Jump to ratings and reviews
Rate this book

যদ্যপি আমার গুরু

Rate this book
জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে চলমান বিশ্বকোষ বললে খুব একটা অত্যুক্তি করা হয় না। অর্থশাস্ত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম-সংস্কৃতি এই সবগুলো বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞের মতো মতামত দেবার ক্ষমতা রাখেন। তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি সর্বজনবিদিত। সমকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপীঠসমূহের শ্রেষ্ঠ মনিষীদের অনেকেই একবাক্যে তাঁর মেধা এবং ধীশক্তির অনন্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন। এই নিভৃতচারী, অনাড়ম্বর জ্ঞানসাধক মানুষটি সারা জীবন কোনো বই রচনা করেননি। সভা-সমিতিতে কথাবার্তা বলারও বিশেষ অভ্যাস তাঁর নেই। তথাপি কৃশকায়, অকৃতদার এই মানুষটি তাঁর মেধা এবং মননশক্তি দিয়ে জাতীয় জীবনের সন্ধিক্ষণ এবং সংকটময় মুহূর্তসময়ে পথনির্দেশ করেছেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, বলতে গেলে, চারটি দশক ধরেই তরুন বিদ্যার্থীদের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন।

সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একজন প্রবাদতুল্য পুরুষ। কিন্তু তাঁর জ্ঞানচর্চার পরিধি কতদূর বিস্তৃত, আর তিনি ব্যক্তি মানুষটি কেমন সে বিষয়েও মুষ্টিমেয় ক'জনের বাইরে খুব বেশি মানুষের সম্যক ধারণা নেই। যদ্যপি আমার গুরু বইটি পাঠক-সাধারণের মনে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মনীষা এবং মানুষ আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে একটি ধারণা গঠন করতে অনেকখানি সাহায্য করবে।

110 pages, Hardcover

First published February 1, 1998

198 people are currently reading
2111 people want to read

About the author

Ahmed Sofa

71 books600 followers
Ahmed Sofa (Bangla: আহমদ ছফা) was a well-known Bangladeshi philosopher, poet, novelist, writer, critic, translator. Sofa was renowned for his intellectual righteousness as well as his holistic approach to the understanding of social dynamics and international politics. His career as a writer began in the 1960s. He never married. On 28 July 2001, Ahmed Sofa died in a hospital in Dhaka. He was buried in Martyred Intellectuals' Graveyard.

Sofa helped establishing Bangladesh Lekhak Shibir (Bangladesh Writers' Camp) in 1970 to organize liberal writers in order to further the cause of the progressive movement.

Ahmed Sofa's outspoken personality and bold self-expression brought him into the limelight. He was never seen hankering after fame in a trivial sense. His fictions were often based on his personal experience. He protested social injustice and tried to portray the hopes and dreams of common people through his writing. Sofa always handled his novels with meticulous thought and planning. The trend of telling mere stories in novels never attracted him; he was innovative in both form and content.

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
1,643 (52%)
4 stars
1,170 (37%)
3 stars
279 (8%)
2 stars
41 (1%)
1 star
18 (<1%)
Displaying 1 - 30 of 399 reviews
Profile Image for Manzila.
167 reviews160 followers
April 6, 2016
পাঠক জীবনের একটা পর্যায়ে সবারই মনে মনে একটা ইচ্ছা জাগে যে আমিও একদিন লেখক হব, এমনি করে লিখব। কিন্তু বেশির ভাগেরই অবস্থা বোধহয় “I wanna a be a writer but I don’t know what to write about!” তুলনামূলক ভাবে বলতে গেলে আমার পাঠক জীবনে এই লেখালেখির ইচ্ছাটা বরাবরই অনুপস্থিত। একটা ভাল লেখার প্রশংসা করতে আমার ভাল লেগেছে, কোন লেখার ব্যাপারে অন্যদের কি মতামত এসব শুনতে ভাল লেগেছে মানে সর্বোপরি একজন তুখোড় পড়ুয়া হয়ে ওঠার ইচ্ছা মনের মধ্যে তো সবসময়ই আছে কিন্তু কেন জানি কোনদিন লেখক হতে ইচ্ছা করেনি । “যদ্যপি আমার গুরু” -এই প্রথম একটি বই কিছুটা আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে যে খুব আটপৌরে বিষয়বস্তুকেও রিপ্রেজেন্টেবল করে লিখলে সেটা থেকেই দারুন এক সৃষ্টি সম্ভব। এর মানে কিন্তু এই না যে বইটি এতটাই পলকা যে পড়ে মনে হয়, “এ আর এমন কি?! আমিও তো এরকম কতই লিখতে পারি?” বরং ঠিক উল্টো। বইটির বিষয়বস্তু দুই গুরু-শিষ্যের দীর্ঘ সময়ব্যাপী আলাপচারিতার নানান দিক। কিন্তু নেহাত ঘোরোয়া আলোচনায় ইতিহাস-সংস্কৃতি, অর্থশাস্ত্র, রাজনীতি, ধর্ম কি যে উঠে আসেনি তাই ভাবতে হয়!

আহমদ ছফা আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে ছিলেন প্রায় সাতাশ বছর। সুদীর্ঘ একটা সময়। সম্পর্কে ছাত্র-শিক্ষক হলেও মনে হয়নি তাদের সম্পর্কটায় আদৌ কোন ফর্ম্যালিটি ছিল। এত দীর্ঘ সময় ধরে কাউকে গুনমুদ্ধ করে রাখা কিন্তু খুব কঠিন ব্যাপার। কিন্তু আবদুর রাজ্জাক পেরেছিলেন, শুধু ছফা নয়, সমসাময়িক অনেক প্রতিভাবানেরাই তাকে গুরুর আসনে আসীন করেছেন। এই মানুষটিকে বিশ্বকোষ বললে বাড়িয়ে বলা হয় না, জ্ঞানের শাখায় শাখায় তার অবাধ বিচরণ। ছাত্রের মনের জানালা খুলে দেয়া শিক্ষক বুঝে এমন কাউকেই বলে। অথচ বিস্তর পড়াশোনা, অগাধ জ্ঞানী এই মানুষটি কখনও নিজে কিছু লেখেননি । আবদুর রাজ্জাক স্যার কেন লেখেননি এই ব্যাপারে ছফা ব্যাখা দিয়েছেন এভাবে, এই মানুষটি তার সমকালীনদের গন্ডি পেরিয়ে এতখানিই উপরে উঠেছিলেন যে তাদের কাতারে নেমে আসা হয়ত একটু মুশকিল হত তাঁর জন্য। আবদুর রাজ্জাক স্যারকে সমালোচনাও কিন্তু তাকে কম শুনতে হয়নি। তৎকালীন বহু বিখ্যাত ও বিশ্বনন্দিত ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে ভাল মন্দ নানা প্রসংগে। উজ্জল একটি নক্ষত্রের মত এই মানুষটির ব্যক্তিজীবন ছিল খুব অদ্ভূত। খাঁটি ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলতেন, কাপড়-চোপড়ের নেই কোন আড়ম্বর, খেতেও ভালবাসেন যা কিছু বাঙালী। অথচ তিনি কতটা বিশ্বজনীন প্রখর দৃষ্টির অধিকারী এই ব্যাপারে ছফা মন্তব্য করেছেন, “নিজেস্ব সামাজিক অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে এবং নিজের সামাজিক পরিচিতির আদি বৈশিষ্ট্যসমূহ গৌরবের সাথে ধারণ করে একটি বিশ্বদৃষ্টির অধিকারী হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।”

আমি বইটি পড়ার সময় আবদুর রাজ্জাক স্যারকে যতটা না লক্ষ্য করেছি মনের অজান্তেই আহমদ ছফার উপর নজর রেখেছি তার চেয়ে বেশি। সাতাশ বছর – এত দীর্ঘ সময়ের নানা কখনপোকথন থেকে আহমদ ছফা যে বিষয় গুলোকে আঁজলা ভরে তুলে নিয়েছেন সেগুলো আসলে আমার মনে হয় আবদুর রাজ্জাক নয়, আহমদ ছফাকেই বেশি সংজ্ঞায়িত করেছে। যে বিষয় গুলোতে তার মুগ্ধতা বেশি ছিল, স্যারের যে কথা গুলো তিনি ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন সেগুলোই তুলে এনেছেন তার বইতে। ভূমিকায় তিনি বলেছেন আবদুর রাজ্জাক স্যারের অনেক কথায় হয়ত অতি সংবেদনশীলেরা নিতে পারবে না, আবার অনেক কথার ভুল ইন্টারপ্রিটেশনে স্যারও রুষ্ঠ হবেন। তাই দুটো ব্যাপারে ছফাকে লক্ষ্য রাখতে হয়েছে। আবদুর রাজ্জাকের “Wit” গুলোও জায়গা বিশেষে সুন্দর করে খাপে মিলিয়েছেন যাতে করে নেহাত দুটি অচেনা-অজানা মানুষের কখনপোকখন পড়ে আমরা বিরক্ত না হয়ে যায়! অগাধ জ্ঞানের পাশাপাশি কাঁঠালের এঁচোড় বিষয়ক ঘটনার অবতারণা আবদুর রাজ্জাক স্যারের মানবীয় গুনাবলি প্রকাশ করেছে তো বটেই। হেনরী কিসিঞ্জারের সাথে দেখা করতে যাওয়ার ঘটনাও এক মজার ব্যাপার। আহমদ ছফার মুন্সীয়ানায় তাই আমি মুগ্ধ – ঠিক কতটুকু সিরিয়াসনেসের সাথে কতটুকু কৌতুক জুড়ে দিলে আমরাও আবদুর রাজ্জাক স্যারকে ভালবেসে ফেলব উনি তা মাথায় রেখেই এই বই লিখেছেন। অনেকে অনেক প্রশ্ন হয়ত তুলেছেন আহমদ ছফার উদ্দেশ্য কি ছিল এই বইটি লেখার পিছনে, নিজের গুরুর মহত্ব তুলে ধরা নাকি আবদুর রাজ্জাক স্যারের নানান বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রদান ইত্যাদি। আমার কাছে মনে হয়েছে আহমদ ছফা এই অসাধারন মানুষটির সান্নিধ্যের স্বাদ কিছুটা হলেও আমাদের কাছে পৌছে দিতে চেয়েছেন এই বইটির মধ্য দিয়ে। দুজন অসম বয়সী বন্ধুর টুকরো টুকরো আলাপচারিতার স্মৃতিচারণ বলে একে মেনে নিতেও আমার আপত্তি নেই।

বইটি আরেকটি কারনে প্রশংসার দাবি রাখে তা হল এর অসংখ্য রেফারেন্স। ইতিহাস, ধর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি, সাহিত্য এত এত বিষয় দুজনের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে যে কেউ যদি এসব বিষয়ে আরও পড়াশোনা করতে চান তাহলে রেফারেন্স হিসাবে কি পড়বেন আমাদের আলোচ্য গুরুর কাছ থেকে তা ভালই জেনে নিতে পারবেন। বাংলার সুলতান থেকে শুরু করে জিন্নাহ, বঙ্কিম থেকে শুরু করে টলস্টয়, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে বিথোভেনের মুনলিট সোনাটা, মার্ক্স-এঙ্গেলস থেকে অ্যাডাম স্মিথ, ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র কিংবা সেক্যুলারিজম সবই তাদের আলোচনায় একে একে উঠে এসেছে। এমন নয় যে আপনি এসব সম্পর্কে বিস্তর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পাবেন এ বইয়ে, কিন্তু জ্ঞানের নানা শাখার সূত্র ধরিয়ে দিতে অবশ্যই সক্ষম হবে বলে আশা রাখছি। আবদুর রাজ্জাক স্যার নিজেই একবার আহমদ ছফাকে বলেছিলেন, “ প্রথম লাইব্রেরীতে ঢুইক্যাই আপনার টপিকের কাছাকাছি যে যে বই পাওন যায় পয়লা একচোটে পইড়া ফেলাইবেন। তারপর একটা সময় আইব আপনে নিজেই খুইজ্যা পাইবেন আপনার আগাইবার পথ।” আর আমার মনে হয়েছে “টপিক” টা কি বেছে নেব সেটারই নানান পথ বাতলে দিয়েছেন লেখক এই বইটিতে।

আবদুর রাজ্জাক স্যার বই পড়া প্রসঙ্গে খুব দারুন একটা কথা বলেছেন, “পড়ার কাজটি অইল অন্যরকম। আপনে যখন মনে করলেন, কোনো বই পইড়্যা ফেলাইলেন, নিজেরে জিগাইবেন যে বইটা পড়ছেন, নিজের ভাষায় বইটা আবার লিখতে পারবেন কিনা। আপনের ভাষার জোর লেখকের মতো শক্তিশালী না অইতে পারে, আপনের শব্দভান্ডার সামান্য অইতে পারে, তথাপি যদি মনে মনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবার পারেন, ধইর‍্যা নিবেন , আপনের পড়া অয় নাই।” এই কথাটার সাথে নিজের মিল খুঁজে পেলাম। কারন আমার মনে হয় আমিও রিভিউ লিখি ঠিক একই কারনেই – যতটা না অন্য পাঠকদের বইটির কথা জানানোর জন্য তার চেয়েও বেশি আমি নিজের মধ্যে বইটা নিতে পেরেছি কিনা উপলব্ধি করার জন্য। দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল আহমদ ছফার এই বইটি পড়ার। সত্যি বলতে এই প্রথম তার লিখা পড়লাম। তাই হালখাতা খুলতে “যদ্যপি আমার গুরু”ই বেছে নিয়েছি। দুটো মানুষের দৈনন্দিন সম্পর্ক আর আটপৌরে আলাপও যেন সাগর থেকে তুলে আনা মণি-মুক্তোর মত অমূল্য রত্ন। এই সুন্দর বইটা আসলে চমৎকার একটা অভিজ্ঞতার মত মনে হল।
Profile Image for NaYeeM.
229 reviews65 followers
May 29, 2023
হা এটা একটা কালজয়ী masterpiece বই।
কিন্তু এই বই যারা এখনও পড়েননি তারা: বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস, সমাজতন্ত্র, অর্থনীতি, ঐ সময়ের কিছু বিশিষ্ট মানুষের জীবনী, এসব নিয়ে অল্প কিছু জ্ঞান রেখে হলেও বইটা পড়তে বসবেন।
আমার মতন এই বইয়ের hype দেখে, সেরা বই বলে পড়তে বসে যাবেন না
...
এই বইটা জ্ঞানের এক সিলেবাস বলা যায়। আমরা স্কুল, কলেজে যেমন সিলেবাস দেখে বই পড়ি, তেমন আপনি অনেক বিষয় এই বই থেকে নিয়ে অনেক অনেক জ্ঞান অর্জন করতে পারেন।
১১০ পৃষ্টার বই, কিন্তু এই বইয়ে রাজ্জাক স্যার যা যা বিষয় নিয়ে কথা বলছে তা নিয়ে লেখাপড়া করতে গেলে অনেক অনেক সময় দিতে হবে আপনার(যার কারণে এটাকে সিলেবাস বলছি)
...
বাংলাদেশে যে রাজ্জাক স্যারের মতন একজন গুণী আর অনেক বিষয়ে জ্ঞান রাখার মতো এক মানুষ ছিলেন সেটাই তো বাংলাদেশের ভাগ্য!! আর এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হওয়ার পরও উনার যে down-to-earth আচরণ এবং ব্যবহার, তা আপনাকে উনার প্রতি মুগ্ধ হতে বাধ্য করবে!
Profile Image for রিফাত সানজিদা.
174 reviews1,356 followers
August 15, 2016
বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং বুদ্ধিজীবী ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, ছিলেন চলমান বিশ্বকোষ। তাই বলা হতো তাঁকে। তাঁর জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত ছিল বিশেষত প্রাশ্চ্যতত্ত্ব, ইতিহাস ও রাজনীতিতে। তিনি 'শিক্ষকদের শিক্ষক' হিসেবে অভিহিত হতেন। এই বইটি ছাত্র আহমদ ছফার রচনা, পদার্ঘ্য হিসেবে। এছাড়াও সরদার ফজলুল করিম তাঁর সাথে আলাপচারিতার ওপর ভিত্তি করে একটি বই লিখেছেন, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজঃ অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা'।

