন করে শান্ত কণ্ঠে রামগোলাম বলল, 'ছয় টাকার ভাড়া দশ টাকা দিয়েছি তারপরও আপনি চাইছেন বিশ টাকা!'
'এখন ঈদের মউসুম স্যার। বকশিশ দেবেন না?' লোভী চোখে বলল রিকশাওয়ালা।
'আমি তো মুসলমান না।'
'তয়, আপনি হিন্দু তো? হিন্দুদেরও পূজা চইলছে এখন। দেন স্যার দেন, বিশ টেকা দেন।'
নিবিড় কষ্টের মধ্যেও কৌতুক ঝিলিক দিয়ে উঠল রামগোলামের মনে। নির্বিকার কণ্ঠে বলল, 'আমি হিন্দুও না।'
'তয়, আপনি কি?'
'আমি মেথর।'
চমকে রামগোলামের মুখের দিকে তাকাল রিকশাওয়ালা। তার চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে সে রামগোলামের কথা বিশ্বাস করছে না। করুণ মুখে বলল, 'স্যার, না দিলে না দিবেন, মিছা কথা কইতাছেন ক্যান?'
রামগোলাম স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো, 'সত্যি বলছি, আমি মুসলমান নই, হিন্দুও না, এমনকি বৌদ্ধ-খ্রিস্টানও না। আমি মেথর।'
রিকশাওয়ালার অবিশ্বাসী মুখাবয়বে ঘৃণার ঘন আস্তর পড়তে শুরু করল। পিচুটিপড়া চোখে তিরস্কারের ছায়া। ধীরে ধীরে ডান হাতটা এগিয়ে দিলো রামগোলামের দিকে। বুড়ো আঙুল আর তর্জনীতে একত্র করে ছোঁয়া বাঁচিয়ে নোটটি নিল রিকশাওয়ালা। রামগোলাম সবকিছু দেখল, বুঝল। কিন্তু কিছু বলার সময় এখন নয়। তার হাতে সময় কম। যত শিগগির সম্ভব ডাক্তারবাবুকে নিয়ে যেতে হবে, বাবাঠাকুরকে বাঁচাতে হবে। দ্রুত পায়ে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে গেল রামগোলাম।
রামগোলাম চেম্বারে ঢুকে গেলে রিক্সাওয়ালা ধীরে ধীরে সিটটি তুলল। সিটের নিচ থেকে নোংরা এক টুকরা কাপড় বের করল। তারপর যে সিটের ওপর রামগোলাম বসেছিল, সেই সিটটি দীর্ঘক্ষণ ধরে ঘষে ঘষে মুছতে থাকল।

এ ধরণের ডিটেইলিং হরিশংকর জলদাসকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় সাহিত্যরস সৃষ্টির ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গল্পাংশ থেকে ঘুরে আসি -

আঁধার থাকতে থাকতেই বেরিয়ে পড়ে গুরুচরণ আর শিউচরণ। সূর্যের আলো ফোটার আগেই কাজে যোগ দেওয়ার নিয়ম তাদের। গুরুচরণ ড্রাইভার, তুফান মেইলের চালক। তুফান মেইল টাট্টি টানার ট্রাক। চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের দু'ধরনের ট্রাক আছে। আবর্জনা টানার আর গু টানার। রাস্তার আবর্জনা টানার জন্য লক্কড়ঝক্কড় তিনটি ট্রাক। ভোর-সকালে মেথররা অলিগলি থেকে ট্রলিতে করে আবর্জনা এনে এনে বড় রাস্তার পাশে রাখে, সেখান থেকে ওগুলো ট্রাকে তুলে নেয়া হয়; নিয়ে যাওয়া হয় দূরের হালিশহরের সমুদ্রের পাড়ে, বহদ্দারহাটের খানাখন্দে। শিউচরণ ওই তিনটি ট্রাকের একটিতে কাজ করে। তার কাজ রাস্তা থেকে টুকরিতে করে ময়লা-আবর্জনা ট্রাকে তোলা আর গন্তব্যে পৌঁছে আবর্জনাগুলোকে ট্রাক থেকে নামিয়ে দেয়া। এই কাজ করতে প্রথম প্রথম খুব ঘেন্না লাগতো শিউচরণের। রাস্তার পাশ থেকে আবর্জনা টুকরিতে ভরে সে যখন মাথায় বা ঘাড়ে নিয়ে ট্রাকের দিকে রওনা দিত তখন কখনো ঝরঝর কখনো টুপটাপ করে ঝরে পড়া নোংরা জল তার সমস্ত শরীর ভিজিয়ে দিত। অসহ্য দুর্গন্ধ। প্রথম প্রথম বমি আসতে চাইত তার। একদিন তো ঘাড় থেকে আবর্জনার টুকরি ফেলে গলগল করে বমি করে দিল শিউচরণ। বাপ বলেছিল, 'প্রথম প্রথম ওই রকম হবে বাপজি। তারপর ঠিক হয়ে যাবে। না সইলেও উপায় নেই। আমাদের বাঁচার অন্য কোনো পথ নেই। গু-মুত টেনেই আমাদের জীবন পার হয়।'

