সৃষ্টিশীল মানুষের যত্নের বড়ো প্রয়োজন। রমাদেবী তাঁর দুইটি পদ্মকুসুমের মতো করতলে নিজের জীবনটি সাজিযে যত্নে রেখেছিলেন স্বামী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে, শেষদিন অবধি। ওই রকম ত্যাগ আর প্রেম আজ দুর্মূল্য। ত্যাগ ও প্রেম শব্দ দুটি পৃথক হলেও কিন্তু তারা আলাদা নয়, ত্যাগ বিনা প্রেম নাই, আবার প্রেম বিনেও কি ত্যাগ আছে? নাই, মনে হয়। এই বই অপরাজিত কথাকার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই অপরূপ প্রেমকথার আখ্যান।
খুব বেশিদিন নয়। মাত্র কবছরের সংসার মাত্র। অথচ কত কত সুন্দর সব অনুভূতি দিয়ে ভরপুর বইখানা। পড়তে পড়তেই যেন শেষ হয়ে গেলো এবং শেষে এসে চোখ ভিজে গেলো। রমা বন্দ্যোপাধ্যায় তার হৃদয়ের কালি দিয়ে লিখে গেছেন তার স্বামীর সাথে কাটানো সুখ দু:খের অনুভূতি। যে অনুভূতি পড়তে পড়তে বিভূতির জগৎ বিচরণ করা যায়। বিভূতি ভক্তদের অবশ্যই পাঠ্য একটি বই।
হিন্দুধর্মীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উৎস ভাবা হয় সামবেদকে। পুরাণ অনুযায়ী, ব্রহ্মা থেকে বেদ এর উৎপত্তি। আবার ভিন্ন মতে, হর-পার্বতী থেকে ৬টি রাগের সৃষ্টি, যাকে আবার ব্রহ্মা ভাগ করেন ষড় ঋতু অনুসারে। গ্রীষ্মে দীপক, বর্ষায় মেঘ, শরৎ এ ভৈরব, হেমন্তে শ্রী, শীতে মালকোষ এবং বসন্তে হিন্দোল।
তেমনই হেমন্তের কোন এক শান্ত রাতে, শাদা চাদরের মতো কুয়াশায় ঢেকে শ্রী রাগে উৎরোল হয়ে আছে চারিদিক আর শ্রীমতি কল্যাণী মালা দিলেন বিভূতির গলায়।
ছেচল্লিশ বছরের বিভূতি আর সতেরো বছরের রমার জীবন বাঁধা পড়ল সাতপাকে৷ রমা, যাঁকে বরাবরই ডাক নাম কল্যাণী বলেই সম্বোধন করতেন লেখক- সেই সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ যুবতীটির মধ্যে কী দেখেছিলেন লেখক? 'কাছে থেকে দেখা' গ্রন্থে সেই অনুভূতি সম্পূর্ণ পাওয়া যাবে না, তবে পাওয়া যাবে উল্টো দিকের অনুভূতির খোঁজ।
প্রায় কিশোরী মেয়েটি ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী, বাবার ছিল বদলির চাকরি। নানা জায়গা ঘুরতে ঘুরতে, হরেক মানুষ দেখতে দেখতে তাঁরও একটা দেখার চোখ গজিয়েই যায়। পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায় পিতৃদেবের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকায় এই আত্মভোলা সাহিত্যিকটির সাথে পরিচিত হওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারেন নি রমা।
তখন বিভূতিভূষণের জীবনে একটা অস্থির অবস্থা। প্রিয় সহোদরা জাহ্নবী মারা গেছেন৷ জাহ্নবীর সন্তান উমা আর শান্তের দিকে তাকিয়ে বিভূতিভূষণ তাঁর বোনের অভাব আরো তীব্রভাবে অনুভব করছেন। সেই আত্মমগ্ন লেখককে দেখে রমার মধ্যে প্রগাঢ় শ্রদ্ধার পাশাপাশি মায়ারও জন্ম নিল। ধীরে ধীরে মেলামেশা বাড়ে, বাড়ে এ বাড়ি-ওবাড়িতে আনাগোণা। ধীরে ধীরে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছান রমা যে তিনি এই বিখ্যাত অথচ খেয়ালী সাহিত্যিককেই আপন করে পেতে চান।