“পড়ার কাজটি অইল অন্যরকম। আপনে যখন মনে করলেন, কোনো বই পইড়্যা ফেলাইলেন, নিজেরে জিগাইবেন যে বইটা পড়ছেন, নিজের ভাষায় বইটা আবার লিখতে পারবেন কিনা। আপনের ভাষার জোর লেখকের মতো শক্তিশালী না অইতে পারে, আপনের শব্দভান্ডার সামান্য অইতে পারে, তথাপি যদি মনে মনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবার পারেন, ধইর‍্যা নিবেন , আপনের পড়া অয় নাই।”
কথা বলতেন এরকমভাবে, খাঁটি ঢাকাইয়া ভাষায়। ভোজনবিলাসী ছিলেন, ছিলেন অকৃতদার, পাকা রাঁধুনী এবং পোশাকে অতি অনাড়ম্বর ঘরানার।

উইকি জানায়, আবদুর রাজ্জাককে (১৯১৪ - ২৮ নভেম্বর, ১৯৯৯) বাংলাদেশ সরকার জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে মনোনীত করে ১৯৭৫ সালে। তাঁর ডঃ ডিগ্রিটি (অনারারি?) ১৯৭৩ সালের প্রথমদিকে অর্জিত, ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

অধ্যাপক রাজ্জাক মাধ্যমিক পাস করেন ঢাকার মুসলিম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে, উচ্চ-মাধ্যমিক ঢাকা কলেজ। ১৯৩১ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিভাগে। স্নাতকোত্তর ১৯৩৬ সালে,প্রথম শ্রেণীতে। লন্ডন যাত্রা বিখ্যাত লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে পিএইচডি করতে, বিশ্ববিখ্যাত অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির সুপারভিশনে। হঠাৎ ডঃ লাস্কি মারা যাওয়ায় মূল্যায়ন করার মতো কেউ নেই এই ধারণায় থিসিস সাবমিট না করেই, অর্থাৎ কোনো ডিগ্রী ছাড়াই তিনি দেশে ফেরেন। অল্প কিছু প্রবন্ধ ছাড়া বাকিজীবনে কিছুই রচনা না করলেও অসাধারণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কারণে তিনি কিংবদন্তির খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
**অধমের দু-পয়সা : লন্ডনের এই গ্রাজুয়েট স্টুডেন্টজীবন কতদিনের ছিলো? ডিফেন্সের জন্য রেডি হচ্ছিলেন মানে অন্তত রিসার্চে তিন বছর তো গেছে। এই তিন বছর তাঁর কোন পেপার পাবলিশড হয়নি কোথাও?
হওয়াটাই কি স্বাভাবিক ছিলো না?**

যাকগে, ১৯৭৫ সালে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে অবসর নেন অধ্যাপক রাজ্জাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক-অর্থনীতি বিভাগ থেকে। যোগ দিয়েছিলেন ১৯৩৬ সালে, প্রভাষক হিসেবে।
তৎকালীন অন্য অনেক রাজনৈতিক নেতার মতো বঙ্গবন্ধু নিজেও ছিলেন তাঁর অনুসারী/ প্রিয়ভাজন। কিন্তু তিনি অনুসারী ছিলেন কার, কিসের? ঢাবির সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ আলী আশরাফ, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, এরকম স্বাধীনতাবিরোধী বুদ্ধিজীবি ও অধ্যাপকদের ব্যাপারে তিনি খুব কঠোর মনোভাব পোষণ করতেন, এমন খুঁজে পাইনি কিছু।

আচ্ছা, ১৯৭১এ তাঁর ভূমিকা কী ছিলো? ৭৫এ?
নীরব ছিলেন ১৫ আগস্ট, প্রিয়ভাজন মুজিব সপরিবারে নিহত হবার পরেও?
মৃত্যু ১৯৯৯এ, তার আগ পর্যন্ত যুদ্ধোত্তর বিধস্ত বাংলাদেশের একাধিক ক্যু, বাকশাল শাসন, চার নেতার হত্যা, সামরিক শাসন-- সবকিছুর পক্ষে/বিপক্ষেই বা কী স্ট্যান্ড ছিলো তাঁর?
ঠিক জানা গেলো না।

জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিদ্যা, ধীশক্তি ইত্যাদি সবই মহামূল্যবান জিনিস।
কিন্তু ইয়ে মানে, হামেশা শুঁড়িবাড়ি গমনের কথা জেনেও নিত্যানন্দ রায়কে গুরু মানতে আমার ব্যক্তিগত একটু খুঁতখুতানি আছে, যদি গুরুবন্দনা করার মতো সলিড কিছু আদৌ খুঁজে না পাই।
Profile Image for Suchona Hasnat.
251 reviews340 followers
January 31, 2021
"যদ্যপি আমার গুরু" নিয়ে অল্প কথায় কিছু বলা খুব শক্ত কাজ। তবু পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখতে বসেছি কেননা আবদুর রাজ্জাক বলেছেন কিছু পড়ে তা নিজের ভাষায় বলতে না পারলে সে বই আসলে পড়া কিছু হয়নি।

আবদুর রাজ্জাকের সাথে লেখকের পরিচয় পিএইচডি করতে গিয়ে। শেষ পর্যন্ত ডক্টরেট তো লেখকের করা হয়ে ওঠেনি, তবে দেখা পেয়েছেন এমন এক মানুষের যিনি লেখকের নিজের সত্ত্বাকে খুঁজে পেতে মশালের মতো পাশে ছিলেন। যাঁর মনন, যাঁর প্রজ্ঞাকে ধরে রাখতেই লিখেছেন এই বই।

আহমদ ছফার কলমে জীবন্ত হয়ে উঠেছে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের জীবন, চিন্তার প্রসার, রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতি, ধর্ম-বিজ্ঞান-শিল্প-সাহিত্য নিয়ে তাঁর মতামত। নিত্যদিনের টুকরো টুকরো ঘটনা, ক্রমশ বিস্তৃত আলোচনার প্রেক্ষাপট আর দৈনন্দিন কথোপকথনের ভীড় ঠেলে আহমদ ছফা কাগজে এঁকেছেন ভেতরকার মানুষটাকে। যে মানুষটা পড়তে ভালোবাসেন, যিনি সত্যকে সত্য বলতে কুন্ঠাবোধ করেন না, যিনি লেখকের হাতে একের পর এক তুলে দিয়েছেন বই, সৃষ্টি করেছেন জানার স্পৃহা, যিনি আপাদমস্তক একজন খাঁটি ঢাকাইয়া মানুষ হয়েও নতুনকে বরণ করেছেন মুক্তহাতে।

এ বইয়ের পাতায় পাতায় জেনেছি কিভাবে অজানাকে জানতে হয়, বুঝেছি জানা জ্ঞানকে কতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। প্রতিটি অক্ষর সৃষ্টি করেছে নতুন সত্যের আলোড়ন। এখানে দেশ ভাগ, নতুন দেশের জন্ম, সমাজের মারপ্যাঁচ আর রাজনীতির কুটিলতাকে ছাপিয়ে গিয়েছে জীবনকে দেখার সহজ স্বীকারোক্তি। জেনেছি বড় মানুষ হওয়ার চেয়ে জনপ্রিয় হওয়া কত সহজ। শিখেছি অতীতের মিথ্যে অহংকারকে মানুষ নিজের স্বার্থে বাঁচিয়ে রাখে কতটা নির্লজ্জভাবে। পেয়েছি নির্ভয়ে নিজের সত্য প্রকাশের সাহস।

তার সবটাই কি শুধু আবদুর রাজ্জাকেরই কৃতিত্ব? না। আহমদ ছফার শব্দ, তার সহজ প্রকাশ এক আকাশ সুবিশাল ব্যক্তিত্বকে ১১০ পাতার বইয়ে যত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে, আমার মনে হয়না যে আর কারো পক্ষে তা সম্ভব।
Profile Image for Arupratan.
235 reviews385 followers
October 4, 2023
অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের ব্যাপারে অনেক শুনেছি, তাই তাঁকে জানতে আগ্রহী হয়েছিলাম। আহমদ ছফার বিখ্যাত বইটি পড়ে তাঁকে কতটুকু জানতে পেরেছি জানিনা, কিন্তু বেশ আশাহত হয়েছি। বইয়ের শুরু হয়েছে একটি প্রবচনকে (যেটি থেকে বইয়ের শিরোনামটি গ্রহণ করা হয়েছে) ভুল ভাবে উদ্ধৃত করে। সূচনাতেই সেই যে আমার ভ্রু কুঁচকে গেছিল, গোটা বইটি পাঠের সময় সেই ভ্রু স্বাভাবিক হয়নি। ভূমিকাতে লেখক অনুযোগ করেছেন যে, অনেকেই সন্দেহ করেছেন তিনি নিজের বক্তব্য অধ্যাপক রাজ্জাকের জবানিতে প্রকাশ করেছেন। সত্যি কথা বলতে, বইটি পড়ার পরে আমিও এই সন্দেহে ভুগছি।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে চেনার উদ্দেশ্যে এই বইটি হাতে তুলে নিয়েছিলাম। তিনি যেহেতু জ্ঞানচর্চা জগতের মানুষ, তাই তাঁর চিন্তাধারা, কাজের প্রেরণা, ��াজ করার পদ্ধতি, মূলত এইসব বিষয় নিয়ে আগ্রহী ছিলাম। তিনি নিজে বিশেষ কিছু লেখেননি, কিন্তু তবু তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি সর্বজনবিদিত। এই বই থেকে তাঁর সেই কিংবদন্তিসম পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেয়েছি? নাহ, প্রায় গোটা বই জুড়ে তিনি বিদ্যাচর্চা এবং রাজনীতিজগতের বিখ্যাত মানুষদের নিয়ে গসিপ করে গেছেন। নজরুল ইসলামের সঙ্গে দিলীপ রায়ের রেষারেষি ছিল। ফজলুল হক মিথ্যে অভিনয় করতে পারদর্শী ছিলেন। সোহরাওয়ার্দির নামের টাইটেলটা নকল, জীবনধারণের জন্যে তাঁকে "চাঁদার টাকার উপর ডিপেন্ড করতে অইত"। "রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা আছিল ঠিকই" কিন্তু তাঁর মধ��যে বড় মানুষের ছায়া নাই। ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠী নাকি তাঁর বইতে "এক্কেরে মনগড়া সব কথা লেইখ্যা থুইছে"। দীনেশচন্দ্র সেন "ওয়াজ রিয়্যালি এ গ্রেট ম্যান, এদিক সেদিক কিছু ব্যাপার আছে, তার পরেও"। কিন্তু ডাক্তার বিধান রায় খারাপ, কারণ দীনেশ সেন যখন অসুস্থ হয়েছিলেন, বিধান রায় দুই হাজার টাকা ফিস দাবি করেছিলেন। নীলরতন সরকার ভালো, কারণ তিনি ফিস মকুব করে দিয়েছিলেন। একই কারণে চিত্তরঞ্জন দাশ খারাপ, কারণ তিনি আলিপুর বোমা মামলায় ফিস নিয়েছিলেন। কিন্তু ভালো কে? ভালো হলেন মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ, কারণ তিনি "একমাস ধরে তিলকের একটা মামলা করছেন, কিন্তু ফিস নেন নাই"। বঙ্কিমচন্দ্র মুহসিন স্কলারশিপের টাকায় পড়াশোনা করেছিলেন, তারপর "মুসলমানের বিরুদ্ধে কলম ধইর‍্যা সেই ঋণ শোধ করছিলেন"। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় বিদ্যাসাগর কঠিন প্রশ্ন করেছিলেন, বঙ্কিমকে গ্রেস মার্কস দিয়ে বিএ পাশ করতে হয়েছিল, তাই তিনি বিদ্যাসাগরের উপর খাপ্পা ছিলেন। অধ্যাপক রাজ্জাকের পিএইচডি গাইড হ্যারল্ড ল্যাস্কিও নাকি স্কলার হিসেবে অত উচ্চশ্রেণীর ছিলেন না। ক্ষীতিমোহন সেন (গোটা বইতে ক্ষিতিমোহন সেনের নামের বানান এটাই লেখা হয়েছে) নাকি "রাইগ্যা গেলে প্রচণ্ড অইয়া উঠতেন। আশু সেন (অমর্ত্য সেনের বাবা) আছিলেন ক্ষীতিমোহনবাবুর জামাই। যখন জানতে পারলেন, আগে আশুবাবু আরেকটা মেমসাহেব বিয়া করছিলেন, ক্ষীতিমোহনবাবু জামাইরে খুন করবার লইছিল"। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যে-বিষয়ে পিএইচডি করেছিলেন, "সে বিষয়ে কাজ করার যোগ্যতা আছিল না"। মাওলানা আবুল কালাম আজাদের "সত্য কথা বলার অভ্যাস আছিল খুব কম, অ্যান্ড হি ওয়াজ এ কনজেনিটাল লায়ার"।

এইরকম ভিত্তিহীন, মনগড়া এবং কিছু কিছু রীতিমত আপত্তিজনক গসিপকে আমি "পাণ্ডিত্য" মানতে রাজি নই। এইসব হাবিজাবি মন্তব্য পড়ার জন্যে আমি এই বইটা হাতে নিইনি।

শুধু ভিত্তিহীন নয়, কিছু মন্তব্য পুরোপুরি অসত্যও বটে। দুটো উদাহরণ দিই।

(এক) বইতে আছে "রামমোহনরে বিলাত পাঠানোর সময় রাজা টাইটেল দিলেন বাহাদুর শাহ"। ভুল তথ্য। রামমোহনকে রাজা টাইটেল দিয়েছিলেন মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর। এই ফাঁকে অবশ্য রামমোহনের ব্যাপারেও গসিপ করে নিয়েছেন : "ঘুষ খাওন থেইক্যা শুরু কইর‍্যা তার গুণের অন্ত আছিল না"। রামমোহন রায় তাঁর প্রথম বইটি লিখেছিলেন ফারসি ভাষায় : "তুহফাত-উল-মুহাহহিদিন", কিন্তু অধ্যাপক রাজ্জাকের মন্তব্য : "ইচ্ছা করলেই আরবি উর্দু ফারসি সংস্কৃত ইংরিজি সব ভাষাতেই লিখতে পারতেন। এক্কেরে ডাইনে বামে না তাকাইয়া হি চুজ টু রাইট ইন বেঙ্গলি, এইডাই তার বড় কাজ"।

(দুই) "লাইফ ম্যাগাজিন ইন্ডিয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্সের ওপর একটা কভার স্টোরি করছিলো। অগ্নিহোত্র অনুষ্ঠানে নেহরু খালি গায়ে বইস্যা মন্ত্র পড়ছেন"। স্বঘোষিত নাস্তিক জওহরলাল নেহরুর ব্যাপারে এই বর্ণনা শুনে হতভম্ব হয়ে গেছি! কোথা থেকে পেলেন এইসব জিনিস? স্বপ্নে?