এসব কথা পড়তে গিয়ে আমি যেন চোখে দেখলাম ঝরঝর-টুপটাপ নোংরা জলপতন। শিউচরণ কেমন করে ঘাড় থেকে আবর্জনার টুকরি ফেলে গলগল করে বমি করে দিল, তার প্রত্যেকটা শব্দতরঙ্গ বুঝি আমার কানে এলো।

হরিশংকর জলদাস একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এ অংশে পাঠকের নাকে দুর্গন্ধ ���ৌঁছে দিতে সক্ষম হওয়াটাই তাঁর সার্থকতা।

গু-মুত টেনেই আমাদের জীবন পার হয় - কথাটির প্রসঙ্গ আসলে রামগোলামদের ইতিহাস এবং বর্তমানকে সমভাবেতুলে ধরতে উদ্যত। রামগোলামরা শুধু এ কাজের জন্য এতদাঞ্চলে এসেছে। মেথরদের বৃত্তিটি অন্য কেউ নেবারও ছিল না সে সময়। কিন্তু পরে বিশেষত স্বাধীনতার পরে সংবিধানের দোহাই দিয়ে এ পেশায় অন্যদের নিযুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে অনুমিত সমস্যার মুখেই পড়ে মেথররা। কারণ -

১. তারা শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ায় অপরাপর পেশার উপযুক্ত নয় এবং
২. হাতেকলমে অন্য কোনো বৃত্তি শিখবার সুযোগও, ছুৎমার্গের প্রভাবে তাদের হয়ে ওঠে না।

দ্বিতীয় কারণটির প্রসঙ্গে মনুসংহিতার যোগ টানা হয় উপন্যাসে। মনুর কঠিন সমালোচনাও হয় এতে। অবশ্য মনু তখনকার উচ্চবংশীয় লোকেদের দ্বারা যে প্রভাবিত ছিলেন সে কথাও হরিশংকর জলদাসের লেখায় এসেছে।

চৌষট্টির আবুল। এটা একটা ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে জহির রায়হানের মুনশিয়ানায়। বউ পেটানো স্বামী কি আজকের সমাজে নেই? তাদের মধ্যে কি চৌষট্টির আবুল বাস করছে না গোপনে-প্রকাশ্যে?

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষিত উচ্চপদস্থ পুরুষের মধ্যে একটা সম্ভাবনাময় নারী নির্যাতকের অস্তিত্ব মুখটিপে হাসে। তারাও মদ্যপ হয়। কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের 'চোরাগলি' উপন্যাসের একটা চরিত্রে এমন স্খলিত রূপ দেখানো হয়েছে।

'রামগোলাম' উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ক্যামিও চরিত্র কুতুবুদ্দীনের হাতে শিক্ষিত উচ্চপদস্থ পুরুষের মুখোশ খুলে দেবার কাজটি করেছেন হরিশংকর জলদাস। কৌশল ছিল ক্ষোভ-রাগমিশ্রিত দুঃখের বহিঃপ্রকাশ।

'কসবি' উপন্যাসে আবার একই কাজ সরল গল্পবিবরণে করেছেন হরিশংকর জলদাস নিজেই। কিন্তু তাতে উঠে এসেছে উচ্চপদস্থটির চরিত্রের অন্ধকার অতৃপ্তির দিকটি। আগেই বলেছি 'চোরাগলি' উপন্যাসের কথা। ইথা তার ফুফাকে আবিস্কার করে মাদকসেবী এবং পণ্যস্ত্রীদের গোপন ডেরায়।

