৪.৫/৫
দেশের উপকূলবর্তী জেলা কক্সবাজার। এখানকার একটা বড় অংশের জীবিকার প্রধান অবলম্বন সমুদ্র। সমুদ্রে মাছ ধরা, শুটকি করা, লবণ তৈরি করা – এসবের মাধ্যমেই জীবিকার সংস্থান হয় তাদের। বদরমোকাম, টেকনাফ থেকে সর্বোচ্চ সেইন্ট মার্টিন – এটুকুর মধ্যেই তাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, প্রেম, সংসার, জীবিকা ও মৃত্যু। মালেকদের পরিবার এমন অসংখ্য পরিবারের মধ্যেই একটা। মালেক, বড় ভাই সুজা, ছোট ভাই সালেক প্রত্যেকের জীবনই সমুদ্রের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
সমুদ্রে মাছের বা লবণের কোনো অভাব নেই। তাইতো সমুদ্র ওদের দুহাত ভরে মাছ বা লবণ দেয়। কিন্তু সমুদ্র দিলেও তোরাব আলী বা গণি মিয়ারা দেয় না। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ওরা যা সংগ্রহ করে তার সিংহভাগ চলে যায় এসব আড়তদার আর মহাজনদের হাতে। ফলে দিনশেষে অর্ধাহারে, অনাহারে দিন কাটাতে হয় ওদের। সততার কোনো দাম নেই এই এলাকায়, যে যত অসৎ হতে পারবে সেই সবচেয়ে ভালোভাবে চলতে পারবে এখানে। এখানে মহাজানরা বৈধ-অবৈধ ব্যবসা করে উপার্জন করে, জেলে-চাষীরা মহাজনদের ফাঁকি দিয়ে বাড়তি উপার্জন করতে চায়, মহিলারা চায় প্রতাপশালী ( হোক না অসৎ) স্বামী।
এই ব্যবস্থায় এলাকার সবাই এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে সে কেউ ভিন্ন কিছু চিন্তা করে না, ভিন্ন কাজ করে না। শত লাথি-ঘুষি খেয়েও মহাজনদের মন জুগিয়ে চলে তারা। কিন্তু মালেক ব্যতিক্রম। সে প্রশ্ন করতে চায়, এলাকাবাসীকে একত্রিত করতে চায়, এই আবদ্ধ ব্যবস্থা ভাঙ্গতে চায়। কিন্তু সে চাইলেই তো তোরাব আলীরা তা হতে দিতে পারে না কেননা তাতে যে গদি হাতছাড়া হয় তাদের। তাইতো শুরু হয় দ্বন্দ্ব।
সহজ কথায় বললে বইটা পড়ে বেশ মুগ্ধ হয়েছি। একটা অঞ্চলকে, একটা শ্রেণির মানুষকে, তাদের জীবনসংগ্রামকে এত দারুণভাবে প্রকাশ করতে খুব কম লেখকই পারেন। সেলিনা হোসেন সেটা পেরেছেন, বেশ ভালোভাবেই পেরেছেন।
তো কি ভালো লেগেছে বইটার? বইটার নাম থেকেই শুরু করি। বইটার নাম শুনেই প্রশ্ন জাগে এই পোকামাকড় কারা? তাদের ঘর-সংসার নিয়ে লেখিকা এত উদ্বিগ্ন কেন? উপন্যাসের প্রতিটা পৃষ্ঠায় আছে এর উত্তর। পোকামাকড়কে যেমনভাবে আমরা তুচ্ছ করি, ইচ্ছে হলেই তাদের নিয়ে মজা করি বা বিরক্ত হলে পা দিয়ে পিষে ফেলি উপন্যাসটিতে লেখিকা তেমন একটা সম্প্রদায়ের কথা বলেছেন যারা প্রতিনিয়ত এমন পোকার জীবন কাটায়। তাদের নিয়ে কেউ চিন্তা করে না কিন্তু সামান্য হেরফের হলেই যাদের গুড়িয়ে দেওয়া যায়। মৌমাছিদের যেমন বিনা-বাধায় বংশবিস্তার করতে দিয়ে সময় হলে আমরা আগুন দিয়ে তাদের তাড়িয়ে তাদেরই সঞ্চিত মধু আহরণ করি তেমনি এদেরও নৌকা, জাল, খাবার দিয়ে ভয়াল সমুদ্রে ছেড়ে দিয়ে তাদের ধরা মাছ মহাজনরা ভক্ষণ করে নিজেরাই। ফলে দিনশেষে এই মানুষরা পোকামাকড়ের চেয়ে বেশি কিছু না। তবু লেখিকা এদের নিয়ে লিখেছেন কেননা তিনি শ্রেণি নির্বিশেষে সবাইকে ভালোবাসেন। তিনি এই ‘ পোকামাকড়দের’ মানুষ হিসেবে দেখেছেন, তারাও যে ‘মানুষের’ ন্যায় সুস্থ জীবনযাপন করতে চায় সেটা দেখাতে চেয়েছেন তাদের ঘরের মধ্যে গিয়ে।