তারপর আছে অধ্যাপক রাজ্জাকের "নিজস্ব মতামত"। এই মতামতগুলো দেখে আজকালকার সবজান্তা ফেসবুক পণ্ডিতদের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল আমার। যেসব মতামতের পিছনে কোনো লজিক নেই, আছে কেবল গায়ের জোর। তিনটে উদাহরণ :

১) "গান্ধি ছাড়া ইংরেজ আমলের আর কারো ইংরিজি লেখাই টিকব না"। জওহরলাল নেহরুর লেখা? "উঁহু টিকব না"।

২) কবি সমর সেন যদি বাংলায় লিখতেন তাহলে তিনি রবীন্দ্রনাথকেও ছাড়িয়ে যেতেন।

৩) ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পঞ্চাশ বছর পরেও ভারতীয়রা একটা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা তৈরি করতে পারেনি, তাই "তারা একলগে থাকব কী কইর‍্যা আমি ত চিন্তা করবার পারি না"। [ভারতীয় সমাজের বৈচিত্র্যময় এবং বহুধাবিস্তৃত জাতীয় চরিত্রটির ব্যাপারে সামান্যতম ধারণা যদি কারো থাকে, তাহলে তিনি এই মন্তব্য করতে পারেন না!]

এরকম আরো বিবিধ অদ্ভুত মন্তব্য, মতামত এবং "বিশ্লেষণে" ভর্তি হয়ে আছে এই বইটির পৃষ্ঠা। কিছু কিছু কথাবার্তাকে তো সোজাসুজি মনগড়া ছাড়া অন্য কিছু বলার উপায় নেই। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নাকি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যাপারে বলেছিলেন, "যে মানুষ চৌদ্দটা পোলা মাইয়ার জন্ম দিছেন, হে সাধনা করবার সময় পাইল কখন!" কোথায় পেলেন তিনি এইসব গাঁজাখুরি কথা?! সমগ্র বই জুড়ে আছে অধ্যাপক রাজ্জাকের সরল জীবনযাপন এবং ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলার জন্যে গুণগান। পাণ্ডিত্যের সঙ্গে এই দুটোর সম্পর্ক কোথায়? তাঁর সরল জীবন এবং ঢাকাইয়া জবানের পরিচয় দিতে গিয়ে পাণ্ডিত্যের বিষয়টাই অগ্রাহ্য করা হয়েছে অত্যন্ত খাপছাড়া এবং অপরিকল্পিতভাবে রচিত এই বইতে। খুব খুব অবাক হয়েছি এইসব পড়ে। মাঝে মাঝে শুধু অবাক নয়, হতবাক হয়েছি। হতবাক হওয়া একটি অংশের উদ্ধৃতি দিয়েই শেষ করবো এই রিভিউ।

আমি বললাম, বাংলার ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছু বলেন।

স্যার বললেন, বাংলার ভবিষ্যত সম্পর্কে আমি আর কী কমু। সে ত আপনেগো উপর। মিঃ জিন্নাহ ত বেঙ্গল আপনেদেরে দিয়া দিছিলেন, আপনেগো চিত্তে সুখ অইল না, বেঙ্গল পার্টিশন করলেন।


এইসব পড়ার পরে, সত্যিই আমার মনে সন্দেহ জেগেছে, সত্যিই কি অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মতো একজন বিদগ্ধ মানুষ এইসব কথা বলতে পারেন? নাকি অন্য কোনো রহস্য আছে যা আমি ধরতে পারিনি?
Profile Image for Sourav Das.
42 reviews76 followers
June 26, 2016
বইটা শেষ করে মনে হল একটা ছোটখাট এন্সাইক্লোপিডিয়া পড়লাম। একজন মানুষের জানার পরিধি কত বিশাল হতে পারে তার নমুনা পেয়ে অভিভূত হলাম।গ্রীক সভ্যতায় সক্রেটিস এই কাজটা করেছিলেন।নিজে কিছুই না লিখে তাঁর বিস্তৃত জ্ঞানের পরিধি, মানুষকে আকর্ষণ করে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করার ক্ষমতা দিয়ে তিনি জাগিয়ে দিয়ে গেছিলেন সেই সময়কার তরুণদের। বাংলাদেশ ও সমাজের জন্য অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে আমার সেরকম একজন বলেই মনে হয়েছে।

পড়তে পড়তে বারবার আমার আফসোস হয়েছে এতোদিন কেন আমি এই বই পড়ি নাই।তাহলে হয়তো বা নানা বিষয়ে তৈরী হওয়া ধ্যান-ধারণা খানিকটা অন্যদিকে প্রবাহিত হতে পারত। মূলত পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক সমাজের বদৌলতে গড়ে ওঠা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী যে অনেক ক্ষেত্রেই ভুল দিকে প্রবাহিত হতে পারে সেটা আবারো চমৎকার ভাবে বুঝলাম।

চলে গিয়েছিলাম সেই সময়কার সমাজে,ইতিহাসের বর্তমানে।এই একটা মাত্র বই পড়ে বহু কিংবদন্তী সম্পর্কে অল্পবিস্তর যতটুকু জানতে পেরেছি এতোদিনে তার সিকিভাগও জানতাম না।তৎকালীন সমাজ,রাজনীতি,দর্শন,শিল্প-সাহিত্য,ধর্ম, হিন্দুমুসলমান জাতির মিথস্ক্রিয়া, এমনকি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কথাও অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের জবানিতে যেভাবে উঠে এসেছে তা মুগ্ধ হয়ে পড়েছি।গিলেছি বললেও ভুল হবে না। এতো উঁচু মাপের মনীষা আর সেই সাথে নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টির ধারাবাহক হয়ে অতি সাধারণ জীবনযাপন করা মানুষটার ব্যক্তিত্ব আমাকে চুম্বকের মতো টেনেছে। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অবদান, সারা বিশ্বের জ্ঞানীগুণীদের কাছে তাঁর গুণের কদর সত্ত্বেও , ঢাকাইয়া ভাষায় অনর্গল কথা বলে যাওয়া, বেশভূষাকে অযথা গুরুত্ব না দেয়া, নিজেই আহমেদ ছফার হোস্টেলে খাবার পৌছে দেয়া, সক্কাল বেলায় তাঁর প্রেসে গিয়ে হাজির হওয়া এরকম আরো ঘটনাগুলো মানুষ হিসেবে তাঁকে আরো উঁচুতে স্থান করে দিয়েছে। প্রতিভাকে ঠিক ঠিক চিনে তিনি তাঁদের শক্তি যুগিয়েছিলেন বিকশিত হবার। এস এম সুলতানের গল্প যার মধ্যে গোগ্রাসে গিলেছি।

পড়তে পড়তেই মনে হয়েছে আমরা অর্থাৎ এই অববাহিকায় জন্ম নেয়া মানুষেরা কত ভাগ্যবান ছিলাম।ইউরোপের সৃষ্টি হওয়া সভ্যতার বহু আগেই স��্য হয়ে ওঠা একটা জাতি ধীরে ধীরে কিকরে পিছিয়ে পড়ল তা নিয়ে বারবার আফসোস হয়েছে।বই থেকেই অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের জবানিতে একটা লাইন উদ্ধৃত করি, “যে জাতি যত বেশি সিভিলাইজড তার রান্নাবান্নাও তত বেশি সফিস্টিকেটেড।আমাগো ইস্টার্ন সভ্যতার রান্নার সাথে পশ্চিমাদের রান্নার কোন তুলনাই অয়না। অরা সভ্য হইছে কয়দিন।এই সেদিনও তারা মাছমাংস কাঁচা খাইত।“

অকৃতদার সেই মানুষটা যিনি কিনা লাস্কী মারা যাওয়ায় তাঁর থিসিস মুল্যায়নের কেউ নেই বলে ডিগ্রি ছাড়াই বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এসেছেন, তাঁর সম্পর্কে আমার শ্রদ্ধা ও উচ্ছ্বাস প্রকাশের শেষ হবে বলে মনে হয় না। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ আমার কাছেও আমার কাছে সম্পুর্ণ অন্যরকম ঠেকেছে। ব্যক্তিগতভাবে মুসলীম লীগের সমর্থক ও জিন্নাহর অনুসারী এই লোকই আবার ছিলেন পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশ তৈরীর অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা, সেক্যুলার চিন্তাধারার বাহক। ধর্মের উর্ব্ধে তিনি সমাজের জন্যই কাজ করেছেন বলে আমার মনে হয়েছ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের কথার সাথে শেখ মুজিবর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কেও জানতে পারলাম তাঁর ভাবনা থেকে।


আহমেদ ছফার লেখনী চমৎকৃত করেছে। খুবসম্ভবত ‘কাঠপেনসিল’ নামে হুমায়ূন আহমেদের একটা বই পড়ে তাঁর সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি। এর আগে তাঁর একটা ছোটগল্পের বই আর তাঁর নিজের একটা সাক্ষাৎকার মোটামুটিভাবে পড়া হয়েছিল। গল্পবলার মত করে একজন মানুষের সম্পর্কে এরকম প্রবহমান লেখা পড়ে লেখক হিসেবে তাঁর সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গী আরো কয়েকধাপ উঁচুতে উঠে গেল । লেখার মাঝখানে তিনি অনেক কোন নির্দিষ্ট মানুষের প্রতি বেশিদিন আগ্রহ না থাকা এই আহমেদ ছফাকেও অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক আগুনের শিখা হয়ে পতঙ্গের মতো টেনেছিলেন। বড় কিছু লেখার আগ্রহ জুগিয়েছিলেন।


একটা বই তখনই একজন পাঠকের কাছে বেশী ভালো লাগে যখন কোনভাবে সেই বইটা তার জীবনে প্রভাব ফেলে। সেই দিক দিয়ে বইটা শতভাগ সফল। তাই পড়া শেষ করেই অনুভূতিগুলো লিখতে বসে যাওয়া। বোধহয় মানুষটার কথা মনে করেই যে, বইটা আসলে আমি কতটুকু ভেতরে নিতে পারলাম। কোনোরকম স্বীকৃতির আশা না করে নিজের সমাজ ও মানুষদের এভাবে ঋণী করে যাওয়া মানুষটার জানার পরিধি যেরকম অবাক করেছে, তেমনি মুগ্ধ করেছে তাঁর সাধারণ জীবনযাপন। বইটা জানিয়েছে অনেক, আগ্রহ জাগিয়েছে, আর সবথেকে বড় কথা ভাবিয়েছে সবথেকে বেশী।
Profile Image for Syeda Ahad.
Author 1 book131 followers
August 10, 2016
অনেকদিন থেকে 'পড়তে চাই' লিস্টে রেখে দেয়া একটা বই। শুরুটা বেশ কয়েকদিন আগে করেছি। তবে প্রথমে একটু একটু হোঁচট খেয়েছি বলতে হবে। কেমন যেন একটু খাপছাড়া আর এক কথা কয়েকবার এসেছে মনে হয়েছিলো। তবে কয়েক পাতা পড়ার পর থেকে আর থামতে হয়নি, পারিনি বলা ভালো।

বইটা পড়তে গিয়ে যতটা না গুনমুগ্ধ হয়েছি তারচেয়ে অনেক বেশি আফসোস হয়েছে। আহা, এমন একজন মানুষের কাছে দাঁড়িয়ে তাঁর এতো এতো অভিজ্ঞতা আর দর্শনের কথা যদি কিছুক্ষণের জন্যও শুনতে পেতাম, লেখক যদি আরেকটু গুছিয়ে আরও বিশদভাবে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সাথে তার কথোপকথন লিখে রাখতেন যখন শুনতেন, ইনি ছাড়া আরও কারো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যদি জানতে পারতাম এই অসাধারণ জ্ঞানী এবং গুণী মানুষটার কথা! - এবং আরও অনেক আফসোস। বইতে একটা জায়গায় আছে, একদিন বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার সমর সেন স্যারের বাসায় আসবেন এই উপলক্ষে তাঁর বাসায় নানান আয়োজন হয়। সেসময় লেখককে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রান্নাবান্নার ধরণ এবং তার কারণ সম্পর্কে অনেক কিছু বলেন; কিন্তু লেখকের নিজের রান্নাবান্না সম্পর্কে তেমন অভিজ্ঞতা বা আগ্রহ কোনোটাই না থাকায় তিনি তার প্রায় সবটাই ভুলে গিয়েছেন। পুরো বইটাতে এই অংশে আরও কি কি লেখা থাকতে পারতো ভেবে যে আফসোস হয়েছে, এরকম আর হয়নি বলা যায়। এরকম অমূল্য কথাগুলো এভাবে হারিয়ে গেলো!

লেখক নিজেই বলেছেন যে, অধ্যাপকের কথা বা তাঁর চরিত্রকে একেবারে সম্পূর্ণরূপে তুলে ধরা হয়তো সম্ভব হয়নি স্মৃতি থেকে লেখার কারণে। তারপরেও, বিভিন্ন ঘটনা আর বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মন্তব্য যা পড়েছি এখানে, এতেই তাঁর জ্ঞানের পরিধি, প্রজ্ঞা, আর চারিত্রিক গুণের কথা ভেবে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। অথচ তেমন কিছুই জানতাম না এঁর ব্যাপারে বইটা পড়ার আগে! বইটা পড়তে গিয়ে তাঁদের কথাবার্তায় উঠে আসা নামগুলো থেকে অনেকগুলো বই আর লেখকের নাম টুকে রেখেছি, সম্ভব হলে অবশ্যই পড়ে দেখতে চাই এমন সব বই।

কোথায় যেন পড়েছিলাম যে, একজন জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে এক ঘণ্টা বসে থেকে তাঁর কথা শোনা একশ' বই পড়ার চেয়ে বেশি জানায় ও ভাবায়। বস্তুতই এমন মানুষের দেখা পাওয়া ভার। কোনো এক বিষয়ে অনেক জানেন এমন মানুষ থাকলেও বিবিধ বিষয়ে পারদর্শী মানুষ যেমন পাওয়া কঠিন, তেমনি অনেক জানেন কিন্তু শ্রদ্ধা করার মত চরিত্রর দেখা পাওয়া আরও কঠিন। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের কথা থেকে নিয়ে বলা যায়, " বড় লেখকদের মধ্যে বড় মানুষের ছায়া থাকে। বড় মানুষেরা আসলেই বড় মাপের মানুষ।" সেদিন থেকে তাঁর মানুষের গুণের যথার্থ কদর, যার প্রয়োজন তাকে যথার্থ সাহায্য করা, সর্বোপরি উপকার পেয়ে পরে ভুলে যাওয়া মানুষের প্রতি কোনো তিক্ত মনোভাব পুষে না রাখার যে দৃষ্টান্ত দেখেছি তাতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়।