নরসিংদীর কৃষ্ণাদের চট্টগ্রাম সদরঘাটের দেবযানী হবার আখ্যানে যে রেস্টুরেন্টের উল্লেখ ছিল, সেটি 'রামগোলাম' উপন্যাসে রশিদ সওদাগর চালাচ্ছে। মাগির দালালেরা 'কসবি' উপন্যাসে যেমন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের, 'রামগোলাম' তাদের পার্শ্বচরিত্রের চাইতেও কম গুরুত্ব বোধকরি। তবু, 'রামগোলাম' আর 'কসবি' যে জায়গাটিতে মিল, সেটি হচ্ছে জাত্যাভিমান।

আমাদের জাত্যাভিমানের স্বরূপ বলছে - মেথরকে ছুঁলে গোসল করতে হবে। তাই ধরা যাবে না! ছোঁয়া যাবে না! অবশ্য বউ বাড়িতে না থাকলে ভিন্ন কথা।

মেথরদের ঘরোয়া জীবনে থাকা-খাওয়ার কষ্ট, শোয়া-ঘুমানোর কষ্ট। স্থানসংকুলান হয়ে ওঠে না যৌথ পরিবারগুলোর। দুটো ঘরে কষ্টেসৃষ্টে মাথা গুঁজতে হয় কোনোমতে। ভেঙে একক পরিবার হিসেবে আলাদা হবার সুযোগও নেই। এরা নির্দিষ্ট কলোনির বাইরে থাকার সুযোগ পায় না। যদিও বা কেউ পদবি বদলে নিয়ে ঘরভাড়া নিতে যায়, ধরা পড়লে জোটে অপমান, অবহেলা, গালাগলি, ভর্ৎসনা। এই অনিশ্চিত মানবেতর জীবনে ভোর-সকালে উঠে যারা কাজে যায়, বেঁচে থাকলে তাদেরই জীবনে আবার আসে রাত। চর্যাপদের একটি পদে কুক্কুরীপা লিখেছেন -

"রাতি ভইলে কামরু জাঅ।।ধ্রু।।"

গুরুচরণদের দাম্পত্যজীবনের রাতগুলো প্রজাপতির অপর পক্ষকে বোঝার পরীক্ষা দিয়েই কাটিয়ে দিতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে কামনার খাণ্ডবদাহ মনের ভেতর চেপে রেখেই। খাটের অনুকার ধ্বনি যদি এক ঘর ছাড়িয়ে অন্য ঘরে পৌঁছায়, তবে একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড হয়ে যেতে পারে। তাই রান্নাঘরে থাকা বাপমা অপেক্ষায় থাকে শোবার ঘরে ছেলে আর ছেলেবউ কখন ঘুমুবে। উল্টোটাও ঘটা অসম্ভব নয়। বোঝাবুঝির এই পৌনঃপুনিকতায়ই নিহিত মেথরদের দাম্পত্যপ্রেমের গল্প। দাম্পত্যপ্রেমের ছিটেফোঁটা হরিশংকর জলদাস 'জলপুত্র' উপন্যাসেও দেখিয়েছেন। তবে মোটাদাগে বাঙলা কথাসাহিত্যে দাম্পত্যপ্রেম দেখাতে সক্ষম হয়েছেন জসীমউদ‌্দীন। 'বোবা কাহিনী' উপন্যাসে আজাহের আর আয়েসা এক্ষেত্রে জ্বলন্ত উদাহরণ।

তৌকির আহমেদের সিনেমা 'ফাগুন হাওয়ায়'। মেথর চরিত্রের মূল উত্তর প্রদেশ, বিহারের মতো জায়গায় দেখানো হয়েছে সিনেমায় ভাষার প্রভাবে। ভাষাগত দিক দিয়ে 'রামগোলাম'-এর স্বাতন্ত্র্য বোধকরি কিছু কমই রক্ষিত হয়েছে। অথচ ভাষাগত বৈচিত্র্যের বিমূর্ত উদাহরণ সৃষ্টির যথেষ্ট সুযোগ ছিল এ উপন্যাসের। কিছু কিছু জায়গায় অশিষ্ট গালিশব্দ ছাড়া ভাষিক বিশেষত্ব চোখে পড়েনি। বিশেষত হিন্দি-উর্দু ভাষার প্রভাব এ উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীর ভাষায় পাওয়া যায় না। সবচেয়ে বেশি চোখে লাগে প্রমিত বাঙলায় কথোপকথন। প্রসঙ্গত 'কসবি' উপন্যাসের চম্পা চরিত্রের ভাষায় যে বৈচিত্র্য পাওয়া যায়, সে ধরণের না হলেও কাছাকাছি ধরণের ভাষিক ধ্বনিবৈচিত্র্য রাখা যেতে পারত 'রামগোলাম' উপন্যাসেও।