আঞ্চলিক ���পন্যাস যেমন হওয়ার কথা তেমনটাই হয়েছে উপন্যাসটি। অঞ্চলটির খুটিনাটি বর্ণনা, আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার, জেলেদের জীবন উপস্থাপন – প্রতিটা দিকে লেখিকা চমৎকার করেছেন। চৌধুরী সাহেব নামক একটা চরিত্র এনে তিনি সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ দূষণের দিকেও দৃষ্টি দিয়েছেন। অতিথি পাখি বা মাছ কমে যাওয়া, প্রবালের ক্ষয়ক্ষতি, সমুদ্র দূষণ ইত্যাদি নিয়ে তিনি বেশ জোরালো কন্ঠে বলেছেন।
বইটার সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে দিক সেটা হলো চরিত্রগুলোর মাধ্যমে সমাজের শ্রেণিবৈষম্যকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখিকা। তোরাব আর গণি মিয়াদের মাধ্যমে উপরতলার মানুষদের শোষণ-নিপীড়ন আর মালেক-সুজা-বাদলদের মাধ্যমে নিচুতলার মানুষদের সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন তিনি। আর এখানেই এসেছে লেখিকার সাম্যবাদী চিন্তাধারা। তিনি দেখিয়েছেন উচুতলার মানুষরা যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন যখন নিচুতলার মানুষরা নিজেদের সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একতাবদ্ধ হতে পারবে তখন উপরতলার মানুষদের পতন অনিবার্য। এভাবেই উপন্যাসটিতে মালেকের নেতৃত্বে লেখিকা প্রলেতারিয়েত বিপ্লব উপস্থাপন করেছেন।
এছাড়াও মালেক-সাফিয়ার ভিন্নমাত্রার সম্পর্ক, সুজার বদলে যাওয়া, বাদলের ভয়, মালেক ও সাফিয়ার মায়ের মালেকের প্রতি ভালোবাসা, সালেকের পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়গুলো ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে বইটাতে।
এতসব ভালো লাগার পরও কিছু নেগেটিভ দিকও আছে বইটার। সবচেয়ে বেশি চোখে যা লেগেছে তা হলো মালেকের বিপ্লবী হয়ে ওঠা। মাঝে মাঝে চাপিয়ে দেওয়া মনে হয়েছে তার বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড ,স্বতঃস্ফূর্ত না আর কি! লেখিকা যেন আগে থেকেই মালেককে ‘নায়ক’ বানাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন, ফলে তার কর্মকাণ্ড ঘটনার পরম্পরায় ঘটে যাওয়া বলে মনে হয় নি অনেক জায়গায়। তাছাড়া তার চিন্তাধারার গুরু হিসেবে লেখিকা যাকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন সেই চৌধুরী সাহেব চরিত্রটাও কেমন যেন অসম্পূর্ণ, ভাসা-ভাসা। অর্থাৎ মালেকের বিপ্লবী হয়ে ওঠার কোনো ‘ব্যাক-স্টোরি’ নেই বইটাতে।
সবাই সুখে শান্তিতে বাস করছে – এমন পরিণতি দেখতে সবারই ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তবতা কখনোই এমন হয় না। বিষয়টা জানেন লেখিকাও। তাইতো একদিকে যখন তিনি মালেকের জয় দেখিয়েছেন সাথে সাথে দেখিয়েছেন সালেকেরও উত্থান। অর্থাৎ বিপ্লব কখনও শেষ হয় না, বিপ্লব জারি রাখতে হয়।
সার্বিকভাবে বলতে গেলে, বইটা একটা দারুণ আঞ্চলিক উপন্যাস। ততটা আলোচনা শোনা যায় না বইটা নিয়ে, আরও বেশি আলোচনার যোগ্য বইটা।