বইয়ের শুরুতে একটু আটকে গেলেও পরে যে আর থামতে পারিনি, তা যেমন লেখনীর গুণ, তেমনি বিষয়ের। এতো ছোট পরিসরের একটা বইতে কত বিষয় আর কত মানুষ সম্পর্কে যে কতো কিছু জানতে পারলাম তা ভেবে কূল পাচ্ছি না আপাতত। লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেষ করছি যার জন্য কিছুটা হলেও এমন একজন ব্যক্তিত্বের কথা জানতে পারলাম।
Profile Image for ORKO.
196 reviews198 followers
April 18, 2021
অনেকদিন আগে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের একটা লেখা পড়েছিলাম। নাম ছিল খুব সম্ভবত "ব্রাহ্মণের বাড়ির কাকাতুয়া".. সেখানে প্রসঙ্গক্রমে শেখ সাদীর একটা কবিতার কথা বলেছিলেন বক্তা। তার মূলটা ছিল অনেকটা এইরকম,
বনের জংলা মতো একটা জায়গায় কবি হাঁটতে হাঁটতে একটা মাটির ঢেলা কুড়িয়ে পেলেন। ঢেলাটাকে কুড়িয়ে নাকের কাছে আনতেই তার গায়ে মিষ্টি অপরূপ এক গন্ধ পেলেন।অথচ,মাটির গন্ধ হবার কথা "সোঁদা"। কবি তখন মাটির ঢেলাকে প্রশ্ন করলেন,"মাটির ঢেলা, তোর গায়ে তো এমন সুগন্ধ থাকার কথা নয় রে।এমন সুঘ্রাণ কী করে এলো?"
মাটির ঢেলা তখন কবিকে বললো,"কবি, তুমি ঠিকই বলেছো। আমার গন্ধ সুন্দর নয়।কিন্তু কী জানো? একটা ব্যাপারে আমি ছিলাম ভাগ্যবান।আমি যে জায়গায় ছিলাম তার ওপরে ছিল একটা বড় আকারের বসরাই গোলাপের গাছ। অপূর্ব গন্ধে ভরা অজস্র বড় বড় গোলাপ ফুটতো সে- গাছে,বহুকাল ধরে তাদের সুগন্ধময় পাপড়িরা ঝরে পড়েছে আমার ওপর। পড়তে পড়তে, পড়তে পড়তে, তাদের গন্ধ একসময় আমার শরীরের পরতে পরতে জড়িয়ে গেছে।তাই আমার গন্ধ গোলাপের মতো এমন সুন্দর হয়ে উঠেছে।"

ঠিক এমনভাবেই প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক স্যারের সংস্পর্শে পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময় ধরে আমাদের দেশের কৃতবিদ্য ব্যক্তিদের বিরাট অংশ নিজেদেরকে সুবাসিত করেছেন,সমৃদ্ধ করেছেন। কে আছে তাঁদের মাঝে,তার থেকে বরং কে নেই সেই তালিকায় এইটা হিসাব করাটা সহজ।আর যারা তাঁর সংস্পর্শে আসেন নি,তাঁর পাণ্ডিত্যের চুম্বকের মতো আকর্ষণী শক্তিতে সম���মোহিত হোন নি সেটা আসলে তাঁদের দূর্ভাগ্যই বলা চলে। আহমদ ছফার শক্তিশালী কলমে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক উপলক্ষ করে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, রাষ্ট্রচিন্তা-সাহিত্য-ব্যক্তিত্ব-ধর্ম-দর্শন-ইতিহাস নিয়ে অকপটে বলে যাওয়া কথাগুলোই এসেছে "যদ্যপি আমার গুরু" বইটিতে। প্রবাদতুল্য অনাড়ম্বর প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের মনীষা, আর মানুষ আব্দুর রাজ্জাকের সম্পর্কে ধারণা গঠনই বইয়ের মূল উদ্দেশ্য।

এই বই নিয়ে আলাদা করে খুব বেশি কিছু বলবার যোগ্যতা বা জ্ঞান আমার নেই। কারণ,অপরিচিত বা কম জনপ্রিয় কোনো বই না এটা। বইটি যারা পড়েছেন আর সবার মতোই আমারও বক্তব্য, এটা মাস্টারপিস এবং একই সাথে কালজয়ী।

জাতীয় অধ্যাপক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাককে চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া বললে মোটেও অতূক্তি করা হবে না।অন্তত এই বইয়ের নানা অংশে তাঁর জ্ঞানবিদ্যার যা পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই সিদ্ধান্তে আসা। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পণ্ডিতদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, ইংল্যান্ড-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়-পণ্ডিতসমাজে তাঁর কীরূপ সম্পর্ক-সমাদর সেসব কথাও প্রসঙ্গক্রমে ফুটে উঠেছে বইয়ের কালো অক্ষরে সাজানো পাতাগুলোতে। তবে আমার মতে সবথেকে বেশি জীবন্ত অংশ হলো, মানুষ হিসেবে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের প্রসঙ্গ। তিনি কীভাবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে কথা বলা মানুষদের সাথেও ডিল করেছেন সেটা বেশ নজর কেড়েছে আমার। প্রসঙ্গক্রমে বলা যেতে পারে,বর্তমানের প্রথিতযশা চিন্তাবিদ সলিমুল্লাহ খানের কথা। উনার সাথে আব্দুর রাজ্জাক স্যারের খুব সম্ভবত আপাত আইডিওলজিক্যাল ক্ল্যাশ ছিল। তারপরও তার প্রতি আব্দুর রাজ্জাক স্যারের উদার মনোভাব আর সর্বাত্মক সহযোগিতা নজর কাড়ে। আবার বলা যেতে পারে,
মার্কিন নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের কথা। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার কর্মকাণ্ড ছিল বাংলাদেশ বিরোধী। আব্দুর রাজ্জাক স্যারের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো থাকলেও উনি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পছন্দ করতেন না।তারপরও আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে কিসিঞ্জারের কলিগ বলে সম্বোধন করাটাকে কী বলবেন?

এতো বড় পণ্ডিত ব্যক্তি হয়েও রাজ্জাক স্যারের সজ্জন্যতা আর নির্লিপ্ততা দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়। আরো বেশি চমকিত হই যখন জানতে পারি, প্রবাদতুল্য এই অকৃতদার কৃশকায় মানুষটি এতোটাই নিভৃতচারী যে,সারাজীবনে কোনো বই তিনি লেখেন নি! অথচ দশকের পর দশক ধরে তরুণ বিদ্যার্থীদের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন। এমন একটা মানুষের জ্ঞানের আধার থেকে আমাদের জন্য যে কিছু রেখে গেলেন না,লিখে গেলেন না,দিয়ে গেলেন না, ক্ষতিটা টের পাচ্ছিলাম ক্ষণে ক্ষণে।
মাতৃস্তনে শিশুর যেরকম অধিকার, শিক্ষকদের স্নেহের ওপরও ছাত্রদের সেরকম অধিকার থাকা উচিত- মানুষ আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে মনে হয়েছে এর থেকে পার্ফেক্ট
ডেফিনিশন আর হয় না।

পুরো বইয়ে শুধু প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকই নন,সাথে আরো কয়েকজনের জীবনও পরোক্ষভাবে ফুটে উঠেছে বইয়ের নানা জায়গায়। বিশেষভাবে বলা যেতে পারে, শিল্পী এস এম সুলতানের কথা। সেসময় তো উনি যথোপযুক্ত মূল্য পান নি,আমাদের সমাজ এখনো তাঁকে ঠিকমতো মূল্যায়ন করে না।
পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন এদিকে সব আধুনিক চিত্রকলা নিয়ে কাজ হচ্ছে, নিভৃতে সবার অলক্ষ্যে তুলির আঁচড় কেটে গেছেন শিল্পী এস এম সুলতান।এই মানুষ টাকে অনেকটা সময় ধরে কেউ চিনতোও না। এ বিষয়েই ছফা লিখেছিলেন,
"কোনো কোনো মানুষ জন্মায়, জন্মের সীমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না। অথচ যাদের সবাইকে ক্ষণজন্মাও বলা যাবে না। এরকম অদ্ভুত প্রকৃতির শিশু অনেক জন্মগ্রহণ করে জগতে, জন্মের বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যাদের রয়েছে এক স্বাভাবিক আকুতি। শেখ মুহাম্মদ সুলতান সে সৌভাগ্যের বরে ভাগ্যবান, আবার সে দুর্ভাগ্যের বরে অভিশপ্তও।"
আছে নিয়াজ মোর্শেদের গ্র্যান্ডমাস্টার হবার গল্প,আর তার পেছনে আব্দুর রাজ্জাক স্যারের ভূমিকার কথা।

তাছাড়াও আহমদ ছফার "বাঙালি মুসলমানের মন" রচনার সময়, মহাকবি গ্যোটে’র "ফাউস্ট" অনুবাদের সময় রাজ্জাক স্যারের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ তাকে কীভাবে প্রভাবিত উপকৃত করেছে তারও উল্লেখ পাওয়া যায় নানা জায়গায়।

যাক সে কথা, "যদ্যপি আমার গুরু" পড়ে মানুষ যতটা না আহমদ ছফার লেখনীর প্রশংসা করেন,তার থেকে বেশি ফ্যান হোন প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক স্যারের। তবে পড়ার সময় আমি এটা মাথায় রেখেছি যে,আমি আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে দেখছি আহমদ ছফার পার্সপেক্টিভ থেকে। ছফা নিজেই বলছেন রচনাটি দাঁড়াচ্ছে মহাকবি আলাওলের ভাষায়-
"গুরু মুহম্মদে করি ভক্তি, স্থানে স্থানে প্রকাশিব নিজ মনোউক্তি" অনেকটা এরকম।
তাই কখনো কখনো কিছু ফ্যাক্টস অতিরঞ্জিত বলে মনে হয়েছে। যেমন: দু'জায়গায় বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ধারণাটিও রাজ্জাক স্যারের মস্তক থেকে এসেছিলো। আবার আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, ছয় দফার আইডিয়াও এসেছিল রাজ্জাক স্যারের মাথা থেকে। এই দুটো বিষয় নিয়ে আমার বেশ খটকা কাজ করেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে রাজ্জাক স্যারের স্ট্যান্ড নিয়েও কোনেকিছু ক্লিয়ার করা হয়নি, থেকে গেছে ধোঁয়াশা। যেমন: একাত্তর পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর শাসনব্যবস্থার কথা আসলেও ১৯৭১ এর যুদ্ধে আব্দুর রাজ্জাক স্যারের ভূমিকা,৭৫ এ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড কিংবা জাতীয় চার নেতার নৃশংস হত্যা নিয়ে তাঁর স্ট্যান্ড বা বক্তব্য এগুলো নিয়ে তেমনভাবে কিছুই বলা হয় নি। কিন্তু দেখা গেছে যে,বিভিন্ন সরকারের আমলে নিযুক্ত স্বনামধন্য মন্ত্রী-আমলারা কোনো না কোনোভাবে আব্দুর রাজ্জাক স্যারের সংস্পর্শে এসেছেন।

তাছাড়া সমসাময়িক বিষয়াবলী,সমাজের নানা সংকীর্ণতা, সীমাবদ্ধতা এসেছে নানাপ্রসঙ্গে।এসব নিয়ে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক ও আহমদ ছফার কথোপকথন বেশ উপভোগ্য। অর্থনীতি নিয়ে জ্ঞান সীমিত থাকার কারণে দু তিনটে চ্যাপ্টার আমার মাথার উপর দিয়ে গেছে।তবে সেজন্য যে, বইটার প্রতি আমার ভালো লাগা কমেছে,বা বইয়ের ব্যর্থতা আছে,সেটা বলবো না।কারণ,অর্থনীতি বাদে বাকিসব বাতচিত,মতাদর্শের আলাপ আমি বেশ ভালোমতোই আস্বাদন করেছি।বইয়ের বিষয়বস্তু মোটেও কাঠখোট্টা বা গুরুগম্ভীর নয়,বরং বেশ হিউমার আর উইটে পরিপূর্ণ।
বইয়ের কিছু উক্তি আমার চেতনায় বড়সড় দাগ কেটেছে। বিশেষত-
"বুঝলেন,মৌলবি আহমদ ছফা, লেখার ব্যাপারটা অইল পুকুরে ঢিল ছোঁড়ার মতো ব্যাপার।যতো বড় ঢিল যতো জোরে ছুঁড়বেন পাঠকের মনে তরঙ্গটাও তত জোরে উঠব এবং অধিকক্ষণ থাকব। আর পড়ার কাজটি অইল অন্য রকম।আপনে যখন মনে করলেন,কোনো বই পইড়্যা ফেলাইলেন,নিজেরে জিগাইবেন যে- বইটা পড়ছেন,নিজের ভাষায় লিখতে পারবেন কি না। আপনের ভাষার জোর লেখকের মতো শক্তিশালী না অইতে পারে,আপনের শব্দভাণ্ডার সামন্য অইতে পারে,তথাপি যদি মনেমনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবার পারেন,ধইরা নিবেন, আপনের পড়া অয় নাই।"

বইয়ের প্রোডাকশন নিয়ে আমার একটু অভিযোগ আছে। দেশে ভালো বইয়ের এমনিই বিক্রি নাই,সেখানে এটার অষ্টম সংস্করণ অবধি এসেছে। তুলনামূলকভাবে এর বাঁধাইয়ের দিকে নজর দেয়াটা বোধহয় এখন জরুরি। আর বইয়ের দুই পৃষ্ঠায় দুইরকম ফন্ট সাইজ ব্যবহারের কারণ কী? এক পেজে ১২, আরেকপেজে ১৪.. এদিকে নজর দেয়াটা উচিত।

আমার মনে হয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেরা ৫০০ বইয়ের শীর্ষে যে বইকে রেখেছে,সেটা না পড়াটা প্রতিটি বাঙালির জীবনে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার ন্যায়। বইয়ের সার্থকতা এই যে,
আজ প্রায় ২১ বছর আগে আব্দুর রাজ্জাক স্যার মৃত্যু বরণ করেছেন,তারপরও আমরা এই প্রজন্মের মানুষ তাঁর সম্পর্কে জানছি,পড়ছি আর অবাক হচ্ছি। কথামৃতের অনুসরণে তাই বলতে ইচ্ছা হয়,
"যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়িবাড়ি যায়,
তথাপি তাহার নাম নিত্যানন্দ রায়।।"

একনজরে-
বইয়ের নাম: যদ্যপি আমার গুরু
লেখক: আহমদ ছফা
প্রকাশনা: মাওলা ব্রাদার্স
প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮
মুদ্রিত মূল্য: ১৭৫ টাকা
পৃষ্ঠা: ১১০

ব্যক্তিগত রেটিং : ৪/৫
গুডরিডস রেটিং: ৪.৩৭/৫
Profile Image for Zabir Rafy.
312 reviews10 followers
February 12, 2025
বই: যদ্যপি আমার গুরু
লেখক: আহমদ ছফা

যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার একবার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছিলেন। তার সম্মানে ভোজের আয়োজন করা হয় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। সেখানে তিনি সাকুল্যে ৪৫ মিনিট অবস্থান করেছিলেন। গুজব আছে, এর মধ্যে তিনি ২৫ মিনিট কাটিয়েছেন প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সাথে!

এই হলেন প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক। হ্যারল্ড যে লাস্কি থেকে হেনরি কিসিঞ্জার, হোসেন সোহরাওয়ার্দী থেকে ফজলুল হক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল যার উঠবস। বিস্মিত হলাম, একজন মানুষ স্রেফ জ্ঞান অর্জন করেই ���্রভূত সামাজিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।

প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক হয়েছিলেন জাতীয় অধ্যাপক। তাকে চলন্ত বিশ্বকোষ বল্লেও অত্যুক্তি করা হয় না। তাকে নিয়ে লেখা আহমদ ছফার "যদ্যপি আমার গুরু" পড়লে এটাই ধারণা হবে আপনার।

তিনি সোহরাওয়ার্দীর মতো কোনো পলিটিক্যাল পারসন নন। গুল মোহাম্মদ আদমজীর মতো কোনো ধনকুবের নন। কিংবা সলিমুল্লাহর মতো অভিজাত কেউ নন।

তিনি একজন জ্ঞানতাপস। বিভিন্ন বিষয়ে তার অগাধ জ্ঞান। তা সেটা ভারতীয় রন্ধনশিল্প হোক তা সংগীত। ইতিহাস, অঅর্থনীতি, সংসস্কৃতি, সমাজ সসংস্কার নিয়ে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তিনি। ছফার মতো লোকটাও তাঁর সামনে কেঁচো হয়ে বসে থাকতেন।

একজন ব্যক্তি সারাজীবন স্রেফ জ্ঞানঅর্জন করেই দেশ-বিদেশের প্রভাবশালী মানুষের উপরে প্রভাব বিস্তার করেছেন।

ছফার সাথে তাঁর পরিচয় পিএইচডির থিসিসের জন্য সুপারভাইজ করা নিয়ে। ছফা তার কাছে গেসিলেন তিনি যেন তার পিএইচডিতে সুপারভাইজ করেন।

এরপর নিয়মিত ছফা তার বাসায় যেতেন বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করার জন্য। প্রফেসর কখনো তাকে ফিরিয়ে দেননি।

"মৌলবি আহমদ ছফা, আপনি কি অমুক বিষয় সম্পর্কে জানেন?"