পাকিস্তান আমলেও মেথরদের কদর ছিল। আগেই বলেছি স্বাধীনতার পর তা কমতে থাকে। পেশাহীন হয়ে যাবার মুখে শ্রেণিসংগ্রামের সূচনা। উপন্যাসে রামগোলামকে দেখানো হয়েছে নেতৃস্থানীয় শক্তিরূপে। কার্তিক চরিত্রটি সহায়তা করেছে যথেষ্ট সে আন্দোলনে বেগ দিতে। এই চরিত্রবিন্যাস 'জলপুত্র' উপন্যাসের গঙ্গা-জয়ন্ত জুটির কথা মনে করিয়ে দেয়।

আমাদের সমাজের প্রচলিত ধারায় অন্যায়ের প্রতিবাদকারীকে স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। সে নিগড় থেকে গঙ্গা, কৈলাসদের মতো মুক্তি পায়নি রামগোলাম বা কার্তিকরাও। রামগোলাম যদিও ১৪ বছর জেল খেটে বের হয়। ততদিনে কিছুই আর আগের মতো নেই।

🅒 রেজওয়ান আহমেদ,
শিক্ষার্থী,
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য (৬ষ্ঠ আবর্তন),
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
This entire review has been hidden because of spoilers.
Profile Image for Jannatul Firdous.
89 reviews178 followers
March 6, 2024
হরিশংকর জলদাসকে আমি সবচেয়ে বেশী পছন্দ করি ইউনিক প্লটের জন্য। তার প্রতিটা উপন্যাসের প্লট গতানুগতিক থেকে আলাদা। এই উপন্যাসটা যেন সে সবকে ছাড়িয়ে গেলো। আমার মনে হয় না এবছরে আমি এরচেয়ে ইউনিক প্লটের আর কোনো ব‌ই পড়বো বলে।

যদিও গল্পটা সমাজের এমন শ্রেনীর মানুষের যারা আমাদের চোখের সামনেই থাকে। তবুও তাদের ঘরের ভেতর,মনের ভেতর ঢুকে তাদের গল্প,তাদের অসহায়ত্ব এইভাবে আর কাউকে তুলে ধরতে আমি অন্তত দেখিনি।

গল্পটা চট্টগ্রামের মেথরপট্টির। কর্ণফুলী নদীর কোল ঘেঁষে সবচেয়ে পতিত সবচেয়ে বঞ্চিত জায়গাটায় দুইটা পাঁচতলা বিল্ডিং। একটার নাম হরিজন পল্লী। এই হরিজন পল্লীর সর্দার গুরুচরন তার নাতির নাম রেখেছেন রামগোলাম। হিন্দুর রাম আর মুসলিমের গোলামকে মিলিত করে। যাতে হিন্দু মুসলিম কেউ‌ই তার নাতিকে মেথর বলে ঘৃণা না করে।

নামেই মেথররা হিন্দু। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করে হিন্দুরাই। আর সবাইকে মানুষ মানলেও মেথরদের মানুষ মানে না তারা। একটা কুকুরকে দেখলেও যেটুকু মায়া জাগে সে মায়া মেথরদের দেখলে জাগে না। এমনকি পুরাণমতে বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ব্রক্ষ্মা যিনি মেথরদের সৃষ্টি করেছিলেন শরীরের ময়লা থেকে তার সকল সৃষ্টি অমৃতের পুত্র হলেও মেথরেরা অমৃতের পুত্রের সম্মান‌ও পায়নি। তারা সম্মান পায়নি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু,যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত বা চিত্তরঞ্জন দাশের মতো মানুষের কাছেও। কেন? কারণ তারা দেশবন্ধু,মেথরবন্ধু নন। কারণ,মেথর তো মানুষ নয় কারো চোখেই!