বিভূতির জীবনে প্রথম স্ত্রী গৌরীর ভালোবাসার পরেও এসেছিলেন আরো কেউ কেউ। সকলেই তাঁর জীবনকে মাধুর্যে ভরিয়ে দিলেও কেউ জীবনসঙ্গী হন নি। অথচ এই ছোট মেয়েটি তাঁকে ভালোবাসা দিয়ে, মমতা দিয়ে এমনভাবে আপন করে নিলেন যে ছেচল্লিশ বছরের দ্বিধাটুকু ছাড়া সংসার পাতায় আর কোন বাধা ছিল না। খুব অল্প সময়ের বিবাহিত জীবন ছিল তাঁদের। বিখ্যাত এবং বয়সে বড় হওয়ার জন্যই হয়তো কল্যাণী তাঁর স্বামীর সম্পূর্ণ অনুগতা ছিলেন। এগারো বছরের দাম্পত্যজীবনে সুখের ভাগটাই বেশি ছিল আর তাই সারাজীবন তিনি সেই এগারো বছরের স্মৃতিকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচেছিলেন।
বিভূতি খেয়ালী হলেও তিনি কিন্তু অপ্রেমিক ছিলেন না! একবার রমাদেবীকে নিয়ে বেড়াতে যেতে চাইলেন বিভূতি। শুনে তিনিও উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। গ্রামে বাস করেন, নানা অখ্যাত জায়গা ঘুরেছেন আগেও। তাঁর চোখেও প্রকৃতির মায়াঞ্জন পরানো ছিল। তবুও যখন শুনলেন শান্ত-নিরিবিলি গ্রাম সালানপুরে তাঁকে নিয়ে যাবেন বিভূতি, খুশি হতে পারলেন না।
ট্রেনে উঠেও তিনি কিছু বুঝতে পারলেন না, আবার টিকিটও দেখতে দিলেন না তাঁকে লেখক। শেষমেশ ঘুমিয়েই পড়লেন, উঠে আবিষ্কার করলেন এক দীর্ঘযাত্রায় বেড়িয়েছেন তাঁরা! কাশীর মাটিতে পা দেয়ার পর বুঝতে পারলেন তাঁর স্বামী তাঁকে দূরে আর বড় শহরেই বেড়াতে নিয়ে এসেছেন! এই 'সারপ্রাইজ' দিতে পেরে বিভূতিভূষণ ছেলেমানুষের মতো খুশি হয়েছিলেন।
তারাদাস মানে বাবলুর অন্নপ্রাশন নিয়েও স্বামী স্ত্রীতে মতভেদ হয়েছিল। কিন্তু শেষমেশ এক মধুর স্মৃতিতেই রূপান্তরিত হয় তা। পরিবারকে আর প্রকৃতিকে জীবনে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন বিভূতি৷ তাঁর সাথে থেকেই প্রকৃতিকে আরো বেশি ভালোবাসেন রমা। তাঁর লেখাতেও তাই অকৃত্রিম একটা টোন আছে। চমৎকার শব্দবন্ধ ব্যবহার করে নিজের অনুভূতি প্রকাশের সহজাত গুণ ছিল তাঁরও। বিভূতিভূষণের স্ত্রী বাদেও তাঁর একটা লেখিকা পরিচয়ও কিন্তু ছিল।
এগারো বছরের দাম্পত্যজীবন আর তার আগের কিছু সময়ের পরিচয়-এই ছিল রমা ওরফে কল্যাণীর স্নেহমাখা ভালোবাসার নীড়ের রসদ। তার সাথে যোগ হয়েছে প্রিয় মানুষের কাছে শোনা তাঁর আগের জীবনের মানুষ আর স্থানের কথা। সেইসব নিয়েই 'কাছে থেকে দেখা।' ইছামতী উপন্যাসের ভবানী বাড়ুজ্যে, তার স্ত্রী তিলু আর একমাত্র সন্তানের মাঝে বিভূতি এঁকে রেখেছেন তাঁর কল্যাণী আর বাবলুকে।
নিজেদের জীবনে নিজেদেরকে নিয়েই তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন এক ছিমছাম সুখের আকর। আরেক প্রকৃতির বরপুত্র জীবনানন্দের স্ত্রী লাবণ্য দাশের লেখা মানুষ জীবনানন্দ গ্রন্থের সাথে এ গ্রন্থের অনেক প্রভেদ, অনেক ফারাক। ফারাকটা আন্তরিকতার, চেনা স্পর্শের আর ভালোবাসার রঙের।