"ভাসা ভাসা জানি স্যার..." ছফা কেঁচোর মতো উত্তর দিতেন।

তারপর লাইব্রেরি থেকে প্রফেসর বের করে দিতেন অমুক বিষয়ে লেখা প্রসিদ্ধ কোনো বই।

বইটা বেশ সুখপাঠ্যই বলা যায়। ছফা সম্ভবত জীবনী লিখতে চেয়েছেন। কিন্তু বইটা হয়েছে ঘটনাবলী। ছফার সাথে প্রফেসরের মিথস্ক্রিয়া উঠে এসেছে লেখায়। ছফা স্বীকার করেছেন দিন তারিখ তার মনে থাকে না। কাজেই লেখাটাকে কেউ যেন ডায়েরি মনে না করেন।

কোথাও কোথাও ঘটনাবলীর টাইমলাইন একটু ভিন্ন মনে হয়েছে আমার। মানে ধারাবাহিক লেখা মনে হয়নি কয়েক জায়গায়।

তবে এসব কোনো ব্যাপার নয়। ছফার ন্যায় একজন জ্ঞানতাপস লিখেছেন আরেক মহারথীকে নিয়ে, এই বইয়ের সমালোচনার সাধ্য আমার নেই।

বইটার সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং পার্ট মনে হয়েছে, বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সত্যবচন।

বইটা রেকমেন্ডেড।

রেটিং ৫/৫
Profile Image for Daina Chakma.
440 reviews773 followers
February 20, 2017
আটপৌরে কথোপকথনের ছলে আহমদ ছফা তাঁর শিক্ষকের গল্প বলে গেছেন। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের গল্প যাকে বলা হয় শিক্ষকদের শিক্ষক! শিক্ষক নাকি অতিমানব?! একটা মানুষের জানার পরিধি এত বিস্তৃত হতে পারে!

মুগ্ধ হয়ে ছাত্র শিক্ষকের আলাপচারিতা পড়ে গেছি। তখনকার দিনে শিক্ষকেরা ছাত্রদের এতটা প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখতো!
Profile Image for Shahriar Kabir.
107 reviews42 followers
November 16, 2019
প্রথম কথা সেই ইংরেজি প্রবাদটি- Don't judge a book by its cover.
আবদুর রাজ্জাক হলেন এই প্রবাদটির উদাহরণ। স্বাধীনতা উত্তরকালীন চার জাতীয় অধ্যাপকের একজন।
তাকে বলা হয় শিক্ষকদের শিক্ষক। তাঁর বেশভূষা ও ভাষা হচ্ছে বইয়ের মলাট, তাঁকে জানতে হলে তাঁকে পড়তে হবে।
তাঁকে পড়ার সুযোগ তো সৃষ্টিকর্তা রাখেন নি, তো আহমদ ছফার এই বইটি পড়া যেতে পারে।

আটপৌরে পোষাক ও ঢাকাইয়া ভাষার ভেতর দিয়েও তাঁর মনীষা, প্রজ্ঞার সৌন্দর্য ঝরঝর। যারা বড় তারা যে শুধু পড়েই বড় হন না, প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক সে দাগটিও কেটেছেন। বড় হতে হলে ভালোও হতে হয়, পরের কড়া কথা শোনার শক্তিও থাকতে হয়। শক্তিমানের জন্য কড়া কথা শোনানো মানুষের জন্যও শুভকামনার শক্তি থাকতে হয়। একজন বড় লেখকের বেলায়ও তা সত্যি।
আমার সৌভাগ্য আমি একজন জীবন্ত বইকে নিয়ে লেখা বই পড়েছি।
Profile Image for Zunaed.
54 reviews119 followers
June 27, 2017
শিক্ষক তো অনেকেই হন, ছাত্রের মনে গুরুর জায়গা কয়জন দখল করে নিতে পারেন? বাকিদের কথা জানি না, আমি আমার কথা বলতে পারি। আমার এই ছোটো জীবনে স্কুল-কলেজ-কোচিং মিলিয়ে অনেক শিক্ষকের কাছ থেকেই তো শিক্ষা পেলাম, কিন্তু তাঁদের কয়জন গুরু হিসেবে মনে গুরুত্ব পেয়েছেন? হাতে গোণা কয়েকজন। সেই কয়েকজন তাঁদের ব্যক্তিত্ব আর জ্ঞান দিয়ে আমার আর আমার বহু সতীর্থের মনে জায়গা করে নিয়েছেন, নিচ্ছেন।

"যদ্যপি আমার গুরু" বইটাকে আহমদ ছফার গুরুদক্ষিণা বলা যায়। বইটা সম্পর্কে বেশ ভালো ভালো কথা শুনেছি, অনেকেই রিকমেন্ডও করেছেন। তাই শুরু করার সময় আশার মাত্রাটা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু সম্ভবত আমারই ব্যর্থতা, বইটা সেভাবে ভালো লাগেনি।

কেন লাগেনি? প্রথমত, বইটা ছোট, তবুও কেন যেন আমার কাছে টেনে টেনে বড় করা বলে মনে হয়েছে। আহমদ ছফা যা বলতে চেয়েছেন, তার বাইরে কিছু বলেছেন বলে মনে হয় না। তবুও উনার লেখার যে স্বতঃস্ফূর্ত ধারাটা আছে, যেটা আগের বইগুলো পড়ার সময় অনুভব করেছি, সেটা এখানে সেভাবে অনুভব করিনি। মাঝপথে এসে তো একটা সময় খানিকটা জোর করেই পড়তে হয়েছে।

যাঁকে নিয়ে বইটা লেখা, জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক নিঃসন্দেহে জ্ঞানী ছিলেন। মানুষ হিসেবেও সম্ভবত অসাধারণ ছিলেন। কিন্তু তাঁর অনেক মতের সাথেই আমি একমত হতে পারিনি। উনার মত জ্ঞানী লোকের ভাবনাকে ভুল বলার স্পর্ধা আমার নেই। তবুও আমি যে এধরনের ভাবনায় বিশ্বাসী নই, সে কথাও বলতে দ্বিধা নেই।

সব মিলিয়ে বলতে গেলে এই প্রথম আহমদ ছফার কোনো বই ভালো লাগেনি। বড় হয়ে আরেকবার পড়তে হবে, দেখি তখন আরেকটু বেশি বুঝতে পারি কি না, দেখি আরেকটু বেশি ভালো লাগে কি না।
Profile Image for Momin আহমেদ .
112 reviews49 followers
March 5, 2021
বই পড়ার আগে আব্দুর রাজ্জাক সার সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। প্রথম হয়তো গুডরিডস এই এই বই এর রিভিউ গুলোতে অথবা সরদার ফজলুল করিমের আব্দুর রাজ্জাক স্মারক গ্রন্থে ওনার নাম এর উল্লেখ প���য়েছি। এই বই পড়ার আগে যদি আব্দুর রাজ্জাক সার সম্পর্কে বা তার কাজ সম্পর্কে কিছু জানা থাকত তাহলে আরও বেশি উপভোগ করতাম। কিন্তু বই পড়ার সময় আবার জানতে পারলাম যে আব্দুর রাজ্জাক সাহেব নাকি কন সময় ই লেখালেখি করেননি। তাহলে ওনার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ খুব একটা ছলও না।

বইটা আমি অত্যন্ত উপভোগ করেছি। যাকে বলে মগজে জ্বালানী সরবরাহকারী বই এ হল তেমন বই। তবে কেমন যেন মনে হয়েছে আহমদ ছফা তার গুরু সম্পর্কে একটু বাড়াবাড়ি করেছেন। আমি আগেই উল্লেখ করেছি আমি আব্দুর রাজ্জাক সার এর সাথে আগে পরিচিত ছিলাম না তাই আমার এই মনে হওয়া ভুল হতেই পারে।

Profile Image for হাঁটুপানির জলদস্যু.
299 reviews228 followers
January 22, 2019
পত্রিকায় প্রকাশিত টুকরো স্মৃতিকথা পরপর জুড়ে দিলে ফর্মার দাবি পূরণ হয়, কিন্তু সেটাই বই হওয়ার একমাত্র শর্ত নয়। আহমদ ছফা গোছানো কলামলেখক ছিলেন হয়তো, কিন্তু গোছানো বইলেখক ছিলেন না। এমন লেখকদের জন‍্যেই বই-সম্পাদক জরুরি, পড়তে গেলে টের পাওয়া যায়। স্মৃতিচারণ কালানুক্রমিক নয় বলে মাঝেমধ‍্যে একটু হোঁচট খেয়েছি।

বইটা ছোটো, ফুড়ুৎ করে শেষ হয়ে যায়; কিন্তু স্মৃতিচারণে লেখকের খানিকটা অসততা আছে, এমন অনুসিদ্ধান্ত না টানা কষ্টকর। বঙ্গবন্ধু হত‍্যাকাণ্ড, জিয়া হত‍্যাকাণ্ড, এরশাদের ক্ষমতাদখল, সামরিক শাসন, এগুলোর কোনোটিই গুরু-শিষ‍্যের আলাপে সামান‍্যতম দাগ ফেলেনি, এমনটা ধরে নিতে কষ্ট হয়, বিশেষ করে ছফা নিজেই যখন নানা জায়গায় বঙ্গবন্ধু হত‍্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন।
Profile Image for Azmain Tur Haque.
9 reviews44 followers
June 15, 2015
ছফার উপন্যাস কিংবা সাক্ষাৎকারের আগে পড়লেও তার টানা গদ্য পড়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম, এবং একরকম
অতুলনীয়। অপ্রতিম গদ্যের স্টাইল আহমদ ছফার, অনেকটা কাঁচা লেখার মতো জীবন্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
কিংবদন্তি শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক-এর সাথে যাপিত সময়ের কথাবলা...

আগেপরে লাভক্ষতি না ভেবে নিষ্কাম জ্ঞানচর্চা করে যাওয়ার সাধনার বিবরণ এসেছে, বাঙালি মুসলমানের দৃষ্টি থেকে পাকিস্তান দেশভাগ আর ভারতপ্রসংগ এসেছে বেশ কয়েকবার। সৈয়দ আলি আহসান, এসএম সুলতান, জয়নুল আবেদীন, নেহেরু সম্বন্ধে রাজ্জাকচিন্তা এসেছে ঘুরেফিরে।

আবদুর রাজ্জাক-এর চরিত্রটি যদিও ছফার মুগ্ধতাআক্রান্ত দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা, তবুও তা বেশ আগ্রহসঞ্চারী আর আনন্দদায়ক, পাঠক হিসেবে বইয়ের শেষ পর্যন্ত পড়ে এই ঢাকাইয়া ইন্টেলেকচুয়াল বুড়াকে খুব কাছের মানুষ মনে হতে থাকলো...

এই বইটি নিয়ে অনেক কথা জমে থাকে পড়বার সময়ই, ছফা তার রাজ্জাকপ্রেম পাঠকের মধ্যে ছড়ায় দিতে ঠিকঠাক সক্ষম হন।

হুমায়ূন আহমেদ-এর আত্মজৈবনিক কিছু টেক্সট পড়ে এবং পরে পুরো মিসির আলি সিরিজটা পাঠ করে আমার একটা ধারণা জন্মেছিল, যদ্যপি আমার গুরু- পড়তে গিয়ে আরো দৃঢ় হলো, মিসির আলির চরিত্রটি অনেকাংশে জনাব আবদুর রাজ্জাক-এর চরিত্রের ছায়ায় তৈয়ার করা, ছফা যেভাবে রাজ্জাকের দৃষ্টির বর্ণনা দিয়েছেন, তা প্রায় অবিকল হুমায়ূন-এর সাথে মিলে যায়...

যদ্যপি আমার গুরু- ছফার অন্যান্য গদ্য পড়ার প্রতি আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দিলো।
Profile Image for Debashish Chakrabarty.
108 reviews94 followers
April 17, 2021
পুনর্পাঠ

বিশেষ কারণে এই বইয়ের কাছে ফিরে আসতে হলো। বারবার ফিরে যাওয়ার মত বই আমাদের আশপাশে কম। আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে বেশি কিছু বলার ইচ্ছা আমার নাই। তাও কথার কিছুটা বরখেলাপ করে কিছু বলে যাই।

আমাদের রাষ্ট্রে এবং সমাজ যাদের একটু বই পড়ার অভ্যাস আছে, পাণ্ডিত্য আছে বা পাণ্ডিত্য অর্জন করার প্রেরণা আছে তাদের সিস্টেমেটিক্যালি এড়িয়ে চলে-নিরুৎসাহিত-হেয় করে। কে না জানে এখানে পাণ্ডিত্য না বরং নেটওয়ার্কিং বা ক্ষমতার পদলেহন হচ্ছে উন্নতির চাবি কাঠি। আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা জানি না একটা সমগ্র জীবন দিয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করা ব্যক্তিরা দেখতে শুনতে কেমন হয়। আহমদ ছফা এমন একজন পণ্ডিতের দেখা পেয়েছিলেন। সেই দেখা, জীবন কথা ছফা তার স্বভাবসুলভ একটু বেখেয়ালি ধাঁচে লিখে গেছেন। এজন্য এই বইয়ের লেখা খুব ইন্টিমেট। এটাও আমাদের সামান্য সৌভাগ্য। কথা হচ্ছে চিন্তার উচ্ছিষ্ট, আর ছফার রাজ্জাক স্মৃতিলেখন তবে উচ্ছিষ্টের উচ্ছিষ্ট। বার বার এক কথা শোনা যায় রাজ্জাক সাহেব এত বড় পণ্ডিত হলে কিছু লিখে যান নাই কেন। এ কথার ব্যাখ্যা ছফা নিজেই দিয়েছেন। জ্ঞান উৎপাদনের জন্য সমাজ থেকে এর সামান্য কিছু হলেও চাহিদা, উৎসাহ থাকতে হয়। তা না থাকলে প্রকাশের ইচ্ছা জন্মে না। আর আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে সকলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এক নয়। আজকাল শিরদাঁড়া সোজা করে চলা মানুষের খুবই অভাব। ছফা নিজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষকদের অন্তঃসারশূন্য ব্যবহারে এবং বনিবনা না হওয়ায় নিজের আত্মসম্মানবোধের চরম প্রমাণ দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অখ্যাত এক কলেজ থেকে প্রাইভেটে গ্রাজুয়েশন করেছিলেন। এই কথা এখন ভাবা যায়? আমরা এখন নিশ্চয়ই বলবো না যে আহমদ ছফার যোগ্যতাটা ছিল না বলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্সটা পাশ করেন নাই। তবে এই ঘোলা জলে, অন্ধকার এক সময়ে বসে এমন এক রাজ্জাককে আমরা কি করে বুঝব? যেখানে আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটা ডিগ্রি নিয়ে জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা। এমনকি একাডেমীতেও গবেষণার মূল লক্ষ্য হচ্ছে উঁচু পদ এবং তার সাথে সাথে অতিরিক্ত ক্ষমতা-স্বাচ্ছন্দ্য অর্জন। তাহলে আমাদের ভেবে দেখতে হবে, একটা মানুষের এমন জাগতিক আকাঙ্ক্ষা না থাকলে, একাডেমীতে-সমাজে জ্ঞানের প্রতি তৃষ্ণা-উৎসাহ না থাকলে আবদুর রাজ্জাকের মতন পণ্ডিত গবেষণাপত্র প্রসব করবেন কোন প্রেরণায়?