সেই মেথরদের মধ্যে একটা ছেলে রামগোলাম এস‌এসসি পাশ দিয়ে ফেললো। শক্ত হাতে বহন করতে শুরু করলো মেথরদের সুখ দুঃখের কঠিন ভার। এরমধ্যে নতুন আইন জারি হয়েছে,যে কেউ এখন এসব কাজ করতে পারবে। শুধু মেথরদের জন্য এই চাকরি নির্দিষ্ট থাকবে না। আর চাকরি না থাকলে ঘর‌ও থাকবে না তাদের। তারা যে অন্য কোথাও চাকরি করবে তাও‌ সম্ভব না। মেথরদের কেউ চাকরি দিবে না। তারা অচ্ছুৎ,অস্পৃশ্য।

গল্পটা যেন মেথরদের হৃদয়ে ঢুকে লেখা। গল্পটা যেন সিরিঞ্জের মাধ্যমে ইনজেক্ট করে প্রতিটা সাধারণ মানুষের মনে মেথর জাতটার প্রতি সহানুভূতি,মমতা জাগানিয়া লেখা। এত ভালো উপন্যাস,এত সাবলীল,এত সুখপাঠ্য!! আমি আমার অনুভূতি খুব গুছিয়ে বলতেও পারলাম না এতটাই আচ্ছন্ন হয়েছি এটা পড়ে।
Profile Image for Habib Rahman.
78 reviews1 follower
January 31, 2025
বন্দর নগরী চট্টগ্রামে হরিজনদের আগমন হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। অভিজাত মানুষদের বাসস্থান, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট পরিষ্কার করবার দায়িত্ব দিয়ে সমাজ এবং ধর্মমতে অস্পৃশ্য এ সম্প্রদায়কে নানা সুযোগ সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল ভারতবর্ষ থেকে। এরপর ব্রিটিশ শাসন পেরিয়ে পাকিস্তান আমল পেরিয়ে বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ হলো। কিন্তু হরিজনদের দেখানো প্রলোভন তাদের কাছে তখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেলো। সেই ব্রিটিশ শাসনামল থেকে এখন পর্যন্ত চলে আসা হরিজনদের উপর অত্যাচার, অবজ্ঞা,ঘৃণা,বঞ্চনাকে উপজীব্য করে রচিত উপন্যাস রামগোলাম।

রামগোলাম পড়ার অনুভূতি খুব একটা সুখকর নয়। সাবলীল লেখনীর কারণে দ্রুত পড়া না গেলে বইটি হয়তো শেষই করতে পারতাম না। রামগোলাম চট্টগ্রামের হরিজনদের নিয়ে লিখিত। একটা বই যখন কোনো নির্দিষ্ট সময়ের, গোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে লিখা হয় তখন আশা থাকে ঐ সময়কার পুরো চিত্র সেখানে তুলে ধরা হবে। তাই সংলাপের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা কিংবা হরিজনদের নিজস্ব ভাষা না দেখে যখন দেখি বইয়ের সব চরিত্র একেবারে বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলছে তাতে একটু আশাহত হই বটে। তাও মেনে নেয়া যেত যদি না সব চরিত্রের মাঝেই দর্শনের ভূত না চাপত। পাঠকদের আবেগাপ্লুত করতে বারংবার ন্যায় অন্যায়ের বুলি কপচানো চরিত্রগুলোর আরোপিত সংলাপ আমার কাছে বিরক্তির উদ্রেক ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি।

এছাড়া বইয়ের কাহিনী নামমাত্র ভূমিকায় রয়েছে। খাপছাড়া কিছু ঘটনা শুধুমাত্র বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা বৃদ্ধিতেই অবদান রেখেছে। ক্যারেক্টর ডেভেলপমেন্ট এর বালাই নেই। কেন্দ্রীয় চরিত্র রামগোলাম এর আবির্ভাব ঘটে গল্পের মাঝামাঝিতে। বইয়ের কোনো চরিত্রই তেমন দাগ কাটতে পারেনি।

বইয়ের একমাত্র ভালো দিক হতে পারে এর এন্ডিং। কেননা, বইটি শেষ হয়েছে ভেবে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি।