শ্রদ্ধেয় সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় একবার টেলিফোনে রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে কথা বলছিলেন। কথা প্রসঙ্গে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা উঠতেই উত্তেজিত হয়ে বলেছিলেন--- বৌমা, আমি নিশ্চয় করে বলছি, বর্তমান যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে বিভূতিভূষণ উপন্যাস-গল্প লিখেছেন। দুহাজার বছর আগে জন্মালে উনি উপনিষদ রচনা করতেন। বিষয়বস্তুর কোন পার্থক্য নেই, পার্থক্য কেবল আঙ্গিকের।
রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়স যখন সতেরো তখন ছেচল্লিশ বছর বয়সের "পথের পাঁচালী" উপন্যাসের লেখকের সাথে বিয়ে হয়। পড়তে ভালোবাসতেন আর এই পড়া লেখার প্রতি টান থেকেই লেখক বিভূতিভূষণের সাথে পরিচয়। পরিচয়ের এক বছর পর দুই পরিবারের চাওয়াতেই এই বিয়ে। বিশেষ ভাবে চাইতেন রমা বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনি এক প্রকার ঠিক করে নিয়েছিলেন যদি বিয়ে করতে হয় তবে এই আত্মভোলা স্বজনহারা লেখককেই বিয়ে করবেন।
লেখক বিভূতিভূষণের লেখক হয়ে ওঠার লড়াইটা অনেক কঠিন ছিল, সেই সময়ে একে একে কাছের মানুষদের হারিয়ে তিনি নিরবিচ্ছিন্ন এক জীবন কাটিয়েদিবেন বলে ঠিক করেছিলেন। আত্মীয় স্বজনদের অনুরোধের যখন তিনি সংসার জীবনে যেতে চান নাই তখন হঠাৎ করেই নিজের জীবনের সাথে ছোট একটা মেয়েকে জড়িয়ে ফেললেন।
'কাছে থেকে দেখা ' রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ মূলক বই। বিভূতিভূষণের খুব ছোট বেলা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত টুকরো টুকরো সব ঘটনা নিয়ে এই বই। তাছাড়া গল্প উপন্যাসের পেছনের গল্প সাথে আছে মানুষ বিভূতিভূষণ ও লেখক বিভূতিভূষণ।
লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত একজনের সাথেই রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিয়ে হয়। বয়সের বিস্তর পার্থক্য, খেয়ালি একজন ভবঘুরে মানুষ তার পরও সম্পর্কে কখনও এর প্রভাব পড়েনি। শ্রদ্ধ, ভালোবাসার কোন ঘাটতি কোথাও ছিল না। কি দারুণ একটা মিষ্টি সম্পর্ক তাঁদের মাঝে। ' উপলব্যথিত গতি' বইটাতে এতোটা স্পষ্ট নয় যতোটা ' কাছে থেকে দেখা' বইটাতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাওয়া যাবে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকৃতি প্রেমী ভবঘুরে লেখক মানুষটি কি ভীষণ পারিবারিকও ছিলেন। ভ্রমণ পিপাসু হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন গোটা দেশ, সন্ন্যাসীর মতো একলা জীবন কাটিয়েছেন বহুবছর। আবার তিনিই আদ্যোপান্ত একজন গৃহী মানুষ। কিশোরী কল্যাণী কে সাথে নিয়ে ঘরে-বাইরে কি অসাধারণ আটপৌরে একটা সংসার পেতেছিলেন। সেই সংসারের গল্প নিয়েই এই "কাছে থেকে দেখা'র" ঘরোয়া আয়োজন।
রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরল লেখনীতে প্রিয় বিভূতিভূষণ কে ব্যক্তি মানুষ হিসাবে জানলাম, অসাধারণ রকমের সাধারণ মানুষটির প্রতি ভালোলাগা বাড়লো আরো কিছুটা... ❤️