তারপর, ছফা যেই গুরুকে এত শ্রদ্ধা করেছেন, যার প্রতি সম্মান বা আগ্রহ তার কোনদিনই কমেনি এমন শিক্ষককে নিয়ে লিখতে গিয়ে পাতার পর পাতা ভক্তিগদগদ হয়ে যায় নি। বরং বহু বার বহুস্থানে দ্বিমত এমনকি ক্ষীণ অনুযোগও আছে। তার পরে, অনেক কথা শোনা যায় এটা নাই কেন ওটা নাই কেন, সেটা নিয়ে কিছু বললেন না কেন। এটাও আমাদের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক নীচতার ফসল। কি নেই, তা নিয়ে না ভেবে যা আছে সেদিকে লক্ষ্য করতে আমাদের শেখান হয় নাই। আর এখানে কেউ তো নবী না, নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে বিচার করে দেখেন, যে জিনিস কাজে লাগবে তা রেখে বাকিটা ফেলে দিলেই তো হচ্ছে।
Profile Image for Farhad Naeem.
36 reviews12 followers
January 14, 2019
"মৌলবি" আহমেদ ছফার এই প্রথম একটা বই পড়লাম!
ছোট্ট একটা বই, মাত্র ১১০ পাতার! সব মিলিয়ে ৩ ঘন্টা লাগলো পড়ে শেষ করতে! এই বইটার প্রতিটা পাতাতে মুক্তা ঝরতেছিল! অনেক অনেক রেফারেন্স, অনেক অনেক তথ্য! এর সব কিছুই আপনারে বিমোহিত করতে বাধ্য করবে! লেখাগুলা অবশ্য কিছুটা অগোছালো! অগোছালো হওয়ার কারন ও অবশ্য আছে। এই বইটা আসলে আহমেদ ছফার, তার গুরু 'জাতীয় অধ্যাপক' স্যার আব্দুর রাজ্জাক এর প্রতি গুরুদক্ষিনা! আবদুর রাজ্জাক সাহেব যেহেতু নিজে কিছু লেখেননি, তাই এইসব বই পড়া ছাড়া তাঁকে জানার কোনো রাস্তা ও নাই। এই বইটাকে স্যার আব্দুর রাজ���জাক এর আত্মজীবনী না বলে, স্যার আব্দুর রাজ্জাক এর সাথে আহমেদ ছফা সাহেবের কথোপকথন এবং আহমেদ ছফা তার গুরুকে কিভাবে মুল্যায়ন করেছেন তার একটা ছোট্ট সমষ্টি! আমরা চায়ের টঙ্গে চা-বিড়ি খেতে খেতে দেশ-দুনিয়া-রাজনীতি-সংসার এইগুলা নিয়ে যেভাবে কথা বলি, আহমেদ ছফা এবং স্যার আব্দুর রাজ্জার এর আড্ডাগুলা এমনই ছিল! আমরাও যেমন চায়ের আড্ডাতে গীবত করি, উনাদের আড্ডাতেও এমন গন্ধ পাওয়া যায়! বাংলা-পূর্ববর্তী সময়ে মুসলমানে সমাজ এবং সাহিত্যে তাদের লেখার বৈচিত্র্যের কথা রাজ্জাক স্যারের যেমন মুখের আগাতেই ছিলো, ঠিক তেমনি ছিলো বর্তমান সময়ের কোন সামাজিক নায়ক কোথায় কেমন ছিলো তার খোঁজ খবরও। শেখ মুজিবর রহমান, এ.কে. ফজলুল হক, ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, মুনীর চৌধুরী, বঙ্কিম, নজরুল, রবিঠাকুর, মোতাহের হোসেন – কেউই বাদ যায়নি আলোচনা-সমালোচনার হাত থেকে। সবাইকে দেখলাম প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকেরই চোখে।

কেমন ছিলেন এই স্যার আব্দুর রাজ্জাক?
উনি ছিলেন শিক্ষকদের শিক্ষক, গুরুদের গুরু, চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া!
তার একটা কথা আছে এমন, "প্রথম লাইব্রেরিতে ঢুইক্যাই আপনার টপিকের কাছাকাছি যে যে বই পাওন যায় পয়লা একচোটে পইড়া ফেলাইবেন। তারপর একটা সময় আইব আপনে নিজেই পাইবেন আপনের আগাইবার পথ।"
স্যার আব্দুর রাজ্জাক জানতেন না এমন বিষয় মনে হয় ছিল না, আহমেদ ছফা সেভাবেই তুলে ধরছেন! বইয়ের ফ্ল্যাপের লেখা আছে -"তার পাণ্ডিত্যের খ্যাতি সর্বজনবিদিত। সমকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠসমূহের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের অনেকেই একবাক্যে তার মেধা আর ধী-শক্তির অনন্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন।"
এতো প্যাশনেট একটা মানুষ, এতো পণ্ডিত একটা মানুষ তাও তার নিজের কোন সেলিব্রেটি হওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না, টাকা পয়সার প্রতিও কোন টান ছিল না! মানুষটা কিন্তু চাইলেই পারতেন বিদেশে থেকে নিজের নামযশ কামাতে। তা না করে, এই লোক তার শিক্ষক হ্যারল্ড লাস্কির মৃত্যুর পর গবেষণাপত্র প্রকাশ না করেই চলে আসেন। কারণ তার ধারণা ছিল, লাস্কি ছাড়া আর কেউ সে পেপারের মর্যাদা বুঝবেন না! খুবই একরোখা একটা মানুষ ছিলেন!

জ্ঞানের এমন পাহাড় মানুষকে অহংকারী বানায়, কিন্তু ইনি ছিলেন পুরো উলটো! অনেক বিনীত একজন মানুষ ছিলেন, তাকে উৎসর্গ করে দেশে বিদেশে কম বই বেরয়নি, কম পেপার-জার্নালও না। তবে কেন জানি খুব নির্বিকার থাকতে পারতেন। মানুষ হিসেবে ছিলেন পরোপকারী এবং গুণীজনরে মুল্য দিতে জানতেন! কোন মানুষের ভিতর সামান্য কোন ট্যালেন্ট দেখলে, উনি সেটারে উঠায় আনার জন্য সবকিছু করে দেখাইছেন! দাবাড়ু নিয়াজ মোরশেদ, চিত্রকার এস এম সুলতান এদের তুইলা আনতে উনি অনেক কিছু করছেন! আহমেদ ছফা নিজেও বলেন, স্যার আব্দুর রাজ্জাক এর সাথে পরিচয় না হইলে, উনি আজকের এই আহমেদ ছফা হইতে পারতেন না!

স্যার আব্দুর রাজ্জাক এর সবচেয়ে যে জিনিশটা আমারে আকর্ষণ করছে, সেটা হলো তার সিমপ্লিসিটি! ছেড়াফাটা জামা পড়তেন, পাঞ্জাবী-লুঙ্গি পড়ে বাজারে যাইতেন, বাসায় ফিরার পথে প্যাক কাদায় মাখামাখি হয়ে থাকতো! তিনি পুরান ঢাকার মানুষ ছিলেন, খাস পুরান ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলতেন! কবি জসিমউদ্দিন এর নাম বলতেন জছিমুদ্দিন! পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ধরে রাখছিলেন! অত্যন্ত ভোজনরসিক মানুষ ছিলেন, খাইতে পছন্দ করতেন, মানুষরে খাওয়াইতেও পছন্দ করতেন! একটা জাতির মানদন্ড করতেন এইভাবে, "কোন দেশের মানুষকে চিনতে হলে প্রথমে দেখতে হবে তারা কি খায়, আর তারা কি ধরণের বই পড়ে। কি খায় সেটা জানতে যাবেন কাঁচা বাজারে, আর কি পড়ে সেটা দেখতে যাবেন তাদের বইয়ের দোকানে। পুরো জাতির ব্যাপারে সম্যক ধারণা এখানেই পেয়ে যাবেন"! ব্যাক্তি হিসেবে স্যার আব্দুর রাজ্জাকের কয়েকটা জিনিস আমারে আহত করেছে, তার মধ্যে একটা হইলো তার স্যেকুলারিজম, বইয়ে অবশ্য এইগুলা নিয়ে কথা হয় নাই!

ছোট্ট একটা বই, তাও কেন এতো কথা লিখলাম? "যদ্যপি আমার গুরু" বইটা পড়ে, বই পড়াটা নতুন ভাবে শিখলাম! শেষে তার একটা কথা কোট না করলেই নয়, "লেখার ব্যপারটি অইলো পুকুরে ঢিল ছোড়ার মত। যত বড় ঢিল যত জোড়ে ছুড়বেন পাঠকের মনে তরঙ্গটাও তত জোড়ে উঠব এবং অধিক্ষণ থাকব। আর পড়ার কাজটি অইলো অন্য রকম। আপনে যখন মনে করলেন, কোন বই পইড়্যা ফেলাইলেন, নিজেরে জিগাইবেন যে বইটা পড়েছেন, নিজের ভাষায় বইটা আবার লিখতে পারবেন কিনা। আপনের ভাষার জোর লেখকের মত শক্তিশালী না অইতে পারে, আপনের শব্দভান্ডার সামান্য অইতে পারে, তথাপি যদি মনে মনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবান পারেন, ধইর‍্যা নিবেন, আপনের পড়া অয় নাই।"
Profile Image for Shahidul Nahid.
Author 5 books142 followers
February 17, 2017
বইঃ যদ্যপি আমার গুরু
লেখকঃ আহমদ ছফা
পৃষ্ঠাঃ ১১০
দামঃ ১৭৫টাকা
রেটিংঃ ৪.৫/৫

( চাইলে অনলাইনে #আরণ্যক থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন, ২৫% ডিসকাউন্টে )

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ

* জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এর সাক্ষাৎকার কিংবা তার জীবনের চুম্বক অংশ, ব্যক্তিত্ব উঠে আসছে বইটা। আমার কাছে অসাধারণ এক ব্যক্তিত্বের মানুষ লাগলো। শিক্ষক হিসেবে যার তুলনা তিনি নিজেই...

* বই পড়া নিয়ে তাঁর এই মন্তব্যটা বাঁধিয়ে রাখার মতোনঃ
“প্রথম লাইব্রেরিতে ঢুইক্যাই আপনার টপিকের কাছাকাছি যে যে বই পাওন যায় পয়লা একচোটে পইড়া ফেলাইবেন। তারপর একটা সময় আইব আপনে নিজেই পাইবেন আপনের আগাইবার পথ।”

* এই বই পড়ে আবার নতুনভাবে বই পড়া শিখলাম ।

“পড়ার কাজটি অইল অন্যরকম। আপনে যখন মনে করলেন, কোনো বই পইড়্যা ফেলাইলেন, নিজেরে জিগাইবেন যে বইটা পড়ছেন, নিজের ভাষায় বইটা আবার লিখতে পারবেন কিনা। আপনের ভাষার জোর লেখকের মতো শক্তিশালী না অইতে পারে, আপনের শব্দভান্ডার সামান্য অইতে পারে, তথাপি যদি মনে মনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবার পারেন, ধইর‍্যা নিবেন , আপনের পড়া অয় নাই।”

* পোশাক নিয়ে আমাদের অনেকের অনেক রকম চুলকানি আছে। আমি নিজে এর ভুক্তভোগী। একবার আমার কলেজে আমি টাউজার পরে গিয়েছিলাম। আমার ক্লাস সিক্সের ম্যাডাম টিচার্স রুমে সব্বার সামনে যেভাবে নিন্দা করেছেন, মনে হচ্ছিলো, আমি মাত্র একটা খুন করে আসলাম... আশ্চর্য। অথচ হোটেল শেরাটনে যেতে, হেনরি ক্যাসিঞ্জারের সাথে দেখা করতে, উনি জাতীয় অধ্যাপক, অথচ লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী পরে গিয়েছেন। ব্যাপারটা তো জামাকাপড় না, ব্যাপারটা হলো, জামার নিচের মানুষটা। তাইই কি হওয়া উচিৎ কি নয় ?

* অনেক বিখ্যাত মানুষ, যেমনঃ বঙ্গবন্ধু, জয়নুল আবেদীন, আহমেদ শরীফ, শোর্হরাওয়ার্দী। মাওলানা ভাসানী, মহাত্মা গান্ধী, হুমায়ূন আহমেদ সহ আরো অনেক বিখ্যাত মানুষ নিয়ে সোজাপাস্টা উনার মতামত প্রকাশ করেছেন। ভাল লেগেছে।

* প্রচুর পড়তে হবে। প্রচুর। আমি একটা স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম, একটা বই লেখার আগে ১০০০টা বই পড়তে হয়। এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র সারাটা জীবন বইয়ে মুখ ডুবিয়ে ছিলেন, উনি কি একটা বইও রচনা করেছেন? উত্তরটা হলো, না। কিন্তু সবার বই উনি মন দিয়ে পড়তেন এবং পড়ার পরেই আলোচনা করতেন, পড়ার আগে সমালোচনা না। এইটাই তো হওয়া উচিৎ, তাই না ? ...
Profile Image for Fahmida Rini.
67 reviews34 followers
January 3, 2025
এই বইটিকে বোধহয় 'স্মৃতিকথা' হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কেননা একে না বলা যাবে উপন্যাস, না আত্মজৈবনিক। বরং আহমদ ছফার স্মৃতি থেকে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাককে দেখালে যেমনটা দাড়ায় তা-ই 'যদ্যপি আমার গুরু'।
আহমদ ছফা মাস্টার্সের শেষদিকে পিএচডি করবার সিদ্ধান্ত নেন। সেসময়ে তিনি প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের সংস্পর্শে আসেন।
তারপর সুদীর্ঘকাল প্রফেসরের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিলো। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাককে তুলে ধরবার চেষ্টা থেকে রচিত এই বই।

মনে হতে পারে, 'ব্যক্তি প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের প্রতি আগ্রহ না থাকলে এই বই পড়বো কেনো?'
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গুণী শিক্ষকের ব্যাপারে এই বই পড়ার আগে কিছুই জানতাম না। এমনকি প্রফেসর রাজ্জাককে জানার উদ্দেশ্যে এই বই হাতে নিয়েছি তা-ও বললে মিথ্যে বলা হয়। বরং লেখক ছফার প্রতি আগ্রহ থেকেই বইখানি পড়তে শুরু করা।
এবং প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের গুণমুগ্ধ হিসেবে বইয়ের শেষ পাতা বন্ধ করলাম।
Profile Image for Abdullah Mobin Chowdhury.
21 reviews4 followers
June 17, 2025
প্রফেসর সাহেব একটা মিথ। আর এই মিথ তৈরী এবং হৃষ্টপুষ্ট করায় একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে আহমদ ছফা রচিত এই বইখানা। ক্যারিশমাটিক রাজ্জাক সাহেবের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা চুম্বকের মত টানত ঢাকার তরুণ বুদ্ধিজীবীদের। এইরকম ঘটনা উল্লেখ করে প্লেটোর সাথে রাজ্জাক সাহেবকে তুলনা করেন তিনি। আচ্ছা প্লেটোর মত জ্ঞান কি তিনি সৃষ্টি করেছেন? বইয়ে লেখকের জবানীতে প্রফেসর সাহেবের বেশিরভাগ আলোচনাই ইংরেজিতে যাকে বলে সার্ফেস লেভেলের। গভীর কোন পান্ডিত্য আমি আসলে আবিষ্কার করতে পারি নাই। কি জানি হয়তবা আমারই ব্যর্থতা।