রামগোলাম
হরিশংকর জলদাস
প্রথমা প্রকাশন
৩২০টাকা
ব্যক্তিগত রেটিং: ১.৫/৫
Profile Image for Ferdous Ahmed.
1 review4 followers
March 26, 2023
পড়ে শেষ করলাম হরিশংকর জলদাসের 'রামগোলাম'।
রামগোলাম উপন্যাসটির প্রধান ও নাম চরিত্র। এই উপন্যাসে হরিজনদের জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন হরিশংকর জলদাস। উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজারের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা মেথরপট্টির হরিজনদের জীবনগাথা। যাদের পূর্বপুরুষদের সূদুর ভারত থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল এই দেশে শুধুমাত্র আবর্জনা আর টাট্টিখানা পরিষ্কারের কাজে লাগানোর জন্যে। সমাজের কাছে অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য এই মানুষগুলোর জীবনচক্র আটকে গিয়েছিল চট্টগ্রাম শহরের এই হরিজনপল্লীর চারটি কলোনীর মধ্যে। তাদেরই সর্দার ছিল এই রামগোলাম। যে তার গোটা জীবন উৎসর্গ করতে চেয়েছিল হরিজনদের অধিকার আদায়ের তরে। এই উপন্যাসের পরতে পরতে একজন পাঠক/পাঠিকা খুঁজে পাবেন হরিজনদের দুঃখ দুর্দশার কথা। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকলের দ্বারা ঘৃণিত হওয়ার কথা। এই বইতে উঠে এসেছে কীভাবে এই সম্প্রদায়ের মানুষগুলো যুগ যুগ ধরে রয়ে গেছে অবহেলিত, অনাহূত। এই বইতে লেখা আছে হরিজনদের মুক্তির উপায়। কিন্তু আদৌ কি তারা মুক্ত হতে পেরেছিল জাতভেদে পূর্ণ শোষক শ্রেণির হাত থেকে? জানতে হলে পড়তে পারেন বইটি। কথা দিচ্ছি, হরিশংকর জলদাসের লেখা পড়ে বিরক্ত হবেন না মোটেও! বরং হরিজনদের করুণ ইতিহাস আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে, সমাজের এই শ্রেণিবৈষম্য নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে আরও একবার!
Profile Image for Pritha.
99 reviews13 followers
March 24, 2020
কাহিনীর শুরু রামগোলামের সাথে তার দাদুর গুরুচরণের কথোপকথন নিয়ে। গুরুচরণ হরিজন অর্থাৎ মেথরসমাজের সর্দার। গুরুচরণের সময়কার হরিজন সমাজের কথা লেখক বর্ণনা করেছেন খুব সুন্দরভাবে।
কাহিনীর মুখ্য চরিত্র রামগোলাম। বইটি পড়া শেষ করার পর মনে হল, তার চরিত্রটা ভালোভাবে ফুটে ওঠার আগেই কাহিনী শেষ হয়ে গেল। বর্ণনা অনেক খাপছাড়া, কিছু পার্শ্ব চরিত্রের প্রাধান্য কাহিনীকে বেগ দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু লেখক তার জন্য হয়ত মূল থেকেই সরে গিয়েছেন।
মোটকথা, বইটি পড়লে সেই সময়ের চট্টগ্রাম অঞ্চল তথা সারা বাংলার মেথরসমাজের দুঃখ-দুর্দশাপূর্ণ জীবন এবং চিরকাল ধরে শোষিত হয়ে আসা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটা ধারণা পাওয়া যাবে।
Profile Image for শুভ.
111 reviews4 followers
November 15, 2023
বইটি সমাজের তথাকথিত অচ্ছুৎ মেথর বা হরিজন সম্প্রদায়কে নিয়ে লেখা। আমার পড়া এটি লেখকের প্রথম বই। আমি এই সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন সরাসরি দেখেছি বিধায় কাহিনির সাথে অনেক একাত্ম হতে পেরেছি।ভবিষ্যতে এ লেখকের অন্যান্য বই ও পড়ার ইচ্ছা থাকলো৷
সমাজের নিচু শ্রেণীর মানুষগুলোর বারবার হেরে যাওয়া আমাকে সতত পীড়া দেয়। ভালো থাকুক ধাক্কা খাওয়া, অপমানিত হওয়া, হেরে যাওয়া মানুষগুলো। শুধু তথাকথিত সফল নয়, ব্যর্থরাও পৃথিবীতে সমান ভালো থাকুক