মাঝে মাঝেই ভাবি বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হওয়ার ক্রাইটেরিয়াগুলো কী? স্টেম ব্যাকগ্রাউন্ডে দুর্দান্ত গবেষণা করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে কিংবা হাজার হাজার সাইটেশন পাওয়া গবেষণা প্রবন্ধ লিখেও এ দেশে মিডিয়া হাউজের আশীর্বাদ পাওয়া যায় না। আর এই দিকে দুই চারটা ভাবের কথা বলে কিংবা শ দুই কপি কোবতের বই কোনরকমে বিক্রি হওয়া লোকজন হয়ে যাচ্ছেন কিংবদন্তি। অদ্ভুত।
Profile Image for Tamanna Binte Rahman.
184 reviews141 followers
June 26, 2019
জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সম্পর্কে জেনে ভাল লাগলেও কিছু কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁর মতামত একদম ভাল লাগেনি বিশেষ করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির বিষয়ে। শহীদ সাহেব ওকালতি চর্চা করে জীবন নির্বাহ করতেন, পার্টিকে সহায়তা করতেন, বংগবন্ধুকে সাহায্য করেছেন, তা নিজেই বংগবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন। যেহেতু লেখকের বয়ান থেকে জেনেছি তাই এই বিষয়ে আর কিছু লিখছিনা।
লেখকের সাবলীল ভাষায় এমন জ্ঞানী মানুষকে উপস্থাপন ভাল লেগেছে। মাঝে মাঝে গভীর প্রজ্ঞার অধিকারীদের সান্নিধ্যে যাবার আকুলতা অনুভব করলেও সুযোগ নেই। আফসোস!
Profile Image for শাহ্‌ পরাণ.
260 reviews74 followers
March 6, 2022
কিছু কিছু বই থাকে অর্ধেক পড়ার পর আর পড়তে ইচ্ছে করেনা, শেষ হয়ে যাবে এই কষ্টে। শেষ করার পর মনে হয়, আরো বড়ো হলো না কেন বইটা। একেকটা অধ্যায় পড়ার পর মনে হচ্ছিল আহা আহা যদি সরাসরি এ কথাগুলো শুনতে পারতাম! ভাগ্যিস এই বইটা ছিলো তাই প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক কে জানতে পারলাম।
Profile Image for Habib Ehsan.
18 reviews10 followers
June 19, 2020
পড়ার আগ পর্যন্ত কখনো নামিই শুনিনি, পড়ার পর বুঝছি শাস্তি সরূপ জেল-জরিমানা হওয়া উচিত আমার।😑🤦‍♀
"My Friend, Go and soak" এই লাইনটা আমার জন্যই বলা।
Profile Image for Shahriar Rahman.
84 reviews13 followers
May 17, 2022
অতিরিক্ত প্রতিভাবান মানুষেরা প্রায়শই কিছুটা এলোমেলো হন, কথ্যভাষায় যাকে বলা যায় “তারছেড়া”! ছফা প্রতিভাবান ছিলেন নিঃসন্দেহে, সাথে ছিলেন প্রচন্ড রগচটা। রেগে গেলে তাঁর মুখের ভাষা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছাড়িয়ে যেত প্রকাশযোগ্যতার সীমারেখা। বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সাথে জড়িয়ে “রাগান্বিত ছফার বচনামৃত” খুঁজলে খুব সহজেই মিলবে অন্তর্জালে। এর সাথে সাথে ছফার ছিল খুব দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলার অভ্যাস। যদ্যপি আমার গুরু’র শুরুতেই ছফা বলেছেন -
“আমার স্বভাবটাই এমন, একজন মানুষ তিনি যতো বড় ব্যক্তিত্বই হোন, বেশিদিন আমার আগ্রহ এবং কৌতুহল উদীপ্ত রাখতে পারেন না। অতি সহজেই তারা পুরনো হয়ে যান।”

অথচ এই বই যাকে নিয়ে লেখা, সেই আবদুর রাজ্জাকের সাথে লেখকের পরিচয় ১৯৭০ সালে। এরপর প্রফেসর রাজ্জাকের মৃত্যু অবধি দীর্ঘ সাতাশটি বছর গুণমুগ্ধ ছিলেন অল্পতেই নিরাসক্ত হয়ে যাওয়া আহমেদ ছফা। ভাগ্যিস ছিলেন! নয়ত এমন চলতি-ফিরতি বিশ্বকোষের সাথে হয়ত অপরিচিতই থেকে যেতে হত পরবর্তী প্রজন্মকে…

কে ছিলেন এই আবদুর রাজ্জাক? তাকে বর্ণনা করা, কিংবা পরিচয় দেয়া আমার কম্ম নয়। এই ভদ্রলোক নিজে কোন বই লেখেননি অথচ তাকে নিয়ে কম করে হলেও ২০টি বই লেখা হয়েছে যেগুলোর লেখকের মধ্যে আছেন সলীমুল্লাহ খান, সরদার ফজলুল করিম কিংবা আহমেদ ছফার মত বাঘা বাঘা নাম। যার সাথে আলাপচারিতায় মুগ্ধ হয়েছেন মুনতাসীর মামুন কিংবা হুমায়ূন আজাদ, যার ছাত্র ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি নিজ হাতে একটি দেশ গড়ে দিয়ে গিয়েছেন, শেখ মুজিবর রহমান (উপরের প্যারার তথ্যসুত্র উইকিপিডিয়া এবং যদ্যপি আমার গুরু)।

অথচ তাঁর চলন, বলন কিংবা পোশাক পরিচ্ছদ ছিল আক্ষরিক অর্থেই “সাদামাটা”। আহমেদ ছফার সাথে তাঁর প্রথম পরিচয়ের কথাই ধরি না কেন -
বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো তিনি চৌকির উপর উঠে বসলেন। পরনের সাদা আধময়লা লুঙ্গিটা টেনে গিটঠু দিলেন। তারপর চশমাটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে কাচ মুছে নাকের আগায় চড়ালেন………
খদ্দেরের চাদরটা টেনে নিয়ে গায়ের উপর মেলে দিলেন। আমার মনে হল তাঁর পরনের গেঞ্জির বড় বড় ফুটো দুটো আমার দৃশটি থেকে আড়াল করার জন্যই চাদরটার সাহায্য নিলেন।

আজকের বড় বড় প্রফেসরদের কথা ভাবুন, এমন কেউ যারা কয়েক বছর পর “জাতীয় প্রফেসরের” সম্মান পাবার যোগ্য। তাঁদের কেউ কি লুঙ্গি পরেন? সাদা আধময়লা লুঙ্গি? অথবা তাঁদের পরনে কি গেঞ্জি থাকে যাতে বড় বড় দুটো ফুটো? প্রফেসর রাজ্জাক ১৯৭৫ সালে জাতীয় প্রফেসর উপাধি পান।

চলনের কথা গেল, “বলনের” কথা কেন আসবে না? প্রফেসর রাজ্জাক শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতেন না (এটুকু লেখে এই মূর্খের মনে প্রশ্ন জাগলো, আচ্ছা শুদ্ধ বাংলা জিনিসটা আসলে কী? সে কি কোন এক আঞ্চলিক বাংলাকেই আত্মীকরণ করে বেড়ে উঠা বাংলা নয়?)। তাঁর বলন ছিল সম্পূর্ণ ঢাকাইয়া বাংলা ভাষায়। সে ভাষাতেই তিনি বাঘা বাঘা সব মানুষকে বশ করে রাখতেন তাঁর জ্ঞান আর প্রজ্ঞার বহর দিয়ে। (আমার পড়া আহমেদ ছফার প্রথম দুটো বইতেই লেখক হিসেবে আহমেদ ছফার শক্তিমত্তার পরিচয় পাই চট্টগ্রাম এবং ঢাকার মত এলাকার দুটো আঞ্চলিক ভাষাকে লিখিতরূপে নিয়ে আসার ক্ষমতা দেখে!) যদ্যপি আমার গুরুতে রাজ্জাক সাহেবের প্রতিটি কথা তাঁর ভাষাতেই লেখার চেষ্টা করেছেন লেখক, খাস ঢাকাইয়া ভাষায়!

প্রফেসর রাজ্জাকের সাথে আহমেদ ছফার উঠাবসা ছিল ২৭ বছরের, ভূমিকা ও অন্যান্য অংশ বা�� দিলে যদ্যপি আমার গুরু’র পরিব্যাপ্তি ৯৯ পৃষ্ঠার। কোনভাবেই ২৭ বছরের সবগুলি ঘটনা এর মাঝে আঁটানো সম্ভব নয়, ছফা সেই প্রচেষ্টা করেছেন বলেও দাবী করেননি। বরং বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টাইমলাইনে লেখা এই সম্পূর্ণ বইটি। এই বইতে মুগ্ধ হবার কারণ একদিকে আহমেদ ছফার ফ্ল-লেস, স্পিডি লেখা, অন্যদিকে প্রফেসর রাজ্জাকের জ্ঞান এবং পরিচয়ের ব্যপ্তি। শুধুমাত্র যদ্যপি আমার গুরু-তে উল্লেখ আছে এমন কিছু মানুষের নাম দেবার চেষ্টা করছি (কোনপ্রকার ক্রম ছাড়া) যাদের সাথে প্রফেসর রাজ্জাকের সরাসরি পরিচয় ছিল
- মুনীর চৌধুরী
- শেখ মুজিবর রহমান
- এ কে ফজলুল হক
- মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী
- তাজউদ্দিন আহমেদ
- আহমেদ ছফা
- নিয়াজ মোর্শেদ (গ্রান্ড মাস্টার)
- ড. কামাল হোসেন
- সরদার ফজলুল করিম
- রওনক জাহান
- ড. আনিসুজ্জামান
- কাজী মোতাহার হোসেন
- এস এম সুলতান
- জয়নুল আবেদীন
- সমর সেন (বাংলাদেশে নিযুক্ত দ্বিতীয় ইন্ডিয়ান হাই কমিশনার)
- হেনরি কিসিঞ্জার
এবং আরও অনেকে

প্রসঙ্গক্রমে হেনরি কিসিঞ্জারের সাথে প্রফেসর রাজ্জাকের একটি ঘটনা না লিখলেই না। (হেনরি কিসিঞ্জার কেমন মানুষ ছিলেন, বাংলাদেশ নিয়ে কেমন ভাবনা তার ছিল তা নিয়ে আলাপ করার স্থান এটা না। বাস্তবতা হল, তিনি এমন এক দেশের মন্ত্রী ছিলেন যে বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করার পরেও শেখ মুজিব বাধ্য হয়েছিলেন দেশ স্বাধীন হবার পর বিশাল নেমন্তন্ন করে তাকে এদেশে নিয়ে আসতে।) যেবার কিসিঞ্জার দেশে আসেন, সেখানে বিশেষ অতিথি হিসাবে আর সবার সাথে আব্দুর রাজ্জাকের আমন্ত্রণ ছিল। দুজনে ছিলেন পূর্ব-পরিচিত। ভ্রমণের এক পর্যায়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে কিসিঞ্জারের স্ত্রীর সাথে অনেকের পরিচয় পর্ব চলছিল, কিসিঞ্জার তার স্ত্রীকে কজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন "দে ওয়ার মাই স্টুডেন্টস"। সেখানে থাকা আব্দুর রাজ্জাকের যখন কথা আসল, কিসিঞ্জারের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন "ওয়াজ হি ইউর স্টুডেন্ট অলসো?" কিসিঞ্জার জবাব দিলেন "নো নো! হি ওয়াজ মাই কলিগ!"। কথিত আছে যে, সেবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে কিসিঞ্জার ৪৫ মিনিট ছিলেন, এর মাঝে ২৫ মিনিটই কাটিয়েছিলেন প্রফেসর রাজ্জাকের সাথে!

আবদুর রাজ্জাক ছিলেন দারুণ ভোজনরসিক, তাঁর বাসায় এক সকালের নাস্তার যে বর্ণনা আহমেদ ছফা দিয়েছেন সে বর্ণনার সাথে বিখ্যাত আরেক লেখকের বর্ণনার মিল পেয়েছি, বাংলা ভাষায় খাবারের বর্ণনা দেয়াকে যিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সাথে বোধহয় খানিকটা খামখেয়ালীও ছিলেন রাজ্জাক সাহেব, সব বাদ দেই, আহমেদ ছফাকে তিনি ডাকতেন “মৌলবি আহমেদ ছফা”। কেন? তার উত্তর খোদ ছফাও দিতে পারেন নি!

এই হাবিজাবি লেখার আকার প্রায় হাজার শব্দ ছুইছুই করছে, যতি টানা উচিত। মাত্র শখানেক পৃষ্ঠার এই বইয়ের যে কলেবর তার সামান্যতমও ছুঁতে পারেনি এই হাজার শব্দ। শেষ করবার আগে হয়ত বলা উচিত অনেক অনেক দিন পর কোন বইয়ের পুরোটা পড়েছি চেয়ার টেবিলে বসে, হাতে পেন্সিল নিয়ে, ভাল লাগলেই আন্ডারলাইন করেছি অসংখ্য জায়গায়। অ্যাকাডেমিক বই ছাড়া অন্য কোন বই এভাবে আন্ডারলাইন করি নি কখনো! পরে কোনদিন সে আন্ডারলাইন করা অংশ নিয়ে লেখা যাবে হয়ত, তবে আপাতত মাত্র দুটো লাইন দিয়েই আজ ইতি টানি

“বাংলা ভাষাটা বাচাইয়া রাখছে চাষাভুষা, মুটেমজুর। এরা কথা কয় দেইখ্যাই তো কবি কবিতা লিখতে পারে।”

"যদি আর কিন্তু দিয়ে ইতিহাস হয় না, যা ঘটে গেছে তাই ইতিহাস।"



এইতো সেদিন, আহমেদ ছফার সৃষ্টির সাথে আমার পরিচয় হয়, ১৯৬৭তে প্রকাশিত ছফার লেখা প্রথম উপন্যাস “সূর্য তুমি সাথী” দিয়ে। তাঁর কয়েকদিনের ব্যবধানেই দ্বিতীয় বই হিসেবে পড়লাম যদ্যপি আমার গুরু, ছফার জীবনের প্রায় শেষদিকে এসে লেখা, ১৯৯৮সালে প্রকাশিত (ছফা মারা যান ২০০১ সালে)।
Profile Image for Nowrin Samrina Lily.
158 reviews15 followers
March 4, 2022
তিথির থেকে বইটা নেওয়া হয়েছিল সেই ১০-১৫ দিন আগে,তারপর শেল্ফে রেখে দিয়েছিলাম কিন্তু আর পড়া হয়নি। পরশু রাতে যখন বইটা পড়া শুরু করলাম,ভাবলাম এক টানেই পড়ে ফেলি।
কিন্তু না বাবা,এতো এক টানে পড়ার মতো বই না। এতো এতো তথ্য, এতো সুন্দর বুলি আমি একবারেই পড়লে মনে রাখতে পারবোনা। বইটা বেশ ভালোই ছিল,টুকটাক নোট ও লিখে রেখেছি ডায়েরীতে। জানিনা উনার মতো কারোর সাহায্য এই ছোট জীবনে পাবো কিনা,কিন্তু ডিপার্টমেন্টের দুএকজন শিক্ষকের কথাই মনে পড়ছিল এই বই পড়ার সময় যাদেরকে আমি আমার অনেক সমস্যায় আমার পাশে পেয়েছিলাম। ধন্যবাদ জানাই উনাদের💜
Profile Image for Chandreyee Momo.
219 reviews30 followers
July 28, 2021
কি পরিমাণ তথ্যবহুল একটি বই। কত কিছু শেখালো। আবার পড়তে হবে কিছুদিন পর।
Profile Image for Sarah Haque.
427 reviews104 followers
February 5, 2022
আমার মনে হয়েছে, রাজ্জাক সাহেবের কথার মর্ম পুরোপুরি বুঝতে আমার আরো কিছু বই পড়া উচিত। বিষয়টা এই না যে, কথাগুলো কঠিন কিছু। তবে তার মতামতগুলোর কারণ ভালোভাবে বোঝার ইচ্ছাতেই জানার কৌতুহল আরো বেড়ে যায়। শিক্ষক তো এমনই হন, তাই না?