Profile Image for Humayra Ta Deen Fabi.
74 reviews8 followers
December 17, 2022
হরিশংকর জলদাসের লেখনি অনেক মজবুত। উনার লেখায় নিম্ন শ্রেণীর মানুষের সুখ দুঃখ আশা হতাশা আর জীবনের কথা উঠে আসে। মেথর সমাজ আমাদের সমাজে কত বড় অবদান রাখছে সেটা ভাবার মত সময় পর্যন্ত আমাদের হয়ে ওঠেনা। লেখকের এই বইটি তাদের নিয়ে লেখায় অনেক কিছু বুঝতে পেরেছি। অনেক গভীর ভাবে ভাবিয়েছে । বেশ ভালো। তবে শেষ টুকু তে আমি সন্তুষ্ট হইনি। শেষাংশ আরও স্ট্রং হতে পারত।
Profile Image for Sarah Tamanna.
1 review
March 10, 2020
হরিজন সমাজের দুর্দশার একটা আপাত ধারণা পাওয়া যায় এই উপন্যাস থেকে। লেখক নিপাট সুরে পুরো গল্প বলে গেছেন, পুরাণের সাথে অল্প বিস্তর যোগও মিলিয়েছেন। কিছু অংশকে উপন্যাসের চাইতে সার্থক ছোটগল্প হিসেবে মানানসই লাগে।
Profile Image for Shah Alam.
6 reviews1 follower
March 29, 2020
সম্প্রতি বেশ কিছু বই পড়েছি। এই বইটা আমার কাছে মনে হয়েছে একটা কমপ্লিট উপন্যাস। লেখায় মুনশিয়ানা আছে। পরিমিতিবোধ অসাধারণ।
Profile Image for Parvez Alam.
310 reviews12 followers
July 19, 2021
মেথর দের জীবন কত কষ্টে ভরা এই বইটা পড়লে বুঝা যাবে।
Profile Image for Tanoy Bhowal.
63 reviews4 followers
November 9, 2021
এই লোকের প্রতিটা বইই লেভেল ছাড়া ভালো লাগার। রামগোলাম হচ্ছে মেথর সমাজের এক নিখুঁত ছবি, যেটাকে গল্পাকারে প্রথিতযশা লেখক তার প্রগাঢ় জ্ঞানের সমভিব্যাহারে ফুটিয়ে তুলেছেন। অসাধারণ এক উপন্যাস ❤️🧡🧡💙💚💜
Profile Image for Alfie Shuvro .
242 reviews58 followers
July 26, 2024
খুবই সুন্দর ভাবে ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে মেথর সমাজের। যুগে যুগে লুন্ঠিত, অভিশপ্ত হয়ে পড়া সমাজের ইতিহাস ফুটে এসেছে৷
Profile Image for Anika Tasnim.
49 reviews3 followers
April 19, 2024
উপন্যাস আর প্রবন্ধের মাঝামাঝি কিছু একটা এই বইটি। হরিজন সম্প্রদায় সম্পর্কে খুব একটা জানাশোনা ছিল না। অনেক্কিছু জানলাম। লেখকের লেখা ঝরঝরে, তরতর করে পড়া যায়। হরিজন সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা, দুদর্শার, হাসি, কান্না সব্বকিছু ছবির মত ধরা দিয়েছে চোখের সামনে। কিন্তু ওইযে বললাম পুরোপুরি উপন্যাস হয়নি। বইয়ের নাম রামগোলাম। কিন্তু এই রামগোলাম কে , রামগোলাম এর গল্পকে আমরা পাই খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে। তার উত্থান এর সিড়িটাও হ্রদয়কে স্পর্শ করেনা। অন্যান্য চরিত্র আর সাবপ্লটই গল্পকে টেনে নিয়ে গিয়েছে।
Profile Image for Saikat Mahmud.
44 reviews22 followers
August 20, 2015
বলতে বাধ্য হচ্ছি, এই লেখকও পুটুনদার মত ওভাররেটেড। 'কসবি' ছাড়া যা যা পড়েছি সব ফাউল। খুব ব্যতিক্রম একটা আবহ, যেটা নিয়ে মাস্টারপিস পর্যন্ত লিখে ফেলা যায়। আর লেখক কিনা ঘুরপাক খেয়ে গেলেন পুনরাবৃত্তেই!
Profile Image for Monowarul ইসলাম).
Author 32 books181 followers
April 30, 2021
এই বইটার কন্সেপ্টটা দারুণ। বিশেষ করে দাদা তার নাতীর নাম কেন রামগোলাম রাখেন এই বিষয়টা আমাকে খুব ভাবিয়েছিল।
মেথর জীবনের নানাদিক এই বইয়ে উঠে এসেছে।
Displaying 1 - 23 of 23 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.