আপাতদৃষ্টিতে ছোট একটা স্মৃতিকথা, তবে আমার কাছে বইটা ঐতিহাসিক দিক দিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। প্রফেসর রাজ্জাক যেমন সোজাকথার সরল মানুষ ছিলেন, আহমদ ছফাও সেইভাবে তার ব্যক্তিত্বকে বেশ ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যেন আমিও তাদের আলোচনার মধ্যে বসে আছি।
Profile Image for Saumen.
256 reviews
December 17, 2023
বিদগ্ধতা ওভারলোডেড!

"যদ্যপি আমার গুরু শুড়িবাড়ি যায়,

তথাপি তাহার নাম নিত্যানন্দ রায়।"

ছফা কেন রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে একথা বলেছেন, বইটা পড়তে বসলে বোঝা যায়। রাজ্জাকের অনেক এনালাইসিস সম্পর্কেই তিনি একমত ছিলেন না,, তবুও ছফা রাজ্জাক স্যারের পান্ডিত্য নিয়ে কোন প্রশ্ন করেননি।

আমি জীবনে কিছু মানুষজনকে আসলেই পেয়েছি যারা বই পড়ে, মানে আসলেই পড়ে। এবং তাদের মধ্যে বইটা পড়ে যে ভাব জন্ম নেয়, সেটাকে বাস্তব জগতের সাথে মিশিয়ে এমনভাবে উপস্থিত করতে পারেন যে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়।  একটা বই পড়া এবং এনালাইসিস করা, পড়া এবং বোঝার মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে।

রাজ্জাক স্যার ছিলেন তেমন। মাল্টিডাইমেনশনাল পড়াশোনা ছিল তার। এমন লোক আমি খুঁজে বেড়াই, যাকে যা খুশি প্রশ্ন করা যায়, এবং সব বিষয়েই তার মতামত থেকে আরো জানতে ইচ্ছে করে। 

নানা বিষয় নিয়ে ছফা প্রশ্ন করেছেন, বেশিরভাগ সময়েই তার গুরু উত্তর দিয়েছেন সিনোপসিস আকারে৷ এমনভাবে উত্তর দিয়েছেন,যেন তা সম্পর্কে আরো জানার আগ্রহ বাড়ে, যতই দ্বিমত হই না কেন!

জ্ঞানী লোকদের মধ্যে বায়াস থাকা দোষের নয়, কিন্তু ছাত্রের কৌতুহল জাগ্রত করা এবং জ্ঞানের বহুমুখীতা, বাংলাদেশের খুব কম, বিরল শিক্ষকের মাঝে এই গুণ আছে ও ছিল৷ প্রফেসর রাজ্জাক সেই বিরল মানুষগুলির একজন ছিলেন।


২০২৪ এ বেশি বই পড়ব না। যা পড়ব, বোঝার ট্রাই করব বেশি। আর এই বইতে স্যার অনেক বইয়ের রেফারেন্স দিয়েছ��ন, সেগুলিও পড়ব। রাজ্জাক স্যারের মত গুরু তো আর পাব না, মন্ত্রশিষ্য হতে দোষ কি!

দর্শন, অর্থনীতি, ইতিহাস, ধর্ম, চিত্রকলা, আর আরো নানা বিদগ্ধ মানুষের জীবন নিয়ে রাজ্জাক সাহেবের উক্তি খুবই জ্ঞানপ্রদায়ক। ভাবতে শেখায়, জানতে উৎসাহিত করে। তার নিজের জীবন থেকেও আমরা বাংলাদেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পর্কে বেশ কিছু ঘটনা জানতে পারি।

একটা ব্যাপার,, রাজ্জাক সাবের ঢাকাইয়া শুনে আমার মুহাম্মদ ভাইকে খুব মনে পড়ছিল৷ এইযে রিডিং এবং এনালাইসিস, গুডরিডসে এই কাজটা মুহাম্মদ ভাইয়ের মত কেউ করতে পারে না।  আপনারা যারা তার বিভিন্ন বইয়ের ম্যারাথন রিভিউ পড়েননি, খুব মিস করছেন। মানুষটা দেশে থাকে না, কখনো আসলে তার বাসার নিচতলায় অস্থায়ী একটা তোশক পেতে বসবাস করব। শুধু আলোচনার লোভে।
Profile Image for প্রিয়াক্ষী ঘোষ.
364 reviews34 followers
April 8, 2023
বইটিতে স্যার আব্দুর রাজ্জাকে ব্যক্তিত্ব অল্প একটু স্পর্শ করেছেন মাত্র।
নিভৃতচারী, অনাড়রম্বর জ্ঞানসাধক, কৃশকায় অকৃতদার স্যার আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন চলনান বিশ্বকোষ।
অর্থশাস্ত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান , ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম - সংস্কৃতি এসব বিষয়ে তাঁর ছিলো অগাধ জ্ঞান।
এই জ্ঞানী মানুষটিকে খুব কাছে থেকে দেখেন লেখক আহমেদ ছফা কারন তিনি ছিলেন মৌলভী আহমদ ছফার স্যার।

দীর্ঘদিন কাছে থেকে দেখা অধ্যাপক আব্দর রাজ্জাকে নিয়ে নানা ঘটনা এবং একই সাথে বিখ্যাত ব্যক্তিকদের কাহিনী গেঁথে রচন করেছে এই গ্রন্থ।
এই গ্রন্থের লেখক আহমদ ছফাও আমাদের সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
Profile Image for Nabid Mostafa.
16 reviews356 followers
February 7, 2017
একজন সাধারণ মানুষ কিংবা মহীরুহের গল্প

যার কথা বলছি তাকে এই আধুনিক-অত্যাধুনিক সময়ের অনেকেই চিনবেন না। তবু তার কথা বলছি, বলছি “একজন বহুমাত্রিক ও ব্যতিক্রমী প্রতিকৃতির ” (প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিমের ভাষায়) কিংবা একজন প্রচারবিমুখ অথচ চলমান বিশ্বকোষের কথা। বলছি প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের কথা। ‘যদ্যপি আমার গুরু’ পড়ার আগে তার সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা ছিলো না। শুধু জানতাম তিনি একসময়ে জাতীয় অধ্যাপক ছিলেন, নামে চিনতাম এই যা। পরে জেনেছি তিনি সে মানুষটি যিনি কিনা একসময়ে হ্যারল্ড লাস্কির সাথে একসাথে গবেষণা করেছেন, যার সাথে তার একটা পেপারও থাকতে পারতো (কেন নেই সে প্রসঙ্গে পরে আসি) যেই হ্যারল্ড লাস্কির কথা আমরা পড়ি বইয়ের পাতায়, ছোটবেলা থেকে। শুধু এটুকু বলে তাকে বরঞ্চ তাকে ছোট করা হয়। তিনি যে কী ছিলেন তা আরও জেনেছি বইটি পড়ে। সৌম্য ভাষার লেখক আহমদ ছফা প্রথম পুরুষে চেষ্টা করেছেন তার একটা ছবি তুলে আনতে। বইয়ের ফ্ল্যাপের কথা থেকেই শুরু করি-“তার পাণ্ডিত্যের খ্যাতি সর্বজনবিদিত। সমকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠসমূহের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের অনেকেই একবাক্যে তার মেধা আর ধী-শক্তির অনন্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন। ” আমার যেমন বইটি পড়ে তার সম্পর্কে শূন্য থেকে জানতে শেখা, আহমদ ছফার জানার সূচনাটা তেমনি অল্প থেকেই। অনেকটা আগ্রহের কারণেই তিনি নিভৃতচারী মানুষটার শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন। পরে অবশ্য আর সম্পর্কটা নীরব-নিভৃত থাকেনি, হয়ে উঠেছে শিক্ষণীয়। ছফা নিজেই তা স্বীকার করেছেন। রাজ্জাক স্যার জানতেন না এমন কোন বিষয় ছিলো বলে মনে হয় না। অন্তত আহমদ ছফার ভাষ্য থেকে সেটাই প্রতীয়মান হয়। হয়তো ছফা সাহেব নাম না জানা অজ্ঞাতকুলশীল একটি বিষয় নিয়ে রাজ্জাক স্যারকে জিজ্ঞাসা করে বসলেন, অমনি স্যার হয়তো আলমারি থেকে স্বাস্থ্যবান একটা বই বের করে বলে দিলেন কোন একটা অধ্যায়ের কথা। পড়তে ব্যাপক আগ্রহ যে তার ছিলো সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না, যেটা না বললেই নয় সেটা তার পড়ার বিষয়বৈচিত্র্যের কথা। বাংলা-পূর্ববর্তী সময়ে মুসলমানে সমাজ ও সাহিত্যে তাদের লেখার বৈচিত্র্যের কথা রাজ্জাক স্যারের যেমন মুখের আগাতেই ছিলো, ঠিক তেমনি ছিলো বর্তমান সময়ের কোন সামাজিক নায়ক কোথায় কেমন ছিলো তার খোঁজ খবরও। দুটো বিষয়ের কথা বলে হয়তো তার বৈদগ্ধতাকে ঠিক বুঝাতে পারলাম না কিন্তু কোন কিছু বলেই এই জ্ঞানতাপসের মূল্য বোঝানো যাবে বলে মনে হয় না। আমি তাই সে চেষ্টা না করে তার অন্যদিক নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করি । আহমদ ছফার ভাষ্য থেকে জানা যায়, স্যারের সান্নিধ্যে এসে তিনি প্রচুর বই পড়তে শিখেছেন এবং তা অনেক বিচিত্র বিষয়েই। পাশাপাশি অনাড়ম্বর এই মানুষটার অনেক বদান্যতার বর্ণনাও এসেছে তার লেখায়। অনেকেই এমন ছিলেন যারা স্যারের রিকমেন্ডেশন নিয়ে বাইরে গিয়েছেন বা অনেক উচু পর্যায়ে নিয়োগ নিয়েছেন। তার মাঝে অনেকেই বিলাত-ফেরত এই মানুষটার অনেক দুর্নাম করেছেন কিন্তু স্যার কিছুই বলেননি তাদের-এতটাই বিনীত ছিলেন তিনি। ভালো কিছুর কদর করতে পারতেন তিনি। তারই প্রমাণ যখন এস এম সুলতানের কথা আসে। প্রথমে আগ্রহ না দেখালেও পড়ে তিনি ঠিকই সুলতানের সমাদর করেছিলেন। সুলতানের পরের দিকের কাজেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এইগুলো তো গেলো ব্যক্তিগত গুণগানের কথা। বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপারটা হলো রাজ্জাক স্যারের নিজমুখের কথাগুলি। ভেবে অবাক হই ছফা সাহেব কীভাবে এতটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আঞ্চলিক ভাষার সব সংলাপ অবিকলভাবে বর্ণনা করে গেছেন। দুই একটা উদাহরণেই সব স্পষ্ট হবে। “সেজন্যে পালটা প্রশ্ন করলাম, রবীন্দ্রনাথ কি বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষাকে উৎকর্ষের একটা বিশেষ স্তরে নিয়ে যাননি? স্যার বললেন, বাংলা ভাষাটা বাচাইয়া রাখছে চাষাভুষা, মুটেমুজুর-এরা কথা কয় দেইখ্যাই ত কবি কবিতা লিখতে পারে। সংস্কৃত কিংবা ল্যাটিন ভাষায় কেউ কথা কয় না, হের লাইগ্যা অখন ল্যাটিন কিংবা সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্য লেখা হয় না।” আরেকটা- “একটা কথা খেয়াল রাখন খুব দরকার। যখন একটা নতুন জায়গায় যাইবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানার চেষ্টা করবেন। অই জায়গার মানুষ কি খায় আর পড়ালেখা কী করে। কাঁচাবাজারে যাইবেন কি খায় হেইডা দেহনের লাইগ্যা। আর বইয়ের দোকানে যাইবেন পড়াশোনা কি করে হেইডা জাননের লাইগ্যা। ... কী খায় আর কী পড়ে এই দুইডা জিনিস না জানলে একটা জাতির কোনো কিছু জানন যায় না। ” আরও অনেক ছিলো । সব আমি বলতে পারছি না আমার অক্ষমতার কারণে, তবে তা পড়ে যে নিদারুণ আনন্দ পেয়েছি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাশাপাশি স্যারের সাথে কথোপকথনের প্রতিটি সংলাপেই বোঝা যাবে কতকিছু জানার আছে তার থেকে। ভারতের মাওলানা আজাদের ‘নির্জলা গালাগালি’-র বই থেকে শুরু করে শেরে বাংলার ‘অভিনয়’ পর্যন্ত অসংখ্য ছোটখাট ঘটনার উল্লেখ আছে। আমি আর কি বলবো, নিজে যেমন বিমোহিত হয়েছি এত বিচিত্র কিছু জেনে, পাঠককেও বলব সেই সমুদ্রে অবগাহন করতে। শেষ করতে গিয়ে আবার মানুষ আব্দুর রাজ্জাক স্যারের কথাতেই আসতে হয়। অত্যন্ত বিনীত এই মানুষটি কিন্তু চাইলেই পারতেন বিদেশে থেকে নিজের নামযশ কামাতে। তা না করে চিরতরুণ এই মানুষটি হ্যারল্ড লাস্কির মৃত্যুর পর গবেষণাপত্র প্রকাশ না করেই চলে আসেন। কারণ তার ধারণা ছিলো লাস্কি ছাড়া আর কেউ সে পেপারের মর্যাদা বুঝবেন না !! তাকে উৎসর্গ করে দেশে বিদেশে কম বই বেরয়নি, কম পেপার-জার্নালও না। তবে কেন জানি খুব নির্বিকার থাকতে পারতেন। নির্মোহের মতই মানুষের উপকার করতেন। তিনি হয়তো অনেক বড় সেলেব্রিটি ছিলেন না, কিন্তু তিনি যে কী মহীরুহ ছিলেন, তা তিনি কখনো না বললেও বইটি পড়ে কিছুটা ধারণা পাওয়া য���য়। আহমদ ছফার জীবনের একটা সেরা কাজ বলবো আমি এটাকে। আমার জীবনের একটা সেরা প্রাপ্তিও তার সাথে পরিচিত হতে পারাটায়। (“যদ্যপি আমার গুরু শুড়ি বাড়ি যায় তথাপি তাহার নাম নিত্যানন্দ রায়” )
Displaying 1 - 30 of 399 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.